Home Blog Page 13

মার্কাস অরেলিয়াস – ইউরোপের অন্ধকার যুগে যে সম্রাট আলোর খোঁজে কাটিয়েছিলেন

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এক অন্ধকার সময়ে যখন মহামারি ও যুদ্ধ ইউরোপকে গ্রাস করছিল তখন সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, দার্শনিক বিশ্বাস এবং একজন ভালো শাসক ও মানুষ হওয়ার উপায় নিয়ে লিখেছিলেন এক অনন্য গ্রন্থ, ‘মেডিটেশনস’। এটি কোনো সাধারণ বই ছিল না, ছিল একজন সম্রাটের একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার এক সংকলন, যা পরবর্তী সহস্রাব্দে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মার্কাস অরেলিয়াসের চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ শতকে গ্রিসের জেনো অব সিটিয়াম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দর্শন স্টোইসিজম। স্টোইসিজমের মূল কথা হলো, জীবনের প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে ভেতরের শক্তিকে বিকশিত করা। এই দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের ভালো থাকা বা সুখ নির্ভর করে সদ্‌গুণ এবং যুক্তির ওপর, বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নয়।

মার্কাস অরেলিয়াস নিজে একজন শিক্ষিত এবং অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন, তিনি তার ব্যক্তিগত শিক্ষক কুইন্টাস জুনিয়াস রাসটিকাসের মাধ্যমে এই দর্শনের সংস্পর্শে আসেন। রাসটিকাস তার অস্থির এবং উদ্ধত চরিত্রকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন এবং স্টোইক দার্শনিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

‘মেডিটেশনস’ গ্রন্থে মার্কাস অরেলিয়াস তার গুরু এপিটেটাসের ‘এনচিরিডিয়ন’ (Manual) থেকে বেশ কিছু নীতি গ্রহণ করেছেন। এপিটেটাস কজন প্রাক্তন দাস ছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল পূর্বসূরিদের আদর্শ অনুসরণ করেননি, তার নিজস্ব মৌলিক চিন্তাভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের উপলব্ধিই হলো প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তি। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়ে সদ্‌গুণের অনুশীলনই সুখের পথ।

‘মেডিটেশনস’ কোনো পরিকল্পিত গ্রন্থ ছিল না। এটি ছিল মার্কাস অরেলিয়াসের ব্যক্তিগত জার্নাল, যা তিনি যুদ্ধের মাঝে, সামরিক ছাউনিতে, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে বসেও লিখতেন। তার লেখাগুলো ছিল অনেকটা বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনার মতো, কখনো সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ, আবার কখনো গভীর দার্শনিক আলোচনা। এই লেখাগুলো থেকে বোঝা যায়, একজন রোমান সম্রাট হিসেবে জীবনযাপন করা কতটা কঠিন ছিল, বিশেষত যখন একজন স্টোইক হিসেবে জীবন ধারণ করার চেষ্টা করা হয়।

মার্কাস অরেলিয়াস তার দায়িত্ববোধের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন তাকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে যা জনগণের জন্য সর্বোত্তম।

তিনি লিখেছেন, “প্রতিটি দিন শুরু করো নিজেকে এই কথা বলে: আজ আমি বাধা, অকৃতজ্ঞতা, ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্বেষ এবং স্বার্থপরতার সম্মুখীন হব… এর কোনোটিই আমাকে আঘাত করতে পারবে না, কারণ কেউ আমাকে এমন কাজে জড়াতে পারবে না যা আমাকে হেয় করে।”

এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তিনি তার সম্রাটের দায়িত্বকে কতটা কঠিন মনে করতেন এবং স্টোইক দর্শন তাকে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে সাহায্য করত।

‘মেডিটেশনস’ গ্রন্থের শুরুতেই মার্কাস অরেলিয়াস তার জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি তার শিক্ষক, পিতামাতা এবং অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন, যারা তাকে কুসংস্কার ও মন্দ অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে এবং একটি গুণী জীবন ধারণে সহায়তা করেছেন।
তবে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু দিক তার লেখায় উঠে এসেছে। তিনি অনেক মানবিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন যেগুলো তাকে বিরক্ত করত।

তিনি গ্ল্যাডিয়েটরদের খেলা ঘৃণা করতেন, যৌনতাকে তিনি “এক ক্ষণিকের আবেশ” হিসেবে দেখতেন। তিনি সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিও বিরক্তি প্রকাশ করতেন, যারা ক্ষমতা বা ঐশ্বর্যের মোহে আচ্ছন্ন ছিল। তিনি তার লেখায় সিনেটর এবং সম্রাটদের পরা বেগুনি পোশাককে “ভেড়ার পশম, যা শামুকের রক্তে রাঙানো” বলে উপহাস করেছেন।

স্ত্রী ফাউস্টিনার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা ফাউস্টিনাকে নিয়ে খারাপ কথা বললেও মার্কাস অরেলিয়াস তাকে “এত বাধ্য, এত স্নেহময়ী এবং এত সহজ-সরল” বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের ১৩ জন সন্তান ছিল, কিন্তু মাত্র ছয়জন শৈশব পার করতে পেরেছিল। ফাউস্টিনার মৃত্যুর পর মার্কাস অরেলিয়াস গভীর শোক প্রকাশ করেন।

যুদ্ধে অবস্থানকালে তিনি অনেক অন্ধকার দিক নিয়েও ভেবেছেন। তিনি যুদ্ধের ভয়ংকর বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন এভাবে –
“তুমি কি কখনো বিচ্ছিন্ন হাত বা পা দেখেছো, বা একটি বিচ্ছিন্ন মাথা, যা তার দেহ থেকে অনেক দূরে পড়ে আছে…?”

এই চিন্তাগুলো তাকে বারবার আঘাত করেছে। তবুও তিনি নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাতের দার্শনিককে দিনের বেলায় একজন সামরিক নেতা হতে হয়।

‘মেডিটেশনস’ জুড়ে মার্কাস অরেলিয়াস বারবার জীবনের ক্ষণস্থায়ীতার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত এবং তুচ্ছ। গতকাল ছিল এক ফোঁটা শুক্রাণু; আগামীকাল হবে ছাই।”

এই ক্ষণস্থায়ীতা তাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। তিনি বলেছেন, “এমনভাবে প্রতিটি কাজ করো যেন এটি তোমার জীবনের শেষ কাজ।” তিনি অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে কেবল বর্তমানের ওপর মনোযোগ দিতে বলেছেন।

মার্কাস অরেলিয়াসের সবচেয়ে বড় অন্বেষণ ছিল মনের শান্তি। তিনি বলেছেন, “অস্তিত্ব আমাদের পাশ দিয়ে নদীর মতো বয়ে যায়।” এই ক্ষণস্থায়ীতার আলোকে তিনি মনে করতেন সবচেয়ে ভালো পথ হলো নিজের কর্তব্য পালন করা, অন্যদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং সব কিছুকে যুক্তির দ্বারা বিচার করা।

তার কাছে মৃত্যু কোনো দুঃখের বিষয় ছিল না। তিনি মৃত্যুকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “মৃত্যুকে ঘৃণা করো না, বরং একে স্বাগত জানাও।” মৃত্যুকে তিনি একটি জলপাইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা পেকে গাছ থেকে পড়ে যায় এবং তার জন্মদাত্রী মায়ের প্রশংসা করে।

মার্কাস অরেলিয়াসের এই জীবন-দর্শন তার মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে আছে। তার লেখাগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। চীন থেকে আমেরিকার বহু বিখ্যাত ব্যক্তি তার লেখাকে তাদের জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে একজন সম্রাটের ব্যক্তিগত ভাবনাগুলোও কীভাবে সময়ের সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন সত্যে পরিণত হতে পারে।

ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পথে

ভারত সরকার নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দর ব্যবহার করে চার ধরনের পাটপণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে দেশটিতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানি কার্যত সীমিত হয়ে এসেছে। প্রজ্ঞাপনের আওতায় থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্যের কাপড়, পাটের দড়ি বা রশি, পাটজাত পণ্য দিয়ে তৈরি দড়ি বা রশি এবং পাটের বস্তা বা ব্যাগ। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, এই পণ্যগুলো ভারতে পাঠাতে হলে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে মুম্বাইয়ের নভসেবা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করতে হবে।

জানা গেছে, স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে রপ্তানি করা পণ্যের প্রায় ৯৮ ভাগই আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেত। গত জুনে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর স্থলবন্দর ব্যবহার করে কিছু পাট ও পাটজাত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করায় ইতিমধ্যেই রপ্তানি সংকুচিত হয়ে এসেছিল। এখন এই নতুন প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, সমুদ্রপথ ব্যবহার করে রপ্তানি কতটা কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশনের ডিরেক্টর ও রাজবাড়ী জুট মিলসের চেয়ারম্যান শেখ শামসুল আবেদিন জানান, স্থলবন্দর ব্যবহার করে পাটপণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আসলে যেটুকু পণ্য যাওয়ার সুযোগ ছিলো সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হলো।” ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। এছাড়াও আগে এই পণ্যগুলো ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের বাজারে রপ্তানি হতো, কিন্তু এখন অতিরিক্ত শুল্কের কারণে রপ্তানি হুমকির মুখে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী মনে করছেন, ভারতের স্থলবন্দর ব্যবহার করে আমদানি নিষিদ্ধ করার ফলে ভারতীয় আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে। এতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, “এখন ভারতের আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেশি হওয়ায় ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে এবং রপ্তানিকারকদের দাম কমিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতে পারে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, একেবারে রপ্তানি বন্ধ হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, “ভারতের বিধিনিষেধের নেতিবাচক প্রভাব থাকবে, কিন্তু এটি রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। নির্বাচিত সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে স্থলপথে রপ্তানি পুনঃপ্রবেশের পথ তৈরি করে, তবে পরিস্থিতি সমাধানযোগ্য।”

এর আগে ভারতের কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয় এবং গত মে মাসে স্থলবন্দর ব্যবহার করে কিছু পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে স্থলবন্দর ব্যবহার করে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের আয় প্রায় ১৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি ছিল। এর মধ্যে প্রায় সমস্ত পণ্যই স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে গিয়েছিল।

পাট অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১২টি দেশে প্রায় ১০৯৭ কোটি টাকার কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ভারতই ছিল প্রধান বাজার, যেখানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭০৯ কোটি টাকার পাট।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, যদি স্থলপথে রপ্তানির সুবিধা পুনরায় না পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের পাটখাতের রপ্তানি আয় কিছুটা কমতে পারে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবহন খরচ বাড়বে।

বিশ্বের প্রথম AI-ডিজাইন করা ভাইরাস তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণরূপে AI-উৎপন্ন জেনোম তৈরি করেছেন। এটি এক প্রকার বিপ্লব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ AI দ্বারা তৈরি নতুন ভাইরাসটি ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণ করতে এবং ধ্বংস করতে সক্ষম।

আগে বিজ্ঞানীরা AI ব্যবহার করে নির্দিষ্ট প্রোটিন বা ছোট মাল্টি-জিন সিস্টেম ডিজাইন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে একটি সম্পূর্ণ জেনোম তৈরি করা অনেক বেশি জটিল। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি জেনোমে অনেক আন্তঃক্রিয়াশীল জিন এবং নিয়ন্ত্রণমূলক সুইচ থাকতে হয় যা একটি জীবকে বৃদ্ধি, প্রতিলিপি তৈরি এবং বেঁচে থাকার ক্ষমতা দেয়। বিজ্ঞানীদের জন্য এ পর্যন্ত সবগুলো উপাদান একত্রিত করা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

আর্ক ইনস্টিটিউটের পোস্টে বলা হয়েছে “জেনোম ডিজাইন করতে হলে একাধিক আন্তঃক্রিয়াশীল জিন এবং নিয়ন্ত্রণ উপাদানকে সমন্বয় করতে হয়, সাথে এমন ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় যা পুনরাবৃত্তি, হোস্ট নির্দিষ্টতা এবং বিবর্তনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এই জটিলতা নতুন সীমাবদ্ধতা এবং ব্যর্থতার সম্ভাবনা তৈরি করে যা একক প্রোটিন বা দুই-উপাদান সিস্টেম ডিজাইনের ক্ষেত্রে দেখা যায় না”।

গবেষকরা পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছিলেন একটি ছোট ভাইরাস ব্যাকটেরিওফেজ ΦX174। এই ভাইরাসটি ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণ করে এবং এর জেনোম খুব ছোট কিন্তু জটিল – মাত্র ৫,৩৮৬ DNA লেটার এবং ১১টি জিন, যাদের অধিকাংশই একে অপরের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে।

এটি ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স করা জেনোম এবং ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো স্ক্র্যাচ থেকে সংশ্লেষিত। এখন এটি AI দ্বারা ডিজাইন হওয়া প্রথম জেনোম।

AI-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গবেষকরা একটি জেনোমিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করেছেন যার নাম Evo, এটিতে ভাইরাসের পরিবারের হাজার হাজার জেনোমে ফাইন-টিউন করা হয়েছিল, যাতে এটি ΦX174-এর “ডায়ালেক্ট” বুঝতে পারে। প্রম্পটের মাধ্যমে AI হাজার হাজার সম্ভাব্য জেনোম তৈরি করেছে।

পরবর্তীতে গবেষকরা একটি কাস্টম সফটওয়্যার তৈরি করে নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিটি ডিজাইনে সব মূল জিন এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিন আছে, যা ই.কোলাই সংক্রমণ সক্ষম। এরপর তারা শত শত AI জেনোম ল্যাবে সংশ্লেষণ করে ব্যাকটেরিয়ায় প্রতিস্থাপন করেন এবং পরীক্ষা করেন এগুলো পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম কিনা। ফলশ্রুতিতে ১৬টি নতুন কার্যকর ভাইরাস উদ্ভূত হয়, যা প্রকৃতিতে কখনো দেখা যায়নি এমন ৩৯২টি মিউটেশন বহন করে।

একটি ডিজাইন এমনকি দূরের আত্মীয় ভাইরাস থেকে DNA-প্যাকেজিং প্রোটিন ধার নিয়েছিল, যা মানব প্রকৌশলীরা আগে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি নিশ্চিত করেছে নতুন প্রোটিন ভাইরাস শেলের ভিতরে সঠিকভাবে কাজ করছে।

Evo মডেলটি ২ মিলিয়ন ভাইরাসে প্রশিক্ষিত হয়েছিল এবং পরে নতুন ভাইরাস ডিজাইনের জন্য ব্যবহার করা হয়। ৩০২টি প্রচেষ্টার মধ্যে ১৬টি ল্যাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়। AI-ভাইরাসগুলো এমন জিন সংমিশ্রণ বহন করছিল যা আগে মানব বিজ্ঞানীরা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই অর্জন জীববিজ্ঞানে একটি নতুন ধাপের সূচনা করেছে। DNA সিকোয়েন্সিং থেকে শুরু করে এটি লেখা এবং এখন ডিজাইন করা পর্যন্ত, এটি একটি নতুন মাইলফলক। AI এখন শিক্ষার, উৎপাদনশীলতা এবং সৃজনশীলতার মতো ক্ষেত্রে সীমাহীন সম্ভাবনা প্রদর্শন করছে। এই গবেষণা প্রমাণ করে, AI বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং বিপ্লবী উদ্ভাবনকে কত দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।

জনগণ ট্যাক্স দেয় কিন্তু সেবা পায় না : ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থ উপদেষ্টা

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে কর প্রদান করেও জনগণ যথাযথ সেবা পাচ্ছে না, যা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক বিদেশি দেশে করের পরিমাণ বেশি হলেও সেবার মান ভালো থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ কর দেয়, সেবা পায় না।এজন্য জনগণের মধ্যে ক্ষোভ স্বাভাবিক।

ড. সালেহউদ্দিন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) যৌথভাবে আয়োজিত “বাংলাদেশের বন্ড ও সুকুক বাজার উন্মোচন: রাজস্ব স্থিতি, অবকাঠামো বাস্তবায়ন ও ইসলামি মানি মার্কেট উন্নয়ন” শীর্ষক সেমিনারে এই মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, দেশের অর্থায়নের অভাব একটি বড় সমস্যা। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন সবকিছু সরবরাহ করা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে অর্থের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার প্রতিদিন বিভিন্নভাবে অর্থ চায়, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহ হচ্ছে না।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.২ শতাংশ, যেখানে ব্রাজিলে এটি ২৬ শতাংশ। ব্রাজিলে কর প্রদানকারীরা সেবা পান, কিন্তু বাংলাদেশে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই তিনি প্রায়ই এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সদস্যদের পরামর্শ দেন, জনগণকে সেবা প্রদান বাড়াতে হবে।তিনি বলেন, “সেবা ভালো দিলে আমরা করও বেশি দিতে পারি। সেবা না দিলে কতই বা ফি চাইবেন, তা কার্যকর হবে না।”

সেমিনারে ড. সালেহউদ্দিন পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার গুরুত্ব এবং সুকুক বন্ড সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অর্লিন্সের অধ্যাপক এম. কবীর হাসান। সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও পুঁজিবাজার উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মানসুর, এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক প্রমুখ।

সেমিনারটির মাধ্যমে দেশের কর সংগ্রহ, রাজস্ব স্থিতি এবং ইসলামি মানি মার্কেটের উন্নয়নসহ পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে জনগণকে সেবা প্রদানের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

Goethe-এর Faust ইউরোপের বিকাশ ও জীবনদর্শনের সংঘাত

পাশ্চাত্য সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে হাতেগোনা কিছু সাহিত্যকর্ম খুঁজে পাওয়া যায়, যা কেবল একটি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মানবসভ্যতার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে। জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে’র অমর কাব্যনাট্য ‘ফাউস্ট’ এমনই একটি সৃষ্টি। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে রচিত এই মহাকাব্যটি নিছক কোনো সাহিত্য নয়, এটি ইউরোপীয় আধুনিকতার জন্মলগ্ন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবাধ আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের আত্মার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক প্রতিচ্ছবি। এই রচনাটি কেবল একজন মানুষের শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রির গল্প নয়, এটি মানবতার নিরন্তর সংগ্রাম, জ্ঞান ও ক্ষমতার অন্বেষণ এবং ভালো-মন্দের সীমারেখা নিয়ে গভীর দার্শনিক আলোচনা।

গ্যেটে’র ফাউস্টের মূল চরিত্র, ডক্টর হেইনরিখ ফাউস্ট, একজন জ্ঞানী পণ্ডিত। তিনি দর্শন, আইন, ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা সবকিছুতেই পারদর্শী।কিন্তু এত জ্ঞান অর্জন করেও তার আত্মা তৃপ্ত নয়। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রচলিত বিদ্যা দিয়ে জীবনের গভীরতম সত্য বা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। তার এই অতৃপ্তি, এই শূন্যতা তাকে প্রচলিত সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে। আধুনিক মানুষের এই চিরন্তন অতৃপ্তি, যার জন্ম হয় জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মাধ্যমে, তা ফাউস্ট চরিত্রের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই অতৃপ্তিই তাকে চরম মুহূর্তে হতাশ করে তোলে এবং মেফিস্টোফেলিসের (শয়তান) মুখোমুখি দাঁড় করায়।

ফাউস্টের জীবনের চরম হতাশার মুহূর্তে মেফিস্টোফেলিস তার কাছে আসে এবং তাকে এক লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। মেফিস্টোফেলিস তাকে এমন সব অভিজ্ঞতা, ক্ষমতা ও জ্ঞান দেবে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনাতীত। বিনিময়ে ফাউস্টকে নিজের আত্মা তার কাছে বিক্রি করতে হবে। তবে এখানে চুক্তিটি প্রচলিত গল্পের মতো সরল নয়। গ্যেটে-এর ফাউস্টে চুক্তিটি হয় এই শর্তে যে, যদি ফাউস্ট কোনো এক মুহূর্তে জীবনের প্রতি চরম তৃপ্তি অনুভব করে বলে ওঠেন, “থেমে যাও! তুমি কত সুন্দর!” (“Verweile doch! du bist so schön!”), তবে সেই মুহূর্তেই তার জীবন শেষ হয়ে যাবে এবং তার আত্মা মেফিস্টোফেলিসের হবে।

এই শর্তের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গ্যেটে’র দার্শনিক ভাবনা, মানুষের জীবন হলো নিরন্তর সংগ্রাম ও অসন্তুষ্টির এক অন্তহীন যাত্রা। প্রকৃত আধুনিক মানুষ তার জীবনের কোনো এক মুহূর্তে চূড়ান্ত তৃপ্তি অনুভব করে স্থির থাকতে পারে না, কারণ তার লক্ষ্য কেবল-ই সামনে এগিয়ে যাওয়া।

এই চুক্তির মাধ্যমে ফাউস্ট কেবল শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেনি, বরং সে প্রচলিত নৈতিকতা, ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সমাজের গণ্ডি থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে। এটি ছিল আধুনিক মানুষের জন্মলগ্ন—যেখানে মানুষ ঈশ্বরের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছাকে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ফাউস্টের এই যাত্রা কোনো নৈতিক অবক্ষয়ের গল্প নয়, এটি মানবজাতির সেই যাত্রার প্রতীক, যেখানে জ্ঞান, ক্ষমতা এবং সাফল্যের অন্বেষণে মানুষ সব ধরনের সীমানা অতিক্রম করতে প্রস্তুত।

গ্যেটে তার ‘ফাউস্ট’ মহাকাব্যটি দুটি খণ্ডে রচনা করেন। প্রথম খণ্ড ফাউস্টের ব্যক্তিগত যাত্রা এবং তার মানবিক আবেগের গল্প। এই খণ্ডে ফাউস্ট মেফিস্টোফেলিসের সাহায্যে গ্রচেন নামক এক সাধারণ মেয়েকে মুগ্ধ করে। তাদের ভালোবাসার গল্পটি করুণ ট্র্যাজেডিতে শেষ হয়। গ্রচেনের করুণ পরিণতি ফাউস্টের মধ্যে অপরাধবোধ তৈরি করে, যা তার অহংকারী আত্মাকে বিচলিত করে তোলে।

এই অংশটি মানবীয় আবেগ, প্রেম, পাপ এবং অনুশোচনার এক শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রথম খণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী ও দার্শনিক। এটি শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়, এটি মানবসভ্যতার অগ্রগতি, শিল্পকলা, বিজ্ঞান এবং আধুনিক রাষ্ট্রের বিবর্তনের এক রূপক। এই খণ্ডে ফাউস্ট সময় ও স্থান অতিক্রম করে হেলেন অফ ট্রয়ের মতো পৌরাণিক চরিত্রের মুখোমুখি হয়। সে রাজসভায় গিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করে, যা আধুনিক পুঁজিবাদ এবং অর্থনীতির জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় খণ্ডে ফাউস্টের লক্ষ্য আর ব্যক্তিগত সুখ নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণকর কিছু সৃষ্টি করা। সে সাগরের ভূমি পুনরুদ্ধার করে এক নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে চায়। এই প্রচেষ্টা ফাউস্টের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।

‘ফাউস্ট’-এর মূল বার্তা হলো, মানুষের সার্থকতা তার অবিরাম প্রচেষ্টায়, কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে নয়। যখন ফাউস্ট জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং সে মনে করে যে সে তার স্বপ্ন পূরণ করেছে, তখনই তার জীবনের চুক্তিটি সমাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু গ্যেটে তার ফাউস্টকে বাঁচিয়ে রাখেন। ফাউস্টের আত্মা স্বর্গে আরোহণ করে, কারণ সে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছে। এখানে গ্যেটে একটি বিপ্লবী বার্তা দেন, “মানুষের চূড়ান্ত মুক্তি আসে তার অনবরত সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে, শুধু জ্ঞান বা সুখের মাধ্যমে নয়।”

গ্যেটে’র ফাউস্ট তাই কেবল একজন পণ্ডিতের গল্প নয়, এটি আধুনিক ইউরোপের জন্মের গল্প। এটি সেই সময়ের গল্প যখন আলোকায়ন আন্দোলন মানুষকে যুক্তি ও জ্ঞানের পথে পরিচালিত করেছিল। এটি আধুনিক মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, যার জন্ম হয় জ্ঞান ও স্বাধীনতার মাধ্যমে, কিন্তু শেষ হয় না কখনো। ফাউস্টের আত্মার বিক্রয়কথা তাই কেবল একটি সাহিত্যিক থিম নয়, এটি মানবসভ্যতার সেই চুক্তির প্রতীক, যেখানে মানুষ তার সীমাহীন জ্ঞান, ক্ষমতা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য তার আত্মার শান্তিকে বাজি রাখতে প্রস্তুত।

প্লাস্টিককে শক্তিশালী কার্বন ফিল্টারে পরিণত করলেন বিজ্ঞানীরা

জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্লাস্টিক দূষণের মতো দুটি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য একটি নতুন এবং অপ্রত্যাশিত সমাধান নিয়ে এসেছেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। তারা প্লাস্টিকের বোতল থেকে এমন একটি নতুন উপাদান তৈরি করেছেন, যা শুধু বাতাস থেকেই নয়, পানি থেকেও কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) শোষণ করতে সক্ষম। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার একই সঙ্গে সমুদ্র এবং বাতাসকে আরও পরিচ্ছন্ন করতে পারে।

গবেষকরা PET প্লাস্টিক, যা সাধারণত প্লাস্টিকের বোতল এবং টেক্সটাইল পণ্যে ব্যবহৃত হয়, তাকে রাসায়নিকভাবে রূপান্তরিত করে BAETA নামক একটি উপাদান তৈরি করেছেন। এই উপাদানটি কার্বন ক্যাপচার করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এটিকে বিজ্ঞানীরা “কার্বন-খাদক প্লাস্টিক” হিসেবে অভিহিত করছেন, কারণ এটি বাতাস থেকে অথবা শিল্পকারখানার নির্গমন থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। এটি প্লাস্টিক দূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান সমস্যার যুগপৎ সমাধান দিতে সক্ষম।

অন্যান্য প্রচলিত কার্বন-ক্যাপচার প্রযুক্তির তুলনায় BAETA বেশ কয়েকটি দিক থেকে অনন্য। প্রথমত এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সহজে তৈরি করা যায়। দ্বিতীয়ত এটি বিভিন্ন তাপমাত্রায় সমানভাবে কার্যকর, যা এটিকে শিল্পকারখানার বিভিন্ন পরিবেশে ব্যবহারের জন্য আদর্শ করে তোলে। এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর কার্যকারিতা। এটি এমন ধরনের ক্ষয়প্রাপ্ত বা ডিগ্রেডেড প্লাস্টিক ব্যবহার করে, যা প্রচলিত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় প্রায়শই বাদ পড়ে যায়।

