Home Blog Page 10

বাংলাদেশকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব দিল ভুটান

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮০তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এক জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, উভয় দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করা হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে।

আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী তোবগে ভুটানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি (জিএমসি)’কে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এই সংযোগ স্থাপন করলে দুই দেশই ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগকেও সমৃদ্ধ করবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস এই প্রস্তাবগুলোকে স্বাগত জানান এবং বলেন, “উন্নত সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভুটান তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন স্তরে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের উচিত এই সুযোগগুলোকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য উভয় দেশকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতে হবে।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তোবগে ভুটানের ধর্মীয় পর্যটন সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই ভুটানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংযোগ স্থাপন করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের পর্যটন খাত এবং ধর্মীয় সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তোবগে ভুটানের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা বাংলাদেশের সাথে ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ভুটান তাদের জলবিদ্যুৎ খাতের সুবিধা বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে চায়। পাশাপাশি ভুটান বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এছাড়া ভুটান বাংলাদেশের সহায়তায় ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপনের জন্যও আগ্রহী।

দুই নেতা রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তোবগে নিশ্চিত করেন যে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভুটান অংশগ্রহণ করবে। তিনি এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেন।

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘সু-শাসনে’ রয়েছে। তিনি অধ্যাপককে ‘রোল মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করে ‘মাই প্রফেসর’ বলে সম্বোধন করেন। এছাড়া তিনি নবনির্মিত বাংলাদেশের নতুন চ্যান্সারি ভবনের নকশাও প্রশংসা করেন। নকশাটি ‘হিমালয়ের পাদদেশে বঙ্গোপসাগর’ থিমে তৈরি করা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। শেরিং তোবগে এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে জানান, বাংলাদেশের আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের আগে তিনি হয়তো এ সফর সম্পন্ন করতে পারবেন।

এই বৈঠক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংযোগ স্থাপন নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা দুই দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং পর্যটন খাতের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক জোটকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মহাকাশে দুটি গ্যালাক্সি যুক্ত, বিশাল হাইড্রোজেন সেতু আবিষ্কার

মহাকাশে বামন গ্যালাক্সিগুলির মধ্যেকার গ্যাসীয় মিথস্ক্রিয়া এবং তাদের বিবর্তন প্রক্রিয়া জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল গবেষণার বিষয়। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি রিসার্চ (ICRAR)-এর বিজ্ঞানীদের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার এই বিষয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁরা নিউট্রাল হাইড্রোজেন গ্যাসের এক বিশাল সেতু আবিষ্কার করেছেন, যা দুটি বামন গ্যালাক্সিকে সংযুক্ত করেছে। এই আবিষ্কার শুধুমাত্র গ্যালাক্সিগুলির মিথস্ক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রধান অগ্রগতি নয়, তারার জন্ম ও গ্যালাকটিক গ্যাসের পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি যোগ করেছে।

ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া নোডের ICRAR-এর বিজ্ঞানীরা বামন গ্যালাক্সি NGC 4532 এবং DDO 137-কে সংযুক্তকারী নিউট্রাল হাইড্রোজেন গ্যাসের একটি বিশাল কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন।

গ্যালাক্সি দুটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। গ্যাস সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৮৫,০০০ আলোকবর্ষ, যা এটিকে একটি বিশাল আন্তঃগ্যালাকটিক সংযোগস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই গবেষণায় আরো উন্মোচিত হয়েছে ১.৬ মিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল গ্যাস লেজ। এটি এই ধরনের গ্যাস লেজের মধ্যে আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত দীর্ঘতম কাঠামো। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি Monthly Notices of the Royal Astronomical Society জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রধান গবেষক প্রফেসর লিস্টার স্টেভেলি-স্মিথ এবং সহ-গবেষক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর কেনজি বেক্কি-এর নেতৃত্বাধীন গবেষক দল পর্যবেক্ষণকৃত গ্যাস গতিশীলতার কারণ ব্যাখ্যা করতে একটি বিস্তারিত মডেলিং করেছেন। তাঁদের মডেল অনুযায়ী, এই বিশাল গ্যাসীয় কাঠামোর উৎপত্তির পিছনে দুটি প্রধান বল কাজ করেছে, একটি জোয়ারভাটা বল এবং অপরটি র‍্যাম চাপ ।

গ্যালাক্সি দুটি যখন একে অপরের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছিল, তখন তাদের মধ্যেকার মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া বা জোয়ারভাটা বলগুলি গ্যাসকে গ্যালাক্সিগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেতুর আকারে টেনে নিয়ে যায়। গ্যালাক্সিগুলির মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে জোয়ারভাটা বল একটি সাধারণ ঘটনা হলেও, এই ক্ষেত্রে এর তীব্রতা ও ফলাফল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আবিষ্কারটির আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Virgo cluster of galaxies-এর নৈকট্য। বামন গ্যালাক্সি দুটি এই সুবিশাল গ্যালাক্সি স্তবকের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছিল। Virgo clusterকে ঘিরে থাকা গ্যাস মেঘের তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি উষ্ণ।

এই উষ্ণ গ্যাস মেঘের মধ্য দিয়ে গ্যালাক্সিগুলি যখন উচ্চ গতিতে পতিত হয়, তখন তারা র‍্যাম চাপ নামে পরিচিত এক তীব্র চাপের সম্মুখীন হয়।প্রফেসর স্টেভেলি-স্মিথ এই প্রক্রিয়াটিকে উপগ্রহের বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন, তবে এই প্রক্রিয়াটি প্রায় এক বিলিয়ন বছর ধরে বিস্তৃত। উচ্চ ইলেকট্রন ঘনত্ব এবং গ্যালাক্সিগুলির দ্রুত পতনের ফলে তাদের ভেতরের গ্যাসগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে উষ্ণ গ্যাস মেঘের সাথে মিশে যায়, যা সেতু এবং লেজের কাঠামো তৈরির কারণ। এই র‍্যাম চাপ বামন গ্যালাক্সিগুলির বিবর্তনে এক মারাত্মক ভূমিকা পালন করে।

এই আবিষ্কারটি সম্ভব হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা CSIRO দ্বারা পরিচালিত ASKAP রেডিও টেলিস্কোপ-এর ওপর নির্ভরশীল Widefield ASKAP L-band Legacy All-sky Survey নামক একটি বৃহৎ কর্মসূচির মাধ্যমে। WALLABY জরিপের মূল লক্ষ্যই হলো মহাকাশে নিউট্রাল হাইড্রোজেন গ্যাসের বণ্টন ও বিন্যাস নিয়ে গবেষণা করা।

অধ্যাপক বেক্কি উল্লেখ করেন নিউট্রাল হাইড্রোজেন (Neutral Hydrogen) গ্যাসের উচ্চ-রেজোলিউশন এই ধরনের বিশাল কাঠামো শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে। নিউট্রাল হাইড্রোজেন তারার জন্ম প্রক্রিয়ায় এক মৌলিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। এই গ্যাসই ভবিষ্যতে নতুন নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সির সৃষ্টিতে কাঁচামাল যোগায়।

অধ্যাপক স্টেভেলি-স্মিথ এই নব-আবিষ্কৃত সিস্টেমটিকে আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে এবং ম্যাজেলানিক সিস্টেম-এর সাথে তুলনা করেছেন।আমাদের মিল্কিওয়েও তার দুটি বামন সহচর গ্যালাক্সি, বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র ম্যাজেলানিক ক্লাউডের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত।

এই গবেষণাটি গ্যালাকটিক গ্যাস কীভাবে পুনর্বন্টিত হয়, কীভাবে গ্যালাক্সিগুলি মহাজাগতিক সময়ের সাথে বিবর্তিত হয় এবং তারা গঠনের জন্য উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত পরিস্থিতিতে কীভাবে গ্যাস প্রভাবিত হয়, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। গ্যাস সেতু এবং লেজের গতিশীলতা বোঝার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিশাল কাঠামো এবং তাদের জীবনচক্র সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন।

দুর্গাপূজা ঘিরে গুজব ও সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গুজব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “পূজা ঘিরে গুজব রটানো বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করার যে কোনো প্রচেষ্টা আমরা বরদাস্ত করব না। প্রতিবেশী দেশ ও ফ্যাসিস্টের দোসরেরা বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকবে এবং এখন পর্যন্ত কোনো শঙ্কাজনক ঘটনা ঘটেনি।”

তিনি আরও জানান, এবারের পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩,৩৫৫, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার বেশি। এ উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থার শীর্ষপর্যায়ের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আনসার সদস্য হিসেবে ২,০৩,৫৬৪ জন মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া পুলিশের সংখ্যা ৭০,০০০, সশস্ত্র বাহিনীর এক লাখ এবং বিজিবি হিসেবে ৪৩০টি প্লাটুন দায়িত্বে থাকবে।

ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে অতিরিক্ত টহলদারি করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “অনেক জায়গায় গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কখনো কোনো ঘটনা না ঘটলেও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সাংবাদিকদের আমরা আহ্বান জানাই, তারা সঠিক তথ্য পরিবেশন করবেন এবং গুজবের প্রতিহতিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন।”

সভার সময় সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্নও করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজকে বিমানবন্দরে আটক হওয়ার কারণ জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কোনো মন্তব্য করেননি। এছাড়া খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে এবং সর্বস্তরের মানুষ উৎসব উদযাপনে অংশগ্রহণ করবে। তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে অবহেলা করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে হবে।

কামুর The Plague – অনিশ্চয়তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ কীভাবে বাঁচে?

মৃত্যু কি কেবল একটি জৈবিক সমাপ্তি? নাকি তা এক মহাকাব্য, যা আমাদের শিখিয়ে যায় মানুষের প্রকৃত পরিচয়? আলবেয়ার কামুর ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস “দ্য প্লেগ” কেবল ১৯৪০-এর দশকে ইউরোপে ঘটে যাওয়া এক মহামারীর নিছক আখ্যান নয়। এটি মূলত মানব অস্তিত্বের এক শাশ্বত প্রশ্নচিহ্ন—অকস্মাৎ নেমে আসা অমঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কীভাবে তার নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে? কামু এই উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার উপকূলীয় শহর ওরাঁ-কে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্লেগকে শুধুমাত্র একটি রোগ হিসেবে চিত্রিত করেননি, বরং এটিকে তিনি মানবজীবনে অনিবার্য অমঙ্গল, অযৌক্তিকতা এবং নৈরাশ্য-এর এক শক্তিশালী রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

উপন্যাসটির শুরুতেই দেখা যায় একটি সাধারণ একঘেয়ে শহরে ইঁদুরের মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় এই মহাবিপর্যয়। প্রথমে কেউই এর গুরুত্ব বোঝে না, কিন্তু যখন মানুষের মৃত্যু শুরু হয় তখন শহরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বিচ্ছিন্নতা ও নির্বাসনই জন্ম দেয় গভীর মানবিক ভীতি।

ওরাঁর নাগরিকরা হঠাৎ করেই তাদের পরিচিত আরামদায়ক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের কাছে এই প্লেগ ছিল এক অনাহুত অতিথি, যা ঈশ্বরের অভিশাপ বা প্রকৃতির খেয়াল কোনো কিছুরই যুক্তি মানে না। এটিই হলো কামুর মতে মানব অস্তিত্বের অযৌক্তিকতা বা Absurdity-র প্রকাশ। মৃত্যু যখন এতই নৈর্ব্যক্তিক ও দৈব, তখন মানুষ অসহায় বোধ করে।

এই ভীতির কয়েকটি স্তর উপন্যাসে দেখা যায়। প্রথম দিকে মানুষ বিশ্বাসই করতে চায়নি প্লেগ এত গুরুতর হতে পারে। তারা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছিল। সাথে আছে শহর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার ও প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তীব্র বেদনা। ডক্টর বার্নার্ড রিয়ো-র নিজের স্ত্রীকে শহরের বাইরে রেখে আসা এবং সাংবাদিক রামবার্ট-এর প্রেমিকার কাছে ফিরে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা এই যন্ত্রণার প্রতীক।

মৃত্যুর হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভয় তাদের গ্রাস করে। এই পরিস্থিতিতে কামুর চরিত্ররা নিজেদেরকে পৃথিবীর একাকী বাসিন্দা হিসেবে অনুভব করে, যেখানে মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে থাবা বসাতে পারে।

এই ভীতিই মানুষকে আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করায়। তারা জানতে চায় এই অমঙ্গলের কারণ কী? কেন এমন ঘটলো? ধর্মযাজক প্যানেলু প্রথমে একে মানুষের পাপের জন্য ঈশ্বরের শাস্তি বললেও, প্লেগের ভয়াবহতা ও এক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু দেখে তাঁর মত পাল্টে যায়। তিনি বোঝেন অমঙ্গল কেবল পাপীদের জন্য আসে না, তা নির্বিচারে আঘাত হানে।

ভীতির চরম পর্যায়ে কামু এক নতুন পথের সন্ধান দেন, আর তা হলো সমষ্টিগত প্রতিরোধ ও মানবিক সংহতি। কামুর মতে, যদি মানুষের জীবনে অমঙ্গল ও অযৌক্তিকতা অনিবার্য হয় তবে তার মোকাবিলা করার একমাত্র পথ হলো এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, যা তিনি অভিহিত করেছেন বিদ্রোহ হিসেবে। প্লেগের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহই হলো নৈতিকতা।

এই প্রতিরোধের নৈতিক ভিত্তি তিনটি প্রধান চরিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিয়ো হলেন উপন্যাসের প্রধান মানবতাবাদী চরিত্র। তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা প্লেগের কারণ নিয়ে তর্কে না গিয়ে কেবল মানুষের যন্ত্রণা কমানো ও বাঁচার জন্য লড়াই-এ বিশ্বাসী। তাঁর কাছে প্লেগ হলো এমন এক রোগ যা বারবার ফিরে আসতে পারে। তাই তার বিরুদ্ধে কাজ করে যাওয়াটাই সততা। রিয়ো কোনো বীর নন, তিনি একজন সাধারণ মানুষ যিনি কোনো পুরস্কারের আশা না করে তার পেশাগত ও মানবিক দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁর নিঃস্বার্থ শ্রম প্লেগের বিরুদ্ধে মানবিক সংহতির মূল স্তম্ভ।

জ্যাঁ তারু হলেন সেই চরিত্র যিনি প্লেগকে মানব সমাজের এক স্থায়ী নৈতিক অসুস্থতা হিসেবে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই “প্লেগ” সুপ্ত থাকে এবং এই অমঙ্গলের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে। তিনি প্লেগের মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করেন। তারুর কাছে ভালোবাসা ও সংহতিই হলো এই রোগের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরোধ।

পৌরসভার কর্মচারী জোসেফ গ্রাঁ আপাতদৃষ্টিতে অকিঞ্চিত্কর। তিনি একটি নিখুঁত বাক্য লেখার চেষ্টা করেন, কিন্তু কখনও শেষ করতে পারেন না। গ্রাঁ-এর মতো সাধারণ মানুষের নীরব, দৈনিক পরিশ্রম, যারা কেবল কোনো বড় স্বীকৃতির প্রত্যাশা না করে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তা-ই হলো এই প্রতিরোধের আসল ভিত্তি। কামু দেখিয়েছেন, বড় বড় বুলি বা দার্শনিক বিতর্কের চেয়ে এই দৈনিক, নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্লেগ উপন্যাসের শেষে রোগ বিদায় নিলেও কামু সতর্ক করে দেন, প্লেগের বীজ কখনও পুরোপুরি মরে না, তা সুপ্ত থাকে এবং যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারে।

“দ্য প্লেগ” আধুনিক মানুষকে শেখায় অমঙ্গল যখন সম্মিলিতভাবে আসে, তখন তাকে সমষ্টিগত সংহতির মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হয়। এটি এমন এক নৈতিকতার কথা বলে, যা কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, প্রতিষ্ঠিত মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও অকৃত্রিম ভালোবাসার ওপর। এই উপন্যাসের মাধ্যমে কামু মানবিক ভীতিকে জয় করে প্রতিরোধের এক শক্তিশালী নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও পৃথিবীর যেকোনো মানবিক সঙ্কটে মানুষের বাঁচার এবং লড়াই করার অনুপ্রেরণা যোগায়।

ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ শুরু করছে চীন

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, তিব্বতের পূর্বাঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, এই প্রকল্পের আনুমানিক খরচ প্রায় ১৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা চীনের জৈবিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগের একটি। এই বাঁধ প্রকল্প থ্রি গর্জেস বাঁধের পর চীনের সর্বাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকল্পটি পাঁচটি ধাপের জলবিদ্যুৎ স্টেশন নিয়ে গঠিত, যা বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। এটি যুক্তরাজ্যের গত বছরের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ। বাঁধটি ইয়ালুং জাংবো নদীর নিম্নাঞ্চলে নির্মিত হবে, যেখানে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে নদীর পতন উচ্চতা ২,০০০ মিটার, যা বিশাল হাইড্রোপাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।

তবে এই প্রকল্পের ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশের নদীর নিম্নাংশের মানুষের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো সতর্ক করেছে, তিব্বতের এই অঞ্চলের একাধিক প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্যময় পরিবেশ বিপদের মুখে পড়তে পারে। চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বাঁধটি তিব্বেত এবং চীনের অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সাহায্য করবে, তবে নিম্নাঞ্চলের জল সরবরাহ বা পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলবে না।

এই ঘোষণার পর চীনের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। CSI Construction & Engineering Index সাত মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং Power Construction Corporation ও Arcplus Group PLC-এর শেয়ারের মূল্য দৈনিক সীমার ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে। শাংহাই ঝুওঝুও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অংশীদার ওয়াং ঝু বলছেন, “প্রকল্পটি বিনিয়োগের দিক থেকে বন্ড-এর মতো লাভ প্রদান করবে, তবে জুয়া বা স্পেকুলেটিভ বিনিয়োগে শেয়ারের মূল্য অযথা বাড়তে পারে।”

প্রকল্পটি সিমেন্ট, সিভিল বিস্ফোরক ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা বাড়াবে। হুনান ডাকসুন টানেল ইন্টেলিজেন্ট ইকুইপমেন্ট ও জিওক্যাং টেকনোলজিস-এর শেয়ারের মূল্য যথাক্রমে ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

চীনা প্রধানমন্ত্রী এই বাঁধকে ‘শতাব্দীর প্রকল্প’ আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেন, পরিবেশগত ক্ষতি রোধে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে। সরকারি বন্ডের রিটার্ন বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা এটিকে অর্থনৈতিক উদ্দীপনার অংশ হিসেবে দেখছেন। প্রকল্পটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত China Yajiang Group-এর তত্ত্বাবধানে চলছে এবং চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, থ্রি গর্জেস বাঁধ প্রায় দুই দশক সময় নিয়েছিল এবং প্রায় এক মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কমপক্ষে সমপরিমাণ মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। ইয়ালুং জাংবো প্রকল্পে কতজনকে স্থানান্তরিত করতে হবে, তা এখনও জানানো হয়নি। নদী ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়ার কারণে downstream এলাকায় কোটি কোটি মানুষ প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রকল্পের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন।

এই প্রকল্প চীনের শক্তি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছে জাতিসংঘ

জাতিসংঘ আবারও ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র এবং একাধিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছে। শনিবার থেকে এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি অভিযোগ করেছে ইরান ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। ওই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া থামানো। তবে ইরান বারবার অস্বীকার করে বলেছে, তাদের লক্ষ্য কেবল শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি উৎপাদন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, তেহরান ‘এর কঠোর জবাব’ দেবে, তবে দেশটি পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বের হবে না। ইতিমধ্যেই তারা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়াও এই নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে দাবি করেছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ জাতিসংঘ মহাসচিবকে সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ একটি বড় ধরনের ভুল হবে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের জন্য আবারও অস্ত্র আমদানি-রফতানি নিষিদ্ধ হবে। এছাড়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট যে কোনো কার্যক্রমে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দের নির্দেশও কার্যকর হবে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইতিমধ্যেই ইরানি অর্থনীতিতে দেখা গেছে। ইরানের মুদ্রা রিয়াল নতুন করে রেকর্ড পতনের মুখে পড়েছে। শনিবার এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়াল নেমে দাঁড়ায় ১১,২৩,০০০-এ, যা একদিন আগে ছিল প্রায় ১০,৮৫,০০০।

ইউরোপীয় শক্তিগুলো বলছে, নিষেধাজ্ঞা মানে কূটনীতির ইতি নয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল মানেই আলোচনার সুযোগ বন্ধ নয়। আমরা কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনও খোলা রাখতে চাই।”

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনার পক্ষপাতী, তবে ইরানকে সরাসরি এবং সৎভাবে আলোচনায় বসতে হবে। ততদিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আর্থিক ও কূটনৈতিকভাবে চাপের মুখে ইরানকে সতর্ক করে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক স্থিতিশীলতার জন্য তারা কূটনৈতিক পথে সহযোদ্ধা হবে কি না।

২০০০ বছরের নিস্তব্ধতা থেকে হিব্রু ভাষার পুনর্জীবন

আজকের বিশ্বে হিব্রু একটি সজীব ভাষা, কোটি কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করে। অথচ প্রায় দেড়শো বছর আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, ভাষাটিকে কেবল প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে হিব্রু ভাষা ছিল একপ্রকার সুপ্ত অবস্থায়। এই সময়ে ইহুদি জনগোষ্ঠী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের নতুন আবাসস্থলের ভাষা গ্রহণ করে। উনিশ শতকের শেষ দিকে, হিব্রু শব্দভাণ্ডার সীমিত ছিল কেবল হিব্রু বাইবেল-এর প্রাচীন ও ধর্মীয় ধারণার মধ্যে। ‘সংবাদপত্র’, ‘শিক্ষা জগত’, ‘মাফিন’ বা ‘গাড়ি’-এর মতো আধুনিক ধারণাগুলোর জন্য কোনো শব্দই তখন ছিল না।

খ্রিস্টপূর্ব ১৩ থেকে ২য় শতাব্দী পর্যন্ত হিব্রু ভাষা পূর্ণ বিকশিত ছিল। এই সময়েই হিব্রু বাইবেল সংকলিত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী পর্যন্ত হিব্রু দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এর পর থেকেই ইহুদিরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও নিপীড়িত হতে শুরু করে। রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, মধ্যযুগ, রেনেসাঁস পেরিয়ে তারা ইউরোপজুড়ে অভিবাসনে বাধ্য হয় এবং যে দেশে যেত, সেই দেশের ভাষা গ্রহণ করত। এভাবে হিব্রু, জার্মান ও স্লাভিক ভাষার মিশ্রণ ইদ্দিশ-এর মতো নতুন ভাষারও জন্ম হয়।

তবুও ইহুদিরা “গ্রন্থের মানুষ” হিসেবে পরিচিত ছিল। তোরাহ অধ্যয়ন এবং তা জোরে পাঠ করার মতো ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তারা বাইবেল পাঠের জন্য হিব্রু শেখা চালিয়ে যায়। ফলে লিখিত হিব্রু এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে প্রধানত ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে টিকে ছিল। ব্যতিক্রমও ছিল, শিক্ষিত ইহুদিরা হিব্রুতে নিজেদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করতেন, কখনও কখনও ব্যবসায়ীরা ব্যবসার নথি সংরক্ষণের জন্য এটি ব্যবহার করতেন। জেরুজালেমের হিব্রু ভাষা ইতিহাসবিদ মেইরাভ রিউভেনি জানান, ১০ম থেকে ১৪শ শতাব্দীতে স্পেনের আন্দালুসিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ হিব্রু কবিতার এক বিশাল বিস্তার ঘটেছিল।

১৯শ শতাব্দীতে ইউরোপের বেশিরভাগ ইহুদি তখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতেন। এমন সময়ে একটি নতুন আন্দোলনের জন্ম হলো, যা ইহুদিদের গৌরবময় অতীতকে তুলে ধরে আশার সঞ্চার করতে হিব্রুকে ব্যবহার করতে চাইল। হিব্রু পুনরুজ্জীবনকারীরা এই ভাষাটিকে বাইবেলের বিমূর্ত ধারণার বাইরে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন এটি আধুনিক ঘটনা, রাজনীতি, দর্শন এবং ওষুধ নিয়ে কথা বলতে সক্ষম হোক।

এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন এলিয়েজার বেন-ইহুদা, যাকে আধুনিক হিব্রুর জনক বলা হয়। বেন-ইহুদা বিশ্বাস করতেন, ইহুদিদের সমৃদ্ধির জন্য একটি দেশ এবং একটি ভাষার প্রয়োজন। ১৮৮১ সালে তিনি জেরুজালেমে চলে যান, যেখানে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী শুধুমাত্র হিব্রুতেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন যদিও তখন প্রয়োজনীয় আধুনিক জিনিসপত্রের জন্য কোনো শব্দ ছিল না। তাঁরা তাঁদের পুত্র ইতামার বেন-আভিকে প্রায় ২,০০০ বছরে প্রথম স্থানীয় হিব্রু ভাষাভাষী হিসেবে গড়ে তোলেন।

শুরুর দিকে ভাষাটিকে অনেক নতুন শব্দের জন্ম দিতে হয়েছিল। বেন-ইহুদা নতুন হিব্রু শব্দ নিয়ে একটি অভিধান তৈরি করেন। ইউরোপজুড়ে হিব্রু পত্রিকাগুলোও তাদের নিজস্ব শব্দ উদ্ভাবন করত। এটি ছিল এক কঠিন পথ, যেখানে একটি প্রাচীন ও পবিত্র ভাষাকে একটি নতুন ও অপরিচিত ভাষায় রূপান্তর করা হচ্ছিল। কিন্তু ভাষার এই বর্ধন-যন্ত্রণা পেরিয়ে ২০শ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভাষাটি ধীরে ধীরে প্রমিত হয়। ১৯২২ সালে প্রথম আধুনিক হিব্রু অভিধানটি পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রকাশিত হয় এবং হিব্রু ভাষা স্কুল চালু হয়।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সারা বিশ্ব থেকে মানুষ সেখানে আসতে শুরু করে। ইসরায়েলের প্রায় ৯৫ লাখ ২০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের প্রায় সবাই হিব্রু ব্যবহার করেন এবং ৫৫ শতাংশ এটি তাদের মাতৃভাষা হিসেবে বলেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.৫ কোটি হিব্রু ভাষাভাষী আছেন। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিব্রু ভাষা কর্মসূচির পরিচালক মিরিট বেসায়ার বলেন, “রাজা ডেভিড এবং আমি সম্ভবত একে অপরের কথা বুঝতে পারতাম,” যা আধুনিক ইংরেজিতে শেক্সপিয়রের ইংরেজি বোঝার চেষ্টার মতোই। ভাষা স্বভাবতই বিকশিত হয় এবং বৃদ্ধি পায়, এটি অনিবার্য। হিব্রু আজ প্রযুক্তি থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের সব চাহিদা পূরণ করে, যা প্রমাণ করে কটি ভাষা তার ব্যবহারকারীদের চাহিদা মেটাতেই টিকে থাকে এবং বিকশিত হয়।

শক্তিশালী বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে বরফ

পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বরফ। হিমবাহ, পর্বতমালা থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চল পর্যন্ত এর উপস্থিতি সর্বত্র। অথচ এই পরিচিত বস্তুটিই এখনও তার আচরণে নতুন নতুন বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা প্রথমবারের মতো দেখিয়েছে সাধারণ বরফও ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটি প্রদর্শন করে। এর অর্থ হলো, বরফকে যখন যান্ত্রিকভাবে বাঁকানো হয় বা অসমভাবে বিকৃত করা হয়, তখন এটি একটি তড়িৎ আধান তৈরি করতে পারে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত প্রয়োগের নতুন পথ খুলে দিতে পারে এবং বজ্রঝড়ের সময় বিদ্যুৎ কীভাবে তৈরি হয় সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি বুঝতেও সহায়তা করতে পারে।

ইউএবি ক্যাম্পাস এর ICN2, Xi’an Jiaotong University এবং স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি দল Nature Physics জার্নালে প্রকাশিত তাদের কাজে বরফের এই তড়িৎ-যান্ত্রিক আচরণের ওপর আলোকপাত করেছেন।

ICN2 অক্সাইড ন্যানোফিজিক্স গ্রুপের প্রধান গবেষক ডঃ জিন ওয়েন জানান, “আমরা আবিষ্কার করেছি বরফ সকল তাপমাত্রায় যান্ত্রিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় তড়িৎ আধান তৈরি করে।” এর পাশাপাশি গবেষকরা আরও একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা দেখেছেন −১১৩∘C এর নিচের তাপমাত্রায় বরফের পৃষ্ঠে একটি পাতলা ‘ফেরোইলেক্ট্রিক’ স্তর তৈরি হয়। এর মানে হলো, বরফের পৃষ্ঠে একটি প্রাকৃতিক তড়িৎ পোলারাইজেশন (electric polarization) সৃষ্টি হতে পারে, যা বাহ্যিক তড়িৎ ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে উল্টে দেওয়া যায়—ঠিক যেমন চুম্বকের মেরু পরিবর্তন করা হয়।

এই পৃষ্ঠের ফেরোইলেক্ট্রিসিটি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এর অর্থ দাঁড়ায় বরফের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার শুধু একটি নয়, বরং দুটি উপায় রয়েছে! অতি নিম্ন তাপমাত্রায় ফেরোইলেক্ট্রিসিটি এবং −০∘C পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটি।

এই দ্বৈত ক্ষমতা বরফকে টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের মতো উন্নত ইলেক্ট্রোসেরামিক সামগ্রীর কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে, যা বর্তমানে সেন্সর এবং ক্যাপাসিটরের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় ফল হলো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সংযোগ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বরফের এই ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিক আচরণ ঝড়ের মেঘে তড়িৎ আধান সঞ্চয় করতে সাহায্য করে, যা সম্ভবত বজ্রপাত সৃষ্টির মূল রহস্য।

আমরা জানি মেঘের মধ্যে বরফের কণাগুলির সংঘর্ষের ফলে একটি তড়িৎ বিভব (electric potential) তৈরি হয় এবং পরে তা বজ্রপাতের মাধ্যমে মুক্ত হয়। কিন্তু সংঘর্ষের ফলে বরফের কণাগুলি কীভাবে তড়িৎ আধান লাভ করে, তা এতদিন পরিষ্কার ছিল না। কারণ, বরফ জোইলেকট্রিক নয় । অর্থাৎ কেবল সংকুচিত হওয়ার মাধ্যমে এটি আধান তৈরি করতে পারে না। তবে বর্তমান গবেষণা দেখায়, বরফকে যখন অসমভাবে বিকৃত (inhomogeneous deformations) করা হয়, অর্থাৎ যখন তা বেঁকে যায় বা অনিয়মিতভাবে বিকৃত হয় তখন এটি তড়িৎ আধান লাভ করে।

ICN2-এর অক্সাইড ন্যানোফিজিক্স গ্রুপের নেতা অধ্যাপক গুস্তাউ কাতালান ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের গবেষণায়, বরফের একটি স্ল্যাবকে বাঁকানোর মাধ্যমে সৃষ্ট তড়িৎ বিভব পরিমাপ করা হয়েছিল। ফলাফল হুবহু বজ্রঝড়ে বরফের কণাগুলোর সংঘর্ষে পূর্বে observado তড়িৎ বিভবের সাথে মিলে যায়।”

এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটিই সম্ভবত ঝড়ের সময় বজ্রপাত সৃষ্টিকারী তড়িৎ বিভবের জন্ম দেওয়ার একটি অন্যতম সম্ভাব্য কারণ। এই আবিষ্কার কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বুঝতে সাহায্য করবে না, বরফকে সক্রিয় উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে নতুন ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি করবে। গবেষকরা ইতিমধ্যেই ঠাণ্ডা পরিবেশে সরাসরি তৈরি করা যেতে পারে এমন প্রযুক্তির জন্য বরফের এই বৈশিষ্ট্যগুলি কাজে লাগানোর নতুন দিক অন্বেষণ করছেন।

বিশ্বনেতারা অধ্যাপক ইউনূসকে সমর্থন ও বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন

0

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতারা বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্ভাবক অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে চলমান অস্থায়ী সরকারের কার্যক্রম এবং দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা।

সাক্ষাতে অংশগ্রহণকারী নেতারা অধ্যাপক ইউনূসের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য আজীবন সংগ্রামের প্রশংসা করেছেন। তারা একমত হয়েছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মানুষের পাশে আছি এবং আপনাদের পাশে আমরা সম্পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ।’ তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতে আগ্রহী।

লাটভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ভাইরা ভিকে-ফ্রেইবার্গারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অধ্যাপক ইউনূসের হোটেল স্যুইটে উপস্থিত হয়। উক্ত প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন স্লোভেনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বোরুত পোহোর, সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, গ্রিসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জর্জ পাপান্দ্রেউ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রাক্তন সভাপতি শার্ল মিশেল এবং বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মৌরিতানিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানসহ একাধিক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এছাড়া কমনওয়েলথের সাবেক মহাসচিব, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাগেলদিন, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটসের সভাপতি কেরি কেনেডি এবং জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির নির্বাহী পরিচালক মেলান ভারভিয়ারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও সাক্ষাতে অংশগ্রহণ করেন।

বিশ্বনেতারা অধ্যাপক ইউনূসের কর্মকাণ্ডে একজোট হয়ে সমর্থন জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়ের উন্নয়নের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, অতীতের দুর্নীতি ও শোষণের পর বাংলাদেশ এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এবং এই সময় দেশকে স্থিতিশীল ও উন্নত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দক্ষতা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সহায়তা প্রদান অপরিহার্য। কেরি কেনেডি বিশেষভাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আপনারা মানবাধিকারে যে সাফল্য অর্জন করেছেন তা সত্যিই অসাধারণ।’

জর্জটাউন ইনস্টিটিউট শিগগিরই বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানাবে বলে ঘোষণা দেন নির্বাহী পরিচালক মেলান ভারভিয়ার। নিজামী গঞ্জাভি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের সহ-সভাপতি ইসমাইল সেরাগেলদিন বলেন, ‘যখনই আমাদের প্রয়োজন হবে, আমরা আছি।’

অধ্যাপক ইউনূস সাক্ষাতের সময় সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘এটি আমার কল্পনার বাইরে। আপনাদের এভাবে একসঙ্গে দাঁড়ানো আমাদের জন্য অবিশ্বাস্য এবং গভীরভাবে স্পর্শকাতর।’ তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি দীর্ঘ ভূমিকম্পোত্তর পুনর্গঠনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে এ দেশ একটি ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ধাক্কা সহ্য করেছে। মানুষ রাতারাতি অলৌকিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে, অথচ আমাদের সামর্থ্য সীমিত। তবে তরুণদের স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে—তারা নতুন বাংলাদেশ খুঁজছে।’

অধ্যাপক ইউনূস ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘আপনাদের দিকনির্দেশনা, সমর্থন ও নৈতিক শক্তি আমাদের জন্য অমূল্য হবে।’ এই সাক্ষাৎ আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতি সমর্থন ও বিশ্বাসের একটি সুস্পষ্ট প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফ্রিদা কাহলোর ছবিতে মেক্সিকোর আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

ফ্রিদা কাহলো কেবল একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন পোস্ট কলোনিয়াল মেক্সিকোর আত্মানুসন্ধান, জাতীয় চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শের এক জীবন্ত ক্যানভাস। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিগুলো কেবল ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখের প্রতিচ্ছবি নয়, সেগুলি হলো বিপ্লবোত্তর মেক্সিকোর জটিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মেক্সিকো এক দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসন ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসছিল। ১৯১০ সালের মেক্সিকান বিপ্লব দেশটির ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ সৃষ্টি করে। এই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং স্পেনীয় ও ইউরোপীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে ‘মেক্সিকানিজম’ বা খাঁটি মেক্সিকান ঐতিহ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্ম এই বিপ্লবের আদর্শিক উত্তরাধিকার বহন করে।

বিপ্লবোত্তর সরকার, বিশেষ করে হোসে ভাসকোন্সেলোসের মতো শিক্ষাবিদদের উদ্যোগে, শিল্প ও শিক্ষাকে জাতীয়তাবাদ প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফ্রিদা এই সময়ে তাঁর শিল্পকর্মে আদিবাসী সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোককথা এবং প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর গুরুত্ব দেন।

তাঁর চিত্রকর্মে প্রায়শই দেখা মেলে মেক্সিকোর গ্রামীণ জীবন, প্রাক-কলম্বীয় শিল্পকলা ও লোকশিল্পের এক মেলবন্ধন। তাঁর অনেক প্রতিকৃতিতে তিনি “তেহোয়ানা” পোশাক পরিধান করতেন—যা মেক্সিকোর মাতৃতান্ত্রিক তেহুয়ানতেপেক অঞ্চলের প্রতীক, এই পোশাক পরিধানের মাধ্যমে তিনি শুধুমাত্র ঐতিহ্যকে ধারণ করেননি বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও আদিবাসী ঐতিহ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

উপনিবেশ-উত্তর মেক্সিকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সাংস্কৃতিক দ্বৈততা বা সংকর পরিচয়। স্পেনীয় ঔপনিবেশিকরা আদিবাসী সংস্কৃতিকে দমন করে ইউরোপীয় রীতিনীতি চাপিয়ে দিলেও, সম্পূর্ণরূপে তা মুছে ফেলতে পারেনি। ফলে মেক্সিকোর সংস্কৃতি হয়ে ওঠে এই দুই ধারার এক জটিল মিশ্রণ বা মেস্টিজো সংস্কৃতি।

ফ্রিদা কাহলো তাঁর ‘দ্য টু ফ্রিডাস’ বা ‘দু’জন ফ্রিডা’ চিত্রে এই দ্বৈত পরিচয়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। একটি ফ্রিদা ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত, যার হৃদযন্ত্র ক্ষতবিক্ষত, অন্যজন তেহোয়ানা পোশাকে সজ্জিত এবং তার হৃদযন্ত্র সুস্থ। এই চিত্রটি শুধু ফ্রিডার ব্যক্তিগত ভাঙা হৃদয়ের গল্প নয়, এটি সেই সময়কার মেক্সিকান সমাজের ইউরোপীয় প্রভাব ও নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষার মধ্যেকার রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও দ্বিধা নির্দেশ করে। তিনি ইউরোপীয় সুররিয়ালিজমের দ্বারা প্রভাবিত হলেও, সর্বদা দাবি করতেন যে তাঁর শিল্পকর্ম স্বপ্নের নয়, মেক্সিকোর বাস্তবতার প্রতিফলন।

ফ্রিদা কাহলোর শিল্প কেবল সাংস্কৃতিক নয়, স্পষ্টত বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শেরও বাহক ছিল। তিনি এবং তাঁর স্বামী দিয়েগো রিভেরা দু’জনই ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট এবং মার্কসবাদী। তাঁদের কাজ ছিল মেক্সিকোর শ্রমজীবী মানুষ এবং কৃষকদের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তোলা।

ফ্রিদার চিত্রকর্মে সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান না থাকলেও, নিপীড়িত মানুষ, নারীর সংগ্রাম এবং সামাজিক অবিচারের চিত্রায়ন তাঁর মার্কসবাদী আদর্শের প্রতিফলন। তিনি ১৯৩৭ সালে লিওন ট্রটস্কিকে (Leon Trotsky) মেক্সিকোতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, যা মেক্সিকোর রাজনীতিতে তাঁর সরাসরি সক্রিয়তার প্রমাণ। ‘মার্কসবাদ জন্ম দেবে স্বাস্থ্যবান মেক্সিকোর’ (‘Marxism Will Give Health to the Sick’, ১৯৫৪) শীর্ষক চিত্রে তিনি নিজের শরীরের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কমিউনিজমকে তুলে ধরেছেন, যা স্পষ্টতই শিল্পকে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত। এটি ছিল সেই সময়ের লাতিন আমেরিকার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার।

উপনিবেশ-উত্তর মেক্সিকোতে নারীর ভূমিকা এবং অধিকার ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয়। ফ্রিডা তাঁর শিল্পে নারীর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, গর্ভপাত, অসুস্থতা ও ভাঙা সম্পর্কের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছেন। এই আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত বিষয়গুলির চিত্রায়ন আসলে ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর শারীরিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মমর্যাদার জন্য এক রাজনৈতিক সংগ্রাম।

‘হেনরি ফোর্ড হাসপাতাল’ এবং ‘মাই বার্থ’ এর মতো চিত্রগুলি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং শারীরিক যন্ত্রণাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে। এটি ছিল সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজে নারীবাদী একটি পদক্ষেপ, যা ব্যক্তিগতকে রাজনৈতিক করার মাধ্যমে উপনিবেশ-উত্তর মেক্সিকোর সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি ছিলেন আধুনিক মেক্সিকান নারীর স্বাধীনতার প্রতীক, যিনি তাঁর জীবন, পোশাক ও শিল্পকলার মাধ্যমে প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।

ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্ম উপনিবেশ-উত্তর মেক্সিকোর রাজনীতির এক বহুমাত্রিক দলিল। তাঁর ক্যানভাসে বিপ্লবের আদর্শ, আদিবাসী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, সাংস্কৃতিক সংকরতা, বামপন্থী রাজনীতি এবং নারীর সংগ্রাম এই সব কিছুই একসূত্রে গাঁথা। ফ্রিডা তাঁর আত্মপ্রতিকৃতির মাধ্যমে কেবল নিজের আত্মাকেই নয়, বরং এক নতুন জাতীয় পরিচয়ের সন্ধানে থাকা একটি দেশের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও ইতিহাসকে চিত্রিত করেছেন। তাঁর শিল্প আজও লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী চেতনা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রাসঙ্গিক।