Home Blog Page 3

যুক্তরাষ্ট্র–চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বিরল খনিজ ধাতু

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে, এবার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিরল খনিজ ধাতু। মোট ১৭টি উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে চীন সম্প্রতি বিরল ধাতুর রপ্তানিতে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং এমনকি এশিয়া সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-এর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করার কথা বলেছেন।

বিরল ধাতু বলতে বোঝানো হয় পর্যায় সারণির ১৭টি ধাতব উপাদান, যেমন স্ক্যান্ডিয়াম, ইট্রিয়াম এবং ল্যানথানাইড সিরিজ। ভূগর্ভে এ ধাতুর উপস্থিতি কম নয়, কিন্তু আহরণ ও পরিশোধন ব্যয়সাপেক্ষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই ধাতুগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কল্পনাই করা যায় না। স্মার্টফোন, এলইডি বাতি, উইন্ড টারবাইন, টেলিভিশনের পর্দা, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, এমআরআই মেশিন ও ক্যানসার চিকিৎসায় এগুলোর ব্যবহার অপরিহার্য।

বিশেষভাবে সামরিক শিল্পে বিরল ধাতুর গুরুত্ব অপরিসীম। সিএসআইএসের ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, লেজার ও স্যাটেলাইটে এ ধাতুর ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট উত্তোলিত বিরল ধাতুর ৬১ শতাংশ আসে চীন থেকে, আর পরিশোধন পর্যায়ে চীনের অংশ ৯২ শতাংশ।

চীনের এই নিয়ন্ত্রণকে মার্কিন বিশ্লেষকরা কৌশলগতভাবে ব্যবহৃত ‘অস্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। চীন তুলনামূলকভাবে দাম কম রাখে এবং নতুন প্রতিযোগীদের বাজারে আসা নিরুৎসাহিত করে। ১৯৯০-এর দশক থেকে দেশটি ধাতুর উৎপাদন বাড়িয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে শিল্পটি আনা হয়েছে এবং দুটি বৃহৎ কোম্পানি—চায়না নর্দার্ন রেয়ার আর্থ ও চায়না রেয়ার আর্থ গ্রুপ—সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা হুমকির পর চীনের নতুন তালিকায় আরও পাঁচটি উপাদান যোগ করা হয়েছে—হলমিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইউরোপিয়াম ও ইটারবিয়াম। এই ধাতু ও প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে এখন অনুমতিপত্র বাধ্যতামূলক। ট্রাম্প বলেন, “চীন প্রতিটি উপাদানে একচেটিয়া দখল নিতে চায়, অথচ আমাদের বিকল্প রয়েছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই লড়াই কেবল বাণিজ্য সীমিত নয়, এটি প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং শিল্প স্বনির্ভরতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিরল ধাতু এখন কেবল প্রযুক্তি উপাদান নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের নতুন কেন্দ্রবিন্দু। চীনের নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করছে, এ বিষয় ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পালন করবে।

বিবর্তিত হচ্ছে ডার্ক ম্যাটার, ‘হাবল টেনশন’ সমস্যা কি সমাধানের পথে?

মহাবিশ্বের বিস্তৃতি এবং এর রহস্যময় উপাদান ডার্ক ম্যাটার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে ধাঁধা সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাধানে নতুন এক সাহসী তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞান। প্রথাগত মহাজাগতিক মডেলে একটি জটিল অসঙ্গতি রয়েছে: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নিয়ে নিকটবর্তী ও আদিম মহাজাগতিক পরিমাপগুলির মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই অসঙ্গতি হাবল টেনশন (Hubble Tension) নামে পরিচিত ও অমীমাংসিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন যে এই সমস্যার সমাধান হয়তো লুকিয়ে আছে এক পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারে।

স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিক্যাল মডেলে হাবল টেনশন একটি জেদি সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণগুলি স্পষ্ট করে যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু আদিম মহাবিশ্ব থেকে প্রাপ্ত পরিমাপ অনুযায়ী সম্প্রসারণের হার এবং নিকটবর্তী পরিমাপ অনুযায়ী বর্তমানের সম্প্রসারণের হার এক নয়। অর্থাৎ বর্তমান মহাবিশ্ব যেন অতীত অনুমানের চেয়ে দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে।

এই সমস্যা সমাধানে অনেক ধারণার জন্ম হয়েছে—যেমন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অসম্পূর্ণ হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার হয়তো আদৌ নেই, কিংবা সময়ের প্রবাহ হয়তো অভিন্ন নয়। কিন্তু ক্সিংগাং চেন এবং আব্রাহাম লোয়েবের সাম্প্রতিক কাজ একটি নতুন পথের সন্ধান দেয়, ডার্ক ম্যাটার সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে!

ডার্ক এনার্জির বিবর্তন নিয়ে মডেল তৈরি হলেও, ডার্ক ম্যাটার নিজে যে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে—এই ধারণাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর প্রধান কারণ দুটি:
* ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ খুবই জোরালো। এটি এমন একটি পদার্থ যা আলোর সাথে খুব কম মিথস্ক্রিয়া করে। এর দুর্বলতা শুধু একটাই—এখনও পর্যন্ত ডার্ক ম্যাটারের কোনো কণার প্রত্যক্ষ শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি।

* ডার্ক ম্যাটারের সমালোচকরা প্রায়শই একে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে চান এবং সংশোধিত মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের (Modified Gravity) মাধ্যমে এর প্রভাব ব্যাখ্যা করতে চান। তাদের কাছে ডার্ক ম্যাটার একটি সংশোধনযোগ্য ধারণা নয়, বরং বর্জনীয় একটি ভিত্তি।

ঠিক এই কারণেই পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের প্রস্তাবনাটি কৌতূহলোদ্দীপক। চেন এবং লোয়েব দেখেন যে, ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটারের বিবর্তন নিয়ে তৈরি মডেল দুটি কিছুটা সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু মহাবিশ্বের বিবর্তন আংশিকভাবে শক্তি ঘনত্ব এবং পদার্থ ঘনত্বের অনুপাতের উপর নির্ভর করে, তাই স্থির ডার্ক ম্যাটার ও পরিবর্তনশীল ডার্ক এনার্জির মডেলটি স্থির ডার্ক এনার্জি ও পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের মডেলের মতোই প্রতীয়মান হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের মডেলটি পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে আরও ভালোভাবে খাপ খায়।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক ধরনের Exotic Dark Matter-এর ধারণা অন্বেষণ করেন, যার অবস্থার সমীকরণ পরিবর্তনশীল। পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে মেলে এমন একটি মডেল পেতে হলে, ডার্ক ম্যাটারের EOS-কে সময়ের সাথে সাথে দোলিত হতে হবে।

এই ধারণাটি কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্ভট নয়। যেমন নিউট্রিনো (Neutrinos) কণার ভর আছে এবং তারা আলোর সাথে দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। যদিও তারা মহাবিশ্বের সমস্ত ডার্ক ম্যাটারের জন্য দায়ী নয়, তারা হলো উষ্ণ ডার্ক ম্যাটারের একটি রূপ এবং তারা ভর দোলনের মধ্য দিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, শীতল ডার্ক ম্যাটার কণাগুলির ক্ষেত্রেও হয়তো একই ধরনের দোলন প্রভাব দেখা যায়।

গবেষকদের মতে, পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে সবচেয়ে ভালোভাবে মিলে যায় এমন মডেলটি হলো এমন একটি মহাবিশ্ব, যেখানে প্রায় ১৫% শীতল ডার্ক ম্যাটার হলো দোলক প্রকৃতির এবং বাকি ৮৫% হলো স্ট্যান্ডার্ড ডার্ক ম্যাটার। এই মিশ্র মডেলটি একইসাথে আমাদের কাছে থাকা ডার্ক ম্যাটার পর্যবেক্ষণগুলির সাথেও সামঞ্জস্য বজায় রাখবে এবং হাবল টেনশনকেও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবে।

গবেষকরা তাদের কাজটিকে একটি ‘টয় মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, এটি একটি বিস্তৃত ধারণা, যা ডার্ক ম্যাটার কণাগুলির জন্য নির্দিষ্ট কোনো কঠোর সীমাবদ্ধতা বা প্যারামিটার নির্ধারণ করে না। তবুও এই কাজ ডার্ক ম্যাটার মডেলগুলির বিস্তৃত পরিসরের দিকে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মহাজাগতিক রহস্য সমাধানে চিরায়ত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনাগুলি অন্বেষণ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সিইসির প্রত্যাশা – গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে বাধা সৃষ্টি করবে না এনসিপি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, শাপলা প্রতীক বরাদ্দ সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি (এনসিপি) গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। রোববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম বিভাগের সব জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এই মন্তব্য করেন।

এ সময় সিইসি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ফ্যাক্টচেক না করে কোনো সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য গণমাধ্যমকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নির্বাচনকালীন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি নিশ্চিত করেছেন, এবার কোনো ভোট লুকিয়ে বা রাতের আঁধারে হবে না।

শাপলা প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি নাসির উদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এনসিপির ধারণা আছে। তাই গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে তারা বাধা সৃষ্টি করবে না বলেই প্রত্যাশা করছি। যারা এনসিপির নেতৃত্বে আছেন, তারা ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান চলাকালে সম্মুখ সারিতে থেকে আন্দোলন করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, তারা গণতন্ত্রায়ণের পথে বাধা সৃষ্টি করবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন কোনো দল নিবন্ধন পায়, তাদের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রতীকের তালিকা থেকে প্রতীক নির্বাচন করতে হয়। যেহেতু শাপলা প্রতীক তালিকায় নেই, তাই তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত তালিকার বাইরে কাউকে প্রতীক দেওয়া হয়নি।’ নতুন করে প্রতীক যোগ করতে কোনো অসুবিধা নেই বলেও সাংবাদিকদের জানান সিইসি।

সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনর এই মন্তব্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি কমিশনের প্রতিশ্রুতি আরও জোরদার করছে। ভোটারদের স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কমিশন সর্বদা তৎপর থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই আলোচনায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতীকের সঠিক বরাদ্দ এবং গণমাধ্যমের দায়িত্ব নিয়ে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

হোর্হে লুইস বোর্হেস – কিভাবে সময়ের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিলেন?

হোর্হে লুইস বোর্হেস বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক, যিনি গল্পের মাধ্যমে দর্শন, গণিত, সময় ও বাস্তবতার সীমা ভেঙে ফেলেছিলেন। তাঁর গল্প পড়লে মনে হয়, তিনি গল্প লিখছেন না— মহাবিশ্বের গঠন ব্যাখ্যা করছেন প্রতীকের ভাষায়। সময় তাঁর কাছে সরলরেখা নয়, এটি অসীম সম্ভাবনার গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি মোড়েই এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়। তাঁর গল্পে সময়, বাস্তবতা এবং অনন্তের মতো মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নগুলিকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যা আধুনিক সাহিত্য এবং চিন্তাধারার গতিপথ বদলে দিয়েছে।

বোর্হেসের গল্পে সময় একটি গোলকধাঁধা বা জালিকা। ‘The Garden of Forking Paths’ গল্পে তিনি এই ধারণাকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেন। এখানে সময়কে একটি বিশাল, জটিল এবং ক্রমবর্ধমান জালের মতো দেখানো হয়েছে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ভবিষ্যতে একাধিক ভিন্ন পথে বিভক্ত হয়। এটি গতানুগতিক, একমুখী সময়ের ধারণাকে অস্বীকার করে এবং প্রতিটি বিকল্পের বাস্তবতাকে স্বীকার করে। এই অর্থে, প্রতিটি সিদ্ধান্তই একটি নতুন মহাবিশ্বের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে ‘The Aleph’-এ উপস্থাপিত হয়েছে অনন্তের ধারণা। আলেফ হলো এমন এক বিন্দু যেখানে মহাবিশ্বের সমস্ত স্থান এবং কাল একই সঙ্গে বিদ্যমান। এটি মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুকে এক লহমায় দেখার এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা। এই দুই গল্প একত্রিত হয়ে বোর্হেসের সময়ের দর্শনকে সংজ্ঞায়িত করে যেন সময় অসীমভাবে বিভাজ্য এবং প্রতিটি বিভাজনে অনন্তের বীজ নিহিত। এটি কেবল একটি সাহিত্যিক কৌশল নয়, একটি প্রশ্ন, যদি সব ঘটনাই ঘটে, তবে আমাদের অস্তিত্বের একক মুহূর্তের অর্থ কী?

বোর্হেসের দর্শনে ভাষা ও জ্ঞান একটি জটিল দ্বৈততার জন্ম দেয়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলির মধ্যে ‘The Library of Babel’, জ্ঞান এবং বিশৃঙ্খলার এই সম্পর্ককে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। এই গ্রন্থাগারটি মহাবিশ্বের মতোই অসীম, যেখানে সম্ভাব্য সমস্ত বই বিদ্যমান। এটি মানব জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা এবং জ্ঞানের চূড়ান্ত ব্যর্থতাকে প্রতিফলিত করে। গ্রন্থাগারে সমস্ত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও, এর বিপুলতা এতটাই overwhelming যে অর্থপূর্ণ জ্ঞান খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ভাষার এই গোলকধাঁধা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘Pierre Menard, Author of the Quixote’ গল্পে। মেনার্ড বিংশ শতাব্দীতে সতেরো শতকের সার্ভান্তেসের “ডন কুইক্সোট”–এর হুবহু কিছু অনুচ্ছেদ রচনা করেন। বোর্হেস দেখান, শব্দগুলি এক হলেও কিন্তু লেখকের প্রেক্ষাপট এবং সময় পরিবর্তনের কারণে সেই শব্দগুলির অর্থ আমূল পরিবর্তিত হয়। এটি প্রমাণ করে ভাষা স্থির নয়; শব্দ কীভাবে অর্থ হারায় বা সময়ের সাথে সাথে নতুন অর্থ অর্জন করে, তা সম্পূর্ণরূপে পাঠক এবং লেখকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে। এটি পাঠককে ঈশ্বরের ভূমিকায় উন্নীত করে, যেখানে পাঠক কেবল অর্থ গ্রহণকারী নন, অর্থের নতুন সৃষ্টিকর্তাও।

বোর্হেসের গল্পে বাস্তবতার দর্শন প্রায়শই স্বপ্ন এবং প্রতিফলনের প্রতীকী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। ‘The Circular Ruins’ গল্পে, এক জাদুকর স্বপ্নে একজন মানুষকে সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেন তিনিও হয়তো অন্য কারো স্বপ্নের ফসল বা প্রতিলিপি। এটি সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির অস্পষ্ট সীমারেখা এবং আমাদের বাস্তবতার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বাস্তব এবং কল্পনার সীমা মুছে ফেলার এই শিল্প বোর্হেসের লেখাকে পরাবাস্তবতার এক নতুন স্তরে নিয়ে যায়।

এই অস্পষ্টতা ব্যক্তির আত্মপরিচয় পর্যন্ত প্রসারিত। ‘Borges and I’ এর মতো ছোট রচনাগুলিতে লেখক তাঁর নিজের অস্তিত্বকে দুটি সত্তায় বিভক্ত করে দেখান: জনসমক্ষে পরিচিত “বোর্হেস” এবং একান্ত ব্যক্তিগত “আমি”। এই আত্ম-দ্বৈততা পরিচয়ের সঙ্কটকে তুলে ধরে — কোনটা আসল এবং কোনটা তার প্রতিলিপি? এই বিভ্রম আমাদেরকে তাঁর মেটাফিকশনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যায়, যেখানে সাহিত্যিক টেক্সট এবং জীবন একে অপরের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। সাহিত্যে লেখকের অনুপস্থিতি বা “অদৃশ্য লেখক” টেক্সটকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলে, যা পাঠককে তার নিজের বাস্তবতার দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করে।

বোর্হেসের চিন্তাধারা ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসন-এর সময়ের ধারণা এবং ফ্রিডরিখ নীৎসের “চিরন্তন প্রত্যাবর্তন” দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। বার্গসনের Durée (অবধি) বা subjective time-এর ধারণা বোর্হেসের গল্পে সরলরৈখিক সময়ের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহায্য করেছে। এই দার্শনিক ভিত্তিই তাঁকে পোস্টমডার্নিজমের অন্যতম স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। গল্পের ভিতরে গল্পের জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে, বোর্হেস আধুনিক সাহিত্যের গঠন বদলে দেন এবং মেটাফিকশনের কৌশলকে সাহিত্যের মূলধারায় নিয়ে আসেন।

তাঁর গল্পে ব্যবহৃত গোলকধাঁধা, আয়না এবং প্রতিফলন প্রতীকগুলি গভীর অর্থ বহন করে। গোলকধাঁধা হলো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা এবং মানব জীবনের জটিলতার প্রতীক, আয়না ও প্রতিফলন হলো বাস্তব এবং প্রতিলিপির মধ্যে বিভ্রমের প্রতীক।

বাংলা সাহিত্য ও বোর্হেসের ছায়া গভীরভাবে বিস্তৃত। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে বোর্হেসের মেটাফিকশনাল কৌশল, প্রতীক ব্যবহার, এবং দার্শনিক জিজ্ঞাসা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর উত্তরাধিকার কেবল সাহিত্যে নয়, বরং সিনেমা, ভিডিও গেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-র মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত আলোচনায় “সিমুলাক্রা” এবং “সুপার-রিয়েলিটি”র ধারণা পুনরুত্থিত করেছে।

বোর্হেসীয় বাস্তবতা এমন এক বাস্তবতা যেখানে গল্পই হয়ে ওঠে মহাবিশ্ব। তাঁর লেখা প্রমাণ করে মানুষের কল্পনাশক্তি এবং সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষমতা এতটাই প্রবল যে তা বাস্তবতার কাঠামোকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম। বোর্হেস পাঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সকলেই হয়তো সেই অসীম গ্রন্থাগারের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো পাঠক, যারা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের অর্থহীনতা এবং অনন্ত সম্ভাবনার মধ্যে একটি ক্ষণস্থায়ী অর্থ খুঁজে চলেছে।

অবিশ্বাস্য গতিতে শুকাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণনদী গঙ্গা

দক্ষিণ এশিয়ার শতকোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎস গঙ্গা এখন মৃত্যুর পথে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইতিহাসে কখনও গঙ্গার এমন দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বর্ষা, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও নদী বাঁধার ফলে এই মহার্ঘ নদী আজ ধ্বংসের মুখে।

হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা অববাহিকা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে বসবাস করে ৬৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। ভারতের এক-চতুর্থাংশ মিঠাপানির যোগান এবং কৃষি-অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—গত এক হাজার তিনশ বছরের ইতিহাসে গঙ্গা অববাহিকার সবচেয়ে ভয়াবহ খরার ঘটনাগুলো ঘটছে গত কয়েক দশকেই। এই পরিবর্তন প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

যে নদী একসময় সারা বছর নাব্য ছিল, এখন গ্রীষ্মে শুকিয়ে যায়। বাংলার নদীবন্দর থেকে বিহার, বারাণসি বা আলাহাবাদ পর্যন্ত যে নৌযান চলাচল ছিল একসময়, এখন সেই পথ নাব্যতার অভাবে অচল। সেচনালার পানিও এখন আগেভাগেই শুকিয়ে যায়, অনেক নলকূপ যা দশকের পর দশক পানি সরবরাহ করেছিল, এখন কেবল ঝরঝরে ধারা দেয়।

বিশ্বের বহু বড় নদীর পরিবর্তন বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, তবে গঙ্গার পরিবর্তনের গতি ও ব্যাপ্তি একেবারেই ব্যতিক্রম। জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলগুলোও এই শুষ্কতার মাত্রা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় পরিবেশগত পরিবর্তন এমনভাবে মিশে যাচ্ছে যা আমরা এখনো সম্পূর্ণভাবে বুঝে উঠতে পারিনি।

নদীর পানি বিপুল পরিমাণে সেচে ব্যবহৃত হচ্ছে, কৃষিকাজের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নদীর তীরে ক্রমে বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি বাঁধ ও ব্যারেজ গঙ্গার প্রাকৃতিক প্রবাহ পরিবর্তন করে দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্রমবিকৃত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন নদীটিকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

হিমালয়ের উঁচুতে গঙ্গার উৎস গঙ্গোত্রী হিমবাহ গত দুই দশকে প্রায় এক কিলোমিটার পেছনে সরে গেছে। এই গলন একদিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা বিশ্বের দ্রুততম হারে শূন্য হয়ে যাওয়া জলাধারগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর পানির স্তর ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার নেমে যাচ্ছে। তাছাড়া এই পানির বড় অংশই আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডে দূষিত, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মানব প্রকৌশলও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে ভূমি লবণাক্ত হচ্ছে এবং সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। উত্তর বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক ছোট নদী ইতিমধ্যেই গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে কয়েক দশকের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষ খাদ্য ও পানির ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পদক্ষেপ ভূগর্ভস্থ পানির অতি-ব্যবহার কমানো, নদীতে ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবীয় প্রভাব একসাথে বিবেচনায় নিয়ে নতুন জলনীতির রূপরেখা তৈরি করা।

গঙ্গা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার প্রাণরেখা, পবিত্রতার প্রতীক এবং কোটি মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু এই নদী দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন গঙ্গা আগামী প্রজন্মের জন্যও প্রবাহিত থাকে।

তালেবানকে ‘কড়া জবাবে’র হুঁশিয়ারি দিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সীমান্তে সংঘাতের জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী করেছেন। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশটির তালেবান সরকারের ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের’ কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে পাকিস্তানের সেনা এবং আফগান তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারিজমি শনিবার রাতে জানান, আফগান ভূখণ্ডে বারবার পাকিস্তানের সীমানা লঙ্ঘন এবং বিমান হামলার জবাবে তালেবান ‘সফল প্রতিশোধমূলক অভিযান’ চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, অভিযানটি মধ্যরাতে শেষ হয়েছে।

এ ঘটনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস হবে না। কড়া ও কার্যকরভাবে প্রতিটি উসকানির জবাব দেওয়া হবে।’ তিনি আফগান তালেবানকে সতর্ক করে বলেন, তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, যা পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

চলতি সপ্তাহে আফগান রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামাবাদ ওই হামলার দায় স্বীকার না করে অভিযোগ করেছে, আফগান তালেবান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। তারা পাকিস্তানে ভারত সহযোগিতায় হামলা চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এরপর আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারতের সফরের সময় সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান আফগান তালেবান যোদ্ধারা। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সীমান্তে এ সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বোভোয়ারের দর্শন – কেন মানব-অস্তিত্বের দ্বৈততা আমাদের স্বাধীন করে?

মানবিক অস্তিত্বের এক মৌলিক ও গভীর সত্য হলো এর দ্বৈততা বা অস্পষ্টতা। আমরা একইসাথে বিষয়ী ও বস্তু হিসেবে নিজেদের অনুভব করি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সত্তা রূপে। কিন্তু এই দুই অবস্থার কোনোটিকেই আমরা পুরোপুরিভাবে ধারণ করতে পারি না। এটিই সিমন দ্য বোভোয়ারের দর্শনের মূলে থাকা ট্র্যাজিক অস্পষ্টতা।

বোভোয়ারের মতে, আমরা যখন নিজেদের ‘বিষয়ী’ বা কর্তা হিসেবে অনুভব করি,তখন আমরা হই স্বাধীন, স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। এই সত্তা হলো আমাদের চেতনা যা জগৎকে উপলব্ধি করে এবং অর্থ দেয়। অন্যদিকে যখন আমরা ‘বস্তু’ হিসেবে নিজেদের দেখি, তখন আমরা হই জগতের অংশ, পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত, অন্যের চোখে বিচারিত একটি শরীর বা ঘটনা। আমরা কখনই পুরোপুরিভাবে কেবল বিষয়ী বা কেবল বস্তু হয়ে উঠতে পারি না। এই নিরন্তর টানাপোড়েনই মানব-অস্তিত্বের এক মৌলিক ট্র্যাজেডি।

এই ধারণার গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জোনাথন রি এবং জেমস উড তাঁদের ‘ক্লোজ রিডিংস’ অনুষ্ঠানে বোভোয়ারের ১৯৪৬ সালের গ্রন্থ যা পরে ‘দ্য ইথিক্স অব অ্যাম্বিগুইটি’ নামে প্রকাশিত হয়—এর নৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, এই অস্পষ্টতা কোনো দুর্বলতা নয়, এটিই আমাদের ‘স্বাধীনতার যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণ’।

এই ট্র্যাজিক অস্পষ্টতা আমাদের সামনে এক কঠিন নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরে, আমরা স্বাধীন, কিন্তু এই স্বাধীনতা আসে এক বিশাল দায়িত্বের বোঝা নিয়ে। বোভোয়ারের মতে, যেহেতু আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংজ্ঞায়িত নই, তাই আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের অর্থ নিরন্তর তৈরি করে যেতে হয়। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ এই আত্ম-সংজ্ঞায়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটিই হলো অবিরাম আত্ম-সংজ্ঞায়নের সুযোগ ।

বোভোয়ার দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অস্পষ্টতা থেকে উদ্ভূত দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। দার্শনিক ও বিশ্লেষকগণ মনে করেন, অনেকেই এই গুরুদায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চান। মানুষ অস্তিত্বের এই অস্পষ্টতা এবং স্বাধীনতার অনিবার্য চাপকে অস্বীকার করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।

যারা বিশ্বাস করেন যে জীবনের অর্থ আগে থেকেই নির্ধারিত এবং অপরিবর্তনীয় কোনো নৈতিক আইন বা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত। তারা নিজেদের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে প্রথা বা নিয়মের অধীনস্থ হতে চান। আর আছে, যারা স্বাধীনতার গুরুভার মানতে না পেরে জীবন ও মূল্যবোধকে অর্থহীন বলে মনে করেন এবং কোনো নৈতিক মানদণ্ড স্বীকার করেন না।

বোভোয়ার এই উভয় প্রকার এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেই ‘মন্দ বিশ্বাস’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নৈতিক জীবন যাপন করতে হলে এই ট্র্যাজিক অস্পষ্টতাকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে নিতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তে নিজের কর্মের দ্বারা বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীনতার অর্থ হলো অন্য কারও চাপানো মূল্যবোধ নয়, বরং নিজস্ব নৈতিকতা তৈরি করা এবং সেই স্বাধীনতা অন্য সকলের জন্যও নিশ্চিত করা।

বোভোয়ারের এই দার্শনিক ধারণাগুলি পরবর্তীতে তাঁর যুগান্তকারী নারীবাদী গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ এবং তাঁর উপন্যাসগুলিতে আরও বিস্তৃতভাবে বিকশিত হয়েছে। ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’- গ্রন্থে বোভোয়ার নারীর সামাজিক অবস্থানে এই ট্র্যাজিক অস্পষ্টতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।তিনি দেখিয়েছেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সাধারণত ‘অন্য’ বা বস্তু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যেখানে পুরুষ নিজেকে ‘বিষয়ী’ বা মূল সত্তা হিসেবে দেখে। সমাজ নারীর স্বাধীনতা এবং আত্ম-সংজ্ঞায়নের সুযোগকে অস্বীকার করে, তাকে পুরুষের প্রয়োজন পূরণের একটি বস্তু বা ভূমিকা হিসেবে আবদ্ধ করে রাখে।

‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর মূল বক্তব্য হলো, নারীর মুক্তি তখনই সম্ভব যখন সে এই আরোপিত ‘বস্তুত্ব’ অস্বীকার করে, নিজের বিষয়ী সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করবে এবং পুরুষদের মতো নিজেদের অস্তিত্বের অর্থ নিজেই তৈরি করার দায়িত্ব নেবে। এটিও স্বাধীনতার যন্ত্রণারই একটি রূপ, যেখানে নারীকে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সংজ্ঞা ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়।

বোভোয়ারের উপন্যাসগুলি, যেমন ‘শি কেম টু স্টে’ বা ‘দ্য ম্যান্ডারিনস’, তাঁর দার্শনিক ভাবনার জীবন্ত চিত্রায়ণ। এই উপন্যাসগুলিতে চরিত্রদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং স্বাধীনতার অন্বেষণ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চরিত্রগুলি প্রায়শই তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে বিষয়ী ও বস্তুর মধ্যেকার দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়, যা বোভোয়ারের নৈতিক তত্ত্বের জটিলতাকে শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরে।

জোনাথন রি এবং জেমস উডের আলোচনায় বোভোয়ারের গভীর সাহিত্যিক বিশ্লেষণও উঠে এসেছে। বোভোয়ার কীভাবে জর্জ এলিয়ট , ভার্জিনিয়া উলফ এবং ই.এম. ফরস্টার-এর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে মানব অস্তিত্বের এই জটিলতাগুলি উপলব্ধি ও বিকশিত করেছেন, তা তাঁরা তুলে ধরেছেন।

বোভোয়ার এই লেখকদের কর্মে দেখেছেন কীভাবে ব্যক্তিরা সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্বে ভোগে। জর্জ এলিয়ট তাঁর উপন্যাসে নৈতিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যেকার সংগ্রাম বোভোয়ারের নীতিশাস্ত্রের সঙ্গে অনুরণিত হয়।

ভার্জিনিয়া উলফের লেখায় নারী-চরিত্রদের অভ্যন্তরীণ জীবন, তাদের চেতনা এবং আত্ম-অনুসন্ধান বোভোয়ারের ‘বিষয়ী’ সত্তার ধারণাকে শক্তিশালী করে।

ফরস্টারের উপন্যাসে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি বা শ্রেণীর মধ্যেকার সংঘাত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক জটিলতাকে প্রকাশ করে। বোভোয়ার এই সাহিত্যিকদের কাজকে কেবল উপভোগ করেননি, দার্শনিক টুল হিসেবে ব্যবহার করেছেন মানব-অস্তিত্বের জটিল চিত্রকে গভীরভাবে বোঝার জন্য।

সিমন দ্য বোভোয়ারের দর্শন ইতিহাস, নীতিশাস্ত্র এবং সমাজতত্ত্বের জন্য এক অপরিহার্য দিকনির্দেশক। তিনি আমাদের শেখান, মানবিক অস্তিত্বের কেন্দ্রে যে ট্র্যাজিক অস্পষ্টতা রয়েছে, তা আসলে এক বিশাল সম্ভাবনার জন্ম দেয়। এটি আমাদের দায়িত্বশীল ও নৈতিক হতে বাধ্য করে। স্বাধীনতার যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণকে স্বীকার করে আমরা নিরন্তর নিজেদের নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ পাই। এই দার্শনিক বার্তা কেবল ১৯৪০-এর দশকের জন্য নয়, বরং আধুনিক সমাজের জটিলতায় জর্জরিত প্রতিটি মানুষের জন্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়।

সস্তা ভারতীয় সুতা পিছিয়ে দিচ্ছে দেশের টেক্সটাইল শিল্প

প্রতিবেশি দেশ ভারত থেকে তুলনামূলক সস্তায় সুতা আমদানি করতে পারায় বাংলাদেশের স্থানীয় পোশাক ও টেক্সটাইল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফলে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো তাদের উৎপাদিত সুতা ও কাপড় বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছে, গুদামগুলো অবিক্রিত পণ্যে ভরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “ভারত সরকার রপ্তানিতে বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা চালু করায় তাদের সুতা বাংলাদেশে সস্তায় বা ডাম্পিং মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আমরা এসব তথ্য আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করেছি।”

বিটিএমএ’র তথ্যমতে, ভারত থেকে সুতা আমদানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় কারখানাগুলোতে সুতা বিক্রি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে অনেকে ব্রেক ইভেন পয়েন্টের নিচে বা লোকসান সত্ত্বেও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় মিলগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো ভারতের প্রতি কেজি সুতার দাম দেশীয় দামের তুলনায় কম। চট্টগ্রাম বন্দরের সিঅ্যান্ড এফ মূল্য অনুযায়ী, স্থানীয় ৩০ কাউন্টের সুতার দাম প্রতি কেজি ২.৪৫ থেকে ৩.০৫ ডলার হলেও ভারতের সুতার দাম পড়ছে প্রায় ২.১৯ ডলার । দুই বছর আগে এই পার্থক্য মাত্র ০.০৫ ডলার ছিল। ফলে পোশাক প্রস্তুতকারকরা দেশীয় সুতার পরিবর্তে আমদানি করা সুতার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

এছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাই পথে সুতা ও কাপড় প্রবেশের কারণে স্থানীয় মিলগুলোর বিক্রি আরও কমেছে। লিটল স্টার স্পিনিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, “কাস্টমসের নির্লিপ্ততার সুযোগে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সুতা ও ফেব্রিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে স্থানীয় মিলগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না।”

শাহ ফতেহউল্লাহ গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ আলম বলেন, “বিক্রি কমে যাওয়ায় আমাদের গুদামগুলো ভর্তি হয়ে গেছে। উৎপাদিত সুতার ৫০ শতাংশের বেশি এখনও গুদামে পড়ে আছে। ফলে আরও উৎপাদন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।”

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারত থেকে সুতা আমদানি ৪১ শতাংশ বেড়েছে। স্থানীয় মিলগুলো রপ্তানিতে কম প্রণোদনা ও উচ্চ ইউটিলিটি ব্যয়ের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এনজেড স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউদজামান খান বলেন, “ভারতীয় মিলগুলো প্রতি কেজিতে ০.২৫–০.৩০ ডলার বেশি সুবিধা পাচ্ছে, যার কারণে নিটওয়্যার মিল মালিকরা আমদানিতে উৎসাহিত হচ্ছেন।”

স্থানীয় টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট হলেও, ৫০টির বেশি কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিটিএমএ আশা করছে, এই সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল খাত বড় সঙ্কটে পড়তে পারে, যার প্রভাব দেশের ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও লজিস্টিকস খাতেও পড়বে।

মস্তিষ্কের কোষে প্রোটিনের ছিদ্র পারকিনসন্স রোগের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে

পারকিনসন্স রোগ হলো এক রহস্যময় স্নায়বিক ব্যাধি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষগুলিকে নিস্তেজ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে। এর প্রাথমিক লক্ষণ হাতের সামান্য কাঁপুনি বা সামান্য পেশি কাঠিন্য সাধারণত সহজে এড়ানো গেলেও, রোগের গভীরতা বাড়ে যখন মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্নায়ু কোষ বা নিউরনগুলো নীরবে মারা যেতে থাকে।

দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই স্নায়ু ক্ষয়ের পেছনের মূল কারণটি খুঁজছিলেন। সম্প্রতি ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষকরা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে এই রহস্যের ওপর নতুন আলো ফেলেছেন। তাঁরা একটি বিশেষ বিষাক্ত প্রোটিনকে “মস্তিষ্কের কোষে ছিদ্রকারী” হিসেবে শনাক্ত করেছেন এবং একটি শক্তিশালী ইমেজিং পদ্ধতির সাহায্যে এই আণবিক আক্রমণকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই গবেষণাটি পারকিনসন্স রোগের উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

পারকিনসন্স রোগের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘকাল ধরে যে প্রোটিনটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল, তা হলো আলফা-সিনুক্লিন (α-synuclein)। একটি সুস্থ মস্তিষ্কে এই প্রোটিন স্নায়ু কোষগুলির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বা বার্তা প্রেরণে সাহায্য করে। কিন্তু পারকিনসন্স আক্রান্ত মস্তিষ্কে এটি তার স্বাভাবিক ভূমিকা থেকে সরে এসে ক্ষতিকারক রূপ ধারণ করে।

অতীতে বেশিরভাগ গবেষণা এই প্রোটিনের বড় আকারের জমাট বাঁধা রূপ, যা ফাইব্রিল (Fibrils) নামে পরিচিত এবং যা পারকিনসন্স আক্রান্তদের মস্তিষ্কের টিস্যুতে দেখা যায়, তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। কিন্তু নতুন গবেষণাটি একটি ভিন্ন, অনেক ছোট এবং আরও বিপজ্জনক গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমার নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্র অলিগোমার কাঠামোটিই স্নায়ু কোষের ঝিল্লিতে মাইক্রোস্কোপিক ছিদ্র তৈরি করে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নাল ACS Nano-এ এই চাঞ্চল্যকর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

আরহাস ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল গবেষক মেটে গালসগার্ড মালে জোর দিয়ে বলেন, “আমরাই প্রথম যারা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছি এই অলিগোমারগুলি কীভাবে ছিদ্র তৈরি করে এবং এই ছিদ্রগুলি কীভাবে আচরণ করে।”

গবেষণায় দেখা গেছে, কোষ ঝিল্লিতে এই ছিদ্র তৈরির প্রক্রিয়াটি তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ঘটে। প্রথমে আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমারগুলি কোষের ঝিল্লির সাথে, বিশেষত ঝিল্লির বাঁকানো বা বক্র অঞ্চলগুলিতে, নিজেদের যুক্ত করে। এরপর তারা আংশিকভাবে ঝিল্লির ভেতরে প্রবেশ করে। সবশেষে তারা একটি ছিদ্র তৈরি করে যা অণুগুলিকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বা বের করে দিতে পারে, যা কোষের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কিন্তু এই ছিদ্রগুলি স্থির নয়। এরা ক্রমাগত ছোট ঘূর্ণায়মান দরজার মতো খোলে এবং বন্ধ হয়, যা এই আবিষ্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই গতিশীল আচরণ বা ডায়নামিক বিহেভিয়র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পিএইচডি ছাত্র এবং গবেষণার প্রথম লেখক বো ভোল্ফ ব্রোচনার বলেন, “এই গতিশীল আচরণটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে কেন কোষগুলি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় না।”

