Home Blog Page 8

প্রথমবারের মতো ৫০০০ আলোকবর্ষ দূরে মিল্কিওয়েতে কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত

মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও ভয়ানক বস্তু হলো কৃষ্ণগহ্বর বা Black Hole। এদের তীব্র মহাকর্ষের টান এতটাই প্রবল যে আলোও এর থেকে পালাতে পারে না, তাই এদের সরাসরি দেখা অসম্ভব। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে কয়েক কোটি নাক্ষত্রিক ভরের কৃষ্ণগহ্বর আছে বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু এদের অধিকাংশই নিঃসঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়, কোনো নক্ষত্রের সঙ্গে জোড়বদ্ধ হয় না।

এতদিন পর্যন্ত এই একাকী নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর-এর অস্তিত্ব শুধুমাত্র তাত্ত্বিকভাবেই প্রমাণিত ছিল। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এমন একটি নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বরের সরাসরি প্রমাণ নিশ্চিত করেছেন, যা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

স্যাজিটারিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই রহস্যময় বস্তুটি OGLE-2011-BLG-0462 নামে পরিচিত। এটিই প্রথম কৃষ্ণগহ্বর, যা কোনো সঙ্গী নক্ষত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া ছাড়াই তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে। এই আবিষ্কার আমাদের ছায়াপথের গঠন, বিবর্তন এবং কোটি কোটি অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বরের সংখ্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

কৃষ্ণগহ্বরকে শনাক্ত করা হয় যখন তারা কোনো কাছাকাছি নক্ষত্র থেকে গ্যাস শোষণ করে, যার ফলে প্রচণ্ড উজ্জ্বল এক্স-রে বিকিরণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু OGLE-2011-BLG-0462 একাকী হওয়ায়, এই ধরনের কোনো বিকিরণ এটি নির্গত করে না, তাই একে খুঁজে পাওয়া ছিল এক অসাধ্য সাধন। এই কৃষ্ণগহ্বরটিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং (Gravitational Microlensing) নামক এক বিরল জ্যোতির্বিজ্ঞানগত ঘটনার মাধ্যমে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো অত্যন্ত ভারী বস্তু—যেমন একটি কৃষ্ণগহ্বর তার কাছাকাছি দিয়ে অতিক্রম করা আলোর পথকে বাঁকিয়ে দেয়। এই বক্রতা একটি প্রাকৃতিক লেন্সের মতো কাজ করে, যা পিছনের দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের আলোকে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল ও বিকৃত করে তোলে।

২০১১ সালে ওজিএলই সমীক্ষা চলাকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম এই ঘটনার ইঙ্গিত পান। যখন OGLE-2011-BLG-0462 নামের এই কৃষ্ণগহ্বরটি একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে নক্ষত্রটির আলো মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাটিকে একটি কৃষ্ণগহ্বর প্রার্থীর সংকেত হিসেবে দেখা হলেও এর ভর এবং প্রকৃতি নিশ্চিত করতে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন ছিল। মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং-এর কারণে আলোর বক্রতার দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন (অ্যাস্ট্রোমেট্রিক ডিফ্লেকশন) বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এর ভর ও দূরত্ব পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে মজবুত করেছে।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর গাইয়া মিশন (Gaia mission) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা এই বস্তুটির বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করেন।দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত গবেষণাটি এই নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বরটির মূল পরিচয় তুলে ধরেছে।

এটি আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় সাত গুণ। এই ভর এটিকে নিশ্চিতভাবেই একটি নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা কোনো বিশালাকার নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর ধসে পড়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এই ভর পরিসীমা এটিকে শ্বেত বামন বা নিউট্রন স্টার থেকে আলাদা করে।

কৃষ্ণগহ্বরটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী দূরত্ব এটিকে ছায়াপথের এই ধরনের বস্তুদের পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আদর্শ লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।

এই আবিষ্কারটি জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় একটি বিশাল মাইলফলক। এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম সরাসরি নিশ্চিতকরণই নয়, বরং ছায়াপথে লুকিয়ে থাকা এই ধরনের আরও কোটি কোটি বস্তুর একটি নমুনা হিসেবেও কাজ করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুমান করে আসছিলেন যে আমাদের মিল্কিওয়েতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর থাকতে পারে। তবে এগুলির বেশিরভাগই নিঃসঙ্গ এবং অদৃশ্য হওয়ায়, তাদের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। OGLE-2011-BLG-0462-এর আবিষ্কার তাত্ত্বিক এই মডেলগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে এবং ছায়াপথের মোট কৃষ্ণগহ্বর সংখ্যার একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি করে।

বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরগুলোর গতি এবং জন্মস্থান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন বিশালাকার নক্ষত্রগুলো যখন তাদের জীবনচক্রের শেষে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়, তখন তারা কীভাবে মহাকাশে নিক্ষেপিত হয় । এই অধ্যয়ন নাক্ষত্রিক বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ এবং কৃষ্ণগহ্বর গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেবে।

এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করেছে। নাসা’র ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ, এই ধরনের অদৃশ্য বস্তুদের খুঁজে বের করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।

রোমান টেলিস্কোপের সুবিশাল Field-of-View এবং উন্নত রেজোলিউশন মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং ইভেন্ট পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই নতুন শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করে তারা OGLE-2011-BLG-0462-এর মতো আরও শত শত নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত করতে পারবেন, যা আমাদের গ্যালাক্সির অন্ধকার, বিচরণকারী এই মহাজাগতিক দৈত্যদের একটি বিশদ মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন থেকে গ্যালাক্সি – মার্ক চেনের লেন্স ও ক্যানভাস কীভাবে ‘সুদূর সময়’কে দৃশ্যমান করেছে?

মানুষের কল্পনার সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখানেই শুরু হয় সময়ের প্রকৃত গভীরতা। হাজার বছর নয়, লক্ষ বা কোটি বছর ধরে চলমান ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, কিংবা গ্যালাক্সির আলো এসবের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন সময়বোধের কোনো মিল নেই। মানুষ মাত্র একশ বছরও টিকে না, অথচ পৃথিবী ও মহাবিশ্ব চলেছে বিলিয়ন বছর ধরে। এই গভীর সময় বা Deep Time—এর ধারণা তাই অনেকের কাছেই প্রায় অচিন্তনীয়।

এই দুর্বোধ্যতাকে মূর্ত ও অনুভবযোগ্য করে তোলার এক অসাধারণ প্রয়াস চালিয়েছেন হিউস্টনের আলোকচিত্রী ও শিক্ষক মার্ক চেন । তাঁর চলমান প্রকল্প, “পিলগ্রিমেজ অফ লাইট” (Pilgrimage of Light), মহাবিশ্বের দূরতম নক্ষত্রপুঞ্জের আলোক-বর্ষের দূরত্বকে পৃথিবীর সুপ্রাচীন ভূ-প্রকৃতির ভূতাত্ত্বিক বয়সের সাথে মিলিয়ে এক অনুপম শিল্প ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

মার্ক চেন, ২০২২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যানসহ নানা বন্য অঞ্চলে রাতের বেলা ভ্রমণ করছেন। তাঁর প্রধান সরঞ্জাম হলো একটি কাস্টম-মেড প্রজেক্টর, যার মাধ্যমে তিনি নাসা (NASA)-র সংগৃহীত নক্ষত্রপুঞ্জের ছবিগুলিকে পৃথিবীর আইকনিক প্রাকৃতিক কাঠামোর উপর স্বল্প সময়ের জন্য প্রক্ষেপণ করেন। এই প্রকল্পটির মূল ধারণাটি খুবই সরল কিন্তু গভীর, প্রতিটি ছবিতে পৃথিবীস্থ স্থানের বয়স (কোটি বা মিলিয়ন বছর) মহাকাশীয় বস্তুর দূরত্ব (আলোক-বর্ষ) এর প্রায় সমান।

এক আলোক-বর্ষ হলো সেই দূরত্ব, যা আলো এক বছরে অতিক্রম করে। এর অর্থ হলো আমরা যখন একটি নির্দিষ্ট আলোক-বর্ষ দূরের নক্ষত্রের দিকে তাকাই, তখন আমরা আসলে তার অতীতকে দেখছি। যদি একটি নক্ষত্র ২০ মিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরে থাকে, তবে আমরা তার ২০ মিলিয়ন বছর আগের আলো দেখছি, অর্থাৎ সেই আলো ২০ মিলিয়ন বছর ধরে যাত্রা করে আমাদের চোখে পৌঁছাচ্ছে। মার্ক চেন ঠিক এই দূরত্বের সাথে পৃথিবীর সেইসব স্থানের বয়স মিলিয়ে দিয়েছেন, যা ২০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল। এই যুগলবন্দী একটি বৈপ্লবিক ধারণা তৈরি করে, আমাদের গ্রহটি কীভাবে মহাবিশ্বের সঙ্গে সহাবস্থান করেছে, তা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মার্ক চেনের কাজটির গভীরতা বুঝতে হলে তাঁর কিছু প্রধান শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করা জরুরি। Carlsbad Caverns হলো তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজের পটভূমি। প্রায় ২০ মিলিয়ন বছর আগে, ভূ-অভ্যন্তরীণ চাপের ফলে এখানকার সুবিশাল চুনাপাথরের কাঠামো গঠিত হয়েছিল। এই গুহার অভ্যন্তরে তিনি প্রক্ষেপণ করেছেন পিনহুইল ছায়াপথের (Pinwheel galaxy) সর্পিল বাহুগুলির চিত্র। এই ছায়াপথটি পৃথিবী থেকে ২২.৩ মিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরে অবস্থিত।

এখানে ২০ মিলিয়ন বছর ধরে তৈরি হওয়া গুহার স্থায়িত্বের সঙ্গে ২২.৩ মিলিয়ন বছর ধরে ভ্রমণরত আলোর এক অদ্ভুত সমন্বয় দেখা যায়। গুহাটি ২০ মিলিয়ন বছরের নীরবতা ও স্থিরতার প্রতীক, আর ছায়াপথের আলো হলো সেই ২০ মিলিয়ন বছরের নিরন্তর মহাজাগতিক গতির প্রমাণ। এই তুলনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যখন এই গুহার পাথরগুলি গঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে সেই সুদূর গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীর দিকে যাত্রা শুরু করেছিল।

মার্ক চেনের আর একটি চমকপ্রদ কাজ হলো Yosemite Valley। সেখানকার বিখ্যাত ক্লিফ হাফ ডোম একাধিক বরফ যুগের মাধ্যমে সৃষ্ট হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে তৈরি হয়েছে, যার শেষটি ঘটেছিল প্রায় ৩০,০০০ বছর আগে। হাফ ডোমের পাদদেশের গাছগুলিতে তিনি প্রক্ষেপণ করেছেন পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮,০০০ আলোক-বর্ষ দূরের একটি নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি।

যদিও এখানে দূরত্বের সাথে বয়সের একটি সামান্য পার্থক্য রয়েছে, তবে উভয়ের কালক্রমিক নৈকট্য উল্লেখযোগ্য। এই ছবিটি যেন বরফ যুগের প্রচণ্ড শক্তি আর মহাজাগতিক নক্ষত্রের এক ঝলমলে সভার মাঝে মানব ইতিহাসের মাত্র কয়েক হাজার বছরের অবস্থানকে তুলে ধরেছে। এটি আমাদের দেখায় যে যখন শেষ বরফ যুগ শেষ হচ্ছিল, তখনো সেই দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো তার যাত্রা শেষ করেনি।

মার্ক চেন ব্রাইস ক্যানিয়নকে বেছে নিয়েছেন যার শুষ্ক হ্রদের তলদেশে থাকা পলি প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এই ক্যানিয়নটির উপর প্রক্ষেপিত হয়েছে সোমব্রেরো ছায়াপথ (Sombrero galaxy), যা M104 নামেও পরিচিত। এই গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো যখন হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়ে, তখন তা প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী থেকে নির্গত হয়েছিল।

এই ক্যানিয়ন ও গ্যালাক্সির যুগলবন্দীটি মহাকালের একটি শক্তিশালী প্রতীক। যখন ব্রাইস ক্যানিয়নের শুষ্ক পলি থেকে বর্তমানের হুডু নামক অদ্ভুত শিলাস্তম্ভগুলি তৈরি হচ্ছিল, তখন সেই ৩০ মিলিয়ন বছর আগের গ্যালাক্সির আলো আমাদের দিকে আসছিল। এই মিল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের গতি মহাজাগতিক গতিধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

মার্ক চেনের সবচেয়ে মানবিক সংযোগ স্থাপনকারী কাজটি হলো Grand Canyon। এখানকার সাউথ রিমের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজের আলোতে তিনি এনজিসি ৩৩২৪ (NGC 3324) নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি তুলে ধরেন। এই নক্ষত্রপুঞ্জটির দূরত্ব প্রায় ৯,২৬০ আলোক-বর্ষ।

এই দূরত্বকে তিনি তুলনা করেছেন সেই সময়ের সাথে, যখন মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন শুরু করে। যদিও মানব বসতির সূচনা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে, কিন্তু এই সময়কালটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী ও সুসংগঠিত জীবনযাত্রার সূচনাকে নির্দেশ করে। প্রায় ৯-১০ হাজার বছর হলো সেই সময়, যখন শিকারি-সংগ্রাহক জীবন ছেড়ে মানুষ কৃষিকাজ ও স্থায়ী বসতি স্থাপন শুরু করে। এই ছবিটি আমাদের অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ীত্বকে তুলে ধরে: মহাজাগতিক স্কেলে আমরা, মানুষ, যেন এক মুহূর্তের জন্য সেখানে উপস্থিত।

মার্ক চেনের “পিলগ্রিমেজ অফ লাইট” প্রকল্পটি শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির একটি কাজ নয়; এটি বিজ্ঞান, শিল্প এবং দর্শনের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ। এই কাজটি সুদূর সময়ের ধারণাকে বিমূর্ততার স্তর থেকে নামিয়ে এনে একটি বোধগম্য দৃশ্যমানতায় প্রতিষ্ঠা করেছে।

এইসব ছবিতে আমাদের পায়ের নিচে থাকা পাথরগুলি কোটি কোটি বছরের স্থায়িত্বের সাক্ষ্য বহন করে, আর মাথার উপরের আলোকরশ্মিগুলিও ঠিক একই সময়ের মহাজাগতিক যাত্রার গল্প শোনায়। মানবজাতি এই মহাকালের প্রেক্ষাপটে খুবই নতুন, যেন এক ক্ষণিকের ঝলকানি। এই কাজ আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, একই সাথে আমাদের গ্রহের এই বিশাল মহাবিশ্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককেও তুলে ধরে।

উত্তরাঞ্চলে নদীর পানি বাড়ছে, নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সতর্কতা জারি

দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও, উজানে অব্যাহত ভারি বর্ষণের কারণে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগে এবং উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে উজানের পানি প্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের নদীগুলোর পানিস্তরেও প্রভাব ফেলছে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দিনে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগসহ ভারতের পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী দুই দিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর প্রভাবে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংস নদীর পানিও আগামী দুই দিন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ নদীগুলো শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলায় সতর্কসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে। এতে ওইসব জেলার নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

এদিকে করতোয়া, যমুনেশ্বরী, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, আত্রাই, আপার-আত্রাই, মহানন্দা ও ঘাঘট নদীর পানিস্তরও আগামী দুই দিনে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও এখনই বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি দেখা না দিলেও, স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাপাউবো।

পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানিস্তর আগামী দুই দিন বৃদ্ধি পাবে এবং পরবর্তী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। অন্যদিকে পদ্মা নদীর পানির স্তর আগামী এক দিন স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী চার দিন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার পানি আগামী এক দিন স্থিতিশীল থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে সিলেট অঞ্চলে তীব্র বন্যার সম্ভাবনা আপাতত নেই বলে মনে করছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা উপেক্ষা করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান উপেক্ষা করে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। শনিবার উপত্যকাটির বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও স্থল হামলায় কমপক্ষে ৭০ জন নিহত হয়েছেন। এই তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা। গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাতের মধ্যে সাম্প্রতিক এ হামলা মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন, যাতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। পরিকল্পনার আওতায় হামাসকে জিম্মি মুক্তি, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সংঘর্ষ বন্ধে কিছু শর্ত মানতে বলা হয়েছিল। হামাস ওই প্রস্তাবের কিছু অংশ আংশিকভাবে মেনে নেওয়ার পরও ইসরায়েল হামলা বন্ধের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

শনিবার গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের হামলায় ৪৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। বিশেষভাবে গাজা সিটির তুফফাহ এলাকায় একটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১৮ জন নিহত ও আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আশপাশের বেশ কয়েকটি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের জোরালো অভিযান চলছে, যার ফলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দক্ষিণের জনাকীর্ণ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসাকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুই মাস থেকে আট বছর বয়সী সাত শিশুও রয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকার একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরকেও লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যেখানে দুই শিশু নিহত ও অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। আল-মাওয়াসি অঞ্চল ইসরায়েলের ঘোষিত “নিরাপদ ও মানবিক এলাকা” হলেও সেখানে বারবার হামলার ঘটনা ঘটছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসকে দ্রুত জিম্মিদের মুক্তি দিতে এবং যুদ্ধ বন্ধে শান্তি পরিকল্পনার আলোচনাসমূহ চূড়ান্ত করতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘না হলে সবই হাতছাড়া হয়ে যাবে।’ ট্রাম্প আরও বলেছেন, “আমি দেরি মেনে নেব না। এমন কোনো ফলাফল মেনে নেব না যেখানে গাজা আবার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এটি দ্রুত শেষ করতে হবে এবং সবার সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হবে।”

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাঁর দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে মিসরে পাঠাবেন, যেখানে তারা জিম্মি মুক্তির কারিগরি দিক চূড়ান্ত করবেন এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করবেন। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিদল মিসরে বসবে এবং বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে।

ট্রাম্পের প্রস্তাবের প্রথম ধাপে হামাসের কাছে থাকা সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার শর্ত রয়েছে। বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে। যদিও হামাস এখনও অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।

গাজার পরিস্থিতি বর্তমানে মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। হাসপাতালগুলো সীমিত সক্ষমতা ও জ্বালানিসংকতের মধ্যেও চলছে। স্থানীয় সাংবাদিক হিন্দ খোদারি জানিয়েছেন, নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরসহ মধ্যাঞ্চলের অন্য এলাকাতেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। সাম্প্রতিক হামলা এবং যুদ্ধবিরতি অনিশ্চয়তা উভয়ই গাজার সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সেমিকোলনের বিবর্তন – প্রাচীন স্ক্রোল থেকে আধুনিক স্ক্রিন পর্যন্ত

বিরামচিহ্ন হলো নীরব ভাষার এক অপরিহার্য কাঠামো, যা লিখিত শব্দের অর্থ, গতি এবং ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে। একটি মাত্র কমা বা দাঁড়ি বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। এই চিহ্নের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিতর্কিত সংযোজনগুলির মধ্যে একটি হলো সেমিকোলন (;)।

সেমিকোলন কোনো প্রাচীন রোমান আবিষ্কার ছিল না, যেমনটা ছিল কমা বা কোলন। এটির জন্ম হয়েছিল ইতালীয় রেনেসাঁস-এর আলোকোজ্জ্বল যুগে। মুদ্রণ শিল্পের ব্যাপক প্রসারের ফলে যখন বই এবং সাহিত্যের সহজলভ্যতা বাড়তে থাকে, তখন সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট এবং অর্থবহ লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

১৪৯৪ সালে ভেনিসের বিখ্যাত মুদ্রাকর অ্যালডাস ম্যানুটিয়াস এবং তাঁর পরিবার এই চিহ্নের উদ্ভাবনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ম্যানুটিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি চিহ্ন তৈরি করা, যা দুটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত কিন্তু স্বাধীন বাক্যকে সংযুক্ত করতে পারে। সেই সময় কমা (,) দ্বারা স্বল্প বিরতি এবং কোলন (:) দ্বারা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ বিরতি বোঝানো হতো। সেমিকোলনকে এমন এক ‘মাঝারি বিরতি’ হিসেবে তৈরি করা হয়, যা কমা অপেক্ষা দীর্ঘ এবং কোলন অপেক্ষা সংক্ষিপ্ত। এটি লেখকের ভাবনার গভীরতা ও জটিলতা প্রকাশের সুযোগ দেয়। ইতালীয় ভাষায় তাঁর প্রথম ব্যবহার দেখা যায়, এরপর দ্রুত তা ইউরোপের অন্য ভাষাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।

সেমিকোলন যখন ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন এটি তার নিজস্ব শৈলীগত পরিচয় তৈরি করে নেয়। এর ব্যবহার কেবল ব্যাকরণগত প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সাহিত্যিক কমনীয়তা ও ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ষোড়শ শতকে ইংরেজিতে এর ব্যবহার শুরু হলেও, ১৮শ শতকের বিখ্যাত সাহিত্যিক স্যামুয়েল জনসন-এর রচনা এবং তাঁর প্রমিতকরণ প্রচেষ্টা সেমিকোলনকে ইংরেজিতে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। জনসন এবং তাঁর সমসাময়িক লেখকরা সেমিকোলনকে এমন এক ছন্দময় বিরতি সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতেন, যা পাঠককে একটি জটিল ধারণার একাধিক দিক বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় দিত, কিন্তু মূল ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন করত না।

এই সময়ে লেখকরা সেমিকোলনকে নিম্নলিখিত দুটি প্রধান কাজে ব্যবহার করতেন।

দুটি প্রধান স্বাধীন ধারাকে সংযুক্ত করা, যেমন: “সূর্য অস্ত গেল; দিন ফুরিয়ে রাত নামলো।”

তালিকার জটিল উপাদানগুলিকে পৃথক করা, যেখানে তালিকার অভ্যন্তরে কমার প্রয়োজন হয়। যেমন: “আমাদের দলে ছিল শুভ, যে একজন স্থপতি; অনামিকা, একজন ডাক্তার; এবং প্রবীর, একজন শিক্ষক।”

ফরাসি সাহিত্য এবং ইউরোপের অন্যত্র, লেখক ও ব্যাকরণবিদদের মধ্যে এই চিহ্নের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, কেউ এটিকে ‘অহেতুক ভারিক্কি’ হিসেবে দেখতেন, আবার কেউ এটিকে ‘দার্শনিক বিরতি’ হিসেবে সম্মান করতেন। তবে চার্লস ডিকেন্স, জেন অস্টেন এবং হেনরি জেমস-এর মতো ক্লাসিক লেখকদের হাতে সেমিকোলন তাদের গদ্যে এক চমৎকার ছন্দ এবং ঔজ্জ্বল্য এনেছিল।

২০শ শতকের শুরুতে ভাষার গতিশীলতা ও লেখার শৈলীতে পরিবর্তন আসে। আধুনিকতাবাদী লেখকরা, যেমন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ছোট, প্রত্যক্ষ এবং সাবলীল বাক্যকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। তাঁরা মনে করতেন, সেমিকোলন এবং অন্যান্য জটিল বিরামচিহ্ন গদ্যের প্রবাহকে কৃত্রিমভাবে ধীর করে দেয়।

এই সময়ে অনেক স্টাইল গাইড এবং সম্পাদনা নির্দেশিকা সেমিকোলন-এর ব্যবহারকে সীমিত করে দেয়। এর জায়গায় অনেক লেখক হয় দুটি ছোট বাক্য ব্যবহার করতে শুরু করেন, অথবা কোলন (:) ব্যবহার করে উপসংহার বা তালিকা শুরু করতেন। এই বিতর্কটি এখনো বিদ্যমান। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কার্ট ভনেগাট সেমিকোলনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “তোমাদের যা করার আছে, করো; কিন্তু এই মুহূর্তে আমি একটি জিনিস বলতে চাই—সেমিকোলনের কোনো মানে নেই। এটি একটি অলংকার।” এই সরলতার প্রতি ঝোঁক সেমিকোলনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে থেকে প্রান্তের দিকে সরিয়ে দিতে থাকে।

বিংশ শতকের শেষের দিকে যখন মানব ভাষা থেকে কম্পিউটার ভাষার দিকে মনোযোগ সরতে থাকে, তখন সেমিকোলন এক অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন জীবন ফিরে পায়। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ভাষার উত্থান সেমিকোলনের জন্য এক নতুন, কঠোর এবং অপরিহার্য ভূমিকা নিয়ে আসে।

সি (C), সি++ (C++), জাভা (Java), এবং জাভাস্ক্রিপ্ট-এর মতো প্রধান প্রোগ্রামিং ভাষাগুলিতে সেমিকোলন (;) একটি ‘স্টেটমেন্ট টার্মিনেটর’ বা ‘বিবৃতি সমাপ্তকারী’ হিসেবে কাজ করে। এই ভাষাগুলিতে একটি নির্দেশ শেষ হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ শুরু হতে চলেছে—তা কম্পিউটারকে বোঝানোর জন্য সেমিকোলনকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে হয়। মানব ভাষায় যেখানে সেমিকোলন একটি শৈলীগত পছন্দ মাত্র, সেখানে প্রোগ্রামিংয়ে এর অনুপস্থিতি বা ভুল ব্যবহার একটি ‘সিনট্যাক্স এরর’ বা গঠনগত ত্রুটি সৃষ্টি করে, যা পুরো প্রোগ্রামকে অকার্যকর করে তোলে। এর মাধ্যমে সেমিকোলন তার ঐতিহাসিক ভূমিকা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূমিকা অর্জন করেছে। ঐতিহাসিক ভূমিকায় ছন্দের জন্য ঐচ্ছিক বিরতি। আর আধুনিক ভূমিকায় নির্দেশের জন্য বাধ্যতামূলক সমাপ্তি।

সেমিকোলনের ইতিহাস আমাদের দেখায় কীভাবে বিরামচিহ্ন একটি ভাষা ব্যবহারের যন্ত্র থেকে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলস্বরূপ রূপান্তরিত হয়। রেনেসাঁসের মুদ্রাকরদের হাতে জন্ম নেওয়া, ক্লাসিক্যাল লেখকদের হাতে পালিত এবং আধুনিকতাবাদীদের হাতে প্রায় পরিত্যক্ত এই চিহ্নটি বর্তমানে ডিজিটাল বিশ্বে এক নতুন, ক্ষমতাশালী এবং অনিবার্য ভূমিকা পালন করছে। এটি এখন আর কেবল ভাবনার ছন্দ নয়, এটি কম্পিউটার লজিকের গঠনগত ভিত্তি। সেমিকোলনের এই দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ যাত্রা প্রমাণ করে লিখিত ভাষা এবং তার সহযোগী চিহ্নগুলি কেবল অতীতের নিদর্শন নয়, তারা আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সমাজের সক্রিয় ও পরিবর্তনশীল অংশ।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার গবেষণা – দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়ে যায় দেশে উৎপাদিত মাছের ৩০%

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয় তা বৈশ্বিক জনসংখ্যার দেড় গুণকে খাওয়াতে সক্ষম। তবু বিশ্বের বহু মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না এবং কোটি কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার। এর প্রধান কারণ হলো অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, সংঘাত এবং খাদ্য অপচয়।

বাংলাদেশেও এই সমস্যা প্রবল। এফএওর গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ফার্ম থেকে প্রসেসিং পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে ধানের প্রায় ১৭ শতাংশ, কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণের অভাবের কারণে ১৪ শতাংশ ধান নষ্ট হয়। গমের ক্ষেত্রে ক্ষতির হার প্রায় ১৮ শতাংশ। ফল ও শাকসবজিতে ক্ষয়-ক্ষতির হার সর্বোচ্চ, যা বার্ষিক ভিত্তিতে ২৫–৪০ শতাংশ পর্যন্ত। আমের ক্ষেত্রে একক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ শতাংশ, মাছের ক্ষেত্রে ক্ষতি ২০–৩০ শতাংশ। পোলট্রি শিল্পেও ক্ষতি প্রায় ১৭ শতাংশ বলে এফএও কর্মকর্তা দিয়া সানু উল্লেখ করেছেন।

খাদ্য অপচয় শুধুমাত্র সরবরাহ চেইনে সমস্যা তৈরি করে না, জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও তা গুরুত্বপূর্ণ। দিয়া সানু বলেন, খাদ্য ব্যবস্থায় অপচয় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বড় কারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমানোর জন্য কৌশলগত নীতি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, কোল্ড স্টোরেজ, বাজার ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৭৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৫ কোটি শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে বিকাশজনিত সমস্যায় ভুগছে। আর প্রতিদিন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খাদ্য অপচয় হচ্ছে। বাংলাদেশে গৃহস্থালি পর্যায়ে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাবার অপচয় হয়, যেখানে প্রতিটি পরিবার গড়ে ৮২ কেজি খাবার নষ্ট করে। এ সময় দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, খাদ্য অপচয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ায়। তিনি নাগরিকদের সচেতনতা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত ‘খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি শূন্যের পথে: বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য মূল্য শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, শূন্য ক্ষতি ও অপচয় লক্ষ্য এখনও দূর, তবে অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব। কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন চলছে। এ বছর ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ কার্যকর করা হয়েছে, আরও ১০০টি আসছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জেস উড বলেন, বৈশ্বিক খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন প্রতি বছর নষ্ট হয়। বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ সমানভাবে গুরুতর, বিশেষত ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামানো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ। তবে এ লক্ষ্য অর্জন করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টিজনিত সমস্যা আরও বৃহৎ আকার ধারণ করবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ৭টি প্রস্তাব দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

0

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের দুর্দশা নিরসনে উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সাতটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এই প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা শুরুর আট বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের দুর্দশা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সংকট নিরসনে যথাযথ উদ্যোগের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নে ভয়াবহ ঘাটতি বিদ্যমান। রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারেই। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।” তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করতে মিয়ানমার ও আরাকান সেনাবাহিনীর ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি রাখাইনে তাদের দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।”

ড. ইউনূস বলেন, “মিয়ানমারের বৃহত্তর সংস্কারের সঙ্গে এই সংকটকে জড়িয়ে রাখা উচিত নয়। তহবিলের সীমাবদ্ধতার মধ্যে একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানো। এটি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেয়ে কম সংস্থান ব্যবহার করবে। রোহিঙ্গারা ধারাবাহিকভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাই যারা সম্প্রতি সংঘাত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের প্রত্যাবাসনের অনুমতি দেওয়া জরুরি।”

তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সাতটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেন। প্রথমত, রাখাইনে যুক্তিসংগত স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তব রোডম্যাপ প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে মিয়ানমার ও আরাকান সেনাবাহিনীর ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ এবং সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রবেশ করা অথবা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের ফেরত নেওয়া। তৃতীয়ত, রাখাইনকে স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় এবং স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, রাখাইন সমাজ ও শাসনে রোহিঙ্গাদের টেকসই সংহতকরণে আস্থা তৈরির উদ্যোগে সহায়তা করা। পঞ্চমত, যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার জন্য দাতাদের সহায়তা একত্রিত করা। ষষ্ঠত, জবাবদিহিতা ও পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সপ্তমত, মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি ধ্বংস ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই চালানো।

ড. ইউনূস বলেন, “রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানোর জন্য আর অপেক্ষা করার সময় নেই। আজই আমরা এই সংকট সমাধানে একযোগে কাজ করার শপথ নেই। বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।”

এর আগে গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গা বিষয়ে আঞ্চলিক সম্মেলনেও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সাত দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। এবার জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সভায় তিনি তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে শক্তিশালী বার্তা গেছে যে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং রাখাইনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

কার্নিভাল ডি ভেনেজিয়া – মুখোশ কেন ভেনিসবাসীর মুক্তির প্রতীক ছিল?

প্রাচীন ইউরোপের এক ঝলমলে শহর ভেনিস। এর স্থাপত্যশৈলী, ক্যানাল আর সংস্কৃতি জগৎ জুড়ে বিখ্যাত। এই শহরের সংস্কৃতিতে এক গভীর এবং রহস্যময় উপাদান হলো এর মুখোশ উৎসব, যা ‘কার্নেভাল ডি ভেনেজিয়া’ (Carnevale di Venezia) নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবলই এক জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব হলেও, এর প্রতিটি মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভেনিসের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জটিল ও গবেষণামূলক বিশ্লেষণ।

ভেনিশিয়ান মুখোশের ইতিহাস ১৩তম শতাব্দী বা তারও আগে থেকে পাওয়া যায়। ১২৬৯ খ্রিস্টাব্দে একটি সরকারি ডিক্রিতে মুখোশ পরে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করার উল্লেখই এর প্রাচীনত্বের প্রমাণ। তবে মুখোশ পরার মূল কারণটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং সমাজ-সংশ্লিষ্ট। ভেনিস ছিল ধনী-দরিদ্রের তীব্র বৈষম্যযুক্ত এক সমাজ। এর কঠোর সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিল দৈনন্দিন জীবনের এক নির্মম সত্য। মুখোশ এই বৈষম্য থেকে মুক্তির এক প্রতীক হিসেবে কাজ করেছিল। যখন কেউ মুখোশ পরতো, তখন তার সামাজিক পরিচয়, শ্রেণী, এমনকি লিঙ্গও ঢাকা পড়তো।

বেনামী হয়ে ওঠার এই স্বাধীনতা ভেনিসবাসীদের এমন কিছু সুযোগ এনে দেয়, যা অন্য কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। অভিজাত শ্রেণী নির্দ্বিধায় নিম্নবিত্তের আড্ডাখানায় যেতে পারতো, পুরুষরা নারীর বেশ ধরে রাস্তায় বের হতে পারতো, আবার গরিব মানুষরা ধনী সেজে সমাজের উচ্চস্তরের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারতো। মুখোশ যেন এক সামাজিক সমতাবিধানকারী হিসেবে কাজ করতো, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শ্রেণী-ভেদাভেদকে অদৃশ্য করে দিতো। এই বেনামীর সুযোগে মানুষ নিজেদের স্বাভাবিক নৈতিকতার বেড়া ভেঙে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে আচরণ করতে পারতো। জুয়া খেলা, গোপন প্রণয় এবং নৈতিকভাবে আপত্তিকর কার্যকলাপের প্রবণতাও বেড়েছিল এই মুখোশের আড়ালে। তাই ১৮শ শতকের দিকে সরকার বিভিন্ন সময়ে মুখোশ ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এখন ভেনিশিয়ান মুখোশ বলতে মূলত কার্নিভালকেই বোঝালেও একসময় ভেনিসবাসীরা প্রায় বছরের অর্ধেক সময় ধরে মুখোশ ব্যবহার করতো। মুখোশ শুধু উৎসবের অঙ্গ ছিল না, তা ছিল ভেনিসের দৈনন্দিন জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। থিয়েটার, সামাজিক সমাবেশ, এমনকি রাজনৈতিক সভা-সমিতিতেও মুখোশ ছিল বাধ্যতামূলক। এই ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মুখোশ শিল্পের এক নতুন ধারার জন্ম হয়, যা ‘মাসকেরারি’ নামে পরিচিত দক্ষ কারিগরদের দ্বারা পরিচালিত হতো। কাগজ-মন্ড ছিল এর মূল উপাদান, যার সাথে সোনা বা রূপার পাত, পালক ও রত্নপাথর যুক্ত করে তৈরি হতো শৈল্পিক মুখোশ।

মুখোশের চরিত্রায়ণ ছিল বৈচিত্র্যময়। বাউতা (Bauta) এটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সরকারিভাবে স্বীকৃত মুখোশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি পরলে মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যেত, তবে কথা বলা বা পানাহার করার জন্য মুখের অংশটি এমনভাবে নকশা করা হতো যাতে পরিচয় গোপন থাকে। এটি প্রায়শই কালো ক্যাপ এবং কেপের সাথে পরা হতো। একসময় রাজনৈতিকভাবে নাম প্রকাশ না করে ভোট দেওয়ার জন্যও এটি ব্যবহার করা হতো।

মোরেত্তা ছিল ডিম্বাকৃতির একটি কালো মখমলের মুখোশ, এটি মূলত মহিলারা পরতেন। এটিকে ঠোঁট দিয়ে ধরে রাখতে হতো, ফলে পরিধানকারী মহিলাটি কথা বলতে পারতেন না, যা তাকে এক রহস্যময় ও আবেদনময়ী করে তুলতো।

মেডিকো ডেলা পেস্তে লম্বা, পাখির ঠোঁটের মতো এই মুখোশটি প্লেগ ডাক্তারদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো। ঠোঁটের ভেতরের অংশে সুগন্ধি ভেষজ রাখা হতো, যা তাদের বিশ্বাসমতে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতো। বর্তমানে এটি ‘মৃত্যু স্মারক’ হিসেবে কার্নিভালে পরা হয়।

কমেডিয়া ডেল’আর্তে নামে ইতালির এই ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য থেকে বহু মুখোশের চরিত্র এসেছে। যেমন: হার্লেকিনো/আরলেচিনো একজন ধূর্ত, বানরের মতো মুখাবয়বযুক্ত ভাঁড়; পানতালোনে একজন লোভী, ধনী বৃদ্ধ ব্যবসায়ী; এবং কলম্বিনা যা অর্ধ-মুখোশ হিসেবে পরিচিত।

ভেনিশিয়ান কার্নিভাল প্রথম শুরু হয়েছিল ১১৬২ সালে, যখন ভেনিস প্রজাতন্ত্র অ্যাকুইলেইয়ার প্যাট্রিয়ার্কের বিরুদ্ধে এক সামরিক বিজয় লাভ করে। এই বিজয়কে কেন্দ্র করে সেন্ট মার্কের স্কোয়ারে নৃত্য ও সমাবেশের মাধ্যমে উৎসব শুরু হয়। ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে এটি রেনেসাঁসের জৌলুস লাভ করে এবং ১৭শ শতাব্দীতে বারোক শিল্পের সাথে মিশে বিশ্বের কাছে ভেনিসের এক মর্যাদাপূর্ণ ভাবমূর্তি তুলে ধরে।

তবে মুখোশের বেনামী সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে এই ধারণার উপর ভিত্তি করে ভেনিস সরকার ধীরে ধীরে মুখোশ ব্যবহারের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে। ১৭৯৭ সালে যখন নেপোলিয়নের নেতৃত্বে অস্ট্রিয়ান সরকার ভেনিসের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তারা এই কার্নিভালকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য চাপা পড়ে ছিল, যেখানে মুখোশ পরা হয়ে ওঠে এক বিরল এবং সীমাবদ্ধ প্রথা।

১৯৭৯ সালে ইতালীয় সরকার ভেনিসের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ‘কার্নেভাল ডি ভেনেজিয়া’র পুনরায় প্রবর্তন করে। এই পুনরুত্থান আধুনিক ভেনিসের জন্য কেবল একটি উৎসব ছিল না, ছিল বিশ্ব মঞ্চে শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সগৌরবে তুলে ধরার এক প্রচেষ্টা। আধুনিক কার্নিভাল প্রতি বছর প্রায় ৩০ লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করে, যা ভেনিসের সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক জীবনের জন্য অপরিহার্য।

গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে ভেনিশিয়ান মুখোশকে শুধুমাত্র সজ্জা হিসেবে দেখা যায় না, তা ‘স্ব-পরিচয়ের নির্মাণ’ এবং ‘সামাজিক পরিচয়’ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দার্শনিক মিখাইল বাখতিন ‘কার্নিভাল’কে বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এটি সমাজের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে ‘অপরিশোধিত সত্য’কে উন্মোচিত করার এক প্রক্রিয়া। মুখোশ তার পরিধানকারীকে এক ধরণের আলিবাই বা অজুহাত দিতো, যার ফলে সে সমাজের আরোপিত কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে পারতো। লাতিন শব্দ ‘পার্সোনা’-র অর্থও হলো ‘মুখোশ’। এর থেকেই ধারণা পাওয়া যায় একসময় মুখোশ এবং ব্যক্তিত্ব ছিল সমার্থক। মুখোশ পরিবর্তন মানেই ছিল ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন, যা এক বিশেষ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা দিতো।

ভেনিসের ঘনবসতিপূর্ণ এবং বহু-সাংস্কৃতিক পরিবেশে মুখোশ এক গুরুত্বপূর্ণ ‘সামাজিক লুব্রিক্যান্ট’ হিসেবে কাজ করতো। কঠোর সামাজিক উত্তেজনার সময়ে এটি শ্রেণী ও সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সহজে যোগাযোগের সুযোগ করে দিতো। মুখোশ পরিধানকারীকে তার নিজস্ব বাস্তবতার বাইরে একটি ‘অভিনয় জগত’ তৈরি করতে সাহায্য করতো, যেখানে সমাজের সাধারণ নিয়ম-কানুন শিথিল ছিল।

ভেনিশিয়ান মুখোশ উৎসব শুধু রঙের খেলা নয়, এটি ভেনিস প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস, শ্রেণী সংঘাত, নৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পুনরুত্থানের এক জীবন্ত দলিল। মুখোশ ছিল সেই রহস্যময় আবরণ, যা একইসাথে গোপন করতো এবং প্রকাশও করতো একদিকে যেমন বেনামী করে সামাজিক সাম্য আনতো, অন্যদিকে তেমনি চরম নৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকেও ফুটিয়ে তুলতো। ভেনিসের প্রতিটি মুখোশই যেন ইতিহাসের এক নীরব ভাষ্য, যা আজও বিশ্ববাসীকে এই প্রাচীন শহরের অন্তরালের গল্প শোনায় যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এক রহস্যময় আবরণে আবৃত।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও নার্সদের বেতন সবচেয়ে কম

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের বেতনসংক্রান্ত পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। সিরাজগঞ্জের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা তরুণ চিকিৎসক ডা. আব্দুল মুকিত বণিক বার্তাকে বলেন, “ঢাকায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির প্রস্তাব থাকলেও মাসিক বেতন গড়ে ২০ হাজার টাকা। এমবিবিএস শেষ করার পর নবীন চিকিৎসকরা অর্থ সংকটে থাকেন। কম বেতন কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

বাংলাদেশে একজন চিকিৎসক গড়ে বার্ষিক ৩ লাখ টাকা বেতন পান, যেখানে একজন নার্স পান ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এ বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ভারতের চিকিৎসকদের বার্ষিক গড় বেতন ১৬ লাখ ৪৪ হাজার, নেপালে ১০ লাখ ৩২ হাজার, শ্রীলংকায় ৪ লাখ ৮০ হাজার এবং পাকিস্তানে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। যুক্তরাজ্যের একজন চিকিৎসক বছরে প্রায় ৯৮ লাখ টাকা বেতন পান, যা বাংলাদেশের চিকিৎসকের বেতনের প্রায় ৩৩ গুণ।

নার্সদের ক্ষেত্রেও অবস্থা অনুরূপ। ভারতের নার্সদের বার্ষিক গড় বেতন ৬ লাখ ৯০ হাজার, নেপালে ৫ লাখ ২০ হাজার, শ্রীলংকায় ২ লাখ ৪০ হাজার এবং পাকিস্তানে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। যুক্তরাজ্যের নার্সের বার্ষিক বেতন বাংলাদেশের নার্সের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চিকিৎসকদের বেতন অনেক কম। সরকারি কাঠামোয় বেতন বৃদ্ধি সীমিত, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধাও কম। প্রমোশন ধীর এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক ইনসেনটিভ নেই।”

স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক ডা. আলী আফতাব বলেন, “উন্নত দেশে সরকারি চিকিৎসকরা পূর্ণকালীন সেবা দেন, কিন্তু উচ্চ বেতনের বিনিময়ে। বাংলাদেশে সরকারি বেতন কম হওয়ায় সরকার-বেসরকারি প্র্যাকটিসের সুযোগ দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেয়। তবে এটি পেশার সম্মান ও প্রেরণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

সাম্প্রতিক ‘স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি জনবলের বেতন নীতি: বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সরকারি জনবল ১ লাখ ৫০ হাজার, বেসরকারি খাতে ১ লাখ ৯০ হাজার। বেতন কাঠামোর দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন।

গতকাল সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্বাস্থ্য খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান জাতীয় অধ্যাপক ডা. একে আজাদ খান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেনসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ।

প্রস্তাবিত সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে পৃথক বেতন কাঠামো, দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ ভাতা, বেসরকারি খাতে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ এবং কর্মদক্ষতা, রোগীর সন্তুষ্টি ও সেবার মানের ভিত্তিতে বোনাস বা প্রণোদনা প্রদান।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বলেন, “চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা না হলে স্বাস্থ্য খাতের সংকট অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ প্রয়োজন।”

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতের এই দীর্ঘমেয়াদি বেতন সংকট শুধু কর্মীদের উদ্বেগই বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মান ও সেবার স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে।

বাজেট ও স্বাস্থ্যখাত নিয়ে দ্বন্দ্বে, ‘শাটডাউন’ এর মুখে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্যের কারণে বুধবার থেকে সরকারি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই শাটডাউনের ফলে দীর্ঘ ও জটিল অচলাবস্থা শুরু হয়েছে, যা দেশজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফেডারেল কর্মীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

১৯৮১ সালের পর এটি মার্কিন সরকারের ১৫তম শাটডাউন। সরকারি সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বেতন না পাওয়ার কারণে ফেডারেল কর্মীদের জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। সামরিক বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী এবং জরুরি সেবায় নিযুক্ত কর্মীরা কাজ চালিয়ে গেলেও শাটডাউনের অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বেতন পাবেন না।

অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক। শাটডাউনের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। এছাড়াও সেপ্টেম্বরের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশ স্থগিত থাকবে, বিমান চলাচল ধীর হবে, এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ হবে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ায় ওয়াল স্ট্রিটে ফিউচার চুক্তির দাম কমেছে। স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং ডলারের মান এক সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

সিনেটে স্বল্পমেয়াদী অর্থায়ন বিল প্রত্যাখ্যান হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শাটডাউন কার্যকর হয়। এই বিলটি ২১ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ দিত। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু স্বাস্থ্যখাত। ডেমোক্র্যাটরা চান বাজেট পাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’-এর ভর্তুকি স্থায়ীভাবে নিশ্চিত হোক। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা মনে করেন, এ বিষয়টি বাজেট থেকে আলাদা আলোচনা হওয়া উচিত।

মার্কিন সরকারের মোট ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার এখন অচলাবস্থার মুখে।বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই শাটডাউন অতীতের বাজেট-সংক্রান্ত অচলাবস্থার তুলনায় দীর্ঘ হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা সরকারি কর্মসূচিতে কাটছাঁট এবং স্থায়ী ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়েছেন।

ডেমোক্র্যাটিক সিনেট নেতা চাক শুমার রিপাবলিকানদের ‘জোর খাটানোর’ চেষ্টার সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, ‘তারা সফল হবে না।’ অন্যদিকে সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুন এই অচলাবস্থার পেছনে কোনো বাস্তবিক কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক রবার্ট পেপ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাজনৈতিক মেরুকরণের এই পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের জন্যই সমঝোতায় আসা কঠিন হবে।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৫ দিন ধরে চলা শাটডাউন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম।