অম্লতা সীমা অতিক্রম করেছে মহাসাগর, হুমকির মুখে সামুদ্রিক প্রাণ ও খাদ্যনিরাপত্তা

বিশ্বের মহাসাগরগুলো প্রথমবারের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ ‘প্ল্যানেটারি হেলথ চেক’-এ ব্যর্থ হয়েছে। জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সমুদ্রের অম্লতা এমন এক সংকটজনক সীমায় পৌঁছেছে যা সামুদ্রিক জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। এর ফলে পৃথিবীর মোট নয়টি ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি’র মধ্যে সপ্তম সীমাও অতিক্রান্ত হলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লব শুরুর পর থেকে মহাসাগরের পৃষ্ঠের pH মান প্রায় ০.১ ইউনিট কমে গেছে, যা অম্লতার ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এর ফলে প্রবালপ্রাচীর, শীতল পানির প্রবাল, আর্কটিক অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রাণীসহ নানা প্রজাতির বাস্তুতন্ত্র নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের ঘাটতির কারণে প্রবাল, ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য খোলসযুক্ত প্রাণী তাদের বৃদ্ধি ও টিকে থাকার জন্য সংকটে পড়ছে। খাদ্যশৃঙ্খলের নিম্নস্তরের এই প্রাণীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সরাসরি স্যামন মাছ, তিমি ও অন্যান্য বৃহৎ প্রাণীকেও প্রভাবিত করছে। শেষ পর্যন্ত এটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠের ৭১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এবং জলবায়ু স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান। প্রতিবেদন তাদেরকে “গ্রহের অঘোষিত রক্ষক” হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু অম্লতা বৃদ্ধি ও উষ্ণায়নের কারণে মহাসাগরের তাপ শোষণক্ষমতা এবং বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ শোষণ করার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এর ফলে মহাসাগরের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে।

প্রতিবেদনটি আরও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, স্বাদুপানি ব্যবহার, জৈব-রাসায়নিক প্রবাহ ও নতুন কৃত্রিম উপাদান ব্যবহারের মতো ছয়টি সীমা আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে এবং সেগুলোর প্রবণতা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এবার মহাসাগরকে কেন্দ্র করে সপ্তম সীমার অতিক্রম একটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে বিলম্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন গবেষক লেভকে সিজার। তিনি বলেন, “একটি গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়াতে এক বছর লাগে, কিন্তু তা মহাসাগরে স্থায়ী হতে হাজার বছর পর্যন্ত সময় নেয়। এই তথ্য দেখে সত্যিই ভয় পাচ্ছি।”

তবে এখনো সমাধানের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো, দূষণ হ্রাস এবং মৎস্যসম্পদ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সমস্যার অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর নীতির উদাহরণ হিসেবে ওজোন স্তর রক্ষা এবং জাহাজ চলাচলে নির্গমন নিয়ন্ত্রণের সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জোহান রকস্ট্রোম বলেছেন, “আমরা পৃথিবীর স্বাস্থ্যের সর্বত্র অবনতি প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু এটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নয়। ওজোন স্তরের পুনরুদ্ধার ও এয়ারোসল দূষণ হ্রাস দেখায়, সঠিক নীতি বৈশ্বিক উন্নয়নের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ব্যর্থতা অনিবার্য নয়, বরং এটি একটি সিদ্ধান্ত। আর এই সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন