গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের নির্ধারিত বৈঠক শেষে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন — যদি ঠিকভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার পদে থেকে কী লাভ।
বিকেল থেকে এই আলোচনা ‘প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জন’ হিসেবে ডালপালা মেলে। বিকেল ৪টায় বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনের পথনকশার দাবি জানায়, অন্যথায় সরকারকে সহযোগিতা করা কঠিন হবে বলে মত দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের অব্যাহতি দাবি করেছে দলটি।
বিএনপি’র সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয় — মাথাভারী উপদেষ্টা পরিষদ না রেখে শুধু রুটিন ওয়ার্ক (দৈনন্দিন কার্যক্রম) পরিচালনার জন্য একটি ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাখাই বাঞ্ছনীয়।
বিকেল ৫টার দিকে জামায়াতে ইসলামী দলের নির্বাহী কমিটির সভা করে এবং সর্বদলীয় সভা ডাকার জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানায়।
সন্ধ্যায় এনসিপি নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেন। গণমাধ্যমকে তারা জানান, প্রধান উপদেষ্টাকে তারা পদত্যাগ না করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খবর আসতে থাকে–প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ইশরাক ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলনের ইতি টানেন। এর কিছু পর শাহবাগ মোড় অবরোধের কর্মসূচি শেষ করে ছাত্রদল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য সমকালকে বলেছেন, নির্বাচনের রোডম্যাপের দাবিতে বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করেনি। আদালতের রায়ের পরও অবরোধ চালিয়ে যাওয়া ইশরাকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল। দল থেকে পরে নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি সরে যান।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুকে লেখেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীজনদের নিয়ে অতীতে বিভাজনমূলক কথার জন্য দুঃখিত। সরকারের পদত্যাগ গুঞ্জনের মধ্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল পক্ষকে মান, অভিমান ও ক্ষোভ একদিকে রেখে, জাতীয় স্বার্থে দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানাই।’ বিকেলে দলের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকের পর সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত।
এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর চলমান আন্দোলন থেকে দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
বিএনপির এই দাবির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টাকে ‘বিএনপির মুখপাত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা। তবে তা ‘সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে’। এই তিনজন হলেন– আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
সেই সঙ্গে তাঁরা বিচার বিভাগে বিএনপির হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে কর্মসূচিও পালন করেছেন। এদিকে, গত বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। তিনি জানান, কী সংস্কার হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে–এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা আলোচনাও করা হয়নি।
সেনাপ্রধান আরো বলেন–মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে মানবিক করিডোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে। করিডোর দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দিতে স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রয়োজন হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেছেন, ‘বিএনপি বলি কিংবা এনসিপিকে বলি, তাদের অধৈর্যের ফল হচ্ছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি। গত কয়েক দিনে যেটা হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়েছে। এখন সমাধানে আসতে হবে।’


