Home Blog Page 11

২০৩৫ সালের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে দেশের ১১ শতাংশ মানুষ

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল শুরু হয় দুই দিনব্যাপী ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘স্বাস্থ্য ও কৃষিতে জৈবপ্রযুক্তি’।সম্মেলনের স্লোগান ছিল “টেকসই স্বাস্থ্য ও কৃষির জন্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকার”, এটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশী বায়োটেকনোলজিস্টস যৌথভাবে আয়োজন করে।

সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ক্যান্সার এখন শতাব্দীর এক অব্যাহত চিকিৎসা চ্যালেঞ্জ। ডা. তাসনিম আরা জানান, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্যান্সার মূলত জেনেটিক অস্থিতিশীলতার কারণে হয়। এই অস্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটায় এবং ম্যালিগন্যান্ট কোষে রূপান্তরিত করে।ফলে কোষগুলো শরীরের স্বাভাবিক কোষের মতো আচরণ না করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে এবং আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। এ জেনেটিক পরিবর্তন ডিএনএ, আরএনএ বা প্রোটিন স্তরে ঘটতে পারে এবং এর পেছনে জিনগত, পরিবেশগত ও জীবনযাত্রার কারণগুলো একত্রে কাজ করে।

ডা. তাসনিম আরা আরও জানান, ক্যান্সার নিরাময়ে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করছে। এই পদ্ধতিগুলো রোগীর নির্দিষ্ট জেনেটিক প্রোফাইল অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সক্ষম, যা নির্ভুলতা বাড়ায় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমায়।

সম্মেলনের আরেকটি বৈজ্ঞানিক আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাদিম মাহমুদ লিকুইড বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, রক্ত বা মূত্রের নমুনা থেকে ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব, যা রোগীর জন্য অনেক সহজ ও কম আঘাতপূর্ণ। বিশেষ করে মূত্রথলি ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রচলিত সিস্টোস্কোপি অস্বস্তিকর হলেও লিকুইড বায়োপসি রোগীর জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এটি রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়ায় এবং চিকিৎসায় দ্রুততা আনে।

সম্মেলনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বৃদ্ধির সমস্যা নিয়েও সতর্ক করা হয়। বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর সমাধানে ব্যাকটেরিয়াফেজ উৎপন্ন এন্ডোলাইসিন প্রতিশ্রুতিশীল বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি নির্দিষ্ট জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম এবং জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ নিয়েও বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আনোয়ারুল আবেদীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও লবণাক্ততা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। উত্তরাঞ্চলে খরার কারণে মাটির আর্দ্রতা কমছে, ফলে ফসলের ফলন কমছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রস্তরের বৃদ্ধি ও জোয়ার প্রবেশ মাটির লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফসলের খরা ও লবণাক্ততা সহনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আলিমুল ইসলাম বলেন, এই সমস্যা মোকাবেলায় রোগ নির্ণয়, ভেটেরিনারি ও মৎস্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল লতিফ, জিএনওবিবির সভাপতি অধ্যাপক জেবা ইসলাম সিরাজ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবিদুর রহমান এবং মাল্টিমোড গ্রুপের সিইও আবদুল আউয়াল মিন্টু। সম্মেলনের দিনব্যাপী বিভিন্ন সেশনে দেশ-বিদেশের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা ক্যান্সার, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, কৃষি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈবপ্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

সম্মেলনের আলোচনাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার ১১ শতাংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা গুরুতর এবং তা মোকাবেলায় জৈবপ্রযুক্তি, নির্ভুল চিকিৎসা ও কৃষি প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।

লাদাখে জেন–জি আন্দোলনে চ্যালেঞ্জে মোদি সরকার

লাদাখ হিমালয়ের উচ্চভূমির শীতল মরু অঞ্চল, যা ভারত-চীনের সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বুধবার লাদাখ এক সহিংস বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে। জেন-জি প্রজন্মের তরুণরা নেতৃত্বে থাকা এই বিক্ষোভে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আঞ্চলিক কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিক্ষোভে অন্তত চারজন নিহত এবং বহু আহত হয়েছেন।

স্থানীয় অধিকারকর্মী ও সমাজসেবী শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে মোদি সরকার লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে মিলিত রাজ্যের অংশ থেকে আলাদা করে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসিত অঞ্চল ঘোষণা করেছিল। এর ফলে লাদাখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষমতা বাতিল হয়ে যায়। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে স্থানীয় নাগরিক সংস্থাগুলো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও অনশন চালিয়ে আসছিল। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বিস্তৃত সংবিধানিক নিরাপত্তা এবং রাজ্যের মর্যাদা দাবি করছেন।

বুধবার বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় যখন অনশন ১৫তম দিনে প্রবেশ করে। লাদাখ অ্যাপেক্স বডি অনশনের নেতৃত্বে অনশন চলছিল। অনশনে অংশ নেওয়া দুই কর্মী হাসপাতালে ভর্তি হলে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা ‘শাটডাউনের’ ডাক দেন। অনশন ও আলোচনার বিলম্ব তরুণদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে।

এরপর জেন-জি প্রজন্মের তরুণরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে বের হয়ে স্থানীয় সরকারি ভবন ও বিজেপি কার্যালয়ের দিকে যায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংঘর্ষে ৩০ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। আত্মরক্ষার জন্য কিছু নিরাপত্তাকর্মী গুলি ছুড়েছেন।

অ্যাপেক্স বডির সমন্বয়ক জিগমত পালজর বলেন, “লাদাখের ইতিহাসে এটি একটি ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী দিন। পাঁচ বছর ধরে সরকারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং তরুণরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।” তিনি সহিংসতার পর অনশন প্রত্যাহার করে শান্তির আহ্বান জানান।
সোনম ওয়াংচুক গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বলেন, ‘এটা ছিল তরুণদের উন্মাদনা, একধরনের জেন-জি বিপ্লব।’ তিনি নেপালের সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের উদাহরণও উল্লেখ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিজে কখনো সহিংসতার ডাক দেননি।

লাদাখে মুসলিম ও বৌদ্ধ জনসংখ্যা প্রায় সমান। মোদি সরকারের কেন্দ্রীয় শাসন পরবর্তী বিধানে লাদাখের আইনসভা নেই, ফলে স্থানীয় অধিকার ও নির্বাচনের সুযোগ নেই। এই অসমতা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লাদাখে আগে থেকেই অসংখ্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও অনশন হয়েছে। মার্টার্স মেমোরিয়াল পার্কে নামকরণ করা হয়েছে ১৯৮১ ও ১৯৮৯ সালের নিহত বিক্ষোভকারীদের নামে। বুধবারের সহিংসতা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার জন্য ‘বিশৃঙ্খল জনতা’কে দায়ী করেছে। তারা বলেছে, সোনম ওয়াংচুক এবং অন্যান্য নেতা সহিংসতা উদ্দীপিত করেছেন। তবে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা সতর্ক করেছেন, সরকার যদি শান্তিপূর্ণ দাবিগুলো উপেক্ষা করে,তাহলে তরুণদের ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

লাদাখে এই ঘটনা কেবল স্থানীয় নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ, বিশেষত স্বায়ত্তশাসনের অভাব কীভাবে সহিংস উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।

ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

ইতিহাসের পাতায় এক অমোঘ প্রশ্ন, কে ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা? আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইউরোপের এক কোণে লুকিয়ে থাকা সেই পুরোনো রাজ্যগুলোর জটিল রাজনীতি আর ক্ষমতার খেলা উন্মোচিত হয়। বর্তমান পণ্ডিতদের মতে, এই সম্মানের দাবিদার হলেন এথেলস্টান (Aethelstan)।

কিন্তু ‘রাজা’ হতে গেলে ঠিক কী লাগে? কেবল মানুষের ওপর কর্তৃত্ব? নাকি ভূমির দখল? নাকি দুটোই! এই প্রশ্নই মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রের জন্ম ও বিকাশকে বুঝতে সাহায্য করে। আর এই জটিলতার কারণেই প্রথম রাজার পরিচয় নির্ণয় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসই এর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

প্রথম রাজার খোঁজ করতে গেলে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে অ্যাংগেলস)-দের দিয়ে। ইংল্যান্ড (England) নামটিও এসেছে পুরোনো ইংরেজি শব্দ Englaland থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ “অ্যাংগেলদের ভূমি”। ৫ম শতাব্দীতে রোমান প্রদেশ ‘ব্রিটানিয়া’-তে স্যাক্সন, জুটস এবং ফ্রিসিয়ানদের সাথে এই জার্মানিক উপজাতিরা আসতে শুরু করে।

৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই জার্মানিক উপজাতি এবং স্থানীয় রোমানো-ব্রিটিশ সংস্কৃতি মিশে গিয়ে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে স্বতন্ত্র রাজ্যগুলো গঠিত হয়। মজার বিষয় হলো, এই রাজ্যগুলো ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে বরং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল। সময় গড়ানোর সাথে সাথে ছোট ছোট রাজ্যগুলো একত্র হয়ে বৃহত্তর রাজ্যের জন্ম দেয় এবং জন্ম হয় তথাকথিত হেপ্টার্কি (Heptarchy) বা সাত রাজ্যের।

হেপ্টার্কি একটি অতি-সরলীকরণ হলেও কেনট, সাসেক্স, ইস্ট অ্যাংলিয়া, নর্থামব্রিয়া, এসেক্স, ওয়েসেক্স এবং মার্সিয়া—এই সাতটি প্রধান রাজ্যই ছিল সেই সময়ের ক্ষমতার কেন্দ্র। প্রতিটি বড় রাজ্যের ভেতরেও ছিল ছোট ছোট রাজ্য, যাদের শাসকরা নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকত। এই রাজত্বের মূল ভিত্তি ছিল আনুগত্য এবং সুরক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক, যা কর এবং সেবার সমন্বয়ে গঠিত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত।

৮ম শতাব্দীতে এই রাজ্যগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে একসময় মার্সিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। এই ধরনের শাসককে ধর্মযাজক বিড তাঁর ‘একলেসিয়াস্টিক্যাল হিস্টোরি’তে এমন একজন শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন যিনি তাঁর নিজের রাজ্যের বাইরের জনগোষ্ঠীর ওপরও “কর্তৃত্ব” বজায় রাখতেন। ৯ শতাব্দীর ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল’ এই ধারণাকে বোঝাতে ব্রেটওয়ালডা শব্দটি ব্যবহার করে, যা তারা প্রায় ৫ম শতাব্দীর শেষ দিকের শাসকদের ক্ষেত্রেও পূর্বাপেক্ষা প্রয়োগ করেছিল।

মার্সিয়ার সেই আধিপত্যে ফাটল ধরে ওয়েসেক্সের রাজা একগ্বার্টের সময়ে। ৮২৫ খ্রিস্টাব্দে একগ্বার্ট মার্সিয়ানদের ইল্ডেনডনের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং এরপর অন্যান্য প্রধান রাজ্যগুলো তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেয়। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল তাঁকে ব্রেটওয়ালডা হিসেবে চিহ্নিত করে, যা তাঁকে প্রথম ইংল্যান্ডের রাজার দাবিদার করে তোলে।

একগ্বার্টের দাবি আরও জোরালো হয় উত্তরাধিকারের স্থিতিশীলতায়। মার্সিয়া যেখানে শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকার নিয়ে ভুগছিল, সেখানে ওয়েসেক্স ছিল সফল। একগ্বার্টের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র এথেলউলফ সিংহাসনে বসেন, যা ওয়েসেক্সে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের নীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এথেলউলফের মৃত্যুর পর তাঁর আরও তিন পুত্র একে একে রাজা হন এবং অবশেষে ৮৭১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আসেন তাঁর চতুর্থ পুত্র আলফ্রেড, যিনি প্রথম ইংল্যান্ডের রাজার আরেক শক্তিশালী দাবিদার।

আলফ্রেডের রাজা হওয়ার কথা ছিল না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তাঁর বড় ভাই এথেলরেড মারা গেলে তিনি ওয়েসেক্সের রাজা হন। রাজা হিসেবে তিনি সেই হানাদারদের বিরুদ্ধে রাজ্যকে রক্ষা করতে থাকেন, যাদের অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল “গ্রেট হিদেন আর্মি” বলে উল্লেখ করেছে।

৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ডেন, নরওয়েজিয়ান এবং সুইডিশদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী ইস্ট অ্যাংলিয়ায় পৌঁছায় এবং এক দশকের মধ্যে ওয়েসেক্স ছাড়া আর সব রাজ্য দখল করে নেয়। ৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এডিংটনের যুদ্ধে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বাহিনীকে পরাজিত করার পর আলফ্রেড তাদের নেতা গুথ্রুমের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করেন, যা ওয়েসেক্স এবং ভাইকিং-নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সীমানা নির্ধারণ করে, এই ভাইকিং এলাকা পরে ডেন’ল নামে পরিচিত হয়।

এই উত্তর দিকের স্থায়ী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপস্থিতি এবং ভাইকিং আক্রমণ আলফ্রেডকে রাজ্য সুরক্ষিত করতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি সামরিক বাহিনী সংস্কার করেন, বার্হস নামক প্রতিরক্ষামূলক বসতি স্থাপন করেন এবং উপকূল রক্ষা করার জন্য একটি নৌবাহিনীও গঠন করেন। এসবের পাশাপাশি আলফ্রেডের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো ইংল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ে অবদান রাখে বলে মনে করা হয়। আর তাঁর নিজস্ব সনদগুলোতে “অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা” হিসেবে তাঁর পদবী ব্যবহারের কারণেও তিনি প্রথম ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার যোগ্য দাবিদার।

৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড মারা যান এবং তাঁর পুত্র এডওয়ার্ড দ্য এল্ডার সিংহাসনে বসেন। এডওয়ার্ড ৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্র এথেলস্টান ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন।

দাদু আলফ্রেড এবং বাবা এডওয়ার্ডের মতো এথেলস্টানও শুরুতে “অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা” ছিলেন। তবে তাঁর রাজত্বের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় ৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ব্রুনানবুর্গের যুদ্ধের পর। রাজা হওয়ার পরের দশকে তিনি ইয়র্ক এবং নর্থামব্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ওয়েলশ, স্কট এবং ভাইকিং ডাবলিনের রাজারা একত্রিত হয়ে এথেলস্টানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ব্রুনানবুর্গের সঠিক অবস্থান এখনো অজানা, তবে অনেক পণ্ডিত এটিকে ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম সংজ্ঞায়িতকারী ঘটনা মনে করেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকলের একটি কবিতা সেই যুদ্ধকে বর্ণনা করে কিভাবে ওয়েস্ট স্যাক্সনরা তাদের শত্রুদের হত্যা করেছিল, যেখানে পাঁচজন বিরোধী রাজা এবং সাতজন আর্ল নিহত হয়েছিল। কবিতাটি জানায়, “এই দ্বীপে এর আগে এত বড় গণহত্যা আর হয়নি।”

অধ্যাপক কার্ল শুমেকার সংক্ষেপে বলেন, “অন্যান্য দাবিদারদের পক্ষে যুক্তি থাকা সত্ত্বেও, প্রমাণের ভার এথেলস্টানের দিকেই বেশি।এথেলস্টানই ইয়র্ক জয় করে, সেখানকার ভাইকিং রাজ্যকে পরাজিত করে এবং উত্তরকে ইংরেজ শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। তাঁর রাজত্বের শেষে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি আমলাতান্ত্রিক এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ অর্জন করেছিলেন।”

ব্রুনানবুর্গের যুদ্ধে এথেলস্টানের বিজয়ই ‘অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা’-র কর্তৃত্বকে স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলস পর্যন্ত প্রসারিত করে। এটিই তাঁর শাসনকে ‘ইংলিশদের রাজা’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এই বিজয়ের মাত্র দুই বছর পরেই তিনি মারা যান, কিন্তু বহু ঐতিহাসিকের কাছে এই বিজয়ই তাঁকে ইংল্যান্ডের প্রথম সত্যিকারের রাজা করে তোলে।

অম্লতা সীমা অতিক্রম করেছে মহাসাগর, হুমকির মুখে সামুদ্রিক প্রাণ ও খাদ্যনিরাপত্তা

বিশ্বের মহাসাগরগুলো প্রথমবারের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ ‘প্ল্যানেটারি হেলথ চেক’-এ ব্যর্থ হয়েছে। জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সমুদ্রের অম্লতা এমন এক সংকটজনক সীমায় পৌঁছেছে যা সামুদ্রিক জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। এর ফলে পৃথিবীর মোট নয়টি ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি’র মধ্যে সপ্তম সীমাও অতিক্রান্ত হলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লব শুরুর পর থেকে মহাসাগরের পৃষ্ঠের pH মান প্রায় ০.১ ইউনিট কমে গেছে, যা অম্লতার ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এর ফলে প্রবালপ্রাচীর, শীতল পানির প্রবাল, আর্কটিক অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রাণীসহ নানা প্রজাতির বাস্তুতন্ত্র নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের ঘাটতির কারণে প্রবাল, ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য খোলসযুক্ত প্রাণী তাদের বৃদ্ধি ও টিকে থাকার জন্য সংকটে পড়ছে। খাদ্যশৃঙ্খলের নিম্নস্তরের এই প্রাণীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সরাসরি স্যামন মাছ, তিমি ও অন্যান্য বৃহৎ প্রাণীকেও প্রভাবিত করছে। শেষ পর্যন্ত এটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠের ৭১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এবং জলবায়ু স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান। প্রতিবেদন তাদেরকে “গ্রহের অঘোষিত রক্ষক” হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু অম্লতা বৃদ্ধি ও উষ্ণায়নের কারণে মহাসাগরের তাপ শোষণক্ষমতা এবং বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ শোষণ করার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এর ফলে মহাসাগরের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে।

প্রতিবেদনটি আরও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, স্বাদুপানি ব্যবহার, জৈব-রাসায়নিক প্রবাহ ও নতুন কৃত্রিম উপাদান ব্যবহারের মতো ছয়টি সীমা আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে এবং সেগুলোর প্রবণতা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এবার মহাসাগরকে কেন্দ্র করে সপ্তম সীমার অতিক্রম একটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে বিলম্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন গবেষক লেভকে সিজার। তিনি বলেন, “একটি গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়াতে এক বছর লাগে, কিন্তু তা মহাসাগরে স্থায়ী হতে হাজার বছর পর্যন্ত সময় নেয়। এই তথ্য দেখে সত্যিই ভয় পাচ্ছি।”

তবে এখনো সমাধানের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো, দূষণ হ্রাস এবং মৎস্যসম্পদ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সমস্যার অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর নীতির উদাহরণ হিসেবে ওজোন স্তর রক্ষা এবং জাহাজ চলাচলে নির্গমন নিয়ন্ত্রণের সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জোহান রকস্ট্রোম বলেছেন, “আমরা পৃথিবীর স্বাস্থ্যের সর্বত্র অবনতি প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু এটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নয়। ওজোন স্তরের পুনরুদ্ধার ও এয়ারোসল দূষণ হ্রাস দেখায়, সঠিক নীতি বৈশ্বিক উন্নয়নের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ব্যর্থতা অনিবার্য নয়, বরং এটি একটি সিদ্ধান্ত। আর এই সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব।”

যেভাবে মাঙ্গা পতাকা হয়ে উঠলো বিদ্রোহের প্রতীক

প্যারিস ও রোম থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা এবং নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত, প্রতিবাদের ময়দানে একটি অদ্ভুত ব্যানার ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে। ফাঁপা গাল, চওড়া হাসি এবং লাল ব্যান্ডযুক্ত খড়ের টুপি পরা এই চরিত্রটি সহজেই চেনা যায় এবং এটি এখন পরিবর্তনকামী তরুণ বিক্ষোভকারীদের হাতে উত্তোলিত হচ্ছে। নেপালের কাঠমান্ডুতে যখন সেপ্টেম্বরের ২০২৫ সালে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে, তখন দেশটির আড়ম্বরপূর্ণ প্রাসাদ এবং ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল সিংহা দরবারের ফটকের মধ্যে যখন আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই পতাকাটিই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের সংজ্ঞায়িত প্রতিচ্ছবি।

সাধারণত কালো পটভূমিতে থাকা এই ছবিটি এসেছে জাপানের অত্যন্ত জনপ্রিয় মাঙ্গা “ওয়ান পিস” থেকে। প্রায় তিন দশক আগে একটি কাল্পনিক জলদস্যু দলের প্রতীক হিসাবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন তরুণদের নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই পতাকা ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে শুরু করে ফিলিপাইন ও ফ্রান্সের বিক্ষোভগুলিতেও দেখা যাচ্ছে। স্ট্র হ্যাট জলদস্যুদের জলি রজার (Jolly Roger)-এর এই বিস্তার মাঙ্গা পাতার গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবাদের ময়দানে এসেছে, তা আসলে Gen Z প্রজন্ম কিভাবে প্রতিবাদের সাংস্কৃতিক শব্দভান্ডারকে নতুন করে সাজাচ্ছে তারই একটি উদাহরণ।

“ওয়ান পিস” এর এই প্রতীক এখন একটি দীর্ঘমেয়াদী টিভি সিরিজ, লাইভ-অ্যাকশন ফিল্ম এবং ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির শুধুমাত্র পণ্য লাইসেন্সিং থেকেই বছরে প্রায় ৭২০ মিলিয়ন ডলার আয় হয় বান্দাই নামকো কোম্পানির, যারা প্যাক-ম্যান (Pac-Man) এবং টেকেন (Tekken) তৈরির জন্য সুপরিচিত।

“ওয়ান পিস”-এর মূল গল্পটি হলো মাঙ্কি ডি. লুফি এবং তার দল স্ট্র হ্যাট জলদস্যুরা স্বাধীনতা এবং অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধানে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্ব সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভক্তদের কাছে “ওয়ান পিস”-এর পতাকাটি কেবল একটি নৈমিত্তিক সজ্জা নয় এটি অবাধ্যতা এবং দৃঢ়তার একটি প্রতীক। একটি জাদুকরী ফল খাওয়ার পর লুফির শারীরিক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা স্থিতিস্থাপকতার এক শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে দুর্নীতি, অসমতা এবং স্বৈরাচারী বাড়াবাড়িতে চিহ্নিত রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের পথ খুঁজে বেড়ানো তরুণদের কাছে অসম্ভব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য তার অবিচল অনুসন্ধান গভীরভাবে অনুরণিত হয়।

বিক্ষোভকারীরা যখন এই পতাকাটি গ্রহণ করে তখন তারা কেবল জনপ্রিয় সংস্কৃতি থেকে একটি নান্দনিকতা আমদানি করে না, তারা এমন একটি আখ্যানের উপর ভরসা করে যা কোটি কোটি মানুষের কাছে ইতিমধ্যেই বোধগম্য।
গত কয়েক বছরে এই পতাকার ব্যবহার বিক্ষোভগুলিতে দেখা যেতে শুরু করে। ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার “ফ্রি প্যালেস্টাইন” বিক্ষোভে এবং একই বছর নিউ ইয়র্কের ফিলিস্তিন-পন্থী বিক্ষোভে এটি ওড়ানো হয়েছিল।

কিন্তু ইন্দোনেশিয়াতে আগস্ট ২০২৫ সালে এই পতাকার রাজনৈতিক জীবন গতি পায়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা সরকারি নীতির প্রতি হতাশা এবং দুর্নীতি ও অসমতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রকাশ করতে এটিকে গ্রহণ করেছিল। এর সময়টি ছিল স্বাধীনতা উদযাপনের সময় দেশপ্রেমিক প্রদর্শনীর জন্য সরকারের আহ্বানের সমসাময়িক, যা আনুষ্ঠানিক জাতীয়তাবাদ এবং তৃণমূলের প্রতিবাদের মধ্যে বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।

কর্তৃপক্ষ যখন পতাকার ব্যবহার নিয়ে কড়া সমালোচনা করে প্রতিক্রিয়া জানায়, তখন এই আন্দোলন আরও গতি লাভ করে. অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতীকটির প্রতি আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন, আর বিক্ষোভকারীরা এটিকে রাজনৈতিক হতাশার বৈধ অভিব্যক্তি হিসাবে দেখেন।

“ওয়ান পিস” জলি রজার পতাকার এত দ্রুত সীমান্ত পার হয়ে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি Gen Z-এর ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফল। এই প্রজন্মই প্রথম যারা পুরোপুরি অনলাইনে বড় হয়েছে, মেমস, অ্যানিমে এবং বৈশ্বিক বিনোদন ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির মধ্যে নিমগ্ন। তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ “নেটওয়ার্কড পাবলিকস” নামক এমন সম্প্রদায়গুলির উপর নির্ভর করে যা আনুষ্ঠানিক সংগঠনের পরিবর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গঠিত হয় এবং কাজ করে।

এই পরিবেশে সংহতির জন্য কোনো দলের সদস্যপদ বা আদর্শের প্রয়োজন হয় না। পরিবর্তে এটি নির্ভর করে ভাগ করে নেওয়া সাংস্কৃতিক রেফারেন্সের উপর। একটি মেম, অঙ্গভঙ্গি বা পতাকা ভাষা, ধর্ম বা ভূগোলের বিভেদ পেরিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ বহন করতে পারে। এই ধরনের সংযোগ গঠিত হয় পরিচিত সাংস্কৃতিক সংকেতগুলির উপর ভিত্তি করে, যা তরুণদের তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভিন্ন হলেও একে অপরের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে সাহায্য করে।
সোশ্যাল মিডিয়া এই সংহতিকে ব্যাপক এবং দ্রুত করে তোলে। ইন্দোনেশিয়ানদের পতাকা ওড়ানোর ভিডিওগুলি টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে ক্লিপ ও পুনরায় শেয়ার করা হয়েছিল, যা তাদের মূল প্রেক্ষাপটের বাইরেও দর্শকদের কাছে পৌঁছায়। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সেপ্টেম্বরের মধ্যে যখন প্রতীকটি দেখা যায় তখন এটি ইতিমধ্যেই তরুণদের বিদ্রোহের ধারণা বহন করছিল।

এটি কেবলই সাধারণ অনুকরণ নয়। নেপালে পতাকাটি তরুণদের বেকারত্ব এবং অনলাইনে প্রদর্শিত রাজনৈতিক রাজবংশের জাঁকজমকপূর্ণ সম্পদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইন্দোনেশিয়ায় এটি দুর্নীতির পটভূমিতে দেশপ্রেমিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে তরুণদের মোহভঙ্গের প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই জলি রজার পতাকাটি ওপেন-সোর্স কোডের মতো কাজ করেছিল।

“ওয়ান পিস” পতাকাটিই একমাত্র নয় যা প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবে নতুনভাবে কল্পনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আন্দোলনগুলিতে, পপ সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য একটি শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠেছে। চিলি এবং বৈরুতে বিক্ষোভকারীরা দুর্নীতি এবং অসমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের দৃশ্যমান সংক্ষিপ্ত রূপ হিসাবে জোকার মাস্ক পরেছিল। থাইল্যান্ডে বিক্ষোভকারীরা একটি হ্যামস্টার সম্পর্কে শিশুদের অ্যানিমে “হামতারো” (Hamtaro)-এর দিকে ঝুঁকেছিল, এর থিম গানটিকে প্যারোডি করে এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিদ্রূপ করার জন্য নরম খেলনা উড়িয়েছিল।

রাজনীতি, বিনোদন এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের এই সংমিশ্রণ একটি হাইব্রিড মিডিয়া পরিবেশকে প্রতিফলিত করে যেখানে ফ্যানডম থেকে নেওয়া প্রতীকগুলি ক্ষমতা অর্জন করে। এগুলি সহজে চেনা যায়, মানিয়ে নেওয়া যায় এবং রাষ্ট্রীয় দমন থেকে রক্ষা করা যায়।

ইন্দোনেশিয়ায় কিছু বিক্ষোভকারী যুক্তি দিয়েছিলেন যে জাতীয় পতাকা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় ওড়ানোর জন্য খুব পবিত্র, হতাশার বিবৃতি হিসাবে জলদস্যু ব্যানারটি ব্যবহার করে।

পতাকাটির বিস্তার আরও একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায় যে কীভাবে প্রতিবাদের ধারণাগুলি সীমান্ত পেরিয়ে চলে। অতীতে যা ভ্রমণ করত তা ছিল সাধারণত অবস্থান ধর্মঘট, মিছিল বা অনশন ধর্মঘটের মতো কৌশল। আজ যা দ্রুততম সঞ্চালিত হয় তা হলো প্রতীক, বিশ্ব সংস্কৃতি থেকে নেওয়া দৃশ্যমান রেফারেন্স যা স্থানীয় সংগ্রামের সাথে মানিয়ে নেওয়া যায় এবং একই সাথে অন্য কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে চেনা যায়।

পতাকাটির এশীয় সড়ক থেকে ফ্রান্স এবং স্লোভাকিয়ার বিক্ষোভ পর্যন্ত যাত্রা দেখায় প্রতিবাদের ব্যাকরণ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের তরুণ কর্মীদের জন্য, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য। ডিজিটাল স্বকীয়তা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছে যারা মেমস, প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক রেফারেন্সের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে যা সহজে সীমানা অতিক্রম করে। জাকার্তা, কাঠমান্ডু বা ম্যানিলার বিক্ষোভকারীরা যখন “ওয়ান পিস” জলি রজার পতাকা ওড়ায়, তখন তারা কেবল অভিনয় করে না বরং তারা একটি সাংস্কৃতিক প্রতীককে প্রতিরোধের জীবন্ত প্রতীকে রূপান্তরিত করে।

২০২৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পাওয়া যাবে HIV প্রতিরোধী সাশ্রয়ী ইনজেকশন

বিশ্বজুড়ে HIV প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। ইউনিট এবং গেটস ফাউন্ডেশন ঘোষণা করেছে, ২০২৭ সালের থেকে ১০০টিরও বেশি দেশে দুই ডোজ HIV টিকা মাত্র ৪০ ডলারে পাওয়া যাবে। এই টিকা মানুষের মধ্যে HIV সংক্রমণ ঝুঁকি প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ কমাতে সক্ষম।

ফ্রান্সের এএফপি সংবাদ সংস্থার জেনেভা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যাতে কম দামের জেনেরিক লেনাকাভির উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে লেনালিডোমাইড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Yestugo ব্র্যান্ডের নামে বাজারজাত করা হয় এবং একটি বছরের ডোজের দাম ২৮,০০০ ডলার। তবে নতুন জেনেরিক সংস্করণটি ৪০ ডলারে দামে পাওয়া যাবে, যা HIV প্রতিরোধের প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করবে।

ইউনিটেডের HIV কৌশল প্রধান কারমেন পেরেজ কাসাস বলেন, “এই সাশ্রয়ী জেনেরিক সংস্করণ HIV প্রতিরোধ কর্মসূচি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ওষুধের মাধ্যমে আমরা HIV সংক্রমণ রোধ করতে পারব।”

ইউনিটেড আরও ঘোষণা করেছে তারা ডঃ রেড্ডিজ ল্যাবরেটরিজ, ক্লিনটন হেলথ অ্যাকসেস ইনিশিয়েটিভ এবং Wits RHI-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে।এর মাধ্যমে ১২০টি দেশে বছরে পর্যাপ্ত ডোজ সরবরাহ করা হবে মাত্র ৪০ ডলারে। প্রথমে এই ইনজেকশনগুলো ভারতে উৎপাদিত হবে। তবে ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশে উৎপাদন করার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই হাতে নেওয়া হয়েছে।

দুই ডোজের টিকা হাফ-বার্ষিকভাবে নেওয়ার পর দেখা গেছে, HIV সংক্রমণের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে কমে যায়। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বব্যাপী HIV প্রতিরোধে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাশ্রয়ী মূল্য এবং সহজলভ্যতা HIV সংক্রমণ রোধের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বর্তমান উচ্চমূল্যের টিকা নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষের কাছে সহজলভ্য নয়। নতুন জেনেরিক সংস্করণটি বাজারজাত হলে HIV প্রতিরোধ কর্মসূচি অনেক বেশি সম্প্রসারিত হবে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

২০২৭ সাল থেকে এই টিকা বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের মাধ্যমে HIV প্রতিরোধে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো আশা করছে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করবে এবং বিশ্বজুড়ে HIV সংক্রমণ হ্রাস করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার জটিল সংঘাত – আরব বসন্ত

আরব বসন্ত বা Arab Spring ২০১০ সালে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া একটি বড় রাজনৈতিক আন্দোলন যা পুরো অঞ্চলকে উল্টে দিয়েছিলো। এটি ছিল, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে এক ধারাবাহিক গণবিক্ষোভ, বিপ্লব এবং সশস্ত্র সংঘাতের ঢেউ। এই আন্দোলনগুলো মূলত স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল।

এটি শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, ছিল এক প্রজন্ম-ব্যাপী অর্থনৈতিক হতাশা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার আকুতির প্রতিফলন। আরব বসন্তের ঢেউ প্রথম ছড়িয়ে পড়েছিল তিউনিসিয়ায় এবং খুব দ্রুত তা মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনগুলো একদিকে যেমন গণতন্ত্রের নতুন দিগন্তের আশা জাগিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি কিছু দেশে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছিল।

আরব বসন্তের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না, বহু ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উপাদানের সম্মিলিত ফল ছিল এটি। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচারী শাসকরা ক্ষমতায় ছিলেন। এই শাসকগোষ্ঠীগুলো জনগণের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করেছিল এবং ভিন্নমত দমন করত। বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছিল।

আরব দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। অনেক দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও এর সুফল সীমিত সংখ্যক অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা চাকরির অভাবে হতাশায় ভুগছিলেন। তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি এই অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতীক হয়ে ওঠে। অধিকাংশ আরব সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য ছিল প্রকট। জনগণের একটি বড় অংশ মৌলিক সেবা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।

আরব বসন্তের অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন ফেসবুক ও টুইটার। এই মাধ্যমগুলো জনগণের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, সংগঠিত হওয়া এবং সরকারের দমন-পীড়নের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। সরকারের সেন্সরশিপ সত্ত্বেও এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

আরব বসন্তের সূত্রপাত হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি তিউনিসিয়ার জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। মাসব্যাপী গণবিক্ষোভের পর দেশটির দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক জাইনুল আবেদিন বেন আলী ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনাটি অন্যান্য আরব দেশের জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে।

তিউনিসিয়ার সাফল্যের পর আরব বসন্তের ঢেউ এসে লাগে মিশরে। ২০১১ সালের ২৫শে জানুয়ারি তাহরির স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। ১৮ দিনের টানা গণবিক্ষোভের পর ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা হোসনি মোবারক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। মিশরের এই ঘটনাটি আরব বসন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।

লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভ দ্রুতই সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ন্যাটো সামরিক জোটের হস্তক্ষেপের পর গাদ্দাফির পতন হয় এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। কিন্তু গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধের শিকার হয়।

ইয়েমেনে প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহের ৩০ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। চাপের মুখে তিনিও ক্ষমতা ছাড়তে সম্মত হন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশটি রাজনৈতিক বিভাজন ও গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। কিন্তু সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করতে শুরু করলে তা দ্রুতই সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। এই সংঘাত এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়, যা আজও চলমান। সে আরব বসন্তের ঢেউয়ে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

বাহরাইনেও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সুন্নি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও সমানাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

আরব বসন্তের ফলাফল ছিল মিশ্র এবং অত্যন্ত জটিল। কিছু দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তা কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। গণতন্ত্রের ব্যর্থতা ছিলো উল্লেখযোগ্য, তিউনিসিয়া ছাড়া অন্য কোনো দেশে আরব বসন্ত স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।মিশর, ইয়েমেন, লিবিয়া এবং সিরিয়ায় ক্ষমতার শূন্যতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সংঘাত নতুন করে জন্ম দেয়। মিশরে হোসনি মোবারকের পতনের পর নির্বাচিত সরকার সামরিক বাহিনীর দ্বারা উৎখাত হয়।

লিবিয়া, ইয়েমেন এবং বিশেষ করে সিরিয়ায় আরব বসন্ত ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এই সংঘাতগুলো আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ এবং জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানকে উৎসাহিত করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

আরব বসন্তের প্রথম দিকে অনেক দেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা লাভ করে। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তিউনিসিয়ায় এন্নাহদা পার্টি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু এই দলগুলোর শাসনকাল বিতর্কিত ছিল এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি।

আরব বসন্তই সর্বপ্রথম প্রমাণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে, এই মাধ্যমগুলো মিথ্যা তথ্য ও উস্কানিমূলক প্রচারণার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে, যা বিভাজন ও সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

আরব বসন্ত ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জনগণের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি বহু বছরের স্বৈরশাসন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক হতাশার বিরুদ্ধে জনগণের এক সম্মিলিত প্রতিবাদ ছিল। এটি কিছু দেশে ক্ষমতা পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হলেও কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা বা প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরব বসন্তের পরিণতি এক জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য শুধু জনগণের আকাঙ্ক্ষা যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ঐক্য এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ। এই আন্দোলনটি এক অসমাপ্ত অধ্যায়, যেখান থেকে দেখা যায় বিপ্লব ঘটানো যতটা সহজ, তার ফল ধরে রাখা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।

সিএনএনের রিপোর্ট – যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠছে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে ধরা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, স্বল্পমেয়াদে কিছু আকর্ষণ ও পপুলিজমমূলক কর্মসূচি মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানবিদদের বরখাস্ত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন নীতিগ্রহণে হস্তক্ষেপের ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানির মালিকানা ক্রয় ও আয়প্রবাহে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের ঘটনা ঘটছে। বাণিজ্য খাতে প্রেসিডেন্টের শুল্কবৃদ্ধি ও করপোরেট খাতের উপর চাপও অভূতপূর্ব মাত্রায় বেড়ে গেছে।

সিএনএন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গণতন্ত্রে এ ধরনের অবক্ষয় শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি সনেনফেল্ড মন্তব্য করেছেন, “আমরা গণতন্ত্রের ভিতের গুরুতর ক্ষয় দেখেছি। ব্যবসায়ী নেতারা গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে খুবই চিন্তিত।”

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জনতুষ্টিবাদী নেতা অর্থনীতি পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদে সফল হন না। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ’তে দেখা গেছে, ১৯০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ক্ষমতায় থাকা ৫১ জন পপুলিস্ট নেতার দেশগুলোর মাথাপিছু জিডিপি তাদের ক্ষমতার দেড় দশক পরও জনতুষ্টিবাদ থেকে মুক্ত দেশের তুলনায় ১০ শতাংশ কম ছিল।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ভ্যানেসা উইলিয়ামসন মন্তব্য করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র নিয়ে আমি এতটা উদ্বিগ্ন কখনো হইনি। গণতন্ত্র অর্থনীতির জন্য ভালো, আর স্বেচ্ছাচারিতা অর্থনীতির জন্য খারাপ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে নীতিনির্ধারণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের ক্ষয় ঘটলেও চলতি বছর তা দ্রুততর হচ্ছে।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র কুশ দেশাই এই আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে আস্থা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। এর প্রমাণ হলো অ্যাপল, এনভিডিয়া ও মার্কসহ বড় কোম্পানির ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি।” তিনি আগে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় সামাজিক মাধ্যম সেন্সরশিপ, অবৈধ অভিবাসী প্রবাহ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলোর সমর্থন প্রকাশ করেছেন।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার ও করপোরেট খাতে হস্তক্ষেপ আরও প্রশ্ন তোলার বিষয়। ফেড গভর্নর লিসা কুক ও ডাটা কমিশনার এরিকা ম্যাকএন্টারফারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ইন্টেল, নিপ্পন স্টিল ও এমপি ম্যাটেরিয়ালসের ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সতর্ক করেছেন, “রাষ্ট্রীয় মালিকানা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশে সাধারণ বিষয়। এসব দেশ গণতন্ত্র থেকে অনেক দূরে।”

গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে স্পষ্ট, মার্কিন অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা, পুঁজি বিনিয়োগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর গণতন্ত্র অপরিহার্য। স্বেচ্ছাচারী শাসন ও জনতুষ্টিবাদী নীতি দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের ক্ষয় ও সরকারের হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর গণতন্ত্র বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে নিশ্চিত পথ।

পেরোভস্কাইট ক্যামেরা – শনাক্ত করবে শরীরের সব ধরনের রোগ

চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কৌশল এসপিইসিটি স্ক্যান, হৃৎপিণ্ডের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, রক্ত ​​প্রবাহের ধরণ অনুসরণ এবং শরীরের গভীরে লুকিয়ে থাকা রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কৌশলটি অদৃশ্য ক্যামেরার মতো কাজ করে, যেখানে রোগীর শরীরে একটি স্বল্প-জীবিত তেজস্ক্রিয় ট্রেসার (radiotracer) প্রবেশ করানো হয়। ট্রেসারটি গামা রশ্মি নির্গত করে, যা টিস্যুর মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে এবং শরীরের বাইরে থাকা ডিটেক্টর দ্বারা গৃহীত হয়।

প্রতিটি গামা রশ্মি এক একটি পিক্সেলের মতো কাজ করে এবং লক্ষ লক্ষ পিক্সেল রেকর্ড হওয়ার পর কম্পিউটার সেগুলোকে একত্রিত করে একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করে। তবে বর্তমান স্ক্যানারগুলোতে ব্যবহৃত ডিটেক্টরগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তৈরি করা কঠিন হওয়ায় এর ব্যাপক ব্যবহারকে সীমিত করে রেখেছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য Northwestern University এবং চীনের সুচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পেরোভস্কাইট-ভিত্তিক একটি নতুন ডিটেক্টর তৈরি করেছেন, যা নিউক্লিয়ার ইমেজিংকে আরও নির্ভুল সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

বর্তমানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ব্যবহৃত ডিটেক্টরগুলো প্রধানত ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড বা সোডিয়াম আয়োডাইড দিয়ে তৈরি। এই দুটি উপাদানেরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড ডিটেক্টরগুলো অসাধারণ রেজোলিউশন প্রদান করলেও এদের প্রধান সমস্যা হলো আকাশছোঁয়া দাম। একটি ক্যামেরার জন্য এর দাম কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। উপরন্তু ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড ক্রিস্টালগুলো ভঙ্গুর হওয়ায় উৎপাদন করা অত্যন্ত কঠিন।

সোডিয়াম আয়োডাইড ডিটেক্টরগুলো ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড এর চেয়ে সাশ্রয়ী হলেও এর মান অনেক কম। এগুলো আকারে বড় এবং কম নির্ভুল চিত্র তৈরি করে, যা অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন জানালার মধ্য দিয়ে দেখার মতো। এর ফলে রোগ নির্ণয়ে স্পষ্টতার অভাব দেখা যায়। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে বিজ্ঞানীরা নতুন পদার্থের সন্ধান করছিলেন, যেটা উচ্চ মানের ইমেজিং প্রদান করতে পারে এবং একই সাথে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে পারে।

পেরোভস্কাইট হলো এক ধরনের স্ফটিক যা সৌরশক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরের জন্য পরিচিত। এই পদার্থ নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন অধ্যাপক মার্কুরি কানাতজিডিস। ২০১৩ সালে তাঁর দল প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে একক পেরোভস্কাইট স্ফটিক এক্স-রে এবং গামা রশ্মি কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে পারে। এই আবিষ্কারটি বিকিরণ শনাক্তকরণ উপাদানের একটি নতুন ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার একটি নতুন ঢেউ নিয়ে আসে।

সাম্প্রতিক গবেষণায়, কানাতজিডিস এবং সহযোগী অধ্যাপক ইহুই হে পেরোভস্কাইট ক্রিস্টাল ব্যবহার করে একটি উন্নত গামা-রে ডিটেক্টর তৈরি করেছেন। এই ডিটেক্টরটি একটি পিক্সেলযুক্ত সেন্সরের মতো কাজ করে, যা স্মার্টফোনের ক্যামেরার পিক্সেলের মতোই উচ্চ রেজোলিউশন এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করে।

নতুন পেরোভস্কাইট ডিটেক্টরের পারফরম্যান্স পূর্ববর্তী ডিটেক্টরগুলোর চেয়ে অনেক উন্নত। পরীক্ষার সময় এটি বিভিন্ন শক্তির গামা রশ্মিকে অত্যন্ত নির্ভুলতার সাথে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সেরা রেজোলিউশন। এটি অত্যন্ত ক্ষীণ সংকেতও ধরতে পারে, যেমন ক্লিনিকাল চিকিৎসায় ব্যবহৃত টেকনেশিয়াম-99m নামক একটি মেডিকেল রেডিয়োট্রেসার থেকে আসা সংকেত। ডিটেক্টরটি মাত্র কয়েক মিলিমিটার দূরে অবস্থিত ক্ষুদ্র তেজস্ক্রিয় উৎসকেও স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারে, যে ক্ষমতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম রোগ নির্ণয়ের জন্য অপরিহার্য।

এই ডিটেক্টরটি স্থিতিশীলতাতেও অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে, ট্রেসারের প্রায় সমস্ত সংকেত কোনো ক্ষতি বা বিকৃতি ছাড়াই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এই উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে রোগীদের স্ক্যানের সময় কমানো এবং রেডিয়েশনের কম মাত্রার সম্মুখীন হওয়া সম্ভব হবে।

এই প্রযুক্তিকে ল্যাব থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্পিনআউট কোম্পানি অ্যাকটিনিয়া ইনকর্পোরেটেড কাজ করছে। যেহেতু পেরোভস্কাইট ক্রিস্টালগুলো সহজে বৃদ্ধি করা যায় এবং এদের উপাদানগুলো সরল, তাই এটি CZT এবং NaI ডিটেক্টরগুলোর চেয়ে অনেক কম খরচে বিকল্প হতে পারে। এর ফলে দরিদ্র দেশ এবং ছোট হাসপাতালগুলোও উন্নত নিউক্লিয়ার ইমেজিং প্রযুক্তির সুবিধা পাবে, যা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে সহায়ক হবে।

পেরোভস্কাইট-ভিত্তিক গামা-রে ডিটেক্টরের উদ্ভাবন নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং ডায়াগনস্টিক ইমেজিংয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বেশি কিছু, এটি এমন একটি উদ্ভাবন যা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, দক্ষ এবং নিরাপদ করে তুলবে। এর ফলে অনেক বেশি মানুষ উন্নত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আসবে।

স্থিতিশীলতার অর্থনীতি গড়তে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান : প্রধান উপদেষ্টার

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আরও কার্যকর অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রথম দ্বিবার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন’-এ তিনি বলেন, “আমরা এমন এক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মর্যাদা, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা থাকবে, এবং কেউ পিছিয়ে থাকবে না।”

ড. ইউনূস তার বক্তব্যে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরে জানান, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দারিদ্র্য কোনো মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

প্রধান উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দেন, চতুর্থ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সম্মেলনে নেয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে বছরে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে, যা পূরণ করা কঠিন হলেও অপরিহার্য। তিনি বলেন, “আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সম্পদের ন্যায্য প্রবেশাধিকারই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি। একজন নারী যখন ব্যবসা শুরু করতে পারে, তরুণ সমাজ যখন সৌরশক্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, বস্তিবাসী শিশুরা যখন শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা পায়—তখনই বাস্তব ও টেকসই পরিবর্তন আসে।”

সম্মেলনের বাইরে ড. ইউনূস অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত এক সংবর্ধনায়। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। অনুষ্ঠানে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

একই দিনে নিউইয়র্কে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও তার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক সংস্কার, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

বিশ্বব্যাংকপ্রধান অজয় বাঙ্গা আলোচনায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ধারা, রাজস্ব ও ব্যাংক খাত সংস্কার, চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি চুরি হওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার জাতীয় সম্পদ দ্রুত পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে অজয় বাঙ্গা বলেন, গত ১৪ মাসে তার ভূমিকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সংস্কার কার্যক্রমে অব্যাহত সহায়তা দেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। জাতিসংঘ অধিবেশনকে ঘিরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এসব কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি ও নেতৃত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।