Home Blog Page 6

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্বাস, শামানিক প্রতীকবাদ কেন আজও জীবন্ত?

সাইবেরিয়া, যার বিশাল তুষারাবৃত ভূমি হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির দুর্গমতা আর রহস্যকে ধারণ করে আছে, তা কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয় এটি শামানিক সংস্কৃতি ও প্রতীকবাদের এক জীবন্ত যাদুঘর। এই সংস্কৃতিকে বোঝার অর্থ হলো মানুষের আদিমতম আধ্যাত্মিক যাত্রার এক গভীর অধ্যায়ে প্রবেশ করা, যেখানে শিল্প, ধর্ম ও জীবন অবিচ্ছেদ্য ছিল।

শামানবাদ কোনো সংগঠিত ধর্ম নয়, এটি একটি আদিম আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা সাইবেরিয়ার স্থানীয় তুঙ্গুস শব্দ ‘শামান’, যার অর্থ ‘যে জানে’ বা ‘যে উত্তাপ দেয়’, থেকে উদ্ভূত। এর মূল ভিত্তি হলো বিশ্বজগতের ত্রিমাত্রিক ধারণা, ঊর্ধ্ব জগৎ যেখানে দেব-দেবী, জ্যোতিষ্ক ও শুভ আত্মার বাসস্থান। মধ্য জগৎ যেখানে মানুষের বসতি এবং জাগতিক প্রকৃতি। আর নিম্ন জগৎ পূর্বপুরুষের আত্মা ও কিছু ক্ষেত্রে অশুভ শক্তির স্থান।

শামানের কাজ হলো এই তিনটি জগতের মধ্যে সেতু বন্ধন করা। তাঁরা বিশেষ চেতনা পরিবর্তনের অবস্থার মাধ্যমে আত্মিক জগতে প্রবেশ করেন, যা তাঁদের সমাজের নিরাময়কারী, ভবিষ্যদ্বক্তা, পশুপালক এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই বিশ্বাসের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় প্যালিওলিথিক যুগের গুহাচিত্রে, যা দেখায় শামানিক অনুশীলন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানবজাতির একটি মৌলিক অংশ।

শামানিক প্রতীকবাদের প্রধান বাহন হলো বিভিন্ন উপকরণ, যা তাদের আধ্যাত্মিক যাত্রাকে সম্ভব করে তোলে। এগুলি কেবল বস্তু নয়, এগুলি হলো রূপান্তরের শক্তি ধারণকারী আধ্যাত্মিক কোড।

শামানের ঢোল হলো তাঁর প্রধান উপকরণ এবং এটি বিশ্বজগতের প্রতীক। ঢোলের গোল আকারটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে নির্দেশ করে এবং এর কেন্দ্রে আঁকা ছবিগুলি শামানের ভ্রমণপথ ও আত্মিক সহায়কদের চিত্রিত করে। এই ঢোলটিকে প্রায়শই শামানের ঘোড়া বা রেইনডিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়, যা তাঁকে এক জগৎ থেকে অন্য জগতে দ্রুত নিয়ে যায়।

শামানের পোষাক আত্মার জগতে গ্রহণযোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতীক। এটি প্রায়শই বিভিন্ন প্রাণীর পালক, হাড় বা ধাতব টুকরা দ্বারা সজ্জিত থাকে, যা তাঁকে সেই প্রাণীর শক্তি ও ক্ষমতা প্রদান করে।

সাইবেরিয়ার শামানিক প্রতীকবাদে প্রাণীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেবল প্রাণী নয়, তারা হলো আত্মিক গাইড বা টোটেম। ঈগল বা পেঁচা ঊর্ধ্ব জগতের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতীক। এটি প্রায়শই শামানের পোশাক বা ঢোলে আঁকা হয়, যা আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বোঝায়।ভালুক শক্তি, নিরাময় এবং প্রজ্ঞার প্রতীক। অনেক সাইবেরীয় গোষ্ঠীর কাছে ভালুক একটি পবিত্র টোটেম। হরিণ বা রেইনডিয়ার গতি, পুনর্জন্ম এবং আত্মার জগতের পথপ্রদর্শকের প্রতীক। এই প্রাণীগুলি শামানের জন্য সহায়ক আত্মা হিসেবে কাজ করে।

সাইবেরিয়ার শামানিক প্রতীকবাদের শিল্পকলা প্রাচীনকাল থেকেই শিলালিপি, ক্ষুদ্র ভাস্কর্য এবং ধাতব অলঙ্কারে প্রকাশিত হয়েছে। এই শিল্প কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক শক্তিকে দৃশ্যমান করে তোলা।

আংগারা এবং ইয়েনিসে নদীর তীরে প্রাপ্ত প্রাচীন শিলালিপিগুলিতে শামানিক দৃশ্য দেখা যায়। এই খোদাই করা চিত্রগুলিতে প্রায়শই দেখা যায়:
আন্তঃরূপান্তরের চিত্র রূপে মানুষ ও প্রাণীর সংমিশ্রিত রূপ, যা শামানের তাঁর আত্মিক ভ্রমণে রূপান্তরের ক্ষমতাকে তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ মাথার শিংযুক্ত মানবাকৃতির চিত্র।

আত্মা ও দেব-দেবীর প্রতীকে সরল জ্যামিতিক আকার বা প্রতীকী মানবাকৃতি আত্মার উপস্থিতি নির্দেশ করে।

এই শৈল্পিক প্রকাশগুলি প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ বছর পুরনো। এগুলি কেবল ইতিহাসের নথি নয়, এগুলি সেই সময়ের মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

পরবর্তীকালে ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগে এই প্রতীকবাদ ধাতুশিল্পে প্রবেশ করে। শামানের পোশাকের অলঙ্কার, পূজার বস্তু এবং সমাধিতে প্রাপ্ত শিল্পকর্মগুলি অত্যন্ত প্রতীকী। ‘প্যাজরিক সংস্কৃতি’র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এমন সূক্ষ্ম কাঠের ও ধাতব কারুকার্য পাওয়া যায়, যেখানে কাল্পনিক প্রাণী এবং জটিল জ্যামিতিক বিন্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা শামানিক মহাজাগতিক ধারণাগুলিরই শৈল্পিক প্রতিফলন।

সাইবেরিয়ার শামানিক প্রতীকবাদ কেবল একটি সাংস্কৃতিক অতীত নয়, এটি মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রতীকবাদ প্রমাণ করে প্রাগৈতিহাসিক যুগেও মানুষ তাদের পরিবেশের সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। শামানিক শিল্পকলা জাগতিক সৌন্দর্য বা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ছিল না, তা ছিল আত্মার পথের মানচিত্র।

এই প্রতীকগুলির ধারাবাহিকতা সাইবেরিয়ার সংস্কৃতিতে স্থিতিস্থাপকতা এবং গভীর ঐতিহাসিক শিকড়-এর প্রমাণ দেয়। আধুনিক যুগেও শামানবাদ বিভিন্ন দমন-পীড়নের শিকার হলেও এই প্রতীকগুলি এখনও সাইবেরিয়ার মানুষ, শিল্পী ও গবেষকদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। ‘প্রাগৈতিহাসিক আত্মার শিল্প’ হিসাবে, এটি কেবল অতীতের প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি সেই আদিম চেতনা, যা আজও আমাদের বিশ্বকে বুঝতে ও প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে উৎসাহিত করে।

চলতি বছরে ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত

দেশজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৬৮৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। এ নিয়ে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১৫।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৯৫ জন পুরুষ এবং ২৮৭ জন নারী। সর্বাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় যে তিনজন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে দুজন ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। অপর একজনের মৃত্যু হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক এবং তা আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও খারাপ হতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার মনে করেন, এ বছর প্রলম্বিত বর্ষা মৌসুম এবং সাম্প্রতিক সরকারি ছুটির সময় মশক নিধন কার্যক্রমে শিথিলতা ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, “প্রলম্বিত বর্ষার কারণে এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা অনুমান করছি, আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।”

পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ২০০০ সালে দেশে যখন নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন তা মূলত ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সব অঞ্চলে। চলতি বছর ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৪৯ জন, আর ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৪০ জন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সেপ্টেম্বরে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখনই জনস্বাস্থ্যবিদদের একাংশ সতর্ক করেছিলেন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। বাস্তব চিত্রেও সেই আশঙ্কা সত্যি হতে শুরু করেছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই দেশে একদিনে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ২১ সেপ্টেম্বরের মৃত্যুর সংখ্যার সমান।

বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনেক ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শহরাঞ্চলে পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, ফুলের টবসহ যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, সেখানে মশার প্রজনন রোধে তদারকি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সংকট নয়, এটি পরিণত হচ্ছে সারাবছরব্যাপী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ঘাটতি এবং জনগণের অসচেতনতা দূর না হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ইসরায়েলকে যেসব শর্ত দিল হামাস

মিসরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা দ্বিতীয় দিনের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিসরের পর্যটন শহর শারম-আল-শেখে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে হামাসের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইসরায়েলের কাছ থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা চায়।

এই আলোচনার মূল কাঠামো গঠিত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস গাজায় থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দিলে ইসরায়েল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। তবে হামাসের অভিযোগ, পরিকল্পনায় সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি ও প্রক্রিয়া অস্পষ্ট রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবারের এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় গাজা যুদ্ধে দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে। ওইদিন ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “গাজা ইস্যুতে একটি চুক্তি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।” ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই শারম-আল-শেখে হামাস ও ইসরায়েলের আলোচকরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় বসেন। আজও মিসরে আলোচনা চলবে, যেখানে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

হামাসের শীর্ষ নেতা ফাওজি বারহুম জানিয়েছেন, তাঁদের আলোচকরা যুদ্ধের অবসান চান এবং গাজা থেকে দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারই তাঁদের প্রধান শর্ত। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সমাধান চাই যা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে এবং ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে শেষ ইসরায়েলি সৈন্যও সরে যাবে।”

তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্দিষ্ট করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, হামাস যখন তাদের হাতে থাকা ৪৮ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে, তখনই সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই জিম্মিদের মধ্যে প্রায় ২০ জন এখনো জীবিত আছেন।

হামাসের আরেক নেতা খলিল আল-হায়া মিসরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-কাহেরা নিউজ-কে বলেন, “আমরা দখলদার বাহিনীকে এক সেকেন্ডের জন্যও বিশ্বাস করি না। আমরা চাই যুদ্ধের অবসান ঘটুক, তবে এমন নিশ্চয়তা দরকার যাতে এই যুদ্ধ আর কখনো পুনরায় শুরু না হয়।”

একই সঙ্গে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সমন্বিত জোট এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা “সব উপায়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে” এবং “ফিলিস্তিনি জনগণের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।” এই বিবৃতির মাধ্যমে তারা সরাসরি ট্রাম্পের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হামাসের অস্ত্র সমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে আলোচনা চলার মধ্যেও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা-র তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার ট্রাম্প ইসরায়েলকে বোমা হামলা বন্ধের আহ্বান জানানোর পরও হামলা অব্যাহত আছে। ওই সময় থেকে গতকাল পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

হামাসের নেতারা বলছেন, যুদ্ধবিরতির কোনো আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের লিখিত নিশ্চয়তা দেবে এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করবে। অন্যথায়, তারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন।

ক্ষমতা কীভাবে স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করে? ফুকো, হবস ও অ্যারিস্টটলের দার্শনিক বিচার

ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই দর্শন, রাজনীতি এবং সমাজের মূল আলোচ্য বিষয়। এই দুটি ধারণা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত— কখনও সাংঘর্ষিক, কখনও পরিপূরক। মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে বাস করি, আর এই কাঠামোর নিরিখেই নির্ধারিত হয় আমাদের স্বাধীনতার পরিসর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিকারের স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়? এবং ক্ষমতা কীভাবে সেই স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত বা সীমিত করে?

সাধারণভাবে ক্ষমতাকে স্বাধীনতার বিপরীত মনে করা হয়। যদি কেউ ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তবে অন্যজনের স্বাধীনতা খর্ব হয়। একটি সরকার যখন জনগণের উপর আইন প্রয়োগ করে, তখন জনগণের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা সীমিত হয়। কিন্তু এই সরলীকরণ ক্ষমতা ও স্বাধীনতার গভীর সম্পর্কটিকে এড়িয়ে যায়।

প্রাচীনকাল থেকেই দার্শনিকেরা ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে ভেবেছেন। অ্যারিস্টটল ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।তাঁর মতে, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী এবং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা সমাজে বসবাস করেই সে তার পূর্ণ মানবীয় সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের আইন ও ক্ষমতা নাগরিকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, যা আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীনতা খর্ব মনে হলেও, অ্যারিস্টটলের কাছে এটি বৃহত্তর স্বাধীনতার ভিত্তি। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নাগরিকদের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি দেয়, যার ফলে তারা ভালো জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ পায়। তাই এখানে ক্ষমতা স্বাধীনতার রক্ষক ও ধারক।

অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপনকারী দার্শনিক টমাস হবস ক্ষমতার অন্য এক দিক তুলে ধরেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লেভিয়াথান-এ তিনি দেখান প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষের স্বাধীনতা ছিল নিরঙ্কুশ—প্রত্যেকেই সবকিছুর উপর অধিকার রাখত। কিন্তু এই সব পাওয়ার স্বাধীনতা আসলে ছিল এক সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ অবস্থা, যেখানে জীবন ছিল “একাকী, জঘন্য, ঘৃণ্য, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী।” এই বিশৃঙ্খল স্বাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের সমস্ত স্বাধীনতা এক সার্বভৌম শক্তির হাতে তুলে দেয়, যাকে হবস ‘লেভিয়াথান’ বা সার্বভৌম রাষ্ট্র নামে অভিহিত করেন। হবসের মতে, এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয় বলেই মানুষ বেঁচে থাকার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার মৌলিক স্বাধীনতা পায়। এখানে বিনিময়ে ব্যক্তি তার অনেক অধিকার হারালেও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

বিশ শতকের প্রভাবশালী দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের বা শাসকের হাতে থাকা কোনো বস্তু বা সম্পত্তি হিসেবে দেখেননি, যা উপর থেকে প্রয়োগ করা হয়। বরং ফুকোর কাছে ক্ষমতা হলো এক সম্পর্ক জাল যা সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মুহূর্তে কাজ করে।

ক্ষমতা আমাদের জ্ঞান, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সত্যকে তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারাগার বা এমনকি বিজ্ঞানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি নির্দিষ্ট জ্ঞান তৈরি করে এবং এর মাধ্যমে আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো একে ‘ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার’ বা শৃঙ্খলা স্থাপনকারী ক্ষমতা বলেন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বাধীনতা আর ক্ষমতার বাইরের কোনো অবস্থা নয়। মানুষ সর্বদাই কোনো না কোনো ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে থাকে। যখন আমরা নিজেকে স্বাধীন মনে করি, তখন আমরা হয়তো কেবল সেই ক্ষমতা জালের অধীনে কাজ করছি, যা আমাদের এই স্বাধীনতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। ফুকোর কাছে, সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো সেই ক্ষমতা জালকে চিহ্নিত করা এবং তার সাথে লড়াই করা, যা তিনি ‘প্রতিরোধ’ বলে আখ্যায়িত করেন। যেহেতু ক্ষমতা সর্বত্র, প্রতিরোধও সর্বত্র। স্বাধীনতা হলো এই চলমান প্রতিরোধের প্রক্রিয়া।

ফুকো, অ্যারিস্টটল ও হবসের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, স্বাধীনতার ধারণাটি একক বা স্থির নয়। অ্যারিস্টটল এর মতে, স্বাধীনতা হলো সমাজে থেকে নৈতিক ও সৎ জীবন যাপন করার ক্ষমতা। ক্ষমতা এখানে শৃঙ্খলা ও মঙ্গলের পরিবেশ তৈরি করে। হবস এর মতে, স্বাধীনতা হলো নিরাপত্তা ও জীবনধারণের অধিকার। ক্ষমতা বিশৃঙ্খল প্রাকৃতিক স্বাধীনতা থেকে মুক্তি দেয়। ফুকো’র মতে, স্বাধীনতা হলো সর্বব্যাপী ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ। এটি ক্ষমতা-সম্পর্কের বাইরে কোনো অবস্থা নয়, বরং সেই সম্পর্কের ভেতরেই একটি ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া।

তাহলে মানুষ কতটা স্বাধীন?

বাস্তবে মানুষের স্বাধীনতা আপেক্ষিক ও শর্তসাপেক্ষ। কেউ যদি মনে করে, সে সমাজের কোনো নিয়ম মানবে না বা কোনো ক্ষমতার অধীন থাকবে না, তবে তাকে হয় সমাজের বাইরে চলে যেতে হবে, অথবা চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, পছন্দ বা আকাঙ্ক্ষা সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার অলক্ষ্য জালের দ্বারা প্রভাবিত।

সত্যিকারের স্বাধীনতা সম্ভবত কোনো নিরঙ্কুশ অবস্থা নয়, একটি সচেতন প্রক্রিয়া। এটি হলো যেসব ক্ষমতা কাঠামো আমাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করছে, সেগুলোকে বুঝতে পারা। নিজেকে সেই কাঠামোগুলির দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা। অ্যারিস্টটলের মতো করে বৃহত্তর সামাজিক মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রাখা।

আমরা তখনই সবচেয়ে বেশি স্বাধীন, যখন আমরা বুঝতে পারি আমরা পুরোপুরি স্বাধীন নই। এই জ্ঞানই আমাদের নিজেদের উপর, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ক্রিয়াশীল ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার এবং প্রতিরোধের শক্তি যোগায়। ক্ষমতা ও স্বাধীনতার মধ্যে সম্পর্ক তাই কোনো স্থির সমীকরণ নয়, বরং মানব অস্তিত্বের এক গতিশীল দ্বন্দ্ব, যা আমাদের প্রতিনিয়ত এক উন্নত ও মানবিক সমাজের দিকে চালিত করে।

সেপ্টেম্বরে রপ্তানি কমেছে, গার্মেন্টস শিল্পে বড় প্রভাবের আশঙ্কা

চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩,৬২৭.৫৮ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩,৮০২.৮৭ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৪.৬১ শতাংশ।

ইপিবি জানিয়েছে, দেশের মোট রপ্তানি আয় কমার প্রধান কারণ হলো তৈরি পোশাক খাতে পতন। দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে সেপ্টেম্বরে নিট পোশাক রপ্তানি ৫.৭৫ শতাংশ এবং বোনা পোশাক রপ্তানি ৫.৫৪ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিকারকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের প্রভাবই পতনের কারণ।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পোশাক অর্ডার বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অর্ডার কমেছে। উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয় কমে গেছে, ফলে পোশাকের চাহিদা কমছে।” তিনি আরও বলেন, সাধারণত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর তৈরি পোশাক খাতের জন্য মন্দা মৌসুম হলেও, এই পর্যায়ে এতটা পতন প্রত্যাশিত ছিল না।

সেপ্টেম্বরে রপ্তানি কমলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট রপ্তানি ৫.৫৬ শতাংশ বেড়ে ১১.৬৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি নির্দেশ করে, সামগ্রিকভাবে দেশের রপ্তানি পরিস্থিতি এখনও কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও মার্কিন শুল্ক এবং তৈরি পোশাক খাতের পতন আগামী মাসগুলোতে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

রপ্তানিতে এই ধরণের পতন নীতিগত সমন্বয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান ক্রেতা দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুল্ক ও ভোক্তাচাহিদে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বাংলাদেশি রপ্তানিকারীদের নতুন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

অ্যান্টার্কটিকার বরফের আড়ালে লুকানো পৃথিবীর বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি

আমরা সাধারণত অ্যান্টার্কটিকাকে শীতল এবং জীবহীন মহাদেশ হিসেবে চিনে থাকি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিশাল বরফময় মহাদেশের নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরি। স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৩৮টি আগ্নেয়গিরি আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মধ্যে ৯১টি আগের জানা ছিল না। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনভাবে বিস্তৃত আগ্নেয়গিরি অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এই আগ্নেয়গিরিগুলো মূলত পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার নিচে কেন্দ্রীভূত, যেখানে বরফের স্তর স্থিতিশীল হলেও তার নিচের শিলা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অনেক গভীরে অবস্থিত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই গোপন আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে কিছু প্রায় ১৩,০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছায়, যা ইউরোপের আলপাইন পর্বতমালার সমান। অথচ এই বিশাল আগ্নেয়গিরিগুলো সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢেকে রয়েছে, তাই সাধারণ নজরে একেবারেই অদৃশ্য।

গবেষকরা এই আগ্নেয়গিরিগুলো চিহ্নিত করতে ব্যবহার করেছেন আইস-পেনেট্রেটিং রাডার, স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং বিশদ ভৌগোলিক মানচিত্র। এই প্রযুক্তির সংমিশ্রণে বোঝা গেছে, এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গতিশীলতা আগুনের মতো গভীর শক্তির সঙ্গে যুক্ত, যা বরফের স্তরকে প্রভাবিত করতে পারে। অ্যান্টার্কটিকার বরফক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে এই আগ্নেয়গিরিগুলো কি সক্রিয়? প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, বেশিরভাগ আগ্নেয়গিরি স্থিতিশীল বা শীতল অবস্থায় আছে। কিন্তু স্থিতিশীল শব্দটি সম্পূর্ণ নিশ্চয়তার প্রতীক নয়। আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট তাপ বরফের স্তরকে দুর্বল করতে পারে। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরেই এমন তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘটলে বরফ দ্রুত গলে যেতে পারে। এ অঞ্চলের বরফের নিচে থাকা পানি সমুদ্রপৃষ্ঠকে প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত উঁচু করতে পারে। এমন একটি পরিস্থিতি কোস্টাল শহর ও সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে থাকা অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক।

এই তথ্যের গুরুত্ব আরও বাড়ে যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি বিবেচনা করি। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বরফ গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অ্যান্টার্কটিকার নিচে লুকানো আগ্নেয়গিরির তাপ একটি অজানা ভয়ঙ্কর শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বরফের নিচের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও বরফের উপরের স্তর দুর্বল হয়ে দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। এটি শুধু স্থানীয় নয়, বিশ্বের বহু দেশের তটবর্তী অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক।

গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার এই আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে মূলত ছোট এবং মাঝারি আকারের আগ্নেয়গিরি বেশি। এই অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত জটিল। বরফের নীচে শিলা, আগ্নেয়গিরি খোলার গঠন এবং জলবায়ুর প্রভাব একত্রে বরফের গতিশীলতা নির্ধারণ করে। শুধু তাপই নয়, বরফ ও আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপ একসাথে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলে।

অ্যান্টার্কটিকার এই আবিষ্কৃত আগ্নেয়গিরি ব্যবস্থা আমাদের জন্য এক ধরণের সতর্কবার্তা। আমরা বরফময় মহাদেশটিকে স্থিতিশীল ও নিরাপদ ধরে নিই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর নিচে রয়েছে এমন শক্তি, যা পৃথিবীর জলবায়ুকে দ্রুত পরিবর্তন করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অঞ্চল সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন করা এখন সময়োপযোগী। যদি আমরা আগ্রহী না হই, তবে বরফের গলনের হার, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি পূর্বানুমান করা কঠিন হবে।

অ্যান্টার্কটিকা এখন শুধুই একটি বরফময় মহাদেশ নয়। এটি একটি ভূতাত্ত্বিকভাবে জীবন্ত মহাদেশ, যার নিচে আগ্নেয়গিরির জটিল নেটওয়ার্ক লুকিয়ে আছে। এই অদৃশ্য শক্তি পৃথিবীর জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশ্চর্যবোধ করছে, এই আগ্নেয়গিরির তাপ এবং গঠন কিভাবে বরফের গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।

সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে গণভোট একই সঙ্গে হতে পারে : সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে আয়োজিত হলে সময় সাশ্রয় হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ও রোধ করা যাবে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাগরিক যুব ঐক্য আয়োজিত আলোচনায় তিনি এই মন্তব্য করেন।

আলোচনায় সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যে, অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দায়িত্ব দেওয়া উচিত যাতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তিনি বলেন, “দুটি ব্যালট দিলে জাতি বিভ্রান্ত হবে এমন কথা বলা হচ্ছে। অথচ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনটি ব্যালটে ভোট হয়। সুতরাং জনগণ দুটি ব্যালটে সংসদ ও গণভোটে অংশ নিতে সক্ষম। শুধু নির্বাচন কমিশনকে প্রচারণা চালাতে হবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি মহা আয়োজন, আর গণভোটও যথেষ্ট জটিল প্রক্রিয়া। দুটি প্রক্রিয়া একই সময়ে আয়োজন করলে জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার যেকোনো প্রয়াস এড়ানো সম্ভব হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “যারা বিষয়টি জটিল করার চেষ্টা করছেন, তাদের সুবুদ্ধি উদয় হোক।”

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তিকর প্রচারণা যেমন—সুবহে সাদিকে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর মিছিলের ছবি বা দিল্লি ও ফ্রান্স থেকে পাঠানো বার্তা, এগুলো জনগণ পাত্তা দেয় না। তিনি জোর দেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য অটুট রাখলে নির্বাচন নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হবে না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে ফ্যাসিস্টদের বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখতে সকল প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা আবশ্যক।

আলোচনায় তিনি সার্বিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, সময় ও সম্পদ সাশ্রয়, জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় বিএনপি নির্বাচনের যথাযথ সময়সূচি, নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।

যেভাবে আজও টিকে আছে বিশ্বের আদি অর্কেস্ট্রাল সঙ্গীত – জাপানি গাগাকু

সারা বিশ্বের সঙ্গীত ইতিহাসের পটভূমিতে, কিছু ধারা সময়ের পরীক্ষা পেরিয়ে আজও সগৌরবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। জাপানের গাগাকু (Gagaku) তেমনই একটি সঙ্গীতধারা, যা শুধু একটি শৈলী নয়, প্রায় দেড় হাজার বছরের জীবন্ত সাংস্কৃতিক নথি।

“গাগাকু” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো “মার্জিত বা আভিজাত্যপূর্ণ সঙ্গীত”। একে প্রায়শই বিশ্বের প্রাচীনতম অর্কেস্ট্রাল সঙ্গীত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী জাপানি রাজকীয় দরবারী সঙ্গীত ও নৃত্যধারা এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং শৈল্পিক জটিলতার মাধ্যমে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির গবেষক এবং সাধারণ শ্রোতা উভয়কেই গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।

গাগাকুর জন্ম কোনো একক উৎস থেকে নয়, বরং এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক অসাধারণ ফলশ্রুতি। ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে কোরিয়া, চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে আগত বাদ্যযন্ত্র ও সঙ্গীতশৈলীর সমন্বয়ে জাপানে গাগাকুর ভিত্তি স্থাপিত হয়।

তোগাকু চীনের ট্যাং রাজবংশের সময়কার) থেকে আগত সঙ্গীত। এটি গাগাকুর মূল ধারা হিসেবে বিবেচিত হয়। কোমাগাকু কোরিয়া থেকে উদ্ভূত সঙ্গীত ও নৃত্য। আর রিওবিয়াং ভারতীয় ও ভিয়েতনামি বাদ্যযন্ত্র ও সুরের প্রভাব।

এই মিশ্রণের ফলে জাপানি সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে ওঠে। হেইয়ান যুগের কিয়োটো রাজদরবার ছিল গাগাকুর স্বর্ণযুগ। এই সময়েই গাগাকুর একটি সুসংগঠিত অর্কেস্ট্রাল ফর্ম এবং আনুষ্ঠানিক পরিবেশনার কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মূলত আজকের গাগাকুর ভিত্তি।

জাপানের সাম্রাজ্যিক দরবার গাগাকুকে কঠোরভাবে সংরক্ষণ করেছে। অন্যান্য সংস্কৃতির দরবারী সঙ্গীত যেমন চীনে বিভিন্ন রাজবংশের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, কিন্তু জাপানি রাজকীয় প্রতিষ্ঠান একে প্রায় একই রূপে সংরক্ষণ করেছে। আজো টোকিওর ইম্পিরিয়াল হাউসহোল্ড এজেন্সি-এর মিউজিক ডিপার্টমেন্টের বংশানুক্রমিক শিল্পীরা এটি পরিবেশন করে থাকেন। এই ধারাবাহিকতাই গাগাকুকে ‘প্রাচীনতম’ অর্কেস্ট্রাল ধারার তকমা দিয়েছে।

গাগাকু কেবল সঙ্গীত নয়, এটি নৃত্য এবং গানের এক সামগ্রিক পরিবেশনা। এর শৈল্পিকতা প্রকাশ পায় এর বাদ্যযন্ত্রের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস ও পরিবেশনার জটিল নিয়মের মাধ্যমে।

গাগাকুর অর্কেস্ট্রা তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, বায়ু, তন্ত্রী এবং তালবাদ্য। এই তিনটি বিভাগের ভারসাম্যই গাগাকুর শান্ত, ধ্যানমূলক ধ্বনি সৃষ্টি করে।

গাগাকুর প্রাণ হলো এর বায়ু বাদ্য। এদের মধ্যে শো নামে একটি ছোট বাঁশের মাউথ অর্গান এর অনন্য ক্লাস্টার কর্ড বা গুচ্ছ স্বর সৃষ্টি করে, যা পরিবেশনায় একধরনের স্বর্গীয় এবং স্থিতিশীল আবহ তৈরি করে। এছাড়া বাঁশি জাতীয় হিশিরিকি তীক্ষ্ণ এবং আবেগপূর্ণ সুরের যোগান দেয় এবং বড় বাঁশি রিউতেকি -এর ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

তন্ত্রী বাদ্যের মধ্যে রয়েছে জাপানি বীণা গাকুসৌ এবং জাপানি বেহালা গাকুবিওয়া । এরা মূল সুরের উপর একটি ধীর এবং আলংকারিক স্তর তৈরি করে, যা বায়ুবাদ্যের সাথে মিশে সামগ্রিক ধ্বনি দেয়।

তাল বাদ্যের মধ্যে রয়েছে বড় ড্রাম তাইকো, ছোট ড্রাম শোকো এবং আওয়ার গ্লাসের আকারের ড্রাম কাক্কো। এদের তাল ধীরগতির হলেও পরিবেশনায় এক গভীর ও নিয়ন্ত্রিত ছন্দের সৃষ্টি করে।

গাগাকুর সঙ্গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অতি ধীর গতি এবং শান্ত, স্থির মেজাজ। পরিবেশনা শুরু হয় ধীর লয়ে এবং ধীরে ধীরে মূল ছন্দে প্রবেশ করে। এটি পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো চরম আবেগ বা দ্রুত ছন্দ পরিবর্তন এড়িয়ে চলে। ধ্যানমূলক, আনুষ্ঠানিক এবং পবিত্র অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। বুগাকু বা নৃত্য পরিবেশনার সময় শিল্পীরা ঐতিহাসিক উজ্জ্বল পোশাক এবং অসাধারণ মুখোশ পরিধান করেন, যা এই পরিবেশনাকে এক অসাধারণ দৃশ্যগত মাত্রা প্রদান করে।

ঐতিহাসিকভাবে গাগাকু জাপানি রাজদরবারের আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্রাটদের অভিষেক, বিবাহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এর পরিবেশনা একটি পবিত্র ও উচ্চ মর্যাদার প্রতীক। এটি জাপানি রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতাকে প্রতীকায়িত করে।

শিন্তো এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও গাগাকুর পরিবেশনা দেখা যায়। বিশেষ করে শিন্তো ধর্মের দেবতাদের শান্ত করার বা তাদের কাছে প্রার্থনা জানানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। এর শান্ত, মহৎ সুর শ্রোতাকে দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করার ক্ষমতা রাখে।

জাপানি গাগাকু বিশ্বের প্রাচীনতম অর্কেস্ট্রাল ধারার এক জটিল ও বহুস্তরীয় শৈল্পিক প্রকাশ। চীনের দরবারী সুর থেকে শুরু করে জাপানি রাজকীয় সংরক্ষণের মাধ্যমে এর যাত্রা এটিকে সাংস্কৃতিক স্থায়িত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ করে তুলেছে। এর বাদ্যযন্ত্রের অসাধারণ সমন্বয়, ধীর ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশনা শৈলী এবং জাপানি রাজতন্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার সাথে এর গভীর সংযোগ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই ধারা আজকের দ্রুতগতির বিশ্বে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সৌন্দর্য ও আভিজাত্য কেবল দ্রুত ছন্দে নয়, বরং স্থিতিশীলতা, ধৈর্য এবং বহু শতকের ঐতিহ্যের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়। এর পরিবেশনায় যে নীরবতা ও মহত্ত্ব বিরাজ করে তা কেবল কানকে নয়, আত্মাকেও গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং সেই কারণেই গাগাকু আজও এত প্রাসঙ্গিক ও মূল্যবান।

নীলনদের তীব্র স্রোতে প্লাবিত মিশর ও সুদান, ইথিওপিয়ার জিইআরডি বাঁধ নিয়ে চলছে বিতর্ক

নীলনদের জলস্তর অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মিশর ও সুদানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং বিপন্ন। এই আকস্মিক বন্যাকে কেন্দ্র করে ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (জিইআরডি)-এর পরিচালনা নিয়ে কায়রো ও আদ্দিস আবাবার মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

মিশরের উত্তরাঞ্চলে নীলনদ ব-দ্বীপের গ্রামগুলিতে বন্যার প্রভাব ছিল মারাত্মক। কায়রো থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের মেনুফিয়া গভর্নরেটের ডালহামো গ্রামে বাড়িঘর ও ফসলের ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে। বাসিন্দারা সরু গলিতে নৌকায় চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। জেলে সাঈদ গামেল বলেন, “আমরা সবকিছু হারিয়েছি। জলের স্তর এবার অস্বাভাবিকভাবে বেশি… আগে দু’দিন বেড়ে আবার নেমে যেত।”

বন্যাটি সাধারণত জুলাই ও আগস্টে ইথিওপিয়ান উচ্চভূমিতে বর্ষার কারণে হয়ে থাকে, কিন্তু এবার অক্টোবর মাসে দেরিতে আসা এই জলস্ফীতি সুদান হয়ে মিশরে প্রবেশ করেছে।

সুদানেও বন্যার কারণে মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, গত সপ্তাহে খার্তুম রাজ্যের বাহরি অঞ্চলে বন্যায় প্রায় ১,২০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত এবং তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। দেড় বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্যে এই বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মিশর ও ইথিওপিয়া এই বন্যার জন্য একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। মিশরের জলসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় ৩ অক্টোবর এক বিবৃতিতে ইথিওপিয়াকে “বেপরোয়া একতরফা” উপায়ে জিইআরডি পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত করেছে। তাদের দাবি, বাঁধটি ৯ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনের পর জলের ছাড়ের মাত্রায় তীক্ষ্ণ ও পূর্ব-ঘোষণা ছাড়া পরিবর্তন আসে। ১০ সেপ্টেম্বর প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং ২৭ সেপ্টেম্বর তা ৭৮০ মিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছায়, যা “মানব সৃষ্ট, দেরিতে হওয়া বন্যা” তৈরি করেছে। এই অতিরিক্ত জল সুদানের রোজাইরেস বাঁধের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মিশরে প্রবেশ করেছে।

ইথিওপিয়া ৪ অক্টোবর মিশরীয় দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে “বিদ্বেষপূর্ণ ও ভিত্তিহীন” আখ্যা দেয়। দেশটির জল ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানায়, ব্লু নীল প্রকল্প থেকে জল নিয়ন্ত্রিতভাবে ছাড়ার ফলে বন্যার প্রভাব বরং কমেছে এবং বাঁধ না থাকলে ভারি বৃষ্টি “সুদান ও মিশরে ঐতিহাসিক ধ্বংস ডেকে আনত”।

ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ৯ সেপ্টেম্বর বাঁধটি উদ্বোধনকালে বলেছিলেন যে এটি “অঞ্চলকে বিদ্যুতায়িত করতে এবং কালো মানুষের ইতিহাস পরিবর্তন করতে” তৈরি করা হয়েছে, “ভাইদের ক্ষতি করার জন্য নয়।”

মিশরের প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবোলি ২ অক্টোবর সতর্ক করেছিলেন, মেনুফিয়া ও বেইহেইরা অঞ্চলের নিচু এলাকাগুলো, যেখানে অবৈধ নির্মাণ রয়েছে, সেখানে জলস্ফীতির ঝুঁকি আছে। তবে ডালহামোর বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও “অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায়” সাহায্যের অপেক্ষায় ছাদের উপরে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।

ইতিবাচকভাবে শেষ হল ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রথম দিন

মিসরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া পরোক্ষ আলোচনার প্রথম দিনটি ইতিবাচকভাবে শেষ হয়েছে। আল–জাজিরা ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গাজায় চলমান যুদ্ধ অবসান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আলোচনায় সমঝোতার আশার সূচনা হয়েছে।

হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলা বন্দীদের মুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাকে জটিল করে তুলছে। আলোচনায় বন্দিবিনিময়, যুদ্ধবিরতি ও গাজায় মানবিক সহায়তা প্রদান ইস্যু হিসেবে প্রধান গুরুত্ব পেয়েছে।

এ বছর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং তার জবাবে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১,১৩৯ জন নিহত হয় এবং প্রায় ২০০ জনকে জিম্মি করা হয়। আলোচনায় হামাসের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দুই নেতা খলিল আল-হায়া ও জাহের জাবারিন। এই দুই আলোচক গত মাসে দোহায় ইসরায়েলের হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, যেখানে পাঁচজন নিহত হন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ট্রাম্প দ্রুত ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি বন্দিবিনিময়ের প্রক্রিয়াটি শেষ করতে চান। এ মাধ্যমে গাজায় যুদ্ধ অবসানে তার পরিকল্পনার অন্যান্য অংশগুলো কার্যকর করার চেষ্টা হবে।

গতকাল বিকেলে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের চুক্তি করার ভালো সুযোগ আছে। কিছু বিষয় নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, তবে আমরা ভালো করছি। হামাস এমন কিছু বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্টিভ উইটকফ। এছাড়াও ট্রাম্পের জামাতা ও ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনারও প্রতিনিধিদলের অংশ। ট্রাম্প হামাসকে আলোচনায় রাখার জন্য যৌথ আরব-তুর্কি সমর্থনের প্রশংসা করেছেন এবং ইসরায়েলের জনগণকে ও নিজস্ব প্রতিনিধিদের প্রশংসা জানিয়েছেন। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।