চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম ও ব্রয়লার মুরগি — অত্যাবশ্যকীয় এই ৫টি কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের ১৪টি জেলায় এক জরিপ চালায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই জরিপে উঠে আসে — পণ্যের দাম বাড়ার প্রাথমিক কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফার কারণেও দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। কৃষকের মাঠ থেকে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্য ৪-৫ হাত ঘুরে ক্রেতার হাতে পৌঁছায়। যদিও পণ্যের দামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কৃষক বা উৎপাদকেরা। অর্থাৎ লাভ কিংবা লোকসান—দুটিরই বড় হিস্যা যায় কৃষকের ঘাড়ে।
জরিপে দেখা যায় — বছরের যে সময়ে ধান, আলু ও পেঁয়াজের মতো পণ্যের উৎপাদন মৌসুম থাকে না, ওই মাসগুলোতে এসব পণ্যের দাম বেশি বাড়ে। এ জন্য মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে এসব পণ্য আমদানি উৎসাহিত করা ও আমদানি শুল্ক কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন পর্যায় (কৃষক) থেকে অন্তত ৫-৬ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে চাল বিক্রি হয়। এ কারণে একজন ক্রেতাকে উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিগুণ বা তার বেশি দামে চাল কিনতে হয়। জরিপে বলা হয়েছে, ১ কেজি মোটা চালের (ধান) উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩৪ টাকা; সেই চাল খুচরায় ক্রেতারা কেনেন ৬২-৬৩ টাকায়। এ ছাড়া ধান চাষের কৃষিজমি কমে যাওয়া; বিদ্যুৎ, সার, ডিজেল, শ্রমিকের মজুরি ও সুদহার বৃদ্ধি—প্রভৃতি কারণও চালের মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
গত বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয় ১৭ টাকা। সেই আলু বাজার থেকে খুচরায় ক্রেতারা কিনেছেন ৪০ থেকে ৯০ টাকা দরে। চালের মতো আলুও ৪-৫ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে পৌঁছায়। এর মধ্যে হিমাগার থেকে আলু ছাড়ের সময় দামে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দাম স্থিতিশীল রাখতে আলুর সঠিক চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্য জানা জরুরি। সে আলোকে হিমাগার থেকে ধাপে ধাপে আলু ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
জরিপে উঠে আসে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পেঁয়াজের দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। গত বছর কয়েক দফা অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে বহু পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এসব কারণে মূলত সরবরাহ সংকট থেকে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মজুতের কারণেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। কৃষকের মাঠে উৎপাদনের পরে অন্তত ৫ হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে পৌঁছায় পেঁয়াজ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, চলতি বছর প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৫৪ টাকা। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সেই পেঁয়াজ কৃষক বিক্রি করেছেন ৩৫–৪৮ টাকায়। লোকসানের কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর অতিরিক্ত মুনাফা করায় এ বছর বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ বীজ, জমি ইজারা, শ্রমের মজুরিও বেড়েছে।
ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে — পোলট্রি খাদ্য ও মুরগির বাচ্চার দাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিম উৎপাদনের ৭৪% ও ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনের ৬৫% অর্থ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। আর বাচ্চা কিনতে ১৪–২০% অর্থ ব্যয় হয়। পোলট্রি খাদ্যের প্রায় ৭০%-ই আমদানিনির্ভর। গত ৩-৪ বছরে বৈশ্বিক বাজারে খাদ্যের কাঁচামালের দাম বেশি থাকায় দেশেও পোলট্রি খাদ্যের দাম বেশি ছিল। এদিকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক ছোট খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পোলট্রি খাদ্য ও বাচ্চার দাম কমানো এবং ছোট ও মাঝারি আকারের খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।


