মাও সেতুংয়ের ‘লং মার্চ’ কিংবা হিটলারের ‘ব্লিটজক্রিগ’–এর মতো বেনিতো মুসোলিনির ‘মার্চ অন রোম’ বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯২২ সালের অক্টোবরে ইতালির রাজনৈতিক পটভূমিতে মুসোলিনির ক্ষমতা দখল কেবল ইতালির নয়, পুরো ইউরোপের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল।
ইতালিতে ফ্যাসিবাদ জাতীয়তাবাদ, জনতুষ্টিবাদ এবং সহিংসতার এক ভয়ংকর মিশেল মুসোলিনির হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল।
ফ্যাসিবাদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক মতবাদ নয়, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া এক চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং তার ফলে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক ঢেউ ইউরোপে এক নতুন ভয়ের জন্ম দেয়। ইতালিতে এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে মুসোলিনি ফ্যাসিবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলেন। ফ্যাসিবাদ শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন রোমান শব্দ ‘fasces’ থেকে, যা ছিল একগুচ্ছ লাঠির মাঝখানে কুঠার যুক্ত একটি প্রতীক। এটি রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক ছিল এবং এর মাধ্যমে মুসোলিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তার দল ইতালির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে।
মুসোলিনি নিজে একজন সমাজতন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি ১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ইতালির যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। এর ফলে তাকে ইতালির সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি ‘ফ্যাসিস অফ রেভল্যুশনারি অ্যাকশন’ নামে নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলটি মূলত ইতালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করতে চেয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইতালিতে চরম হতাশা বিরাজ করছিল। মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেও ইতালি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমি লাভ করেনি। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে ইতালিকে খুব সামান্যই ভূখণ্ড দেওয়া হয়, এটা ইতালীয়দের কাছে ছিল এক ধরনের অপমান। এটিকে তারা ‘ম্যুটিলেটেড ভিকটরি’ বা ‘বিকৃত বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই ক্ষোভ ইতালির জনগণের মধ্যে এক গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করে দেয়।
এই সময়ে মুসোলিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ইতালীয় ফ্যাসিস অফ কম্ব্যাট’। এই দলটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত সৈন্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল ইতালির হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনা। ১৯১৯ সালের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেও মুসোলিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান করছে, তাদের সমর্থন তার প্রয়োজন। তাই তিনি শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং ভূস্বামীদের কাছে যান, যারা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ধর্মঘট ও বিশৃঙ্খলায় ভীত ছিল। এই নতুন মিত্ররা মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলকে আর্থিক সহায়তা দিতে শুরু করে।
মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের এক বড় শক্তি ছিল তাদের আধাসামরিক বাহিনী, যারা ‘ব্ল্যাকশার্টস’ বা ‘কালো শার্ট’ নামে পরিচিত ছিল। এই দলটি মুসোলিনির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষত সমাজতন্ত্রীদের ওপর সহিংস আক্রমণ চালাত। তারা শহরগুলোতে মিছিল করত, শ্রমিক নেতাদের মারধর করত, এমনকি হত্যাও করত।
ইতালির সরকার এই সহিংসতা বন্ধ করতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, কারণ তারা নিজেরাও সমাজতন্ত্রীদের প্রতিপক্ষ ছিল। এই পরিস্থিতি মুসোলিনির এক শক্তিশালী ও কর্তৃত্ববাদী নেতা হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করে। জনগণ তাকে ইল দুচে অর্থাৎ ‘নেতা’ হিসেবে ডাকতে শুরু করে। মুসোলিনির বাগ্মিতা এবং ব্যক্তিগত আকর্ষণ ইতালির জনগণকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে।
১৯২১ সালে মুসোলিনি ইতালির পার্লামেন্টে একটি আসন লাভ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জিওভান্নি জিওলিত্তি মুসোলিনিকে তার জোট সরকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। জিওলিত্তির ধারণা ছিল, মুসোলিনি সরকারে যোগ দিলে ব্ল্যাকশার্টদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। কিন্তু জিওলিত্তির এই ধারণা ভুল ছিল। মুসোলিনি তার ব্ল্যাকশার্টদের ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনা করেন। ১৯২১ সালের শেষের দিকে তিনি তার ফ্যাসিস্ট গ্রুপকে ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’-তে রূপান্তরিত করেন, যার সদস্য সংখ্যা ততদিনে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছিল।
১৯২২ সালের গ্রীষ্মে ইতালিতে সমাজতন্ত্রীদের একটি সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়, যার লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিস্টদের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। মুসোলিনি এই ধর্মঘটকে সরকারের দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন এবং এর মধ্য দিয়ে নতুন করে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী মানুষের সমর্থন লাভ করেন।
সবকিছু ঠিকঠাক মনে করে মুসোলিনি ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত হন। তিনি তার চারজন নেতাকে নির্দেশ দেন ব্ল্যাকশার্টদেরকে ইতালির রাজধানী রোমের দিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। ২৫শে অক্টোবর ১৯২২ সালে মুসোলিনি তার বিখ্যাত ভাষণটি দেন, যেখানে তিনি বলেন, “আমরা ইতালিকে শাসন করতে চাই।” চারদিন পর ২৮শে অক্টোবর, ব্ল্যাকশার্টরা রোম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।
ব্ল্যাকশার্টদের সামরিক শক্তি ইতালির নিয়মিত সেনাবাহিনীর তুলনায় ছিল নগণ্য হলেও মুসোলিনি সামরিক সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল সরকারকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করা।
মুসোলিনি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী রোমের বাইরে তার বাহিনী জড়ো করেন এবং আলটিমেটাম দেন যদি প্রধানমন্ত্রী তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেন এবং রাজা তৃতীয় ভিক্টর এমানুয়েল তার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি না দেন, তাহলে তার বাহিনী রোমে প্রবেশ করবে।
সরকারের দুর্বলতা এবং রাজার সম্মতির ফলে মুসোলিনির এই ভয় দেখানো কৌশল সফল হয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং রাজা মুসোলিনিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। মুসোলিনির এই পদক্ষেপ কোনো সামরিক বিজয় ছিল না, ছিল একটি রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল যা ইতালির গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছিল।
মুসোলিনির ক্ষমতার উত্থান ছিল এক জটিল প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক হতাশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মুসোলিনির ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। তার এই উত্থান কেবল ইতালির নয়, হিটলারের নাৎসি জার্মানি এবং অন্যান্য চরমপন্থী শাসনের জন্যও এক মডেল তৈরি করে, যার ফল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারতম এক অধ্যায়।


