পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বরফ। হিমবাহ, পর্বতমালা থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চল পর্যন্ত এর উপস্থিতি সর্বত্র। অথচ এই পরিচিত বস্তুটিই এখনও তার আচরণে নতুন নতুন বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা প্রথমবারের মতো দেখিয়েছে সাধারণ বরফও ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটি প্রদর্শন করে। এর অর্থ হলো, বরফকে যখন যান্ত্রিকভাবে বাঁকানো হয় বা অসমভাবে বিকৃত করা হয়, তখন এটি একটি তড়িৎ আধান তৈরি করতে পারে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত প্রয়োগের নতুন পথ খুলে দিতে পারে এবং বজ্রঝড়ের সময় বিদ্যুৎ কীভাবে তৈরি হয় সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি বুঝতেও সহায়তা করতে পারে।
ইউএবি ক্যাম্পাস এর ICN2, Xi’an Jiaotong University এবং স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি দল Nature Physics জার্নালে প্রকাশিত তাদের কাজে বরফের এই তড়িৎ-যান্ত্রিক আচরণের ওপর আলোকপাত করেছেন।
ICN2 অক্সাইড ন্যানোফিজিক্স গ্রুপের প্রধান গবেষক ডঃ জিন ওয়েন জানান, “আমরা আবিষ্কার করেছি বরফ সকল তাপমাত্রায় যান্ত্রিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় তড়িৎ আধান তৈরি করে।” এর পাশাপাশি গবেষকরা আরও একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা দেখেছেন −১১৩∘C এর নিচের তাপমাত্রায় বরফের পৃষ্ঠে একটি পাতলা ‘ফেরোইলেক্ট্রিক’ স্তর তৈরি হয়। এর মানে হলো, বরফের পৃষ্ঠে একটি প্রাকৃতিক তড়িৎ পোলারাইজেশন (electric polarization) সৃষ্টি হতে পারে, যা বাহ্যিক তড়িৎ ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে উল্টে দেওয়া যায়—ঠিক যেমন চুম্বকের মেরু পরিবর্তন করা হয়।
এই পৃষ্ঠের ফেরোইলেক্ট্রিসিটি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এর অর্থ দাঁড়ায় বরফের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার শুধু একটি নয়, বরং দুটি উপায় রয়েছে! অতি নিম্ন তাপমাত্রায় ফেরোইলেক্ট্রিসিটি এবং −০∘C পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটি।
এই দ্বৈত ক্ষমতা বরফকে টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের মতো উন্নত ইলেক্ট্রোসেরামিক সামগ্রীর কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে, যা বর্তমানে সেন্সর এবং ক্যাপাসিটরের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় ফল হলো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সংযোগ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বরফের এই ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিক আচরণ ঝড়ের মেঘে তড়িৎ আধান সঞ্চয় করতে সাহায্য করে, যা সম্ভবত বজ্রপাত সৃষ্টির মূল রহস্য।
আমরা জানি মেঘের মধ্যে বরফের কণাগুলির সংঘর্ষের ফলে একটি তড়িৎ বিভব (electric potential) তৈরি হয় এবং পরে তা বজ্রপাতের মাধ্যমে মুক্ত হয়। কিন্তু সংঘর্ষের ফলে বরফের কণাগুলি কীভাবে তড়িৎ আধান লাভ করে, তা এতদিন পরিষ্কার ছিল না। কারণ, বরফ জোইলেকট্রিক নয় । অর্থাৎ কেবল সংকুচিত হওয়ার মাধ্যমে এটি আধান তৈরি করতে পারে না। তবে বর্তমান গবেষণা দেখায়, বরফকে যখন অসমভাবে বিকৃত (inhomogeneous deformations) করা হয়, অর্থাৎ যখন তা বেঁকে যায় বা অনিয়মিতভাবে বিকৃত হয় তখন এটি তড়িৎ আধান লাভ করে।
ICN2-এর অক্সাইড ন্যানোফিজিক্স গ্রুপের নেতা অধ্যাপক গুস্তাউ কাতালান ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের গবেষণায়, বরফের একটি স্ল্যাবকে বাঁকানোর মাধ্যমে সৃষ্ট তড়িৎ বিভব পরিমাপ করা হয়েছিল। ফলাফল হুবহু বজ্রঝড়ে বরফের কণাগুলোর সংঘর্ষে পূর্বে observado তড়িৎ বিভবের সাথে মিলে যায়।”
এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে ফ্লেক্সোইলেক্ট্রিসিটিই সম্ভবত ঝড়ের সময় বজ্রপাত সৃষ্টিকারী তড়িৎ বিভবের জন্ম দেওয়ার একটি অন্যতম সম্ভাব্য কারণ। এই আবিষ্কার কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বুঝতে সাহায্য করবে না, বরফকে সক্রিয় উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে নতুন ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি করবে। গবেষকরা ইতিমধ্যেই ঠাণ্ডা পরিবেশে সরাসরি তৈরি করা যেতে পারে এমন প্রযুক্তির জন্য বরফের এই বৈশিষ্ট্যগুলি কাজে লাগানোর নতুন দিক অন্বেষণ করছেন।


