চেঙ্গিস খান যাঁর হাতে ১২০৬ সালে মঙ্গোল উপজাতিরা একতাবদ্ধ হয়েছিল, তাঁর স্বপ্ন ছিল গোটা চীনকে মঙ্গোল শাসনের অধীনে আনা। তিনি উত্তর চীনের জিন রাজবংশের অনেকটাই জয় করেছিলেন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরই সুযোগ্য পৌত্র কুবলাই খান। কুবলাই খান শুধু চীন জয়ই করেননি, সেখানে ইউয়ান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে চীনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন। এ
চেঙ্গিস খান ১২২৭ সালে যখন মারা যান, মঙ্গোল সাম্রাজ্য ততদিনে উত্তর চীন ও মধ্য এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চল গ্রাস করেছে। ‘খান’ বা ‘খাগান’ উপাধিটি তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আসে। কুবলাই খান ছিলেন চেঙ্গিসের চতুর্থ পুত্র তোলুইয়ের সন্তান।
১২৫৯ সালে চতুর্থ খাগান মোংকে খানের মৃত্যুর পর, কুবলাইয়ের সামনে উত্তরাধিকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ আসে। তাঁর আরেক ভাই আরিগবোকে নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কুবলাই কেবল সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক বৈধতা অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। মঙ্গোল প্রথার পরিবর্তে তিনি প্রাচীন চীনা প্রথা ‘আই চিং’ বা ভাগ্য গণনার মাধ্যমে নিজের দাবিকে মজবুত করেন। এটি ছিল তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনার প্রথম প্রতীক, যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কেবল একজন মঙ্গোল সেনাপতি নন, একজন চীনা শাসক হতে চলেছেন। এই কৌশল তাঁকে ক্ষমতা নিতে সাহায্য করে এবং চার বছর পর আরিগবোকে পরাজিত হলে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন স্থল সাম্রাজ্যের একক শাসক হন।
কুবলাই খানের সাফল্যের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিলেন তাঁর মা সরঘাঘতানি এবং স্ত্রী চাবি। তোলুইয়ের স্ত্রী সরঘাঘতানি ছিলেন একজন পূর্ব খ্রিস্টান এবং রাজবংশীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে কুবলাই যেন কেবল মঙ্গোল ঐতিহ্যই নয়, চীনা ঐতিহ্য, বৌদ্ধধর্ম ও তাওবাদের ভিত্তি সম্পর্কেও শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর এই বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষা কুবলাইকে শিখিয়েছিল বিজিত অঞ্চলের ঐতিহ্য ও ধর্মকে কীভাবে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। এই শিক্ষা তাঁকে পরবর্তীতে চীন শাসন করার জন্য অপরিহার্য কূটনৈতিক দক্ষতা যুগিয়েছিল।
মঙ্গোল সমাজে নারীরা অপেক্ষাকৃত উচ্চ সামাজিক মর্যাদা উপভোগ করতেন। কুবলাইয়ের স্ত্রী চাবি ছিলেন বুদ্ধিমত্তা ও মুক্তমনের অধিকারী। তিনি চীনা ও মঙ্গোল সংস্কৃতির মধ্যে সাবলীলভাবে চলতে পারতেন, যা কুবলাইকে তাঁর জটিল শাসনকাজে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। কুবলাই ও চাবি ছিলেন এক ক্ষমতাধর জুটি, যা তাঁর সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি ছিল।
কুবলাই খান ১২৬০ সালে খাগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১২৬৭ সাল থেকে দক্ষিণ চীনের সুং রাজবংশের (Southern Song dynasty) বিরুদ্ধে পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই সুং সাম্রাজ্য ছিল প্রায় ৫ কোটি জনবসতির অধিকারী এবং উদ্ভাবনী সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ—যা ইউরোপে মুদ্রণ প্রযুক্তি পৌঁছানোর অনেক আগেই চলনশীল টাইপের প্রথম পরীক্ষা চালিয়েছিল।
সুংদের বিরুদ্ধে জয়লাভ চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের জন্য দীর্ঘদিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। সুংদের সামরিক কমান্ডাররা ছিলেন দক্ষ, তাদের ছিল বারুদ এবং উন্নত ইঞ্জিন সহ চমৎকার সামরিক সরঞ্জাম। কুবলাই বুঝতে পারেন, খোলা মাঠে দ্রুত মঙ্গোল অশ্বারোহী হামলার কৌশল এখানে কার্যকর হবে না। তাই তিনি কৌশল পরিবর্তন করেন!
সুং বাহিনী তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দুর্গম অবস্থানে আশ্রয় নেয়। ফলে কুবলাইকে দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য অবরোধের কৌশল নিতে হয়। তিনি উপকূলীয় আক্রমণ শুরু করেন, যা ছিল তাঁর মতো স্তেপস-সংস্কৃতির কমান্ডারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কৌশলে শত্রুর সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করাই ছিল উদ্দেশ্য।
মঙ্গোলদের অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ, ১২৭৩ সালে সুংদের অত্যন্ত সুরক্ষিত শিয়াংইয়াং শহরের পতন হয়। এরপর ধীরে ধীরে সুং রাজ্যের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। অবশেষে ১২৭৯ সালে সুং রাজবংশের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং কয়েক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো চীন ঐক্যবদ্ধ হয়। কুবলাই খানের হাতেই চেঙ্গিস খানের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।
সুং রাজ্য জয় করার সাথে সাথেই কুবলাই খান নিজেকে নতুন চীনা রাজবংশের সম্রাট ঘোষণা করেন। ১২৭১ সালে তিনি ইউয়ান, যার অর্থ “মহান উৎস” বা “Great Origin,” রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
সুদীর্ঘ শাসন ধরে রাখার জন্য তিনি তাঁর বহুমুখী শিক্ষার জ্ঞান কাজে লাগান এবং চীনা সংস্কৃতিকে ধারণ করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তিনি চীনা পোশাক ও রীতিনীতি গ্রহণ করেন এবং চীনা পদ্ধতির প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে তাঁর সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।
তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা লিউ বিংঝং-এর পরামর্শে মঙ্গোল রাজধানী কারাকোরাম থেকে সাংডুতে এবং পরবর্তীতে চীনা ভূখণ্ডের কেন্দ্রে বর্তমান বেইজিং- এ স্থানান্তরিত করেন। তবে কুবলাইয়ের এই চীনা-কেন্দ্রিক শাসন কাঠামোয় একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ছিল। ইউয়ান সমাজে জাতিভিত্তিক একটি কঠোর স্তরবিন্যাস ছিল, শীর্ষে ছিল মঙ্গোলরা, তারপরে মধ্য এশীয়রা এবং সব শেষে ছিল চীনারা। কুবলাই কিছু চীনা উপদেষ্টাকে কাজে লাগালেও কিন্তু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা বাতিল করার ফলে চীনা পণ্ডিত ও অভিজাতরা সরকারের শীর্ষ পদ থেকে বঞ্চিত হন।অন্যদিকে মঙ্গোল অভিজাতরা কুবলাইয়ের ক্রমবর্ধমান চীনা রীতিনীতি গ্রহণে বিরক্ত ছিলেন।
কুবলাই খান তাঁর দাদা চেঙ্গিস খানের স্বপ্নকে চূড়ান্তভাবে পূর্ণ করে চীনে ইউয়ান রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১২৯৪ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়, তিনি এমন একটি সাম্রাজ্য রেখে যান যা ছিল অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ। তাঁর এই বিজয় ছিল সামরিক দক্ষতা, বহুজাতিক প্রজ্ঞা এবং কঠোর অধ্যবসায়ের ফসল।
তবে, মঙ্গোল অভিজাত এবং বিজিত চীনা প্রজাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা তাঁর উত্তরাধিকারের দুর্বল দিক হয়ে ওঠে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই ছিল ইউয়ান শাসনের অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ, যার ফলে কুবলাইয়ের মৃত্যুর এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কুবলাই খান ইতিহাসে চীনের শ্রেষ্ঠ একীভূতকারী হিসাবেই অমর হয়ে আছেন।


