Home Blog Page 5

জৈব জ্বালানি পরিবেশের জন্য সমাধান নাকি হুমকি?

একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে জৈবজ্বালানির ব্যবহার এমন পর্যায়ে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন বৃদ্ধি করেছে যে তা জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকারক। এই গবেষণা করা হয়েছে ইউরোপের পরিবহন ও পরিবেশ সংস্থা-এর পক্ষে এবং প্রকাশ করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Cerulogy। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জৈবজ্বালানি উৎপাদনকারী কৃষি ও বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে পরিবেশে ১৬% বেশি CO₂ নির্গমন ঘটাচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জৈবজ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে ৭০ মিলিয়ন টন CO₂ বেশি নির্গমন করতে পারে, যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডিজেল গাড়ির বার্ষিক নির্গমনের সমান। একই সঙ্গে সেই একই ভূমি যদি খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হত, তবে তা ১৩০ কোটি মানুষের খাদ্য যোগান দিতে পারত। এছাড়া যদি সেই ভূমির মাত্র ৩% সৌর প্যানেলের জন্য ব্যবহার করা হতো, তাতেও সমান পরিমাণ শক্তি উৎপাদন সম্ভব হতো।

T&E-এর জৈবজ্বালানি ক্যাম্পেইনার সিয়ান ডেলেনি বলেছেন, “জৈবজ্বালানি পরিবেশের জন্য একটি ভয়ঙ্কর সমাধান এবং ভূমি, খাদ্য ও কোটি কোটি ডলারের অনুদানের অপচয়। কৃষি ও প্রকৃতির মধ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য নিশ্চিত করা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অত্যাবশ্যক।” প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত ও বর্জ্য জৈবজ্বালানি অনেক সময় পরিষ্কার সমাধান হিসেবে প্রচারিত হলেও বৈশ্বিকভাবে এ ধরনের বিকল্প জ্বালানির ৯০% এখনও খাদ্য ফসলের উপর নির্ভরশীল।

বিশ্লেষণে T&E জানিয়েছে, জৈবজ্বালানি ফসলের জন্য প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি পানির প্রয়োজন হয়, যা জল সংরক্ষণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিশ্বব্যাপী নেট জিরো লক্ষ্য অর্জনে বিঘ্ন ঘটায়। সামুদ্রিক পরিবহন শিল্পের জন্য T&E ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে জৈবজ্বালানি নেট জিরো অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও কিছু শিপিং কোম্পানি যেমন Norden, Oldendorff, CBH Group, এবং Taiwan-এর Yang Ming Marine Transportation তাদের জাহাজের জন্য জৈবজ্বালানিতে মনোযোগ দিয়েছে, অন্যরা অপেক্ষা করে দেখার কৌশল নিয়েছে।

T&E-এর আরও একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সামুদ্রিক পরিবহনের এক-তৃতীয়াংশ জৈবজ্বালানিতে চলতে পারে। তবে ব্যবহৃত রান্নার তেল বা প্রাণীচর্বি জাতীয় বর্জ্য জৈবজ্বালানি শিপিং কোম্পানিদের নজর কাড়লেও তা সামগ্রিক চাহিদার মাত্র ছোট একটি অংশই পূরণ করতে পারবে। এছাড়া জার্মান কন্টেইনার শিপিং জায়ান্ট Hapag-Lloyd, পরিবেশ সংস্থা NABU এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছে তারা অস্থিতিশীল জৈবজ্বালানিকে বিকল্প জ্বালানির তালিকা থেকে সরিয়ে দিক, এটি জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জৈবজ্বালানি শুধু পরিবেশ বান্ধব সমাধান নয়, এটি ভূমি, খাদ্য ও জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি ও শক্তির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য না রাখলে এটি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর হবে না এবং নতুন ধরনের পরিবেশগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

পিরামিড অব গিজা কীভাবে নির্মিত হয়েছিল?

মিশরের গিজা মালভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল পিরামিডগুলো পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে আজও অন্যতম। প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে মিশরীয়দের পুরাতন রাজত্বকালে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভগুলি কেবল ফারাওদের সমাধিক্ষেত্র ছিল না, ছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, প্রকৌশল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক অনবদ্য প্রতীক। ফারাওরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পর তারা দেবত্ব লাভ করবেন, আর তাই পরবর্তী জগতে নিজেদের প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্রসহ তাদের মরদেহ সংরক্ষণের জন্য এই বিশাল পিরামিড সমাধিগুলি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি পিরামিড গিজা পিরামিড কমপ্লেক্সের একটি অংশ, যার মধ্যে প্রাসাদ, মন্দির, সোলার বোট পিট এবং অন্যান্য কাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে যে প্রশ্নটি আজও ইতিহাসবিদ ও প্রকৌশলীদের কৌতূহলী করে তোলে, তা হলো— ঠিক কীভাবে এই বিশাল স্থাপত্যগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল?

পিরামিড নির্মাণের ধারণাটি রাতারাতি আসেনি। খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮০ সালের আগে ফারাওদের বেঞ্চ-আকৃতির সমাধি দেওয়া হতো। এরপর স্থপতি ইমহোটেপ ফারাও জোসেরের জন্য একটির ওপর আরেকটি ছয়টি ফ্ল্যাট-ছাদযুক্ত মাস্তাবা স্তূপ করে স্টেপ পিরামিড তৈরি করেন।

এই ধারণাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যান চতুর্থ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ফারাও স্নেফ্রু । তিনি মেইদুম-এ একটি স্টেপ পিরামিড তৈরি করে তার ধাপগুলি ভরাট করে এটিকে মসৃণ পিরামিডের রূপ দেন। এরপর ডাহশুরে তিনি এমন একটি পিরামিড নির্মাণের চেষ্টা করেন যার চারটি ত্রিকোণাকার দেয়াল কেন্দ্রে মিলিত হবে। তবে নির্মাণ চলাকালীন সেটি এলোমেলো হয়ে পড়লে এর কৌণিকতা পরিবর্তন করা হয়, ফলে এটি ‘বেন্ট পিরামিড’ নামে পরিচিত। স্নেফ্রু তার তৃতীয় পিরামিড ‘রেড পিরামিড’ নির্মাণ করেন তুলনামূলক নিচু ৪৩ ডিগ্রি কোণে, যা ছিল একটি সফল ও স্থায়িত্বপূর্ণ কাঠামো।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, স্নেফ্রুর এই কঠিন অভিজ্ঞতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসলই কাজে লাগিয়েছিলেন তাঁর পুত্র খুফু, যিনি গিজার মহা পিরামিডের স্থপতি। প্রত্নতাত্ত্বিক মার্ক লেহনারের ভাষায়, “স্নেফ্রু যেন সমস্ত গবেষণা ও উন্নয়ন এর কাজটি সেরে রেখেছিলেন।”

গিজার তিনটি প্রধান পিরামিড চতুর্থ রাজবংশের তিন ফারাও দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। খুফুর মহা পিরামিড আনুমানিক ২৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফারাও খুফু নির্মাণ শুরু করেন। এটি গিজার পিরামিডগুলির মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ, যা মূলত প্রায় ৪৬৯ ফুট (১৪৭ মিটার) উঁচু ছিল। অনুমান করা হয়, এতে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রতিটির গড় ওজন ২.৫ থেকে ১৫ টন। এর মসৃণ আবরণ পাথরগুলি এখন আর নেই, তবে এর বিশালতা আজও বিস্ময়কর।

খুফুর পুত্র ফারাও খাফ্রে আনুমানিক ২৫২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় খাফ্রের পিরামিডটি নির্মাণ করেন। এই কমপ্লেক্সের একটি স্বতন্ত্র অংশ হলো বিশাল চুনাপাথরের মূর্তি গ্রেট স্ফিংস, যার দেহ সিংহের এবং মাথা ফারাওয়ের। স্ফিংস হয়তো ফারাওয়ের সমাধি কমপ্লেক্সের প্রহরী হিসেবে দাঁড়ানো।

খাফ্রের পুত্র মেনকাউরে আনুমানিক ২৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় পিরামিডটি তৈরি করেন, যা প্রথম দুটি পিরামিডের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট। এই কমপ্লেক্সে মেনকাউরের নিজস্ব চেম্বার ছাড়াও তিনটি পৃথক রানির পিরামিড অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গিজার পিরামিডগুলি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা আজও একটি বিতর্কের বিষয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করেছে।

পিরামিড নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল আকারের পাথরগুলি দূর-দূরান্ত থেকে আনা হয়েছিল। আসোয়ান থেকে গ্রানাইট, সিনাই উপদ্বীপ থেকে তামা কাটার সরঞ্জাম এবং লেবানন থেকে কাঠ নৌকায় করে নীল নদ এবং কৃত্রিম খালগুলির একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গিজা মালভূমিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কর্মীদের খাদ্যের জন্য নীল নদের ব-দ্বীপের কাছাকাছি খামার থেকে গবাদি পশুকেও সরবরাহ করা হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থা ফারাওদের সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণের প্রদর্শন হিসেবে এক প্রকার জাতীয় প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল।

এত বিশাল আকারের পাথর ব্লকগুলিকে এত উঁচুতে তোলার পদ্ধতিটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, মিশরীয়রা সম্ভবত বড় র‍্যাম্প তৈরি করে তার ওপর দিয়ে স্লেজ, দড়ি, রোলার এবং লিভার ব্যবহার করে পাথরগুলি টেনে নিয়ে যেত। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই র‍্যাম্পগুলি পিরামিডের বাইরের দিকে জিগ-জ্যাগ বা সর্পিল আকারে তৈরি হয়েছিল।

একটি বিতর্কিত তত্ত্ব অনুযায়ী, পিরামিডের অভ্যন্তরে র‍্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতের উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি হয়তো এই রহস্যের সমাধান করতে পারে। সম্প্রতি স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্পের মাধ্যমে পিরামিডের অভ্যন্তরে গ্র্যান্ড গ্যালারির আকারের সমতুল্য একটি ফাঁকা স্থান এবং ‘নর্থ ফেস করিডোর’ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কোনো কাঠামো হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, পিরামিডগুলি দাসদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তবে গিজার ‘লস্ট সিটি অফ দ্য পিরামিডস’-এ প্রত্নতাত্ত্বিক মার্ক লেহনারের গবেষণা থেকে জানা যায়, এখানে শ্রমিকদের একটি সংগঠিত বসতি ছিল। এই শহরে দীর্ঘ ব্যারাক, প্রশস্ত রাস্তা, কারিগরদের সম্প্রদায় এবং সরবরাহকারী অবকাঠামো ছিল। প্রমাণ থেকে জানা যায়, শ্রমিকরা প্রচুর পরিমাণে রুটি, বিয়ার এবং ভালো মানের মাংস খেত, সেইসাথে তারা উন্নত চিকিৎসা সুবিধাও পেত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে শ্রমিকদের যথেষ্ট মূল্যবান মনে করা হতো এবং তারা স্বেচ্ছায় বা আবর্তিত শ্রমিক হিসেবে এই জাতীয় নির্মাণযজ্ঞে অংশ নিত।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য যে অবকাঠামো ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়েছিল, তা আসলে প্রাচীন মিশরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। লেহনারের মতে, “পিরামিড নির্মাণকে সমর্থন করার জন্য যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা একসময় বিশাল পিরামিড নির্মাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আসল অগ্রগতি ছিল মানুষকে সংগঠিত করার মধ্যে।”

গিজার পিরামিডগুলি কেবল ফারাওদের সমাধি নয়, বরং প্রাচীন মিশরীয়দের সূক্ষ্ম জ্যামিতিক জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা এবং বিশাল জনবলকে সংগঠিত করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পিরামিডগুলি কম্পাসের দিকগুলির সঙ্গে অবিশ্বাস্য নির্ভুলতার সাথে সারিবদ্ধ ছিল। ফারাওরা হয়তো তারকা ব্যবহার করে বা নির্দিষ্ট তারিখে ছায়া মানচিত্র তৈরি করে এই কাজ করেছিলেন। গ্রীষ্মকালে সূর্যকে গ্রেট স্ফিংস থেকে দেখলে তা খুফু ও খাফ্রের পিরামিডের ঠিক মাঝখান দিয়ে অস্ত যায়।

পিরামিডের অভ্যন্তরে আবিষ্কৃত চিত্র ও শিলালিপিগুলি প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাত্রা, কৃষি, শিকার, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ভাষার ওপর অমূল্য তথ্য সরবরাহ করেছে। স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্পের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আজও পিরামিডের অভ্যন্তরের নতুন নতুন শূন্যস্থান আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা তাদের নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে আরও নতুন প্রশ্ন ও তথ্যের জন্ম দিচ্ছে। গিজার পিরামিডগুলি তাদের অনন্তকাল ধরে টিকে থাকার লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের নির্মাণ-রহস্যের উন্মোচন ইতিহাসের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অ্যাজটেক দর্শনে ‘ফুল ও গান’ কীভাবে জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বকে জয় করে?

প্রাচীন মেক্সিকোর যেখানে আজকের মেক্সিকো সিটির অবস্থান, সেই স্থানে সমৃদ্ধিশালী অ্যাজটেক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তাদের দর্শন, ধর্ম এবং জীবনবোধ ছিল অত্যন্ত জটিল, কিন্তু সেই জটিলতার ভেতরও ছিল এক অদ্ভুত সরলতা, জীবনকে তারা দেখত ফুল ও গানের মতো সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়িতা এবং আনন্দের সঙ্গে অঙ্গীভূত। এই দর্শন কেবল ধর্মীয় ধারণা নয়, মানবজীবনের নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক দিকগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জীবনদর্শন।

অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করতেন, জীবন হলো ক্ষণস্থায়ী। যেমন একটি ফুল খুব অল্প সময়ের জন্য ফুটে থাকে, তেমনি মানুষের জীবনও সীমিত। “ফুল” এখানে মৃত্যুর অমোঘতা, সুন্দরতা এবং ক্ষণস্থায়িতা বোঝায়। অন্যদিকে, “গান” মানুষের সৃষ্টিশীলতা, আনন্দ এবং আধ্যাত্মিক উৎফুল্লতা প্রকাশ করে। এই দুইটি উপাদান একত্রিত হয়ে জীবনকে পূর্ণতা দেয়।

তাদের দর্শনে মৃত্যুর ভয় বা জীবনের অসীম দুঃখ-কষ্টে আটকা থাকা মানে ছিল জীবনকে অসম্পূর্ণভাবে দেখা। “ফুল ও গান” দর্শন সেই ভয় দূর করে এবং মানুষকে শেখায়— প্রতিটি মুহূর্তকে পুরোভাবে অনুভব করা, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানব সম্পর্কের আনন্দকে স্বীকৃতি দেওয়া।

অ্যাজটেক দর্শনের আরেকটি মূল উপাদান হলো জীবন-মৃত্যু চক্র। তারা মৃত্যুকে শেষ বলে মনে করত না। তাদের মতে মৃত্যুর পর আত্মা সূর্য, চাঁদ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে একীভূত হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করে।

অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের আধ্যাত্মিক কাজ এবং নৈতিক জীবন তার আত্মার পরবর্তী অবস্থাকে প্রভাবিত করে। ফুল যেমন অল্প সময়ের জন্য সৌন্দর্য দেখায়, তেমনি মানুষের জীবনও অল্প সময়ের জন্য সৌন্দর্য বহন করে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নৈতিক ও সৃজনশীলভাবে ব্যবহারের শিক্ষা তারা দিয়ে গেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ধর্মীয় আচারেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাদের নৃত্য, গান এবং কাব্যচর্চা ছিল এক প্রকার আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা আত্মাকে শুদ্ধ করত এবং জীবনের সৌন্দর্যকে উদযাপন করত।

অ্যাজটেক সমাজে রাজনীতি ও দর্শন একে অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। তাদের শাসকরা কেবল প্রশাসক ছিলেন না, তারা দর্শনের শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করতেন। সমাজে ন্যায়, দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ—এসব নৈতিক আদর্শকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিত।

অ্যাজটেক দর্শনের আধ্যাত্মিক প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ছিল কাব্য ও সংগীত। তারা বিশ্বাস করত, গান কেবল সৌন্দর্য তৈরি করে না, এটি আত্মার ভেতরের শক্তিকে উজ্জীবিত করে। তাদের কবিতা বা “Huehuetlatolli” ছিল প্রাচীন প্রজ্ঞার ভাষা। এতে জীবন, মৃত্যু, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং আধ্যাত্মিক দিকগুলোকে সুন্দরভাবে যুক্ত করা হতো। সংগীতের মাধ্যমে তারা মৃত্যুর ভয় কমাত, নৈতিক শিক্ষা প্রদান করত এবং সমাজে সংহতি বজায় রাখত। এভাবেই ফুলের ক্ষণস্থায়িতা এবং গানের আনন্দ একত্রিত হয়ে আত্মার পরিপূর্ণতা এবং জীবনের পূর্ণতা নির্দেশ করত।

অ্যাজটেক দর্শনে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল কেন্দ্রীয়। সূর্য, চাঁদ, নদী, গাছ, ফুল এবং পশু— সবকিছুতে তারা আধ্যাত্মিক শক্তি দেখত। ফুল যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি প্রকৃতির প্রতিটি মুহূর্তও অল্পকালীন। গান বা সঙ্গীত সেই ক্ষণিক সৌন্দর্য উদযাপন করে। এটি তাদের দর্শনের নান্দনিক দিকও ফুটিয়ে তোলে। শিল্প, স্থাপত্য, চিত্রকলা এবং পোশাক— সবকিছুই এই দর্শনকে সমৃদ্ধ করে। প্রতিটি মন্দির, প্রতিটি ভাস্কর্য এবং প্রতিটি আভ্যন্তরীণ আয়োজনই মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করত।

আজকের দিনে, অ্যাজটেক দর্শনের এই ধারণা আমাদের জীবনযাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। জীবনের অস্থায়ীত্ব স্বীকার করা, প্রতিটি মুহূর্তকে পুরোভাবে অনুভব করা এবং নৈতিক ও সৃজনশীলভাবে জীবন যাপন করার এই দর্শন আমাদের আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ, অস্থিরতা ও উদাসীনতা থেকে মুক্তি দিতে পারে। এছাড়া প্রাচীন অ্যাজটেক দর্শন দেখায় কিভাবে সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা এবং শিল্প একত্রে মানবজীবনের গভীর অর্থ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘ

বাংলাদেশ সরকার এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া পিছিয়ে না দিয়ে উত্তরণ–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি যাচাই ও সম্ভাব্য বহিরাগত ঝুঁকি শনাক্ত করতে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের মতে, এ উদ্যোগ দেশের প্রস্তুতি যাচাই এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।

সরকার ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘকে চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং উত্তরণ–পরবর্তী সম্ভাব্য বহিরাগত ধাক্কা ও ঝুঁকির বিষয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনার অনুরোধ করেছে। সাড়া দিয়ে জাতিসংঘও উত্তরণের প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নে একটি স্বাধীন বিশ্লেষণ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতিসংঘের অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর দ্য লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) ২৯ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, মূল্যায়নের লক্ষ্য একটি নিরপেক্ষ ও সামগ্রিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা, যেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হবে, বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা যাচাই করা হবে, এবং উত্তরণ প্রক্রিয়া মসৃণ ও টেকসই হবে এমন আস্থা তৈরি করা হবে। চিঠিটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নির্ধারিত এলডিসি উত্তরণের তারিখ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। তবে দেশের বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো অন্তত তিন বছর সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু রাজনৈতিক দলও এই দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে। সরকার ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকে জাতিসংঘের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই উত্তরণ পেছানোর আবেদন গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ইআরডি কর্মকর্তারা আশা করছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বেসরকারি খাত, সিভিল সোসাইটি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করা হবে।

ইউএন-ওএইচআরএলএলএস-এর পরিচালক রোনাল্ড মোলেরুস পুরো প্রক্রিয়ার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবেন এবং বাংলাদেশ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ রাবাব ফাতিমা বলেন, “এই মূল্যায়ন স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরামর্শভিত্তিক হবে। এতে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া মসৃণ এবং টেকসই হবে এমন আস্থা তৈরি হবে।”

এদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর দাবি তুলেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা সহায়তা না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, এলডিসি গ্রাজুয়েশনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধার কোনো সম্পর্ক নেই এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এই সুবিধা আগামী কয়েক বছর ধরে অব্যাহত রাখবে।

সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জাতিসংঘে জমা দেওয়া হবে।বর্তমানে প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে, খসড়া তৈরি করে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে, এরপর তা চূড়ান্ত করে প্রেরণ করা হবে।

এছাড়া আগামী ৮ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এলডিসি গ্রাজুয়েশন সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাবসহ সামগ্রিক প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হবে। কমিটিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশগ্রহণ করবেন। পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে প্রস্তুতির স্বচ্ছতা ও বহিরাগত ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের স্বাধীন মূল্যায়ন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণমূলক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

কিভাবে চে’র স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল তৃতীয় বিশ্বের মুক্তির ইশতেহার?

আর্নেস্তো চে গুয়েভারা (Ernesto “Che” Guevara), নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বলিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখ—এক স্বপ্নাতুর বিপ্লবী, যিনি পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’-এর শৃঙ্খল মোচনের স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলেন। বুর্জোয়া পরিবারে জন্ম নিয়েও চিকিৎসক থেকে গেরিলা কমান্ডার এবং কিউবার রাষ্ট্রনায়ক হওয়া পর্যন্ত চে’র জীবন ছিল একটি চলমান রাজনৈতিক ইশতেহার। তাঁর কর্মজীবন কিউবার বিপ্লব, কঙ্গোর ব্যর্থ অভিযান এবং বলিভিয়ার গহীন জঙ্গলে চূড়ান্ত আত্মত্যাগ—এই তিনটি প্রধান পর্বে বিভক্ত।

আজ তাঁর মৃত্যুদিনে যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন প্রশ্ন জাগে, কিভাবে এক লাতিন আমেরিকান চিকিৎসক সারা বিশ্বের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠলেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দু’টি প্রধান ব্লকে বিভক্ত হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। এই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীনতা লাভ করা বা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত দেশগুলো পরিচিত ছিল ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামে। এই দেশগুলো একদিকে যেমন পুরাতন ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিল, তেমনি অন্যদিকে নব-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিল। চে গেভারা এই শোষিত ও নিপীড়িত মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করতেন, সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্তি একমাত্র সশস্ত্র বিপ্লব-এর মাধ্যমেই সম্ভব।

১৯২৮ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিওতে জন্মগ্রহণকারী আর্নেস্তো গেভারা মূলত একজন পেশাদার চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৫১-৫২ সালে ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে তাঁর ঐতিহাসিক মোটরসাইকেল ভ্রমণ তাঁকে মহাদেশের দারিদ্র্য, সামাজিক অবিচার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট শোষণের ভয়াবহ চিত্র দেখায়। এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৫৬ সালে মেক্সিকোতে তিনি ফিদেল কাস্ত্রো’র সঙ্গে পরিচিত হন এবং কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তা’র বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে যোগ দেন।কিউবার সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে চে তার চিকিৎসা-জ্ঞান ছেড়ে গেরিলা কৌশল ও সামরিক রণনীতিতে মনোযোগ দেন। তার Guerilla Canon তত্ত্ব কিউবার সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামরিক প্রতিভা, ইস্পাত-কঠিন শৃঙ্খলা এবং আদর্শের প্রতি অগাধ বিশ্বাস তাঁকে কাস্ত্রোর দ্বিতীয় প্রধান কমান্ডারে পরিণত করে। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের বিজয়ের পর, চে কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং পরে শিল্পমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। এই সময় তিনি কিউবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নির্মাণে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত কিউবা গঠনে নেতৃত্ব দেন।

চে বিশ্বাস করতেন, তাঁর বিপ্লব কেবল কিউবার জন্য নয়, সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের জন্য। তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈশ্বিক সংহতির অংশ হিসেবে ‘বহু ভিয়েতনাম’ তত্ত্বের বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেন এবং আন্তর্জাতিক বিপ্লবের কৌশলগত পথে অগ্রসর হন।

১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান এবং কঙ্গোর (তখনকার বেলজিয়ান কঙ্গো) গৃহযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি কঙ্গোর মুলেলবাদী গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে যান, যাদের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাপন্থী সরকারকে উৎখাত করা। তবে কঙ্গোর ভাষাগত জটিলতা, স্থানীয় নেতা ও গেরিলাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হয়। এটি চে-এর বিপ্লবী জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা ছিল।

কঙ্গো থেকে ফিরে এসে, নিজের পরিচয় গোপন করে চে ১৯৬৬ সালে বলিভিয়ার গহীন জঙ্গলে গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বলিভিয়া থেকে বিপ্লবের আগুন ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। তবে বলিভিয়ার অভিযানও সফল হয়নি। স্থানীয় কৃষকদের সমর্থন না পাওয়া, বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির অসহযোগিতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর তৎপরতার কারণে চে-এর গেরিলা দল দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা-তে চে গেভারা তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধা-সহ বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক আবেদনের তোয়াক্কা না করে, পরের দিন, ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-এর পরামর্শে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যু দ্রুতই বিশ্বজুড়ে এক গভীর শোক এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ক্রোধের জন্ম দেয়।

মৃত্যুর পর চে গেভারা কেবল একজন বিপ্লবী নেতা হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক শহীদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে ওঠেন। তাঁর মুখচ্ছবি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বৈশ্বিক প্রতীক।

চে গেভারা আজও তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি শোষিত মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস ও ক্ষমতা ত্যাগ করে জনগণের মুক্তির জন্য লড়েছেন। একজন মন্ত্রী হয়েও অস্ত্র হাতে জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত আধুনিক রাজনীতিতে বিরল।

তিনি ছিলেন আদর্শের প্রতি অসম্ভব কঠোর এবং নিজের জীবনেও সেই নীতি মেনে চলতেন। তিনি যে “নতুন মানুষ”-এর ধারণা দিয়েছিলেন, তা ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়।

সাহস ও প্রতিরোধ: শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে বিশ্বের তরুণ ও অ্যাক্টিভিস্টদের কাছে নেতা করে তোলে। তবে তাঁর উত্তরাধিকার বিতর্কমুক্ত নয়। সমালোচকরা কিউবার বিপ্লবের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা এবং তাঁর সামরিক কঠোরতার সমালোচনা করেন। অনেকে তাঁর ‘ফুয়েকো’ তত্ত্বকে অন্যান্য দেশে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেন, কারণ এই তত্ত্ব স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জটিলতা উপেক্ষা করেছিল।

কিন্তু সমস্ত বিতর্ক সত্ত্বেও, চে আজও বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের আগ্রাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান। তাঁর জীবন তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে শিখিয়েছে—অবিচার মেনে নেওয়া নয়, প্রতিরোধ অপরিহার্য।

চে’র মৃত্যু হয়েছিল এক গুলিতে, কিন্তু তাঁর ধারণার মৃত্যু হয়নি। তাঁর মুখ আজও ঝুলে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে, কৃষকের মিছিলে, কিংবা অনলাইনের বিপ্লবী পোস্টারে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— বিপ্লব কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে থাকে না, এটি এক আত্মিক দায়বদ্ধতা।

তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি তাই এখনো অসমাপ্ত এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের প্রতীকে, চে আজও দাঁড়িয়ে যেন বলছেন, বাঁচতে হলে লড়তে হবে।

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি দেশে বেকারত্ব বাড়িয়েছে

১৯৮১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তযুক্ত ঋণ কর্মসূচি এবং সেগুলোর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন গ্রিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেটসস ও আন্দ্রেয়াস সিন্টোস। তাদের ‘দি ইফেক্টস অব আইএমএফ কন্ডিশনাল প্রোগ্রাম অন দি আনএমপ্লয়মেন্ট রেট’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, কঠোর শর্তের অধীনে ঋণ নেওয়া দেশগুলোতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা গভীরতর হয়।

গবেষকরা আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিসংখ্যান ও ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বাজেট ঘাটতি কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ, শ্রমবাজার উদারীকরণ এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো শর্ত বাস্তবায়নের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।

কভিড-১৯ মহামারীর পর বাংলাদেশও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের স্থবিরতার প্রভাবে তৎকালীন সরকারকে ২০২২ সালের শেষের দিকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়। ঋণগ্রহণের শর্ত হিসেবে মেনে নিতে হয় অর্ধশতাধিক শর্ত। এসব শর্ত পূরণ করার প্রক্রিয়ায় দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হয় এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে।

২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আইএমএফ ঋণ কর্মসূচিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। ওই সময়ে শুরু হয় সংস্থাটির চাপিয়ে দেওয়া শর্ত বাস্তবায়ন। সরকার ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা বলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে। জুনে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশের সীমা তুলে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বেড়ে যায়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যায় এবং সরকারি ব্যয় কৃচ্ছ্রসাধন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল সংকুচিত হয়। এসব উদ্যোগের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয় এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পায়।

স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণদের (১৫–২৯ বছর বয়স) বেকারত্ব ২০১৯ সালে ১১.৫৯ শতাংশ ছিল। কভিড-১৯-এর প্রভাবে ২০২০ সালে বেড়ে ১৩.২৯ শতাংশ হয়। ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে এটি কমে আসলেও ২০২৪ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়ে ১১.৪৬ শতাংশে পৌঁছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা ও সরকারি ব্যয়ের কৃচ্ছ্রসাধনের প্রভাব দৃশ্যমান।

আইএমএফ ঋণের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতাও এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ। শর্ত পূরণের কারণে বাজেট সংকুচিত হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ৩৩টি দেশের উপর আইএমএফ ঋণের প্রভাব নিয়ে ‘ব্যান্ডেজ অন আ বুলেট উন্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, সরকারি খরচ কমানো, নিয়োগ বন্ধ করা এবং বেতন কাটা বা স্থগিত রাখার ফলে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) উল্লেখ করেছেন, আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য সরকার অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা সম্প্রসারণ বন্ধ থাকায় ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারেও ঋণ এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ স্থিতি ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ, যা ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফ ঋণের প্রভাব পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। ঋণগ্রহণের ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কেবল ঋণের সুদহার বৃদ্ধি বা শর্তের কারণে হয় না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট বেকার ২৫ লাখ ৮০ হাজার, যার মধ্যে তরুণ বেকারের সংখ্যা ২১ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখ ৬০ হাজারে নেমে আসে, তরুণদের মধ্যে ১৯ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৪ সালে বেকার জনসংখ্যা বেড়ে ২৬ লাখ ২০ হাজার, যার মধ্যে তরুণ বেকার ২০ লাখে পৌঁছে। আইএমএফ ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের ফলে কর্মসংস্থান ও তরুণ বেকারত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

জাহিদ হোসেন ও ফাহমিদা খাতুনের মত অনুযায়ী, দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের ঋণ শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী সমাধান প্রদান করে, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন অপরিহার্য।

পিরামিড থেকে পার্থেনন, যে ধর্ম মিশিয়েছিল দুই সভ্যতাকে

প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বে যেখানে বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল, সেখানে এক বিশেষ ধরনের ধর্মীয় আচারের জন্ম হয়েছিল যা ইতিহাসে মিস্ট্রি রিলিজিয়ন নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মিশর জয় এবং পরবর্তীকালে টলেমীয় রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রিক ও মিশরীয় সভ্যতার মধ্যে যে গভীর আদান-প্রদান শুরু হয়, তারই ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য ধর্মীয় সমন্বয়।

এই সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘গ্রিক-মিশরীয় মিস্ট্রি রিলিজিয়ন’, বিশেষত আইসিস ও সেরাপিসের মতো দেবতাদের পূজা। এই ধর্মীয় মিলন কেবল দেবতাদের নাম বা আচারের বিনিময় নয়, এটি ছিল দুটি মহান সভ্যতার আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয়ের পর যে বিশাল হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে পুরনো নগর-রাষ্ট্র ভিত্তিক গ্রিক ধর্ম তার আকর্ষণ হারাচ্ছিল। বহু-সাংস্কৃতিক বিশাল সাম্রাজ্যের পরিবেশে মানুষ এমন একটি ব্যক্তিগত, গভীর এবং সার্বজনীন ধর্মের সন্ধান করছিল যা জাতি বা ভৌগোলিক সীমার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দিতে পারে।

গ্রিক ও রোমানদের চিরাচরিত সরকারি ধর্ম মূলত জাগতিক সাফল্য ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিত, কিন্তু ব্যক্তিগত মোক্ষ বা পরকালের নিশ্চয়তা দিতে পারত না। ঠিক এই সময়েই মিশরীয় দেবদেবী বিশেষত আইসিস, ওসাইরিস, এবং তাদের সঙ্গে নবগঠিত দেবতা সেরাপিস-কে কেন্দ্র করে নতুন রহস্য ধর্মগুলি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

গ্রিক-মিশরীয় রহস্য ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হলো দেবতা সেরাপিস। টলেমি প্রথম সোটার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই দেবতার সৃষ্টি করেন। মিশরের নতুন গ্রিক শাসকদের স্থানীয় মিশরীয়দের সঙ্গে ধর্মীয় সেতুবন্ধন তৈরির উদ্দেশ্যে এই দেবতাকে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

সেরাপিস ছিলেন গ্রিক দেবতাদের বৈশিষ্ট্য ও মিশরীয় দেব-ধারণার এক চমৎকার মিশ্রণ। তার মধ্যে মিশরীয় দেবতা ওসাইরিস (মৃতদের রাজা) এবং ষাঁড় দেবতা অ্যাপিস-এর উপাদান যেমন ছিল, তেমনি গ্রিক দেবতা জিউস-এর রাজকীয়তা, হেইডিস-এর পাতালে কর্তৃত্ব এবং অ্যাসক্লেপিয়াস-এর আরোগ্যের ক্ষমতা যুক্ত হয়েছিল। সেরাপিস হয়ে ওঠেন এক সর্বব্যাপী বিশ্বজনীন (Universal) দেবতা, যিনি জীবন, মৃত্যু এবং নিরাময় সবকিছুর প্রতীক।

তবে এই ধর্মের আসল প্রাণকেন্দ্র ছিলেন দেবী আইসিস। তিনি ছিলেন মিশরীয়দের কাছে মাতৃদেবী, জাদু, প্রকৃতি ও প্রজননের প্রতীক। গ্রিক-রোমানরা তাকে বহু পরিচিত দেবীর সমন্বিত রূপ হিসেবে গ্রহণ করেছিল—যেমন ডিমিটার, আর্টেমিস, এমনকি আফ্রোদিতি। আইসিস হয়ে ওঠেন সেই সর্বজনীন মাতৃদেবী যিনি কেবল করুণা, প্রেম ও জীবনের প্রতিশ্রুতি দেন না, তার অনুসারীদের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি এবং পরকালে অনন্ত জীবনের আশ্বাস দেন।

মিস্ট্রি রিলিজিয়নগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল গোপনীয়তা এবং দীক্ষা । সাধারণের জন্য উন্মুক্ত সরকারি আচারের বিপরীতে, এই ধর্মগুলি কেবল দীক্ষিত অনুসারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। দীক্ষার প্রক্রিয়াটি ছিল একটি প্রতীকী মৃত্যু ও পুনর্জন্মের অভিজ্ঞতা, যা অনুসারীদেরকে দৈব সত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধনে আবদ্ধ করত।

এই ধর্মগুলি অনুসারীদের সঙ্গে দেবতার একটি ব্যক্তিগত এবং আবেগপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দিত, যা চিরাচরিত রাষ্ট্রীয় ধর্মে অনুপস্থিত ছিল। আইসিসের করুণাময় রূপ ভক্তদের জন্য এক গভীর মানসিক আশ্রয় ছিল।

আইসিস ও ওসাইরিসের পৌরাণিক কাহিনি ছিল এই ধর্মের কেন্দ্রীয় বিষয়। দীক্ষার মাধ্যমে অনুসারীরা প্রতীকীভাবে এই দৈব নাটকের অংশ হতেন এবং এর মাধ্যমে পরকালে ব্যক্তিগত পুনর্জীবন ও মোক্ষ লাভের আশা করতেন। আইসিসের আচারে শোভাযাত্রা, নাটকীয় পরিবেশনা, সঙ্গীত এবং পবিত্র জল ব্যবহারের চল ছিল। এই আচারগুলি ছিল প্রাণবন্ত ও দৃশ্যমান, যা গ্রিক-রোমানদের জন্য এক নতুন এবং আকর্ষণীয় ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিল।

গ্রিক-মিশরীয় মিস্ট্রি রিলিজিয়ন শুধুমাত্র মিশরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হেলেনিস্টিক যুগ এবং পরবর্তী রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে আইসিস ও সেরাপিসের কাল্ট পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রোম থেকে পম্পেই, এমনকি দূরবর্তী ব্রিটেনেও তাদের মন্দির ও বেদি আবিষ্কৃত হয়েছে। ধর্মগুলি সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

এই ধর্মগুলি জাতি, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বিশেষত নারীরা আইসিসের কাল্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন, যা ছিল সেযুগে বিরল। গ্রিক-মিশরীয় মিস্ট্রি রিলিজিয়ন ছিল ধর্মীয় সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি দেখিয়েছিল কীভাবে বিভিন্ন সভ্যতার ধর্মীয় ধারণাগুলি সফলভাবে মিশে গিয়ে একটি নতুন, প্রভাবশালী ধর্ম তৈরি করতে পারে।

অনেক পণ্ডিত মনে করেন, এই রহস্য ধর্মগুলির দীক্ষা, প্রতীকী মৃত্যু-পুনর্জন্মের ধারণা এবং মোক্ষ লাভের প্রতিশ্রুতি পরবর্তীকালে খ্রিস্টধর্মের উত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল। এই ধর্মগুলি মানুষের মনকে এমন একটি ব্যক্তিগত পরিত্রাণদাতা দেবতার ধারণার জন্য প্রস্তুত করেছিল।

গ্রিক-মিশরীয় মিস্ট্রি রিলিজিয়ন ছিল প্রাচীন বিশ্বের ধর্মীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায়। এটি কেবল গ্রিক ও মিশরীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ছিল না, এটি ছিল মানবজাতির আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক গভীর বাঁক। হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্যের জন্ম দেওয়া সাংস্কৃতিক শূন্যতাকে পূরণ করে, এই ধর্মগুলি ব্যক্তিগত মোক্ষ, নৈতিক শুদ্ধি এবং পরকালে জীবনের যে আশ্বাস দিয়েছিল, তা সেই সময়ের মানুষকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের উত্থানের ফলে এই ধর্মগুলি বিলীন হলেও, আইসিস ও সেরাপিসের ধারণা এবং তাদের রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠানগুলি সভ্যতার আধ্যাত্মিক স্রোতে যে চিহ্ন রেখে গেছে, তা আজও ইতিহাসের গবেষক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের অনুসন্ধানের এক অফুরন্ত উৎস। গ্রিক-মিশরীয় মিস্ট্রি রিলিজিয়নের রহস্য উদ্ঘাটন করার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসগুলি যুগে যুগে মানুষের পরিবর্তনশীল প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন রূপে প্রকাশিত হয়।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস – মূল্যস্ফীতি কমায় বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি পৌঁছাবে ৪.৮ শতাংশে

মূল্যস্ফীতির চাপ কমার ফলে বেসরকারি ভোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটি বলেছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশ হতে পারে এবং ২০২৭ সালে এটি আরও বেড়ে ৬.৩ শতাংশে পৌঁছাবে। তবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসে আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ আপডেট’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মারাত্মক ব্যাঘাত সত্ত্বেও পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। বহিরাগত খাতের চাপ হ্রাস পেয়েছে, রিজার্ভ হ্রাস স্থিতিশীল হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে।

তবে দেশের অর্থনীতির জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ধীর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির, ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিপূর্ণ এবং রাজস্ব আদায় দুর্বল। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গণআন্দোলনের কারণে প্রথম প্রান্তিকে বড় ধাক্কা খেয়ে পুরো অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি সামান্য কমে ৪.২ শতাংশ থেকে ৪.০ শতাংশে নেমেছে। এর পেছনে বিনিয়োগ স্থবিরতা, উচ্চ সুদের হার ও উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

বেসরকারি বিনিয়োগ কমার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এবং সরকারি বিনিয়োগের হ্রাসকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় এবং মূলধনী পণ্যের আমদানি যথাক্রমে ২৫.৫% এবং ১০.২% কমেছে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও পুরো বছর ঊর্ধ্বগতি ছিল। তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি জিডিপিতে বড় অবদান রাখছে। শিল্পখাতে সামান্য উন্নতি হলেও নির্মাণ খাতে বড় পতন ঘটেছে। বন্যার ধকল কাটিয়ে কৃষিখাত বছরের শেষার্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বাণিজ্য, পরিবহন ও আবাসনের ধীরগতি সেবা খাতকে চাপে রেখেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ পেম, দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসর্গসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা।

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী

এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন তিনজন মার্কিন বিজ্ঞানী জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. দেভোরে এবং জন এম. মার্টিনিস। তারা বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের টানেলিং এবং শক্তির কোয়ান্টাইজেশন প্রমাণ করায় এ স্বীকৃতি পেয়েছেন। সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

নোবেল কমিটি জানিয়েছে, বৈদ্যুতিক সার্কিটে ‘ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং’ এবং ‘এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন’-এর যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তিন বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল একটি সিস্টেমের সর্বাধিক আকার কত হতে পারে, যেখানে এটি কোয়ান্টাম প্রভাব প্রদর্শন করতে সক্ষম।

তারা এমন একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা হাতে ধরা সম্ভব। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই বর্তনী কোয়ান্টাম টানেলিং এবং কোয়ান্টাইজড শক্তি স্তরের মতো কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাব প্রদর্শন করতে সক্ষম। এটি প্রমাণ করে কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল ক্ষুদ্র কণার জগতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বড় ম্যাক্রোস্কোপিক সিস্টেমেও প্রযোজ্য।

১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে এই বিজ্ঞানীরা সুপারকন্ডাক্টর ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক সার্কিটে একাধিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। সার্কিটে দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে আলাদা করেছিল একটি পাতলা অপরিবাহী স্তর, যা ‘জোসেফসন জাংশন’ নামে পরিচিত। সার্কিটে প্রবাহিত ইলেকট্রনগুলোর সম্মিলিত আচরণ পুরো সিস্টেমটিকে একক কণার মতো কার্যকর করে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, সিস্টেমটি এমন এক অবস্থায় থাকে যেখানে ভোল্টেজ ছাড়াই কারেন্ট প্রবাহিত হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম টানেলিং-এর মাধ্যমে এটি বাধা পেরিয়ে যায় এবং ভোল্টেজের উপস্থিতি তার অবস্থার পরিবর্তনের সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া সার্কিটটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা নির্গত করতে পারে—যা কোয়ান্টাইজড শক্তি স্তরের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে এরিকসন বলেন, “এক শতাব্দী পুরোনো কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখনও আমাদের নতুন চমক দিচ্ছে। এটি কেবল মুগ্ধকর নয়, অত্যন্ত কার্যকরও।” এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং সেন্সর প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

তিন বিজ্ঞানীর এই কাজ প্রমাণ করে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেবল ক্ষুদ্র কণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, হাতে ধরা যায় এমন বড় সিস্টেমেও কার্যকর, যা আধুনিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশে এখনো টেকসই ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি : ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনো টেকসই ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তিনি মনে করেন, জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এমন একটি স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা না হলে দেশের উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অ্যাপোস্টলস অব ডেভেলপমেন্ট: সিক্স ইকোনমিস্ট অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে মেড’ শীর্ষক বই নিয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক। প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড সি. এঙ্গারম্যান রচিত অ্যাপোস্টলস অব ডেভেলপমেন্ট বইটিতে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়জন প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদের চিন্তাধারা ও তাদের বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই ছয়জন অর্থনীতিবিদ হলেন—বাংলাদেশের রেহমান সোবহান, পাকিস্তানের মাহবুব উল হক, ভারতের অমর্ত্য সেন, মনমোহন সিং ও জগদীশ ভাগবতী, এবং শ্রীলংকার লাল জয়াবর্ধনে। এরা সবাই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং উন্নয়ন তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সেমিনারে বক্তব্যে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “আমরা এখনো এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি যা নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। ফলে আমাদের লক্ষ্য এখন সীমিত—কিছু মৌলিক উন্নয়ন অর্জন করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে, বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ থাকবে এবং সংসদ হবে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর।”

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তার মতে, বাজারভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে আসা সম্ভব নয়, তবে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন বাজারব্যবস্থা ন্যায্যতা ও সামাজিক সমতা বজায় রাখে। “গণতান্ত্রিক উত্তরণ সফল হলে নীতিনির্ধারণে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তখন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান ও আদর্শ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে—কে বাম, কে ডান, কে মধ্যপন্থী।”

সেমিনারে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গত কয়েক দশকে উন্নয়ন ও নীতি সংস্কারের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমেনি; বরং বেড়েছে। গত ১৭ বছরে আমরা অনেক সংস্কার দেখেছি, কিন্তু বৈষম্য কমাতে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে কিছু গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। গরিব মানুষ জমি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর না হলে উন্নয়ন কখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।”

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সেলিম রশিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ।

বক্তারা একমত হন যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে জবাবদিহিমূলক শাসন, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর—যেখানে উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং মানুষের জীবনের মানোন্নয়নেও প্রতিফলিত হবে।