যশোরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মণিহার সিনেমা হল দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছিল। ১৯৮২ সালে যশোরের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের ঘোষণা দেন। পত্রিকায় নাম আহ্বান করলে কয়েকশ প্রস্তাবের মধ্যে ‘মণিহার’ নামটি বেছে নেন। যশোর শহরের সিটি কলেজ প্রাঙ্গণে চার বিঘা জমির ওপর নির্মিত এ প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হতে সময় লাগে দেড় বছর।
মণিহারের মূল আকর্ষণ ছিল এর বিশালতা ও আধুনিক স্থাপত্য। ঢাকার স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফ নকশা করেছিলেন এবং শিল্পী এস এম সুলতান নির্মাণ-পরবর্তী সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। চারতলা ভবনের পুরো প্রেক্ষাগৃহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। সিঁড়ি, ঝরনা, ঝাড়বাতি ও বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর ছবিতে অভ্যন্তর সাজানো হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহটির আসন সংখ্যা ছিল ১,৪৩০, এই বিশালতা একসময় এটিকে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম একক পর্দার হল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মণিহার যাত্রা শুরু করে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘জনি’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর এক সময়ে মণিহারে দেড় হাজারের বেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শক টেনেছিল ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ এবং টানা তিন মাস দিনে চারটি শো হাউসফুল ছিল। এছাড়া ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘যদি একদিন’, ‘হাওয়া’ ও ‘পরাণ’ চলচ্চিত্রগুলোও মণিহারে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
প্রেক্ষাগৃহে প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টা, বেলা সাড়ে ৩টা, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা এবং রাত সাড়ে ৯টায় চারটি শো অনুষ্ঠিত হত। ১৯৮৩ সালে টিকিটের দাম ছিল নিচতলায় ৫ ও ১০ টাকা এবং দ্বিতীয় তলায় ১৫ টাকা। বর্তমানে টিকিটের দাম যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ টাকা। প্রাথমিকভাবে ২০১২ সাল পর্যন্ত সেলুলয়েড ফিল্ম রিলের মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখানো হতো। এরপর ‘ডিজিটাল সিনে সার্ভিস’–এর মাধ্যমে উন্নতমানের লেজার প্রজেক্টরে ডিজিটাল সিনেমা প্রদর্শিত হয়, যা সিনেপ্লেক্স বাদে দেশের অন্য কোনো হলে পাওয়া যায় না।
বর্তমান সময়ে মণিহারের অবস্থা চিত্রায়ন করে জিয়াউল ইসলাম মিঠু, যিনি প্রেক্ষাগৃহের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল ইসলামের ছেলে এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বলেন, “শুধু ব্যবসার জন্য নয়, বাবার শৈল্পিক মন থেকে মণিহার নির্মিত হয়েছিল। একসময় এটি যশোরের মানুষের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। তবে এখন দর্শক কমে গেছে, সিনেমার মানও নষ্ট হয়েছে। তাই ব্যবসার পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল ও মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে।”
মিঠু জানান, ২০১২ সালের ২২ জুলাই সন্ত্রাসী হামলা ও চাঁদাবাজির কারণে হল প্রথমবার বন্ধ হয়েছিল। ২০ দিন পর প্রশাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পুনরায় চালু হয়, কিন্তু আর্থিক সংকট কখনোই কমেনি। এখন ভালো মানের ছবি না থাকায় দর্শকহীন হয়ে পড়েছে। কলকাতার ‘অভিমান’ চারবার প্রদর্শিত হলেও দর্শক কম। এছাড়া সিনেমা হলের পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎ, কর্মচারী বেতন এবং অন্যান্য খরচ বহন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই ভবিষ্যতে প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে সেখানে মার্কেট, আবাসিক হোটেল এবং অনুমোদন সাপেক্ষে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রবীণ পরিচালক শফিউদ্দীন মিন্টু ১৯৮৩ থেকে এই হলে কাজ করছেন। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, “প্রথম দিকে নতুন ছবি এলে ফিল্ম গুছিয়ে রিলে চাকা বানাতে হতো। প্রদর্শনের সময় মেশিনের পাশে একজন থাকত। তাতেই আনন্দ পেতাম। এখন কম্পিউটারে সব চালু করে বাইরে চলে যাই। ছবি ভালো না হলে দর্শক আসে না। কিন্তু শাবনূর, রাজ্জাক, শাবানা, মান্না, শাকিব খানসহ অনেক তারকার পদচিহ্ন এই প্রেক্ষাগৃহে আছে।”
অন্য প্রায়ই প্রবীণ কর্মচারী মোল্লা ফারুখ জানান, “মণিহারের ১,৪৩০ সিট একসময় সব ভরে যেত। টিকিট না পেয়ে অনেকে ফিরে যেত। এখন শোতে ২০–২৫ জন এবং নাইট শোতে ৫–১০ জন দর্শক থাকে। সামাজিক সিনেমা না থাকায় পরিবারসহ দর্শক আসেন না।”
যশোরের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কাহিনি-নির্ভর সামাজিক ছবি নির্মাণ না হওয়ায় দর্শক হতাশ হয়ে হল থেকে দূরে সরে গেছেন। সিনেমা হলের পরিবেশও নষ্ট হয়েছে। সুস্থধারার বিনোদন ফিরিয়ে আনতে হলে শিল্পী, প্রযোজক এবং প্রশাসন সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
মণিহারের ইতিহাস শুধুমাত্র চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থান নয়, এটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। ৪২ বছরের ইতিহাসে এই প্রেক্ষাগৃহ বহু প্রজন্মের মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রশিল্পের ভঙ্গুর অবস্থা, মানহীন ছবি এবং আর্থিক চাপে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধের পথে চলে এসেছে।
মণিহারের বন্ধ হওয়া কেবল একটি হলের অবসান নয় এটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান চিত্রের আকারে প্রতিফলিত। একসময় দর্শকপ্রিয় ও শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসিত মণিহার আজ দর্শকহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ এবং শিল্পীদের মানসম্পন্ন ছবি তৈরি করা না হলে দেশের সিনেমা হলগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
যশোরের মণিহার সিনেমা হল একটি সময়ে যেমন দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের গর্বের প্রতীক ছিল, তেমনি এটি আজ দেশের প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতির অবনতি ও চ্যালেঞ্জের সাক্ষী। ভবিষ্যতে এর পুনর্জীবন বা স্থায়ী বন্ধ নির্ভর করবে শিল্প ও প্রশাসনের সহযোগিতা এবং দর্শকপ্রিয় মানসম্মত চলচ্চিত্রের উপর।


