Home Blog Page 12

দর্শন ও সাহিত্যের বিচ্ছেদ, ডেভিড হিউম এবং ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ -এর পতন

দর্শনশাস্ত্র ও সাহিত্যের মধ্যে একটা অলিখিত সীমানা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। আজকের দিনে দর্শনের সিলেবাসে জন লকের মতো চিন্তাবিদকে পাওয়া যায়, কিন্তু জোসেফ অ্যাডিসন এর মতো সাহিত্যিককে নয়। কিন্তু এই বিচ্ছেদ কি সব সময় ছিল? না। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম ঠিক এই বিচ্ছেদের সূচনাকারী ছিলেন— বিশেষ করে একটি পুরোনো লেখার ধরন, ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ -কে নৈতিক দর্শন বা Moral Philosophy চর্চার একটি বৈধ পদ্ধতি হিসেবে চ্যালেঞ্জ জানানোর মাধ্যমে। ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ হলো একজন ব্যক্তি বা একটি সামাজিক প্রকারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, যা তাদের অভ্যাসগত পছন্দ ও আচরণের ওপর আলোকপাত করে। যেমন: একজন ‘ইনটেলেকচুয়াল’ বা একজন ‘ম্যানসপ্লেনার’-এর বর্ণনা। এই ধরনটি কেবল বর্ণনামূলক, কিছুটা সমাজতাত্ত্বিক, কিছুটা সাহিত্যিক এবং প্রায়শই হাস্যরসাত্মক। এই সাহিত্যিক ঘরানার ইতিহাস অনেক পুরোনো, প্রাচীন গ্রিস পর্যন্ত বিস্তৃত। থিওফ্রাস্টাস নামের একজন দার্শনিক অ্যারিস্টটলের শিষ্য ছিলেন, তিনি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ‘দ্য ক্যারেক্টারস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এই সংগ্রহে ৩০টি কু-অভ্যাস (Vices) যেমন— ‘খারাপ সময়জ্ঞান’, ‘অন্যমনস্কতা’, ‘অলস আলাপ’ ইত্যাদি— এমন সব চরিত্রের স্কেচ আঁকা হয়েছে যারা এই গুণগুলোর প্রতিমূর্তি। থিওফ্রাস্টাস এমন কোনো নাটকীয় বা মহৎ পাপের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না, যেমন— হিংসা বা লালসা । তিনি বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সামাজিক ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরেছেন। এই স্কেচগুলোর বিশেষত্ব হলো এতে আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি, শুধু বর্ণনা করা হয়েছে। থিওফ্রাস্টাসের এই কাজটি নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে ক্লাসিকিস্টরা বিতর্ক করেছেন— এটি কি বাগ্মিতার জন্য লেখা, নাকি কমেডি চরিত্রের তালিকা, নাকি নৈতিকতার বই? ১৫শ শতকের রেনেসাঁসের সময় থেকে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা এটিকে নৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তারা বিশ্বাস করতেন, এই স্কেচগুলো মানুষের খারাপ গুণাবলীকে চিনতে এবং নিজেদের সংশোধন করতে সাহায্য করবে। ফরাসি ফিলোলোজিস্ট আইজ্যাক ক্যাসোবন ১৬শ শতকের শেষে এই ঘরানার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখান। তাঁর মতে, যুক্তি এবং সাধারণ উপদেশের পাশাপাশি ‘ক্যারেক্টার-রাইটিং’ ছিল নৈতিকতা শেখানোর তৃতীয় এবং সবচেয়ে মার্জিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে যুক্তির বদলে কোনো কু-অভ্যাসকে একটি জীবন্ত চরিত্রের মাধ্যমে মূর্ত করে দেখানো হয়। এটি দর্শনের মতো নৈতিকতা শেখাত, কিন্তু সাহিত্যের মতো ছিল প্রাণবন্ত। ক্যাসোবনের এই ধারণা পরের শতাব্দীতে দারুণ প্রভাবশালী হয়েছিল। ১৭শ শতকে জোসেফ হল -এর হাত ধরে এটি ইংরেজিতে এবং পরে জঁ দে লা ব্রুইয়েরে -এর মাধ্যমে ফরাসিতে জনপ্রিয় হয়। লা ব্রুইয়েরে তাঁর বেস্ট সেলিং ‘দ্য ক্যারেক্টারস’-এ শুধুমাত্র গুণ-ত্রুটি নয়, বিভিন্ন সামাজিক প্রকারভেদ— যেমন ধনী ও দরিদ্র, কর-সংগ্রাহক, আইনজীবী— এদের বর্ণনাও যোগ করেন। তাঁর স্কেচে সমাজতাত্ত্বিক বিবরণও থাকত।

উদাহরণস্বরূপ ধনী ব্যক্তি ‘তাঁর রুমাল বের করে, নাকে ধরেন, এত জোরে নাক ঝাড়েন যে সবাই শুনতে পায়, রুমে থুথু ফেলেন এবং উচ্চস্বরে হাঁচি দেন।’ দরিদ্র ব্যক্তি এর বিপরীতে ‘টুপি নিচে রেখে নাক ঝাড়েন, রুমালের ভেতরে থুথু ফেলেন এবং কোণে গিয়ে হাঁচি দেন।’ ১৭৪৮ সালে ডেভিড হিউম তাঁর ‘An Enquiry Concerning Human Understanding’ গ্রন্থে এসে এই দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে দেন। হিউম সমসাময়িক নৈতিক দর্শনকে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করেন, সহজ ও স্পষ্ট ও সঠিক ও বিমূর্ত । সহজ ও স্পষ্ট ধারা, যা পাঠকের ‘রুচি ও অনুভূতি’ দ্বারা চালিত হয়। এই ধারার দার্শনিকরা সাহিত্যের আশ্রয় নিয়ে নৈতিকতাকে ‘আকর্ষণীয় রঙে’ আঁকেন। হিউম এই ধারার প্রতিনিধি হিসেবে সিসারো, লা ব্রুইয়েরে এবং অ্যাডিসনকে উল্লেখ করেন। এরা সবাই ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ রচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হিউম স্বীকার করেন যে এরা চমৎকার স্টাইলিশ লেখক, কিন্তু এরা ‘আসলের মূলে পৌঁছান না’। সঠিক ও বিমূর্ত ধারা নিয়মনীতি ও সাধারণ সূত্র অনুসন্ধানে আগ্রহী। এই ধারার প্রতিনিধিরা হলেন অ্যারিস্টটল, নিকোলাস ম্যালব্রাঞ্চ এবং জন লক। হিউম মনে করেন এই ধারা সত্যের কাছাকাছি হলেও, অত্যন্ত দুর্বোধ্য ও প্রযুক্তিগত হয়ে ওঠে।

হিউমের মতে, কোনো পদ্ধতিই পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি চাইলেন এই দুই ধারার সেরা অংশগুলোকে একত্রিত করতে— ‘গভীর অনুসন্ধান’ ও ‘সত্য’ এবং ‘পরিষ্কারতা’ ও ‘নব্যতা’ । তিনি দর্শনকে অঙ্গ ব্যবচ্ছেদকারী বিজ্ঞানীর ভূমিকার সাথে তুলনা করেন, যিনি শুধু বাহ্যিক রূপ নয়, মানুষের মনের ‘অভ্যন্তরীণ কাঠামো’ ও ‘আসল নীতি’ জানতে চান। এই কাজ করতে গিয়েই হিউম ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’-এর মতো বর্ণনামূলক পদ্ধতি হয়ে ওঠে এমন এক অনুসন্ধান যা সাধারণ এবং সর্বজনীন নীতির দিকে ধাবিত হয়। হিউম একই বছর ‘Of National Characters’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, কিন্তু সেখানেও তিনি থিওফ্রাস্টাসের স্টাইলে ফরাসি বা ইতালীয় মানুষের কোনো স্কেচ আঁকেননি। জাতিগত চরিত্রের কারণ ও তার মূল নীতি অনুসন্ধানে মন দেন, চরিত্র বর্ণনা নয় চরিত্র কেন হয় সেই নীতি নির্ধারণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। উল্লেখ্য যে, এই প্রবন্ধে হিউম অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে ‘স্বাভাবিকভাবে নিকৃষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন, যা জাতিগত বৈষম্যমূলক ধারণার পরিসংখ্যানগত প্রতিফলন ঘটাতে তার আগ্রহ দেখায়। এই চরম নেতিবাচক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বর্ণবাদমূলক সাধারণীকরণকে সমর্থন করেন, যা তৎকালীন সমাজের কিছু অংশের দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ। হিউমের এই বিভাজনের পর, ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ এবং ‘চিত্রকলাতুল্য’ দর্শন যা প্রাণবন্ত বর্ণনা এবং চরিত্র নির্ভর ছিল তা ধীরে ধীরে ‘সাহিত্য’ নামের সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়। আর নীতি ও সাধারণ নীতি অনুসন্ধানী দর্শন পরিণত হয় আজকের ‘দর্শনশাস্ত্র’-এ। হিউম এভাবে দর্শন ও সাহিত্যের পথকে আলাদা করে দেন।

হিউমের আগের ঐতিহ্যকে মনে রাখলে আমরা দেখতে পাই, সাহিত্যিক ধরনের দর্শনও সম্ভব ছিল— যেখানে জ্ঞান সামাজিক ও প্রাসঙ্গিক এবং যেখানে নান্দনিকতা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই পুরোনো ঘরানা আমাদের দুটি বিষয় ভাবতে উৎসাহিত করে. বর্ণনার গুরুত্ব ও খারাপ উদাহরণের মাধ্যমে নৈতিক নির্দেশ, ‘অন্যমনস্কতা’ বা ‘খারাপ সময়জ্ঞান’-এর মতো কোনো সাধারণ ধারণাকে বুঝতে শুধু সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়, একটি বিশ্বস্ত, প্রাণবন্ত বর্ণনাও দরকার। সাধারণ ধারণাটি বোঝার জন্য আমাদের ‘অন্যমনস্ক মানুষটি’কে দরকার। যখন আমরা ‘ম্যানসপ্লেনার’-এর মতো নৈতিক প্রকারের বর্ণনা করি, তখন আসলে আমরা ‘খারাপ উদাহরণের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা’ দেওয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যেই যুক্ত থাকি। থিওফ্রাস্টাসের স্কেচগুলো যেমন মানুষকে ঐসব কু-অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করত, তেমনই ২১শ শতাব্দীতে ‘ম্যানসপ্লেনার’ বলা হয় এই আশায় যে ব্যক্তিটি তার আচরণ পরিবর্তন করবে। রূপান্তরের ওপর এই জোরই থিওফ্রাস্টাসের স্কেচকে স্টেরিওটাইপ বা গতানুগতিক ছক থেকে আলাদা করে তোলে, কারণ এই গুণাবলীকে অপরিহার্য জাতিগত বা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো না বরং পরিবর্তনযোগ্য আচরণ হিসেবে দেখা হতো। থিওফ্রাস্টাসের স্বল্প পরিচিত স্কেচের বইটি আমাদের এই প্রশ্ন করতে শেখায়— সাহিত্য ও দর্শনের মিলন থেকে কি শুধু ‘ভালো লেখার স্টাইল’-এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না? এই ঐতিহ্য দেখায় যে সাহিত্যের একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ও উপেক্ষিত অংশও সাধারণ ধারণাকে বোঝার এবং আমাদের আচরণকে সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে যা একান্তভাবেই দার্শনিক কাজ।

রান্না যেভাবে হয়ে উঠল ক্ষমতা, ধর্ম ও শিল্পের ধারক

মানুষের বেঁচে থাকার মূল উপাদান খাদ্য। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসে খাবার শুধু পেট ভরানোর উপায় হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে একেক সভ্যতার পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং শিল্পচেতনার প্রতিফলন। রান্না তাই নিছক রান্নাঘরের কাজ নয় এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, সাংস্কৃতিক বিনিময়ের হাতিয়ার এবং কখনও কখনও ক্ষমতা প্রদর্শনের উপায়। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই, কিছু সভ্যতা রান্নাকে এমনভাবে লালন করেছে যে তা আজও বিশ্বজোড়া খ্যাতি বহন করছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন সভ্যতা কীভাবে রান্নাকে একটি সাধারণ প্রক্রিয়া থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মানুষের সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং সমাজের বিবর্তনের এক চমকপ্রদ ইতিহাস।

মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাকে প্রায়শই মানব সভ্যতার প্রথম সূতিকাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানেই প্রথম শহর, আইন এবং লিখিত ভাষার উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু যা কম পরিচিত তা হলো, এখানেই রন্ধনশিল্পের প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। কিউনিফর্ম ট্যাবলেটে লেখা প্রাচীনতম রান্নার রেসিপিগুলোতে স্ট্যু, মাংস এবং সবজির মিশ্রণ দেখা যায়, যা প্রমাণ করে রান্না কেবল ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, একটি সুসংগঠিত কর্মকাণ্ড ছিল। এই সমাজের অভিজাত শ্রেণির জন্য রান্না ছিল আভিজাত্যের পরিচায়ক। দেবতাদের উদ্দেশ্যে বিশাল ভোজের আয়োজন করা হতো, যেখানে দুধ, মধু, মাংস এবং বিভিন্ন মশলা ব্যবহার করা হতো। বলা যায়, রান্নাকে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার প্রথার সূচনা হয়েছিল এই মেসোপটেমিয়ান সমাজেই। সে যুগে রান্না ধর্মীয় আচারের অংশ হয়ে মানুষ ও দেবতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করত।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় খাদ্য এবং ধর্মীয় সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে বিশেষ খাবার নিবেদন করা হতো। প্রতিটি উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রুটি, বিয়ার, মধু, এবং খেজুরের ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। মিশরের সমাধিচিত্রগুলোতে দেখা যায়, খাদ্য প্রস্তুত করাকে তারা একটি শিল্প হিসেবে দেখত। চিত্রগুলো কেবল খাদ্য তৈরির পদ্ধতিই দেখাতো না, এর সাথে জড়িত সামাজিক মর্যাদা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকেও তুলে ধরত। এই চিত্রগুলো প্রমাণ করে, সাধারণ খাবার যেমন রুটি ও বিয়ারকে তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

চীনা রন্ধনশিল্পের ইতিহাস অন্য যেকোনো সভ্যতার চেয়ে ভিন্ন, এটি শুরু থেকেই দর্শন ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের রান্নার মূল ভিত্তি হলো ‘ইন-ইয়াং’ ভারসাম্য এবং ‘পাঁচ স্বাদ’ মিষ্টি, টক, তেতো, নোনতা, ঝাল-এর সমন্বয়। তাদের দর্শন অনুযায়ী, খাবার কেবল শরীরের জন্য নয়, বরং মন ও আত্মার ভারসাম্য রক্ষার জন্যও প্রয়োজন। ৭ম-১০ম শতাব্দীতে ট্যাং রাজবংশের সময় চীনের রান্না আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। সিল্ক রোডের মাধ্যমে চীনা খাদ্য সংস্কৃতি মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। রাজদরবারের ভোজ ছিল এক নাটকীয় পরিবেশনা, যেখানে প্রতিটি পদ ছিল এক একটি শিল্পকর্ম। তাদের খাবার পরিবেশনার নান্দনিকতা, রঙের ব্যবহার এবং প্রতিটি পদের পেছনের গল্প চীনা রান্নাকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়।

প্রাচীন ভারতে রান্নাকে শুধুমাত্র খাবার হিসেবে দেখা হতো না, বরং আয়ুর্বেদের ধারণার সঙ্গে একে যুক্ত করা হয়েছিল। খাবারকে শরীর, মন এবং আত্মার সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে ভারতীয় রন্ধনশিল্পের আসল বিপ্লব আসে মুঘল যুগে। পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং ভারতের নিজস্ব রন্ধনশৈলীর মিশ্রণে এক নতুন ধারার জন্ম হয়, যা মুঘল কুইজিন নামে পরিচিত।

বিরিয়ানি, কাবাব, কোরমা, এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি এই যুগের অবদান, যা রাজকীয় শিল্প হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। মুঘল সম্রাটরা তাদের রান্নাঘরকে একটি শিল্পশালায় পরিণত করেছিলেন, যেখানে ‘রন্ধনশিল্পী’ নামের বিশেষ পদও ছিল। এই রন্ধনশিল্পীরা তাদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রতিটি পদকে এক একটি মাস্টারপিসে রূপান্তরিত করত।

প্রাচীন গ্রিকরা প্রথম ‘গ্যাস্ট্রোনমি’ (Gastronomy) ধারণাটি নিয়ে আসে, এটা ছিল খাদ্যবিজ্ঞান এবং খাদ্যদর্শনের একটি মিশ্রণ। তারা খাবারকে শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়, বরং জ্ঞানচর্চার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখত। অন্যদিকে রোমান সাম্রাজ্যে ভোজ ছিল ক্ষমতা ও আভিজাত্যের চূড়ান্ত প্রতীক। রোমান সম্রাটরা তাদের ভোজসভায় শত শত পদের ব্যবস্থা করতেন, সময়ের সাথে সাথে এটি এক ধরনের পারফরম্যান্স আর্টে পরিণত হয়েছিল। তারা প্রথম কুকবুক রচনা করে, যা ‘Apicius’ নামে পরিচিত এবং আজও রন্ধনশিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রোমানরা বিভিন্ন মশলা, মাংস এবং মদের ব্যবহারে পারদর্শী ছিল।

আধুনিক রন্ধনশিল্পের ‘জনক’ হিসেবে ফরাসিদের খ্যাতি সর্বজনীন। মধ্যযুগের পর থেকে ফরাসি রাজদরবারের খাবার পরিবেশন ছিল ইউরোপীয় ‘হাই কুইজিনে’র জন্মলগ্ন। ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে ফরাসি শেফরা রন্ধনশৈলীকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি পদ ছিল এক একটি শিল্পকর্ম। তারা খাবারের পরিবেশন, স্বাদ এবং সুগন্ধের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে শিখিয়েছিল। আজ ‘Haute Cuisine’ ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা ফরাসি রন্ধনশিল্পের বিশ্বজোড়া প্রভাব প্রমাণ করে।

অটোমান সাম্রাজ্যে রান্না ছিল সাংস্কৃতিক ক্ষমতা ও বৈচিত্র্যের প্রতীক। ইস্তাম্বুলের টপকাপি প্রাসাদের রান্নাঘরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হতো। এই রান্নাঘর ছিল পারস্য, আরব, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন রন্ধনশৈলীর এক অনন্য সংমিশ্রণ। কফি, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, কাবাব এবং নানা ধরনের রুটি অটোমান সাম্রাজ্যের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। অটোমান কুইজিন শুধু স্বাদের জন্যই বিখ্যাত ছিল না বরং এটি ছিল একটি বিশাল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতিচ্ছবি।

রান্নাকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ধারণাটি কোনো একক সভ্যতার নয়, এটি মানব ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সম্মিলিত ফলাফল। প্রাচীন চীন এবং ভারত রান্নাকে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত করে এর একটি গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। গ্রিক ও রোমানরা এটিকে জ্ঞানের অংশ এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিল। আর ফরাসিরা আধুনিক যুগে রান্নাকে একটি সুসংগঠিত, নান্দনিক ও দার্শনিক স্তরে উন্নীত করেছিল। মুঘল এবং অটোমান সাম্রাজ্যগুলি রান্নার মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল, যা আজও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়।

রান্নার শিল্পচেতনা বহু সভ্যতায় ছিল, কিন্তু বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও প্রভাবের দিক থেকে ফরাসি, মুঘল, চীনা এবং রোমান সভ্যতার অবদান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই সভ্যতাগুলো প্রমাণ করে, রান্না কেবল একটি শারীরিক চাহিদা পূরণ করে না বরং মানব সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প।

দেশে চাকরির বাজারে তরুণদের অবস্থান কোথায়?

গত কয়েক বছরে দেশে যুব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুটা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গণঅভ্যুত্থান থেকে। এরপর শোভন কর্মসংস্থান ও যুবদের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর জাতীয় মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য-প্রমাণ নির্দেশ করে বাংলাদেশের যুবদের জন্য কর্মসংস্থান অত্যন্ত সীমিত ও সংকটপূর্ণ।

দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, যার মধ্যে ১৫–২৯ বছর বয়সী যুবের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ, মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশের বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য মূল চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি তারা সঠিক ক্যারিয়ার গাইডেন্স, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের অধিকাংশের দক্ষতা বাজার-উপযোগী নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগহীনতার কারণে এই সমস্যা তীব্র হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার প্রায় ৩.৫ শতাংশ, কিন্তু যুব বেকারত্ব ৭.২ শতাংশ, এই সংখ্যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। মোট প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ তরুণ বেকার। শহরাঞ্চলে বেকারত্ব গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি এবং শহরে নারী যুবদের বেকারত্ব পুরুষদের তুলনায় বেশি। এছাড়া অপ্রতুল কর্মসংস্থান ও নিট (NEET—Not in Education, Employment or Training) জনগোষ্ঠীর হারও বাড়ছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ অপ্রতুল কর্মসংস্থানে এবং তাদের ৬০ শতাংশের বয়স ১৫–২৯ বছরের মধ্যে। ৩০.৯ শতাংশ তরুণ বর্তমানে নিট-এর মধ্যে, যার একটি বড় অংশ নারী।

শিক্ষিত বেকারত্বও উদ্বেগজনক। প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা সম্পন্নদের মধ্যে বেকারত্ব ১২ শতাংশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভূক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ চাকরি পায় এবং ৬৬ শতাংশ ৩ বছর পর্যন্ত বেকার থাকে। বিশেষত মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। সফট স্কিলস যেমন কমিউনিকেশন, নেতৃত্ব ও ভাষা দক্ষতাও অনেকের মধ্যে অপর্যাপ্ত।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে চাকরির ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৫–২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল দক্ষতায় ১৭ কোটি নতুন চাকরির সম্ভাবনা থাকলেও, পুনরাবৃত্তিমূলক, ম্যানুয়াল ও প্রশাসনিক পেশায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশেও ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, রিমোট কাজসহ নতুন পেশায় যুবদের সুযোগ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

তবে দেশীয় কর্মসংস্থান ব্যবস্থা এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিনিয়োগের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে নতুন চাকরির সৃষ্টি সীমিত। যুব কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নারী ও বেকার যুবদের জন্য স্বল্পমেয়াদে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, মধ্যমেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সংযোগ বাড়ানো, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেনটিসশীপ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষানীতি, দক্ষতা উন্নয়ন নীতি এবং শিল্পনীতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে বাংলাদেশ তার যুব জনমিতির সুফল উপভোগ করতে পারবে এবং যুব জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার চাইলে ট্রাম্পকে আগে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে : এমানুয়েল মাখোঁ

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সত্যিই নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করতে চান, তবে তাকে গাজার সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। নিউইয়র্ক থেকে ফ্রান্সের বিএফএম টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাখোঁ বলেন, “শুধু ট্রাম্পেরই ক্ষমতা আছে ইসরায়েলকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ দেওয়ার। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা একজনের হাতে এবং সেই ব্যক্তি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।”

ফরাসি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা। তিনি বলেন, “আরেকটি কারণে তিনি আমাদের চেয়ে বেশি করতে পারেন। তা হলো আমরা এমন কোনো অস্ত্র সরবরাহ করি না যা গাজায় যুদ্ধ চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। আমরা এমন কোনো সামগ্রী সরবরাহ করি না, যা গাজায় সংঘাতের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা করে।” মাখোঁ জোর দিয়ে বলেন, গাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে এবং শান্তি আলোচনার পথ খুলতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মাখোঁর এই মন্তব্য এসেছে সেই সময়, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কড়া ভাষায় বক্তৃতা দেন। ট্রাম্প পশ্চিমা মিত্রদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন এটি হামাসের জন্য পুরস্কার হিসেবে ধরা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের অবিলম্বে গাজার যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আমাদের অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে।”

ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে উঠে এসেছে তার দাবি, তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

এমন পরিস্থিতিতে মাখোঁ ট্রাম্পকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে দেখি, যিনি সক্রিয়ভাবে সংঘাতে যুক্ত হয়েছেন। আজ সকালে তিনি পডিয়াম থেকে পুনরায় বলেছেন, ‘আমি শান্তি চাই। আমি সাতটি সংঘাত সমাধান করেছি।’ কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের জন্য এই সংঘাত বন্ধ করা একান্তভাবে প্রয়োজন।”

কাম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ এই বছর ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে। ট্রাম্পের চারজন পূর্বসূরি এই পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং তিনি মনে করেন, নিজেও এই মর্যাদা অর্জনের যোগ্য।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, “যাঁরা জাতিসংঘে উপস্থিত ছিলেন, তারা প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তির জন্য একাই অন্য সকলের চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। শুধু এই প্রেসিডেন্টই বিশ্বে স্থিতিশীলতার জন্য এত কিছু অর্জন করতে পেরেছেন, কারণ তিনি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে আবার শক্তিশালী করেছেন।”

মাখোঁর মন্তব্যের মূল বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গাজার যুদ্ধের স্থিতিশীলকরণে একমাত্র ট্রাম্প কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন যে, এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির আগে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ এবং শান্তি আলোচনা শুরু করবেন। মাখোঁর দৃষ্টিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নয়, এটি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এই ব্যাখ্যা এবং ট্রাম্পের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা ও প্রশংসা উভয়ই অর্জন করছে। গাজার সংঘাতের অবস্থা এবং ট্রাম্পের কার্যক্রম আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়ার বার্টার ট্রেড, কি প্রভাব পড়বে বিশ্ব বাণিজ্যে?

সোভিয়েত-পরবর্তী ১৯৯০-এর দশকের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যে পুরনো ধাঁচের বার্টার ট্রেড বা পণ্য বিনিময় ফিরে এসেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রুশ ব্যবসায়ীরা গমের বিনিময়ে চীনা গাড়ি এবং তিসি বীজের বিনিময়ে নির্মাণ সামগ্রী আদান–প্রদান করছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত থাকলেও বার্টারের পুনরুত্থান দেখাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ কিভাবে রাশিয়ার বাণিজ্য ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও তাদের মিত্ররা ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের কারণে রাশিয়ার ওপর ২৫ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। লক্ষ্য ছিল ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রুশ অর্থনীতি দুর্বল করা এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি জনগণের সমর্থন হ্রাস করা। তবে পুতিন দাবি করেছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে। গত দুই বছরে জি-৭ দেশগুলির তুলনায় রাশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে কঠিন আঘাত এসেছে ২০২২ সালে রাশিয়ান ব্যাংকগুলোকে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর। চীনা ব্যাংকও ওয়াশিংটনের হুঁশিয়ারির কারণে সরাসরি সহায়তা করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতেই বার্টার ট্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ‘বিদেশী বার্টার লেনদেনের গাইড’ নামে ১৪ পাতার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, যা ব্যবসায়ীদের জানাচ্ছে কীভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পণ্য বিনিময় করা যায়।

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অন্তত আটটি নতুন বার্টার চুক্তি ইতিমধ্যেই সনাক্ত হয়েছে। এক লেনদেনে চীনা গাড়ি বিনিময়ে রাশিয়ান গম বিক্রি হয়েছে। অন্য লেনদেনে তিসি বীজের বিনিময়ে গৃহস্থালি ও নির্মাণ সামগ্রী আদান–প্রদান হয়েছে। কিছু লেনদেনে ধাতু পাঠানো হয়েছে মেশিনের বিনিময়ে, কাঁচামালের বদলে চীনা সেবা নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যিক ও সরকারি সূত্র বলছে, বার্টার ট্রেড রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের বাইরে থেকেও পণ্য ও সেবা আদান–প্রদান করার সুযোগ দিচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে পণ্য বিনিময় অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল, কিন্তু আজ এটি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কার্যকর উপায়। কিছু ব্যবসায়ী ‘পেমেন্ট এজেন্ট’ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে এবং ছোট ব্যবসাগুলো একসঙ্গে ১০–১৫ ধরনের পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহার করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বার্টার ট্রেড রাশিয়ার বাণিজ্যকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করছে। সীমিত অর্থপ্রদানের এই যুগে, পণ্য বিনিময় রাশিয়া ও এশিয়ার দেশগুলোর উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করছে।

যেসব কারণে গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি এক দলে পরিণত হতে চাইছে

বাংলাদেশের তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত দুটি রাজনৈতিক দল, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একীভূত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে বলে রাজনৈতিক মহলে খবর পাওয়া গেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো ঘোষণা আসেনি। গত তিন সপ্তাহ ধরে দলগুলোর শীর্ষ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনায় দুই দলের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া, নেতৃত্ব কাঠামো এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

গণঅধিকার পরিষদ ২০২১ সালে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনসিপি ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠে, এখনও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পাননি। তবে উভয় দলই মূলত তরুণ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে উভয় দলের নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। বিশেষ করে নুরুল হক নূরের নেতৃত্বে গণঅধিকার পরিষদ এবং এনসিপির অন্যান্য নেতারা আন্দোলনের বিভিন্ন মঞ্চে একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উভয় দলের একীভূতকরণের আলোচনা নির্বাচনের পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের সম্ভাব্য রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। তরুণদের বিভাজনের কারণে সাম্প্রতিক ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে উভয় দলের সমর্থিত প্যানেল ভরাডুবি করেছে। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, “তরুণরা যখন বিভাজিত থাকে, তারা সফল হতে পারে না। গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে কারণ আমরা সবাই মিলে কাজ করেছি।” তিনি আশা প্রকাশ করেন একইভাবে গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি একসাথে কাজ করলে নতুন রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টি হবে।

বৈঠকে দুই দল একীভূত হলেও শীর্ষ নেতৃত্বে কারা থাকবেন তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে নাহিদ ইসলাম ও নুরুল হক নূর নেতৃত্বের শীর্ষে থাকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আখতার হোসেনসহ কিছু গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকেও সামনে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দলের নামের বিষয়েও এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, উভয় দল বা নতুন কোনো নামে আত্মপ্রকাশ করতে পারে দলটি।

দুই দল একসাথে কাজ করার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চলছে। গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের ব্যানার ও অন্যান্য সবকিছু ডিজলভ করা হবে এবং নেতা-কর্মীরা এনসিপির কাঠামোয় যোগ দেবেন। এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কালেক্টিভ লিডারশিপে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে এবং দক্ষতা অনুযায়ী পদ বন্টন করা হবে। তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় রাজনীতিতে কোনো অংশগ্রহণ করা হবে না এবং স্টেট কোনো ধর্মের অধিকারপ্রাপ্ত হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন জোট তৈরি করা স্বাভাবিক। উভয় দলের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও আন্দোলনে যুক্ত। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি রাজনৈতিক মাঠে আত্মপ্রকাশের পরও বিভিন্ন দুর্নীতি ও স্ক্যান্ডালের কারণে কিছুটা হতাশার সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে নুরুল হক নূরের রাজনৈতিক ইমেজ এনসিপি কাজে লাগাতে চাচ্ছে।

নির্বাচনের আগে বড় দলের সঙ্গে সমঝোতা বা জোটের মাধ্যমে কিছু আসন নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। দুই দলের একীভূতকরণের ফলে তরুণ নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠিত হবে এবং সমন্বিতভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই একীভূতকরণ তরুণ রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত করবে এবং বিভাজন দূর করবে।

বেদুইন গোষ্ঠী থেকে যেভাবে সৌদি আরবের জন্ম হলো

১৫ থেকে ২০ হাজার বছর আগে বরফ যুগ শেষ হওয়ার পর সৌদি আরবের শুষ্ক মরুভূমিতে মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি ছিল বিভিন্ন যাযাবর বেদুইন গোত্রের বিচরণক্ষেত্র। নিজেদের স্বতন্ত্র জীবনধারা, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে তারা অন্য কোনো শক্তির অধীনে থাকতে রাজি ছিল না। ইসলাম ধর্ম প্রচারের পর এই অঞ্চলটি সাময়িকভাবে খিলাফতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও, তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দামেস্ক, বাগদাদ এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের মতো দূরবর্তী শহরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।

তবে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের চেষ্টা, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক কৌশলের ফসল। এটি ছিল যাযাবর বেদুইনদের একতাবদ্ধ হওয়ার এবং নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক লড়াই।

প্রাচীন আরব উপদ্বীপের ইতিহাস ছিল বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্যের উত্থান-পতনের এক জটিল চিত্র। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০ শতকের দিকে বর্তমান বাহরাইন ও তার আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় দিলমুন নামের একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মুক্তার জন্য বিখ্যাত এই দিলমুন ব্যাবিলন, মেগান (বর্তমান ওমান) এবং মেসোপটেমিয়ার মতো দূরবর্তী শহরের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ইয়েমেন তখন সাবা বা শেবা নামে পরিচিত ছিল, আর জর্ডান ছিল নাবাতায়েন।

তবে এই সব রাজ্যের বাইরে আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের “জাজিরাতে আল-আরব” বা “আরবদের দ্বীপ” বলে পরিচয় দিত। তারা প্রধানত মরুভূমির যাযাবর ছিল, যাদেরকে বলা হতো বেদুইন। তাদের জীবন ছিল গোষ্ঠী বা গোত্রভিত্তিক, যেখানে প্রতিটি গোত্র নিজেদের শাসন ও বিচার-আচার নিজেরাই পরিচালনা করত। দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই গোত্রগুলোর অধিকাংশই রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, পরবর্তীতে তারা সেই কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে। তৃতীয় শতকের দিকে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী আদিবাসী কনফেডারেশন গঠন করে, যা তাদের ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

ষষ্ঠ শতকের শেষের দিকে, আরব উপদ্বীপের যাযাবর গোত্রগুলোর মধ্যে বিভেদ, হানাহানি এবং লুটপাট ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা মুসলমানদের দখলে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। মদিনা থেকে শুরু হওয়া ইসলাম ধর্মের প্রচারের মাধ্যমে বেদুইন গোত্রগুলো একটি একক ছাতার নিচে একত্রিত হয়। ইসলামের নবী মুহাম্মদের (সাঃ) মৃত্যুর পর প্রায় পুরো আরব অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বেদুইনরা নিজেদের মধ্যেকার সংঘাত বাদ দিয়ে একের পর এক অভিযানে অংশ নিয়ে ইসলামকে স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করে। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের রাজধানী আরব থেকে সরে প্রথমে দামেস্ক এবং পরে বাগদাদে চলে যায়। ফলে আবারো আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পায়।

সেই সময় আরব উপদ্বীপ মূলত দুটি অংশে বিভক্ত ছিল, পশ্চিম উপকূল বরাবর “হিজাজ” যার মধ্যে মক্কা, মদিনা, জেদ্দা অবস্থিত এবং মরুভূমি ও পাহাড়বেষ্টিত “নজদ” যেখানে আজকের রিয়াদ শহর অবস্থিত। হিজাজ বিভিন্ন সময়ে বিদেশি শক্তির অধীনে থাকলেও, নজদের বেদুইনরা বরাবরই নিজেদের স্বাধীন মনে করত এবং কোনো বিদেশি শক্তির শাসন মেনে নেয়নি। উসমানি সুলতান প্রথম সেলিম ১৫৫৭ সালে হিজাজের নিয়ন্ত্রণ নিলেও, নজদের যাযাবর গোত্রগুলো তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখে।

আধুনিক সৌদি আরবের ভিত্তি স্থাপন ছিল তিনটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। ১৭৪৪ সালে রিয়াদের কাছে দিরিয়া নামের একটি এলাকায় মুহাম্মদ বিন সউদ প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন। ওয়াহাবের ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের জন্য সামরিক সমর্থন দরকার ছিল, আর মুহাম্মদ বিন সউদের দরকার ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মীয় বৈধতা। এই জোটের মাধ্যমে তারা নজদকে একতাবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তাদের উত্তরসূরিরা উসমানি ও মামলুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন এবং হিজাজের সঙ্গে বিবাহসূত্রে ঐক্য স্থাপন করেন। কিন্তু ১৮১৮ সালে উসমানি ও মিশরীয় বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের পতন ঘটে।

এরপর ১৮২৩ সালে তুর্কি ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সউদ দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রিয়াদকে রাজধানী করে “নজদ আমিরাত” নামে নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। কিন্তু তারও ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি। মাত্র এগারো বছর পর তার এক জ্ঞাতি ভাইয়ের হাতে তিনি নিহত হন এবং ১৮৯১ সালে দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্রেরও পতন ঘটে।

তৃতীয় এবং চূড়ান্ত চেষ্টাটি করেন ইবনে সউদ নামে পরিচিত আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান বিন ফয়সাল আল সউদ। ১৯০২ সালে মাত্র ৪০ জনের একটি দল নিয়ে রিয়াদ দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। তার এই যাত্রাপথে অনেক বেদুইন গোষ্ঠী তার সঙ্গে যোগ দেয়, যা ছিল তার বিজয়ের মূল শক্তি। সেই সময়ে হেজাজ ছিল শরিফ হুসেইনের নিয়ন্ত্রণে এবং নজদ ছিল ইবনে সউদের দখলে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আরব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শরিফ হুসেইন এবং ইবনে সউদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯২৪ সালে ইবনে সউদ হেজাজ দখল করে নেন এবং ১৯২৬ সালে নিজেকে হেজাজের বাদশাহ ঘোষণা করেন। পরের বছর তিনি নজদ এবং হেজাজকে একত্রিত করে “কিংডম অব নজদ অ্যান্ড হেজাজ” গঠন করেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তিনি তার রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আদায় করেন। ১৯৩২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর এক রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে ইবনে সউদ এই অঞ্চলকে “আল মামলাকাতুল অ্যারাবিয়া আস-সাউদিয়া” বা রাজকীয় সৌদি আরব নামে নামকরণ করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি যাযাবর জীবনযাপনকারী বেদুইন গোত্রগুলোকে একটি একক সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে আনেন এবং তাদের চিরাচরিত যুদ্ধ ও লুটপাটের প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকেও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না এবং তখনো বেশিরভাগ মানুষ বেদুইন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু ১৯৩৮ সালে তেলের সন্ধান পাওয়ার পর এই অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্লস ক্রেনের সহায়তায় কার্ল এস উইটশেলের জরিপ এবং ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ড্রিলিংয়ের ফলে তেল উৎপাদন শুরু হয়। এই বিশাল তেলের মজুদ সৌদি আরবকে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করে। তেলের অর্থায়নে নির্মিত হয় আধুনিক শহর, উন্নত অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধা। যাযাবর বেদুইনদের জীবনযাপনে আসে আমূল পরিবর্তন এবং তারা ধীরে ধীরে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়।

সৌদি আরবের রাষ্ট্র হিসেবে উত্থান ছিল বেদুইন গোত্রের পরিচয় থেকে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিকাশের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই যাত্রায় রাজনৈতিক কৌশল, ধর্মীয় সমর্থন এবং সামরিক বিজয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। দীর্ঘ তিন দফা চেষ্টার পর ইবনে সউদ বেদুইনদের একতাবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, যা পরবর্তীতে তেলের আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়। এই ইতিহাস কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্মকাহিনী নয় বরং এটি যাযাবর জীবন থেকে স্থির, সুসংহত এবং সমৃদ্ধ এক জাতিতে রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক দলিল।

ফররুখ ফাররুখজাদ – যে প্রতিরোধী কণ্ঠ কবিতায় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন ইরানের গোঁড়ামি ও পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খলকে

ইরানী সাহিত্যের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গৌরবময়। ফেরদৌসীর শাহনামা, হাফিজের গজল বা রুমির সুফি কাব্য—এই ধারা ইরানের গৌরবময় অধ্যায় হলেও সেসব বরাবরই মূলত পুরুষকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ইরানে যেখানে শিয়া ইসলামের প্রবল প্রভাব এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর অনুশাসন বিদ্যমান, সেখানে দাঁড়িয়ে একজন নারী কবি তাঁর বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর তুলেছিলেন। তিনি প্রেম, যৌনতা, নারী-অধিকার এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে হাতিয়ার করেছিলেন তাঁর কবিতাকে।

তাঁর নাম ফররুখ ফররুখজাদ (১৯৩৫-১৯৬৭), যাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকাল ছিল কেবল ৩২ বছর, তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন ইরানের প্রথম আধুনিক নারী কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রশিল্পী, আর সর্বোপরি এক বিদ্রোহী কণ্ঠ। । তাঁর কবিতা কেবল সাহিত্যিক অভিব্যক্তি ছিল না, ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ।

ফররুখ ফররুখজাদের জন্ম ১৯৩৫ সালে তেহরানে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির প্রতি প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পারভেজ শাপুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এরপরই তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না। এই সময়েই জন্ম হয় তাঁর সাহিত্যিক সত্তার ।

১৯৫৪ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “আসীর” (বন্দী) প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং নারীর স্বাধীনতার জন্য এক তীব্র আকুতি প্রকাশ পায়। তাঁর কবিতায় প্রচলিত শিয়া সমাজের রক্ষণশীলতাকে আঘাত করে, যা সমাজে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তৎকালীন সমাজে একজন নারীর জন্য প্রকাশ্যে প্রেম ও যৌনতার কথা বলা ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। ফররুখজাদ সেই দেয়াল ভেঙে দিলেন। তাঁর সাহসী উচ্চারণ তাকে সাহিত্যের অঙ্গনে এক নতুন পরিচয় এনে দিল।

১৯৫৫ সালে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটান এবং এরপর তাঁর জীবনের পথ সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে হারান এবং একা জীবন যাপন শুরু করেন। এই বিচ্ছেদ এবং একাকীত্ব তাঁর কবিতাকে আরও গভীর ও বেদনাদায়ক করে তোলে। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “দেয়াল” প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে, যেখানে একাকীত্ব, হতাশা এবং সমাজের সাথে তাঁর সংঘর্ষের চিত্র ফুটে ওঠে।

ফররুখজাদের কবিতাগুলোতে নারীর আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও যৌনতার এক সাহসী চিত্রণ দেখা যায়। তিনি প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেমকে কেবল আধ্যাত্মিক বা রোমান্টিক বিষয় হিসেবে না দেখে, তাকে শারীরিক ও মানবিক অভিজ্ঞতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর “বন্দী” কবিতার মতো অনেক কবিতায় তিনি নারীর বন্দীদশা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বর্ণনা করেন। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “বিদ্রোহ” প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। এই কাব্যগ্রন্থেই কাব্যিক কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখানে তিনি সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাজনৈতিক স্বৈরাচার এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর কবিতায় নারী কেবল প্রেমিকা বা মা নয়, বরং একজন স্বাধীন, আত্মসচেতন সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়।তিনি শুধু পুরুষ-শাসিত সমাজের সমালোচনা করেননি, নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে চেয়েছিলেন।

ফররুখ ফররুখজাদকে কেন ইরানের প্রথম আধুনিক নারী কবি বলা হয়, তার কয়েকটি কারণ রয়েছে। তিনি কবিতার বিষয়বস্তুতে বিপ্লব এনেছিলেন। তিনি প্রথাগত প্রেমের কবিতা থেকে সরে এসে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজের কদর্যতা, নারীদের যন্ত্রণা এবং যৌনতার মতো নিষিদ্ধ বিষয়কে তাঁর কবিতার উপজীব্য করেন। তাঁর কাব্যিক ভাষা ছিল অত্যন্ত সরল, সহজ এবং প্রতীকী। তিনি পুরোনো ফারসি কবিতার জটিল রীতি থেকে সরে এসে নতুন এক কাব্যিক ভাষা তৈরি করেন, যা সাধারণ পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয় ছিল। কেবল কবিতার মধ্য দিয়ে নয়, নিজের জীবন দিয়েও বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ, একা জীবনযাপন এবং সাহিত্যিক স্বাধীনতা নারীর জন্য এক নতুন পথের দিশা দেয়।

১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মাত্র ৩২ বছর বয়সে ফররুখ ফররুখজাদের জীবনাবসান হয়। তাঁর মৃত্যু ইরানের সাহিত্য জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ “আসুন আমরা ঠান্ডা ঋতুর শুরুটা বিশ্বাস করি” । এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আরও পরিপক্ক এবং দার্শনিক ছিল। এখানে তিনি মৃত্যু, জীবন এবং মানব অস্তিত্ব নিয়ে গভীর চিন্তা প্রকাশ করেন।

ফররুখ ফররুখজাদের মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রভাব কমেনি, বরং বেড়েছে। তিনি সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর কবিতা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তিনি আজো বিশ্বসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে বিবেচিত। তাঁর কবিতা নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। তিনি শিখিয়েছেন, একজন নারী তাঁর নিজের কণ্ঠস্বরকে কীভাবে খুঁজে বের করতে পারে এবং তার শরীর ও মনকে কীভাবে স্বাধীন করতে পারে। ফররুখ ফররুখজাদ একজন কবির চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন; তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী, একজন নারী, যিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

ফররুখ ফররুখজাদ তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে যা অর্জন করেছিলেন, তা অনেকের দীর্ঘ জীবনেও সম্ভব হয় না। তিনি তাঁর সাহসী উচ্চারণ, তাঁর বিদ্রোহী মনোভাব এবং তাঁর কবিতার অসামান্য শৈলীর মাধ্যমে ইরানী সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তিনি কেবল প্রথম আধুনিক নারী কবি ছিলেন না, ছিলেন নারী জাগরণের এক প্রতীক।

ডেঙ্গুকে নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিস হিসেবে চিহ্নিত করেছে – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ডেঙ্গু বাংলাদেশে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে প্রতিটি বর্ষায় প্রাদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুকে নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিস হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা মূলত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। শহরাঞ্চলের অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত পানি ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনের কারণে মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মশাবাহিত রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ তৈরি করে। দেখা যায় ২০২৩ সালে বর্ষা-পরবর্তী সেপ্টেম্বর মাসটি ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। সেদিন দেশের মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ এবং মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘটেছিল। অক্টোবর ও নভেম্বরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালেরও অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সর্বাধিক আক্রান্ত লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এবং সেপ্টেম্বর থেকে কার্ভটি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী তিন মাসেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কীটনাশক ব্যবহারের মধ্যে লার্ভাল স্টেজে লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্ট স্টেজে অ্যাডাল্টিসাইড ব্যবহৃত হয়। তবে কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে কীটনাশক সঠিক মাত্রায়, সময়মতো এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি কীটনাশকের গুণগত মান, প্রস্তুতকরণ, গুদামজাত প্রক্রিয়া, পরিবহন ও ডিসপোজাল পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। প্রয়োগকৃত কীটনাশক যথাযথ না হলে মশার ঘনত্ব কমবে না বরং উপকারী কীটপতঙ্গের মৃত্যু ঘটাবে, যা পরবর্তীতে মশার দৌরাত্ম্য বাড়াবে।

কিছু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্রয়ের সময় পরীক্ষা করা নমুনা এবং মাঠে প্রয়োগকৃত কীটনাশকের কার্যকারিতার মধ্যে পার্থক্য থাকে। এর ফলে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকর উপাদানের পরীক্ষা অপরিহার্য। এই পরীক্ষার জন্য অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব এবং বিশেষজ্ঞ দলের উপস্থিতিতে দৈব চয়ন পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা উচিত। এর মাধ্যমে মশার ঘনত্ব কমানো এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

পরিবেশ ও মানবজাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ম্যালাথিয়নসহ অন্যান্য বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা কমে এবং লক্ষ্যপোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পল হ্যারম্যান মুলারের আবিষ্কৃত ডিডিটি প্রমাণ করেছে কোনো পদার্থের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশ ও মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবেশবান্ধব বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল উপাদানগুলোর ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে কীটনাশক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সঠিক কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর জনসচেতনতা, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অপরিহার্য। রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের লক্ষ্য হতে হবে প্রতিটি জীবন রক্ষা করা এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সীমিত করা।

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে গাজায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে ফ্রান্স

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি গাজায় যুদ্ধপরবর্তী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি জাতিসংঘ অনুমোদিত শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনাও উপস্থাপন করেন। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশের সমর্থন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ পরিকল্পনার সমর্থন পাওয়া যাবে না।

ম্যাক্রোঁ তার ভাষণে বলেন, “গাজায় যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড এবং মৃত্যুর অবসান করার সময় এসেছে। ফিলিস্তিন জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে। এজন্য গাজা, পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।” ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ফ্রান্সের এই পদক্ষেপকে “ঐতিহাসিক ও সাহসী” হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “এই সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে এটি শেষ নয়। এটি শুধু শুরু মাত্র।” এদিকে আরব ও মুসলিম নেতারা নিউ ইয়র্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে তারা গাজায় স্থিতিশীলতা বাহিনী পাঠানোর জন্য নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরবেন। ফ্রান্স ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ম্যাক্রোঁর ঘোষণার পর, ফ্রান্স ও সৌদি আরব যৌথভাবে জাতিসংঘে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমাধানকে “মৃতপথ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। সোমবার রাতে মোনাকো, বেলজিয়াম, আন্দোরা, মাল্টা ও লাক্সেমবার্গ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, যার ফলে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রত্ব একটি অধিকার, পুরস্কার নয়। তিনি বলেন, “৭ অক্টোবর হামাসের সন্ত্রাস এবং বন্দি নেয়ার মতো ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত করা যায় না। তেমনি ফিলিস্তিন জনগণের উপর সামষ্টিক শাস্তি আরোপের কোনো ন্যায্যতা নেই।”

ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি ড্যানন অধিবেশনটিকে “রাজনৈতিক সার্কাস” হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রও সতর্ক করেছে যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়ায় গুরুতর কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। ইসরায়েল জানিয়েছে, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তারা পশ্চিম তীর দখল করার পরিকল্পনা বিবেচনা করতে পারে।

ফ্রান্সের শান্তিরক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে, তাদের অস্ত্র জমা দিতে বাধ্য করা হবে এবং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। জাতিসংঘ অনুমোদিত বাহিনী গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং হামাসকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে রাখবে।

এই কূটনৈতিক কার্যক্রমের সময় গাজায় পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। সোমবারে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় ৩৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যার মধ্যে ৩০ জন গাজা সিটিতে। ইসরায়েল দাবি করেছে শহরে ৩,০০০ হামাস যোদ্ধা লুকানো আছে।

আরব লীগ জুলাইয়ে ঘোষণা করেছে হামাসের কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকবে না। গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের প্রশাসন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তরিত হবে। হামাসকে তার অস্ত্র সোপর্দ করতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আরব নেতাদের বৈঠক এই বিষয়ে সরাসরি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত নীতি তুলে ধরবেন।

যুক্তরাজ্যও ১৯৪৯ সালের আর্মিস্টিস সীমারেখা বা “গ্রিন লাইন” ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে গাজা ও পশ্চিম তীর পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রাখবে। কিছু দল গাজা দখল করার পরিকল্পনা করছে।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বাররো জানান, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হামাসকে ক্ষমতায় কোনো ভূমিকা দেওয়া হবে না। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোহান ওয়াডেফুল বলেন, “বৈধ দখলদারি জমি অধিগ্রহণের সব পদক্ষেপ দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে বিঘ্নিত করে। তবে এখনও দুই-রাষ্ট্র সমাধানই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ।”

ফ্রান্সের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রত্বকে সমর্থন এবং গাজায় শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।