গ্রামশির হেজিমনি – ‘সাধারণ জ্ঞান’ নামে আধিপত্যের কাঠামো কাদের তৈরি?

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব।গ্রামশির এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কীভাবে শাসক শ্রেণি শুধুমাত্র শক্তি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সম্মতি তৈরির মাধ্যমে সমাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) ছিলেন একজন ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে যখন ফ্যাসিবাদী উত্থান ঘটে, তখন তিনি মুসোলিনির সরকার দ্বারা কারারুদ্ধ হন। কারাগারের নিদারুণ পরিবেশে লেখা তাঁর ‘কারাগারের নোটবুক’ নামক অসাধারণ কাজটিই ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা ‘হেজিমনি’ (Hegemony) তত্ত্বের জন্ম দেয়। এই তত্ত্বটি ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করে এবং ব্যাখ্যা করে কীভাবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি পশ্চিমা সমাজে টিকে থাকে।

কেন গ্রামশির হেজিমনি জরুরি?

কার্ল মার্কস বিশ্বাস করতেন সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি বা কাঠামো অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পদের মালিকানা সমাজের উপরি কাঠামো, যেমন আইন, রাজনীতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে নির্ধারণ করে। মার্কস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অর্থনৈতিক সংকট পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে অনিবার্যভাবে পতন ঘটাবে এবং সর্বহারা শ্রেণি বিদ্রোহ করবে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পশ্চিমা দেশগুলিতে শ্রমিক বিদ্রোহ ঘটেনি। বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রামশি লক্ষ্য করেন পশ্চিমা দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণি তাদের নিজস্ব শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে উল্টোভাবে এই ব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে এবং সমর্থন করছে।

এই সমস্যাটি ব্যাখ্যা করার জন্যই গ্রামশি ‘আধিপত্য’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাদের টিকে থাকার মূল কারণ হলো শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, জনগণের ‘সম্মতি’ অর্জন করা। এই সম্মতি অর্জনের প্রক্রিয়াটি ঘটে সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে।

গ্রামশি হেজিমনিকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে শাসকশ্রেণি তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, আদর্শ এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি সমাজের ‘সাধারণ জ্ঞান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

গ্রামশি রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজ। রাজনৈতিক সমাজ হচ্ছে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র, যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত এবং সরকার থাকে। এটি জনগণের ওপর সরাসরি ‘বলপ্রয়োগ’ ব্যবহার করে।

নাগরিক সমাজ সম্মতির ক্ষেত্র, যেখানে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে ‘সম্মতি’ তৈরি করে।

সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রক্রিয়ায় শাসকশ্রেণি বলপ্রয়োগের পরিবর্তে নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করে তাদের আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মানুষ যখন শাসকশ্রেণীর আদর্শকে স্বাভাবিক, অনিবার্য এবং নিজেদের জন্য উপকারী মনে করতে শুরু করে তখন সাংস্কৃতিক আধিপত্য সফল হয়।

গ্রামশির মতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হয় যখন শাসকশ্রেণি সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সাথে একটি ‘ঐতিহাসিক ব্লক’ (Historical Bloc) গঠন করে। এই ব্লকের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির মধ্যে একটি আদর্শিক ঐক্য তৈরি হয়। এই ঐক্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তা সমাজের সকলের জন্য মঙ্গলজনক।

এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শাসকশ্রেণির আদর্শকে সাধারণ মানুষের ‘সাধারণ জ্ঞান’ বা স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে গেঁথে দেওয়া। যদি কোনো সমাজে এই ধারণা প্রচলিত হয় যে কঠোর পরিশ্রম ও ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা করাই সাফল্যের একমাত্র পথ, তবে তা পুঁজিবাদের একটি আদর্শিক প্রচার। এই ‘সাধারণ জ্ঞান’ শোষণমূলক ব্যবস্থার বিকল্প চিন্তাকে অসম্ভব করে তোলে।

গ্রামশি এই আধিপত্যকে স্থায়ী মনে করেননি। তিনি মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণি ও শোষিত জনগণ এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রক্রিয়াটিকে তিনি ‘স্থানিক যুদ্ধ’ বা ‘অবস্থানের যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

মার্কসবাদীরা সাধারণত রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি হামলার মাধ্যমে ‘দ্রুত যুদ্ধ’ বা ‘চলন্ত যুদ্ধ’-এর কথা বলতেন। কিন্তু গ্রামশি বলেন, পশ্চিমা সমাজে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণ এত গভীরে যে শুধু রাজনৈতিক সমাজকে আঘাত করলেই হবে না, আগে নাগরিক সমাজের উপর আধিপত্যের কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হবে।

‘অবস্থানের যুদ্ধ’ হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সংগ্রাম, যেখানে শোষিত শ্রেণি তাদের নিজস্ব বুদ্ধিজীবী তৈরি করে। এই বুদ্ধিজীবীরা শাসকশ্রেণীর তৈরি করা ‘সাধারণ জ্ঞান’-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শোষিত জনগণের নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিকল্প বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে। এটি হলো ‘পাল্টা-আধিপত্য’ তৈরি করার প্রক্রিয়া।

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা আধুনিক বিশ্বের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের বিশ্বে গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং হলিউডের মতো সাংস্কৃতিক উৎপাদনকারীরা শাসকশ্রেণির আদর্শকে অতি সূক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে দেয়। একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা, ভোগবাদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে জনপ্রিয় করে তুলে তারা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে ইতিহাস ও নাগরিক মূল্যবোধ শেখায়, তার মধ্য দিয়েও শাসকশ্রেণির পক্ষে সম্মতি তৈরি হয়। গ্রামশির তত্ত্ব আমাদের শেখায় শিক্ষার পাঠ্যক্রম কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়, এটি আধিপত্যের একটি হাতিয়ার।

উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নব্য-ঔপনিবেশিক প্রভাব কীভাবে সাংস্কৃতিক উপায়ে বিস্তার লাভ করে, তা বুঝতেও গ্রামশি সহায়ক।

আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, এটি একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার যা সমাজের ক্ষমতা-কাঠামোকে বুঝতে সাহায্য করে। এই তত্ত্ব আমাদের শেখায়, সমাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের মন ও সম্মতি জয় করাও অপরিহার্য। আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং তা হলো সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, যেখানে শোষিতদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও আদর্শিক বিকল্প তৈরি করতে হয়। গ্রামশি তাই মনে করেন, সত্যিকরের সামাজিক মুক্তি ত্বরান্বিত করতে গেলে আগে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে এই ‘অবস্থানের যুদ্ধ’ জয় করা অপরিহার্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন