Home Blog Page 93

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ – শব্দকে ঘিরে আধুনিক বিতর্ক

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মধ্যযুগীয় গবেষণায় ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অ্যাংলো-স্যাক্সনিস্টস সোসাইটির নাম পরিবর্তনের দাবির মাধ্যমে এই বিতর্কের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা আরও বিস্তৃত ও তীব্র আকার ধারণ করে। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল এই শব্দটির বর্ণবাদী ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক ব্যবহার এবং এর প্রভাব। অনেকেই দাবি করেন, ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি বাদ দিলে গবেষণায় বৈষম্যের সুযোগ কমে যাবে এবং ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা থেকে মুক্তি মিলবে। অন্যদিকে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই শব্দটি যথাযথ ও সতর্ক ব্যবহারে বর্ণবাদী অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব এবং এটি ইতিহাস বোঝার জন্য অপরিহার্য।

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি মূলত ইংল্যান্ডের প্রাচীন মধ্যযুগীয় সময়কাল (৫০০ থেকে ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তবে আধুনিক সময়ে বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় এই শব্দটি সাদা supremacist গোষ্ঠীর কাছে একটি রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা এই শব্দের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ‘স্বর্ণযুগ’ এবং ‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমোট করে। এর ফলে অনেকেই এই শব্দের ব্যবহার বন্ধ করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অ্যাংলো-স্যাক্সনিস্টস সোসাইটি নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অফ আর্লি মেডিভাল ইংল্যান্ড’ নামে পরিচিত হয়। এই পরিবর্তনকে অনেকেই বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। কিন্তু কিছু গবেষক মনে করেন, এই পরিবর্তন ইতিহাসের জটিলতা ও বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে এবং গবেষণার স্বাধীনতায় বাধা দেয়।

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৮ম শতকে ইতালির পল দ্য ডিকনের ‘হিস্ট্রি অফ দ্য লম্বার্ডস’ গ্রন্থে। ইংল্যান্ডে এটি sporadically ব্যবহৃত হয় ৯ম থেকে ১১শ শতকের মধ্যে। ১৮-১৯শ শতকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য গবেষকরা এই শব্দটি পুনরুজ্জীবিত করেন ইংল্যান্ডের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝাতে। তখন থেকে এটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ৫ম থেকে ১১শ শতকের ইংল্যান্ডের বসতি, সমাধি, ধাতব কাজ, মুদ্রা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্দেশ করে না, বরং ঐ সময়ের বিভিন্ন রাজ্য ও সম্প্রদায়ের বহুমাত্রিক ইতিহাস তুলে ধরে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এটিকে একটি নিরপেক্ষ ও প্রায়োগিক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, যা ঐ সময়ের জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বোঝাতে সাহায্য করে।

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি বহু সময় ধরেই জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী মতাদর্শের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাদা supremacist গোষ্ঠী এই শব্দকে ইংল্যান্ডের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সমর্থন করে। এই কারণে অনেকেই এই শব্দের ব্যবহার বন্ধের পক্ষে।

তবে আধুনিক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে অ্যাংলো-স্যাক্সনরা কোনো একক ‘বর্ণগত’ গোষ্ঠী ছিল না। বরং এটি ছিল বিভিন্ন জার্মানিক জনগোষ্ঠীর একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল সমন্বয়, যারা ৫ম শতকে রোমান ব্রিটেনের পতনের পর ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপন করে। এই সময়ে স্থানীয় রোমান-ব্রিটিশ জনগণও ছিল এবং তারা নতুন আগতদের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রায় মিশে গিয়েছিল। তাই আধুনিক বর্ণগত ধারণা এই যুগের জন্য প্রযোজ্য নয়।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রত্নতত্ত্বে নতুন প্রশ্ন ও পদ্ধতি এসেছে। এখন গবেষকরা শুধু বসতি বা সমাধির নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার চেয়ে বেশি গভীরভাবে সমাজের গঠন, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনীতি, ধর্মীয় রূপান্তর এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া ভাইকিং আক্রমণ, রাজ্য গঠন, খ্রিস্টান রূপান্তর ইত্যাদি বিষয়েও ব্যাপক গবেষণা চলছে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প যেমন সাটন হু, লিনডিসফার্ন, রেন্ডলশ্যাম ইত্যাদি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। এইসব প্রকল্পে ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ব্যবহার করে ঐ সময়ের জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া বোঝানো হয়।

ব্রিটেনের বিভিন্ন জাদুঘর, দর্শনীয় স্থান, শিক্ষামূলক প্রকল্প ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ব্যবহার করে ইতিহাসকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে। সাটন হু, লিনডিসফার্ন, ওয়েস্ট স্টো, জ্যারো হল ইত্যাদি দর্শনীয় স্থানগুলোতে এই শব্দের মাধ্যমে ইতিহাসের নানা দিক তুলে ধরা হয়। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া ও পাবলিক আর্কিওলজি প্রকল্পগুলোতেও এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণ মানুষকে প্রাচীন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং তাদের মধ্যে ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এই শব্দটি জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী মতাদর্শের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এবং এটি ব্যবহার করলে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা ছড়াতে পারে। আবার কেউ মনে করেন, ‘প্রারম্ভিক ইংরেজ’ বা ‘পুরানো ইংরেজ’ শব্দগুলো ভাষাগত ও জাতিগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।

‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও এর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি ইতিহাস বোঝার জন্য অপরিহার্য। বর্ণবাদী ও জাতীয়তাবাদী অপব্যবহার প্রতিরোধে শব্দটির সতর্ক ও সমালোচনামূলক ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

আমাদের উচিত এই শব্দের ইতিহাস, ব্যবহার ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যময় গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলা। এটি শুধুমাত্র একাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইতিহাসের সঠিক ও সমৃদ্ধ বোধ গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুতির বৈশ্বিক বিভীষিকা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করছে, এটি ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে শুধুমাত্র বন্যার কারণেই ৯.৮ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই বাস্তুচ্যুতি কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তান, ব্রাজিল এবং পূর্ব আফ্রিকার মতো অঞ্চলে সাম্প্রতিক প্রবল বৃষ্টিপাত শহর ও গ্রামগুলিকে প্লাবিত করেছে,এসব সমস্যা দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য ক্রমবর্ধমান কষ্টের কারণ।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ৫৫ মিলিয়নে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি সংঘাত ও সহিংসতার কারণে পালিয়েছে, আর প্রায় সাত মিলিয়ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎখাত হয়েছে, যদিও অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে এই সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম হতে পারে।

গত বিশ বছরে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকার কারণে বড় জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের সাথে মিলে, ক্রমাগত অসমতা এবং প্রান্তিকীকরণ নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে এবং স্থানীয় সংকটের প্রভাবকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সংঘাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংমিশ্রণ অনেক মানুষকে দ্বিতীয় বা এমনকি তৃতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করেছে, যা তাদের দুর্বলতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়িত করেছে। ইয়েমেনে বন্যার কারণে যারা পালিয়েছে তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে সংঘাতের কারণে কমপক্ষে একবার উৎখাত হয়েছিল। সোমালিয়ায় খরা মানুষদের গ্রামীণ এলাকা থেকে শহুরে এলাকায় পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে, যেখানে তারা এখন উচ্ছেদ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সুদানের নীল নদ রাজ্যে ২০২২ সালের অক্টোবরে সশস্ত্র সংঘাতের কারণে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। রোজারিজ এলাকায় অবস্থিত একটি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের (IDP) শিবিরে ৪,০০০ এরও বেশি মানুষ পুনর্বাসিত হয়েছে। এই সাম্প্রতিক আগমন শিবিরের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।

শিবিরে বসবাসকারী মানুষেরা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সেবার অভাব, দুর্বল পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সেবা, জীবিকার কার্যক্রমের অভাব এবং শিশুরা আর স্কুলে যেতে পারছে না। পুষ্টি বিশেষজ্ঞ নাজাতের মতে, ক্লিনিকে আসা বেশিরভাগ বাস্তুচ্যুত শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। “বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক পরিবারের খাওয়ার মতো তেমন কিছু নেই”।

জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লিসমোরে ২০২২ সালের বন্যার পর সম্প্রদায়ের মানুষেরা বর্ণনা করেছেন যে বন্যা তাদের শহরকে প্লাবিত করেছে, হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং এমন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে যা একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছিল।

বন্যার পর বারো মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও মানুষেরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। ঘর, শহর এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের শারীরিক ক্ষতি দেখা যতটা হতবাক করার মতো, সম্প্রদায়জুড়ে ট্রমা এবং দুর্দশার মাত্রা আরও বেশি উল্লেখযোগ্য। এই মানসিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী এবং সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ধীর-সূচনাকারী পরিবেশগত পরিবর্তন বা টেকসই ভূমি ব্যবহারের অভাব যখন কোনো এলাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে, তখন দুর্যোগের পরে ফিরে যাওয়া আর বিকল্প থাকে না। বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য দুটি বিকল্প হলো স্থানীয় একীকরণ বা পরিকল্পিত স্থানান্তর। এই সমাধানগুলোর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী স্থানীয় শাসন এবং বিকেন্দ্রীভূত হস্তক্ষেপ যা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করে এবং সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন জীবিকা উদ্যোগকে সমর্থন করে।

জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ যা তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় পদক্ষেপের দাবি রাখে। পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে বাস্তুচ্যুতি প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়ার জন্য মানবিক, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে সংযুক্ত করার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন রয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে আরও নমনীয় এবং পূর্বাভাসযোগ্য অর্থায়ন প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে যা আলোচনা হল – হতাশ , ক্ষুব্ধ ইউনূস ‘পদত্যাগ’ করতে চাইছেন কেন ?

0

দেশের চলমান পরিস্থিতিতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নানা পক্ষের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতায় তাঁর সরকার কাজ করতে পারছে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ অবস্থায় তাঁর দায়িত্বে থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা–তা নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১০টায় তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের নির্ধারিত বৈঠকে প্রথমে এক ঘণ্টা নিয়মিত সভা হয়। এর পর সচিবরা বেরিয়ে যান। উপদেষ্টাদের নিয়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা অনির্ধারিত বৈঠক করেন ড. ইউনূস।

দু’জন উপদেষ্টা দৈনিক সমকালকে জানান, প্রধান উপদেষ্টা শুরুতে বলেন, রাজনৈতিক দলসহ কেউ সরকারকে প্রতিশ্রুত সহযোগিতা করছে না। এভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে চাপ তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হবে। এর দায় নিতে রাজি নন তিনি।

উপদেষ্টাদের বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে অবিশ্বাস করায় ড. ইউনূস হতাশা প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এমন বিষয়কেও নির্বাচনী ইস্যু করে তোলা হচ্ছে। তিনি বলেছেন,‌ ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে – এটা তিনি বারবার বলছেন। জুনের পর এক দিনও থাকবেন না। কিন্তু কোথাও যেন অবিশ্বাস রয়ে গেছে।

বিএনপি নেতাদের অনেকেই গত কয়েক মাস ধরে খোলাখুলি অভিযোগ করছেন, ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায় সরকারের কেউ কেউ। মানবিক করিডোর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ব্যবস্থাপনার কাজ বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার আলোচনাকেও নির্বাচন বিলম্বের ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেছেন, এমন একটি আবহ তৈরি করা হয়েছে–আমি নাকি দেশ বিক্রি করে দিচ্ছি! এ অপবাদ নিয়ে থাকতে চাই না।

প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সীমারেখা টেনে বলা হচ্ছে–এর বাইরে যাওয়া যাবে না। স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে সরকারে থাকার দরকার নেই। উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরকে স্মার্ট করতে চেয়েছেন বলে জানান তিনি।

এই সময়ে বৈঠকে একজন উপদেষ্টা এনসিটির বর্তমান অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিনের সঙ্গে বিএনপির এক নেতার টেলিফোন আলাপের প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাদের বিনিয়োগ রয়েছে বন্দরে। তারাই প্রচারণা চালাচ্ছে–বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার কাজ দিতে আলোচনা শুরু হয়।

উপস্থিত একজন উপদেষ্টা সমকালকে জানান, বৈঠকে এক পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টার জন্য জাতির উদ্দেশে ভাষণের একটি খসড়া তৈরি করা হয়। তাতে সব পক্ষের প্রতি কিছু বার্তা প্রস্তাব করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা তাতেও হতাশা জানান এবং বলেন, তিনি ছেড়ে দিতে চান।

বৈঠক সূত্র জানায়, এ সময় অন্তত ৪ উপদেষ্টা বলেন, তারাও অপবাদ নিয়ে থাকতে চান না। তবে অন্য উপদেষ্টারা বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসা এই সরকারের জাতির প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। এই অস্থিতিশীল সময়ে সরকার বিদায় নিলে দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এই দায়ও সরকারপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের ওপরেই বর্তাবে।

এ পর্যায়ে অধ্যাপক ইউনূস উপদেষ্টাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে মতামত দিতে বলেন। তিনি বলেন, সরকার থাকবে কিনা, তা উপদেষ্টারাই ঠিক করবেন।রাজনৈতিক চাপের কারণে কিছুই করা যাচ্ছে না বলে জানান উপদেষ্টারা। তারা একে একে অভিযোগ করেন, কাজ করতে কোথায় কী প্রতিবন্ধকতায় পড়ছেন।

ড. ইউনূস তখন বলেন, কোথাও কিছু করা যাচ্ছে না; সব কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্কারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন সরকারের মূল লক্ষ্য হলেও প্রশাসনসহ সব কুক্ষিগত হয়ে যাওয়ায় ভোট নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

বৈঠকে বলা হয়, নির্বাচন বিতর্কিত হলে নোবেলজয়ী হিসেবে ড. ইউনূসের সারাজীবনের অর্জিত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। ড. ইউনূস জানান, এই দায় তিনি নিতে চান না।

সূত্রমতে, ড. ইউনূস বৈঠকে বলেছেন, গত ৯ মাসে সরকার ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেছে। বহু বছরের বৈষম্য-বঞ্চনা দূর করেছে। কিন্তু কোনো ভালো কাজের জন্য সরকারের প্রশংসা করা হয়নি। চারদিক থেকে শুধু সমালোচনা চলছে। সরকার যেসব ভুল করেনি, সেগুলোরও সমালোচনা চলছে।

এ সময় একজন উপদেষ্টা অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, পুলিশ বিমানবন্দর থেকে ওই অভিনেত্রীকে গ্রেপ্তারের পর সরকারের করণীয় কিছুই ছিল না। মামলা থাকায় পুলিশ আদালতে নিয়েছে। কিন্তু পাবলিক প্রসিকিউটর জামিনের বিরোধিতা করেন। এমন সব অভিযোগ আনেন, যা সরকার চায়নি। কিন্তু সরকারকে ট্রল সইতে হয়েছে।

একজন উপদেষ্টা বলেন, সেন্টমার্টিন রক্ষায় পর্যটক সীমিত করা হয়েছে। এ নিয়েও ট্রল হচ্ছে। বৈঠকে উপদেষ্টারা বলেন, ঠুনকো ইস্যুতে রাস্তাঘাট বন্ধ করে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। মব, গুজব সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা হয়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সংস্কারে বড় রাজনৈতিক দলের অনীহা রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক দলের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। দলগুলো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কথা দিয়েছিল– আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন। কিন্তু এখন অস্থিরতা তৈরি করেছে। মানুষের আশা পূরণ করতে দিচ্ছে না। জনদুর্ভোগ তৈরি করছে। যে কোনো ইস্যুতেই রাস্তা অবরোধ করছে।

আরেক উপদেষ্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি নিজ পেশায় ভালো ছিলেন। অভ্যুত্থানের নায়করাও এখন কথায় কথায় আন্দোলন করছেন, যা সরকারের জন্য বিব্রতকর। যারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, তারাই সহযোগিতা করছেন না। সরকারের বিরুদ্ধে যেভাবে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে সরে যাওয়া উচিত।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক সূত্র দৈনিক প্রথম আলোকে বলে, ঢাকায় প্রতিদিন সড়ক আটকে আন্দোলন, সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোদের মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া, রাষ্ট্রীয় কাজে নানা পক্ষের অসহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

আলোচনার এক পর্যায়ে কাজ করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি আরও বলেন, সংস্কারের বিষয়েও এখনো তেমন কিছু হলো না। তাহলে তিনি কেন থাকবেন—এমন প্রশ্নও আলোচনায় আনেন তিনি।

উপদেষ্টা পরিষদের ওই আলোচনায় উপস্থিত থাকা সূত্রগুলো আরও জানায়, একপর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা তাঁদের বলেন, তাঁরা যেন আরেকটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। কারণ, তিনি চলে যেতে চান।

বর্তমানে যে পরিস্থিতি আছে তাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ-প্রশাসন তা ঠেকাতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। অন্যদিকে ভালো নির্বাচন করতে না পারলে মানুষ তাঁকে দায়ী করবে বলেও আলোচনায় উল্লেখ করেন তিনি।

বৈঠক সূত্র জানায়, বিভিন্ন পক্ষের অসহযোগিতার বিষয়টি জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তুলে ধরার কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। একপর্যায়ে তাঁর ভাষণের একটি খসড়াও তৈরি করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ভাষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে পরে আবার আলোচনা হতে পারে।

একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা সমকালকে বলেন, বিএনপি এবং এনসিপি অধৈর্য হয়ে গেছে। সরকার রাজনৈতিক দল ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থনকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু উপদেষ্টা নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছেন। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনায় দায়িত্বপূর্ণ আচরণ না করায় সরকারের সংকট তীব্র হয়েছে। করিডোর, বন্দরের মতো বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে সরকার সবকিছু লেজেগোবরে করে ফেলেছে।

ঘটনাবহুল বৃহস্পতিবার – যেভাবে রাজনৈতিক সংকট জটিল হয়ে উঠলো

0

গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের নির্ধারিত বৈঠক শেষে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন — যদি ঠিকভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার পদে থেকে কী লাভ।

বিকেল থেকে এই আলোচনা ‘প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জন’ হিসেবে ডালপালা মেলে। বিকেল ৪টায় বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনের পথনকশার দাবি জানায়, অন্যথায় সরকারকে সহযোগিতা করা কঠিন হবে বলে মত দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের অব্যাহতি দাবি করেছে দলটি।

বিএনপি’র সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয় — মাথাভারী উপদেষ্টা পরিষদ না রেখে শুধু রুটিন ওয়ার্ক (দৈনন্দিন কার্যক্রম) পরিচালনার জন্য একটি ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাখাই বাঞ্ছনীয়।

বিকেল ৫টার দিকে জামায়াতে ইসলামী দলের নির্বাহী কমিটির সভা করে এবং সর্বদলীয় সভা ডাকার জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানায়।

সন্ধ্যায় এনসিপি নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেন। গণমাধ্যমকে তারা জানান, প্রধান উপদেষ্টাকে তারা পদত্যাগ না করার জন্য অনুরোধ করেছেন।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খবর আসতে থাকে–প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ইশরাক ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলনের ইতি টানেন। এর কিছু পর শাহবাগ মোড় অবরোধের কর্মসূচি শেষ করে ছাত্রদল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য সমকালকে বলেছেন, নির্বাচনের রোডম্যাপের দাবিতে বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করেনি। আদালতের রায়ের পরও অবরোধ চালিয়ে যাওয়া ইশরাকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল। দল থেকে পরে নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি সরে যান।

বৈঠকের পর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুকে লেখেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীজনদের নিয়ে অতীতে বিভাজনমূলক কথার জন্য দুঃখিত। সরকারের পদত্যাগ গুঞ্জনের মধ্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল পক্ষকে মান, অভিমান ও ক্ষোভ একদিকে রেখে, জাতীয় স্বার্থে দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানাই।’ বিকেলে দলের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকের পর সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত।

এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর চলমান আন্দোলন থেকে দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।

বিএনপির এই দাবির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টাকে ‘বিএনপির মুখপাত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা। তবে তা ‘সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে’। এই তিনজন হলেন– আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

সেই সঙ্গে তাঁরা বিচার বিভাগে বিএনপির হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে কর্মসূচিও পালন করেছেন। এদিকে, গত বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। তিনি জানান, কী সংস্কার হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে–এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা আলোচনাও করা হয়নি।

সেনাপ্রধান আরো বলেন–মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। করিডোর দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দিতে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেছেন, ‘বিএনপি বলি কিংবা এনসিপিকে বলি, তাদের অধৈর্যের ফল হচ্ছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি। গত কয়েক দিনে যেটা হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়েছে। এখন সমাধানে আসতে হবে।’

Death Note – ক্ষমতা ও ন্যায়ের সংঘর্ষে , জাপানি গ্রাফিক নভেল

২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়া জাপানি গ্রাফিক নভেল Death Note একটি ক্রান্তিকালীন সাহিত্যকর্ম, যা কেবল বিনোদনের স্তরে থেমে নেই।Tsugumi Ohba (লেখক) ও Takeshi Obata (চিত্রশিল্পী) নির্মিত এই সাইক্রোলজিক্যাল থ্রিলারটি জাপানি মাঙ্গার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। এটি এমন এক কাহিনি যেখানে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, ক্ষমতা ও আত্ম-ঈশ্বরপনা সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

মূল চরিত্র Light Yagami, এক উচ্চমেধাসম্পন্ন কলেজ শিক্ষার্থী, হঠাৎ পায় মৃত্যু দেবতা Ryuk-এর ফেলে যাওয়া Death Note। খাতার নিয়ম সহজ, যে কারো নাম এই নোটবুকে লিখলে সে মারা যাবে। Light এই ক্ষমতাকে সমাজ শোধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, নিজেকে “Kira” ছদ্মনামে অপরাধীদের নির্মূল করতে শুরু করে। এই অবস্থান তাকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দেবতায় পরিণত করে, কিন্তু প্রশ্ন উঠে, ক্ষমতার এই ব্যবহার কি ন্যায়ের সংজ্ঞা পাল্টে দেয়, নাকি তা এক ধরণের নৈতিক সন্ত্রাসে রূপ নেয়?

এই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Light ও রহস্যময় গোয়েন্দা L-এর দ্বৈরথ। তাদের দ্বন্দ্ব একরকম Bentham-এর উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং Kant-এর কর্তব্যবাদ (Deontological Ethics)-এর মধ্যকার সংঘর্ষ।

Light বিশ্বাস করে, খারাপ মানুষ মেরে ফেললে সমাজ নিরাপদ হবে এটি উপযোগবাদী ধারণা। L যুক্তি দেয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করলে তা নিজেরই অন্যায় হয়ে দাঁড়ায়—এটি কর্তব্যবাদী অবস্থান। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে নৈতিক দ্বিধার ভিতর ফেলে একজন মানুষ যদি অপরাধী হয়, তাহলে কি তার মৃত্যু ন্যায্য?

Light ধীরে ধীরে নিজেকে “নতুন পৃথিবীর ঈশ্বর” হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে। তার বিচার নিজের নৈতিক কাঠামোতে চলে। এই অবস্থান জার্মান দার্শনিক Friedrich Nietzsche-এর Übermensch বা “উচ্চমানব” ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। Nietzsche-এর মতে, Übermensch প্রচলিত নৈতিকতার বাইরে নিজের নৈতিকতা নির্মাণ করে। কিন্তু Light-এর নিজস্ব নৈতিকতা শুদ্ধ না হয়ে, হয়ে ওঠে আত্মম্ভরিতায় ভরপুর। প্রশ্ন উঠে Übermensch কি কেবল ক্ষমতার প্রতীক নাকি নৈতিক জবাবদিহিতার প্রতিফলন?

Shinigami Ryuk, যিনি শুধুমাত্র ‘বোরিং’ জীবন থেকে মুক্তি পেতে মানুষের জগতে নোটবুক ফেলেন, নিজে কোনও পক্ষ নেন না। এই অবস্থান Albert Camus-এর অস্তিত্ববাদী দর্শনের সাথে তুলনাযোগ্য। Camus বলেছিলেন, “জীবন অর্থহীন; মানুষই অর্থ নির্মাণ করে।” Ryuk যেন ঈশ্বরের এক নির্লিপ্ত প্রতিরূপ, যিনি মানুষের নৈতিক লড়াইয়ে অবলোকনকারী মাত্র। এটি এমন প্রশ্ন তোলে, মানুষ যদি নিজেই ন্যায়ের সংজ্ঞা নির্মাণ করে, তাহলে ঈশ্বর কি শুধুই নীরব দর্শক?

একপর্যায়ে সমাজের অনেক অংশ Light-কেই ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে মেনে নেয়। জনমত তাকে ‘Kira-sama’ নামে পূজা করতে শুরু করে। এটি একটি গুরুতর সমাজতাত্ত্বিক ইঙ্গিত বহন করে—মানুষ মাঝে মাঝে ন্যায়বিচারের নামে সন্ত্রাসকে বৈধতা দেয়। এটিকে তুলনা করা যায় রাজনৈতিক ইতিহাসে একনায়কতন্ত্রের উত্থানের সাথে—যেখানে গণমানস প্রথমে সমর্থন দেয়, পরে ভয় পায়।

Light-এর চরিত্র বিকাশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক উপাদান রয়েছে—Megalomania (অতিস্বকেন্দ্রিক ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা), Cognitive Dissonance (মনের দ্বন্দ্ব থেকে নৈতিকতা মোচন), Moral Disengagement (আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে খারাপ কাজকেও ভালো বলে মানা), এগুলো Bandura-এর “Moral Disengagement Theory”-এর সাথে মিলে যায়। Light নিজের কর্মকাণ্ডকে ন্যায় বলে মনে করতে থাকে কারণ সমাজ তা সমর্থন করছে।

যখন L পরাজিত হয়ে মারা যায়, তখন Death Note একটি সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ায়—“ন্যায়বিচার কি চিরকালীন, না কি সে-ও হারিয়ে যেতে পারে?” L-এর মৃত্যু কাহিনিতে একটি নৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে, যা পরে আবার নতুন চরিত্র Near-এর আবির্ভাবে কিছুটা পূরণ হয়। তবে L-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দর্শক বুঝতে পারে বুদ্ধি, সততা ও প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার কখনও কখনও ‘ঈশ্বর-সুলভ’ ক্ষমতার কাছে হেরে যায়।

Death Note কেবল একটি থ্রিলার নয়; এটি একটি নৈতিক পরীক্ষাগার। এখানে প্রতিটি চরিত্র একটি দার্শনিক অবস্থান বহন করে। পাঠক যখন শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে, তখন সে নিজের নৈতিক অবস্থান নিয়েই দ্বিধায় পড়ে।

“তুমি হলে কী করতে? Death Note পেলে কী তুমি Light-এর মতো বিচার করতে চাইতে, নাকি L-এর মতো প্রশ্ন করতে?” এই আত্মপ্রশ্নই Death Note-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি আমাদের অন্ধকার ও আলোর মধ্যবর্তী ধূসর অঞ্চলগুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ , খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির যত কারণ –

চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম ও ব্রয়লার মুরগি — অত্যাবশ্যকীয় এই ৫টি কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের ১৪টি জেলায় এক জরিপ চালায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই জরিপে উঠে আসে — পণ্যের দাম বাড়ার প্রাথমিক কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফার কারণেও দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। কৃষকের মাঠ থেকে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্য ৪-৫ হাত ঘুরে ক্রেতার হাতে পৌঁছায়। যদিও পণ্যের দামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কৃষক বা উৎপাদকেরা। অর্থাৎ লাভ কিংবা লোকসান—দুটিরই বড় হিস্যা যায় কৃষকের ঘাড়ে।

জরিপে দেখা যায় — বছরের যে সময়ে ধান, আলু ও পেঁয়াজের মতো পণ্যের উৎপাদন মৌসুম থাকে না, ওই মাসগুলোতে এসব পণ্যের দাম বেশি বাড়ে। এ জন্য মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে এসব পণ্য আমদানি উৎসাহিত করা ও আমদানি শুল্ক কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন পর্যায় (কৃষক) থেকে অন্তত ৫-৬ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে চাল বিক্রি হয়। এ কারণে একজন ক্রেতাকে উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিগুণ বা তার বেশি দামে চাল কিনতে হয়। জরিপে বলা হয়েছে, ১ কেজি মোটা চালের (ধান) উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩৪ টাকা; সেই চাল খুচরায় ক্রেতারা কেনেন ৬২-৬৩ টাকায়। এ ছাড়া ধান চাষের কৃষিজমি কমে যাওয়া; বিদ্যুৎ, সার, ডিজেল, শ্রমিকের মজুরি ও সুদহার বৃদ্ধি—প্রভৃতি কারণও চালের মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

গত বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয় ১৭ টাকা। সেই আলু বাজার থেকে খুচরায় ক্রেতারা কিনেছেন ৪০ থেকে ৯০ টাকা দরে। চালের মতো আলুও ৪-৫ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে পৌঁছায়। এর মধ্যে হিমাগার থেকে আলু ছাড়ের সময় দামে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দাম স্থিতিশীল রাখতে আলুর সঠিক চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্য জানা জরুরি। সে আলোকে হিমাগার থেকে ধাপে ধাপে আলু ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।

জরিপে উঠে আসে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পেঁয়াজের দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। গত বছর কয়েক দফা অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে বহু পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এসব কারণে মূলত সরবরাহ সংকট থেকে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মজুতের কারণেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। কৃষকের মাঠে উৎপাদনের পরে অন্তত ৫ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে পৌঁছায় পেঁয়াজ।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, চলতি বছর প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৫৪ টাকা। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সেই পেঁয়াজ কৃষক বিক্রি করেছেন ৩৫–৪৮ টাকায়। লোকসানের কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর অতিরিক্ত মুনাফা করায় এ বছর বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ বীজ, জমি ইজারা, শ্রমের মজুরিও বেড়েছে।

ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে — পোলট্রি খাদ্য ও মুরগির বাচ্চার দাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিম উৎপাদনের ৭৪% ও ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনের ৬৫% অর্থ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। আর বাচ্চা কিনতে ১৪–২০% অর্থ ব্যয় হয়। পোলট্রি খাদ্যের প্রায় ৭০%-ই আমদানিনির্ভর। গত ৩-৪ বছরে বৈশ্বিক বাজারে খাদ্যের কাঁচামালের দাম বেশি থাকায় দেশেও পোলট্রি খাদ্যের দাম বেশি ছিল। এদিকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক ছোট খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পোলট্রি খাদ্য ও বাচ্চার দাম কমানো এবং ছোট ও মাঝারি আকারের খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

মায়ান ক্যালেন্ডার ও টাইমকিপারদের শেষ সংকেত !

মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়ান সভ্যতা তাদের জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও স্থাপত্যশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তাদের দিনপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার নিয়ে। বিশেষ করে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বরের তারিখটি অনেকের কাছে ছিল পৃথিবীর শেষের দিন। কিন্তু এই দিনটি আসলে কী বোঝাত? মায়ান ক্যালেন্ডারের পেছনের গূঢ় রহস্য কী?

মায়ানরা সময়কে গণনা করতেন একটি অত্যন্ত জটিল পদ্ধতিতে, যা ছিল ‘দীর্ঘ গণনা চক্র’ বা Long Count Calendar। তাদের ক্যালেন্ডার ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হয়ে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি পূর্ণচক্র সম্পন্ন করে। এই দিনটিকে তারা চিহ্নিত করেছিল ১৩.০.০.০.০ (১৩ ব্যাক্টুন), যা ছিল একটি মহাচক্রের সমাপ্তি।

মায়ান ক্যালেন্ডারে একটি বছর ছিল ৩৬৫ দিন, যা ১৮ মাসে বিভক্ত ছিল, প্রতিমাসে ২০ দিন করে। এছাড়া ছিল ৫ অতিরিক্ত দিন, যাদেরকে তারা ‘ভায়েব’ নামে ডাকে। এই সূক্ষ্ম গণনার মাধ্যমে তারা সূর্যের অয়ন, নক্ষত্রের অবস্থান এবং মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করত। বিশেষ করে ২১ ডিসেম্বরের দিনটি ছিল সূর্যের দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবেশের দিন, অর্থাৎ ‘সাউদার্ন সলস্টিস’।

২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর মায়ান ক্যালেন্ডারের মহাচক্র শেষ হওয়ার কারণে অনেকেই ভেবেছিলেন, সেটি পৃথিবীর শেষের দিন। এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায় এবং বিভিন্ন কনস্পিরেসি থিওরি জন্ম নেয়। তবে মায়ান পণ্ডিতদের মতে, এটি কোনো প্রলয় বা ধ্বংসের দিন নয়, বরং একটি সময়চক্রের পুনঃসূচনা বা রিসেটের সূচনা।

মায়ানরা সময়কে একটি চক্র হিসেবে দেখত, যেখানে এক চক্র শেষ হলে নতুন চক্র শুরু হয়। তাই ২০১২ সালের শেষ দিনটি ছিল এক যুগের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনা। মায়ানদের কাছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছিল পবিত্র বৃক্ষ, আর সূর্যের গ্রহণরেখা অতিক্রম করা ছিল মহাজাগতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই এই দিনটি ছিল সময়ের পুনর্গঠনের প্রতীক।

২০১২ সালের পর যখন পৃথিবী ধ্বংস হয়নি, তখন অনেকেই এই ধারণাকে গুজব মনে করেন। কিন্তু পরবর্তীতে গবেষকরা বুঝতে পারেন, মায়ান ক্যালেন্ডারের হিসাবের সঙ্গে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের মিলিয়ে একটি ৮ বছরের পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, মায়ান ক্যালেন্ডারের আসল শেষ দিনটি ২০২০ সালে এসেছে।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন সংকট দেখা দেয়, যা অনেককে আবারও মায়ান ক্যালেন্ডারের প্রলয়দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও বিজ্ঞানীরা এটিকে সময়ের পুনঃচক্রের একটি ভুল ব্যাখ্যা বলেই দেখেন।

মায়ানরা তাদের সময় গণনায় অত্যন্ত নিখুঁত ছিলেন। তাদের ‘ত্জোল্ক’ইন’ নামে একটি ২৬০ দিনের ধর্মীয় ক্যালেন্ডার ছিল, যা সৌরচক্রের সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করা হতো। এই ক্যালেন্ডারে দিনগুলোকে বিভিন্ন দেবতা ও শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

গুয়াতেমালার একটি প্রাচীন পিরামিডের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া মায়ান ক্যালেন্ডারের প্রাচীনতম নিদর্শন প্রমাণ করে, তারা হাজার বছরেরও বেশি আগে থেকে সময়ের জটিল হিসাব করত। তাদের এই জ্ঞান আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জন্যও চমকপ্রদ।

মায়ান ক্যালেন্ডারের শেষ দিনকে কেন্দ্র করে বহু ভুল ব্যাখ্যা ও গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই এটিকে পৃথিবীর ধ্বংসের দিন হিসেবে দেখেছেন, যা ভিত্তিহীন। আসলে এটি ছিল একটি মহাচক্রের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনা। মায়ানদের সময়চক্র ছিল চলমান, যেখানে শেষ কোনো নির্দিষ্ট বিন্দু নেই। তাই ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর ছিল একটি সময়ের রূপান্তর, ধ্বংস নয়।

মায়ান ক্যালেন্ডারের ২০১২ সালের শেষ দিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্ক ও গুজব ছড়িয়েছিল, তা ছিল মূলত ভুল ব্যাখ্যা ও আধুনিক কনস্পিরেসি থিওরির ফল। ২০১২ সালের দিনটি ছিল সেই মহাচক্রের শেষ এবং নতুন যুগের সূচনা। এটি ছিল এক ধরনের ‘টাইমকিপারদের’ সংকেত, যা সময়ের পুনঃসেট বা রিসেটের প্রতীক। তাই এটি ধ্বংসের নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা। মায়ান সভ্যতার এই জটিল ক্যালেন্ডার ও সময়ের ধারণা আজও আমাদেরকে সময়ের গভীর রহস্য ও মহাজাগতিক চক্র সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে – আশাভঙ্গ ভারতের

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা ভারতের বহুল প্রতীক্ষিত ‘বিশ্বের কারখানা’ হওয়ার আশায় জল ঢেলে দিতে পারে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে এক সমঝোতায় ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ১৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনে। সেই তুলনায় ভারতের পণ্যে শুল্ক রয়েছে ২৭ শতাংশ। ভারতের গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (জিটিআরআই) অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এই পরিস্থিতিতে চীন থেকে ভারতে যে উৎপাদন বিনিয়োগ আসছিল, তা হয়তো থেমে যেতে পারে, কিংবা আবার চীনের দিকেই ফিরে যেতে পারে।

গত মাসে অ্যাপল জানিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠানোর বেশিরভাগ আইফোন এখন চীনের বদলে ভারতে তৈরি করবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, কেবল শুল্ক সুবিধায় কিছু হবে না। ভারতকে উৎপাদন খরচ কমানো, অবকাঠামো উন্নত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে হবে।

ভারতের উৎপাদন খাতের অংশ এখনো জিডিপির মাত্র ১৫ শতাংশ এবং দুই দশক ধরে এটি অপরিবর্তিত। নীতি আয়োগ স্বীকার করেছে, চীনের বিকল্প হিসেবে বিনিয়োগ টানায় ভারত পিছিয়ে পড়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ—ভারত এখনো আইফোন তৈরিতে চীননির্ভর। আইফোনের যন্ত্রাংশ ও উপাদান প্রধানত চীন থেকে আসে। ফলে ভারতে তৈরি আইফোন যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার ডলারে বিক্রি হলেও এর মধ্যে মাত্র ২৫ ডলারের মূল্য ভারতীয় শ্রমে সংযুক্ত হয়।

জিটিআরআই জানায়, এ ধরনের অ্যাসেম্বলি লাইন কাজ বেশি চাকরি সৃষ্টি করে না এবং এর গুণগত মানও ভালো নয়। যেমন- ২০০৭ সালে চেন্নাইয়ে নোকিয়ার কারখানা চালু হলে সেখানে তাদের জোগানদাতারাও একসঙ্গে ঘাঁটি গেড়েছিল। কিন্তু এখনকার স্মার্টফোন নির্মাতারা কেবল যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংযোজন করছে এবং কম শুল্ক দাবি করছে, অথচ স্থানীয় সরবরাহ চেইন তৈরি করছে না।

ভারতের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, চীনা রপ্তানিকারকদের ভারতে আমন্ত্রণ জানানো উচিত যাতে তারা এখান থেকেই রপ্তানিমুখী উৎপাদনে যুক্ত হয়। তবে এতে ভারতের নিজস্ব শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে, ভারতের ‘বিশ্ব কারখানা’ হওয়ার স্বপ্ন এখনো বহু দূরের পথ।

ট্রাম্পের গোল্ডেন ডোম , যা জানা যাচ্ছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যুহের নকশা নির্বাচন করেছেন। জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পরপরই এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যুহ বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট, যার লক্ষ্য হচ্ছে শত শত উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে এক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা বানানো যা ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত, অনুসরণ এবং সম্ভব হলে প্রতিরোধ করতে পারবে।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, “গোল্ডেন ডোম আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে। কানাডাও এর অংশ হতে চায়।” ট্রাম্প এই ‘গোল্ডেন ডোমের’ ধারণা নিয়েছেন ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট প্রতিরোধে বেশ কার্যকর ইসরায়েলের ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যুহ ‘আয়রন ডোম’ থেকে।

তবে তার কর্মসূচি আরও বিস্তৃত। এতে থাকবে বিপুল সংখ্যক নজরদারি উপগ্রহ, পাশপাশি থাকবে আক্রমণকারী উপগ্রহের আলাদা বহর, শত্রুপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গেই ওই বহর সেটিকে গুলি করে ভূপাতিত করবে।

ট্রাম্প বলছেন, ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে তার মেয়াদপূর্তির আগেই এই ‘গোল্ডেন ডোমের’ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা উচিত। যদিও বিশেষজ্ঞরা নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যুহের সম্ভাব্য খরচ এবং ট্রাম্প যে সময় বেধে দিয়েছেন তার মধ্যে মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে বেশ সন্দিহান।

“বলা হচ্ছে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের কথা, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কত বছর ধরে এটা খরচ হবে। সম্ভবত ১০ বছর লাগবে,” বলেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের টম কারাকো।

বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সিলিকন ভ্যালি এবং সফটওয়ারে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষতা সময় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, বলেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতরা বিপুল ব্যয়ের এই ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্পের সম্ভাব্য ঠিকাদার হিসেবে এলথ্রিহ্যারিস টেকনোলজিস, লকহিড মার্টিন ও আরটিএক্সের নাম বলেছেন।

এলথ্রি এরই মধ্যে ইন্ডিয়ানার ফোর্ট ওয়েইনেতে নতুন স্থাপনা নির্মাণে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগও করেছে। সেখানে তারা হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী স্যাটেলাইট বানাচ্ছে, যা মহাকাশভিত্তিক সেন্সরের সাহায্যে আরও ভালোভাবে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও অনুসরণে পেন্টাগনের উদ্যোগের অংশ। এই স্যাটেলাইট বা উপগ্রহগুলো গোল্ডেন ডোমেও সংযুক্ত করা হতে পারে।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অবশ্য এই ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্পের সরঞ্জামাদি ক্রয়ের প্রক্রিয়া এবং ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

পিথাগোরাস থেকে মোলমার – কোয়ান্টাম মিউজিক

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার তুলনায় এতটাই অদ্ভুত ও প্রতিসংগতিপূর্ণ যে, ‘কোয়ান্টাম’ শব্দটি আজকাল প্রায়শই শক্তিশালী বা রহস্যময় কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যদিও তার প্রকৃত পদার্থবিজ্ঞানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। হোমিওপ্যাথি থেকে শুরু করে ডিটারজেন্ট ও ডিওডোরেন্ট সব জায়গায় এই শব্দের অপব্যবহার দেখে পদার্থবিজ্ঞানীদের চোখ রোল করা স্বাভাবিক। কিন্তু ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী ক্লাউস মোলমার যখন ‘কোয়ান্টাম মিউজিক’ প্রকল্পের কথা বলেন, তখন বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।

কোয়ান্টাম মিউজিক প্রকল্পে পদার্থবিজ্ঞানী ও সঙ্গীতজ্ঞরা একত্রিত হয়ে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান ও সঙ্গীতের রহস্যময় জগৎকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন। একটি বিশেষ যন্ত্র পিয়ানোর প্রতিটি চাবিতে সংযুক্ত করা হয়, যা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে তথ্য কম্পিউটার ও সিন্থেসাইজারে পাঠায় এবং সেখানে ‘কোয়ান্টাম’ সুর তৈরি হয়। এই সুরের মধ্যে অন্যতম হলো বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট (BEC) এর কম্পন। BEC হলো এমন একটি পারমাণবিক মেঘ, যা প্রায় শূন্য কেলভিন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়, ফলে পারমাণবিক কণাগুলোর কোয়ান্টাম ধর্ম একত্রিত হয়ে একটি বৃহৎ কোয়ান্টাম সত্তায় রূপ নেয়।

BEC-তে অণু-পরমাণুর কম্পন ও দোলন নিয়ে গবেষণাকে বলা হয় কোয়ান্টাম অ্যাকোস্টিক্স। আমাদের কানে শোনা শব্দের মতোই, BEC-র অভ্যন্তরেও এই কম্পনগুলো নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে ছড়ায়, যা নির্ভর করে কণাগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার উপর। কোয়ান্টাম মিউজিক প্রকল্পে এই কম্পনগুলোকে সঙ্গীতের সাথে মিশিয়ে এক অদ্ভুত, কিন্তু মনোমুগ্ধকর সুর সৃষ্টি করা হয়।

সঙ্গীত ও পদার্থবিজ্ঞানের এই সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে পিথাগোরাস সঙ্গীতের সুর ও কম্পাঙ্কের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, কিছু সুরের অনুপাত (যেমন ৪:৩, ৩:২) শ্রুতিমধুর (consonant), আবার কিছু অনুপাত কটু (dissonant)। পিথাগোরাস এই অনুপাতগুলোকে মহাবিশ্বের গূঢ় সৌন্দর্যের প্রতীক মনে করতেন—এমনকি গ্রহ-নক্ষত্রের গতিকেও তিনি ‘Harmony of the Spheres’ নামে এক মহাজাগতিক সঙ্গীতের সাথে তুলনা করেন।

পিথাগোরাসের সিস্টেম ছিল নিখুঁত অনুপাতের উপর ভিত্তি করে, কিন্তু সব সুরকে একসাথে নিখুঁতভাবে মানানসই করা সম্ভব নয়। এই সমস্যা সমাধানে ভিনচেঞ্জো গ্যালিলেই ‘ইকুয়াল টেম্পারামেন্ট’ পদ্ধতি প্রস্তাব করেন, যেখানে অনুপাতের অমিল সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়—ফলে কিছুটা অসামঞ্জস্য থাকলেও সব সুর বাজানো যায়। এই ‘দ্বন্দ্ব’ই সঙ্গীতকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর করেছে।

জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী সাবিন হোসেনফেল্ডার তাঁর বই ‘Lost in Math’-এ দেখিয়েছেন, পদার্থবিজ্ঞানে ‘সৌন্দর্য’ ও ‘সরলতা’র প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক অনেক সময় সত্যকে আড়াল করে। অনেক তত্ত্ব (যেমন স্ট্রিং থিয়োরি) শুধুমাত্র সৌন্দর্যের জন্য টিকে আছে, যদিও তাদের কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই।

আলবার্ট আইনস্টাইন নিজেও ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী। তিনি বলতেন, তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা অনেকটাই সঙ্গীত থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁর স্ত্রী বলতেন, আইনস্টাইন যখন কোনো তত্ত্ব নিয়ে আটকে যেতেন, তখন পিয়ানো বাজাতে বসতেন এবং সেখানেই অনেক সময় নতুন ধারণা পেতেন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টেফন আলেকজান্ডারও জ্যাজ সঙ্গীত থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে নতুন তত্ত্ব তৈরি করেছেন।

পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষায় ‘intuition’ বা অন্তর্দৃষ্টি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা যখন ল্যাব, কম্পিউটার সিমুলেশন বা সঙ্গীতের মাধ্যমে কোনো বিষয় নিয়ে নিজের মতো ‘messing about’ করে তখন তাদের ধারণা আরও গভীর হয়। সঙ্গীত, বিশেষত তরঙ্গ ও কম্পাঙ্কের ধারণা, পদার্থবিজ্ঞানের অনেক বিষয় বুঝতে সাহায্য করে।

BEC-র কোয়ান্টাম অ্যাকোস্টিক্স নিয়ে তৈরি ‘Quantum Oscillator’ সফটওয়্যারে কাজ করার সময় লেখক বুঝতে পারেন, সঙ্গীতের মাধ্যমে কোয়ান্টাম তরঙ্গের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুভব করা যায়। যদিও একে একমাত্র পথ বলা যায় না, তবে অন্তর্দৃষ্টি গড়ে তুলতে সঙ্গীত একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

সঙ্গীত ও পদার্থবিজ্ঞান দুই ক্ষেত্রেই সৌন্দর্য ও সত্যের সন্ধান চলে। কখনো সৌন্দর্যকে অগ্রাধিকার দিলে সত্য চাপা পড়ে যায়, আবার কখনো সত্যের জটিলতা সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেয়। কোয়ান্টাম মিউজিক প্রকল্প দেখিয়েছে, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে নতুন অন্তর্দৃষ্টি ও সৃজনশীলতা জন্ম নিতে পারে। সঙ্গীতের সৌন্দর্য ও পদার্থবিজ্ঞানের সত্য—দুটিই আমাদের মহাবিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ ও রহস্যময় করে তোলে।