প্রথমবারের মতো ৫০০০ আলোকবর্ষ দূরে মিল্কিওয়েতে কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত

মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও ভয়ানক বস্তু হলো কৃষ্ণগহ্বর বা Black Hole। এদের তীব্র মহাকর্ষের টান এতটাই প্রবল যে আলোও এর থেকে পালাতে পারে না, তাই এদের সরাসরি দেখা অসম্ভব। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে কয়েক কোটি নাক্ষত্রিক ভরের কৃষ্ণগহ্বর আছে বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু এদের অধিকাংশই নিঃসঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়, কোনো নক্ষত্রের সঙ্গে জোড়বদ্ধ হয় না।

এতদিন পর্যন্ত এই একাকী নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর-এর অস্তিত্ব শুধুমাত্র তাত্ত্বিকভাবেই প্রমাণিত ছিল। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এমন একটি নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বরের সরাসরি প্রমাণ নিশ্চিত করেছেন, যা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

স্যাজিটারিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই রহস্যময় বস্তুটি OGLE-2011-BLG-0462 নামে পরিচিত। এটিই প্রথম কৃষ্ণগহ্বর, যা কোনো সঙ্গী নক্ষত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া ছাড়াই তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে। এই আবিষ্কার আমাদের ছায়াপথের গঠন, বিবর্তন এবং কোটি কোটি অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বরের সংখ্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

কৃষ্ণগহ্বরকে শনাক্ত করা হয় যখন তারা কোনো কাছাকাছি নক্ষত্র থেকে গ্যাস শোষণ করে, যার ফলে প্রচণ্ড উজ্জ্বল এক্স-রে বিকিরণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু OGLE-2011-BLG-0462 একাকী হওয়ায়, এই ধরনের কোনো বিকিরণ এটি নির্গত করে না, তাই একে খুঁজে পাওয়া ছিল এক অসাধ্য সাধন। এই কৃষ্ণগহ্বরটিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং (Gravitational Microlensing) নামক এক বিরল জ্যোতির্বিজ্ঞানগত ঘটনার মাধ্যমে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো অত্যন্ত ভারী বস্তু—যেমন একটি কৃষ্ণগহ্বর তার কাছাকাছি দিয়ে অতিক্রম করা আলোর পথকে বাঁকিয়ে দেয়। এই বক্রতা একটি প্রাকৃতিক লেন্সের মতো কাজ করে, যা পিছনের দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের আলোকে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল ও বিকৃত করে তোলে।

২০১১ সালে ওজিএলই সমীক্ষা চলাকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম এই ঘটনার ইঙ্গিত পান। যখন OGLE-2011-BLG-0462 নামের এই কৃষ্ণগহ্বরটি একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে নক্ষত্রটির আলো মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাটিকে একটি কৃষ্ণগহ্বর প্রার্থীর সংকেত হিসেবে দেখা হলেও এর ভর এবং প্রকৃতি নিশ্চিত করতে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন ছিল। মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং-এর কারণে আলোর বক্রতার দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন (অ্যাস্ট্রোমেট্রিক ডিফ্লেকশন) বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এর ভর ও দূরত্ব পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে মজবুত করেছে।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর গাইয়া মিশন (Gaia mission) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা এই বস্তুটির বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করেন।দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত গবেষণাটি এই নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বরটির মূল পরিচয় তুলে ধরেছে।

এটি আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় সাত গুণ। এই ভর এটিকে নিশ্চিতভাবেই একটি নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা কোনো বিশালাকার নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর ধসে পড়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এই ভর পরিসীমা এটিকে শ্বেত বামন বা নিউট্রন স্টার থেকে আলাদা করে।

কৃষ্ণগহ্বরটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী দূরত্ব এটিকে ছায়াপথের এই ধরনের বস্তুদের পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আদর্শ লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।

এই আবিষ্কারটি জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় একটি বিশাল মাইলফলক। এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম সরাসরি নিশ্চিতকরণই নয়, বরং ছায়াপথে লুকিয়ে থাকা এই ধরনের আরও কোটি কোটি বস্তুর একটি নমুনা হিসেবেও কাজ করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুমান করে আসছিলেন যে আমাদের মিল্কিওয়েতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন নাক্ষত্রিক-ভর কৃষ্ণগহ্বর থাকতে পারে। তবে এগুলির বেশিরভাগই নিঃসঙ্গ এবং অদৃশ্য হওয়ায়, তাদের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। OGLE-2011-BLG-0462-এর আবিষ্কার তাত্ত্বিক এই মডেলগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে এবং ছায়াপথের মোট কৃষ্ণগহ্বর সংখ্যার একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি করে।

বিচ্ছিন্ন কৃষ্ণগহ্বরগুলোর গতি এবং জন্মস্থান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন বিশালাকার নক্ষত্রগুলো যখন তাদের জীবনচক্রের শেষে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়, তখন তারা কীভাবে মহাকাশে নিক্ষেপিত হয় । এই অধ্যয়ন নাক্ষত্রিক বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ এবং কৃষ্ণগহ্বর গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেবে।

এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করেছে। নাসা’র ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ, এই ধরনের অদৃশ্য বস্তুদের খুঁজে বের করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।

রোমান টেলিস্কোপের সুবিশাল Field-of-View এবং উন্নত রেজোলিউশন মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং ইভেন্ট পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই নতুন শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করে তারা OGLE-2011-BLG-0462-এর মতো আরও শত শত নিঃসঙ্গ কৃষ্ণগহ্বর শনাক্ত করতে পারবেন, যা আমাদের গ্যালাক্সির অন্ধকার, বিচরণকারী এই মহাজাগতিক দৈত্যদের একটি বিশদ মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন