জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর জলচক্র ক্রমেই অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের সর্বশেষ “স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস ২০২৪” প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ছিল পরপর ছয় নম্বর বছর যখন বৈশ্বিক জলচক্রে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে এবং টানা তৃতীয় বছর যখন বিশ্বের সব হিমবাহ অঞ্চল বরফ হারিয়েছে।
প্রতিবেদনে গবেষকরা লেক, নদীর প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটির আর্দ্রতা, তুষার ও বরফ গলনের তথ্য মিলিয়ে মিঠা পানির প্রাপ্যতা ও সংরক্ষণ বিশ্লেষণ করেছেন। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সাল ছিল সাধারণভাবে উষ্ণ ও শুষ্ক বছর। এল নিনো আবহাওয়া প্রপঞ্চের কারণে তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। তবে একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বহু অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার ঘটনাও ঘটেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় হয় অনেক বেশি, নয়তো অনেক কম পানি প্রবাহিত হয়েছে। কেবল এক-তৃতীয়াংশ নদী অববাহিকায় পানির প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক মাত্রায়। ইউরোপ, মধ্য আফ্রিকা, ভারত ও চীনের কিছু অঞ্চলে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টি এবং বন্যা দেখা গেছে। বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা চরম খরার সম্মুখীন হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্দেশ করছে বৈশ্বিক জলচক্র আরও দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা অথবা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত দুটোই বাড়ছে। স্টেফান উলেনব্রুক, ডব্লিউএমও’র পানি ও ক্রায়োস্ফিয়ার বিভাগের পরিচালক, বলেন “জলবায়ু পরিবর্তন মানে সবকিছু বদলে যাচ্ছে, আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জলচক্রের গতিশীলতায়। এখন এটি অনেক বেশি অনিশ্চিত ও অস্থির।”
২০২৪ সালে ইউরোপের বহু অঞ্চলে মার্চ মাসের আগেই অস্বাভাবিকভাবে তুষার গলে যায়। আবার মধ্য এশিয়ার কিছু স্থানে তুষারপাত বেশি হওয়ায় বসন্তকালে প্লাবন দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যে দক্ষিণাঞ্চলে রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহ দেখা গেলেও উত্তর ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে পানির প্রবাহ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে। পরের বছর ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ড শুষ্ক বসন্ত ও সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম নথিভুক্ত হয়, যার ফলে কৃষি ও পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
বরফ গলার তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী হিমবাহ থেকে ৯,০০০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে, যা প্রায় জার্মানির আয়তনের সমান এবং ২৫ মিটার পুরু বরফ স্তর হিসেবে কল্পনা করা যায়। বিশেষত ২০২৩ সালে রেকর্ড ৫৪০ গিগাটন বরফ গলেছে এবং ২০২৪ সালে ৪৫০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে।
বিশ্ব গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের ইসাবেল গার্টনার-রোয়ার বলেন, “হিমবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের সংবেদনশীল সূচক। এগুলো গলে যাওয়া মানে অনেক অঞ্চলের জন্য মিঠা পানির প্রধান উৎস হুমকিতে পড়া।”
হিমবাহ গলা ও অনিশ্চিত তুষারপাত কেবল পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য নয়, ভাটির দিকে থাকা উপত্যকা ও বিস্তৃত এলাকার মানুষের জীবন, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় বিপদ তৈরি করছে। এতে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
উলেনব্রুক জোর দিয়ে বলেন, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তি এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি । তার মতে, “দেরি করার সুযোগ নেই।”


