১৯৮১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তযুক্ত ঋণ কর্মসূচি এবং সেগুলোর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন গ্রিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেটসস ও আন্দ্রেয়াস সিন্টোস। তাদের ‘দি ইফেক্টস অব আইএমএফ কন্ডিশনাল প্রোগ্রাম অন দি আনএমপ্লয়মেন্ট রেট’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, কঠোর শর্তের অধীনে ঋণ নেওয়া দেশগুলোতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা গভীরতর হয়।
গবেষকরা আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিসংখ্যান ও ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বাজেট ঘাটতি কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ, শ্রমবাজার উদারীকরণ এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো শর্ত বাস্তবায়নের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে।
কভিড-১৯ মহামারীর পর বাংলাদেশও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের স্থবিরতার প্রভাবে তৎকালীন সরকারকে ২০২২ সালের শেষের দিকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়। ঋণগ্রহণের শর্ত হিসেবে মেনে নিতে হয় অর্ধশতাধিক শর্ত। এসব শর্ত পূরণ করার প্রক্রিয়ায় দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হয় এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে।
২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আইএমএফ ঋণ কর্মসূচিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। ওই সময়ে শুরু হয় সংস্থাটির চাপিয়ে দেওয়া শর্ত বাস্তবায়ন। সরকার ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা বলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে। জুনে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশের সীমা তুলে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বেড়ে যায়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যায় এবং সরকারি ব্যয় কৃচ্ছ্রসাধন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল সংকুচিত হয়। এসব উদ্যোগের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয় এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পায়।
স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণদের (১৫–২৯ বছর বয়স) বেকারত্ব ২০১৯ সালে ১১.৫৯ শতাংশ ছিল। কভিড-১৯-এর প্রভাবে ২০২০ সালে বেড়ে ১৩.২৯ শতাংশ হয়। ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে এটি কমে আসলেও ২০২৪ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়ে ১১.৪৬ শতাংশে পৌঁছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা ও সরকারি ব্যয়ের কৃচ্ছ্রসাধনের প্রভাব দৃশ্যমান।
আইএমএফ ঋণের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতাও এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ। শর্ত পূরণের কারণে বাজেট সংকুচিত হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ৩৩টি দেশের উপর আইএমএফ ঋণের প্রভাব নিয়ে ‘ব্যান্ডেজ অন আ বুলেট উন্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, সরকারি খরচ কমানো, নিয়োগ বন্ধ করা এবং বেতন কাটা বা স্থগিত রাখার ফলে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) উল্লেখ করেছেন, আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য সরকার অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা সম্প্রসারণ বন্ধ থাকায় ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারেও ঋণ এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ স্থিতি ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ, যা ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফ ঋণের প্রভাব পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। ঋণগ্রহণের ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কেবল ঋণের সুদহার বৃদ্ধি বা শর্তের কারণে হয় না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট বেকার ২৫ লাখ ৮০ হাজার, যার মধ্যে তরুণ বেকারের সংখ্যা ২১ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখ ৬০ হাজারে নেমে আসে, তরুণদের মধ্যে ১৯ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৪ সালে বেকার জনসংখ্যা বেড়ে ২৬ লাখ ২০ হাজার, যার মধ্যে তরুণ বেকার ২০ লাখে পৌঁছে। আইএমএফ ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের ফলে কর্মসংস্থান ও তরুণ বেকারত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
জাহিদ হোসেন ও ফাহমিদা খাতুনের মত অনুযায়ী, দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের ঋণ শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী সমাধান প্রদান করে, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন অপরিহার্য।


