Home Blog

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওমেন) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বছরজুড়ে অন্তত ৮৩ হাজার নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ হাজার নারীকে হত্যা করেছে তাদেরই ঘনিষ্ঠজন—স্বামী, প্রেমিক, প্রাক্তন সঙ্গী, বা পরিবারের সদস্য যেমন ভাই, চাচা বা মামা। আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতা নির্মূল দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদন বলছে, প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী এবং প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী বা কন্যাশিশু পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকা কারও হাতে খুন হচ্ছেন।

জাতিসংঘের মতে, বহু বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সচেতনতা কার্যক্রম ও নীতি সংস্কার সত্ত্বেও নারীহত্যা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং ঘর—যে স্থানকে সাধারণভাবে নিরাপত্তার আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা আজও নারীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ইউএনওডিসির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যান্ডোলিনো মন্তব্য করেন, “ঘর এখনো বহু নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। নারীহত্যা রোধে প্রতিরোধ কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া জরুরি।”

বিশ্বের ১১৭টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আফ্রিকায় নারীহত্যার হার সবচেয়ে বেশি, প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু ওই অঞ্চলেই বছরজুড়ে প্রায় ২২ হাজার নারী খুন হয়েছেন। এশিয়ায় খুন হয়েছেন ১৭ হাজার ৪০০ নারী, আমেরিকায় ৭ হাজার ৭০০, ইউরোপে ২ হাজার ১০০ এবং ওশেনিয়ায় ৩০০ নারী।

প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ হত্যাকাণ্ড ঘটে তার মাত্র ২০ শতাংশ নারী হলেও পরিবারের ভেতরে সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ঘনিষ্ঠজনের হাতে ২০২৪ সালে নিহত নারীদের হার ৬০ শতাংশ, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উদ্বেগজনকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রযুক্তিগত সহিংসতার বিষয়টি। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করার কথা, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তা নতুন ধরনের সহিংসতার দরজা খুলে দিয়েছে। অনিচ্ছাকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, ডিপফেক তৈরি, সাইবার স্টকিং ও অনলাইন হুমকি এসব ডিজিটাল সহিংসতা বাস্তব জীবনে শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার দিকে ধাবিত হতে পারে। জাতিসংঘের নারী নীতি বিভাগের পরিচালক সারাহ হেন্ড্রিক্স বলেন, “নারীহত্যা কখনোই একদিনে ঘটে না। এটি সাধারণত অনলাইন–অফলাইনে ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি ও হয়রানির ফল।”

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ছয় দফা উদ্যোগের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে রয়েছে—শক্তিশালী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য কার্যকর সহায়ক সেবা নিশ্চিত করা, অপরাধ তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মানোন্নয়ন এবং সর্বস্তরের সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

জাতিসংঘ বলছে, ফেমিসাইড কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকট। তাই রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবার সম্মিলিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ ছাড়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। প্রথম আঠারো মাসে এক কোটি চাকরি, সাতখাতে বড় সংস্কার।

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে তারা। ক্ষমতায় এলে প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে যাবে দলটি। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তার জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ সামলাতে স্বাস্থ্য কার্ড চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হবে।

সোমবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব সম্ভাব্য প্রচারণা কৌশল পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে শীর্ষ নেতারা স্পষ্টভাবে জানান, কোন বার্তা তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের বেশি আকৃষ্ট করতে পারে—তা নির্ধারণে ভোটার আচরণ বিশ্লেষণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য স্লোগান হতে পারে: “তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষে পক্ষে হোক।”

বিএনপি সাতটি প্রধান খাতকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে গিয়ে সরাসরি প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খাতগুলো হলো—জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারী ক্ষমতায়ন, ক্রীড়া ও ধর্মীয় বিষয়। দলের ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনার ভিত্তিতেই এসব প্রতিশ্রুতি তৈরির কাজ চলছে। দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকটি ইউনিটও শিগগির মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হতে যাচ্ছে। প্রচারণার লিফলেটে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড, পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি গাছ রোপণ, চাঁদাবাজি–দুর্নীতি দমনে বিশেষ উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হবে।

স্বাস্থ্যখাতে যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেল অনুসরণে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনাও প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পাবে। জলবায়ু ও পানি নিরাপত্তায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী–খাল পুনরুদ্ধার, কমিউনিটি-ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা পুনরায় চালু এবং আধুনিক তিস্তা ও গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের অঙ্গীকারও ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আর্থিক সংকটে থাকা ইমাম–মুয়াজ্জিনদের মাসিক ভাতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগও প্রতিশ্রুতির অংশ থাকবে।

শিক্ষাখাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে বিএনপি। স্কুল পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া, শিল্প–সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে শিক্ষার্থীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও থাকবে প্রচারণায়।

এদিকে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে দলীয় মনোনয়ন–সংশ্লিষ্ট ক্ষোভ প্রশমনে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। টিকিট না পাওয়া নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। রুহুল কবির রিজভীর তত্ত্বাবধানে মূলধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তৃণমূলে প্রচারণায় সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সাত সদস্যবিশিষ্ট সাতটি দল গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের প্রচারণা আরও গতিশীল করা হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় দুর্বলতা চিহ্নিত করছেন এবং ভোটের আগে সেগুলো সমাধানে কাজ করছেন। যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্ব কম, সেখানে পোলিং এজেন্ট প্রশিক্ষণ, ব্যাকআপ এজেন্ট প্রস্তুত এবং ৩১ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে ব্যানার–ফেস্টুন–বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনায় স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অঙ্গীকারও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন করে ভাবতে হবে।

রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫-এর প্রথম দিনের বিকেলের “স্পিড টক” সেশনে তিনি পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

“রাইভ্যালস, রাপচারস অ্যান্ড রিয়্যালাইনমেন্টস” থিমের তিনদিনের এই সম্মেলন ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। এতে ৮৫টি দেশের ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নিচ্ছেন।

অধ্যাপক সোবহান স্মরণ করেন, ১৯৭০-এর দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলো উত্তর আটলান্টিক শক্তির আধিপত্য মোকাবেলায় ন্যায়সঙ্গত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার দাবি তুলেছিল। লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মূলধনে ন্যায্য প্রবেশাধিকার-কিন্তু বাস্তবে খুব কমই বদলেছে।

তিনি বলেন, “আজ আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য গ্লোবাল সাউথের দিকে, বিশেষ করে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও নামমাত্র জিডিপিতে প্রথম হলেও চীন দ্বিতীয় এবং ভারত দ্রুত এগোচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে চীন ইতোমধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ভারত তৃতীয়।

তার মতে, ২০৫০ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী নামমাত্র জিডিপিতেও চীন হবে প্রথম, ভারত তৃতীয় এবং আশ্চর্যজনকভাবে ইন্দোনেশিয়া হবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি।

এই পরিবর্তনের পেছনে বাণিজ্য, মূলধন প্রবাহ ও প্রযুক্তিগত শক্তি পুনর্বিন্যাসের ভূমিকা রয়েছে। এখন চীন বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ, এবং পূর্ব এশিয়ার ভেতরকার বাণিজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। সোবহান বলেন, চীন এখন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। “এগুলো বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন করছে।”

কিন্তু বাংলাদেশের কৌশল এখনও অতীতে আটকে-মার্কিন পোশাকবাজারে নির্ভরতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধার প্রতি অতিরিক্ত জোর। তিনি বলেন, ভারত ও চীনের বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থাকলেও দেশটি এসব সরবরাহ চেইনে ঢোকার মতো কোন কার্যকর কৌশল তৈরি করেনি।

তিনি নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতকে “এলডিসি কোকুন” থেকে বের হয়ে আরও চৌকস, গতিশীল ও সৃজনশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাসের এই সময়ে বাংলাদেশ চায় “দায়িত্বশীল, সক্রিয় ও সার্বভৌম ভূমিকা” পালন করতে। তিনি ক্ষমতার স্থানান্তর, স্থিতিশীলতার ভঙ্গুরতা, জ্ঞানের অস্ত্রায়ন, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং জলবায়ু-সীমান্ত-নিরাপত্তা বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

– মাইকেল কুগেলম্যান
দৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নে তাঁর ভূমিকার জন্য এ সাজা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের মুখে দেশ থেকে পালিয়ে যান হাসিনা, যে আন্দোলনে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৪০০ জনের মতো মানুষকে হত্যা করেছে হাসিনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিছু ভুক্তভোগীর পরিবার এ রায়কে ন্যায়বিচারের একটি রূপ হিসেবে দেখতে পারে। আর এ রায় হাসিনার দল আওয়ামী লীগের বাইরের ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের একটি রাজনৈতিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাদের এই ঐক্য সাবেক এই নেত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার দেখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে।

যা-ই হোক, বাংলাদেশ যখন আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই রায় দেশটির রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

​​এটি অবাক করার মতো বিষয় নয় যে নির্বাসিত হাসিনা এ রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনা এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন এবং পুরোনো হিসাব মেটাতে এটাকে ব্যবহার করেছিলেন। (হাসিনার সরকারও আইসিটিকে রাজনীতিকীকরণের জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছিল)

এ রায় এমন সময়ে এসেছে, যখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ চাপের মধ্যে রয়েছে। দলটির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা দেশের বাইরে পালিয়েছেন, অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, সাবেক ক্ষমতাসীন দলটির সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা-মোকাদ্দমার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একসময় বাংলাদেশের সর্বত্র ব্যাপকহারে হাসিনার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি দেখা গেলেও এখন তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে দেওয়া রায় ক্ষুব্ধ দলটিকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসছে, তখন এটি একটি অশুভ ঘটনা। রায় ঘোষণার কয়েক দিন আগে ঢাকায় কয়েক ডজন অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রায় ঘোষণার পর এমন ঘটনা আরও ঘটেছে।
এ রায় সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদের হুঁশিয়ারির পর। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া না হলে তাঁরা নির্বাচন আটকে দেবেন। সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘আমাদের প্রতিবাদ ক্রমেই আরও শক্তিশালী হচ্ছে। আর এর জন্য যা দরকার হবে, আমরা তা করব।’

অবশ্য হাসিনার বিরুদ্ধে রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ঢাকাকে শুধুই দলটির কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করবে। এই রাজনৈতিক ক্ষোভ একটি টালমাটাল পরিবেশের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকা সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ ক্রমশ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অধৈর্য হয়ে উঠছে।
এসব দিক দিয়ে আগামী নির্বাচন নিয়ে বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের জন্য জনগণের বিপুল প্রত্যাশা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ২০০৮ সাল থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি। দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী রাজনীতিতে সহিংসতা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তাই নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত সহিংসতার ঝুঁকি সামলানো সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। যদিও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারেন। তবে অন্যরাও সহিংসতায় জড়াতে পারে।

ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলেছে দেশটির পুলিশ বাহিনী। গত বছর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের কারণে তীব্র সমালোচনার পর কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তারা। বাহিনীটির মনোবলের ঘাটতি ও দুর্বল তৎপরতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্ষমতা কতটা।

নির্বাচনী সময়ে অপেক্ষাকৃত শান্তি নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়ার সুযোগ আসবে। সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়া খুব কম ব্যক্তিরই এ নিয়ে জোরালো তাড়না রয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস ব্যক্তিগত জীবনে ফেরার প্রস্তুতির সময় নিজের কৃতিত্বের কথা মনে রাখবেন।

[মাইকেল কুগেলম্যান প্রায় দুই দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে কাজ করছেন। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির সাউথ এশিয়া ব্রিফে এই লেখা লিখেছেন। বুধবার লেখাটি প্রকাশিত হয়।]

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

0

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত জাপানের আগ্রাসী নীতি কেবল এশিয়ার মানচিত্রকেই পাল্টে দেয়নি, বরং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।

জাপান একটি দ্রুত শিল্পায়নকারী দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে তার সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য ‘জীবনধারণের স্থান’ খুঁজছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও, জাপানের অভ্যন্তরে সামরিকতন্ত্রের উত্থান এবং অর্থনৈতিক মন্দা সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে মূল স্রোতে নিয়ে আসে।

১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে জাপানের রাজনীতিতে বেসামরিক নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। সামরিক নেতারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো (বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন) এশিয়াতে জাপানের ন্যায্য স্বার্থকে অস্বীকার করছে। এই বিশ্বাস থেকেই তারা সাম্রাজ্যবাদী প্রসারের পক্ষে মত দেন।

কয়লা, লোহা এবং বিশেষত পেট্রোলিয়ামের মতো কাঁচামালের অভাব জাপানকে বহিরাগত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। মাঞ্চুরিয়া (চীন) ছিল এই সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। ‘এশিয়ার এশীয়দের জন্য’ (Asia for Asiatics) এই স্লোগানটি জাপানের আগ্রাসনের একটি প্রধান প্রচারমূলক হাতিয়ার ছিল। আপাতদৃষ্টিতে এটি ছিল পশ্চিমা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে মুক্তির বার্তা, কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল জাপান-কেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

১৯৩১ সালের মানচুরিয়া সংকট ছিল এই সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বড় পদক্ষেপ। জাপান দ্রুত মাঞ্চুরিয়া দখল করে এবং সেখানে পুতুল রাষ্ট্র ‘মাঞ্চুকুও’ প্রতিষ্ঠা করে। আন্তর্জাতিকভাবে এর তীব্র নিন্দা হলেও, লিগ অফ নেশন্সের দুর্বলতা জাপানকে থামাতে পারেনি।

এরপরের ধাপ ছিল চীনের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ। এই যুদ্ধ জাপানের সামরিক শক্তিকে এক ভয়াবহ দ্বন্দ্বে টেনে আনে এবং তাদের সম্পদকে দ্রুত ক্ষয় করতে শুরু করে। একই সময়ে ইউরোপে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল, জাপান তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে নজর দেয়, বিশেষ করে ফরাসি ইন্দোচীন (ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া) এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (ইন্দোনেশিয়া)।

জাপানের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার কেবল সামরিক দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর পিছনে ছিল একটি সুচিন্তিত রাষ্ট্রীয় কূটনীতি এবং মতাদর্শগত কাঠামো, যা ‘বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সহ-সমৃদ্ধি ক্ষেত্র’ (Greater East Asia Co-Prosperity Sphere) নামে পরিচিত ছিল।

এই ‘সহ-সমৃদ্ধি ক্ষেত্র’ ধারণাটি উপনিবেশিক শাসন থেকে এশীয় জাতিদের মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু বাস্তবে জাপান নিজেকে এই অঞ্চলের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যেখানে অন্যান্য দেশগুলো জাপানের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের অধীনস্থ থাকবে।

জাপান যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেল ও রাবারের সন্ধানে ফরাসি ও ডাচ উপনিবেশগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাপানের কাছে সামরিক আগ্রাসন ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না, কারণ তাদের হাতে মজুদ তেল দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিতে অতর্কিত আক্রমণ জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল। এটি ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্পদ দ্রুত দখল করার এক মরিয়া কৌশল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার কবর রচনা করে। প্রাথমিক সামরিক সাফল্য সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের চাপ এবং মিত্রশক্তির সম্মিলিত প্রতিরোধ জাপানকে কোণঠাসা করে ফেলে।

যুদ্ধের প্রথম বছরগুলোতে জাপান ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং বার্মা দ্রুত দখল করে নেয়, যা তাদের ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু এই বিজয় ছিল ক্ষণস্থায়ী।

প্রশান্ত মহাসাগরের যুদ্ধক্ষেত্র মিডওয়ের যুদ্ধ (Battle of Midway, ১৯৪২) ছিল যুদ্ধের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। আমেরিকান নৌ ও বিমানবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব জাপানের নৌ-প্রভুত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জাপানের শিল্প কারখানা মিত্রশক্তির বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁচামাল সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এবং বিপুল সংখ্যক সামরিক সদস্যের মৃত্যু হওয়ায় জাপানের যুদ্ধ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

যুদ্ধের শেষ দিকে জাপানের কোনো আন্তর্জাতিক মিত্র ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রশক্তি তাদের উপর একের পর এক মারাত্মক আঘাত হানতে থাকে।

১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা জাপানি নেতৃত্বের উপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করে। এটি কেবল সামরিক ধ্বংসলীলা ছিল না, এটি ছিল একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।

১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে সম্রাট হিরোহিতোর ঘোষণার মাধ্যমে জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদের যুগের অবসান ঘটায়।

জাপানের সাম্রাজ্যবাদী দুঃস্বপ্ন শেষ হলেও, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই যুদ্ধের ফলে এশিয়ার অনেক উপনিবেশিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কোরিয়ার মতো দেশগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে।

জাপানের এই সময়কার রাষ্ট্রীয় কূটনীতি ছিল মূলত সামরিক শক্তির সমর্থনে আগ্রাসী প্রজেকশন। তারা আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করেছিল। ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের শিক্ষা দেয় প্রাকৃতিক সম্পদের লোভ এবং সামরিকতন্ত্রের হাতে রাষ্ট্রের লাগাম তুলে দেওয়ার পরিণতি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে। আজকের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা চলছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই। জাপানের সাম্রাজ্যবাদ ছিল এক ব্যর্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু একই সাথে এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রের জন্মও দিয়েছিল।

২০২৪ সালে বিশ্বে কয়লার ব্যবহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিপদে ফেলছে। বিশ্ব রিসোর্স ইনস্টিটিউটের (WRI) বার্ষিক “স্টেট অব ক্লাইমেট অ্যাকশন” প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদার বৃদ্ধির কারণে কয়লার ব্যবহার কমেনি। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ তাদের নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে পড়েছে, যদিও নির্গমন বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমেছে।

বিশ্ব রিসোর্স ইনস্টিটিউটের গবেষণা সহকারী ক্লিয়া শুমার বলেছেন, “আমরা সঠিক পথে আছি, তবে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি না।” তিনি আরও বলেন, “কয়লা ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা গত পাঁচটি প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।”

প্যারিস চুক্তির আওতায় ২০৫০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নির্গমন অর্জনের লক্ষ্যে, তেল, গ্যাস ও কয়লা ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বৈদ্যুতিকীকরণ বাড়াতে হবে। কিন্তু এটি সম্ভব হবে যদি বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহ কম কার্বন নির্গমনযুক্ত হয়। শুমার সতর্ক করে বলেন, “যদি কয়লার ব্যবহার রেকর্ড ভাঙতে থাকে, তবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমিত করা সম্ভব হবে না।”

কিছু দেশ এখনও কয়লা ব্যবহার বাড়ানোর দিকে মনোযোগী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১ বিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদন উদযাপন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন “বিস্ফোরকভাবে” বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরশক্তি “ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতবর্ধমান শক্তির উৎস” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে, সৌর ও বায়ু শক্তির বার্ষিক বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ করতে হবে, যাতে এই দশকের শেষে নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়।

বিশ্ব রিসোর্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু সংকটের প্রভাব থেকে বাঁচতে দ্রুত গতিতে কয়লা ব্যবহার কমানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

ইসির জনবল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিএনপি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সীমিত জনবল ও অতীতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইসির দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কমিশনের নিজস্ব জনবল অত্যন্ত সীমিত। একদিনে ১০ লাখের বেশি কর্মকর্তা প্রয়োজন হয়, যাদের সরকার থেকে ধার নিতে হয়, ফলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে ইসি ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. মঈন খান এ উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা সিইসির কাছে জানতে চেয়েছি, নির্বাচনের দিন মাঠে যারা কাজ করবেন তারা কারা, তাদের নির্বাচনের জন্য কতটা প্রস্তুত করা হয়েছে। কমিশনের নিজস্ব জনবল না থাকায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কীভাবে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।”

গত তিনটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মঈন খান বলেন, “আমরা দেখেছি অতীতে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে। যেসব কর্মকর্তা বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন, তারা ১৫ মাসে বদলে যাবেন—এটা বাস্তবসম্মত নয়।” তিনি কমিশনকে অনুরোধ করেন যেন বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে না রাখা হয়।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, “আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষ নির্ভয়ে বাস করুক, ১২ কোটি ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিক, সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে লিখতে ও বলতে পারুক।” পাশাপাশি নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে শঙ্কা রয়েছে, তা দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

জোট রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে প্রাক-নির্বাচনী জোট হয়েছিল, এবারও বিএনপি ‘ওপেন’ আছে এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেবে।

এছাড়া সাধারণ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আচরণবিধি ও জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনীর বিষয়ে বিএনপি আগেই প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানান মঈন খান। বৈঠকে বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

দীনবন্ধু মিত্র কীভাবে বাংলা নাটককে জনমুখী করলেন?

দীনবন্ধু মিত্র রচিত ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি, যা ঔপনিবেশিক ভারতের এক নির্মম বাস্তবতাকে প্রথম সার্থকভাবে নাট্যরূপে উপস্থাপন করেছিল। এই নাটক কেবল নীলকর সাহেবদের অত্যাচারকে ফুটিয়ে তোলেনি, তা উনিশ শতকের বাংলার সমাজে এক জোরালো রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ‘নীলদর্পণ’ ও তার রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্রের নাট্যদৃষ্টি এবং বাংলা নাটকের আধুনিকতায় তাঁর অবদান নিয়ে এই গবেষণামূলক বিশ্লেষণ।

দীনবন্ধু মিত্রের নাট্যদৃষ্টির মূল ভিত্তি হলো তীব্র বাস্তবচেতনা। ‘নীলদর্পণ’-এ তিনি নীল চাষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক শোষণের বীভৎস চেহারাটা তুলে ধরেছেন। নাটকটি তৎকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেছিল। দীনবন্ধু এই নাটকে দেখিয়েছেন কীভাবে নীলকরদের লোভ, অত্যাচার ও আইনি জটিলতা নিরীহ কৃষক পরিবারগুলির জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তাঁর নাট্যদৃষ্টি ছিল সংস্কারমুখী ও প্রতিবাদী। তিনি সমাজের গভীর ক্ষতগুলিকে সরাসরি দেখাতে ভয় পাননি। নাটকের চরিত্র, ঘটনা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শিল্প কেবল মনোরঞ্জনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে। এই বাস্তবতার সাহসী উপস্থাপনই ‘নীলদর্পণ’-কে সাধারণ বিনোদনমূলক নাটক থেকে “জাতীয় নাটকে” পরিণত করেছিল।

উনবিংশ শতকে বাংলা নাটক তখনো পুরাণ ও ইতিহাসভিত্তিক কাহিনি নির্ভরতার বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে দীনবন্ধু মিত্রের আগমন বাংলা নাটকের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।

আধুনিক বাংলা নাটকের প্রথম সার্থক রূপকারদের মধ্যে দীনবন্ধু অন্যতম। তিনি নাটককে সাধারণ মানুষের জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর নাটকে স্থান পেল সমকালীন সমস্যা, পরিচিত চরিত্র এবং দৈনন্দিন ভাষারীতি। এই যে ‘বাস্তবতার মুখাপেক্ষী হওয়া’, এটিই ছিল আধুনিকতার প্রথম পদক্ষেপ। ‘নীলদর্পণ’-এর আগে সমাজের এমন জ্বলন্ত ইস্যু নিয়ে নাটক রচনার সাহস খুব কমই দেখানো হয়েছে। তাঁর সমাজ-সচেতনতা, বলিষ্ঠ সংলাপ ও চরিত্র-চিত্রণ বাংলা নাটকের আধুনিকতার সূচনা করেছিল। তাঁর হাতেই নাটক ‘দেখার ও শোনার’ মাধ্যম থেকে ‘ভাবার ও প্রতিবাদ করার’ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

উনবিংশ শতকের বাংলা নাটকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং দীনবন্ধু মিত্র—এই দুই দিকপাল সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারার জন্ম দেন। দীনবন্ধু ছিলেন বাস্তববাদী ধারার প্রবর্তক, অন্যদিকে মধুসূদন ছিলেন রোমান্টিক ও ক্লাসিক্যাল ধারার পথিকৃৎ। মধুসূদন যখন অমিত্রাক্ষর ছন্দে বাংলা নাটকে নতুন রূপ ও আঙ্গিক আনছিলেন, তখন দীনবন্ধু বিষয়বস্তুর বাস্তবতায় জোর দিচ্ছিলেন। এই দুই ধারাই বাংলা নাটকের ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু ‘নীলদর্পণ’-এর সামাজিক প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী, যা মধুসূদনের কোনো নাটকের ক্ষেত্রে সেভাবে দেখা যায়নি।

দীনবন্ধু মিত্রের নাটকের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তাঁর ভাষারীতি, সংলাপ ও চরিত্র নির্মাণের অনন্য কৌশল।

দীনবন্ধু নাটকের প্রয়োজনে চলিত ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘নীলদর্পণ’-এর কৃষকদের সংলাপে গ্রাম্য ভাষার সরলতা ও নিজস্বতা দেখতে পাওয়া যায়। আবার নীলকর সাহেবদের মুখে তিনি বিকৃত ইংরেজি বাংলা বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা তাদের মানসিকতা ও ঔদ্ধত্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষারীতি তাঁর নাটককে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। তাঁর সংলাপগুলি ছিল শক্তিশালী, আবেগপূর্ণ ও সরাসরি, যা দর্শকদের সঙ্গে সহজে সংযোগ স্থাপন করত। তাঁর চরিত্রগুলি ছিল বহুমাত্রিক এবং বাস্তবসম্মত।

গোলোক বসু, সাধুচরণ, রেবতীরা হলেন নির্যাতিত কৃষক সমাজের প্রতিনিধি, যাদের মধ্যে রয়েছে সহনশীলতা ও প্রতিরোধে ব্যর্থতার করুণ চিত্র।
নীলকর রগ ও উডরা ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী মুখ। তাদের অহংকার, কামুকতা ও আইনের প্রতি তাচ্ছিল্য নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। নবীন মাধব প্রতিবাদী যুবক, যার মধ্যে লেখক আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। দীনবন্ধু দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অসহায়তা এবং ক্রোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাঁর নাট্য-কৌশলের গভীরতা প্রমাণ করে।

‘নীলদর্পণ’-এর মূল সুর নিঃসন্দেহে রিয়ালিজম (বাস্তববাদ)। নাটকটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে তৎকালীন নীলচাষের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। কৃষকদের উপর দৈহিক অত্যাচার, নারীদের প্রতি লোলুপতা, সম্পত্তি দখল—এগুলি রিয়ালিজমের কঠোর চিত্র।

কিন্তু এই রিয়ালিজমের কঠিন ভূমিতেই জন্ম নিয়েছে একধরনের প্রতিরোধের কাব্যিকতা। এই কাব্যিকতা সরাসরি কোনো কবিতা বা গানের আকারে নয়, বরং চরিত্রের হতাশা, বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষা ও করুণ পরিণতিতে প্রকাশিত।

প্রতিরোধের কাব্যিকতা: যখন গোলোক বসুর স্ত্রী ক্ষেত্রমণি অত্যাচারী সাহেবকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে, অথবা যখন নবীন মাধব তার শেষ শক্তিতেও প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নেয়, তখন তা কেবল বাস্তব ঘটনা থাকে না, তা শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের মনের গভীরে জমা হওয়া ক্ষোভের এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়। ক্ষেত্রমণির আত্মহত্যা এবং গোলোক বসুর দেশান্তরিত হওয়া—এই করুণ সমাপ্তিগুলি শোষণের বিরুদ্ধে এক নীরব, গভীর ও মর্মান্তিক প্রতিবাদের কাব্য রচনা করে। এই কাব্যিকতা নাটকটিকে নিছক তথ্যচিত্রের স্তর থেকে চিরকালীন মানবতার সংকটের দলিলে পরিণত করেছে।

দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, শিল্প ও সাহিত্য কীভাবে সমাজের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলিতে মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বাস্তববাদী নাট্যদৃষ্টি বাংলা নাটকের আধুনিকতার পথ প্রশস্ত করে এবং আজও সামাজিক ন্যায়ের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান।

ঔপনিবেশিক বাংলার কৃষক কীভাবে জমিদার-কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল?

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলা প্রদেশটি ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ ও প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক লীলাভূমি। অর্থনৈতিক শোষণ যখন চরম আকার ধারণ করল, তখন তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা দিল কৃষক বিদ্রোহের ঢেউ। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সংঘটিত কৃষক আন্দোলনগুলি কেবল খাদ্যের অভাব বা খাজনা দিতে না পারার ফল ছিল না, এগুলি ছিল ঔপনিবেশিক ভূমি-ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থার পতন এবং স্থানীয় জমিদার-মহাজন শ্রেণির সঙ্গে সৃষ্ট এক জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক অসহযোগিতার ফসল। এই বিদ্রোহগুলি ছিল বাংলার ইতিহাসে ক্ষমতার বিন্যাস ও সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত প্রতিবাদ।

কৃষক বিদ্রোহের পটভূমি রচনা করেছিল ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’। এই ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির জন্য একটি স্থিতিশীল রাজস্বের উৎস তৈরি করা এবং একটি অনুগত জমিদার শ্রেণি গড়ে তোলা। কিন্তু এর ফলস্বরূপ যা ঘটল, তা ছিল বাংলার কৃষিজীবী সমাজের জন্য এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

জমিদাররা জমির মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হলেও, তারা প্রায়শই উৎপাদনকারী ছিলেন না। তারা কোম্পানির ধার্য করা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব মেটাতে গিয়ে কৃষকদের ওপর অত্যাধিক খাজনা আরোপ করতে শুরু করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মহাজন শ্রেণি, যারা উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে কৃষকদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেলে। এই জমিদার-মহাজন অক্ষশক্তি কৃষকদের ওপর এক দ্বিমুখী শোষণ চালায়।

কৃষকরা জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়ে কেবল ‘প্রজা’ বা বর্গাদারে পরিণত হন, যাদের উচ্ছেদ করা সহজ ছিল। তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি-অধিকার ও গ্রাম্য বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা কৃষকদের মনে গভীর রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতিতে, কৃষক বিদ্রোহের প্রাথমিক কারণ ছিল অর্থনৈতিক, কিন্তু এর গভীর প্রোথিত ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে।

১৮শ ও ১৯শ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলিকে সরলভাবে দেখা ভুল হবে। এগুলির প্রকৃতি ছিল স্থান ও কালভেদে ভিন্ন, তবে মূল চালিকাশক্তি ছিল শোষণের বিরোধিতা।

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহটি ছিল প্রথম বৃহৎ আকারের প্রতিক্রিয়া, যা মূলত সন্ন্যাসী ও ফকিরদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। যদিও এদের মধ্যে অনেক ছিল প্রাক্তন সৈনিক বা ছিন্নমূল কৃষক, তাদের বিদ্রোহ ছিল মূলত ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং কোম্পানির নতুন কর আরোপের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় মোড়কে আবৃত প্রতিরোধ। তারা প্রচলিত পীড়নকারী ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছিল। এই বিদ্রোহের বিচ্ছিন্ন, যোদ্ধা চরিত্র প্রমাণ করে, প্রাথমিক প্রতিরোধ প্রায়শই সনাতন সামাজিক কাঠামোর সাহায্য নিয়েই গড়ে উঠত।

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুসংগঠিত রূপটি ছিল নীল বিদ্রোহ। এটি ছিল মূলত একটি অর্থনৈতিক বিদ্রোহ যা রাজনৈতিক রূপ নেয়। নীলকর সাহেবরা কৃষকদের জোর করে অপেক্ষাকৃত কম দামে নীল চাষে বাধ্য করত, যা ছিল বাংলার খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর।

নীল বিদ্রোহের বিশেষত্ব ছিল এর সংগঠিত প্রকৃতি। কৃষকরা প্রথমবার বুঝতে পারে যে, ব্যক্তিগতভাবে প্রতিরোধ করার চেয়ে সম্মিলিতভাবে যেমন, ফসল না বোনা বা নীলকুঠিতে কাজ বন্ধ করে বিদ্রোহ করলে সুবিধা হয়। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক এই বিদ্রোহের সামাজিক ও মানবিক ট্র্যাজেডিকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে, যা এটিকে কেবল কৃষক আন্দোলন না রেখে একটি জাতীয় প্রতিবাদে পরিণত করে। এই বিদ্রোহে কৃষকরা প্রমাণ করে তারা কেবল শোষিত নয়, শোষকের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতাও রাখে।

কৃষক বিদ্রোহগুলি কেবলমাত্র সাময়িক গোলযোগ ছিল না, এগুলি বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এই বিদ্রোহগুলি স্থানীয় জমিদার ও মহাজনদের মুখোশ খুলে দেয়, যারা কোম্পানির আশ্রয়ে থেকে কৃষকদের ওপর অত্যাচার করত। বিদ্রোহের ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে তাদের প্রকৃত শত্রু কেবল বিদেশি শাসক নয়, তাদের নিকটবর্তী শোষক শ্রেণিও। এটি পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ভূমি সংস্কারের দাবি উত্থাপনের ভিত্তি তৈরি করে।

নীল বিদ্রোহের ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার নীল কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। এটি প্রমাণ করে যে, ব্যাপক গণআন্দোলন ব্রিটিশ প্রশাসনের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নচিহ্নিত করতে সক্ষম ছিল। এই আন্দোলনগুলি প্রশাসনকে দেখায় তাদের প্রবর্তিত ভূমি-আইনগুলি সাধারণ মানুষের জন্য টেকসই নয়।
এই আন্দোলনগুলির মধ্য দিয়েই বাংলায় কৃষক শ্রেণি চেতনা দৃঢ় হতে শুরু করে। যদিও এই বিদ্রোহগুলির নেতৃত্ব প্রায়শই জমিদার, তালুকদার বা প্রাক্তন সৈনিকদের হাতে থাকত, তবুও এর মূল ভিত্তি ছিল প্রান্তিক কৃষকের দুঃখ-কষ্ট। এই প্রাথমিক প্রতিরোধগুলিই পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে মিশে গিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের বৃহত্তর দাবিতে পরিণত হয়।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের কৃষক বিদ্রোহগুলি ছিল ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। এই আন্দোলনগুলি প্রমাণ করে বাংলা কেবল ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষেত্র ছিল না, এটি ছিল প্রতিবাদের কেন্দ্রও। জমিদার-মহাজন শোষণের দ্বৈত আঘাত এবং ঔপনিবেশিক আইনের কঠোরতা কৃষকদের বাধ্য করেছিল প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে। নীল বিদ্রোহের মতো ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দেয় কৃষকরা কেবল অতীত দিনের সরল প্রজাই ছিল না; তারা ছিল সুসংগঠিত শক্তি, যারা তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিল। এই বিদ্রোহের উত্তরাধিকার পরবর্তীকালের জমিদার বিরোধী আন্দোলন এবং এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামের সামাজিক ভিত্তি প্রস্তুত করে গিয়েছিল।

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়নি নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছে : ড. আসিফ নজরুল, আইন উপদেষ্টা

বিএনপি কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়নি বরং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, “বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় যা বোঝা গেছে, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইনি। বরং বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকার যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। তারা আমাদের কাছ থেকে শুধুমাত্র নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছে। আমরা তাদের জানিয়েছি আমরা সেই নিরপেক্ষ ভূমিকাই পালন করছি।”

তিনি আরও জানান, “জনপ্রশাসন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় ধরনের বদল বা পরিবর্তন প্রধান উপদেষ্টা নিজে দেখবেন। বিএনপি স্পষ্ট করেছে, তারা চাইছে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষভাবে কাজ করুক, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে নয়।”

নির্বাচনের সময় উপদেষ্টা পরিষদ ছোট হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল বলেন, “এ ধরনের কোনো আলোচনা এখনো হয়নি। নির্বাচনকালীন সরকার ছোট হবে কিনা তা উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার বিষয়। কোনো পক্ষ থেকে এ ধরনের দাবি আসেনি।”

উপদেষ্টা আরও বলেন, “বিএনপি চাইছে, কোনো দলের সদস্য অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে না থাকুক। প্রধান উপদেষ্টা নিশ্চিত করেছেন যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাজ আরও নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে।”

একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার অবস্থায় নেই। আমি জনপ্রশাসনের দায়িত্বে নেই।”

ড. আসিফ নজরুল শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করেন, “জনপ্রশাসনের নিয়োগ-বদলি দলীয়ভাবে হয় না। সব দলই অভিযোগ করে, যেটা প্রমাণ করে আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি।”