যদি ছিদ্রগুলি ক্রমাগত খোলা থাকত, তবে কোষের ভেতরের এবং বাইরের আয়ন ও অণুর ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে কোষটি অল্প সময়ের মধ্যেই ধসে পড়ত। যেহেতু ছিদ্রগুলি মুহূর্তের জন্য খোলে এবং বন্ধ হয়, তাই কোষের নিজস্ব পাম্পগুলি হয়তো সাময়িকভাবে এই ক্ষতিপূরণ দিতে পারে এবং কোষটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিই সময়ের সাথে সাথে স্নায়ু কোষগুলিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে এবং পারকিনসন্স রোগের উপসর্গগুলির ধীরে ধীরে অবনতি ঘটায়। এটি একটি নতুন ধারণা যা পারকিনসন্সের অগ্রগতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়।

এই প্রথমবার বিজ্ঞানীরা এমন ছিদ্রের গতিশীলতা বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হলেন। এটি সম্ভব হয়েছে একটি নব-উন্নত সিঙ্গেল-ভেসিকল অ্যানালিসিস প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে।

এই প্ল্যাটফর্মে গবেষকরা কৃত্রিম ক্ষুদ্র বুদ্বুদ ব্যবহার করেছেন যা বাস্তব কোষ ঝিল্লির একটি সরল মডেল হিসেবে কাজ করে। প্ল্যাটফর্মটি গবেষকদের প্রতিটি একক প্রোটিন এবং প্রতিটি একক ভেসিকলের মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়া অনুসরণ করার সুযোগ দেয়।

এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, গবেষকরা কেবল প্রক্রিয়াটি দেখতেই পাচ্ছেন না, বরং বিভিন্ন অণু এই প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে তাও পরীক্ষা করতে পারছেন। এটি ভবিষ্যতে ঔষধ স্ক্রিনিং-এর জন্য একটি মূল্যবান হাতিয়ার হতে পারে, যেখানে গবেষকরা এমন অণু বা ওষুধ খুঁজে বের করতে পারবেন যা এই ছিদ্র তৈরি হওয়া বা তার কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে পারে।

গবেষক দলটি ইতিমধ্যে এই অলিগোমারগুলিকে বিশেষভাবে আবদ্ধ করার জন্য ডিজাইন করা ন্যানোবডি খণ্ড পরীক্ষা করেছে। ডায়াগনস্টিকস বা রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এগুলি দারুণ সম্ভাবনা দেখালেও, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছুটা পথ বাকি।

গবেষকরা সতর্কতা অবলম্বন করে বলেছেন, বর্তমান গবেষণাটি মডেল সিস্টেম বা সরল পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়েছে যা জীবন্ত কোষ বা টিস্যু নয়। এই সরল সেটআপের সুবিধা হলো, এতে একবারে একটি মাত্র চলক পরিমাপ করা যায়, যা নির্ভুল ফলাফলের জন্য অপরিহার্য।

কিন্তু পরবর্তী ধাপে গবেষকদের এই আবিষ্কারকে জৈবিক টিস্যু বা জীবন্ত কোষের মধ্যে নকল বা প্রতিরূপ তৈরি করতে হবে, যেখানে আরও জটিল জৈব-রাসায়নিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণগুলি কাজ করে। মেটে গালসগার্ড মালের মতে, “এখন আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আরও জটিল জৈবিক সিস্টেমে কী ঘটে তা তদন্ত করতে হবে।”

এই গবেষণাটি পারকিনসন্স রোগের পেছনের আণবিক প্রক্রিয়াকে অভূতপূর্ব স্পষ্টতায় তুলে ধরেছে। এটি রোগের সূত্রপাত বোঝার এবং সম্ভবত প্রারম্ভিক রোগ নির্ণয়ের জন্য নতুন উপায় আবিষ্কারের পথে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। তবে আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমারকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করে কোষের ক্ষতি থামানোর জন্য শক্তিশালী ওষুধ আবিষ্কারের পথে এখনও একাধিক স্তর পার হতে হবে।

সংস্কারের মধ্য দিয়েই বিএনপির জন্ম হয়েছে : মির্জা ফখরুল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপি সংস্কারের জন্মদাতা দল, এবং সংস্কারের মধ্য দিয়েই এর জন্ম হয়েছে।’ তিনি বলেন, তারেক রহমানের প্রদত্ত ৩১ দফা কর্মসূচির মধ্যেই সব ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।’

গতকাল গাজীপুরে প্রয়াত বিএনপি নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ’র নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় এই বক্তব্য দেন তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কিছু মহল ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে বিএনপি সংস্কার মানে না। তবে বিএনপির ইতিহাস এবং কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে যে, এই দল সর্বদা সংস্কারের পথেই এগিয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংস্কারের পথ দেখিয়েছিলেন। এরপর বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশবাসী নতুন স্বাধীনতা পেয়েছে এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। তারা অর্থনীতি ও প্রশাসনে স্থিতি ফেরানোর চেষ্টা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। দলের নেতা খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি এবং তারেক রহমান ১৮ বছর ধরে বিদেশে আছেন। তাদের এই ত্যাগ গণতন্ত্রের জন্য অনন্য। নির্বাচনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা এসেছে, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে হবে।’

মির্জা ফখরুল নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে ঘরে ঘরে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাতে হবে। এছাড়াও যারা ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তাদের ক্ষমতায় আসা যেন কখনও সম্ভব না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।’

মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য বিএনপির সংস্কার ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে পুনর্ব্যক্ত করে এবং দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়।