বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে AI প্রতি মুহূর্তে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। সম্প্রতি নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয় এবং লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষকদের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার সেই যাত্রায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। তাঁরা এমন একটি উন্নত কম্পিউটেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছেন, যা পরিসংখ্যানগত পদার্থবিজ্ঞানীদের বহু দশক ধরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া একটি দুরূহ সমস্যা— কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল (Configurational Integral) সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। THOR (Tensors for High-dimensional Object Representation) নামক এই এআই সিস্টেমটি সেকেন্ডের মধ্যে এমন জটিল সমীকরণ সমাধান করে দিচ্ছে, যা চিরায়ত সিমুলেশন পদ্ধতিতে সমাধান করতে শতাব্দীর পর শতাব্দী সময় লাগার কথা।
পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পদার্থের আচরণ, বিশেষ করে তাপমাত্রা ও যান্ত্রিক পরিস্থিতিতে কোনো বস্তুর ধর্ম কেমন হবে, তা বোঝার জন্য কিছু মৌলিক সমীকরণ অপরিহার্য। এই সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল, যা পদার্থের কণাগুলির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে ধারণ করে।
বিজ্ঞানীরা এই ইন্টিগ্রাল সরাসরি সমাধান করতে পারেননি। এর প্রধান কারণ হলো “মাত্রার অভিশাপ”! যখন একটি সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত চলকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন গণনার জটিলতা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। পদার্থের আচরণ নির্ধারণের জন্য এই ইন্টিগ্রাল প্রায়শই হাজার হাজার মাত্রা জড়িত থাকে। চিরায়ত ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে এত বিশাল মাত্রার সমস্যা সমাধান করতে পৃথিবীর দ্রুততম সুপারকম্পিউটারেরও মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি সময় লেগে যেত।
এই অসম্ভব চ্যালেঞ্জের কারণে বিজ্ঞানীরা এতদিন মলিকুলার ডাইনামিক্স বা মন্টে কার্লো সিমুলেশনের মতো আনুমানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করতেন। এই পদ্ধতিগুলি কেবল আণবিক গতিকে পরোক্ষভাবে অনুকরণ করে একটি দীর্ঘ সময় ধরে ফলাফল অনুমান করত, যা প্রায়শই সপ্তাহব্যাপী নিবিড় প্রক্রিয়াকরণের পরও সীমিত নির্ভুলতা দিত। লস আলামোস-এর সিনিয়র এআই বিজ্ঞানী বোইয়ান আলেকজান্দ্রভ এই ইন্টিগ্রালকে “কুখ্যাতভাবে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
THOR ফ্রেমওয়ার্ক এই অসাধ্য সাধনের জন্য আধুনিক গণিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি দুটি উন্নত প্রযুক্তি :
* টেনসর নেটওয়ার্ক অ্যালগরিদম
THOR AI উচ্চ-মাত্রার ডেটাকে দক্ষতার সাথে সংকুচিত ও বিশ্লেষণ করার জন্য টেনসর নেটওয়ার্ক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। এটি ইন্টিগ্র্যান্ডের বিশাল ডেটা কিউবকে ছোট, সংযুক্ত উপাদানগুলির একটি শৃঙ্খল হিসেবে উপস্থাপন করে, যা একটি বিশেষ গাণিতিক কৌশল “টেনসর ট্রেন ক্রস ইন্টারপোলেশন” নামে পরিচিত।
ইউএনএম-এর অধ্যাপক ডিমিটার পেতসেভ আবিষ্কার করেন এই নতুন কম্পিউটেশনাল কৌশলটি সরাসরি কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রাল সমাধানে প্রয়োগ করা যেতে পারে—যা এতদিন পরিসংখ্যানগত মেকানিক্সে অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। টেনসর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, উচ্চ মাত্রার জটিলতা দূর করা সম্ভব হয় এবং সমস্যাটিকে একটি কার্যকর গাণিতিক ফর্মে নিয়ে আসা যায়।
* মেশিন লার্নিং পোটেনশিয়াল
THOR AI সিস্টেমে টেনসর নেটওয়ার্কের সাথে মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক পারমাণবিক মডেল যুক্ত করা হয়েছে। এই মডেলগুলি আন্তঃপারমাণবিক শক্তি এবং আণবিক গতিকে নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করে। এর ফলে সিমুলেশনগুলি বিস্তৃত ভৌত পরিবেশে, যেমন চরম চাপ বা দশান্তর-এর মতো পরিস্থিতিতে পদার্থের আচরণ সঠিকভাবে বুঝতে পারে।
THOR AI-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো এর গতি ও নির্ভুলতা। প্রচলিত সিমুলেশন পদ্ধতির বিপরীতে, THOR AI কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রালকে একটি প্রথম-নীতি গণনা হিসেবে বিবেচনা করে, যা আনুমানিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দূর করে।
গবেষকরা তামা, উচ্চ চাপে ক্রিস্টালাইন আর্গন এবং টিনের সলিড-সলিড দশান্তর গণনা করে এই ফ্রেমওয়ার্কের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন। ফলাফলগুলি ছিল চমকপ্রদ!
THOR AI প্রচলিত লস আলামোস সিমুলেশনগুলোর তুলনায় ৪০০ গুণেরও বেশি দ্রুত একই ফলাফল দিতে সক্ষম হয়েছে। যে গণনা করতে হাজার হাজার ঘণ্টা লাগত, এখন তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হচ্ছে।
টেনসর ট্রেন ক্রস ইন্টারপোলেশনের একটি কাস্টম ভেরিয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ ক্রিস্টাল প্রতিসাম্য সনাক্ত করে এবং সেগুলিকে গণনায় ব্যবহার করে, যার ফলে নির্ভুলতা বজায় থাকে।
লস আলামোসের বিজ্ঞানী ও প্রধান লেখক ডুক ট্রুং এর মতে, এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি “শতাব্দী প্রাচীন সিমুলেশন এবং কনফিগারেশনাল ইন্টিগ্রালের আনুমানিক পদ্ধতিকে প্রথম-নীতি গণনা দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে।”
THOR AI ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জিত এই সাফল্য কেবল একটি গাণিতিক জয় নয়, এটি পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন এবং বস্তু বিজ্ঞানে দ্রুত আবিষ্কারের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন চরম চাপ, উচ্চ তাপমাত্রা বা দশান্তরের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে পদার্থের স্থিতিশীলতা, তাপগতিবিদ্যা এবং কার্যক্ষমতা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে অধ্যয়ন করতে পারবেন। ধাতব পদার্থবিদ্যা সহ বিভিন্ন মূল ক্ষেত্রে এর গভীর প্রভাব পড়বে।
THOR AI-এর নির্ভুলতা এখন অন্যান্য চিরায়ত বা আনুমানিক সিমুলেশন পদ্ধতির জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। এই দ্রুত এবং নির্ভুল গণনা ক্ষমতা নতুন উন্নত উপকরণ নকশা ও উৎপাদনে সরাসরি সাহায্য করতে পারে, যেমন—মহাকাশ গবেষণা বা পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত উপাদান।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে , উচ্চ-মাত্রার ডেটা ও জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানে এআই-এর ভূমিকা কতটা মৌলিক হতে পারে। বহু বছর ধরে অসম্ভব বিবেচিত হওয়া একটি চ্যালেঞ্জকে এআই যেভাবে সেকেন্ডের মধ্যে সমাধান করল, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়মাবলী বোঝার পথকে আরও গভীর করবে।


