১৫ থেকে ২০ হাজার বছর আগে বরফ যুগ শেষ হওয়ার পর সৌদি আরবের শুষ্ক মরুভূমিতে মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি ছিল বিভিন্ন যাযাবর বেদুইন গোত্রের বিচরণক্ষেত্র। নিজেদের স্বতন্ত্র জীবনধারা, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে তারা অন্য কোনো শক্তির অধীনে থাকতে রাজি ছিল না। ইসলাম ধর্ম প্রচারের পর এই অঞ্চলটি সাময়িকভাবে খিলাফতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও, তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দামেস্ক, বাগদাদ এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের মতো দূরবর্তী শহরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।
তবে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের চেষ্টা, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক কৌশলের ফসল। এটি ছিল যাযাবর বেদুইনদের একতাবদ্ধ হওয়ার এবং নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক লড়াই।
প্রাচীন আরব উপদ্বীপের ইতিহাস ছিল বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্যের উত্থান-পতনের এক জটিল চিত্র। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০ শতকের দিকে বর্তমান বাহরাইন ও তার আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় দিলমুন নামের একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মুক্তার জন্য বিখ্যাত এই দিলমুন ব্যাবিলন, মেগান (বর্তমান ওমান) এবং মেসোপটেমিয়ার মতো দূরবর্তী শহরের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ইয়েমেন তখন সাবা বা শেবা নামে পরিচিত ছিল, আর জর্ডান ছিল নাবাতায়েন।
তবে এই সব রাজ্যের বাইরে আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের “জাজিরাতে আল-আরব” বা “আরবদের দ্বীপ” বলে পরিচয় দিত। তারা প্রধানত মরুভূমির যাযাবর ছিল, যাদেরকে বলা হতো বেদুইন। তাদের জীবন ছিল গোষ্ঠী বা গোত্রভিত্তিক, যেখানে প্রতিটি গোত্র নিজেদের শাসন ও বিচার-আচার নিজেরাই পরিচালনা করত। দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই গোত্রগুলোর অধিকাংশই রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, পরবর্তীতে তারা সেই কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে। তৃতীয় শতকের দিকে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী আদিবাসী কনফেডারেশন গঠন করে, যা তাদের ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
ষষ্ঠ শতকের শেষের দিকে, আরব উপদ্বীপের যাযাবর গোত্রগুলোর মধ্যে বিভেদ, হানাহানি এবং লুটপাট ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা মুসলমানদের দখলে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। মদিনা থেকে শুরু হওয়া ইসলাম ধর্মের প্রচারের মাধ্যমে বেদুইন গোত্রগুলো একটি একক ছাতার নিচে একত্রিত হয়। ইসলামের নবী মুহাম্মদের (সাঃ) মৃত্যুর পর প্রায় পুরো আরব অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বেদুইনরা নিজেদের মধ্যেকার সংঘাত বাদ দিয়ে একের পর এক অভিযানে অংশ নিয়ে ইসলামকে স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করে। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের রাজধানী আরব থেকে সরে প্রথমে দামেস্ক এবং পরে বাগদাদে চলে যায়। ফলে আবারো আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পায়।
সেই সময় আরব উপদ্বীপ মূলত দুটি অংশে বিভক্ত ছিল, পশ্চিম উপকূল বরাবর “হিজাজ” যার মধ্যে মক্কা, মদিনা, জেদ্দা অবস্থিত এবং মরুভূমি ও পাহাড়বেষ্টিত “নজদ” যেখানে আজকের রিয়াদ শহর অবস্থিত। হিজাজ বিভিন্ন সময়ে বিদেশি শক্তির অধীনে থাকলেও, নজদের বেদুইনরা বরাবরই নিজেদের স্বাধীন মনে করত এবং কোনো বিদেশি শক্তির শাসন মেনে নেয়নি। উসমানি সুলতান প্রথম সেলিম ১৫৫৭ সালে হিজাজের নিয়ন্ত্রণ নিলেও, নজদের যাযাবর গোত্রগুলো তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখে।
আধুনিক সৌদি আরবের ভিত্তি স্থাপন ছিল তিনটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। ১৭৪৪ সালে রিয়াদের কাছে দিরিয়া নামের একটি এলাকায় মুহাম্মদ বিন সউদ প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন। ওয়াহাবের ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের জন্য সামরিক সমর্থন দরকার ছিল, আর মুহাম্মদ বিন সউদের দরকার ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মীয় বৈধতা। এই জোটের মাধ্যমে তারা নজদকে একতাবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তাদের উত্তরসূরিরা উসমানি ও মামলুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন এবং হিজাজের সঙ্গে বিবাহসূত্রে ঐক্য স্থাপন করেন। কিন্তু ১৮১৮ সালে উসমানি ও মিশরীয় বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
এরপর ১৮২৩ সালে তুর্কি ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সউদ দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রিয়াদকে রাজধানী করে “নজদ আমিরাত” নামে নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। কিন্তু তারও ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি। মাত্র এগারো বছর পর তার এক জ্ঞাতি ভাইয়ের হাতে তিনি নিহত হন এবং ১৮৯১ সালে দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্রেরও পতন ঘটে।
তৃতীয় এবং চূড়ান্ত চেষ্টাটি করেন ইবনে সউদ নামে পরিচিত আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান বিন ফয়সাল আল সউদ। ১৯০২ সালে মাত্র ৪০ জনের একটি দল নিয়ে রিয়াদ দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। তার এই যাত্রাপথে অনেক বেদুইন গোষ্ঠী তার সঙ্গে যোগ দেয়, যা ছিল তার বিজয়ের মূল শক্তি। সেই সময়ে হেজাজ ছিল শরিফ হুসেইনের নিয়ন্ত্রণে এবং নজদ ছিল ইবনে সউদের দখলে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আরব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শরিফ হুসেইন এবং ইবনে সউদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯২৪ সালে ইবনে সউদ হেজাজ দখল করে নেন এবং ১৯২৬ সালে নিজেকে হেজাজের বাদশাহ ঘোষণা করেন। পরের বছর তিনি নজদ এবং হেজাজকে একত্রিত করে “কিংডম অব নজদ অ্যান্ড হেজাজ” গঠন করেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তিনি তার রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আদায় করেন। ১৯৩২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর এক রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে ইবনে সউদ এই অঞ্চলকে “আল মামলাকাতুল অ্যারাবিয়া আস-সাউদিয়া” বা রাজকীয় সৌদি আরব নামে নামকরণ করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি যাযাবর জীবনযাপনকারী বেদুইন গোত্রগুলোকে একটি একক সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে আনেন এবং তাদের চিরাচরিত যুদ্ধ ও লুটপাটের প্রথা নিষিদ্ধ করেন।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকেও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না এবং তখনো বেশিরভাগ মানুষ বেদুইন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু ১৯৩৮ সালে তেলের সন্ধান পাওয়ার পর এই অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্লস ক্রেনের সহায়তায় কার্ল এস উইটশেলের জরিপ এবং ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ড্রিলিংয়ের ফলে তেল উৎপাদন শুরু হয়। এই বিশাল তেলের মজুদ সৌদি আরবকে রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করে। তেলের অর্থায়নে নির্মিত হয় আধুনিক শহর, উন্নত অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধা। যাযাবর বেদুইনদের জীবনযাপনে আসে আমূল পরিবর্তন এবং তারা ধীরে ধীরে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়।
সৌদি আরবের রাষ্ট্র হিসেবে উত্থান ছিল বেদুইন গোত্রের পরিচয় থেকে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিকাশের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই যাত্রায় রাজনৈতিক কৌশল, ধর্মীয় সমর্থন এবং সামরিক বিজয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। দীর্ঘ তিন দফা চেষ্টার পর ইবনে সউদ বেদুইনদের একতাবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, যা পরবর্তীতে তেলের আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়। এই ইতিহাস কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্মকাহিনী নয় বরং এটি যাযাবর জীবন থেকে স্থির, সুসংহত এবং সমৃদ্ধ এক জাতিতে রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক দলিল।


