জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্লাস্টিক দূষণের মতো দুটি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য একটি নতুন এবং অপ্রত্যাশিত সমাধান নিয়ে এসেছেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। তারা প্লাস্টিকের বোতল থেকে এমন একটি নতুন উপাদান তৈরি করেছেন, যা শুধু বাতাস থেকেই নয়, পানি থেকেও কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) শোষণ করতে সক্ষম। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার একই সঙ্গে সমুদ্র এবং বাতাসকে আরও পরিচ্ছন্ন করতে পারে।
গবেষকরা PET প্লাস্টিক, যা সাধারণত প্লাস্টিকের বোতল এবং টেক্সটাইল পণ্যে ব্যবহৃত হয়, তাকে রাসায়নিকভাবে রূপান্তরিত করে BAETA নামক একটি উপাদান তৈরি করেছেন। এই উপাদানটি কার্বন ক্যাপচার করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এটিকে বিজ্ঞানীরা “কার্বন-খাদক প্লাস্টিক” হিসেবে অভিহিত করছেন, কারণ এটি বাতাস থেকে অথবা শিল্পকারখানার নির্গমন থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। এটি প্লাস্টিক দূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান সমস্যার যুগপৎ সমাধান দিতে সক্ষম।
অন্যান্য প্রচলিত কার্বন-ক্যাপচার প্রযুক্তির তুলনায় BAETA বেশ কয়েকটি দিক থেকে অনন্য। প্রথমত এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সহজে তৈরি করা যায়। দ্বিতীয়ত এটি বিভিন্ন তাপমাত্রায় সমানভাবে কার্যকর, যা এটিকে শিল্পকারখানার বিভিন্ন পরিবেশে ব্যবহারের জন্য আদর্শ করে তোলে। এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর কার্যকারিতা। এটি এমন ধরনের ক্ষয়প্রাপ্ত বা ডিগ্রেডেড প্লাস্টিক ব্যবহার করে, যা প্রচলিত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় প্রায়শই বাদ পড়ে যায়।
এর ফলে এই প্রক্রিয়াটি বর্জ্যকে একটি মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরিত করে। এই রূপান্তরের পদ্ধতিটি খুবই শক্তি-সাশ্রয়ী। এটি সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রায় সম্পন্ন হয়, যার ফলে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয় না। একবার যখন উপাদানটি কার্বন শোষণে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন এটিকে সামান্য উত্তাপের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড মুক্ত করা হয় এবং উপাদানটি আবার ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এটিকে বারবার ব্যবহার করা যায়, যা এর কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই গবেষণার প্রধান লেখক মার্গারিটা পোডেরাইটে বলেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে একটি সংকট সমাধান করতে গিয়ে অন্য কোনো সংকটকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়োজন নেই বরং এটি উভয়কেই সমাধান করতে পারে।
গবেষকরা বর্তমানে এই উপাদানের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার এবং এটিকে বৃহৎ পরিসরে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনা করছেন।
এই আবিষ্কার পরিবেশের প্রতি আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে আর পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবে না দেখে, এটিকে জলবায়ু সমস্যার সমাধানে একটি মূল্যবান হাতিয়ার হিসেবে দেখা যেতে পারে।
যদি BAETA সফলভাবে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি শুধু কার্বন ক্যাপচারের খরচই কমাবে না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতেও একটি বিপ্লব নিয়ে আসবে। এটি দেখিয়ে দেয়, সঠিক গবেষণা এবং উদ্ভাবন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।


