Home Blog Page 9

বাবি ইয়ার গণহত্যা – যে ট্র্যাজেডিকে চাপা দিতে চেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু তারিখ থাকে, যা কেবল সংখ্যা নয়, মানবজাতির অসীম বর্বরতা ও গভীর বেদনার প্রতীক। ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১ সাল এমনই একটি তারিখ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা ‘বাবি ইয়ার’-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইউক্রেনের কিয়েভ শহরের কাছে অবস্থিত এই গভীর উপত্যকাটি সাক্ষী হয়েছিল নাৎসি জার্মানির হাতে মাত্র দুই দিনে ৩৩,৭৭১ জন নিরীহ ইহুদি মানুষের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের। বাবি ইয়ার অর্থ ইউক্রেনীয় ভাষায় ‘বৃদ্ধার খাদ’, পরিণত হয়েছিল ইউরোপীয় ইহুদিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হলোকাস্টের এক অন্যতম প্রতীকী বধ্যভূমিতে।

বাবি ইয়ার গণহত্যার শিকড় প্রোথিত ছিল নাৎসি জার্মানির পূর্ব ইউরোপ দখলের সামরিক ও আদর্শগত পরিকল্পনার গভীরে। ১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি তার পূর্ব ইউরোপীয় মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে ‘অপারেশন বারবারোসা’ শুরু করে। এই আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির জন্য ‘লেবেনসরাউম’ দখল করা এবং বলশেভিক-ইহুদিবাদকে নির্মূল করা। নাৎসি মতাদর্শ অনুসারে, কমিউনিজম ছিল ইহুদিদের সৃষ্ট একটি মতবাদ যা জার্মান জাতিকে ধ্বংস করতে চায়।

জার্মান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে আইন্সাজগ্রুপেন—এসএস ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ভ্রাম্যমাণ ঘাতক দল। এদের মূল কাজ ছিল সামরিক দখলকৃত এলাকায় রাজনৈতিক নেতা, কমিউনিস্ট কর্মী এবং ইহুদিদের চিহ্নিত করে দ্রুত হত্যা করা। এই গণহত্যার কৌশলকে বলা হতো ‘হোল্ডনাকেনস্কিস’ বা মাথার পেছনে গুলি করে হত্যা। বাবি ইয়ার গণহত্যা এই আইন্সাজগ্রুপেনের ‘সি’ গ্রুপের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছিল।

১৯৪১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করে। কিয়েভ ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম বৃহৎ ইহুদি অধ্যুষিত শহর, যেখানে প্রায় ১৬০,০০০ ইহুদির বসবাস ছিল। শহরের অধিকাংশ ইহুদি পালাতে ব্যর্থ হয়। কিয়েভের পতনের পরপরই নাৎসিরা তাদের চূড়ান্ত ‘সমাধান’ কার্যকর করার সুযোগ পায়।

হত্যাকাণ্ড শুরুর আগে নাৎসিরা কিয়েভে একটি বিভ্রান্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করে। কিয়েভ দখলের কয়েক দিনের মধ্যেই জার্মান সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে, যার জন্য নাৎসিরা ইহুদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করে।

২৯ সেপ্টেম্বর শহরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগানো হয়। এতে কিয়েভের সমস্ত ইহুদিকে পরের দিন সকাল ৮টার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্থান ডোরাগোঝিৎস্কা ও মেলিঙ্কোভা রাস্তার সংযোগস্থলে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অমান্যকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়। ইহুদিদের বোঝানো হয়েছিল তাদের কেবল পুনর্বাসনের জন্য স্থানান্তর করা হবে।

হাজার হাজার ইহুদি বৃদ্ধ, নারী, শিশুসহ তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র ও সীমিত খাবার নিয়ে নির্দেশিত স্থানে পৌঁছায়। তারা জানতো না যে সামান্য দূরেই বাবি ইয়ার নামের একটি গভীর উপত্যকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের যখন ছোট ছোট দলে বাবি ইয়ারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তারা বুঝতে পারে এটি পুনর্বাসন নয় এক সুপরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদ।

আইন্সাজগ্রুপেন এবং স্থানীয় ইউক্রেনীয় সহকারীরা সেখানে একটি নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী তৈরি করে রেখেছিল। খাদে নিয়ে যাওয়ার আগে ইহুদিদের পোশাক, অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়।এরপর নগ্ন ও অসহায় মানুষদের দল বেঁধে উপত্যকার কিনারে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাৎসি সৈন্যরা উপর থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এবং মেশিনগান ব্যবহার করে তাদের নির্বিচারে গুলি করে উপত্যকার ভেতরে ফেলে দেয়। একদল মানুষকে হত্যা করার পর তাদের দেহাবশেষের ওপর নতুন দলকে দাঁড় করিয়ে একইভাবে হত্যা করা হয়। এই দুই দিনে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৩৩,৭৭১ জন মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। এটি ছিল হলোকাস্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক গণহত্যামূলক ঘটনা।

বাবি ইয়ার হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র ইহুদিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত জার্মান দখলদারিত্বের সময়ে এই উপত্যকায় রোমা যাযাবর, কমিউনিস্ট, মানসিক রোগী এবং সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীসহ ১ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

বাবি ইয়ার ছিল হলোকাস্টের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি প্রমাণ করে গ্যাস চেম্বার বা মৃত্যুশিবির তৈরি হওয়ার আগেও নাৎসিরা কেবল গুলি করে ব্যাপক হারে ইহুদিদের হত্যা করতে সক্ষম ছিল। এই ঘটনার পরই পূর্ব ইউরোপে ‘বুলেট বাই হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত গণহত্যার ধারণাটি চূড়ান্ত রূপ নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত সরকার এই গণহত্যার স্মৃতিকে মুছে ফেলার বা এর ইহুদি পরিচয়কে লঘু করার চেষ্টা করে। সোভিয়েত মতাদর্শ অনুসারে, গণহত্যার শিকারদের কেবল ‘সোভিয়েত নাগরিক’ হিসেবে স্মরণ করা হতো, ইহুদি হিসেবে নয়। তারা দীর্ঘকাল বাবি ইয়ারে কোনো ইহুদি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে দেয়নি। এই নীরবতা ছিল হত্যাকাণ্ডের শিকারদের প্রতি এক গভীর বঞ্চনা।

দীর্ঘকাল ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীরবতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন ইউক্রেনীয় কবি ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বাবি ইয়ার”-এর মাধ্যমে। তাঁর কবিতাটি দমিত স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং বিশ্বকে সোভিয়েত নীরবতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

