যেভাবে আজও টিকে আছে বিশ্বের আদি অর্কেস্ট্রাল সঙ্গীত – জাপানি গাগাকু

সারা বিশ্বের সঙ্গীত ইতিহাসের পটভূমিতে, কিছু ধারা সময়ের পরীক্ষা পেরিয়ে আজও সগৌরবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। জাপানের গাগাকু (Gagaku) তেমনই একটি সঙ্গীতধারা, যা শুধু একটি শৈলী নয়, প্রায় দেড় হাজার বছরের জীবন্ত সাংস্কৃতিক নথি।

“গাগাকু” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো “মার্জিত বা আভিজাত্যপূর্ণ সঙ্গীত”। একে প্রায়শই বিশ্বের প্রাচীনতম অর্কেস্ট্রাল সঙ্গীত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী জাপানি রাজকীয় দরবারী সঙ্গীত ও নৃত্যধারা এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং শৈল্পিক জটিলতার মাধ্যমে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির গবেষক এবং সাধারণ শ্রোতা উভয়কেই গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।

গাগাকুর জন্ম কোনো একক উৎস থেকে নয়, বরং এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক অসাধারণ ফলশ্রুতি। ষষ্ঠ শতক থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে কোরিয়া, চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে আগত বাদ্যযন্ত্র ও সঙ্গীতশৈলীর সমন্বয়ে জাপানে গাগাকুর ভিত্তি স্থাপিত হয়।

তোগাকু চীনের ট্যাং রাজবংশের সময়কার) থেকে আগত সঙ্গীত। এটি গাগাকুর মূল ধারা হিসেবে বিবেচিত হয়। কোমাগাকু কোরিয়া থেকে উদ্ভূত সঙ্গীত ও নৃত্য। আর রিওবিয়াং ভারতীয় ও ভিয়েতনামি বাদ্যযন্ত্র ও সুরের প্রভাব।

এই মিশ্রণের ফলে জাপানি সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে ওঠে। হেইয়ান যুগের কিয়োটো রাজদরবার ছিল গাগাকুর স্বর্ণযুগ। এই সময়েই গাগাকুর একটি সুসংগঠিত অর্কেস্ট্রাল ফর্ম এবং আনুষ্ঠানিক পরিবেশনার কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মূলত আজকের গাগাকুর ভিত্তি।

জাপানের সাম্রাজ্যিক দরবার গাগাকুকে কঠোরভাবে সংরক্ষণ করেছে। অন্যান্য সংস্কৃতির দরবারী সঙ্গীত যেমন চীনে বিভিন্ন রাজবংশের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, কিন্তু জাপানি রাজকীয় প্রতিষ্ঠান একে প্রায় একই রূপে সংরক্ষণ করেছে। আজো টোকিওর ইম্পিরিয়াল হাউসহোল্ড এজেন্সি-এর মিউজিক ডিপার্টমেন্টের বংশানুক্রমিক শিল্পীরা এটি পরিবেশন করে থাকেন। এই ধারাবাহিকতাই গাগাকুকে ‘প্রাচীনতম’ অর্কেস্ট্রাল ধারার তকমা দিয়েছে।

গাগাকু কেবল সঙ্গীত নয়, এটি নৃত্য এবং গানের এক সামগ্রিক পরিবেশনা। এর শৈল্পিকতা প্রকাশ পায় এর বাদ্যযন্ত্রের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস ও পরিবেশনার জটিল নিয়মের মাধ্যমে।

গাগাকুর অর্কেস্ট্রা তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, বায়ু, তন্ত্রী এবং তালবাদ্য। এই তিনটি বিভাগের ভারসাম্যই গাগাকুর শান্ত, ধ্যানমূলক ধ্বনি সৃষ্টি করে।

গাগাকুর প্রাণ হলো এর বায়ু বাদ্য। এদের মধ্যে শো নামে একটি ছোট বাঁশের মাউথ অর্গান এর অনন্য ক্লাস্টার কর্ড বা গুচ্ছ স্বর সৃষ্টি করে, যা পরিবেশনায় একধরনের স্বর্গীয় এবং স্থিতিশীল আবহ তৈরি করে। এছাড়া বাঁশি জাতীয় হিশিরিকি তীক্ষ্ণ এবং আবেগপূর্ণ সুরের যোগান দেয় এবং বড় বাঁশি রিউতেকি -এর ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

তন্ত্রী বাদ্যের মধ্যে রয়েছে জাপানি বীণা গাকুসৌ এবং জাপানি বেহালা গাকুবিওয়া । এরা মূল সুরের উপর একটি ধীর এবং আলংকারিক স্তর তৈরি করে, যা বায়ুবাদ্যের সাথে মিশে সামগ্রিক ধ্বনি দেয়।

তাল বাদ্যের মধ্যে রয়েছে বড় ড্রাম তাইকো, ছোট ড্রাম শোকো এবং আওয়ার গ্লাসের আকারের ড্রাম কাক্কো। এদের তাল ধীরগতির হলেও পরিবেশনায় এক গভীর ও নিয়ন্ত্রিত ছন্দের সৃষ্টি করে।

গাগাকুর সঙ্গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অতি ধীর গতি এবং শান্ত, স্থির মেজাজ। পরিবেশনা শুরু হয় ধীর লয়ে এবং ধীরে ধীরে মূল ছন্দে প্রবেশ করে। এটি পশ্চিমা সঙ্গীতের মতো চরম আবেগ বা দ্রুত ছন্দ পরিবর্তন এড়িয়ে চলে। ধ্যানমূলক, আনুষ্ঠানিক এবং পবিত্র অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। বুগাকু বা নৃত্য পরিবেশনার সময় শিল্পীরা ঐতিহাসিক উজ্জ্বল পোশাক এবং অসাধারণ মুখোশ পরিধান করেন, যা এই পরিবেশনাকে এক অসাধারণ দৃশ্যগত মাত্রা প্রদান করে।

ঐতিহাসিকভাবে গাগাকু জাপানি রাজদরবারের আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্রাটদের অভিষেক, বিবাহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এর পরিবেশনা একটি পবিত্র ও উচ্চ মর্যাদার প্রতীক। এটি জাপানি রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতাকে প্রতীকায়িত করে।

শিন্তো এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও গাগাকুর পরিবেশনা দেখা যায়। বিশেষ করে শিন্তো ধর্মের দেবতাদের শান্ত করার বা তাদের কাছে প্রার্থনা জানানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। এর শান্ত, মহৎ সুর শ্রোতাকে দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করার ক্ষমতা রাখে।

জাপানি গাগাকু বিশ্বের প্রাচীনতম অর্কেস্ট্রাল ধারার এক জটিল ও বহুস্তরীয় শৈল্পিক প্রকাশ। চীনের দরবারী সুর থেকে শুরু করে জাপানি রাজকীয় সংরক্ষণের মাধ্যমে এর যাত্রা এটিকে সাংস্কৃতিক স্থায়িত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ করে তুলেছে। এর বাদ্যযন্ত্রের অসাধারণ সমন্বয়, ধীর ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশনা শৈলী এবং জাপানি রাজতন্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার সাথে এর গভীর সংযোগ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই ধারা আজকের দ্রুতগতির বিশ্বে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সৌন্দর্য ও আভিজাত্য কেবল দ্রুত ছন্দে নয়, বরং স্থিতিশীলতা, ধৈর্য এবং বহু শতকের ঐতিহ্যের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়। এর পরিবেশনায় যে নীরবতা ও মহত্ত্ব বিরাজ করে তা কেবল কানকে নয়, আত্মাকেও গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং সেই কারণেই গাগাকু আজও এত প্রাসঙ্গিক ও মূল্যবান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন