Home Blog Page 2

দেশে এক দশকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ লাখ ১৬ হাজার

২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সড়কগুলোতে মোট ৬৭,৮৯০টি দুর্ঘটনা ঘটে, এতে ১ লাখ ১৬,৭২৬ জন নিহত এবং ১ লাখ ৬৫,০২১ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এই তথ্য তুলে ধরেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে প্রাণহানি যা, তার চেয়েও এই সময়সীমায় দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কয়েকগুণ বেশি।

সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, “এই প্রতিবেদনের তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে।”

মোজাম্মেল হক চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সড়ক পরিবহন খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি ঘটে। অব্যবস্থাপনা, মালিক-শ্রমিকদের চাঁদাবাজি, নৈরাজ্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়কের ত্রুটি, মাদকাসক্ত চালক এবং বেপরোয়া গতি—এসব কারণেই এত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।”

সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, স্বাধীনতার পর থেকে দাতা সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী একের পর এক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। নৌ ও রেল যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা না গড়ে নতুন সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে দেশের যাতায়াত প্রায় ৮০ শতাংশ সড়কনির্ভর হয়ে উঠায় দুর্ঘটনার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় একই হারে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, “সড়কে এই গণহত্যার জন্য বিগত সরকারের দুর্নীতি ও ভুলনীতি দায়ী। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগও এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।” তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগে নীতিগত সংস্কার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।

সংগঠনটি নিরাপদ সড়ক দিবসকে সামনে রেখে ১২ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—নৌ ও রেলপথের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সমন্বিত যাতায়াত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, চাঁদাবাজি ও অনিয়ম বন্ধে পরিবহন খাতের সংস্কার, বিভাগীয় শহরে সরকারি উদ্যোগে ম্যাস ট্রানজিট ব্যবস্থা, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে কমপক্ষে দুটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট লেন চালু করা। এছাড়া জেলা থেকে উপজেলায় শক্তিশালী বাস নেটওয়ার্ক তৈরি, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারি-চালিত অটোরিকশা এবং সিএনজি চালিত অটোরিকশার আমদানি ও বিপণন বন্ধ, উন্নত কারিকুলামের মাধ্যমে চালক প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রম ডিজিটাল করা, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গঠন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা সরকারি উদ্যোগে আমলে নেওয়া এবং হতাহত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান অন্তর্ভুক্ত।

সংগঠনটি বলেছে, যাত্রীস্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ফোরামে যাত্রী প্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীর মতামত নিশ্চিত করা, সড়ক খাতে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাইক্লিস্ট ও পথচারীদের জন্য পৃথক লেন ও নিরাপদ ফুটপাতের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

মধুসূদন দত্ত যেভাবে বাংলা নাটকের ভাষাকে ‘আবৃত্তি’ থেকে ‘জীবন’ দিলেন

বাংলা নাটকের ইতিহাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কেবল একজন রেনেসাঁসের পথিকৃৎ নন, তিনি আধুনিক বাংলা নাট্যভাষারও রূপকার। যখন তিনি নাটক রচনা শুরু করেন, বাংলা নাটকের ভাষা ছিল এক স্থবির, সংস্কৃত-ভারাক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা আর পয়ার ছন্দের সীমাবদ্ধতায় বাঁধা। সেই যুগের নাটকে সংলাপ ছিল ছন্দোবদ্ধ আবৃত্তির মতো, যার ফলে মঞ্চের স্বাভাবিকতা ও জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে যেত। মধুসূদনই প্রথম উপলব্ধি করেন, মঞ্চের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংলাপকে হতে হবে চলমান, জীবনমুখী এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্বের ধারক।

ক্লাসিক্যাল গাম্ভীর্য থেকে লোকজ জীবন্ততার দিকে তাঁর এই ভাষিক উত্তরণই বাংলা নাট্যসাহিত্যকে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়, যা আজও আধুনিক নাট্যচর্চার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

মধুসূদনের নাট্যজীবনের সূচনা হয়েছিল চিরাচরিত ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে। তাঁর প্রথম দিকের নাটক, যেমন—১৮৫৯ সালে রচিত শর্মিষ্ঠা, সেই সময়ের সংস্কৃত-প্রভাবিত নাট্যরীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এই নাটকটি পৌরাণিক আখ্যান নির্ভর এবং এর ভাষা ছিল প্রথাগত সংস্কৃত-নির্ভর সাধু ভাষার উচ্চমার্গীয় রূপ।

শর্মিষ্ঠার সংলাপগুলি ছিল দীর্ঘ, অলঙ্কারবহুল এবং প্রচুর তৎসম শব্দের ভারে ভারাক্রান্ত, যা ছিল যেন প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ বা ভাবানুবাদ। উদাহরণস্বরূপ ‘দেবী, কেন এ দাসীকে তিরস্কার করিতেছেন? দাসী কখনও কি স্বেচ্ছাক্রমে আপনার অহিতসাধনে প্রবৃত্তা হইবে?’ এই ধরনের ভাষা আভিজাত্য বাড়ালেও মঞ্চের জন্য ছিল দুর্বহ। এই ভাষা ব্যবহারের ফলে নাটকীয় চরিত্রদের মানবিক আবেগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ক্লাসিক্যাল দূরত্ব তৈরি হতো।

মঞ্চের প্রয়োজনে যে দ্রুততা, স্বতঃস্ফূর্ততা, সরসতা ও ঘাত-প্রতিঘাত প্রয়োজন, তা এই ভারী, সংস্কৃতনির্ভর ভাষায় অনুপস্থিত ছিল। এই সংলাপ রীতির প্রধান দুর্বলতা ছিল—চরিত্রদের মুখে আবেগ ও ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা না থাকা, সবাই প্রায় একই ধরনের উচ্চাঙ্গের ভাষায় কথা বলত। মধুসূদন দ্রুত এর দুর্বলতা উপলব্ধি করেন এবং বুঝতে পারেন, নাটকের সংলাপকে অবশ্যই কাব্যিক বর্ণনা থেকে মুক্ত করে ক্রিয়ামূলক করে তুলতে হবে।

বাংলা নাট্যভাষায় মধুসূদনের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক বিপ্লবটি আসে তাঁর প্রহসনগুলোতে—একেই কি বলে সভ্যতা? (১৮৬০) এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)। এই দুটি প্রহসনের মধ্য দিয়েই তিনি সচেতনভাবে সাধু ভাষার নাগপাশ ছিন্ন করে প্রবেশ করেন লোকজীবনের প্রাণবন্ত চলিত ভাষার জগতে। প্রহসনের চরিত্ররা সমাজের সাধারণ মানুষ এবং তৎকালীন সময়ের বিকৃত সমাজচিত্রের প্রতিচ্ছবি। তাদের মুখের সংলাপকে জীবন্ত করতে মধুসূদন প্রথমবার প্রথাগত ভাষাকে মঞ্চের বাইরে ঠেলে দিলেন।

এই নাটকগুলির চরিত্রদের মুখে যে সংলাপ দেওয়া হলো, তা ছিল পুরোপুরি বাঙালির দৈনন্দিন কথ্যরীতি, আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার এবং স্থানীয় বাগধারার স্বচ্ছন্দ গতিতে ভরপুর। এই ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ, কৌতুকপ্রদ এবং চরিত্রের সামাজিক অবস্থান ও মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই।

বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নাটকের ভক্তপ্রসাদের সংলাপ গ্রামের মেঠো ভাষা, আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং রূঢ় বাস্তবতাকে ধারণ করে, যা দর্শককে সরাসরি গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করে। অন্যদিকে একেই কি বলে সভ্যতা?-র নব্য যুবকদের সংলাপ তৎকালীন কলকাতার তথাকথিত ‘Young Bengal’-এর ইংরেজি-মিশ্রিত, হালকা কথোপকথনকে তুলে ধরে। এই ধরনের মিশ্র ভাষার ব্যবহার বাংলা নাটকে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই চলিত ভাষার ব্যবহার নাটকের সংলাপকে শুধু জীবন্ত করে তোলেনি বরং তা তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী নাট্যরূপ প্রদান করে, যা সরাসরি দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এই প্রহসনগুলি প্রমাণ করে দিল, গম্ভীর ট্র্যাজেডি না হলেও সামাজিক নাটক বা প্রহসনের জন্য চলিত ভাষা অপরিহার্য, যা বাংলা নাট্যভাষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

নাটকের ভাষাকে গাম্ভীর্য ও আধুনিকতা প্রদানের জন্য মধুসূদন তাঁর ক্লাসিক্যাল ট্র্যাজেডিগুলো, যেমন— পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) এবং মায়াকানন (১৮৭৩)-এ এক ভিন্ন ভাষিক পরীক্ষা চালান। এটি হলো বাংলা কাব্যে তাঁর আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার, যা তিনি গ্রহণ করেছিলেন ইংরেজি সাহিত্য, বিশেষত শেক্সপিয়র এবং মিল্টনের মহাকাব্যিক নাট্যশৈলী থেকে। এই অমিত্রাক্ষর ছন্দ ছিল ইংরেজি নাটকের প্রভাবের একটি সুস্পষ্ট অনুপ্রবেশ, যা বাংলা নাটকের সংলাপের কাঠামোকে চিরতরে পাল্টে দেয়।

পয়ার ছন্দের অতি-নিয়ন্ত্রিত দ্বিদলীয় পর্ব ভেঙে মধুসূদন বাক্যের অর্থানুসারে ছন্দকে মুক্তি দিলেন। এই পদ্ধতিকে ইংরেজিতে ‘এনজাম্বমেন্ট’ (Enjambment) বলা হয়, যেখানে বাক্য এক পঙ্‌ক্তি থেকে পরের পঙ্‌ক্তিতে প্রবাহিত হয়। এই স্বাধীনতা অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করে তিনি সংলাপকে এনে দিলেন এক বিশাল ব্যাপ্তি ও গাম্ভীর্য, যা মেঘনাদ বা কৃষ্ণকুমারীর মতো ট্র্যাজিক চরিত্রদের গভীর মনস্তত্ত্ব ও আবেগকে প্রকাশের জন্য অপরিহার্য ছিল। এই ছন্দ সংস্কৃতনির্ভর ভাষার ভার বহন করলেও, তার অভ্যন্তরীণ গতিকে তীব্র করে তুলল এবং তা মঞ্চে আবৃত্তির বদলে অভিনয়যোগ্য সংলাপে পরিণত হলো। ইংরেজি সাহিত্যের এই প্রভাব শুধু ছন্দের অনুকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সংলাপের ভাষাকে দিয়েছে একটি উদার ও বলিষ্ঠ কাঠামো, যা পরবর্তীকালে নাট্যকারদের কাছে এক আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।

মধুসূদনের এই বহুমুখী ভাষিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হিসেবে আধুনিক বাংলা নাটকের ভাষা একটি সুনির্দিষ্ট নাট্যরূপ পেল।

তিনি প্রমাণ করেছেন, নাটকের বিষয়বস্তু ও চরিত্র অনুযায়ী ভাষা পরিবর্তিত হতে পারে। উচ্চবিত্ত, পৌরাণিক চরিত্রের জন্য সাধু ও অমিত্রাক্ষর, আর নিম্নবিত্তের বা সামাজিক প্রহসনের জন্য চলিত ও লোকজ ভাষা এই দ্বৈততা বা ‘ডায়ালেক্টিক্যাল’ বৈচিত্র্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

মধুসূদনীয় সংলাপ কেবল চরিত্রদের মনের ভাব প্রকাশ করে না, তা নাটকের কাহিনিকে তীব্র গতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়, অনিবার্য সংঘর্ষ তৈরি করে এবং সম্পূর্ণ ক্রিয়াত্মক হয়ে ওঠে। এই সংলাপের হাত ধরেই বাংলা নাটক কাব্য থেকে মঞ্চের দিকে যাত্রা করে।

প্রহসনের মাধ্যমে তিনি নতুন ধরনের চলিত ও মিশ্র ভাষার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন, যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাঙালি জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে নাট্যভাষাকেও ঋদ্ধ করে। কলকাতার শহুরে জীবনের ভাষাকে মঞ্চের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে তিনি সামাজিক নাটকের পথ প্রশস্ত করেন।

মধুসূদনের এই প্রচেষ্টা ছিল আসলে বাংলা নাটকের সংলাপকে কেবল “শোনার” সাহিত্য থেকে “দেখার” শিল্পে রূপান্তরিত করার একটি সফল প্রয়াস। সংস্কৃতনির্ভর ক্লাসিক্যাল গাম্ভীর্যকে সম্মান জানিয়েও, তিনি লোকজ জীবন্ততার মাধ্যমে মঞ্চের সঙ্গে দর্শকের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে দিলেন। তাঁর এই ভাষিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের নাট্যকারদের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।

দীনবন্ধু মিত্র তাঁর নীলদর্পণ-এ সামাজিক বাস্তবতার ভাষাকে আরও শক্তিশালী করেন এবং গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো মঞ্চাভিনেতা ও নাট্যকাররা মধুসূদনের দেখানো পথ ধরেই বাংলা নাটকের সংলাপকে আরও মজবুত ও জনমুখী করে তোলেন। মধুসূদন দত্ত আধুনিক বাংলা নাটকের ভাষা-স্থপতি। তাঁর হাতেই সাধু ভাষা পেল অমিত্রাক্ষর ছন্দের দৃঢ়তা, আর চলিত ভাষা পেল মঞ্চের স্বীকৃতি। এই দুই ধারার মিশ্রণই বাংলা নাটকের সংলাপকে ক্লাসিক্যাল আনুষ্ঠানিকতা থেকে মুক্তি দিয়ে আধুনিকতার পথে চালিত করে, যা আজও নাট্যমঞ্চের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে।

শিল্প বিপ্লব কিভাবে বিশ্বরাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছিলো?

মানবজাতির ইতিহাসে শিল্প বিপ্লব একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। কেবল অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেই নয়, এই বিপ্লব বিশ্বের রাজনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতা বিন্যাসকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আঠারোো শতকের মধ্যভাগে পশ্চিম ইউরোপে এর সূত্রপাত ঘটলেও, আধুনিকায়নের ধারায় এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক, পুঁজিবাদী সমাজের দিকে এক রূপান্তর।

শিল্প বিপ্লবের আগে পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সমাজে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল রাজা, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের হাতে। রাজনৈতিক অধিকার ছিল সীমিত, সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ভোটাধিকার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সম্পত্তির মালিকানা ছিল ঐতিহ্যগতভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। এই ব্যবস্থা মূলত সামন্ততন্ত্র ও বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ দ্বারা চালিত হতো, যেখানে রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজকীয় কোষাগার বৃদ্ধি করা এবং অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষা করা।

১৮শ শতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও বস্ত্র শিল্পের হাত ধরে শিল্প বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির স্থান দখল করে নেয় কল-কারখানা। এই পরিবর্তন সমাজের অভ্যন্তরে দুটি নতুন ও শক্তিশালী শ্রেণীর জন্ম দেয়, যা পুরাতন রাজনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়।

বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল কল-কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী এবং পুঁজিপতি। এরা অর্থ, সম্পদ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পুরাতন অভিজাত শ্রেণীর বিপরীতে এদের ক্ষমতা নির্ভর করত সম্পত্তির উপর, জন্মগত মর্যাদার উপর নয়।

আর কল-কারখানায় কাজ করা শ্রমিক শ্রেণীর এই বিশাল জনসমষ্টি ছিল মূলত গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে আসা। এরা ছিল সংখ্যায় বেশি এবং তীব্র শোষণের শিকার।

এই নতুন শ্রেণীগুলোর উত্থান পুরাতন রাজতান্ত্রিক-সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। বুর্জোয়া শ্রেণী অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবি জানায় যা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে রক্ষা করবে।

বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয় উদারনীতিবাদ। জন লক, অ্যাডাম স্মিথ এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো চিন্তাবিদদের হাত ধরে এই মতবাদ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে। এই ধারণার প্রভাবে রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।

ইংল্যান্ডে ক্ষমতা পুরোপুরি রাজার হাত থেকে পার্লামেন্টের হাতে স্থানান্তরিত হয়, তেমনি অনেক দেশে রাজা সীমিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন এবং একটি নির্বাচিত আইনসভা রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা নেয়। বুর্জোয়া শ্রেণী প্রথমে নিজেদের জন্য এবং পরে ক্রমবর্ধমান চাপে সাধারণ পুরুষদের জন্য ভোটাধিকার আদায় করে নেয়। এর ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রসারিত হয়।

জটিল শিল্প-অর্থনীতি পরিচালনার জন্য একটি সুসংগঠিত ও পেশাদার আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রভূমি গ্রেট ব্রিটেন এই পরিবর্তনের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ১৮৩২ সালের সংস্কার আইন এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে ক্ষমতা অভিজাতদের হাত থেকে বুর্জোয়াদের হাতে আসে।

অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের ফলস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণীর উপর নেমে আসে অমানবিক শোষণ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বল্প মজুরি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নারী-শিশু শ্রমের মতো সমস্যাগুলো শ্রমিকদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শ্রেণী থেকে জন্ম নেয় সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম-এর মতো মতবাদ।

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের মতো তাত্ত্বিকেরা শিল্প বিপ্লবকে “পুঁজিবাদী শোষণ” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের মাধ্যমে একটি শ্রেণীবিহীন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার ডাক দেন। ইউরোপ জুড়ে শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন এবং লেবার পার্টির মতো রাজনৈতিক দল গঠন করে পার্লামেন্টে নিজেদের দাবি তোলার সুযোগ পায়।

শ্রমিক আন্দোলনের চাপে এবং সামাজিক অস্থিরতা এড়াতে ১৯শ ও ২০শ শতকে অনেক সরকার সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বেকারত্ব ভাতার মতো কর্মসূচি গ্রহণ করে। এটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সমাজের দুর্বল অংশের দিকে চালিত করার প্রথম ধাপ। এই আন্দোলন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করে, যা বহুদলীয় ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের মতো ধারণার জন্ম দেয়।

শিল্প বিপ্লব আধুনিক জাতিরাষ্ট্র-এর ধারণাকে আরও মজবুত করে। একীভূত অর্থনীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি একটি সাধারণ জাতীয় পরিচিতি তৈরি করতে সাহায্য করে। জনগণ নিজেদের ঐতিহ্যগত পরিচয় ভুলে একটি একক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়।

তবে একইসাথে শিল্প বিপ্লব দেশগুলোর মধ্যে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির বাজার দখলের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। এর ফলস্বরূপ জন্ম নেয় সাম্রাজ্যবাদ। ইউরোপীয় শক্তিগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়। এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কেবল উপনিবেশগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করেনি, ইউরোপীয় রাজনীতিতেও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, মিত্রতা জোট গঠন এবং অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ সংঘাতের বীজ বপন করে।

শিল্প বিপ্লব নিছক একটি অর্থনৈতিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল এমন একটি প্রক্রিয়া যা আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছিল। রাজতন্ত্রকে প্রতিস্থাপন করে গণতন্ত্র এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিগত অধিকারের স্বীকৃতি, সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার প্রসার—এগুলো সবই ছিল শিল্প বিপ্লব ও আধুনিকায়নের প্রত্যক্ষ ফল।

এই বিপ্লব রাজনৈতিক ক্ষমতাকে জন্মগত মর্যাদা থেকে সরিয়ে সম্পদ ও সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করেছে। পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদের মতো তিনটি প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্ম দিয়ে শিল্প বিপ্লব বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে এর প্রভাব এখনও প্রতিটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অনুভূত হয়। এটি প্রমাণ করে প্রযুক্তির অগ্রগতি কিভাবে সমাজের গভীরতম রাজনৈতিক ভিত্তিকেও আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম।

বৃদ্ধি পেয়েছে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি, প্রধান গন্তব্য ভারত ও চীন

টানা দুই বছরের পতনের পর গত অর্থবছরে বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ রপ্তানি খাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮৮.৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩২৫.৭৩ মিলিয়নের তুলনায় ১৯.৩৩ শতাংশ বেশি। উন্নত কমপ্লায়েন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ফলে এই সাফল্য এসেছে। ভারত ও চীনের চাহিদা বৃদ্ধি খাতের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, রপ্তানিকারকরা নতুন কমপ্লায়েন্স শর্তের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছেন। ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রোগব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার উন্নতি ইতোমধ্যেই ফল দিচ্ছে।

তবে অনুকূল আবহাওয়ার অভাব, নদী-খালের পলি জমে যাওয়া এবং চিংড়ি চাষে প্রয়োজনীয় লবণাক্ত পানি ব্যবহারে পরিবেশবাদীদের আপত্তির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিংড়ি উৎপাদন কমে গেছে।

ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৩,২৩৮ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে ২৯৬.২৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা পরিমাণে ২১.৫ শতাংশ এবং মূল্যে ১৯.৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি কিলোগ্রাম চিংড়ির গড় রপ্তানি মূল্য সামান্য কমে ১২.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে হিমায়িত মাছের রপ্তানি মূল্য ৯২.৪১ মিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে রপ্তানির পরিমাণ ৭,৯৫১ টনে কমেছে। প্রতি কিলোগ্রাম মাছের গড় মূল্য বেড়ে ১১.৬২ ডলারে উঠেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্যের প্রজাতির চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, মহামারিজনিত বিপর্যয় এবং ‘আর্লি মরটালিটি সিনড্রোম’-এর মতো রোগে খুলনা ও সাতক্ষীরার চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল, পরের বছর প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়।

চিংড়ি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এখন চীন, যা ৫৬.৬৯ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি আমদানি করেছে। নেদারল্যান্ডস ৪৭.৩৯ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ৪৪.৯৬ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি আমদানি করেছে। হিমায়িত মাছের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান শীর্ষে, ৬২.৫৪ মিলিয়ন ডলার।

তবে খাতের চ্যালেঞ্জও কম নয়। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, পানিদূষণ, মানসম্মত ব্রুডস্টক অভাব, রোগব্যাধি এবং দুর্বল জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমস্যার মুখোমুখি। বর্তমানে দেশে ১১০টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মধ্যে মাত্র ৩০–৪০টি সক্রিয়, পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে মাত্র ১০টি। খামার পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানো না গেলে অচল কারখানাগুলো চালু করা কঠিন হবে।

চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিকারক দোদুল কুমার দত্ত বলেন, “সংখ্যায় ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত আছে, তবে উন্নত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং কোল্ড-চেইন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে।”

বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ খাতের পুনরুদ্ধার উপকূলীয় অর্থনীতিতে স্বস্তি এনেছে, বিশেষত খামার বন্ধ হওয়া এবং রপ্তানিতে ধীরগতির প্রভাব কাটাতে। তবে খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আরও বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের প্রয়োজন।

পদার্থবিজ্ঞানের শতাব্দী প্রাচীন সমস্যা, ‘কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল’ সমাধান করলো AI

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে AI প্রতি মুহূর্তে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। সম্প্রতি নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয় এবং লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষকদের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার সেই যাত্রায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁরা এমন একটি উন্নত কম্পিউটেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছেন, যা পরিসংখ্যানগত পদার্থবিজ্ঞানীদের বহু দশক ধরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া একটি দুরূহ সমস্যা— কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল (Configurational Integral) সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। THOR (Tensors for High-dimensional Object Representation) নামক এই এআই সিস্টেমটি সেকেন্ডের মধ্যে এমন জটিল সমীকরণ সমাধান করে দিচ্ছে, যা চিরায়ত সিমুলেশন পদ্ধতিতে সমাধান করতে শতাব্দীর পর শতাব্দী সময় লাগার কথা।

পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পদার্থের আচরণ, বিশেষ করে তাপমাত্রা ও যান্ত্রিক পরিস্থিতিতে কোনো বস্তুর ধর্ম কেমন হবে, তা বোঝার জন্য কিছু মৌলিক সমীকরণ অপরিহার্য। এই সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল, যা পদার্থের কণাগুলির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে ধারণ করে।

বিজ্ঞানীরা এই ইন্টিগ্রাল সরাসরি সমাধান করতে পারেননি। এর প্রধান কারণ হলো “মাত্রার অভিশাপ”! যখন একটি সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত চলকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন গণনার জটিলতা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। পদার্থের আচরণ নির্ধারণের জন্য এই ইন্টিগ্রাল প্রায়শই হাজার হাজার মাত্রা জড়িত থাকে। চিরায়ত ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে এত বিশাল মাত্রার সমস্যা সমাধান করতে পৃথিবীর দ্রুততম সুপারকম্পিউটারেরও মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি সময় লেগে যেত।

এই অসম্ভব চ্যালেঞ্জের কারণে বিজ্ঞানীরা এতদিন মলিকুলার ডাইনামিক্স বা মন্টে কার্লো সিমুলেশনের মতো আনুমানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করতেন। এই পদ্ধতিগুলি কেবল আণবিক গতিকে পরোক্ষভাবে অনুকরণ করে একটি দীর্ঘ সময় ধরে ফলাফল অনুমান করত, যা প্রায়শই সপ্তাহব্যাপী নিবিড় প্রক্রিয়াকরণের পরও সীমিত নির্ভুলতা দিত। লস আলামোস-এর সিনিয়র এআই বিজ্ঞানী বোইয়ান আলেকজান্দ্রভ এই ইন্টিগ্রালকে “কুখ্যাতভাবে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

THOR ফ্রেমওয়ার্ক এই অসাধ্য সাধনের জন্য আধুনিক গণিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি দুটি উন্নত প্রযুক্তি :
* টেনসর নেটওয়ার্ক অ্যালগরিদম
THOR AI উচ্চ-মাত্রার ডেটাকে দক্ষতার সাথে সংকুচিত ও বিশ্লেষণ করার জন্য টেনসর নেটওয়ার্ক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। এটি ইন্টিগ্র্যান্ডের বিশাল ডেটা কিউবকে ছোট, সংযুক্ত উপাদানগুলির একটি শৃঙ্খল হিসেবে উপস্থাপন করে, যা একটি বিশেষ গাণিতিক কৌশল “টেনসর ট্রেন ক্রস ইন্টারপোলেশন” নামে পরিচিত।

ইউএনএম-এর অধ্যাপক ডিমিটার পেতসেভ আবিষ্কার করেন এই নতুন কম্পিউটেশনাল কৌশলটি সরাসরি কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল সমাধানে প্রয়োগ করা যেতে পারে—যা এতদিন পরিসংখ্যানগত মেকানিক্সে অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। টেনসর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, উচ্চ মাত্রার জটিলতা দূর করা সম্ভব হয় এবং সমস্যাটিকে একটি কার্যকর গাণিতিক ফর্মে নিয়ে আসা যায়।

* মেশিন লার্নিং পোটেনশিয়াল
THOR AI সিস্টেমে টেনসর নেটওয়ার্কের সাথে মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক পারমাণবিক মডেল যুক্ত করা হয়েছে। এই মডেলগুলি আন্তঃপারমাণবিক শক্তি এবং আণবিক গতিকে নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করে। এর ফলে সিমুলেশনগুলি বিস্তৃত ভৌত পরিবেশে, যেমন চরম চাপ বা দশান্তর-এর মতো পরিস্থিতিতে পদার্থের আচরণ সঠিকভাবে বুঝতে পারে।

THOR AI-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো এর গতি ও নির্ভুলতা। প্রচলিত সিমুলেশন পদ্ধতির বিপরীতে, THOR AI কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রালকে একটি প্রথম-নীতি গণনা হিসেবে বিবেচনা করে, যা আনুমানিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দূর করে।

গবেষকরা তামা, উচ্চ চাপে ক্রিস্টালাইন আর্গন এবং টিনের সলিড-সলিড দশান্তর গণনা করে এই ফ্রেমওয়ার্কের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন। ফলাফলগুলি ছিল চমকপ্রদ!

THOR AI প্রচলিত লস আলামোস সিমুলেশনগুলোর তুলনায় ৪০০ গুণেরও বেশি দ্রুত একই ফলাফল দিতে সক্ষম হয়েছে। যে গণনা করতে হাজার হাজার ঘণ্টা লাগত, এখন তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হচ্ছে।

টেনসর ট্রেন ক্রস ইন্টারপোলেশনের একটি কাস্টম ভেরিয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ ক্রিস্টাল প্রতিসাম্য সনাক্ত করে এবং সেগুলিকে গণনায় ব্যবহার করে, যার ফলে নির্ভুলতা বজায় থাকে।

লস আলামোসের বিজ্ঞানী ও প্রধান লেখক ডুক ট্রুং এর মতে, এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি “শতাব্দী প্রাচীন সিমুলেশন এবং কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রালের আনুমানিক পদ্ধতিকে প্রথম-নীতি গণনা দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে।”

THOR AI ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জিত এই সাফল্য কেবল একটি গাণিতিক জয় নয়, এটি পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন এবং বস্তু বিজ্ঞানে দ্রুত আবিষ্কারের দুয়ার খুলে দিয়েছে।

এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন চরম চাপ, উচ্চ তাপমাত্রা বা দশান্তরের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে পদার্থের স্থিতিশীলতা, তাপগতিবিদ্যা এবং কার্যক্ষমতা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে অধ্যয়ন করতে পারবেন। ধাতব পদার্থবিদ্যা সহ বিভিন্ন মূল ক্ষেত্রে এর গভীর প্রভাব পড়বে।

THOR AI-এর নির্ভুলতা এখন অন্যান্য চিরায়ত বা আনুমানিক সিমুলেশন পদ্ধতির জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। এই দ্রুত এবং নির্ভুল গণনা ক্ষমতা নতুন উন্নত উপকরণ নকশা ও উৎপাদনে সরাসরি সাহায্য করতে পারে, যেমন—মহাকাশ গবেষণা বা পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত উপাদান।

এই আবিষ্কার প্রমাণ করে , উচ্চ-মাত্রার ডেটা ও জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানে এআই-এর ভূমিকা কতটা মৌলিক হতে পারে। বহু বছর ধরে অসম্ভব বিবেচিত হওয়া একটি চ্যালেঞ্জকে এআই যেভাবে সেকেন্ডের মধ্যে সমাধান করল, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়মাবলী বোঝার পথকে আরও গভীর করবে।

এনসিপিকে ইসির চিঠি – শাপলা নয়, বিকল্প না চাইলে কমিশন নিজেই দেবে প্রতীক

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শাপলা প্রতীকের বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, দলটি যদি ১৯ অক্টোবরের মধ্যে বিকল্প প্রতীকের জন্য আবেদন না করে, তাহলে কমিশন নিজ উদ্যোগে তাদের জন্য নতুন প্রতীক নির্ধারণ করবে।

এ বিষয়ে এনসিপিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইসি সচিব বলেন, “এনসিপিকে নতুন প্রতীক চেয়ে আবেদন করার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। ১৯ অক্টোবরের মধ্যে আবেদন না করলে, কমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতীক বরাদ্দ দেবে। শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই বলেই কমিশন মনে করে।” তিনি আরও জানান, শাপলা ছাড়া নিবন্ধন না নেওয়া হলে সেটা রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসি প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী ২০ অক্টোবর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সচিব বলেন, সরকার এ পর্যন্ত কমিশনকে কোনো তথ্য দেয়নি, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রসঙ্গে তিনি জানান, সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া চলমান। আগামী সপ্তাহে নতুন দলগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

প্রবাসী ভোটারদের বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ১১টি দেশে তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আরও ৮টি দেশে এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ধাপে ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালদ্বীপ ও জর্ডানে কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এর পর বাহরাইন, স্পেনসহ আরও চার দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।

এনসিপি শাপলা প্রতীকের বিকল্প বিষয়ে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে আবেদন না করলে, কমিশনের স্বতঃস্ফূর্ত বরাদ্দই চূড়ান্ত হবে। নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রবাসী ভোটার কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসি দেশজুড়ে নির্বাচনের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

মার্কেজের মাকান্দো থেকে জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়, অনিদ্রার দীর্ঘ রাত ও চিরন্তন নিঃসঙ্গতা

অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া বিশ্বসাহিত্যের এক চিরন্তন ও বহুমাত্রিক থিম। এটি কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, মানুষের মানসিক, দার্শনিক এবং সামাজিক সংকটের গভীর প্রতীক। প্রাচীন মহাকাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক উপন্যাসের জটিল কাঠামো পর্যন্ত, ‘ঘুমহীন রাত’ বারবার লেখক ও পাঠকের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের যাদুবাস্তববাদী উপন্যাসে এটি যেমন ‘প্লেগ’ হয়ে এসেছে, তেমনই আধুনিক লেখকদের কাছে তা হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা বা নিছক অস্তিত্বের শূন্যতা।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কালজয়ী উপন্যাস ‘One Hundred Years of Solitude’-এ অনিদ্রা এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা লাভ করে। মাকোন্দো গ্রামে যে “নিদ্রাহীনতার মহামারী” দেখা দেয়, তা কোনো সাধারণ রোগ নয়, এক যাদুবাস্তববাদী অভিশাপ। এর চরিত্ররা প্রথমে ঘুম না আসায় খুশি হয়; তারা মনে করে, এখন তাদের হাতে কাজ করার জন্য আরও বেশি সময় থাকবে। কিন্তু শীঘ্রই তারা আবিষ্কার করে, ঘুম না আসাটা মূল সমস্যা নয়।

উপন্যাসে ভারতীয় রমণী ভিজিটাসিওন বুয়েন্দিয়া পরিবারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অনিদ্রার অনিবার্য পরিণতি হলো স্মৃতিশক্তির বিলোপ। চরিত্ররা রাত জাগতে অভ্যস্ত হয়ে যখন স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়, তখন তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অতীত, পরিচিতি, এমনকি নিত্যব্যবহার্য জিনিসের নাম পর্যন্ত ভুলে যেতে শুরু করে। হোসে আরকাডিও বুয়েন্দিয়া তখন প্রতিটি বস্তুকে লেবেল করে, যেমন—’টেবিল’, ‘চেয়ার’, ‘গরু’—কিন্তু তারা জানে একদিন তারা অক্ষরগুলোও ভুলে যাবে। মার্কেজ এখানে অনিদ্রার মাধ্যমে কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ার গভীর আতঙ্ককে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনিদ্রা এখানে এক জাতীয় ট্র্যাজেডির রূপক, যা একটি পুরো সভ্যতাকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

বিশ শতকের আধুনিকতাবাদী লেখকদের কাছে অনিদ্রা একটি ব্যক্তিগত ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে উঠে এসেছে, যা মানসিকতাকে দিনের আলোর বাস্তবতা থেকে রাতের আঁধারের গভীরে নিয়ে যায়।

ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্ত দীর্ঘকাল ধরে অনিদ্রায় ভুগেছিলেন। তার সুবিশাল উপন্যাস ”In Search of Lost Time’ শুরুই হয় ঘুমানোর এবং রাতে জেগে ওঠার বর্ণনা দিয়ে। প্রুস্তের কাছে ঘুম ও জাগরণের মাঝের সেই ‘সন্ধিক্ষণ’ বা ‘Hypnagogic state’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় যখন চেতনা সম্পূর্ণভাবে জাগ্রত থাকে না, তখন ‘অনিচ্ছাকৃত স্মৃতি’ জেগে ওঠে, যা জীবনের সারসত্যকে উন্মোচিত করে। অনিদ্রা প্রুস্তের জন্য ছিল এক সময়ের ভেতরের সময়, যা মনকে গভীরতম আত্ম-অনুসন্ধানে ডুব দিতে সাহায্য করে। ঘুমের অভাব তার শিল্পকর্মের কাঠামোরই একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

রুশ-আমেরিকান লেখক ভ্লাদিমির নাবোকভ ছিলেন আরেকজন ক্রনিক ইনসমনিয়াক। তিনি ঘুমকে ‘সময় নষ্ট’ বা ‘উত্‍পাদনশীলতার পথে বাধা’ মনে করতেন, যা তার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে থামিয়ে দেয়। নাবোকভের কাছে অনিদ্রা ছিল এক ধরণের মানসিক শৌর্য বা তীব্র সৃজনশীলতার ফল। তাঁর উপন্যাস ‘লোলিতা’-তে হামবার্ট হামবার্টের অনিদ্রা তার চারিত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব বর্ণনা তৈরির একটি মোটিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা দেখায় কীভাবে জাগ্রত চেতনা দিয়ে সে নিজের অসৎ কাজকে যৌক্তিকতা দেয়। তিনি এমনকি স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে যে স্বপ্ন ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা হতে পারে, যেখানে সময় হয়তো বিপরীত দিকেও প্রবাহিত হয়।

উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে অনিদ্রা প্রায়শই আধুনিক জীবনের উদ্বেগ, বিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের কঠোর কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির ছোটগল্প ‘ঘুম’-এর প্রধান চরিত্র একজন মধ্যবিত্ত গৃহিণী, যিনি হঠাৎ করেই টানা সতেরো দিন ঘুমহীন কাটান। আশ্চর্যজনকভাবে এই অনিদ্রা তাকে ক্লান্ত করার পরিবর্তে এক ধরণের বিপ্লবী মুক্তি এনে দেয়। দিনের বেলায় তিনি বাধ্যগতভাবে সংসার সামলান, কিন্তু রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, তখন তিনি নিঃশব্দে ওয়াইন পান করেন, চকোলেট খান এবং আন্না কারেনিনা পড়েন। এই গোপন রাত জাগা তার চাপা পড়া আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতার প্রতীক। অনিদ্রা তাকে অভ্যস্ত জীবন থেকে ‘জাগ্রত’ হওয়ার সুযোগ দেয়। মুরাকামি দেখান যে কীভাবে আধুনিক শহুরে জীবনে, যেখানে সবাই নিজেদের কাজে মগ্ন, সেখানে একজন মানুষ টানা সতেরো দিন না ঘুমালেও কেউ খেয়াল করে না। এই অনিদ্রা তার গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের শূন্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

সাহিত্য কেবল সৃজনশীলতার ক্ষেত্র হিসেবে অনিদ্রাকে দেখেনি, এটিকে গভীর মানসিক যন্ত্রণা, অপরাধবোধ এবং অস্তিত্বের অর্থহীনতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করেছে। কাফকা ছিলেন একজন ইনসমনিয়াক এবং তাঁর লেখায় অনিদ্রা প্রায়শই এক অসহনীয় উদ্বেগ এবং মানসিক পীড়নের ফল হিসেবে আসে। কাফকা মনে করতেন, তাঁর লেখালেখিই তাঁর ঘুম কেড়ে নেয়, কারণ এটি তাঁর মনকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল করে তোলে। তাঁর কাছে রাত জাগা মানে দৃশ্যমান জগতের প্রতিরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিজের ভেতরের ‘অন্ধকার’-এর কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া।

ফিওদর দস্তয়ভস্কির উপন্যাসগুলিতে অনিদ্রা চরিত্রের অপরাধবোধ ও নৈতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাসকোলনিকভ হত্যার পর দীর্ঘ অনিদ্রায় ভোগে। এই ঘুমহীন রাতগুলো তার অপরাধের স্বীকারোক্তি বা মনস্তাত্ত্বিক বিচারের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলা সাহিত্যেও অনিদ্রা একাধিকবার এসেছে নানা অর্থে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা “ঘুম” ও “নিশীথে” ঘুমহীন রাতকে রূপ দিয়েছে আত্মসংলাপের সময়ে। জীবনানন্দ দাশের “রাতের কুকুর” বা “আট বছর আগের একদিন”-এর মতো কবিতায় নিদ্রাহীনতা একাকীত্বের প্রতিধ্বনি।

বিশ্বসাহিত্যে অনিদ্রা তাই ঘুম ব্যাধি নয় এটি এক শক্তির উৎস এবং একইসাথে বেদনার চিহ্ন। এটি মানুষের মনকে অপ্রতিরোধ্য কল্পনা, গভীরতম আত্ম-বিবেচনা বা অনিবার্য ধ্বংসের দিকে চালিত করে। ঘুমহীন রাত কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং তা মানব অস্তিত্বের গভীরতম সত্যের সন্ধান।

বিবিএস জরিপ – দেশে প্রতি দুই নারীর একজন স্বামীর সহিংসতার শিকার

বাংলাদেশে প্রতি দুইজন নারীর মধ্যে একজন স্বামীর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সদ্য প্রকাশিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ–২০২৪’-এ উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন—যার মধ্যে শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ অন্তর্ভুক্ত। শুধু গত এক বছরে ৪৯ শতাংশ নারী এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সোমবার (১৩ অক্টোবর) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিবিএস। ‘জিওস্পেশিয়াল ইনফরমেশন ইন্টিগ্রেটিং উইথ জেন্ডার অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রকল্পের পরিচালক মীনাক্ষী বিশ্বাস অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫ বছর বয়স থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ শতাংশ নারী স্বামী ছাড়া অন্য ব্যক্তির হাতে শারীরিক সহিংসতা ও ২ দশমিক ২ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে কিছুটা অগ্রগতি হলেও ২০১৫ সালে স্বামী কর্তৃক সহিংসতার হার ছিল ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে। তবে সহিংসতা প্রতিরোধে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যয় এবং সামাজিক বাধা এখনো বড় প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের ৫৪ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬০ শতাংশ গত এক বছরে একাধিকবার সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। গর্ভাবস্থাতেও নারীরা নিরাপদ নন—বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ শারীরিক ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

নন-পার্টনার সহিংসতার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে প্রধানত শাশুড়ি ও পুরুষ আত্মীয়রা জড়িত। যৌন সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে পরিচিত পুরুষদের মাধ্যমে—যেমন আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশী। প্রযুক্তি-সহায়ক সহিংসতাও দ্রুত বাড়ছে। জরিপে দেখা যায়, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ডিজিটাল মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে ছবি অপব্যবহার, যৌন ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তিনজনের মধ্যে দুইজন ভুক্তভোগী কখনোই সহিংসতার কথা প্রকাশ করেননি বা সাহায্য চাননি। মাত্র ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে এই হার আরও কম, মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

এছাড়া ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী জানেন না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। মাত্র ১২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী সহিংসতা প্রতিরোধ হেল্পলাইন ‘১০৯’ সম্পর্কে অবগত।

বিবিএস জানায়, কম বয়সে বিয়ে, যৌতুক প্রথা, স্বামীর মাদকাসক্তি বা পরকীয়া এবং শহরের বস্তিতে বসবাস নারীর সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে স্বামীর উচ্চতর শিক্ষা সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে নারীর কম বয়স, সীমিত শিক্ষা ও প্রতিবন্ধিতা বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় কেন অংশ নিচ্ছে না ইরান?

পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি হিসেবে খ্যাত পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী ইরান মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার দীর্ঘদিনের বাসনা পোষণ করে আসছে। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের বিদেশনীতি বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী হয়। খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এই দেশটি বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।

সম্প্রতি মিশরে লোহিত সাগরের তীরে শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গাজা শান্তি সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কেউই সেখানে যোগ দিতে যাচ্ছেন না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, “আমরা সেই নেতাদের সামনে দাঁড়াতে চাই না যারা ইরানের জনগণের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে,” যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিতবাহী। তবু তিনি উল্লেখ করেন, ইরান গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় কাজ চালাবে।

ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ইতিহাসে বহুবার সুপরিচিত। ১৯৮০-এর দশকে ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহ গড়ে তোলে, যা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১৯৯০-এর দশকে ইরান প্রতিবেশী ইরাকে শিয়াপ্রধান সম্প্রদায়ের প্রতি প্রভাব বিস্তার করে। ২০০০-এর দশকে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের জন্যও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

২০১০-এর দশকে আরব বসন্ত ইরানের প্রভাবকে আরও জোরালো করে। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসার সময় ইরানকে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে দেখেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সশস্ত্র অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়। ইরান প্রকাশ্যে হামাসকে সমর্থন জানায়, ফলে ইরানবিরোধী সরকারগুলো হিজবুল্লাহ ও হামাসকে ‘ইরানের হাত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

ইরানের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র চরম অভিযান চালায়। তেল আবিব ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টা জোরালো হয়। এই পরিস্থিতিতে শার্ম আল-শেখে সম্মেলনে ইরানের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে তার গুরুত্বহীন হওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নিপ্রধান রিয়াদ, দোহা ও আঙ্কারা। এরা বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে, তবে সব দেশই শিয়াপ্রধান ইরানকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে আন্তর্জাতিকভাবে তার অবস্থান আরও দুর্বল হয়।

ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার ও মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার বাসনা বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তার গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শার্ম আল-শেখে সম্মেলনে অনুপস্থিতি ইরানের অবস্থান ও প্রভাবের সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব এখন সঙ্কটময় পর্যায়ে রয়েছে।

যে কৌশলে মঙ্গোলদের চীন শাসনের স্বপ্ন সত্যি হয়েছিলো

চেঙ্গিস খান যাঁর হাতে ১২০৬ সালে মঙ্গোল উপজাতিরা একতাবদ্ধ হয়েছিল, তাঁর স্বপ্ন ছিল গোটা চীনকে মঙ্গোল শাসনের অধীনে আনা। তিনি উত্তর চীনের জিন রাজবংশের অনেকটাই জয় করেছিলেন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরই সুযোগ্য পৌত্র কুবলাই খান। কুবলাই খান শুধু চীন জয়ই করেননি, সেখানে ইউয়ান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে চীনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন। এ

চেঙ্গিস খান ১২২৭ সালে যখন মারা যান, মঙ্গোল সাম্রাজ্য ততদিনে উত্তর চীন ও মধ্য এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চল গ্রাস করেছে। ‘খান’ বা ‘খাগান’ উপাধিটি তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আসে। কুবলাই খান ছিলেন চেঙ্গিসের চতুর্থ পুত্র তোলুইয়ের সন্তান।

১২৫৯ সালে চতুর্থ খাগান মোংকে খানের মৃত্যুর পর, কুবলাইয়ের সামনে উত্তরাধিকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ আসে। তাঁর আরেক ভাই আরিগবোকে নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কুবলাই কেবল সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক বৈধতা অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। মঙ্গোল প্রথার পরিবর্তে তিনি প্রাচীন চীনা প্রথা ‘আই চিং’ বা ভাগ্য গণনার মাধ্যমে নিজের দাবিকে মজবুত করেন। এটি ছিল তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনার প্রথম প্রতীক, যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কেবল একজন মঙ্গোল সেনাপতি নন, একজন চীনা শাসক হতে চলেছেন। এই কৌশল তাঁকে ক্ষমতা নিতে সাহায্য করে এবং চার বছর পর আরিগবোকে পরাজিত হলে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন স্থল সাম্রাজ্যের একক শাসক হন।

কুবলাই খানের সাফল্যের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিলেন তাঁর মা সরঘাঘতানি এবং স্ত্রী চাবি। তোলুইয়ের স্ত্রী সরঘাঘতানি ছিলেন একজন পূর্ব খ্রিস্টান এবং রাজবংশীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে কুবলাই যেন কেবল মঙ্গোল ঐতিহ্যই নয়, চীনা ঐতিহ্য, বৌদ্ধধর্ম ও তাওবাদের ভিত্তি সম্পর্কেও শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর এই বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষা কুবলাইকে শিখিয়েছিল বিজিত অঞ্চলের ঐতিহ্য ও ধর্মকে কীভাবে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। এই শিক্ষা তাঁকে পরবর্তীতে চীন শাসন করার জন্য অপরিহার্য কূটনৈতিক দক্ষতা যুগিয়েছিল।

মঙ্গোল সমাজে নারীরা অপেক্ষাকৃত উচ্চ সামাজিক মর্যাদা উপভোগ করতেন। কুবলাইয়ের স্ত্রী চাবি ছিলেন বুদ্ধিমত্তা ও মুক্তমনের অধিকারী। তিনি চীনা ও মঙ্গোল সংস্কৃতির মধ্যে সাবলীলভাবে চলতে পারতেন, যা কুবলাইকে তাঁর জটিল শাসনকাজে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। কুবলাই ও চাবি ছিলেন এক ক্ষমতাধর জুটি, যা তাঁর সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি ছিল।

কুবলাই খান ১২৬০ সালে খাগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১২৬৭ সাল থেকে দক্ষিণ চীনের সুং রাজবংশের (Southern Song dynasty) বিরুদ্ধে পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই সুং সাম্রাজ্য ছিল প্রায় ৫ কোটি জনবসতির অধিকারী এবং উদ্ভাবনী সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ—যা ইউরোপে মুদ্রণ প্রযুক্তি পৌঁছানোর অনেক আগেই চলনশীল টাইপের প্রথম পরীক্ষা চালিয়েছিল।

সুংদের বিরুদ্ধে জয়লাভ চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের জন্য দীর্ঘদিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। সুংদের সামরিক কমান্ডাররা ছিলেন দক্ষ, তাদের ছিল বারুদ এবং উন্নত ইঞ্জিন সহ চমৎকার সামরিক সরঞ্জাম। কুবলাই বুঝতে পারেন, খোলা মাঠে দ্রুত মঙ্গোল অশ্বারোহী হামলার কৌশল এখানে কার্যকর হবে না। তাই তিনি কৌশল পরিবর্তন করেন!

সুং বাহিনী তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দুর্গম অবস্থানে আশ্রয় নেয়। ফলে কুবলাইকে দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য অবরোধের কৌশল নিতে হয়। তিনি উপকূলীয় আক্রমণ শুরু করেন, যা ছিল তাঁর মতো স্তেপস-সংস্কৃতির কমান্ডারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কৌশলে শত্রুর সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করাই ছিল উদ্দেশ্য।

মঙ্গোলদের অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ, ১২৭৩ সালে সুংদের অত্যন্ত সুরক্ষিত শিয়াংইয়াং শহরের পতন হয়। এরপর ধীরে ধীরে সুং রাজ্যের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। অবশেষে ১২৭৯ সালে সুং রাজবংশের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং কয়েক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো চীন ঐক্যবদ্ধ হয়। কুবলাই খানের হাতেই চেঙ্গিস খানের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।

সুং রাজ্য জয় করার সাথে সাথেই কুবলাই খান নিজেকে নতুন চীনা রাজবংশের সম্রাট ঘোষণা করেন। ১২৭১ সালে তিনি ইউয়ান, যার অর্থ “মহান উৎস” বা “Great Origin,” রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।

সুদীর্ঘ শাসন ধরে রাখার জন্য তিনি তাঁর বহুমুখী শিক্ষার জ্ঞান কাজে লাগান এবং চীনা সংস্কৃতিকে ধারণ করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তিনি চীনা পোশাক ও রীতিনীতি গ্রহণ করেন এবং চীনা পদ্ধতির প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে তাঁর সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।

তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা লিউ বিংঝং-এর পরামর্শে মঙ্গোল রাজধানী কারাকোরাম থেকে সাংডুতে এবং পরবর্তীতে চীনা ভূখণ্ডের কেন্দ্রে বর্তমান বেইজিং- এ স্থানান্তরিত করেন। তবে কুবলাইয়ের এই চীনা-কেন্দ্রিক শাসন কাঠামোয় একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল। ইউয়ান সমাজে জাতিভিত্তিক একটি কঠোর স্তরবিন্যাস ছিল, শীর্ষে ছিল মঙ্গোলরা, তারপরে মধ্য এশীয়রা এবং সব শেষে ছিল চীনারা। কুবলাই কিছু চীনা উপদেষ্টাকে কাজে লাগালেও কিন্তু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা বাতিল করার ফলে চীনা পণ্ডিত ও অভিজাতরা সরকারের শীর্ষ পদ থেকে বঞ্চিত হন।অন্যদিকে মঙ্গোল অভিজাতরা কুবলাইয়ের ক্রমবর্ধমান চীনা রীতিনীতি গ্রহণে বিরক্ত ছিলেন।

কুবলাই খান তাঁর দাদা চেঙ্গিস খানের স্বপ্নকে চূড়ান্তভাবে পূর্ণ করে চীনে ইউয়ান রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১২৯৪ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়, তিনি এমন একটি সাম্রাজ্য রেখে যান যা ছিল অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ। তাঁর এই বিজয় ছিল সামরিক দক্ষতা, বহুজাতিক প্রজ্ঞা এবং কঠোর অধ্যবসায়ের ফসল।

তবে, মঙ্গোল অভিজাত এবং বিজিত চীনা প্রজাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা তাঁর উত্তরাধিকারের দুর্বল দিক হয়ে ওঠে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই ছিল ইউয়ান শাসনের অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ, যার ফলে কুবলাইয়ের মৃত্যুর এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কুবলাই খান ইতিহাসে চীনের শ্রেষ্ঠ একীভূতকারী হিসাবেই অমর হয়ে আছেন।