বাবি ইয়ার গণহত্যা মানব ইতিহাসে এক মর্মান্তিক নৈতিক প্রশ্ন রেখে যায়। কীভাবে এত অল্প সময়ে, সাধারণ সামরিক পোশাক পরিহিত মানুষরা এমন অমানবিক কাজ করতে পারল? এই গণহত্যা ছিল সুসংগঠিত, আমলাতান্ত্রিক এবং কার্যকর। নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের মানুষ হিসেবে নয় কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখেছিল। হান্না আরেন্ডট যাকে ‘ব্যানালিটি অফ ইভিল’ বলেছেন, বাবি ইয়ার তারই এক ভয়াবহ প্রতিফলন।

এই গণহত্যার সময় স্থানীয় জনসাধারণের একটি অংশ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। তবে কিছু স্থানীয় মানুষ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ইহুদিদের লুকিয়ে রেখে মানবিক সংহতির পরিচয়ও দিয়েছিল।

বাবি ইয়ার আজ বিশ্বকে এই শিক্ষাই দেয় যে, যখনই কোনো সমাজে ঘৃণার রাজনীতি শুরু হয় এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে মানবতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখনই এমন ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাবি ইয়ারের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া মানে সেই বর্বরতার পুনরাবৃত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা।

বাস্তবতা হলো ১৯৪১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বাবি ইয়ারের উপত্যকায় যা ঘটেছিল, তা কেবল ইহুদিদের ট্র্যাজেডি নয় এটি ছিল মানবজাতির নৈতিক পতনের এক চূড়ান্ত প্রতীক।

পরবর্তী প্রজন্মের কার্যকর সৌর শক্তি মডেল উদ্ভাবন করেছে এআই

বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণের জন্য টেকসই এবং কার্যকর সমাধানের প্রয়োজনীয়তাকে আরও তীব্র করে তুলছে। এর সম্ভাব্য সমাধানের একটি হলো উন্নত মানের সৌর সেল উপকরণের উদ্ভাবন, যা বর্তমানের ব্যবহৃত উপকরণের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ। এই নতুন উপকরণগুলোকে এত পাতলা ও নমনীয়ভাবে তৈরি করা যেতে পারে যে সেগুলো স্মার্টফোন থেকে শুরু করে পুরো ভবন পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।

সুইডেনের চ্যালমার্স ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির গবেষকরা সম্প্রতি একটি প্রতিশ্রুতিশীল, কিন্তু জটিল উপকরণ হ্যালাইড পেরোভস্কাইট নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে তারা এই উপকরণের জটিল আচরণ বোঝার চেষ্টা করছেন।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা অনুসারে, বিদ্যুৎ ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানির ব্যবহারের ২০ শতাংশের জন্য দায়ী। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে এটি ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারে, যা আরও স্পষ্ট করে যে পরিচ্ছন্ন এবং কার্যকরী শক্তি প্রযুক্তি দ্রুত বিকাশের প্রয়োজন। চ্যালমার্স ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এবং প্রধান গবেষক জুলিয়া উইক্টর বলেন, “চাহিদা পূরণের জন্য নতুন, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর শক্তি রূপান্তরের পদ্ধতির চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের গবেষণার ফলাফল এই প্রতিশ্রুতিশীল সৌর সেল উপকরণকে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এখন এমন সিমুলেশন পদ্ধতি রয়েছে যা কয়েক বছর আগেও সমাধান করা যাওয়া সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে সক্ষম।”

হ্যালাইড পেরোভস্কাইট উপকরণগুলোকে ব্যয়সাশ্রয়ী, নমনীয় এবং হালকা সৌর সেল তৈরির জন্য সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ধরা হয়। এগুলো লাইট শোষণ ও নির্গমনে অত্যন্ত দক্ষ। তবে এই উপকরণগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাদের কর্মপদ্ধতি ও স্থিতিশীলতার গভীর বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ফরমামিডিনিয়াম লিড আইডাইড নামক ক্রিস্টালাইন যৌগটি দীর্ঘ সময় ধরে বোঝার জন্য গবেষকদের অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটি অপটোরেলেকট্রনিক বৈশিষ্ট্যে অত্যন্ত শক্তিশালী, তবে অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবহার সীমিত। দুটি প্রকার হ্যালাইড পেরোভস্কাইট মিশ্রণ করে এই সমস্যা আংশিকভাবে সমাধান করা সম্ভব।

চ্যালমার্সের গবেষকরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে উপকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়েছেন। এটি উপকরণ ডিজাইন ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক সাঙ্গিতা দত্ত বলেন, “এই উপকরণের নিম্ন-তাপমাত্রা স্তর দীর্ঘদিন গবেষণার অভাবের কারণে বোঝা যায়নি এবং আমরা এখন এর কাঠামো সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নের সমাধান করেছি।”

মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে তারা হাজারগুণ দীর্ঘ সিমুলেশন চালাতে পেরেছেন এবং লক্ষাধিক পরমাণু যুক্ত মডেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে মডেল আরও সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে। গবেষকরা উপকরণটি –২০০°সেলসিয়াসে ঠান্ডা করে পরীক্ষা করেছেন এবং তা সিমুলেশন ফলাফলের সাথে মিলেছে। এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে জটিল হ্যালাইড পেরোভস্কাইট উপকরণ মডেলিং ও বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বুদ্ধ মূর্তি ও গ্রীক স্থাপত্য, যেভাবে হেলেনিস্টিক শৈলীতে বুদ্ধ প্রথম মানব ভাস্কর্যের রূপ পেলেন

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষভাগে দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর ভারত অভিযান প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই অভিযান কেবল সামরিক জয়লাভের কাহিনী নয়, ছিল গ্রিক হেলেনিস্টিক এবং ভারতীয় দুটি মহান সভ্যতার মধ্যে সরাসরি সংযোগের সূচনা। এই সংযোগ কেবল বাণিজ্য বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর গভীর প্রভাব পড়েছিল শিল্পকলা, দর্শন, বিজ্ঞান এবং সর্বোপরি ভারতীয় সংস্কৃতির উপর।

ম্যাসিডোনের রাজা আলেকজান্ডার ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন। তাঁর অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে বিশ্বের প্রান্তসীমায় পৌঁছানো।

আলেকজান্ডার প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন ছোট রাজ্য জয় করেন। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঝিলাম নদীর তীরে তিনি স্থানীয় পরাক্রমশালী রাজা পোরস-এর বিরুদ্ধে এক কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। পোরসের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার তাঁকে তাঁর রাজ্যের শাসক হিসেবে বহাল রাখেন এবং তাঁর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। তবে আলেকজান্ডার-এর সৈন্যরা যখন শক্তিশালী নন্দ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র পাটলিপুত্র অভিমুখে অগ্রসর হতে চাইল, তখন দীর্ঘ যুদ্ধক্লান্ত এবং নিজ দেশ থেকে বহু দূরে অবস্থিত সৈন্যরা বিয়াস নদীর তীরে বিদ্রোহ করে। এর ফলস্বরূপ ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন।

আলেকজান্ডার ভারতে স্বল্পকাল অবস্থান করলেও, এই অভিযান ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলে বেশ কয়েকটি নতুন শহর স্থাপন করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তাঁর প্রিয় ঘোড়ার নামে প্রতিষ্ঠিত বুকেফালা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অভিযান ভারত ও পশ্চিমের মধ্যে স্থল ও জলপথের জন্য এক স্থায়ী যোগাযোগের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তিনি তাঁর বিজয়কে চিহ্নিত করে অনেক গ্রিক সামরিক ঘাঁটি এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।

আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তনের পরও তাঁর নিযুক্ত গ্রিক প্রশাসক ও সৈন্যদের একাংশ ভারতে থেকে যান। এই কারণে এবং পরবর্তীকালে ইন্দো-গ্রিক রাজ্যগুলির উত্থানের ফলে ভারতীয় সংস্কৃতিতে গ্রিক বা হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির গভীর ছাপ পড়ে।

গ্রিক-ভারত সংযোগের সবচেয়ে স্পষ্ট ও স্থায়ী নিদর্শন হলো গান্ধার শিল্পকলা। এই শিল্পশৈলীতে ভারতীয় বৌদ্ধ থিম এবং গ্রিক-রোমান শৈলীর মিলন ঘটে। ভারতীয় শিল্পে বৌদ্ধধর্মে বুদ্ধকে সাধারণত প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হত। কিন্তু গান্ধার শিল্পে প্রথমবার বুদ্ধের মানব-আকৃতির মূর্তি তৈরি হতে দেখা যায়, যা অনেকটাই গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর ভাস্কর্যশৈলী দ্বারা অনুপ্রাণিত।

গ্রিক ভাস্কর্যর বৈশিষ্ট্য যেমন পেশিবহুল দেহ, কাপড়ের ভাঁজে বাস্তবতা, তরঙ্গায়িত চুল এবং নিখুঁত মুখাবয়ব গান্ধার মূর্তিশিল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই শৈলীটি উত্তর-পশ্চিম ভারতে, বিশেষত আজকের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

হেলেনিস্টিক প্রভাব ভারতীয় মুদ্রা ব্যবস্থার উপরও লক্ষ্য করা যায়। আলেকজান্ডার-এর উত্তরসূরিদের এবং পরবর্তীকালে ইন্দো-গ্রিক রাজাদের যেমন মিনান্দার, যিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে মিলিন্দ নামে পরিচিত হন, তাদের মুদ্রাগুলি ছিল গ্রিক শৈলীতে তৈরি। মুদ্রার একপাশে রাজার প্রতিকৃতি এবং অন্যপাশে গ্রিক দেব-দেবীর চিত্র ও গ্রিক লিপি ব্যবহৃত হত। এই মুদ্রাগুলি ভারতীয় মুদ্রাশৈলীতে প্রতিকৃতি ব্যবহারের ধারণাকে উৎসাহিত করেছিল।

গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রভাব ভারতীয় পণ্ডিতদের উপরও পড়েছিল। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের পূর্বাভাস, রাশিচক্রের ধারণা এবং গণনার গ্রিক পদ্ধতি ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় প্রবেশ করে। “যবনজাতক”-এর মতো সংস্কৃত গ্রন্থে গ্রিক জ্যোতিষশাস্ত্রের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। “যবন” শব্দটি গ্রিকদের জন্য ব্যবহৃত হত।

গ্রিকদের আগমন একমুখী ছিল না, ভারতীয় সংস্কৃতিও গ্রিকদের উপর প্রভাব ফেলেছিল। এই পারস্পরিক আদান-প্রদান ছিল ভারতীয় সভ্যতার এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য।

আলেকজান্ডার-এর অভিযান গ্রিকদের ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্লিনির মতো গ্রিক ঐতিহাসিকরা ভারতীয় সন্ন্যাসী বা শ্রমণদের কঠোর জীবনধারা এবং দার্শনিক আলোচনার প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মের বিস্তার, গ্রিক রাজা মিনান্দারের বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা গ্রহণ প্রমাণ করে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা বিদেশিদের কতটা আকর্ষণ করেছিল।

“মিলিন্দপঞহো” বাংলা নাম মিলিন্দ-এর প্রশ্নাবলী গ্রন্থটি রাজা মিনান্দার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে দার্শনিক কথোপকথন নিয়ে রচিত।

আলেকজান্ডারের পর ভারতে শাসন প্রতিষ্ঠা করা মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তাঁর নাতি অশোক-এর উপর হেলেনিস্টিক প্রশাসনিক মডেলের প্রভাব ছিল। অশোকের আর্মাইক ও গ্রিক ভাষায় খোদিত শিলালিপিগুলিতে গ্রিক ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা গ্রিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এবং তাদের প্রতি রাজার সম্মান নির্দেশ করে।

খ্রিস্টপূর্ব গ্রিক-ভারত সংযোগ ভারতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আলেকজান্ডারের অভিযান সামরিকভাবে ক্ষণস্থায়ী হলেও, এর সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী। গান্ধার শিল্পশৈলী, গ্রিক স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা, মুদ্রাব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের আদান-প্রদান এই সবই ভারতীয় সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছিল। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির এই সফল সংমিশ্রণ প্রমাণ করে, সামরিক সংঘাতের মধ্যেও জ্ঞান ও শিল্পকলার আদান-প্রদান কীভাবে নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে পারে। গ্রিক-ভারত সংযোগের এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আজও আমাদের প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক গভীরতাকে বুঝতে সাহায্য করে।

তীব্র পানি সংকটে ভুগছে কাবুল, শুকিয়ে যাচ্ছে শহরের সব কূপ

কাবুলের অনেক পরিবার এখন প্রতিদিনের পানি সংগ্রহের জন্য শহরের ধুলোঝরা গলিপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাতরায় দাঁড়াতে বাধ্য। একসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ কূপ থেকে পানি সরবরাহ পেত পরিবারগুলো, কিন্তু আজ সেই উৎস শুকিয়ে গেছে। ফলে বহু পরিবারকে সম্প্রদায়ভিত্তিক নলের কাছে লাইনে দাঁড়াতে হয় অথবা ব্যয়বহুল ট্যাঙ্কার দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আফগানিস্তানে খরা এবং অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কাবুলকে এশিয়ার সবচেয়ে পানিসঙ্কটগ্রস্ত শহরের মধ্যে গণ্য করা হচ্ছে। পানি সংকট শুধু দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে না, এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সমতার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে, আর দুর্বল স্বাস্থ্য পরিস্থিতি যেমন অপুষ্টি ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কাবুলে ভূ-জলের পরিস্থিতি দারুণ উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে শহরের ভূ-জলের স্তর ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। কেবল কাবুল নয়, দেশের অন্যান্য শহরও দ্রুত পানি সংকটে ভুগছে। এই সংকট সামাজিক বৈষম্যকেও তীব্র করছে। ধনী পরিবাররা গভীর ব্যক্তিগত কূপ খনন করতে পারলেও, দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে ট্যাঙ্কারভর্তি পানি সংগ্রহে।

শহরের নলের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মধ্যে চাপ, উত্তেজনা এবং শারীরিক দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। তীব্র গরমে হঠাৎ মাথা ঘোরা, অসুস্থতা ও দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দেয়। পরিবারগুলো দিনে ছয় থেকে সাতবার পানি সংগ্রহ করতে বের হয়। এ ধরনের নিয়মিত পরিশ্রম পরিবারের আয়ের ওপরও প্রভাব ফেলেছে, অনেকেই তাদের কাজ বা ব্যবসা বন্ধ করে শিশুদের সাহায্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

পানির নিরাপত্তা এবং মানের সমস্যাও গুরুতর। অনেক পরিবারকে জলা পানি নিরাপদ করার জন্য একাধিকবার ফুটাতে হয়, তবুও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে নদী বা কূপ পুনর্নির্মাণে সহায়তা করছে না এবং নদীর শীতল পানির স্তরও বছরের বেশির ভাগ সময় শূন্য থাকে।

শহরের জনসংখ্যা গত দুই দশকে ছয় মিলিয়নের বেশি হয়েছে, কিন্তু পানির অবকাঠামোর বিনিয়োগ তা অনুসরণ করতে পারেনি। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, ফলে মানুষ কূপ বা ব্যয়বহুল ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভর করছে। অনেক নল এবং গভীর কূপও এখন শুকিয়ে গেছে, যেগুলো পূর্বে পানি সরবরাহে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গণ্য হতো।

বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলো সতর্ক করছে চলমান খরা, জলবায়ু ধাক্কা এবং জনসংখ্যার স্থানান্তর কাবুলকে কয়েক বছরের মধ্যেই পানির সম্পূর্ণ সংকটে ফেলে দিতে পারে। এটি কেবল দৈনন্দিন জীবনের ঝুঁকি নয়, বরং শহরের স্থায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার ওপরও হুমকি।
এই সংকট মোকাবেলায় অবিলম্বে অবকাঠামো উন্নয়ন, পানির সংরক্ষণ এবং নীতি প্রণয়নের প্রয়োজন। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে কাবুলের নাগরিকরা প্রতিদিনের পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিনিয়ত বিপদের সম্মুখীন হবে, আর শহরের স্বাভাবিক জীবন ও শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হবে।

মহাত্মা গান্ধী – যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ধারা পরিবর্তন করেছিলেন

মহাত্মা গান্ধী এক ক্ষীণদেহী অথচ দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মানুষ। তিনি কেবল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বই দেননি, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ নতুন দর্শন ও কার্যপ্রণালী তৈরি করে গেছেন। আইন পেশা থেকে শুরু করে “ভারতের জাতির জনক” হয়ে ওঠা পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল অবিরাম সংগ্রাম ও নতুন পদ্ধতির এক পরীক্ষা।

১৮৬৯ সালে ভারতের গুজরাটে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে বিদেশে। ১৮৯৩ সালে ২৪ বছর বয়সে নতুন অ্যাটর্নি গান্ধী আইনচর্চার জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল-এ যান। সেখানে তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হন। ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা, জনপথ ব্যবহার করায় লাঞ্ছিত হওয়া এবং ইউরোপীয় যাত্রীদের থেকে আলাদা করে রাখার মতো ঘটনা তাঁকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।

এই বর্ণবৈষম্যই তাঁকে প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৯৪ সালে যখন নাটাল সরকার ভারতীয়দের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, তখন গান্ধী ভারতীয় প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। এই প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর অনন্য প্রতিবাদী দর্শন সত্যাগ্রহ গড়ে তোলেন। সত্যাগ্রহ ছিল নৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করে অন্যায়কে প্রতিরোধ করার একটি পদ্ধতি। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, চরম নৈতিক ও আত্মিক শক্তির প্রকাশ ছিল।এখানেই ছিল তাঁর প্রথম পরিবর্তন, তিনি প্রতিবাদের জন্য হিংসার পথ পরিহার করে সত্য ও অহিংসাকে প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেন।

১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বছর কাটানোর পর গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন এবং তাঁর উদ্ভাবিত সত্যাগ্রহের দর্শনকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের নেতা নির্বাচিত হন এবং স্বাধীনতার জন্য জোরদার আন্দোলন শুরু করেন।

গান্ধী রাজনৈতিক প্রতিবাদকে জনসম্পৃক্ততার এক নতুন স্তরে নিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলো কেবল অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজের সাধারণ মানুষকেও এর সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে বিনা বিচারে সন্দেহভাজন বিপ্লবীদের কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া রাউলাট অ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে গান্ধীজির নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার এই অহিংস প্রতিরোধের জবাবে চরম নৃশংসতা প্রদর্শন করে। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ৪০০-এরও বেশি নিরস্ত্র, অহিংস বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বর্বরতা গান্ধীর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, অহিংসা ও নৈতিক শক্তি দিয়ে ব্রিটিশদের সামরিক শক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব। এই হত্যাকাণ্ড ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং গান্ধীজিকে আরও কঠোরভাবে হোম রুলের জন্য চাপ দিতে উৎসাহিত করে।

গান্ধীর রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো Salt March। ১৮৮২ সালের একটি ব্রিটিশ আইন ভারতীয়দের স্থানীয়ভাবে লবণ উৎপাদন না করে ব্রিটিশ লবণ কিনতে বাধ্য করত। এই অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজি এক বিশাল সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ২৪১ মাইল দীর্ঘ পদযাত্রা করে গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছান এবং আরবসাগরের তীর থেকে লবণ সংগ্রহ করে আইন অমান্য করেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এই ঘটনায় ব্রিটিশ সরকার ৬০,০০০-এরও বেশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীকে কারারুদ্ধ করে, কিন্তু এর ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। গান্ধী প্রমাণ করেন সাধারণ ও প্রতীকী প্রতিবাদও কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই সময়ের মধ্যেই গান্ধী জাতীয় আইকনে পরিণত হন এবং তিনি “মহাত্মা” উপাধিতে ভূষিত হন। সংস্কৃত ভাষায় যার অর্থ মহান আত্মা বা সাধু ।কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি “অস্পৃশ্যদের” প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেন, প্রশ্ন তোলেন ভারতের জাতিভেদ প্রথার মূল নিয়ে। তাঁর “ভারত ছাড়ো আন্দোলন”-এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের ভারত থেকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন, যা স্বাধীনতার পক্ষে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়।

১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি একজন হিন্দু চরমপন্থীর হাতে গান্ধীজি নিহত হন।

গান্ধীর উত্তরাধিকার ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি নাগরিক অসহযোগের মুখ বদলে দিয়েছিলেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় তাঁর কৌশল গ্রহণ করেন। দালাই লামা এবং বিশ্বজুড়ে যারা সহিংসতা ছাড়াই পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন, তারা গান্ধীজির শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

গান্ধী প্রমাণ করেন শারীরিক শক্তি বা হিংসা ছাড়াই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আত্মিক দৃঢ়তার মাধ্যমে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। তাঁর পদ্ধতি রাজনৈতিক প্রতিবাদকে ধ্বংসাত্মক পথ থেকে একটি গঠনমূলক, নৈতিক আন্দোলনের দিকে চালিত করেছিল।

তবে তাঁর জীবন এবং কর্মপদ্ধতি বেশ জটিল ছিল। দলিতদের অধিকার নিয়ে তাঁর সংগ্রাম এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি তাঁর অবিচল সমর্থন একদিকে যেমন তাঁকে পূজনীয় করেছে, তেমনি অন্যদিকে তিনি কিছু কঠোর সমালোচনাও পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তাঁর কিছু মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর “ব্রহ্মচর্য পরীক্ষা” নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

তা সত্ত্বেও,মহাত্মা গান্ধী নামক এই জন-ব্যক্তিত্ব ভারতের ইতিহাস এবং বিশ্বজুড়ে নাগরিক প্রতিবাদের অনুশীলনে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর অহিংসার দর্শন আজও বিশ্বজুড়ে সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষীদের জন্য একটি কার্যকরী নীলনকশা হিসেবে বিবেচিত। রাজনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাসে গান্ধী এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন, যেখানে অহিংসাই হলো চূড়ান্ত বিজয়ী শক্তি।”

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে রেমিট্যান্স : প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, তা দেশের অর্থনীতিকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের নিউইয়র্ক মেরিয়ট মার্কুইসে অনুষ্ঠিত ‘এনআরবি কানেক্ট ডে: এমপাওয়ারিং গ্লোবাল বাংলাদেশিজ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আমাদের অর্থনীতি একেবারে নিচে নেমে গিয়েছিল। আপনাদের রেমিট্যান্সই তা বাঁচিয়েছে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পেছনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স মূল চালিকা শক্তি।”

প্রধান উপদেষ্টা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত তরুণ জনশক্তি রয়েছে যা দেশের উন্নয়নে মূল সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তিনি বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানান, বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তর করে এই মানবসম্পদ কাজে লাগাতে এবং দেশকে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে। প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনারা এখন বাংলাদেশের অংশ। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ ও ধারণা নিয়ে আসুন।” এছাড়া তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।

অর্থনীতির আঞ্চলিক প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নেপাল, ভুটান ও ভারতের সাতটি রাজ্য সমুদ্রবন্দরের অভাবে স্থলবেষ্টিত। যদি বাংলাদেশ তাদের জন্য সমুদ্র উন্মুক্ত করে, তবে সবাই উপকৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কক্সবাজার-মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। গত এক বছরে বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) দ্বিগুণ হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ‘হারনেসিং ডায়াসপোরা অ্যাজ আ ন্যাশনাল অ্যাসেট’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা পরিচালনা করেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। আলোচনায় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশীয় সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

একটি আরও প্যানেল সেশন পরিচালনা করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান। আলোচনায় বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির, জামায়াত নেতা মোহাম্মদ নকীবুর রহমান এবং এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ড. তাসনিম জারা বক্তব্য রাখেন।তাসনিম জারা নারী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত বাংলাদেশ গড়ার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “যখন সবাই একসঙ্গে কাজ করে, ইতিহাস বদলায়। আমরা একসঙ্গে ইতিহাস বদলাবো।”

অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনও বক্তব্য রাখেন।

টেক নেক থেকে বাঁচুন, জানুন ল্যাপটপ ব্যবহার করার সঠিক ভঙ্গি

২০-ডিগ্রি নিয়ম

এরগোনমিক্স বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান এগ্রবার্ট বলেন, ডেস্কে সরাসরি ল্যাপটপ ব্যবহার করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে আপনার ভঙ্গি বা পোশ্চারে বড় প্রভাব ফেলে। তিনি “২০-ডিগ্রি নিয়ম” উল্লেখ করে বলেন, যদি ঘাড় ২০ ডিগ্রির বেশি বাঁকা হয়ে থাকে, তাহলে আপনি ঝুঁকির সীমা অতিক্রম করছেন।

ল্যাপটপ স্ট্যান্ডই হতে পারে সমাধান

একটি ল্যাপটপ স্ট্যান্ড ভঙ্গি ঠিক রাখতে ও শরীরের চাপ কমাতে কার্যকর। তবে মনে রাখবেন, স্ক্রিন উঁচু করলে আরামদায়কভাবে কাজ চালিয়ে যেতে বাহ্যিক কীবোর্ড ও মাউস ব্যবহার করাও জরুরি।

সঠিক টেবিল ও চেয়ার নির্বাচন

এরগোনমিক্স বিশেষজ্ঞ বলেন, ভালো ভঙ্গি বজায় রাখতে শুরুটা হওয়া উচিত আপনার অফিস চেয়ার থেকে। তবে আপনার ডেস্কের উচ্চতা ও ধরনই ঠিক করবে, কী ধরনের চেয়ার আপনার জন্য উপযুক্ত হবে ।

সচেতন থাকুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতন থাকাই মূল বিষয়, আরামের বিনিময়ে ব্যথাকে মেনে নেওয়া উচিত নয়। সঠিক স্ট্যান্ড, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ও ভালো অভ্যাসের মাধ্যমে আপনি ঘাড় ও মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন, একই সঙ্গে ল্যাপটপের পোর্টেবিলিটিও উপভোগ করতে পারবেন।

আপনার স্ক্রিন কোথায় আছে?

প্রতিদিন টানা আট ঘণ্টা ল্যাপটপে কাজ করলে স্ক্রিনের উচ্চতা আপনার শরীরে প্রভাব ফেলবে। নিচু স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, কোমরে চাপ, দীর্ঘসময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকার কারণে মাথাব্যথা এবং ‘কাইফোসিস’ নামে পরিচিত কুঁজো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

বাঙালির দুর্গাপূজা – ঘরের মেয়ে উমা যেভাবে হয়ে উঠেছিলো মহিষাসুরমর্দিনী

প্রতি বছর শরৎকালে যখন প্রকৃতিতে স্নিগ্ধতা আসে, তখন শুধু বাঙালি জনজীবন নয়, বাঙালির মনন ও দর্শনেও এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হয় ।এই আলোড়নের নাম শারদীয় দুর্গোৎসব। বাইরের পরিচয়ে এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র হিসেবে সম্প্রতি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই বর্ণিল আবরণের তলায় লুকিয়ে আছে সহস্রাব্দ প্রাচীন দার্শনিক ভিত্তি, যা কেবল দেবীর আরাধনা নয় তা হলো শুভ ও অশুভের শাশ্বত সংঘাত, আত্মশুদ্ধির পথ এবং পারিবারিক সংহতির এক প্রতীকী দর্শন। কেন এই উৎসব বাঙালির কাছে শুধু ‘পূজা’ নয়, বরং ‘উৎসবের’ প্রতীক? এর উত্তর জানতে আমাদের প্রবেশ করতে হবে পুরাণ ও শাস্ত্রের গভীরে, যেখানে মহিষাসুরমর্দিনীর গল্প কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং মানবমুক্তির এক মহা-আখ্যান।

দুর্গাপূজার কেন্দ্রীয় আখ্যান হলো দেবী দুর্গা কর্তৃক মহিষাসুরকে বধ করার কাহিনী। এই উপাখ্যানের প্রধান উৎস হলো ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর অন্তর্গত ‘দেবী মাহাত্ম্যম্’ বা ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’।

পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুর কঠোর তপস্যায় ব্রহ্মার বরে এমন শক্তি লাভ করেছিল যে কোনো পুরুষ দেব-দানব তাকে হত্যা করতে পারবে না। এই বর পেয়ে সে স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে দেবতাদের পরাজিত করে বিতাড়িত করে। উপায়ন্তর না দেখে দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন। তখন সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তির সৃষ্টি করে, ইনিই দেবী দুর্গা। দেবতারা নিজ নিজ অস্ত্র দিয়ে দেবীকে সজ্জিত করেন। এরপর দশমহাবিদ্যা মহিষাসুরকে বধ করে স্বর্গলোক উদ্ধার করেন।

এই কাহিনীর গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে, যেগুলো কেবল পৌরাণিক নয় দার্শনিকও। মহিষাসুর হলো অহং, কামনা এবং জড়ত্ব-এর প্রতীক। মহিষ শব্দটি সংস্কৃত ‘মহিষা’ থেকে এসেছে, যা তমোগুণ বা অন্ধকারের দ্যোতক। সে যখন পুরুষ দেবতাকুলের সম্মিলিত শক্তিকেও পরাস্ত করে, তখন এটি বোঝায় যে মানব মনের অহংকার ও অজ্ঞতা এতই শক্তিশালী যে কেবল যুক্তিবাদী (দেবতা) শক্তি দিয়ে তাকে জয় করা সম্ভব নয়।

দেবী দুর্গা হলেন ‘মহাশক্তি’ বা ‘আদ্যাশক্তির’ প্রতীক, যিনি জ্ঞান, শক্তি এবং ইচ্ছার সমন্বয়। দেবীর দশ হাতে দশটি অস্ত্র দশ প্রকার শক্তি ও গুণের প্রতীক। দশভূজা এই মূর্তি আসলে পুরুষ ও প্রকৃতির শক্তির সম্মিলিত রূপ, যা মানুষের ভেতরের সত্ত্বা, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাঁর হাতে মহিষাসুরের বধ কেবল এক দানবকে হত্যা করা নয়, এটি মানুষের আত্মিক জীবনে অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির শাশ্বত বিজয়, অর্থাৎ অহংকারকে বিনাশ করে আত্মিক মুক্তি লাভ করার প্রতীক।

সনাতন শাস্ত্রানুসারে, দেবী দুর্গার পূজা বসন্তকালে বা চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয়, যা বাসন্তী পূজা নামেও পরিচিত। তবে শরৎকালে যে দুর্গাপূজা হয়, তাকে অকালবোধন বলা হয়।

‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ অনুসারে, রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্রকে দেবীর আশীর্বাদ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শরৎকাল ছিল দেবীর নিদ্রার সময়। তাই রামচন্দ্র অকালে দেবীকে জাগ্রত করে পূজা করেন। দেবীর বরে তিনি রাবণকে পরাজিত করতে সক্ষম হন।

অকালবোধন সেই শাস্ত্রীয় ব্যতিক্রমকে প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে জীবনের চরম সঙ্কটে সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়েও দেবীর শরণাপন্ন হওয়া যায়। এটি দেখায় শুভ উদ্দেশ্য ও ঐকান্তিক ভক্তির কাছে শাস্ত্রের নিয়ম কিছুটা শিথিল হতে পারে। এই আখ্যান বাঙালি সমাজে দুর্গাপূজাকে শ্রেষ্ঠ ও প্রধান উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি স্থাপন করে।

দুর্গাপ্রতিমায় দেবী একাই পূজিত হন না, তিনি তাঁর চার সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ-কে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন। এই সপরিবারে দুর্গা ধারণাটি কেবল প্রতিমার বিন্যাস নয়, এটি একটি আদর্শ পরিবার এবং মানবজীবনের প্রয়োজনীয় গুণাবলির প্রতীকী বিন্যাস।

এই বিন্যাস বাঙালি সমাজকে বার্তা দেয় যে জীবনে পরিপূর্ণতা আনতে হলে শুধু মহাশক্তি (দুর্গা) থাকলেই হবে না, সেই শক্তির সাথে জ্ঞান (সরস্বতী), ধন (লক্ষ্মী), সফলতা (গণেশ) ও সুস্বাস্থ্য (কার্তিক)-এর সমন্বয় প্রয়োজন। পূজা মণ্ডপে এই পারিবারিক ঐক্য আসলে মানুষের জীবনের সার্বিক উন্নতি ও সমন্বয়ের দর্শনকেই তুলে ধরে।

বাঙালি সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গার আরাধনায় এক বিশেষ দ্বৈততা দেখা যায়, যা এটিকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের পূজা থেকে আলাদা করেছে। এখানে দেবী একই সাথে মহাশক্তি ও ‘ঘরের মেয়ে’ উমা বা গৌরী রূপে পূজিতা।

দেবী দুর্গা হিমালয়-কন্যা উমা। এই সময়টা তাঁর কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি আসার সময়। মহালয়ার আগমনী গানে এবং পূজার রীতিনীতিতে মাতৃস্নেহ ও কন্যার প্রতি বাৎসল্যের এক মানবিক ভাব ফুটে ওঠে। বিজয়া দশমীতে দেবীর বিসর্জন হয়ে ওঠে কন্যার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার বিষাদময় চিত্র।

এর বিপরীতে, শাস্ত্রীয় আরাধনা ও মন্ত্রপাঠে দেবী দুর্গা মহাজাগতিক শক্তি, মহিষাসুরমর্দিনী এবং বিশ্ব-প্রকৃতির মূর্ত প্রতীক।

এই সংযোগটি বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্মকে এক মানবিক স্তরে নিয়ে এসেছে। মহাশক্তির আরাধনা করার পাশাপাশি তাকে স্নেহ, ভালোবাসা ও আতিথেয়তা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়, যা বাঙালির পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে। এটি একদিকে যেমন শক্তির মাধ্যমে আত্মিক মুক্তি খোঁজে, তেমনি অন্যদিকে মানবিকতার মাধ্যমে দেবীর প্রতি নৈকট্য স্থাপন করে।

এই দ্বিমুখী পরিচয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক মনোভাব। বাঙালির কাছে পূজা যেমন মহাশক্তির আরাধনা, তেমনি আবেগ, স্মৃতি ও পারিবারিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। তাই দুর্গোৎসবকে কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং পারিবারিক পুনর্মিলন ও আবেগঘন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবেও দেখা হয়।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে পালিত হয় নবরাত্রি ও দশেরা। কিন্তু বাংলা দুর্গোৎসবের সঙ্গে এর কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
উত্তর ভারতে নবরাত্রি মূলত নয় দিনব্যাপী উপবাস, ভজন ও রামলীলা পালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। দশম দিনে পালিত হয় রাবণের দহন, অশুভের উপর শুভের বিজয়ের প্রতীক। পশ্চিম ভারতে বিশেষত গুজরাটে নবরাত্রির প্রধান আকর্ষণ গরবা ও দান্ডিয়া নৃত্য। বাংলায় দুর্গাপূজা প্রধানত প্রতিমা, প্যান্ডেল, আরাধনা, সজ্জা ও সামাজিক মিলনের উৎসব। এখানে দশম দিনে বিসর্জন প্রথা পালিত হয়।

মূল বার্তা সর্বত্র অভিন্ন, অশুভের উপর শুভ শক্তির বিজয়, তবুও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে প্রতিটি উৎসবের আলাদা মাত্রা তৈরি হয়েছে।

দুর্গাপূজা কেবল একটি দশ দিনের উৎসব নয়, এটি হিন্দু শাস্ত্রের গভীর দর্শন ও বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।মহিষাসুর বধের পৌরাণিক আখ্যান আমাদের নৈতিকতা শেখায়, অকালবোধন আমাদের ভক্তির গুরুত্ব বোঝায়, সপরিবারে দুর্গার প্রতিমা আমাদের জীবনের সমন্বয়ের শিক্ষা দেয় এবং ‘ঘরের মেয়ে’ উমার ধারণা আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে মানবিক করে তোলে। এই সমস্ত তাৎপর্য একত্রিত হয়েই দুর্গাপূজাকে এক মহোৎসবের মর্যাদায় উন্নীত করেছে, যা প্রতি বছর বাঙালি জীবন ও সমাজকে এক নবীন উদ্দীপনায় সঞ্জীবিত করে।

জলবায়ু পরিবর্তন ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক শক্তিকে হুমকিতে ফেলছে

ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (EEA)-এর সর্বশেষ “Europe’s Environment 2025” রিপোর্টে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবনতির কারণে ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হুমকির মুখে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপে বনজঙ্গল ও বাসস্থানগুলোর ৮০% খারাপ বা অতি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বায়োডাইভার্সিটি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষত পানির সংকট ও পরিবেশগত দূষণ আগামী কয়েক বছরে আরও গুরুতর আকার নেবে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

বর্তমানে কিছু সদস্য রাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশবান্ধব নীতির বাস্তবায়ন বিলম্বিত করছে। ফলে ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত ২২টি পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও ওজোন-বিধ্বংসী পদার্থ—পূরণে রয়েছে। বাকি লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।

ইইএ-এর নির্বাহী পরিচালক লীনা ইলা-মোনোনেন বলেছেন, “পরিবেশগত অবনতি ইউরোপের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা ও জীবনযাত্রার মানকে হুমকির মুখে ফেলছে।” তিনি আরও বলেন, “জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে বিলম্ব করলে খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং বৈষম্য আরও বাড়বে।” ইইএ-এর কর্মকর্তারা পরিবেশবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ইউরোপে বায়ু মানের উন্নতি হয়েছে, যার ফলে ২০০৫ সাল থেকে দূষণের কারণে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবে সাসটেইনেবল কনজাম্পশন ও সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ইইএ-এর কর্মকর্তারা বলছেন, “আমাদের কনজাম্পশন লেভেল অত্যন্ত উচ্চ, যা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।”

ইউরোপের পরিবেশগত অবস্থা উন্নত করতে হলে, পরিবেশবান্ধব নীতির বাস্তবায়ন ও নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। সরকার, শিল্প ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সম্ভব। ইইএ-এর রিপোর্ট আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে পরিবেশগত অবনতি রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।

গ্রামশির হেজিমনি – ‘সাধারণ জ্ঞান’ নামে আধিপত্যের কাঠামো কাদের তৈরি?

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব।গ্রামশির এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কীভাবে শাসক শ্রেণি শুধুমাত্র শক্তি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সম্মতি তৈরির মাধ্যমে সমাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) ছিলেন একজন ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে যখন ফ্যাসিবাদী উত্থান ঘটে, তখন তিনি মুসোলিনির সরকার দ্বারা কারারুদ্ধ হন। কারাগারের নিদারুণ পরিবেশে লেখা তাঁর ‘কারাগারের নোটবুক’ নামক অসাধারণ কাজটিই ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা ‘হেজিমনি’ (Hegemony) তত্ত্বের জন্ম দেয়। এই তত্ত্বটি ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করে এবং ব্যাখ্যা করে কীভাবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি পশ্চিমা সমাজে টিকে থাকে।

কেন গ্রামশির হেজিমনি জরুরি?

কার্ল মার্কস বিশ্বাস করতেন সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি বা কাঠামো অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পদের মালিকানা সমাজের উপরি কাঠামো, যেমন আইন, রাজনীতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে নির্ধারণ করে। মার্কস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অর্থনৈতিক সংকট পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে অনিবার্যভাবে পতন ঘটাবে এবং সর্বহারা শ্রেণি বিদ্রোহ করবে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পশ্চিমা দেশগুলিতে শ্রমিক বিদ্রোহ ঘটেনি। বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রামশি লক্ষ্য করেন পশ্চিমা দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণি তাদের নিজস্ব শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে উল্টোভাবে এই ব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে এবং সমর্থন করছে।

এই সমস্যাটি ব্যাখ্যা করার জন্যই গ্রামশি ‘আধিপত্য’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাদের টিকে থাকার মূল কারণ হলো শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, জনগণের ‘সম্মতি’ অর্জন করা। এই সম্মতি অর্জনের প্রক্রিয়াটি ঘটে সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে।

গ্রামশি হেজিমনিকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে শাসকশ্রেণি তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, আদর্শ এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি সমাজের ‘সাধারণ জ্ঞান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

গ্রামশি রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজ। রাজনৈতিক সমাজ হচ্ছে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র, যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত এবং সরকার থাকে। এটি জনগণের ওপর সরাসরি ‘বলপ্রয়োগ’ ব্যবহার করে।

নাগরিক সমাজ সম্মতির ক্ষেত্র, যেখানে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে ‘সম্মতি’ তৈরি করে।

সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রক্রিয়ায় শাসকশ্রেণি বলপ্রয়োগের পরিবর্তে নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করে তাদের আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মানুষ যখন শাসকশ্রেণীর আদর্শকে স্বাভাবিক, অনিবার্য এবং নিজেদের জন্য উপকারী মনে করতে শুরু করে তখন সাংস্কৃতিক আধিপত্য সফল হয়।

গ্রামশির মতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হয় যখন শাসকশ্রেণি সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে একটি ‘ঐতিহাসিক ব্লক’ (Historical Bloc) গঠন করে। এই ব্লকের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির মধ্যে একটি আদর্শিক ঐক্য তৈরি হয়। এই ঐক্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তা সমাজের সকলের জন্য মঙ্গলজনক।

এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শাসকশ্রেণির আদর্শকে সাধারণ মানুষের ‘সাধারণ জ্ঞান’ বা স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে গেঁথে দেওয়া। যদি কোনো সমাজে এই ধারণা প্রচলিত হয় যে কঠোর পরিশ্রম ও ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা করাই সাফল্যের একমাত্র পথ, তবে তা পুঁজিবাদের একটি আদর্শিক প্রচার। এই ‘সাধারণ জ্ঞান’ শোষণমূলক ব্যবস্থার বিকল্প চিন্তাকে অসম্ভব করে তোলে।

গ্রামশি এই আধিপত্যকে স্থায়ী মনে করেননি। তিনি মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণি ও শোষিত জনগণ এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রক্রিয়াটিকে তিনি ‘স্থানিক যুদ্ধ’ বা ‘অবস্থানের যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

মার্কসবাদীরা সাধারণত রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি হামলার মাধ্যমে ‘দ্রুত যুদ্ধ’ বা ‘চলন্ত যুদ্ধ’-এর কথা বলতেন। কিন্তু গ্রামশি বলেন, পশ্চিমা সমাজে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণ এত গভীরে যে শুধু রাজনৈতিক সমাজকে আঘাত করলেই হবে না, আগে নাগরিক সমাজের উপর আধিপত্যের কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হবে।

‘অবস্থানের যুদ্ধ’ হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সংগ্রাম, যেখানে শোষিত শ্রেণি তাদের নিজস্ব বুদ্ধিজীবী তৈরি করে। এই বুদ্ধিজীবীরা শাসকশ্রেণীর তৈরি করা ‘সাধারণ জ্ঞান’-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শোষিত জনগণের নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিকল্প বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে। এটি হলো ‘পাল্টা-আধিপত্য’ তৈরি করার প্রক্রিয়া।

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা আধুনিক বিশ্বের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের বিশ্বে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং হলিউডের মতো সাংস্কৃতিক উৎপাদনকারীরা শাসকশ্রেণির আদর্শকে অতি সূক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে দেয়। একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা, ভোগবাদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে জনপ্রিয় করে তুলে তারা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে ইতিহাস ও নাগরিক মূল্যবোধ শেখায়, তার মধ্য দিয়েও শাসকশ্রেণির পক্ষে সম্মতি তৈরি হয়। গ্রামশির তত্ত্ব আমাদের শেখায় শিক্ষার পাঠ্যক্রম কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়, এটি আধিপত্যের একটি হাতিয়ার।

উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নব্য-ঔপনিবেশিক প্রভাব কীভাবে সাংস্কৃতিক উপায়ে বিস্তার লাভ করে, তা বুঝতেও গ্রামশি সহায়ক।

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, এটি একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার যা সমাজের ক্ষমতা-কাঠামোকে বুঝতে সাহায্য করে। এই তত্ত্ব আমাদের শেখায়, সমাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের মন ও সম্মতি জয় করাও অপরিহার্য। আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং তা হলো সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, যেখানে শোষিতদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও আদর্শিক বিকল্প তৈরি করতে হয়। গ্রামশি তাই মনে করেন, সত্যিকরের সামাজিক মুক্তি ত্বরান্বিত করতে গেলে আগে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে এই ‘অবস্থানের যুদ্ধ’ জয় করা অপরিহার্য।