বাবি ইয়ার গণহত্যা – যে ট্র্যাজেডিকে চাপা দিতে চেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু তারিখ থাকে, যা কেবল সংখ্যা নয়, মানবজাতির অসীম বর্বরতা ও গভীর বেদনার প্রতীক। ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১ সাল এমনই একটি তারিখ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা ‘বাবি ইয়ার’-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইউক্রেনের কিয়েভ শহরের কাছে অবস্থিত এই গভীর উপত্যকাটি সাক্ষী হয়েছিল নাৎসি জার্মানির হাতে মাত্র দুই দিনে ৩৩,৭৭১ জন নিরীহ ইহুদি মানুষের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের। বাবি ইয়ার অর্থ ইউক্রেনীয় ভাষায় ‘বৃদ্ধার খাদ’, পরিণত হয়েছিল ইউরোপীয় ইহুদিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হলোকাস্টের এক অন্যতম প্রতীকী বধ্যভূমিতে।

বাবি ইয়ার গণহত্যার শিকড় প্রোথিত ছিল নাৎসি জার্মানির পূর্ব ইউরোপ দখলের সামরিক ও আদর্শগত পরিকল্পনার গভীরে। ১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি তার পূর্ব ইউরোপীয় মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে ‘অপারেশন বারবারোসা’ শুরু করে। এই আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির জন্য ‘লেবেনসরাউম’ দখল করা এবং বলশেভিক-ইহুদিবাদকে নির্মূল করা। নাৎসি মতাদর্শ অনুসারে, কমিউনিজম ছিল ইহুদিদের সৃষ্ট একটি মতবাদ যা জার্মান জাতিকে ধ্বংস করতে চায়।

জার্মান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে আইন্সাজগ্রুপেন—এসএস ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ভ্রাম্যমাণ ঘাতক দল। এদের মূল কাজ ছিল সামরিক দখলকৃত এলাকায় রাজনৈতিক নেতা, কমিউনিস্ট কর্মী এবং ইহুদিদের চিহ্নিত করে দ্রুত হত্যা করা। এই গণহত্যার কৌশলকে বলা হতো ‘হোল্ডনাকেনস্কিস’ বা মাথার পেছনে গুলি করে হত্যা। বাবি ইয়ার গণহত্যা এই আইন্সাজগ্রুপেনের ‘সি’ গ্রুপের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছিল।

১৯৪১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করে। কিয়েভ ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম বৃহৎ ইহুদি অধ্যুষিত শহর, যেখানে প্রায় ১৬০,০০০ ইহুদির বসবাস ছিল। শহরের অধিকাংশ ইহুদি পালাতে ব্যর্থ হয়। কিয়েভের পতনের পরপরই নাৎসিরা তাদের চূড়ান্ত ‘সমাধান’ কার্যকর করার সুযোগ পায়।

হত্যাকাণ্ড শুরুর আগে নাৎসিরা কিয়েভে একটি বিভ্রান্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করে। কিয়েভ দখলের কয়েক দিনের মধ্যেই জার্মান সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে, যার জন্য নাৎসিরা ইহুদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করে।

২৯ সেপ্টেম্বর শহরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগানো হয়। এতে কিয়েভের সমস্ত ইহুদিকে পরের দিন সকাল ৮টার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্থান ডোরাগোঝিৎস্কা ও মেলিঙ্কোভা রাস্তার সংযোগস্থলে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ অমান্যকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়। ইহুদিদের বোঝানো হয়েছিল তাদের কেবল পুনর্বাসনের জন্য স্থানান্তর করা হবে।

হাজার হাজার ইহুদি বৃদ্ধ, নারী, শিশুসহ তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র ও সীমিত খাবার নিয়ে নির্দেশিত স্থানে পৌঁছায়। তারা জানতো না যে সামান্য দূরেই বাবি ইয়ার নামের একটি গভীর উপত্যকা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের যখন ছোট ছোট দলে বাবি ইয়ারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তারা বুঝতে পারে এটি পুনর্বাসন নয় এক সুপরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদ।

আইন্সাজগ্রুপেন এবং স্থানীয় ইউক্রেনীয় সহকারীরা সেখানে একটি নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী তৈরি করে রেখেছিল। খাদে নিয়ে যাওয়ার আগে ইহুদিদের পোশাক, অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়।এরপর নগ্ন ও অসহায় মানুষদের দল বেঁধে উপত্যকার কিনারে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাৎসি সৈন্যরা উপর থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এবং মেশিনগান ব্যবহার করে তাদের নির্বিচারে গুলি করে উপত্যকার ভেতরে ফেলে দেয়। একদল মানুষকে হত্যা করার পর তাদের দেহাবশেষের ওপর নতুন দলকে দাঁড় করিয়ে একইভাবে হত্যা করা হয়। এই দুই দিনে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৩৩,৭৭১ জন মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। এটি ছিল হলোকাস্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক গণহত্যামূলক ঘটনা।

বাবি ইয়ার হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র ইহুদিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত জার্মান দখলদারিত্বের সময়ে এই উপত্যকায় রোমা যাযাবর, কমিউনিস্ট, মানসিক রোগী এবং সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীসহ ১ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

বাবি ইয়ার ছিল হলোকাস্টের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি প্রমাণ করে গ্যাস চেম্বার বা মৃত্যুশিবির তৈরি হওয়ার আগেও নাৎসিরা কেবল গুলি করে ব্যাপক হারে ইহুদিদের হত্যা করতে সক্ষম ছিল। এই ঘটনার পরই পূর্ব ইউরোপে ‘বুলেট বাই হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত গণহত্যার ধারণাটি চূড়ান্ত রূপ নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত সরকার এই গণহত্যার স্মৃতিকে মুছে ফেলার বা এর ইহুদি পরিচয়কে লঘু করার চেষ্টা করে। সোভিয়েত মতাদর্শ অনুসারে, গণহত্যার শিকারদের কেবল ‘সোভিয়েত নাগরিক’ হিসেবে স্মরণ করা হতো, ইহুদি হিসেবে নয়। তারা দীর্ঘকাল বাবি ইয়ারে কোনো ইহুদি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে দেয়নি। এই নীরবতা ছিল হত্যাকাণ্ডের শিকারদের প্রতি এক গভীর বঞ্চনা।

দীর্ঘকাল ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীরবতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন ইউক্রেনীয় কবি ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বাবি ইয়ার”-এর মাধ্যমে। তাঁর কবিতাটি দমিত স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং বিশ্বকে সোভিয়েত নীরবতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

বাবি ইয়ার গণহত্যা মানব ইতিহাসে এক মর্মান্তিক নৈতিক প্রশ্ন রেখে যায়। কীভাবে এত অল্প সময়ে, সাধারণ সামরিক পোশাক পরিহিত মানুষরা এমন অমানবিক কাজ করতে পারল? এই গণহত্যা ছিল সুসংগঠিত, আমলাতান্ত্রিক এবং কার্যকর। নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের মানুষ হিসেবে নয় কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখেছিল। হান্না আরেন্ডট যাকে ‘ব্যানালিটি অফ ইভিল’ বলেছেন, বাবি ইয়ার তারই এক ভয়াবহ প্রতিফলন।

এই গণহত্যার সময় স্থানীয় জনসাধারণের একটি অংশ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। তবে কিছু স্থানীয় মানুষ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ইহুদিদের লুকিয়ে রেখে মানবিক সংহতির পরিচয়ও দিয়েছিল।

বাবি ইয়ার আজ বিশ্বকে এই শিক্ষাই দেয় যে, যখনই কোনো সমাজে ঘৃণার রাজনীতি শুরু হয় এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে মানবতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখনই এমন ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাবি ইয়ারের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া মানে সেই বর্বরতার পুনরাবৃত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা।

বাস্তবতা হলো ১৯৪১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বাবি ইয়ারের উপত্যকায় যা ঘটেছিল, তা কেবল ইহুদিদের ট্র্যাজেডি নয় এটি ছিল মানবজাতির নৈতিক পতনের এক চূড়ান্ত প্রতীক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন