পারকিনসন্স রোগ হলো এক রহস্যময় স্নায়বিক ব্যাধি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষগুলিকে নিস্তেজ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে। এর প্রাথমিক লক্ষণ হাতের সামান্য কাঁপুনি বা সামান্য পেশি কাঠিন্য সাধারণত সহজে এড়ানো গেলেও, রোগের গভীরতা বাড়ে যখন মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্নায়ু কোষ বা নিউরনগুলো নীরবে মারা যেতে থাকে।
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই স্নায়ু ক্ষয়ের পেছনের মূল কারণটি খুঁজছিলেন। সম্প্রতি ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষকরা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে এই রহস্যের ওপর নতুন আলো ফেলেছেন। তাঁরা একটি বিশেষ বিষাক্ত প্রোটিনকে “মস্তিষ্কের কোষে ছিদ্রকারী” হিসেবে শনাক্ত করেছেন এবং একটি শক্তিশালী ইমেজিং পদ্ধতির সাহায্যে এই আণবিক আক্রমণকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই গবেষণাটি পারকিনসন্স রোগের উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
পারকিনসন্স রোগের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘকাল ধরে যে প্রোটিনটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল, তা হলো আলফা-সিনুক্লিন (α-synuclein)। একটি সুস্থ মস্তিষ্কে এই প্রোটিন স্নায়ু কোষগুলির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বা বার্তা প্রেরণে সাহায্য করে। কিন্তু পারকিনসন্স আক্রান্ত মস্তিষ্কে এটি তার স্বাভাবিক ভূমিকা থেকে সরে এসে ক্ষতিকারক রূপ ধারণ করে।
অতীতে বেশিরভাগ গবেষণা এই প্রোটিনের বড় আকারের জমাট বাঁধা রূপ, যা ফাইব্রিল (Fibrils) নামে পরিচিত এবং যা পারকিনসন্স আক্রান্তদের মস্তিষ্কের টিস্যুতে দেখা যায়, তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। কিন্তু নতুন গবেষণাটি একটি ভিন্ন, অনেক ছোট এবং আরও বিপজ্জনক গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমার নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্র অলিগোমার কাঠামোটিই স্নায়ু কোষের ঝিল্লিতে মাইক্রোস্কোপিক ছিদ্র তৈরি করে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নাল ACS Nano-এ এই চাঞ্চল্যকর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
আরহাস ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল গবেষক মেটে গালসগার্ড মালে জোর দিয়ে বলেন, “আমরাই প্রথম যারা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছি এই অলিগোমারগুলি কীভাবে ছিদ্র তৈরি করে এবং এই ছিদ্রগুলি কীভাবে আচরণ করে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, কোষ ঝিল্লিতে এই ছিদ্র তৈরির প্রক্রিয়াটি তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ঘটে। প্রথমে আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমারগুলি কোষের ঝিল্লির সাথে, বিশেষত ঝিল্লির বাঁকানো বা বক্র অঞ্চলগুলিতে, নিজেদের যুক্ত করে। এরপর তারা আংশিকভাবে ঝিল্লির ভেতরে প্রবেশ করে। সবশেষে তারা একটি ছিদ্র তৈরি করে যা অণুগুলিকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বা বের করে দিতে পারে, যা কোষের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কিন্তু এই ছিদ্রগুলি স্থির নয়। এরা ক্রমাগত ছোট ঘূর্ণায়মান দরজার মতো খোলে এবং বন্ধ হয়, যা এই আবিষ্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই গতিশীল আচরণ বা ডায়নামিক বিহেভিয়র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পিএইচডি ছাত্র এবং গবেষণার প্রথম লেখক বো ভোল্ফ ব্রোচনার বলেন, “এই গতিশীল আচরণটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে কেন কোষগুলি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় না।”
যদি ছিদ্রগুলি ক্রমাগত খোলা থাকত, তবে কোষের ভেতরের এবং বাইরের আয়ন ও অণুর ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে কোষটি অল্প সময়ের মধ্যেই ধসে পড়ত। যেহেতু ছিদ্রগুলি মুহূর্তের জন্য খোলে এবং বন্ধ হয়, তাই কোষের নিজস্ব পাম্পগুলি হয়তো সাময়িকভাবে এই ক্ষতিপূরণ দিতে পারে এবং কোষটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিই সময়ের সাথে সাথে স্নায়ু কোষগুলিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে এবং পারকিনসন্স রোগের উপসর্গগুলির ধীরে ধীরে অবনতি ঘটায়। এটি একটি নতুন ধারণা যা পারকিনসন্সের অগ্রগতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়।
এই প্রথমবার বিজ্ঞানীরা এমন ছিদ্রের গতিশীলতা বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হলেন। এটি সম্ভব হয়েছে একটি নব-উন্নত সিঙ্গেল-ভেসিকল অ্যানালিসিস প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে।
এই প্ল্যাটফর্মে গবেষকরা কৃত্রিম ক্ষুদ্র বুদ্বুদ ব্যবহার করেছেন যা বাস্তব কোষ ঝিল্লির একটি সরল মডেল হিসেবে কাজ করে। প্ল্যাটফর্মটি গবেষকদের প্রতিটি একক প্রোটিন এবং প্রতিটি একক ভেসিকলের মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়া অনুসরণ করার সুযোগ দেয়।
এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, গবেষকরা কেবল প্রক্রিয়াটি দেখতেই পাচ্ছেন না, বরং বিভিন্ন অণু এই প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে তাও পরীক্ষা করতে পারছেন। এটি ভবিষ্যতে ঔষধ স্ক্রিনিং-এর জন্য একটি মূল্যবান হাতিয়ার হতে পারে, যেখানে গবেষকরা এমন অণু বা ওষুধ খুঁজে বের করতে পারবেন যা এই ছিদ্র তৈরি হওয়া বা তার কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে পারে।
গবেষক দলটি ইতিমধ্যে এই অলিগোমারগুলিকে বিশেষভাবে আবদ্ধ করার জন্য ডিজাইন করা ন্যানোবডি খণ্ড পরীক্ষা করেছে। ডায়াগনস্টিকস বা রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এগুলি দারুণ সম্ভাবনা দেখালেও, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছুটা পথ বাকি।
গবেষকরা সতর্কতা অবলম্বন করে বলেছেন, বর্তমান গবেষণাটি মডেল সিস্টেম বা সরল পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়েছে যা জীবন্ত কোষ বা টিস্যু নয়। এই সরল সেটআপের সুবিধা হলো, এতে একবারে একটি মাত্র চলক পরিমাপ করা যায়, যা নির্ভুল ফলাফলের জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু পরবর্তী ধাপে গবেষকদের এই আবিষ্কারকে জৈবিক টিস্যু বা জীবন্ত কোষের মধ্যে নকল বা প্রতিরূপ তৈরি করতে হবে, যেখানে আরও জটিল জৈব-রাসায়নিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণগুলি কাজ করে। মেটে গালসগার্ড মালের মতে, “এখন আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আরও জটিল জৈবিক সিস্টেমে কী ঘটে তা তদন্ত করতে হবে।”
এই গবেষণাটি পারকিনসন্স রোগের পেছনের আণবিক প্রক্রিয়াকে অভূতপূর্ব স্পষ্টতায় তুলে ধরেছে। এটি রোগের সূত্রপাত বোঝার এবং সম্ভবত প্রারম্ভিক রোগ নির্ণয়ের জন্য নতুন উপায় আবিষ্কারের পথে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। তবে আলফা-সিনুক্লিন অলিগোমারকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করে কোষের ক্ষতি থামানোর জন্য শক্তিশালী ওষুধ আবিষ্কারের পথে এখনও একাধিক স্তর পার হতে হবে।


