Home Blog Page 59

ধুপের ধোঁয়া ও তাবিজের শাসনে বাংলার ভূত তাড়ানোর লোকজ বিজ্ঞান

যেখানে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছায় না, সেখানে আজও ছায়ারা ঘোরে। আমাদের গ্রামবাংলার অলিতে গলিতে, বাঁশবনের পাতায়, শীতের রাতের নিস্তব্ধতায় ‘ভূত’ নামে এমন বহু অদৃশ্য অস্তিত্বের বিশ্বাস টিকে আছে। কিন্তু এ ভূতেরাও চিরকালের অতিথি নয়। বাংলার মানুষ জানত, কীভাবে তাদের তাড়াতে হয়, শান্ত করতে হয়, কিংবা বোঝাতে হয় “এখানে আর জায়গা নেই।” যেগুলো আজ প্রায় বিলুপ্ত, কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে ওঝার ধূপদানি, শ্মশানঘাটের কুয়াশা আর মানুষের স্মৃতিতে।

বাংলায় ভূত মানে একরকম নয়। এই ভূতেরও শ্রেণি আছে, আছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও আচরণ। শাকচুন্নি হলো বিয়ের আগেই মারা যাওয়া নারী, যে অন্য নারীদের জীবনে হানা দেয়। পেত্নী অনেকটা প্রতিশোধপরায়ণ আত্মা, যাকে হত্যার শিকার বলা হয়। আলভূত সাধারণত শিশুদের টার্গেট করে এবং গাছে বসবাস করে বলে বিশ্বাস। ডাইন ছিল একধরনের কালো জাদু প্রয়োগকারী আত্মা, যে জীবন্ত মানুষকেও জাদুবলে বশ করতে পারে। এসব ভূতের জন্য আলাদা রিচুয়াল ছিল, আলাদা সাবধানতা, আর আলাদা ধরনের ভয়।

বিশ্বাসে বেঁচে থাকা প্রতিরোধ –

ধুনো ও ধূপ:
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের কোণে কোণে ধূপ ধরার রীতি ছিল অনেক গ্রামে। সুগন্ধি ধূপে সরিষা, নিমপাতা ও শুকনো লঙ্কা জ্বালিয়ে ঘরের বাতাস ‘শুদ্ধ’ করা হতো। বিশ্বাস ছিল, ভূত ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না।

উল্টো কলসি:
রোগাক্রান্ত কাউকে নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে ওঝা মাটিতে উল্টো করে কলসি বসিয়ে তাতে সাতটি বিশেষ মন্ত্র ফুঁকতেন। বিশ্বাস ছিল যদি কলসি ফেটে যায়, ভূত দেহ ছেড়ে দিয়েছে।

কালো সীমানা ও লাল সুতা:
ভূতের প্রবেশ ঠেকাতে বাড়ির চারপাশে কালি দিয়ে সীমানা টানা হতো। নবজাতকের কোমরে লাল সুতা, গলায় তাবিজ এবং কপালে কালো টিপ দেওয়া হতো ‘আলভূত’ থেকে বাঁচাতে।

বিশেষ কিছু রিচুয়াল সম্পন্ন হতো গভীর রাতে, অনেকসময় শ্মশানের পাশে। তান্ত্রিকরা একে বলতেন শ্মশানমন্ত্র সাধনা। এ সময় শ্মশানের আগুন থেকে কাঠ এনে ঘরে জ্বালানো হতো, যার পবিত্র আগুনে ভূত পালায় বলে বিশ্বাস। কিছু অঞ্চলে মৃতের পোড়ার জায়গার মাটি সংগ্রহ করে তা বাড়ির চারপাশে ছিটানো হতো, যেন মৃত আত্মা ফিরে না আসে।

‘ভূত ধরেছে’ কথাটি নারীর প্রতি সমাজের এক প্রকার দমননীতির মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে নতুন বউকে ‘শাকচুন্নি ধরেছে’ বলে নির্যাতন চালানো হতো। তাকে আট রাতে আট রঙের শাড়ি পরানো, কাঁচা রসুন দিয়ে ঘষানো, বাঁশবনে দাঁড় করিয়ে বিশেষ মন্ত্র পড়া ইত্যাদি চলতো। এইসব আচারে একদিকে ছিল লোকজ চিকিৎসা, আবার অন্যদিকে ছিল লুকোনো নিপীড়ন।

সন্তান রাতে ঘুমের মধ্যে কাঁদছে, বৃদ্ধা হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন, এসব ছিল ভূতের ধরা। এই বিশ্বাস থেকেই শুরু হতো রিচুয়াল। ধান, লবণ, সরিষা দিয়ে শরীর ঝাড়ানো; হাঁস বা পাঁঠা বলি দেওয়া। সরিষার তেল মাথায় ঢেলে চুলায় ফেলা, “ভূতের আগুনে পুড়ুক” এমন ধারণা। আজ এসব ঘটনাকে মানসিক রোগের লক্ষণ বলা হলেও, তখনকার সমাজে রিচুয়ালই ছিল চিকিৎসা ও প্রতিকার।

বাউল-ফকিরদের মধ্যে একটি পৃথক ভাবধারা ছিল, যেখানে ভূত মানে বাইরের কিছু নয়, নিজের ভেতরের ভয়, লালসা, অহং। তারা গান, সাধনা আর দেহতত্ত্বে ভূত তাড়াতেন মনকে পবিত্র রাখার মাধ্যমে।

আজ এই রিচুয়ালগুলো হয়ত লোকবিশ্বাস হিসেবে পাঠ্যবইয়ে স্থান পেয়েছে, কিন্তু অনেক গ্রামেই এখনও ওঝা ডাকানো হয়। শিশুর কপালে এখনো কালো টিপ, গলায় তাবিজ, পেছনের দরজায় উল্টো ঝাড়ু, এসব প্রথা এখনো বহন করে লোকমানসের ভয় আর প্রতিরোধ। এমনকি শহরেও কোনো কোনো বাড়িতেও অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে “ এবার তাবিজ-পুঁতির দিকটাও দেখাও” বলা হয়। ভূত তাড়ানোর এই চর্চাগুলো এখন anthropology, folklore studies, এবং cultural psychiatry-র গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

গ্রামবাংলার ভূত তাড়ানোর রিচুয়ালগুলো শুধুই অতিপ্রাকৃত নয় তারা সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক। এই রিচুয়ালগুলো আমাদের ভয়কে সংগঠিত করত, ভয়কে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করত। তাই এই রিচুয়াল মানে শুধুই ভূত নয়, বরং ভয়কে মোকাবেলার এক চিরায়ত পদ্ধতি।আজ তারা হারিয়ে গেলেও, কোথাও যেন এখনো বাঁশবনের ভেতর একটা ধূপের ধোঁয়া হয়ে উড়ছে। সে ধোঁয়ার গন্ধেই হয়তো কোনো একদিন আমরা চিনে ফেলবো নিজেরই কোনো হারিয়ে যাওয়া ভয়কে।

‘The Future I Saw’ মাঙ্গার মিথ থেকে আতঙ্ক

২০২৫ সালের জুলাই মাসে জাপান-ভ্রমণে আগ্রহী হাজার হাজার পর্যটক হঠাৎ সফর বাতিল করতে শুরু করলেন। এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বাতিল করল, হোটেল বুকিং হ্রাস পেল। সাধারণের মনে প্রশ্ন, জাপানে কি কোনো বড় বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে?

না, এটির ভিত্তি কোনো বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। আতঙ্কের উৎস একটি মাঙ্গা ‘The Future I Saw’। এই একটি শিল্পকর্ম কীভাবে একটি দেশের পর্যটন ব্যবস্থা, গণমানসিকতা ও মিডিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, তার এক গভীর ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ ভাবার মতো।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় Ryo Tatsuki রচিত মাঙ্গা ‘Watashi ga Mita Mirai’ বা ‘The Future I Saw’। Tatsuki নিজেকে লেখক নন, বরং ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার দাবি তিনি ভবিষ্যতের ঘটনা স্বপ্নে দেখেন এবং সেগুলোই ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

এই মাঙ্গার বিশেষ গুরুত্ব জন্ম নেয় যখন দেখা যায়, এতে ২০১১ সালের টোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি-এর কথা পূর্বেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবের সাথে মিলে যাওয়ার কারণে Tatsuki-র মাঙ্গা এক ধরণের আধা-মিথিক সাংস্কৃতিক সম্মান লাভ করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে মাঙ্গাটির পুনর্মুদ্রণ হয়, এবং সেখানে এগিয়ে আসে নতুন একটি ভবিষ্যদ্বাণী, “A catastrophic event will occur in July 2025!”

মাঙ্গায় কোনো নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ ছিল না। কিন্তু পাঠক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা এটিকে ৫ জুলাই ২০২৫ হিসেবে ছড়িয়ে দিতে থাকে। TikTok, YouTube, Reddit ও বিভিন্ন ব্লগে এই তথ্য প্রচারিত হয়। অদ্ভুতভাবে অনেকেই তা বিশ্বাস করতে শুরু করে।এর ফলে Hong Kong Airlines, Greater Bay Airlines-এর মতো সংস্থাগুলো জানায়, তারা হংকং থেকে জাপানগামী জুলাই ও আগস্ট মাসের বহু ফ্লাইট বাতিল করেছে। এক হংকং-ভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সির মতে, “৫০% ক্লায়েন্ট শেষ মুহূর্তে জাপান সফর বাতিল করছেন, বিশ্বাসের ভিত্তি শুধু একটি মাঙ্গা।”

এই ঘটনাটি কেবল গুজব নয়, বরং এক প্রকার সংস্কৃতি-নির্ভর সামাজিক আতঙ্ক (cultural panic)-এর প্রতিচ্ছবি। আতঙ্ক নিজে যেমন সামাজিক শক্তি, তেমনি তা শিল্প ও মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

এখানে ভয় চারটি স্তরে কাজ করে। পূর্ব-ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা, Tatsuki অতীতে সঠিক বলেছিলেন বলে এবারও তাকে বিশ্বাস করা হয়।জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় জনগণের মধ্যে ভয় সহজেই জন্মায়। মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম এই ভয়কে বারবার পুনরুৎপাদন করে। জাপানসহ পূর্ব এশিয়ার বহু সংস্কৃতিতে ভবিষ্যদ্বাণী ও পূর্বলক্ষণ বিশ্বাসযোগ্য ধরা হয়।

এই আতঙ্ক বাড়তেই লেখিকা Ryo Tatsuki-কে সামনে আসতে হয়। তিনি বলেন, “আমি কোনো ভবিষ্যদ্বক্তা নই, আমি শুধু স্বপ্ন দেখি এবং তা আঁকি। ‘জুলাই ২০২৫’-এ কী হবে, আমি তা জানি না। স্বপ্নের মধ্যে কোনো তারিখ দেখলে তা বাস্তবে ঘটবে এমনটা বিশ্বাস করার যৌক্তিকতা নেই।” তবে এই ব্যাখ্যা আর কতটা কার্যকর তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ একবার যখন একটি কাল্পনিক ভয় বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয়, তখন তা অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে শুরু করে বাস্তব সমাজে।

‘The Future I Saw’ মাঙ্গাটি একাধারে আধুনিক কল্পনার মিথ এবং মিডিয়া-কনস্ট্রাক্টেড বাস্তবতা। এটি দেখায় কিভাবে একটা শিল্পকর্ম, যখন গণবিশ্বাসের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তা বাস্তবের মতোই বাস্তব হয়ে ওঠে। তথ্য ও যুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও, মানুষ কেন একটি মাঙ্গাকে বিশ্বাস করে? কারণ মানুষ শুধুমাত্র তথ্য চায় না, তারা নিরাপত্তার অর্থ, কল্পনার ব্যাখ্যা এবং সামষ্টিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিও খোঁজে। এমনকি ভয়ও যখন সম্মিলিত হয়, তখন তা এক ধরণের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান তৈরি করে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন : গাজায় ইসরায়েলি ‘গণহত্যায়’ সহযোগিতা করছে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি

অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এক নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এতে যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার যুদ্ধে সহযোগিতা করছে, তাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্রান্সেসকা আলবানিজের এই সর্বশেষ প্রতিবেদন আগামী বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। এই তদন্তে মোট ৪৮টি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের জায়ান্ট মাইক্রোসফট, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ইনকরপোরেটেড এবং অ্যামাজনের নাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইসরায়েলের এই চিরস্থায়ী দখলদারিত্ব অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আদর্শ এক পরীক্ষার মাঠে (টেস্টিং গ্রাউন্ড) পরিণত হয়েছে—যেখানে সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই ব্যাপক, নজরদারির সুযোগ নেই বললেই চলে এবং জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। বিনিয়োগকারী ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবাধে মুনাফা অর্জন করছে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর শুধু দখলদারিত্বে জড়িয়ে পড়ছে না, বরং তারা সম্ভবত “গণহত্যার অর্থনীতির” অংশ হয়ে উঠছে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব তথ্য-উপাত্তই দেখায় যে কেন ইসরায়েলের গণহত্যা থামছে না। কারণ এতে অনেকেরই মোটা অঙ্কের লাভ হচ্ছে।

ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করছে। এতে আটটি দেশের কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ কোম্পানি জড়িত। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন। তবে এই যুদ্ধবিমানের বিভিন্ন অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি ও তাদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সরকারের ব্যবহারের সুবিধা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট এবং অ্যামাজন ইসরায়েলকে তাদের ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে প্রায় পুরোপুরি প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা ইসরায়েলের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নজরদারির ক্ষমতা বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইটি প্রতিষ্ঠান আইবিএম ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্যদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি, দেশটির অভিবাসন ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের বায়োমেট্রিক ডেটাবেজ পরিচালনার দায়িত্বও পালন করছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম পালান্টির টেকনোলজিস ‘স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের’ সক্ষমতা সম্পন্ন ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নজরদারি প্রযুক্তি দিয়েছে, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং ‘ল্যাভেন্ডার’, ‘গসপেল’, ‘হোয়্যার’স ড্যাডি’ এর মতো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু তালিকা তৈরি করা হয়।

বিশ্বের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই যুদ্ধ হয়ে উঠেছে লাভের সুবর্ণ সুযোগ। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সামরিক বাজেট ৬৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে অন্যতম।

বিশেষ করে অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতের তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে বিপুল মুনাফা করেছে।

ট্রোলিং বনাম অ্যাকটিভিজম – ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র

বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ মানুষই এই মাধ্যমকে বেছে নেন তাদের মতামত প্রকাশের জন্য। একদিকে যেমন অ্যাকটিভিজম বা সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কণ্ঠ উঠছে, অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ট্রোলিং নামক এক বিষ। এই দুইয়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে এক গভীর দ্বন্দ্ব।

ট্রোলিং বলতে বোঝায় কাউকে উসকানো, অপমান করা বা বিদ্রূপের মাধ্যমে মানসিক আঘাত দেওয়া। অনলাইনে ট্রোলিং এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বাংলাদেশে ট্রোলিংয়ের কয়েকটি ধরন প্রচলিত, যেমন: টেক্সট-ভিত্তিক, ভিডিও এবং ছবি বা মিম ব্যবহার করে ট্রোলিং। ট্রোলিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো—গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে অপমান ও মানসিক চাপ সৃষ্টি।

অ্যাকটিভিজম হলো একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা, যা সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণসচেতনতা বাড়ানো। বর্তমানে অ্যাকটিভিজম শুধু রাস্তার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিষয়ে মানুষ সোচ্চার হচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অনেক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। যেমন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নতুন আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়া নারী অধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে #MeToo হ্যাশট্যাগটি নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানজনিত বিষয়গুলোকে সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

ট্রোলিং যেখানে সস্তা বিনোদন, সেখানে অ্যাকটিভিজম একটি দায়িত্বশীল আচরণ। ট্রোলিংয়ের ভয় ও চাপ অ্যাকটিভিজমের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর মুক্ত মতপ্রকাশের জায়গা নয়; বরং এটি ভয় ও হুমকির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রোলিংয়ের শিকারদের মধ্যে অধিকাংশই ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে নারী ও ধর্মীয়-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তরুণ অ্যাকটিভিস্টরাও এর শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশে নারী হয়রানি ও ট্রোলিংয়ের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফেইসবুক, টিকটক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামে নারীদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অপমানজনক মিম, এডিটেড ভিডিও ও ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এই ট্রোলিং ও ডিজিটাল হয়রানি শুধু মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে না, নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব হয়রানিকারীর পরিচয় অজ্ঞাত থাকে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু অনলাইন সমস্যা নয়, একটি সাংস্কৃতিক চর্চার রূপ নিচ্ছে। দ্রুত প্রতিরোধ না করলে নারীর নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহিংসতা আরও ভয়াবহ হতে পারে।

কিছু মানুষ তথ্য যাচাই না করেই ট্রোলিং শুরু করেন, মিথ্যা রটনার মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। অনেকে যাচাই না করেই মিম, ভিডিও বা পোস্টে বিশ্বাস করে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। ফলে অনেকে ভিন্নমত প্রকাশে ভয় পান।

এই দ্বন্দ্ব তখনই শেষ হবে, যখন মানুষ সহনশীল মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। শেয়ার করার আগে তথ্য যাচাই করা জরুরি। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল এথিকস, দায়িত্বশীলতা ও সাইবার সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রিপোর্টিং, ফ্যাক্ট-চেকিং ও কনটেন্ট ফিল্টারিং আরও কার্যকর করতে হবে।

সরকার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব হলো এই ভয়ের পরিবেশ দূর করা এবং এমন সমাজ গড়ে তোলা—যেখানে ভিন্নমত ও যুক্তিভিত্তিক তর্ক থাকবে, কিন্তু অপমান ও দমনের প্রবণতা থাকবে না। তবেই ট্রোলিং বন্ধ হবে এবং অ্যাকটিভিজম সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, গণতন্ত্র শুধু ভোটাধিকারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

Quantum physics – ‘স্পর্শ’ মস্তিষ্কের একটি বিভ্রম!

মানবজগতে ‘স্পর্শ’ এক গভীর বাস্তব অভিজ্ঞতা। হাত দিয়ে কিছু ধরলে, ত্বকের সঙ্গে অন্য কিছুর মিলন ঘটলে আমরা বুঝি ‘স্পর্শ করেছি’। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, এই অনুভবটা আদতে একটি বিভ্রম। বাস্তবিক অর্থে কোনো বস্তু আরেক বস্তুকে স্পর্শ করতে পারে না। কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুযায়ী, যেটাকে আমরা “ছোঁয়া” ভাবি, তা কেবলমাত্র কণিক-স্তরের বিকর্ষণ বলের একটি স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া।

প্রতিটি বস্তুই গঠিত হয় পরমাণু দিয়ে। একটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন), এবং তার চারপাশে নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘোরে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রন সব বস্তুতে থাকে এবং পরমাণু ও বস্তুগুলোর আচরণ নির্ধারণে তা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইলেকট্রন একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। একাধিক ইলেকট্রন একে অপরকে সবসময়ই বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ তারা একে অপরের কাছাকাছি আসতে চায় না। এই বিকর্ষণ ক্ষমতা খুব ক্ষুদ্র মাপের হলেও, একসাথে লক্ষ লক্ষ কণা যখন প্রতিক্রিয়া করে, তখন তার প্রভাব মানব ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভবযোগ্য হয়। অর্থাৎ ন্যানোস্কেল বলবিন্যাসই হয়ে ওঠে ম্যাক্রোস্কেল বাস্তবতা।

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের একটি মৌলিক নিয়ম হলো Pauli Exclusion Principle। এই নিয়ম অনুযায়ী, দুটি ইলেকট্রন কখনও একই কোয়ান্টাম অবস্থানে থাকতে পারে না। তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একে অপরকে ঠেলে দেয়। ফলে একটি বস্তু যখন আরেকটির খুব কাছাকাছি আসে, তখন তাদের ইলেকট্রন শেলগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী বিকর্ষণ বল তৈরি হয়। এই বলই প্রতিনিয়ত আমাদের আশেপাশের সবকিছুকে আলাদা রাখে। যে টেবিল কেউ ছুঁয়ে বসে আছে, তার পৃষ্ঠের ইলেকট্রনগুলো তার আঙুলের ইলেকট্রনগুলোকে ঠেলে দেয়। অথচ আমরা এই ঠেলাটাকেই “ছোঁয়া” বলে মনে করি। এই বিকর্ষণকে বলা হয় electromagnetic repulsion, যা চারটি মৌলিক বলের একটি। এটি শুধু পদার্থের কাঠামোকে ঠিক রাখে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আচরণও নির্ধারণ করে।

ইলেকট্রনের মধ্যকার বিকর্ষণ কেবল স্থির কোনো বল নয় বরং এটি ঘটে ফোটন বিনিময়ের মাধ্যমে। ফোটন হলো আলোর কণা, তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় এটি “force carrier” হিসেবেও কাজ করে। এই আলো কণা (ফোটন) এক ইলেকট্রন থেকে অন্য ইলেকট্রনে দ্রুত আদান-প্রদান হয়ে তৈরি করে একটি বলের অনুভব। এই বিনিময়ের মাধ্যমে ইলেকট্রন বুঝে ফেলে যে, তার সামনে আরেকটি কণা রয়েছে এবং সে একে ঠেলে দেয়। এই কার্যপ্রণালী হয় এত দ্রুত এবং এত ক্ষুদ্র স্কেল-এ যে তা আমাদের উপলব্ধির বাইরে। তবুও সেই বিনিময়ের মাধ্যমেই আমাদের বাস্তবতা তৈরি হয়। একে বলে force mediation, অর্থাৎ বল কিভাবে কণার মাধ্যমে স্থানান্তর হয়।

যখন আমরা একটি বস্তুতে হাত রাখি, ধরা যাক, একটি কাঁচের টেবিল, বাস্তবে আমাদের হাতের কণাগুলো আর ঐ বস্তুর কণাগুলো কখনো একে অপরকে সরাসরি ছোঁয় না। তারা একটি অদৃশ্য ‘ইলেকট্রনিক সীমাবদ্ধতা’ তৈরি করে। সেই সীমায় যে বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তা আমাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে। মস্তিষ্ক তখন তাকে বলে “স্পর্শ।” বস্তুর গায়ে চাপ দিলে কেন একটি শক্ত প্রতিক্রিয়া পাই? কারণ যত বেশি চাপ দেয়া হয়, বিকর্ষণ বলও তত বেশি বৃদ্ধি পায়। আর সেই বল স্নায়ুতে বেশি সংবেদন পাঠায়। এই ঘটনাটিই চেতনার মধ্যে স্পর্শের একটি বিভ্রম তৈরি করে। এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয় তাপ, টেক্সচার ও গতির প্রতিক্রিয়াও, যা স্পর্শকে বাস্তব বলে মনে করায়, যদিও তা আসলে একটি গাণিতিক শক্তি বিন্যাসমাত্র।

ধরা যাক, কেউ একজন প্রিয়জনের হাতে হাত রাখলে অনুভব করছে একটি উষ্ণতা, নরমত্ব, হৃদয়ের সংযোগ। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলছে, তুমি তাকে ছুঁতে পারো না। তোমার ইলেকট্রনগুলো তার ইলেকট্রনগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে, কোনো এক বিন্দুতে এসে তারা আর কাছাকাছি যেতে পারছে না। কিন্তু সেই ঠেলাটাই তোমার মস্তিষ্ককে বলছে—”তুমি স্পর্শ করেছো।” এই অনুভব কি তবে শুধু স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া? না কি এটা একধরনের ব্যাখ্যাত্মক বাস্তবতা, যেটি তৈরি হয় কণার ঘর্ষণের জাল থেকে? এই প্রশ্নগুলোই আমাদের বিজ্ঞান ও দর্শনের সন্ধিক্ষণে দাঁড় করায়।

দার্শনিক প্রতিফলনে যদি বাস্তবে কেউ কাউকে ছুঁতে না পারে, তাহলে আমাদের যে ভালোবাসা, যে সম্পর্ক, যে আবেগ তা কি কেবল স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া? এই প্রশ্ন মানবজিজ্ঞাসার মূল। বাস্তবতাকে আমরা শুধুই ইন্দ্রিয়ের ব্যাখ্যায় চিনতে শিখেছি। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, সেই ইন্দ্রিয়ও বিভ্রমের শিকার। আমরা যে জগতে বাস করি, তার সবচেয়ে ছোট স্কেল-এ বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা রূপ ধারণ করে। স্পর্শ, শব্দ, রঙ সবই কণিক স্তরে একেকটা বল বা শক্তির বিনিময়।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘বাস্তবতা’ একটি মস্তিষ্কভিত্তিক ভাষ্য না যে বস্তু প্রকৃতপক্ষে আছে, বরং যেভাবে আমরা তা অনুভব করি সেভাবেই তার অস্তিত্ব। স্পর্শের বিভ্রম তাই আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যা অনুভব করে, তার পেছনে সবসময় একটি অতিপারমাণবিক সত্য লুকিয়ে থাকে।

“স্পর্শ” আমাদের জীবনের একটি গভীর মানবিক অনুভূতি। অথচ কোয়ান্টাম দৃষ্টিকোণ থেকে, তা কেবলমাত্র ইলেকট্রনিক বিকর্ষণের ঘর্ষণীয় ফলাফল। আমাদের শরীর ও অন্যান্য যেকোনো বস্তুগুলোর মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, তা কখনোই পুরোপুরি দূর হয় না। সেই সীমাবদ্ধ দূরত্বেই তৈরি হয় বাস্তবতার স্পর্শ।

সংঘাত ও শান্তির দ্বিমুখী যাত্রা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম বরাবরই এক শক্তিশালী ও দ্বিমুখী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এর বহুমুখী প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বৃহত্তর সমাজ গঠনেও রেখেছে গভীর ভূমিকা।

ধর্মের মৌলিক শিক্ষাগুলোতে সাধারণত শান্তি, সহনশীলতা ও ভালোবাসার কথা বলা হলেও, ইতিহাস ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে অসংখ্য সংঘাত দেখা গেছে।

যখন ধর্মীয় পরিচয় একটি গোষ্ঠীর একমাত্র বা প্রধান পরিচয়ে রূপান্তরিত হয়, তখন তা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস ও বৈরিতা জন্ম দেয়। এই ‘আমরা বনাম ওরা’ মানসিকতা অনেক সময় জাতিগত বা নৃতাত্ত্বিক বিভাজনের সাথে মিশে ভয়াবহ সংঘাতের জন্ম দেয়। যেমন, বসনিয়ার গৃহযুদ্ধ বা রুয়ান্ডার গণহত্যায় ধর্মীয় বিভাজন জাতিগত সংঘাতকে তীব্র করেছিল।

কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বা মতবাদকে কঠোর, আক্ষরিক ও অসহিষ্ণুভাবে ব্যাখ্যা করে। এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রায়শই ভিন্নমতের প্রতি চরম বিদ্বেষ তৈরি করে এবং মৌলবাদ ও চরমপন্থার জন্ম দেয়। এই উগ্রবাদী ধারণাগুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং বহুমাত্রিক সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই ধরনের উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রচার আরও সহজ হয়ে উঠেছে, যা তরুণদের মধ্যে বিভেদ ও সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে।

ধর্মকে প্রায়শই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের বা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক নেতারা জনসমর্থন আদায় বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে সুকৌশলে ব্যবহার করেন। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোতেও ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা ও সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট বা ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোতে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার স্পষ্ট।

ধর্মীয় বিভাজন প্রায়শই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের সাথে জড়িত থাকে। যখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রান্তিক বা বঞ্চিত হয়, তখন তাদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি জন্ম নেয়, যা সংঘাতের ইন্ধন যোগায়। এই ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় কেবল একটি অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু মূল কারণ থাকে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসমতা।

ধর্ম সংঘাতের কারণ হতে পারলেও, এটি মানব ইতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্মিলনেও এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিটি ধর্মেরই মূল বার্তা ক্ষমা, সহানুভূতি, ন্যায়বিচার, ভালোবাসা এবং সহাবস্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এই সার্বজনীন মূল্যবোধগুলো সংঘাত নিরসন এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। যখন এই মূল্যবোধগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন বিভেদ দূর হয়ে সম্প্রীতির সম্পর্ক তৈরি হয়।

বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া শান্তি প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ভুল ধারণা ভেঙে দেয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা তৈরি করে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এটি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং সহনশীলতা ও সহযোগিতার পথ খুলে দেয়।

ধর্মীয় শিক্ষা প্রায়শই ক্ষমা, পুনর্মিলন এবং অতীতের ভুল ভুলে নতুন করে শুরু করার উপর জোর দেয়। সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এটি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নিরাময় এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে চার্চের ভূমিকা এবং নেলসন ম্যান্ডেলার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ ধর্মীয় ক্ষমার ধারণার একটি বাস্তব উদাহরণ।

অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেবল আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনা প্রদান করে না, বরং তারা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে। তারা দরিদ্র, বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ায় এবং মানবিক সহায়তা প্রদান করে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ধর্মীয় সংগঠনগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করে, যা সংঘাতের শিকার মানুষদের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নৈতিক কর্তৃত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

ধর্মীয় নেতারা প্রায়শই তাদের সম্প্রদায়ের কাছে গভীর বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেন। তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং নৈতিক কর্তৃত্ব সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে, যা মধ্যস্থতা ও আলোচনার পথ সুগম করে। তারা সংঘাতের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে এবং পক্ষগুলোকে সমঝোতার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন।

ধর্মীয় নেতারা তাদের উপাসনা স্থান এবং ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে শান্তি, সহনশীলতা এবং ঐক্যের বার্তা প্রচার করে জনমত গঠন করতে পারেন। তারা ঘৃণা, বিভেদ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করতে সক্ষম। বিশেষ করে, তরুণদের মধ্যে উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার রোধে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সংঘাতের ফলে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক সহায়তা প্রদানে ধর্মীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা শোকাহতদের সান্ত্বনা দেন এবং নিরাময় প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন, যা সংঘাত-পরবর্তী সমাজে পুনর্মিলনের জন্য অপরিহার্য।

কেবল সংঘাত থামানো নয়, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় নেতারা সামাজিক পুনর্গঠন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্মিলনের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর করতে ভূমিকা রাখেন।

ধর্মের দ্বিমুখী ভূমিকা মানব সমাজের এক জটিল বাস্তবতা। এটি একদিকে যেমন সংঘাত ও বিভেদের কারণ হতে পারে, তেমনি অন্যদিকে এটি শান্তি, সহনশীলতা এবং পুনর্মিলনের এক শক্তিশালী উৎস। যখন ধর্মীয় মতবাদকে সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা সংঘাতের জন্ম দেয়। কিন্তু যখন ধর্ম তার মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ, ক্ষমা ও সহাবস্থানের বার্তা প্রচার করে, তখন তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তাবিজ, মন্ত্র ও বশীকরণের সুতোয় বাংলার লোকবিশ্বাসের রহস্য

কখনো কি এমন হয়েছে, কেউ হঠাৎ এসে বলেছে “তোমার শরীরে বদ নজর লেগেছে”, কিংবা “এই তাবিজটা পরে নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে”?বা বোঝাতে চাইছে পড়া মুখস্থ রাখতে পানিপড়া কতো দারুণ টোটকা?

দক্ষিণ এশিয়ার ভারতবর্ষ ও বিশেষ করে বাংলার জনজীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। তাবিজ, বশীকরণ মন্ত্র, নজর লাগা, ওঝা-পীরের ঝাঁড়া এসব শুধু অলৌকিক বিশ্বাস নয় এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক বেঁচে থাকার উপকরণ, একটি মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার ভাষা।

তাবিজ হলো এক ধরনের লেখা, কখনো কোরআনের আয়াত, কখনো সংস্কৃত মন্ত্র, কখনো অজানা প্রতীকের সমাহার, এগুলো ভাঁজ করে চামড়ার খাপে পুরে গলায়, হাতে বা কোমরে ঝোলানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই লেখাগুলো কিভাবে “শক্তি” হয়ে ওঠে?

ইসলামি তাবিজ সাধারণত কোরআনের আয়াত বা আরবি দোয়া তাবিজে লেখা হয়। “আয়াতুল কুরসি”, “সূরা ফালাক”, “সূরা নাস” ইত্যাদি পঙক্তিকে পবিত্র রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিন্দু লোকাচারে তাবিজ আসে “যন্ত্রতন্ত্র” আর “বীজমন্ত্র” থেকে।ত্রিকোণ, চক্র, পদ্ম বা অক্ষরবিশিষ্ট প্রতীকে দেবতাকে আহ্বান করা হয়। তাবিজের মূল উদ্দেশ্য একটাই, দৃষ্ট অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা, আর অন্তর্গত ভয়কে শান্ত করা।

“প্রেমে ব্যর্থ? শত্রুকে আয়ত্তে আনতে চান? একবার বশীকরণ মন্ত্র চেষ্টা করুন।” এইধরনের বিজ্ঞাপন হয়তো আপনি কোনো ফুটপাতের দেয়ালে দেখেছেন। বশীকরণ মূলত তান্ত্রিক মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে মানুষকে মানসিক বা আধ্যাত্মিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কৌশল।এটা সরলভাবে কেবল প্রেমভিক্ষার জন্য নয়, এক সময় ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার।

হিন্দু তন্ত্রগ্রন্থ “অথর্ববেদ”, “কালিকা পুরাণ” ইত্যাদিতে বশীকরণের নানা রকম মন্ত্র ও পদ্ধতির বিবরণ রয়েছে। মুসলিম সমাজে সিফলি ও রুহানী ইলমে জ্বিন, ফেরেশতা বা আত্মিক শক্তিকে আহ্বান করে কৌশল প্রয়োগ করা হয়। আজকের দিনে ইউটিউব বা ফেসবুকেও এইসব মন্ত্রের আধুনিক সংস্করণ ছড়িয়ে আছে, যা দেখে বোঝা যায় মানুষ এখনও ভালোবাসা, প্রতিশোধ আর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে অদৃশ্য শক্তি’কে বিশ্বাস করে।

গ্রামীণ বাংলায় আজও কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের আগে ওঝার কাছে যাওয়া হয়। ‘ঝাঁড়ফুঁক’ শব্দটি এখানে যেমন সাধারণ, তেমনি গভীর সাংস্কৃতিক। ওঝা/ফকির/সাধুরা একদিকে যেমন লোকচিকিৎসক, তেমনি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা। তাবিজ, পানি পড়া, কাঁচি দিয়ে কাটাকাটি, নারকেল ঘুরানো সবকিছু একসাথে চলে। পীরের দেয়া তাবিজ, গিলাফ ছোঁয়া, মানত করা—সবই সেই অদৃশ্য শক্তিকে খুশি করার প্রয়াস।

ব্রিটিশ আমলে এই তাবিজ, মন্ত্র এসবকে অন্ধবিশ্বাস বলে বিদ্রুপ করা শুরু হয়। এমনকি “Witchcraft Act” বা “Magical Remedies Act” চালু করে এসব চর্চা দমন করা হতো। কিন্তু এই উপমহাদেশে বিজ্ঞান ও মন্ত্র সবসময় পাশাপাশি থেকেছে।
একজন কৃষক হয়তো পাকা ধান তুলতে মাঠে তাবিজ পুঁতে দেন, আবার সেই তিনিই বাজারে গিয়ে আধুনিক সার কিনে আনেন। এই দ্বৈততা এখানকার মানসিকতার গভীরে গেঁথে আছে।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাবিজ ও বশীকরণ মন্ত্রের সঙ্গে নারীর সম্পর্কও গভীর। প্রেমে প্রতারণা, স্বামীকে নিজের দিকে রাখা, সন্তান না হওয়া, এসব নিয়ে বহু নারী আজও পীর, ওঝা, তান্ত্রিকের শরণ নেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে নারীর আওয়াজ সহজে শোনা হয় না, সেখানে এই তাবিজ হয়ে ওঠে এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ, যেন অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ দিয়ে নিজের নিয়তি কিছুটা হলেও বদলে ফেলার চেষ্টা। শুধু প্রেমের ক্ষেত্রেই নয়, সন্তানধারণে অক্ষমতা, স্বামীর অবাধ্যতা, পরকীয়া নিয়ন্ত্রণেও তাবিজ বা পানি পড়ার উপর নির্ভরতা সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এগুলো কখনো কখনো প্রতারণার হাতিয়ার হলেও, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক অসহায়ত্ব।

এ বিশ্বাসের বাজারে দালালও আছে। ‘বিশ্ববিখ্যাত কামদেব তান্ত্রিক’, ‘যে কোনো সমস্যার সমাধান ২৪ ঘণ্টায়’—এমন বিজ্ঞাপন ছড়ানো হয় শহরের দেয়ালজুড়ে। এইসব বিজ্ঞাপন মানুষকে দুর্বল মুহূর্তে ঠকায়, ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এদের মাধ্যমে বোঝা যায় এই লোকজ সংস্কৃতি কেবল ধর্ম বা ঐতিহ্য নয়, তা একধরনের অর্থনৈতিক বাজারও হয়ে উঠেছে।

অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, তাবিজ বা মন্ত্র আসলে একধরনের প্লেসিবো ইফেক্ট তৈরি করে। রোগীর বিশ্বাস তাকে মানসিকভাবে শক্ত করে, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। কখনো কোনো তাবিজে আসলেই কিছু নেই, কিন্তু রোগী ভাবে “এটা আমাকে রক্ষা করবে”, ফলে সে স্বস্তি পায়। এই স্বস্তি থেকেই ধীরে ধীরে আরোগ্যের পথ খোলে।

তাবিজ, মন্ত্র বা বশীকরণ এই বিষয়গুলোকে আমরা হয়তো অবৈজ্ঞানিক বলে এড়িয়ে গেলেও কিন্তু এগুলোর ভেতরে রয়েছে এক গহিন মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। যখন চিকিৎসা বা যুক্তি ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে বিশ্বাসে। আর এই বিশ্বাস কখনো আয়াতে বাঁধা, কখনো কালি দিয়ে আঁকা মন্ত্রে। এই বিশ্বাসকে বুঝতে হলে শুধুমাত্র যুক্তিবাদ নয়, বুঝতে হবে ভয়ের ভেতরকার ভাষা, চাহিদার অস্পষ্টতা এবং একাকীত্বের গভীরতাও।

জেডিইজম – স্টার ওয়ার্স থেকে আধুনিক আত্মিকতার এক নতুন ধারা

ধর্ম কি শুধুমাত্র প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা? নাকি তা হতে পারে কল্পনার জগত থেকে উঠে আসা নতুন আত্মিক অভিজ্ঞতা?আধুনিক যুগে ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি ধর্মের উৎস ও রূপেও এসেছে নতুনত্ব। এরই অন্যতম উদাহরণ হলো জেডিইজম (Jediism)। একটি আধুনিক আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক জীবনদর্শন, যার শিকড় জনপ্রিয় সায়েন্স-ফিকশন সিরিজ Star Wars-এর ভিতর থেকে এসেছে। যদিও অনেকেই এটি কেবল ফ্যান কালচারের অংশ মনে করেন, বাস্তবে এটি অনেক অনুসারীর কাছে আত্মউন্নয়ন, নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের শক্তিশালী মাধ্যম।

জেডিইজম কী?

জেডিইজম এমন এক জীবনদর্শন যা “জেডি” চরিত্র ও তাদের নৈতিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রে, জেডিরা হলেন এক ধরনের যুদ্ধবাজ সন্ন্যাসী যারা “The Force” নামক এক সর্বব্যাপী শক্তির মাধ্যমে মহাবিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা করেন। জেডিইজম এই কল্পিত চরিত্র ও তাদের নৈতিকতা বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য ধর্মীয় দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে।

এতে কোনো ঐতিহ্যবাহী ঈশ্বর বা দেবতা না থাকলেও এখানে “The Force” নামের এক অদৃশ্য শক্তিকে আধ্যাত্মিক ধারণা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এটি এমন একটি শক্তি, যা মহাবিশ্বের সকল প্রাণ ও বস্তুতে বিদ্যমান এবং যাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।

২০০১ সালে যুক্তরাজ্যে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আদমশুমারি প্রতিবেদনে প্রায় ৪ লাখ মানুষ নিজের ধর্ম হিসেবে “Jedi” উল্লেখ করে।এই ঘটনা “Jedi Census Phenomenon” নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এটি প্রাথমিকভাবে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হলেও, এর মাধ্যমে জেডিইজম নামক ধারণাটি জনসাধারণের নজরে আসে।

এরপর ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে Temple of the Jedi Order (ToTJO) নামক সংগঠনটি গড়ে ওঠে, যা একটি বৈধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। এই সংগঠন আত্মউন্নয়ন, সহানুভূতি, শান্তি এবং শক্তির ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়ে জেডিইজমের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চা প্রসারিত করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষ নিজেকে জেডি ধর্মবিশ্বাসী হিসেবে দাবি করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে করছাড় পেয়ে ToTJO-কে বৈধ ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

জেডিইজমের মূল বিশ্বাসের ভিত্তি হলো, The Force এক সার্বভৌম শক্তি যা মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা ও প্রাণের সঙ্গে যুক্ত।আত্মজ্ঞান ও ধ্যানের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি সম্ভব। নৈতিকতা, সহানুভূতি ও শান্তির মূল্যবোধের মাধ্যমে জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর করা যায়।

জেডিইজম অনুসারীরা “Jedi Code” মেনে চলেন, যার মূল অংশগুলো হলো:
There is no emotion, there is peace.
There is no ignorance, there is knowledge.
There is no passion, there is serenity.
There is no chaos, there is harmony.
There is no death, there is the Force.

এই নৈতিকতা কেবল কল্পনা নয়; বরং জীবনের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আত্মসংযম, জ্ঞান চর্চা ও মানসিক শান্তি অর্জনের উপায় হিসেবে বিবেচিত।

ধর্ম না দর্শন?

জেডিইজমকে অনেকেই প্যারোডি বা মজার ধর্ম মনে করেন, কারণ এর উৎস একটি কাল্পনিক সিনেমা সিরিজ। তবে যারা এটিকে অনুসরণ করেন, তাদের কাছে এটি একটি বাস্তব ও গভীর আধ্যাত্মিক জীবনধারা। এতে কোনো ঐতিহ্যবাহী মন্দির, যাজক বা পূজা পদ্ধতি নেই।বরং এটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে নিজের নৈতিকতা ও আত্মজীবন উন্নত করার পথ। এখনকার যুগে ধর্মের ঐতিহ্যগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে যারা আধ্যাত্মিকতা খুঁজছেন, তাদের মধ্যে জেডিইজম বিশেষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে অনেক মানুষ ধর্মীয় কুসংস্কার ও জড়তা থেকে দূরে সরে গেছে। তারা এমন একটি পথ খুঁজছেন যা যুক্তি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারে। জেডিইজম এই শূন্যস্থান পূরণে ভূমিকা রাখছে। তরুণদের মাঝে এটি বিশেষ প্রিয়, কারণ এটি প্রথাগত ধর্মের বাইরেও আত্মিক অনুসন্ধান ও নৈতিক জীবনের পথ দেখায়। এটি ধ্যান, জ্ঞানার্জন, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত বিকাশকে উৎসাহিত করে।

জেডিইজম নিয়ে প্রচুর বিতর্কও রয়েছে। অনেক ঐতিহ্যগত ধর্মবিশ্বাসী এটি গ্রহণ করেন না। তাদের মতে, এটি শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য তৈরি একটি কাল্পনিক ধর্ম। আবার কেউ কেউ এটিকে আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেন। যুক্তরাজ্যে ToTJO-র ধর্মীয় স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে কারণ কর্তৃপক্ষের মতে, এটি পর্যাপ্ত ধর্মীয় কাঠামো ও প্রচলিত উপাসনা পদ্ধতি রাখে না।

জেডিইজম কেবল একটি কাল্পনিক চলচ্চিত্রের নকল নয়, বরং এটি আধুনিক মানুষের আত্মিক অনুসন্ধান ও নৈতিক জীবনযাপনের এক নতুন ধারার সূচনা করেছে। এটি প্রথাগত ধর্মের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে একধরনের বুদ্ধিদীপ্ত, নৈতিক ও আত্মসংশোধনী জীবনপদ্ধতি প্রদান করে।

বিশ্বায়নের যুগে যখন ধর্ম বিভাজনের কারণ হয়ে উঠছে, তখন জেডিইজমের মতো নতুন ধর্ম ও দর্শন মানুষকে ঐক্য, শান্তি ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করার সুযোগ সৃষ্টি করছে। এটি একটি আধুনিক, মুক্ত ও যুক্তিবাদী আধ্যাত্মিকতা যা স্টার ওয়ার্সের কল্পিত জগত থেকে উঠে এসে বাস্তব জীবনে নৈতিকতা ও আত্মোন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

সমাজ কীভাবে আমাদের ‘আমি’ গঠন করে?

“তুমি কে?”—এই সহজ প্রশ্নটির পেছনে আছে সমাজবিজ্ঞানের জটিল ও গভীর ব্যাখ্যা। একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে চেনে, নিজের অস্তিত্বকে বোঝে এবং নিজের সত্তাকে গড়ে তোলে, এই গোটা প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় ‘Self’ বা আত্ম-সত্তার গঠন। তবে এই আত্ম-সত্তা কখনোই একা দাঁড়ায় না; এটি গড়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ, পারিপার্শ্বিকতা, পরিবার, সংস্কৃতি ও ভাষার মাধ্যমে। আর এই গঠনের প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় সমাজায়ন বা Socialization।

সমাজায়ন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজের নিয়ম-কানুন, মূল্যবোধ, ভাষা, আচরণ ও ভূমিকা শিখে নেয়। এটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। শিশুর জন্মের পর তার পরিবারই প্রথম সামাজিক শিক্ষালয়, যেখানে সে শেখে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে অন্যদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। পরবর্তীতে বন্ধু, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, ধর্ম, রাজনীতি, এমনকি পপ কালচারও সমাজায়নের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাথমিক সমাজায়ন শিশু অবস্থায় ঘটে; পরিবারই এখানে মুখ্য। গৌণ সমাজায়ন কৈশোর ও পরবর্তী সময়ে ঘটে; বিদ্যালয়, বন্ধু, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি এর উৎস।

আত্ম-সত্তা হচ্ছে সেই ধারণা যা একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে ধারণা করে। আমি কে? আমি কেমন? আমি সমাজে কী ভূমিকা পালন করি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই গড়ে তোলে একজনের Self বা আত্মপরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আত্মপরিচয় কি স্বতঃসিদ্ধ? না কি এটি সমাজের একটি নির্মাণ? সমাজবিজ্ঞানের মত অনুযায়ী, আত্ম-সত্তা প্রাকৃতিক নয়, সামাজিকভাবে নির্মিত। অর্থাৎ মানুষ জন্মগতভাবে ‘আমি’ নিয়ে জন্মায় না; বরং সে শেখে কীভাবে ‘আমি’ হতে হয়। এই ‘আমি’ বা Self গঠনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেন Charles H. Cooley ও George Herbert Mead-এর তত্ত্ব।

চার্লস কুলি ‘Looking Glass Self’ ধারণা দেন। তার মতে আমরা নিজেদেরকে যেমন দেখি, সেটা আসলে অন্যেরা আমাদেরকে কীভাবে দেখে, সেই প্রতিফলনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। এই তত্ত্বে তিনটি ধাপ রয়েছে:
১. অন্যেরা আমাকে কীভাবে দেখে।
২. সেই দৃষ্টিভঙ্গির মূল্যায়ন।
৩. এর মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে গর্ব, লজ্জা, আত্মবিশ্বাস অথবা হীনমন্যতা। এই প্রক্রিয়াটি প্রতিদিনের জীবনে ঘটে, কখনো সচেতনভাবে, কখনো অসচেতনভাবে।

জর্জ হারবার্ট মিড আত্ম-সত্তার একটি গভীর ও দ্বৈত গঠন বিশ্লেষণ করেন, তিনি বলেন, Self গঠিত হয় ‘I’ এবং ‘Me’ এই দুই অংশে:
‘Me’: সমাজ থেকে শেখা নিয়ম, প্রত্যাশা, সামাজিক ভূমিকা। এটি সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত অংশ।
‘I’: নিজের স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন প্রতিক্রিয়া। এটি সৃজনশীল ও নতুন। এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় মানুষ নিজের সত্তাকে খুঁজে পায়। যেমন, একজন ছাত্র পরীক্ষার আগে ভাবছে, “আমাকে ভালো করতে হবে, সবাই আশা করছে” এটি ‘Me’। আবার হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলো সে নিজের মতো প্রশ্নপত্র সাজাবে—এটি ‘I’।

ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ব্যক্তি যদি না থাকে, তাহলে সমাজের ধারণা অর্থহীন। আবার সমাজ ছাড়া ব্যক্তির আত্ম-সত্তাও গঠিত হতে পারে না। কেউ একা থাকলেও তার মধ্যে কাজ করে সমাজের নিয়ম, ভাষা, সংস্কৃতি। তাই আত্মপরিচয় ব্যক্তিগত হলেও, তা গভীরভাবে সামাজিক।

ডিজিটাল যুগে আত্ম-সত্তার ধারণা আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ curated self বা সাজানো আত্মপরিচয় তৈরি করছে। একজন মানুষ হয়তো বাস্তবে লাজুক, কিন্তু অনলাইনে সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও জনপ্রিয়। এখানেই প্রশ্ন উঠে কোনটা আসল Self?

এরিক গফম্যান আত্মপরিচয়ের একটি অভিনয়গত ব্যাখ্যা দেন, যা The Presentation of Self in Everyday Life বইতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর মতে প্রতিদিন আমরা যেন একটি মঞ্চে অভিনয় করি—একেকটি সামাজিক পরিস্থিতিতে আমরা একেক রকম ভূমিকা পালন করি। এই ভূমিকার পেছনে থাকে সামাজিক প্রত্যাশা, পরিচিতি রক্ষা এবং আত্ম-উপস্থাপনার কৌশল। অর্থাৎ আত্ম-সত্তা কোনো স্থির বা একমাত্রিক সত্তা নয়; এটি পরিবর্তনশীল, পরিস্থিতিনির্ভর এবং অভিনয়ভিত্তিক। এই তত্ত্বটি আধুনিক ডিজিটাল যুগে আরও প্রাসঙ্গিক, যেখানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব হলো সেই মঞ্চ যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের পছন্দসই ‘আমি’ উপস্থাপন করি। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন নির্ভরশীল, দ্বিধাগ্রস্ত অথবা অস্পষ্ট হতে পারি, অনলাইনে আমরা হতে পারি নিখুঁত, পরিপাটি ও জনপ্রিয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্ম-সত্তা একটি নিরবচ্ছিন্ন উপস্থাপনা, যেখানে ব্যক্তি তার সমাজ, সময় ও প্রযুক্তির আলোকে নিজের পরিচয় গঠন ও উপস্থাপন করে চলে প্রতিনিয়ত। এইভাবেই ব্যক্তি নামক এককটি হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক বিন্যাসের এক অপরিহার্য অংশ।

আত্ম-সত্তা ও সমাজায়ন এই দুইটি বিষয় আমাদের ব্যক্তিসত্তা গঠনের মৌলিক স্তম্ভ। মানুষ জন্মগতভাবে ‘আমি’ হয়ে জন্মায় না; সে শেখে, গড়ে উঠে, ও নিজের পরিচয় নির্মাণ করে সমাজের আয়নায়। Cooley-এর আয়না, Mead-এর ‘I’ ও ‘Me’, Goffman-এর উপস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের আত্মপরিচয়কে যেভাবে নির্মাণ করে, তা বুঝতে পারলেই আমরা জানতে পারবো “আমি কে” এই প্রশ্নটি আসলে “আমরা কে” এই প্রশ্নের ছায়া।

ফেভেলার রক্তমাখা স্বপ্ন ‘City of God’

“একটা মুরগি পালাচ্ছে… আর তার পেছনে দৌড়াচ্ছে একদল বন্দুকধারী।”

একটা ছোট্ট দৃশ্য, কিন্তু এটাই হয়তো City of God সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। এই মুরগিটা যেন একেবারে সাধারণ জীবন বা স্বপ্ন, যা রিও ডি জেনেইরোর ফেভেলার রক্তাক্ত রাস্তায় বেঁচে থাকতে চায়। আর যারা তাড়া করে, তারা সেই স্বপ্ন-ভাঙা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে অস্ত্র, গ্যাং আর মৃত্যুই জীবনের একমাত্র দিকনির্দেশ। আর এই মুরগির দৌড় দেখতে দেখতে আমরা পরিচিত হই রকেট নামের এক তরুণের সঙ্গে, যে শুধু ক্যামেরা হাতে জীবনকে ধরে রাখতে চায়, অথচ জীবন নিজেই তার সামনে বিস্ফোরিত হতে থাকে বারবার।

সিনেমার গল্প রকেট নামের ছেলেটির জীবনের নানা বাঁকে এগিয়ে চলে। সে ফেভেলায় জন্মেছে, যেখানে বন্দুক হাতে নেওয়াই যেন জীবনের অনিবার্যতা। রকেট চায় ফটোগ্রাফার হতে, কোনো অপরাধী নয়। তার সমান্তরালে আমরা দেখি লিল ডাইস (পরবর্তীতে লিল জি)-এর উত্থান। এক নিষ্ঠুর, হিংস্র চরিত্র, যে একসময় রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে ফেভেলার নিয়ন্ত্রণ নেয় । বন্ধু, প্রেম, পরিবার সবকিছুই ফিকে হয়ে যায় অপরাধজগতের নিঃশ্বাসে। সিনেমা রকেটের চোখ দিয়ে আমাদের জানায়, কোথায় শুরু হয় স্বপ্ন আর কোথায় সেটা হারিয়ে যায় গুলির শব্দে।

ফ্র্যাগমেন্টেড টাইমলাইন, ক্যারেক্টারভিত্তিক সাব-প্লট এবং হাইপার-রিয়েল সিন সব মিলিয়ে সিনেমার গল্প বলার ধরন দর্শককে তাড়িয়ে নিয়ে চলে। কখনও আমরা ১০ বছর আগে ফিরে যাই, আবার পরের দৃশ্যেই এখনকার গ্যাংওয়ারে পৌঁছে যাই। এই ঝাঁপিয়ে পড়া টাইমস্টাইল শুধু সিনেমাটিকে গতিশীলই করে না, বরং ফেভেলার জটিল বাস্তবতাকেও ধরতে সক্ষম হয়।

একটি দৃশ্য মনে গেঁথে যায়, দুই শিশুকে বলা হয়, “গুলি করবে পায়ে না হাতে?” আরেক শিশু গুলি করে ফেলে তার বন্ধুকে। এই মুহূর্তটি কেবল নৃশংসতা নয়, এটি সমাজের বিকৃত প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাচ্চারা বড় হয় মৃত্যু হাতে নিয়ে, খেলা শেখে গুলি করে।

আরেক বিখ্যাত ডায়লগ — “If you run, the beast catches; if you stay, the beast eats” এ যেন জীবনের পরিহাস। পালালেও মরবে, দাঁড়ালেও মরবে। এই দ্বৈততা নিয়েই তো চলছে শহর।

City of God সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি অনন্য। ফেভেলার প্রতিটি গলি যেন জীবন্ত ধুলোমাখা, রঙচটা, রক্তমাখা। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার ব্যবহার, দ্রুত এডিটিং এবং ঘন রঙের সংমিশ্রণ দর্শককে প্রায় বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়। এক সময় আপনি বুঝতে পারেন, আপনি আর সিনেমা দেখছেন না, আপনি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, লুকিয়ে আছেন, দৌড়াচ্ছেন।

City of God কোনো কাল্পনিক শহরের গল্প নয়। এই শহর আছে, এই মানুষগুলো বাস্তব। বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো প্রতিটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেই এই ধরনের শহর আছে, যেখানে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সহিংসতা একসঙ্গে বাস করে। বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং কালচারের উত্থান, কক্সবাজারের মাদক চক্র, কিংবা পুরান ঢাকার এলাকা দখলের লড়াই, সমস্তই যেন City of God-এরই এক স্থানান্তরিত ছায়া। ২০২০ সালে মিরপুর ও গাজীপুরে কিশোর গ্যাংদের হাতে হওয়া সহিংস ঘটনাগুলোও সিনেমাটির বাস্তব প্রতিবিম্ব।

Cidade de Deus থেকে War of Rio সিনেমার পটভূমি ভিত্তি করে রিওর বাস্তব এলাকা “Cidade de Deus” (ঈশ্বরের শহর)–এর ঘটনা, যেখানে ১৯৬০-৮০ দশকে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার গ্যাংওয়ার শুরু হয়। ব্রাজিল সরকার বারবার চেষ্টা করেও থামাতে পারেনি এই আগুন। সাংবাদিক পাওলো লিন্স এই ঘটনাগুলোর উপর ভিত্তি করে বই লিখেছিলেন, যেটিকে পরে সিনেমা বানানো হয়।

City of God একটি নৃশংস অথচ মানবিক সিনেমা। এটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, কিভাবে সমাজ গড়ে তোলে খুনিদের, কিভাবে বঞ্চনার বুকে জন্ম নেয় ‘বস’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন। রকেটের ক্যামেরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যদি কেউ চোখ মেলে দেখে, কেউ সত্যকে ধরে রাখে, তাহলে আমূল পরিবর্তনের বিকল্প পথও আছে।