এর ফলে এই প্রক্রিয়াটি বর্জ্যকে একটি মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরিত করে। এই রূপান্তরের পদ্ধতিটি খুবই শক্তি-সাশ্রয়ী। এটি সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রায় সম্পন্ন হয়, যার ফলে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয় না। একবার যখন উপাদানটি কার্বন শোষণে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন এটিকে সামান্য উত্তাপের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড মুক্ত করা হয় এবং উপাদানটি আবার ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এটিকে বারবার ব্যবহার করা যায়, যা এর কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে তোলে।

এই গবেষণার প্রধান লেখক মার্গারিটা পোডেরাইটে বলেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে একটি সংকট সমাধান করতে গিয়ে অন্য কোনো সংকটকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়োজন নেই বরং এটি উভয়কেই সমাধান করতে পারে।

গবেষকরা বর্তমানে এই উপাদানের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার এবং এটিকে বৃহৎ পরিসরে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনা করছেন।

এই আবিষ্কার পরিবেশের প্রতি আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে আর পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবে না দেখে, এটিকে জলবায়ু সমস্যার সমাধানে একটি মূল্যবান হাতিয়ার হিসেবে দেখা যেতে পারে।

যদি BAETA সফলভাবে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি শুধু কার্বন ক্যাপচারের খরচই কমাবে না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতেও একটি বিপ্লব নিয়ে আসবে। এটি দেখিয়ে দেয়, সঠিক গবেষণা এবং উদ্ভাবন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।

নিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেই হতে যাচ্ছে সিরিয়ার নির্বাচন

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ৫ অক্টোবর সিরিয়ায় নতুন পার্লামেন্ট বা গণপরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ গত বছরের শেষের দিকে বিদ্রোহীদের অভিযানের মুখে দেশ ত্যাগ করলে তার দীর্ঘকালীন শাসনের অবসান ঘটে। নতুন নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, নির্বাচন দেশের সকল নির্বাচনী জেলায় অনুষ্ঠিত হবে। পার্লামেন্টে মোট ২১০ আসন থাকছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ আসন সরাসরি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা নিয়োগ দেবেন। বাকি আসনগুলো নির্বাচিত হবে স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে, যা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।

নতুন পার্লামেন্টের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নতুন আইন প্রণয়ন, বিদেশি চুক্তি অনুমোদন এবং দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির সংস্কার। সানা আরও জানিয়েছে, পার্লামেন্ট একটি ‘বিস্তৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি’ গড়ে তুলবে।

তবে সমালোচকরা মনে করছেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা সিরিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারছে না। মূলত নিরাপত্তাজনিত কারণে সেপ্টেম্বর মাসে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে সুয়াইদা, হাসাকা ও রাক্কা প্রদেশে ভোট স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সুয়াইদায় জুলাই মাসে দ্রুজ যোদ্ধা এবং সুন্নি বেদুইন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। অন্যদিকে হাসাকা ও রাক্কা এখনো আংশিকভাবে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে প্রেসিডেন্ট আল-শারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ঘোষণা জারি করেন। এতে ইসলামি আইনকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়া হয়েছে এবং নারীর অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই কাঠামো সরকারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে।

আহমেদ আল-শারা এক সময় আল-কায়েদার কমান্ডার ছিলেন এবং হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে আল-আসাদ পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় এক মিডিয়াকে তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা অবশ্যক, তবে কোনো চুক্তিই সিরিয়ার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা না করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

‘বেনিতো মুসোলিনি’ কীভাবে ইতালিকে ফ্যাসিবাদের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন?

মাও সেতুংয়ের ‘লং মার্চ’ কিংবা হিটলারের ‘ব্লিটজক্রিগ’–এর মতো বেনিতো মুসোলিনির ‘মার্চ অন রোম’ বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯২২ সালের অক্টোবরে ইতালির রাজনৈতিক পটভূমিতে মুসোলিনির ক্ষমতা দখল কেবল ইতালির নয়, পুরো ইউরোপের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল।

ইতালিতে ফ্যাসিবাদ জাতীয়তাবাদ, জনতুষ্টিবাদ এবং সহিংসতার এক ভয়ংকর মিশেল মুসোলিনির হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল।

ফ্যাসিবাদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক মতবাদ নয়, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া এক চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং তার ফলে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক ঢেউ ইউরোপে এক নতুন ভয়ের জন্ম দেয়। ইতালিতে এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে মুসোলিনি ফ্যাসিবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলেন। ফ্যাসিবাদ শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন রোমান শব্দ ‘fasces’ থেকে, যা ছিল একগুচ্ছ লাঠির মাঝখানে কুঠার যুক্ত একটি প্রতীক। এটি রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক ছিল এবং এর মাধ্যমে মুসোলিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তার দল ইতালির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে।

মুসোলিনি নিজে একজন সমাজতন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি ১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ইতালির যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। এর ফলে তাকে ইতালির সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি ‘ফ্যাসিস অফ রেভল্যুশনারি অ্যাকশন’ নামে নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলটি মূলত ইতালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করতে চেয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইতালিতে চরম হতাশা বিরাজ করছিল। মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেও ইতালি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমি লাভ করেনি। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে ইতালিকে খুব সামান্যই ভূখণ্ড দেওয়া হয়, এটা ইতালীয়দের কাছে ছিল এক ধরনের অপমান। এটিকে তারা ‘ম্যুটিলেটেড ভিকটরি’ বা ‘বিকৃত বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই ক্ষোভ ইতালির জনগণের মধ্যে এক গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করে দেয়।

এই সময়ে মুসোলিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ইতালীয় ফ্যাসিস অফ কম্ব্যাট’। এই দলটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত সৈন্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল ইতালির হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনা। ১৯১৯ সালের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেও মুসোলিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান করছে, তাদের সমর্থন তার প্রয়োজন। তাই তিনি শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং ভূস্বামীদের কাছে যান, যারা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ধর্মঘট ও বিশৃঙ্খলায় ভীত ছিল। এই নতুন মিত্ররা মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলকে আর্থিক সহায়তা দিতে শুরু করে।

মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের এক বড় শক্তি ছিল তাদের আধাসামরিক বাহিনী, যারা ‘ব্ল্যাকশার্টস’ বা ‘কালো শার্ট’ নামে পরিচিত ছিল। এই দলটি মুসোলিনির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষত সমাজতন্ত্রীদের ওপর সহিংস আক্রমণ চালাত। তারা শহরগুলোতে মিছিল করত, শ্রমিক নেতাদের মারধর করত, এমনকি হত্যাও করত।

ইতালির সরকার এই সহিংসতা বন্ধ করতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, কারণ তারা নিজেরাও সমাজতন্ত্রীদের প্রতিপক্ষ ছিল। এই পরিস্থিতি মুসোলিনির এক শক্তিশালী ও কর্তৃত্ববাদী নেতা হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করে। জনগণ তাকে ইল দুচে অর্থাৎ ‘নেতা’ হিসেবে ডাকতে শুরু করে। মুসোলিনির বাগ্মিতা এবং ব্যক্তিগত আকর্ষণ ইতালির জনগণকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে।

১৯২১ সালে মুসোলিনি ইতালির পার্লামেন্টে একটি আসন লাভ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জিওভান্নি জিওলিত্তি মুসোলিনিকে তার জোট সরকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। জিওলিত্তির ধারণা ছিল, মুসোলিনি সরকারে যোগ দিলে ব্ল্যাকশার্টদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু জিওলিত্তির এই ধারণা ভুল ছিল। মুসোলিনি তার ব্ল্যাকশার্টদের ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনা করেন। ১৯২১ সালের শেষের দিকে তিনি তার ফ্যাসিস্ট গ্রুপকে ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’-তে রূপান্তরিত করেন, যার সদস্য সংখ্যা ততদিনে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছিল।

১৯২২ সালের গ্রীষ্মে ইতালিতে সমাজতন্ত্রীদের একটি সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিস্টদের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। মুসোলিনি এই ধর্মঘটকে সরকারের দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন এবং এর মধ্য দিয়ে নতুন করে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী মানুষের সমর্থন লাভ করেন।

সবকিছু ঠিকঠাক মনে করে মুসোলিনি ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত হন। তিনি তার চারজন নেতাকে নির্দেশ দেন ব্ল্যাকশার্টদেরকে ইতালির রাজধানী রোমের দিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। ২৫শে অক্টোবর ১৯২২ সালে মুসোলিনি তার বিখ্যাত ভাষণটি দেন, যেখানে তিনি বলেন, “আমরা ইতালিকে শাসন করতে চাই।” চারদিন পর ২৮শে অক্টোবর, ব্ল্যাকশার্টরা রোম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।

ব্ল্যাকশার্টদের সামরিক শক্তি ইতালির নিয়মিত সেনাবাহিনীর তুলনায় ছিল নগণ্য হলেও মুসোলিনি সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল সরকারকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করা।

মুসোলিনি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী রোমের বাইরে তার বাহিনী জড়ো করেন এবং আলটিমেটাম দেন যদি প্রধানমন্ত্রী তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেন এবং রাজা তৃতীয় ভিক্টর এমানুয়েল তার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি না দেন, তাহলে তার বাহিনী রোমে প্রবেশ করবে।

সরকারের দুর্বলতা এবং রাজার সম্মতির ফলে মুসোলিনির এই ভয় দেখানো কৌশল সফল হয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং রাজা মুসোলিনিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। মুসোলিনির এই পদক্ষেপ কোনো সামরিক বিজয় ছিল না, ছিল একটি রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল যা ইতালির গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছিল।

মুসোলিনির ক্ষমতার উত্থান ছিল এক জটিল প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক হতাশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মুসোলিনির ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। তার এই উত্থান কেবল ইতালির নয়, হিটলারের নাৎসি জার্মানি এবং অন্যান্য চরমপন্থী শাসনের জন্যও এক মডেল তৈরি করে, যার ফল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারতম এক অধ্যায়।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা আনতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ৮টি সুপারিশ

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি একটি বিশেষ প্রতিবেদনে আটটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে।ফিসক্যাল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট বা আর্থিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদনে এই পরামর্শগুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মূলত আগের সরকারের বাজেট কাঠামোই অনুসরণ করছে। বাজেটের মূল কাঠামোতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে সরকারের কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে ধরা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী, সরকারের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বাড়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমত, বছরের শেষ হিসাব প্রতিবেদন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট নথি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রস্তুত করা উচিত, যাতে বাজেটের তথ্য সহজে যাচাইযোগ্য ও স্বচ্ছ হয়। তৃতীয়ত, নির্বাহী কার্যালয়ের ব্যয় আলাদাভাবে দেখানো উচিত। চতুর্থত, বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করতে হবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের বাজেটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ষষ্ঠত, নিরীক্ষা প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রস্তাবনা ও বিস্তারিত তথ্য সাধারণ জনগণের জন্য উপলব্ধ থাকে। সপ্তমত, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ সংক্রান্ত চুক্তির মূল তথ্য প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। শেষপর্যায়ে, সরকারি ক্রয়ের তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।

প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, আগের সরকার নির্বাহী বাজেট প্রস্তাব এবং প্রণীত বাজেট অনলাইনে সাধারণ জনগণের জন্য প্রকাশ করলেও বছরের শেষ হিসাব প্রতিবেদন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বাজেটের তথ্য সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য থাকলে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বচ্ছ ও পর্যাপ্ত ছিল না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের ঋণ বা দেনার পরিমাণ বাজেটে প্রকাশ করা হতো। তবে একাধিক ক্ষেত্রে তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল। বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগের ব্যয় আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক বরাদ্দ ও আয় প্রকাশিত হলেও রাজস্ব ও ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়া যায়নি।

এছাড়া সরকারি নিরীক্ষক সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পুরো হিসাব যাচাই করতে পারেনি। কিছু সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারেনি। প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের চুক্তি ও লাইসেন্স প্রদানে আইনগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হলেও সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সীমিত তথ্য প্রদান করা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও উন্মুক্তভাবে পরিচালনা করেছে এবং আগের সরকারের চলমান ও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি স্থগিত করেছে।

প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে আরও স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করার জন্য সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বছরের শেষ হিসাব প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ, বাজেট ও নিরীক্ষা নথি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রস্তুতকরণ, নির্বাহী ব্যয়ের আলাদা তথ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা বৃদ্ধিই এই পরামর্শগুলোর মূলমন্ত্র।

নতুন স্মার্ট গ্লাস উন্মোচন করল মেটা এক সানগ্লাসেই থাকবে গান, অ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম

ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে মেটার বার্ষিক ডেভেলপার সম্মেলনে কোম্পানিটি বুধবার তিন ধরনের নতুন স্মার্ট গ্লাস উন্মোচন করেছে। প্রযুক্তি মহলে এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নতুন গ্লাসগুলোতে রয়েছে ছোট্ট লেন্সের ভিতরে স্ক্রিন, যা ব্যবহারকারীরা অ্যাপ চালাতে, ইনস্টাগ্রামে মিডিয়া শেয়ার করতে এবং স্পিকার থেকে গান শুনতে ব্যবহার করতে পারবেন।

মেটা এই গ্লাসগুলো পরিচালনার জন্য একটি রিস্টব্যান্ড প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। রিস্টব্যান্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা গ্লাসের অ্যাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এছাড়াও এতে ভয়েস-ভিত্তিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট সংযুক্ত রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর কথা শুনতে ও ক্যামেরার মাধ্যমে পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা রাখে।

উল্লেখযোগ্য হলো নতুন স্মার্ট গ্লাসগুলোর মধ্যে একটি বিদ্যমান রে-ব্যান সানগ্লাসের উন্নত সংস্করণ। এই গ্লাসের নামকরণ করা হয়েছে ‘মেটা রে-ব্যান ডিসপ্লে’। এটি আগের সংস্করণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যক্ষম এবং দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন গ্লাসের দাম ধরা হয়েছে ৭৯৯ ডলার, আগের দামের প্রায় দ্বিগুণ। মেটা জানিয়েছে, এটি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারে পাওয়া যাবে।

চার বছর আগে মেটা যখন প্রথম স্মার্ট গ্লাস বাজারে এনেছিল, তখন তা অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করেছিল। লাখ লাখ মানুষ প্রথম সংস্করণটি কিনেছিল। এবার প্রতিষ্ঠানটি আরও বড় বাজি ধরছে স্মার্ট গ্লাসের ওপর।

সম্মেলনের সময় মেটার কিছু স্মার্ট গ্লাস ডেমোতে সমস্যায় পড়েছে। উদ্বোধনের সময় মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ গ্লাসকে একটি বারবিকিউ সসের রেসিপি দিতে এবং একজন সহকর্মীকে কল করতে বলেন। কিন্তু ডিভাইসটি তা করতে ব্যর্থ হয়। দর্শকরা হেসে ওঠার পর জাকারবার্গ ব্যাখ্যা দেন, “তারা আমাদের লাইভ ডেমো দিতে মানা করেছিল।”

জাকারবার্গ বলেন, “এই গ্লাসগুলো আপনার দেখা ও শোনা অনুযায়ী কাজ করবে। আপনি যা দেখবেন, তা গ্লাসও দেখতে পাবে এবং যা শুনবেন, তা গ্লাসও শুনতে পারবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন গ্লাসগুলো ভারী ভিআর হেডসেটের পরিবর্তে দেখতে একেবারে সাধারণ সানগ্লাসের মতো। এতে সংযুক্ত ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এবং স্পিকার এতটা সূক্ষ্মভাবে বসানো হয়েছে যে বাইরে থেকে বোঝাই যায় না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর ফলে নতুন স্মার্ট গ্লাসগুলো ভিআর হেডসেটের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ভিজিবল আলফার গবেষণা প্রধান মেলিসা অটো বলেন, “মেটাভার্স মূলত গেমারদের জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভাবুন তো কত মানুষ প্রতিদিন সানগ্লাস ব্যবহার করে। এই গ্লাসের মাধ্যমে মেটা ভ্যালু অনেকাংশে বাড়াতে পারে।”

নতুন স্মার্ট গ্লাসগুলো প্রযুক্তি ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা দুটোই বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যবহারকারীরা সহজভাবে সোশ্যাল মিডিয়া, মিউজিক এবং এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের সুবিধা একত্রে উপভোগ করতে পারবেন। মেটার এই উদ্যোগ প্রযুক্তি প্রেমীদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার সূচনা করছে এবং স্মার্ট গ্লাসের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করবে।