Home Blog Page 14

স্বৈরাচার বিদায় হলেও অদৃশ্য শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে : তারেক রহমান

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে, পালিয়ে গেছে, কিন্তু অদৃশ্য শক্তি ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।” তিনি কিশোরগঞ্জ শহরের পুরোনো স্টেডিয়ামে জেলা বিএনপির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, “আমি বিভিন্ন সময় এই কথা বলেছি। প্রায় এক বছর আগে, এই একই মাঠে বহু নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সেদিন আমি যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তা আজ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।” তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কিছু অদৃশ্য রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ১৬ বছর ধরে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছে। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে নিজের রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে এবং সরকার সংস্কার প্রস্তাবনা দিয়েছে। এই প্রস্তাবনার ৯০ শতাংশ আড়াই বছর আগে দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে মতামত প্রদান করেছে। যদিও কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকারে কারও কোনো দ্বিমত নেই।”

তারেক রহমান আরও উল্লেখ করেন, “যারা শিশু এবং আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তাদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। নারীদের স্বাবলম্বী করা হবে এবং কিশোর যুবক যাদের এই মুহূর্তে কর্মসংস্থানে নেই, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
কৃষকদের সঠিক সময়ে বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করা হবে। জনগণের চিকিৎসা পাওয়া জন্মগত অধিকার। গ্রাম থেকে শহর—প্রতিটি মানুষ যাতে চিকিৎসা সুবিধা পায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। আগামী বছরের প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের রায় ও মতামতে জনগণের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা অপরিহার্য। এর বিকল্প নেই।”

তারেক বলেন, “আমাদের দলের প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা হয়েছে। আমাদের দলে যে নেতাকর্মী রয়েছে, তাদের সংখ্যা বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায়ও কম।”

তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা কি কোনো ব্যক্তির কর্মী, নাকি ধানের শীষের কর্মী? জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, তা বাস্তবায়ন করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। যেমন এই সম্মেলন ঐক্যবদ্ধভাবে সফল হয়েছে, তেমনি আগামী ফেব্রুয়ারিতে ঐক্যবদ্ধভাবে সফল জনরায় আনা সম্ভব হবে।”

তারেক রহমান শেষের দিকে সতর্কবার্তা দেন, “প্রত্যেককে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। কেউ যেন বিএনপির নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে।” সম্মেলনে জেলা বিএনপির বিভিন্ন নেতা ও শতাধিক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন।

ডারউইনের The Voyage of the Beagle, যে ভ্রমণ কাহিনি থেকে জন্ম নিলো বিবর্তনের ধারণা

ভ্রমণ সাহিত্য সাধারণত আমাদের চোখে একরাশ অভিজ্ঞতা, নতুন ভূখণ্ডের বর্ণনা আর মানুষের জীবনের গল্প। কিন্তু কখনও কখনও ভ্রমণ কেবল সাহিত্য নয়, হয়ে ওঠে মানব সভ্যতা ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিপ্লবী অধ্যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকাহিনী চার্লস ডারউইনের The Voyage of the Beagle সেই বিরল উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে ভ্রমণ, প্রকৃতিচিন্তা ও বৈজ্ঞানিক কৌতূহল একসাথে মিশে গড়ে তুলেছে আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি।

এই গ্রন্থটি কেবল দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চকর বিবরণ নয়, বিজ্ঞান, দর্শন এবং সাহিত্যের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ।

১৮৩১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর HMS Beagle নামক জাহাজে করে ২২ বছর বয়সী যুবক চার্লস ডারউইন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল, বিশেষ করে প্যাটাগোনিয়া এবং টিয়েরা দেল ফুয়েগোর ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা।

ক্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয় তাকে জাহাজের একজন প্রকৃতিবিদ হিসেবে নিয়োগ দেন, যার কাজ ছিল ভ্রমণের সময় সংগৃহীত নমুনাগুলো নথিভুক্ত করা। ১৮৩৬ সালে শেষ হওয়া এই পাঁচ বছরের দীর্ঘ যাত্রা ডারউইনের জীবন ও বিজ্ঞানকে চিরতরে বদলে দেয়। এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ডারউইন তার ডায়েরি ও নোটবুকগুলো একত্রিত করে প্রকাশ করেন “Journal and Remarks,” যা পরবর্তীতে “The Voyage of the Beagle” নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।

এই গ্রন্থটি কেবল একটি ডায়েরি নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানমূলক দলিল। ডারউইন তার লেখায় প্রতিটি স্থান, সেখানকার ভূতাত্ত্বিক গঠন, উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন এবং আদিবাসীদের সংস্কৃতির বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি শুধুমাত্র বর্ণনা দিয়ে থেমে থাকেননি, বরং তার পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক কারণগুলো নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ফিঞ্চ পাখির ঠোঁটের গঠনে যে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করেন, তা তার বিবর্তনবাদের ধারণার ভিত্তি স্থাপন করে। তিনি দেখান কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য একই প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।

“The Voyage of the Beagle” গ্রন্থের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা ও উপস্থাপনা। ডারউইন তার কঠিন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে সহজ ও কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তিনি যখন Patagonia-এর রুক্ষ ভূমির বর্ণনা দেন, তখন তার লেখায় Adventure ও রহস্যের এক দারুণ মিশ্রণ দেখা যায়। আবার যখন তিনি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা-র রেইনফরেস্টের বর্ণনা দেন, তখন তার লেখায় প্রকৃতির প্রতি অপার মুগ্ধতা প্রকাশ পায়। ডারউইনের এই দ্বৈতসত্তা তার লেখাকে এমন এক গভীরতা দিয়েছে, যা সমসাময়িক অন্য ভ্রমণ সাহিত্যে বিরল।

তিনি বিজ্ঞানকে শুষ্ক ও প্রযুক্তিগত না রেখে তাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, Tierra del Fuego-এর স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ শুধু নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন নয়, তাদের প্রতি তার সহানুভূতি ও মানবিক বোধের প্রকাশ। তিনি তাদের সরল জীবনযাপন এবং প্রকৃতির সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরেছেন। এই ধরণের মানবিক বিশ্লেষণ ডারউইনের লেখাকে কেবলমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন থেকে উন্নত করে এটিকে একটি সাহিত্যিক মাস্টারপিসে রূপান্তরিত করে।

ডারউইনের লেখার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রকৃতি। তিনি প্রকৃতিকে কেবল একজন বহিরাগত হিসেবে দেখেননি, বরং একজন গভীর প্রেমিক ও অনুসন্ধানকারী হিসেবে দেখেছেন। তার চোখে প্রকৃতি জীবন্ত সত্তা, যেখানে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক নীরব খেলা চলছে। তিনি তার লেখায় প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে সম্পর্ক, তাদের অভিযোজন এবং টিকে থাকার সংগ্রামকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রকৃতির আপাত বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে এবং সবকিছুই একে অপরের সাথে সংযুক্ত।

ডারউইনের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে আধুনিক প্রকৃতিচিন্তা ও পরিবেশবাদের জন্ম দেয়। তার লেখায় আমরা প্রথম দেখতে পাই, মানুষ প্রকৃতির একটি অংশ, তার চেয়ে বড় কিছু নয়। তিনি Galapagos-এর বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী, যেমন Giant Tortoise-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে তাদের অস্তিত্বের ভঙ্গুরতা তুলে ধরেন, যা এক অর্থে আধুনিক সংরক্ষণ-এর প্রথম পদক্ষেপ।

“The Voyage of the Beagle” ভ্রমণ সাহিত্যকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর আগে ভ্রমণ কাহিনীগুলো সাধারণত সাহসী ভ্রমণকাহিনী এবং ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হতো। কিন্তু ডারউইন এতে যোগ করেছেন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। তিনি দেখিয়েছেন, ভ্রমণের উদ্দেশ্য কেবল নতুন স্থান দেখা নয়, সে স্থানকে বোঝা এবং তার অন্তর্নিহিত রহস্য উদঘাটন করা। ডারউইনের এই বইটি পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ভ্রমণ লেখক ও প্রকৃতিবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বিশেষ করে, হেনরি ডেভিড থরো এবং জন মুইর -এর মতো বিখ্যাত লেখকদের কাজে ডারউইনের প্রভাব সুস্পষ্ট। ডারউইনের মতোই তারাও প্রকৃতির গভীরে গিয়ে তার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন এবং তাদের লেখায় বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এই অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। ডারউইনের বইটি ভ্রমণ সাহিত্যকে কেবল অবসরের আনন্দ থেকে বদলে করে এটিকে বৌদ্ধিক কৌতূহল
এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান-এর একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

চার্লস ডারউইনের “The Voyage of the Beagle” কেবল একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, এটি হলো মানবচিন্তার এক নতুন দিগন্ত। এটি প্রমাণ করে, বিজ্ঞান ও সাহিত্য একে অপরের পরিপূরক হতে পারে এবং গভীর পর্যবেক্ষণ ও মানবিক সংবেদনশীলতা এক হয়ে একটি অসাধারণ সাহিত্যকর্মের জন্ম দিতে পারে।

ইতিহাসের ভয়াবহ খরার মুখে ইরান

ইরান বর্তমানে এক ভয়াবহ পানি সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বহুমুখী পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট শুধু তেহরানের মতো বড় শহরগুলোতেই নয়, বরং দেশটির কৃষি ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

ইরানের জলসংকটের মূল কারণগুলো হলো ইরান পৃথিবীর “শুষ্ক বলয়”-এর অন্তর্ভুক্ত। গত পাঁচ বছর ধরে দেশটি লাগাতার খরার শিকার। দেশটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রধান শিনা আনসারি জানান, গত তিন দশকে ইরানের তাপমাত্রা ১.৮° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত পাঁচ বছরে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩০% কমে গেছে। তেহরানে গত বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫৮ মিমি, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে ৪২% কম।

কৃষিক্ষেত্রে জলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দেশটির প্রায় ৮৮% জল কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ১০-১২%। এছাড়াও হাজার হাজার অননুমোদিত কূপ থেকে জল উত্তোলন করা হয়। শুধুমাত্র আলবোর্জ পর্বতমালার উত্তরেই ৮,০০০-এর বেশি অননুমোদিত কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে।

অতীতে ভুল পরিকল্পনায় জল-নির্ভর শিল্পকারখানাগুলো শুষ্ক এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে এবং অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। শিনা আনসারি স্বীকার করেন, ১৯৯৪ সালের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই অনেক বাঁধ নির্মিত হয়েছে, যা দেশের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ইরানের জল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা খুবই খণ্ডিত। জল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, যেমন—শক্তি মন্ত্রণালয়, কৃষি জিহাদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভক্ত, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।

এই জলসংকটের ফলে ইরানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ লেক উরমিয়া প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। একসময় এটি পর্যটন কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এখন এর গভীরতা মাত্র আধা মিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ এবং কৃষি কাজে মাত্রাতিরিক্ত জল ব্যবহারের কারণে হ্রদটি ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই হ্রদ শুকিয়ে গেলে লবণাক্ত ধূলিঝড়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক জলবায়ু শুষ্ক হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেবে।

মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে ইরানের ইসফাহানের মতো প্রাচীন শহরগুলোতে ভূমি অবনমন ঘটছে। ইসফাহানের গভর্নর মেহেদি জামালিনেজাদ এই ভূমি অবনমনকে “একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনা, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল এবং এমনকি স্কুলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ইসফাহানের কেন্দ্রে ৭ থেকে ১৫ মিটার গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে।

পানির অভাবে দেশের কৃষি উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। দক্ষিণ ইরানের আবান্দান অঞ্চলে জল লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় পাম গাছের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ইরানের সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তবে সেগুলো ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তেহরানের নাগরিকদের জল ব্যবহার ২৫% কমানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। শিনা আনসারি স্বীকার করেন যে কৃষিক্ষেত্রে মৌলিক নীতি পরিবর্তন করা আবশ্যক। চাল এবং তরমুজের মতো পানি-নির্ভর শস্যের পরিবর্তে কম জল ব্যবহারকারী ফসলের চাষকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে।

কৃষকদের জন্য কৃষি ছাড়া অন্য আয়ের উৎস খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন তারা পানি-নির্ভর ফসলের উপর কম নির্ভরশীল হয়। সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে দেশের মোট শক্তির মাত্র ১% নবায়নযোগ্য হলেও, ২০২৮ সালের মধ্যে ১২,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তির সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিনা আনসারি জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু সংকটকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা উচিত। ইরান যদিও প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা এটি অনুমোদন করেনি। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আজ তিনি এ ঘোষণা দিতে পারেন। জুলাই মাসে তিনি ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদি ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয় এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়, তবে যুক্তরাজ্য সেপ্টেম্বর মাসে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে। এখন সেই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এই পদক্ষেপ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করছে। সরকার বলছে, শান্তি প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ প্রভাবের সময় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তবে পদক্ষেপটি ইসরায়েলি সরকার, জিম্মিদের পরিবার এবং কিছু রক্ষণশীলদের সমালোচনার মুখে পড়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ “সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত” করবে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা যুক্তি দিচ্ছেন, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা রক্ষা করার জন্য এটি নৈতিকভাবে জরুরি।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাজার পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। ইসরায়েলের সর্বশেষ স্থল-অভিযান লাখ লাখ মানুষকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা এই অভিযানকে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সময়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে বলে উপসংহারে পৌঁছেছে। তবে ইসরায়েল এটিকে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক আইন এবং পশ্চিম তীরের অব্যাহত ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন প্রকল্প ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করছে।

ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও স্যার স্টারমারের সঙ্গে দেখা করে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। দুই নেতাই একমত হয়েছেন, ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি শাসন ব্যবস্থায় হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। তবে কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি বেডেনক এবং হামাসের জিম্মিদের পরিবারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে বিতর্কিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিবারগুলো দাবি করেছেন, অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বীকৃতি ঘোষণার সিদ্ধান্ত না নেওয়া হোক।

এদিকে স্যার স্টারমার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাবনা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য জরুরি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কথা বলেছেন, যিনি স্বীকৃতির সাথে একমত নন।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। পর্তুগাল, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে ইতিমধ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ফিলিস্তিনের কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই, তাই এই স্বীকৃতি মূলত প্রতীকী।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় অভিযান শুরু করে। এতে প্রায় ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয় এবং অন্তত ৬৪ হাজার ৯৬৪ জন নিহত হয়। এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে আরও জটিল ও বিতর্কিত করে তুলেছে।

কেমন ছিলো মিশরের স্বর্ণযুগের স্থপতি দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকাল?

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে দ্বিতীয় রামেসিস (আনুমানিক ১৩০৩-১২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এক অনন্য শাসক ছিলেন। তাঁর প্রায় ৬৬ বছরের সুদীর্ঘ শাসনকালকে মিশরের ক্ষমতা ও গৌরবের চূড়ান্ত শিখর হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি শুধু একজন যোদ্ধা হিসেবেই নন, একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং দূরদর্শী নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে নির্মিত বিশাল সব স্থাপত্যকীর্তি, জনসংযোগ এবং কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে তিনি মিশরের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন।

তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর নয়জন ফারাও তাঁর নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন, যা মিশরের ইতিহাসে তাঁর মহান অবস্থানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

দ্বিতীয় রামেসিসের সামরিক শক্তি ও কৌশল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাঁর পিতামহ, প্রথম রামেসিস, একজন সাধারণ যোদ্ধা থেকে নিজেদের রাজবংশে উন্নীত করেছিলেন। তাঁর বাবা, প্রথম সেতি, উত্তর সীমান্তে শক্তিশালী হিট্টাইট সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মিশরের সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিলেন। এই শক্তিশালী সামরিক পটভূমি সত্ত্বেও, দ্বিতীয় রামেসিসকে সিংহাসনে আরোহণের পরপরই হিট্টাইটদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন হিট্টাইটরা মিশরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শহর কাদেশ দখল করে নেয়।

দ্বিতীয় রামেসিস কাদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু তিনি হিট্টাইটদের গুপ্তচরদের ফাঁদে পড়েন, যারা তাকে বিভ্রান্ত করে। গুপ্তচরদের ভুল তথ্যের কারণে তিনি মনে করেছিলেন হিট্টাইটরা শিবির থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে, অথচ তারা কাছেই ওঁৎ পেতে ছিল। এই আকস্মিক আক্রমণে মিশরীয় বাহিনী প্রায় পরাজিত হতে বসেছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত সৈন্যদল এসে পৌঁছালে তারা রক্ষা পায়। রামেসিস ওই যুদ্ধ জিতলেও কৌশলগতভাবে তিনি যুদ্ধে জয়ী হননি। বিপর্যস্ত মিশরীয় সেনারা কাদেশ থেকে পিছু হটেছিল।

তবে রামেসিস এই পরাজয়কে পরাজয় হিসেবে দেখাতে চাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু সামরিক বিজয়ে নয়, বরং জনসমক্ষে তার ভাবমূর্তির ওপরও নির্ভর করে। তাই তিনি সারা মিশরের বিভিন্ন মন্দিরের দেয়ালে এমন দেয়ালচিত্র তৈরির নির্দেশ দেন, যেখানে দেখানো হয়েছে তিনি একাই শত্রুপক্ষকে পরাজিত করছেন। এই কল্পিত বিজয়গাথা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ক্ষমতা ও বীরত্ব সম্পর্কে এক ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। এটি ছিল প্রাচীনকালে জনসংযোগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত, যেখানে সত্যের চেয়ে অনুভূত বিজয়ের গুরুত্ব ছিল বেশি।

কাদেরশের যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে মিশর ও হিট্টাইটদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কিন্তু দ্বিতীয় রামেসিস বুঝতে পেরেছিলেন সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধান অধিক ফলপ্রসূ। বহু বছরের আলোচনার পর তিনি হিট্টাইট রাজা হাত্তুসিলির সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।

এটি ছিল মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত শান্তিচুক্তি, যার মূল পাঠ এখনো টিকে আছে। এই চুক্তির একটি অনুলিপি হিয়েরোগ্লিফিক লিপিতে কার্নাকের মন্দিরের একটি ফলকে খোদাই করা হয়েছিল। আরেকটি অনুলিপি আক্কাদিয়ান ভাষায় লেখা একটি মাটির ফলকে ১৯০৬ সালে আধুনিক তুরস্কের বোঘাজকোয়-এর কাছে আবিষ্কৃত হয়।

এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। উভয় পক্ষই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দিতে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করতে সম্মত হয়। পাশাপাশি বিদেশি বা অভ্যন্তরীণ কোনো শত্রুর আক্রমণের মুখে উভয় পক্ষ একে অপরকে সাহায্য করার ব্যাপারেও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এই চুক্তির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এর একটি অনুলিপি আজও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিতীয় রামেসিস শুধু নিজের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি, কূটনৈতিক প্রজ্ঞার এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। চুক্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নিদর্শন হিসেবে তিনি হিট্টাইট রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যাকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ ছিল রাজনৈতিক মৈত্রীর এক অন্যতম উদাহরণ, যা দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপন করে।

দ্বিতীয় রামেসিসের শাসনকালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ প্রকল্প। কোনো ফারাও এত বেশি সংখ্যক স্থাপনা তৈরি করেননি। কার্নাক এবং আবু সিম্বেলের বিশাল মন্দিরগুলো তাঁর স্থাপত্য-প্রেম ও ক্ষমতার প্রতীক। আবু সিম্বেলের মন্দির, যা তিনি নিজের এবং প্রধান স্ত্রী নেফারতারির জন্য তৈরি করেছিলেন, তা আজও মিশরের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

তাঁর অন্ত্যেষ্টি মন্দির, রামেসিয়াম, ‘রাজাদের উপত্যকা’য় অবস্থিত ছিল, যেখানে প্রায় ১০,০০০ প্যাপিরাস স্ক্রোল সম্বলিত একটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। এটি তাঁর জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তিনি তাঁর বাবার সম্মানার্থে আবিডসে মন্দির নির্মাণের কাজও সম্পন্ন করেন।

রামেসিস নিজের সুনাম ও উত্তরাধিকার স্থায়ী করার জন্য নিরলস চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর নতুন রাজধানী পের রামেসু-এর নামকরণ নিজের নামে করেন। তিনি একশোরও বেশি সন্তানের জনক ছিলেন, যা তাঁর অঢেল সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর এই সমস্ত প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল, কারণ তাঁর মৃত্যুর পর নয়জন ফারাও তাঁর নাম গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি তাঁর স্থায়ী প্রভাব এবং মর্যাদা প্রমাণ করে।

দ্বিতীয় রামেসিসের জীবন ও শাসনকাল ছিল সামরিক দুর্বলতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জনসংযোগের এক মিশ্রণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সাম্রাজ্যকে মহান করা যায় না। বরং স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটি জাতির প্রকৃত মহত্ব প্রকাশ পায়। কাদেশের যুদ্ধে তাঁর কৌশলগত পরাজয় সত্ত্বেও, তিনি তার প্রচারণার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি প্রমাণ করে তিনি সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর এই দূরদৃষ্টির ফলস্বরূপ মিশর এক দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে হেঁটেছিল, যা দ্বিতীয় রামেসিসকে “মহান” এবং “শাসকদের শাসক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

জাতিসংঘের সতর্ক বার্তা – ক্রমেই অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বৈশ্বিক জলচক্র

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর জলচক্র ক্রমেই অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের সর্বশেষ “স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস ২০২৪” প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ছিল পরপর ছয় নম্বর বছর যখন বৈশ্বিক জলচক্রে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে এবং টানা তৃতীয় বছর যখন বিশ্বের সব হিমবাহ অঞ্চল বরফ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনে গবেষকরা লেক, নদীর প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটির আর্দ্রতা, তুষার ও বরফ গলনের তথ্য মিলিয়ে মিঠা পানির প্রাপ্যতা ও সংরক্ষণ বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সাল ছিল সাধারণভাবে উষ্ণ ও শুষ্ক বছর। এল নিনো আবহাওয়া প্রপঞ্চের কারণে তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। তবে একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বহু অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার ঘটনাও ঘটেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় হয় অনেক বেশি, নয়তো অনেক কম পানি প্রবাহিত হয়েছে। কেবল এক-তৃতীয়াংশ নদী অববাহিকায় পানির প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক মাত্রায়। ইউরোপ, মধ্য আফ্রিকা, ভারত ও চীনের কিছু অঞ্চলে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টি এবং বন্যা দেখা গেছে। বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা চরম খরার সম্মুখীন হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্দেশ করছে বৈশ্বিক জলচক্র আরও দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা অথবা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত দুটোই বাড়ছে। স্টেফান উলেনব্রুক, ডব্লিউএমও’র পানি ও ক্রায়োস্ফিয়ার বিভাগের পরিচালক, বলেন “জলবায়ু পরিবর্তন মানে সবকিছু বদলে যাচ্ছে, আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জলচক্রের গতিশীলতায়। এখন এটি অনেক বেশি অনিশ্চিত ও অস্থির।”

২০২৪ সালে ইউরোপের বহু অঞ্চলে মার্চ মাসের আগেই অস্বাভাবিকভাবে তুষার গলে যায়। আবার মধ্য এশিয়ার কিছু স্থানে তুষারপাত বেশি হওয়ায় বসন্তকালে প্লাবন দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যে দক্ষিণাঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহ দেখা গেলেও উত্তর ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে পানির প্রবাহ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে। পরের বছর ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ড শুষ্ক বসন্ত ও সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম নথিভুক্ত হয়, যার ফলে কৃষি ও পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়ে।

বরফ গলার তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী হিমবাহ থেকে ৯,০০০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে, যা প্রায় জার্মানির আয়তনের সমান এবং ২৫ মিটার পুরু বরফ স্তর হিসেবে কল্পনা করা যায়। বিশেষত ২০২৩ সালে রেকর্ড ৫৪০ গিগাটন বরফ গলেছে এবং ২০২৪ সালে ৪৫০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে।

বিশ্ব গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের ইসাবেল গার্টনার-রোয়ার বলেন, “হিমবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের সংবেদনশীল সূচক। এগুলো গলে যাওয়া মানে অনেক অঞ্চলের জন্য মিঠা পানির প্রধান উৎস হুমকিতে পড়া।”

হিমবাহ গলা ও অনিশ্চিত তুষারপাত কেবল পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য নয়, ভাটির দিকে থাকা উপত্যকা ও বিস্তৃত এলাকার মানুষের জীবন, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় বিপদ তৈরি করছে। এতে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

উলেনব্রুক জোর দিয়ে বলেন, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তি এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি । তার মতে, “দেরি করার সুযোগ নেই।”

বিএনপি’র জরিপভিত্তিক মনোনয়নে তৃণমূল নেতাদের অসন্তোষ

কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে বিএনপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে, যা দলীয় গঠনতন্ত্রের নিয়মের বাইরে বলে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জেলার নেতারা বলছেন, তারা আর এই প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না এবং তারা মনে করছেন দলের তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়তে পারে এবং নির্বাচনের আগে দল দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংসদীয় বোর্ড হিসেবে স্থায়ী কমিটি অবশ্যই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, থানা বা জেলা কমিটির গঠিত প্যানেল থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনীত করতে বাধ্য। এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯০বি (৪) ধারায় তৃণমূলের অংশগ্রহণ প্রার্থীদের মনোনয়নে বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিচালিত জরিপই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে।

জেলা পর্যায়ের নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশনায় জরিপের মাধ্যমে প্রার্থী মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএ জিন্নাহ কবির বলেন, অতীতের মতো ইউনিয়ন ও উপজেলা নেতাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে না।

মুন্সিগঞ্জ ও শরীয়তপুরের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে।

সিলেট-৩ আসনের প্রার্থী প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জরিপ হচ্ছে কিন্তু প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানানো হচ্ছে না। তিনি তারেক রহমানকে আহ্বান জানান, যেন প্রার্থী মনোনয়ন দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়।

কুষ্টিয়া-৩ আসনের প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার সতর্ক করে বলেন, অন্য কোনো দলের সদস্য ‘হাইব্রিড’ হিসেবে ঢুকে মনোনয়ন কিনে নিলে তা তৃণমূল গ্রহণ করবে না। অন্যদিকে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমিনুর রশিদ ইয়াসিন ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জরিপভিত্তিক প্রক্রিয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। সালাহউদ্দিন বলেন, প্রক্রিয়ায় একাধিক জরিপ এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় এটি নির্দিষ্ট কোনো জরিপের ওপর নির্ভর করে না। তিনি আরও জানান, নির্বাচনী আইন ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে চলা হবে এবং গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন সংশোধনের সুযোগ এখনও রয়েছে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলিম বলেন, তৃণমূল থেকে না করে কেন্দ্র থেকে প্রার্থী নির্বাচিত করা হচ্ছে এবং দলের ভেতরে গণতন্ত্র মানা হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মজিবুর রহমানও বলেন, কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সংযোগ ও সমন্বয় কমে যাবে এবং প্রায়শই জরিপের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়। তিনি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, প্রার্থী বাছাইতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিএনপির বর্তমান মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে, যা তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই প্রক্রিয়া দলীয় অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং স্থানীয় নেতৃত্বের অংশগ্রহণের অভাব ঘটাতে পারে, যা নির্বাচনের আগে দলের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের বৃহত্তম সিনেমা হল মণিহার

যশোরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মণিহার সিনেমা হল দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছিল। ১৯৮২ সালে যশোরের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের ঘোষণা দেন। পত্রিকায় নাম আহ্বান করলে কয়েকশ প্রস্তাবের মধ্যে ‘মণিহার’ নামটি বেছে নেন। যশোর শহরের সিটি কলেজ প্রাঙ্গণে চার বিঘা জমির ওপর নির্মিত এ প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হতে সময় লাগে দেড় বছর।

মণিহারের মূল আকর্ষণ ছিল এর বিশালতা ও আধুনিক স্থাপত্য। ঢাকার স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফ নকশা করেছিলেন এবং শিল্পী এস এম সুলতান নির্মাণ-পরবর্তী সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। চারতলা ভবনের পুরো প্রেক্ষাগৃহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। সিঁড়ি, ঝরনা, ঝাড়বাতি ও বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর ছবিতে অভ্যন্তর সাজানো হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহটির আসন সংখ্যা ছিল ১,৪৩০, এই বিশালতা একসময় এটিকে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম একক পর্দার হল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মণিহার যাত্রা শুরু করে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘জনি’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর এক সময়ে মণিহারে দেড় হাজারের বেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শক টেনেছিল ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ এবং টানা তিন মাস দিনে চারটি শো হাউসফুল ছিল। এছাড়া ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘যদি একদিন’, ‘হাওয়া’ ও ‘পরাণ’ চলচ্চিত্রগুলোও মণিহারে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

প্রেক্ষাগৃহে প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টা, বেলা সাড়ে ৩টা, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা এবং রাত সাড়ে ৯টায় চারটি শো অনুষ্ঠিত হত। ১৯৮৩ সালে টিকিটের দাম ছিল নিচতলায় ৫ ও ১০ টাকা এবং দ্বিতীয় তলায় ১৫ টাকা। বর্তমানে টিকিটের দাম যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ টাকা। প্রাথমিকভাবে ২০১২ সাল পর্যন্ত সেলুলয়েড ফিল্ম রিলের মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখানো হতো। এরপর ‘ডিজিটাল সিনে সার্ভিস’–এর মাধ্যমে উন্নতমানের লেজার প্রজেক্টরে ডিজিটাল সিনেমা প্রদর্শিত হয়, যা সিনেপ্লেক্স বাদে দেশের অন্য কোনো হলে পাওয়া যায় না।

বর্তমান সময়ে মণিহারের অবস্থা চিত্রায়ন করে জিয়াউল ইসলাম মিঠু, যিনি প্রেক্ষাগৃহের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল ইসলামের ছেলে এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বলেন, “শুধু ব্যবসার জন্য নয়, বাবার শৈল্পিক মন থেকে মণিহার নির্মিত হয়েছিল। একসময় এটি যশোরের মানুষের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। তবে এখন দর্শক কমে গেছে, সিনেমার মানও নষ্ট হয়েছে। তাই ব্যবসার পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল ও মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে।”

মিঠু জানান, ২০১২ সালের ২২ জুলাই সন্ত্রাসী হামলা ও চাঁদাবাজির কারণে হল প্রথমবার বন্ধ হয়েছিল। ২০ দিন পর প্রশাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পুনরায় চালু হয়, কিন্তু আর্থিক সংকট কখনোই কমেনি। এখন ভালো মানের ছবি না থাকায় দর্শকহীন হয়ে পড়েছে। কলকাতার ‘অভিমান’ চারবার প্রদর্শিত হলেও দর্শক কম। এছাড়া সিনেমা হলের পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎ, কর্মচারী বেতন এবং অন্যান্য খরচ বহন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই ভবিষ্যতে প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে সেখানে মার্কেট, আবাসিক হোটেল এবং অনুমোদন সাপেক্ষে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রবীণ পরিচালক শফিউদ্দীন মিন্টু ১৯৮৩ থেকে এই হলে কাজ করছেন। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, “প্রথম দিকে নতুন ছবি এলে ফিল্ম গুছিয়ে রিলে চাকা বানাতে হতো। প্রদর্শনের সময় মেশিনের পাশে একজন থাকত। তাতেই আনন্দ পেতাম। এখন কম্পিউটারে সব চালু করে বাইরে চলে যাই। ছবি ভালো না হলে দর্শক আসে না। কিন্তু শাবনূর, রাজ্জাক, শাবানা, মান্না, শাকিব খানসহ অনেক তারকার পদচিহ্ন এই প্রেক্ষাগৃহে আছে।”

অন্য প্রায়ই প্রবীণ কর্মচারী মোল্লা ফারুখ জানান, “মণিহারের ১,৪৩০ সিট একসময় সব ভরে যেত। টিকিট না পেয়ে অনেকে ফিরে যেত। এখন শোতে ২০–২৫ জন এবং নাইট শোতে ৫–১০ জন দর্শক থাকে। সামাজিক সিনেমা না থাকায় পরিবারসহ দর্শক আসেন না।”

যশোরের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কাহিনি-নির্ভর সামাজিক ছবি নির্মাণ না হওয়ায় দর্শক হতাশ হয়ে হল থেকে দূরে সরে গেছেন। সিনেমা হলের পরিবেশও নষ্ট হয়েছে। সুস্থধারার বিনোদন ফিরিয়ে আনতে হলে শিল্পী, প্রযোজক এবং প্রশাসন সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।”

মণিহারের ইতিহাস শুধুমাত্র চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থান নয়, এটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। ৪২ বছরের ইতিহাসে এই প্রেক্ষাগৃহ বহু প্রজন্মের মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রশিল্পের ভঙ্গুর অবস্থা, মানহীন ছবি এবং আর্থিক চাপে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধের পথে চলে এসেছে।

মণিহারের বন্ধ হওয়া কেবল একটি হলের অবসান নয় এটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান চিত্রের আকারে প্রতিফলিত। একসময় দর্শকপ্রিয় ও শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসিত মণিহার আজ দর্শকহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং শিল্পীদের মানসম্পন্ন ছবি তৈরি করা না হলে দেশের সিনেমা হলগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

যশোরের মণিহার সিনেমা হল একটি সময়ে যেমন দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের গর্বের প্রতীক ছিল, তেমনি এটি আজ দেশের প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতির অবনতি ও চ্যালেঞ্জের সাক্ষী। ভবিষ্যতে এর পুনর্জীবন বা স্থায়ী বন্ধ নির্ভর করবে শিল্প ও প্রশাসনের সহযোগিতা এবং দর্শকপ্রিয় মানসম্মত চলচ্চিত্রের উপর।

ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণে দেখা দিচ্ছে পানি ও বিদ্যুৎ সংকট

AI এবং ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অনুমোদিত ডেটা সেন্টারগুলো বছরে প্রায় ৯.৬ গিগালিটার পানি ব্যবহার করতে পারে, যা সিডনি শহরের মোট পানির সরবরাহের প্রায় ২%।

ডেটা সেন্টারগুলো শুধুমাত্র পানি ব্যবহার করছে না, বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপরও বিশাল চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলো ২০২৪ সালে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১.৫% ব্যবহার করেছে, যা প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (TWh)। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ TWh পৌঁছাতে পারে।

সিডনিতে ২০২১ সাল থেকে সরকার মোট ১০টি বড় ডেটা সেন্টারের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, যার মোট বিনিয়োগ প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। তবে এই প্রকল্পগুলোতে পানি সংরক্ষণের কার্যকর পরিকল্পনার অভাব দেখা গেছে। কিছু কোম্পানি, যেমন AirTrunk ও Amazon,বৃষ্টির পানি বা পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই উদ্যোগও সামগ্রিক ব্যবহারের মাত্র ০.৪% হ্রাস করতে সক্ষম।

ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যদি এই ধরনের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকে, তাহলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে, যা সাধারণ মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।”

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেটা সেন্টারের শক্তি ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোসফট উইসকনসিনে একটি নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের সময় পরিবেশবান্ধব কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করবে এবং পানি ব্যবহারের পরিমাণ কম রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হলে কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। শক্তি ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো, পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহার করা এবং পরিবেশবান্ধব কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা আবশ্যক। ডেটা সেন্টারের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে শহরের পানির চাহিদা মেটাতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সিডনির পানি সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষও সতর্ক করে বলেছে, ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে শহরের পানি ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। ভবিষ্যতে যদি পর্যাপ্ত পরিকল্পনা না করা হয়, তাহলে সাময়িক জলাভাব বা সরবরাহে ব্যাঘাত দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যা সমাধান করতে সরকার, ডেটা সেন্টার অপারেটর ও প্রযুক্তি নির্মাতাদের মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শক্তি এবং পানি ব্যবহার কমানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে সৌদি আরব–পাকিস্তান চুক্তি

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ক্রমেই ইসরায়েল থেকে হুমকি অনুভব করছে। এমন এক পরিস্থিতিতে গত বুধবার সৌদি আরব ও পাকিস্তান “কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি” সই করেছে। চুক্তিটি পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে রিয়াদের অর্থশক্তি ও ইসলামাবাদের পারমাণবিক ক্ষমতার সমন্বয় ঘটেছে। ইসলামাবাদকে বিভিন্নভাবে অর্থসহায়তা দেবে রিয়াদ এবং বিনিময়ে পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সামরিক ও পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রিয়াদের পাশে থাকবে। চুক্তির বিস্তারিত বিষয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্র এই চুক্তির আওতায় নেই। কোনো আগ্রাসনের জন্য এটি ব্যবহার করা হবে না, তবে যদি কোনো পক্ষ হুমকির মুখে পড়ে, তা স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর হবে।” তবে সৌদি আরব ইঙ্গিত দিচ্ছে চুক্তির মাধ্যমে তারা কার্যত পারমাণবিক সুরক্ষা বলয়ের নিচে চলে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ইসরায়েল সৌদি আরব-পাকিস্তানের চুক্তিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পাকিস্তানের ঘোষিত পারমাণবিক নীতি মূলত ভারতকে লক্ষ্য করে হলেও, সৌদি আরব আশা করছে এই চুক্তি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং কৌশলগত ক্ষমতা শক্তিশালী করবে।

চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশকেও অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে গণ্য হবে। এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলবে, যা দীর্ঘদিন ধরে অস্থির ও সংঘাতপ্রবণ এই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে।

সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সীমিত সেনা উপস্থিতি রয়েছে, তবে নতুন চুক্তি আরও বড় ধরনের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, “পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে, তবে এটি এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করছে যা অত্যন্ত অস্থির।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি মার্কিন নিরাপত্তা নির্ভরতার ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রতিফলনও বহন করছে। সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে, পারমাণবিক শক্তিধর ইসরায়েলের তুলনায় কৌশলগত ও প্রচলিত সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দেশটি এই চুক্তির মাধ্যমে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। এছাড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও রিয়াদের আর্থিক সহায়তা দেশটিকে ভারত-সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা ভারসাম্য আনতে সাহায্য করতে পারে।

পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে এশিয়ার মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তান ভারতের লক্ষ্য রেখে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা ভারতের গভীরে আঘাত করতে সক্ষম। ধারণা করা হয়, খাতা-কলমের হিসাব অনুযায়ী পাকিস্তানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ইসরায়েলেরও ওপর আঘাত করার পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তিটি ইসরায়েল ও ভারতের কৌশলগত আগ্রহের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

চুক্তির এক অংশ হিসেবে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই পাকিস্তানকে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। রিয়াদ বহু বছর ধরেই ইসলামাবাদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, সর্বশেষ ৩০০ কোটি ডলার ঋণ প্রদান করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমরা বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণে গভীর আগ্রহী।”

চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা করেছিলেন আব্রাহাম চুক্তির আওতায় আরও আরব দেশ ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, সৌদি আরব স্পষ্ট করেছে, গাজা যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে না।