মানুষের কল্পনার সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখানেই শুরু হয় সময়ের প্রকৃত গভীরতা। হাজার বছর নয়, লক্ষ বা কোটি বছর ধরে চলমান ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, কিংবা গ্যালাক্সির আলো এসবের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন সময়বোধের কোনো মিল নেই। মানুষ মাত্র একশ বছরও টিকে না, অথচ পৃথিবী ও মহাবিশ্ব চলেছে বিলিয়ন বছর ধরে। এই গভীর সময় বা Deep Time—এর ধারণা তাই অনেকের কাছেই প্রায় অচিন্তনীয়।
এই দুর্বোধ্যতাকে মূর্ত ও অনুভবযোগ্য করে তোলার এক অসাধারণ প্রয়াস চালিয়েছেন হিউস্টনের আলোকচিত্রী ও শিক্ষক মার্ক চেন । তাঁর চলমান প্রকল্প, “পিলগ্রিমেজ অফ লাইট” (Pilgrimage of Light), মহাবিশ্বের দূরতম নক্ষত্রপুঞ্জের আলোক-বর্ষের দূরত্বকে পৃথিবীর সুপ্রাচীন ভূ-প্রকৃতির ভূতাত্ত্বিক বয়সের সাথে মিলিয়ে এক অনুপম শিল্প ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
মার্ক চেন, ২০২২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যানসহ নানা বন্য অঞ্চলে রাতের বেলা ভ্রমণ করছেন। তাঁর প্রধান সরঞ্জাম হলো একটি কাস্টম-মেড প্রজেক্টর, যার মাধ্যমে তিনি নাসা (NASA)-র সংগৃহীত নক্ষত্রপুঞ্জের ছবিগুলিকে পৃথিবীর আইকনিক প্রাকৃতিক কাঠামোর উপর স্বল্প সময়ের জন্য প্রক্ষেপণ করেন। এই প্রকল্পটির মূল ধারণাটি খুবই সরল কিন্তু গভীর, প্রতিটি ছবিতে পৃথিবীস্থ স্থানের বয়স (কোটি বা মিলিয়ন বছর) মহাকাশীয় বস্তুর দূরত্ব (আলোক-বর্ষ) এর প্রায় সমান।
এক আলোক-বর্ষ হলো সেই দূরত্ব, যা আলো এক বছরে অতিক্রম করে। এর অর্থ হলো আমরা যখন একটি নির্দিষ্ট আলোক-বর্ষ দূরের নক্ষত্রের দিকে তাকাই, তখন আমরা আসলে তার অতীতকে দেখছি। যদি একটি নক্ষত্র ২০ মিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরে থাকে, তবে আমরা তার ২০ মিলিয়ন বছর আগের আলো দেখছি, অর্থাৎ সেই আলো ২০ মিলিয়ন বছর ধরে যাত্রা করে আমাদের চোখে পৌঁছাচ্ছে। মার্ক চেন ঠিক এই দূরত্বের সাথে পৃথিবীর সেইসব স্থানের বয়স মিলিয়ে দিয়েছেন, যা ২০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল। এই যুগলবন্দী একটি বৈপ্লবিক ধারণা তৈরি করে, আমাদের গ্রহটি কীভাবে মহাবিশ্বের সঙ্গে সহাবস্থান করেছে, তা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
মার্ক চেনের কাজটির গভীরতা বুঝতে হলে তাঁর কিছু প্রধান শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করা জরুরি। Carlsbad Caverns হলো তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজের পটভূমি। প্রায় ২০ মিলিয়ন বছর আগে, ভূ-অভ্যন্তরীণ চাপের ফলে এখানকার সুবিশাল চুনাপাথরের কাঠামো গঠিত হয়েছিল। এই গুহার অভ্যন্তরে তিনি প্রক্ষেপণ করেছেন পিনহুইল ছায়াপথের (Pinwheel galaxy) সর্পিল বাহুগুলির চিত্র। এই ছায়াপথটি পৃথিবী থেকে ২২.৩ মিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরে অবস্থিত।
এখানে ২০ মিলিয়ন বছর ধরে তৈরি হওয়া গুহার স্থায়িত্বের সঙ্গে ২২.৩ মিলিয়ন বছর ধরে ভ্রমণরত আলোর এক অদ্ভুত সমন্বয় দেখা যায়। গুহাটি ২০ মিলিয়ন বছরের নীরবতা ও স্থিরতার প্রতীক, আর ছায়াপথের আলো হলো সেই ২০ মিলিয়ন বছরের নিরন্তর মহাজাগতিক গতির প্রমাণ। এই তুলনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যখন এই গুহার পাথরগুলি গঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে সেই সুদূর গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীর দিকে যাত্রা শুরু করেছিল।
মার্ক চেনের আর একটি চমকপ্রদ কাজ হলো Yosemite Valley। সেখানকার বিখ্যাত ক্লিফ হাফ ডোম একাধিক বরফ যুগের মাধ্যমে সৃষ্ট হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে তৈরি হয়েছে, যার শেষটি ঘটেছিল প্রায় ৩০,০০০ বছর আগে। হাফ ডোমের পাদদেশের গাছগুলিতে তিনি প্রক্ষেপণ করেছেন পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮,০০০ আলোক-বর্ষ দূরের একটি নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি।
যদিও এখানে দূরত্বের সাথে বয়সের একটি সামান্য পার্থক্য রয়েছে, তবে উভয়ের কালক্রমিক নৈকট্য উল্লেখযোগ্য। এই ছবিটি যেন বরফ যুগের প্রচণ্ড শক্তি আর মহাজাগতিক নক্ষত্রের এক ঝলমলে সভার মাঝে মানব ইতিহাসের মাত্র কয়েক হাজার বছরের অবস্থানকে তুলে ধরেছে। এটি আমাদের দেখায় যে যখন শেষ বরফ যুগ শেষ হচ্ছিল, তখনো সেই দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো তার যাত্রা শেষ করেনি।
মার্ক চেন ব্রাইস ক্যানিয়নকে বেছে নিয়েছেন যার শুষ্ক হ্রদের তলদেশে থাকা পলি প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এই ক্যানিয়নটির উপর প্রক্ষেপিত হয়েছে সোমব্রেরো ছায়াপথ (Sombrero galaxy), যা M104 নামেও পরিচিত। এই গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো যখন হাবল টেলিস্কোপে ধরা পড়ে, তখন তা প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী থেকে নির্গত হয়েছিল।
এই ক্যানিয়ন ও গ্যালাক্সির যুগলবন্দীটি মহাকালের একটি শক্তিশালী প্রতীক। যখন ব্রাইস ক্যানিয়নের শুষ্ক পলি থেকে বর্তমানের হুডু নামক অদ্ভুত শিলাস্তম্ভগুলি তৈরি হচ্ছিল, তখন সেই ৩০ মিলিয়ন বছর আগের গ্যালাক্সির আলো আমাদের দিকে আসছিল। এই মিল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের গতি মহাজাগতিক গতিধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।
মার্ক চেনের সবচেয়ে মানবিক সংযোগ স্থাপনকারী কাজটি হলো Grand Canyon। এখানকার সাউথ রিমের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিলেজের আলোতে তিনি এনজিসি ৩৩২৪ (NGC 3324) নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি তুলে ধরেন। এই নক্ষত্রপুঞ্জটির দূরত্ব প্রায় ৯,২৬০ আলোক-বর্ষ।
এই দূরত্বকে তিনি তুলনা করেছেন সেই সময়ের সাথে, যখন মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন শুরু করে। যদিও মানব বসতির সূচনা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে, কিন্তু এই সময়কালটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী ও সুসংগঠিত জীবনযাত্রার সূচনাকে নির্দেশ করে। প্রায় ৯-১০ হাজার বছর হলো সেই সময়, যখন শিকারি-সংগ্রাহক জীবন ছেড়ে মানুষ কৃষিকাজ ও স্থায়ী বসতি স্থাপন শুরু করে। এই ছবিটি আমাদের অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ীত্বকে তুলে ধরে: মহাজাগতিক স্কেলে আমরা, মানুষ, যেন এক মুহূর্তের জন্য সেখানে উপস্থিত।
মার্ক চেনের “পিলগ্রিমেজ অফ লাইট” প্রকল্পটি শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির একটি কাজ নয়; এটি বিজ্ঞান, শিল্প এবং দর্শনের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ। এই কাজটি সুদূর সময়ের ধারণাকে বিমূর্ততার স্তর থেকে নামিয়ে এনে একটি বোধগম্য দৃশ্যমানতায় প্রতিষ্ঠা করেছে।
এইসব ছবিতে আমাদের পায়ের নিচে থাকা পাথরগুলি কোটি কোটি বছরের স্থায়িত্বের সাক্ষ্য বহন করে, আর মাথার উপরের আলোকরশ্মিগুলিও ঠিক একই সময়ের মহাজাগতিক যাত্রার গল্প শোনায়। মানবজাতি এই মহাকালের প্রেক্ষাপটে খুবই নতুন, যেন এক ক্ষণিকের ঝলকানি। এই কাজ আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, একই সাথে আমাদের গ্রহের এই বিশাল মহাবিশ্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককেও তুলে ধরে।


