মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় কেন অংশ নিচ্ছে না ইরান?

পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি হিসেবে খ্যাত পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী ইরান মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার দীর্ঘদিনের বাসনা পোষণ করে আসছে। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের বিদেশনীতি বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী হয়। খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এই দেশটি বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।

সম্প্রতি মিশরে লোহিত সাগরের তীরে শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গাজা শান্তি সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কেউই সেখানে যোগ দিতে যাচ্ছেন না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, “আমরা সেই নেতাদের সামনে দাঁড়াতে চাই না যারা ইরানের জনগণের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে,” যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিতবাহী। তবু তিনি উল্লেখ করেন, ইরান গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় কাজ চালাবে।

ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ইতিহাসে বহুবার সুপরিচিত। ১৯৮০-এর দশকে ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহ গড়ে তোলে, যা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১৯৯০-এর দশকে ইরান প্রতিবেশী ইরাকে শিয়াপ্রধান সম্প্রদায়ের প্রতি প্রভাব বিস্তার করে। ২০০০-এর দশকে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের জন্যও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

২০১০-এর দশকে আরব বসন্ত ইরানের প্রভাবকে আরও জোরালো করে। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসার সময় ইরানকে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে দেখেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সশস্ত্র অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়। ইরান প্রকাশ্যে হামাসকে সমর্থন জানায়, ফলে ইরানবিরোধী সরকারগুলো হিজবুল্লাহ ও হামাসকে ‘ইরানের হাত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

ইরানের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র চরম অভিযান চালায়। তেল আবিব ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টা জোরালো হয়। এই পরিস্থিতিতে শার্ম আল-শেখে সম্মেলনে ইরানের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে তার গুরুত্বহীন হওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নিপ্রধান রিয়াদ, দোহা ও আঙ্কারা। এরা বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে, তবে সব দেশই শিয়াপ্রধান ইরানকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে আন্তর্জাতিকভাবে তার অবস্থান আরও দুর্বল হয়।

ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার ও মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার বাসনা বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তার গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শার্ম আল-শেখে সম্মেলনে অনুপস্থিতি ইরানের অবস্থান ও প্রভাবের সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব এখন সঙ্কটময় পর্যায়ে রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন