কখনো কি এমন হয়েছে, কেউ হঠাৎ এসে বলেছে “তোমার শরীরে বদ নজর লেগেছে”, কিংবা “এই তাবিজটা পরে নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে”?বা বোঝাতে চাইছে পড়া মুখস্থ রাখতে পানিপড়া কতো দারুণ টোটকা?
দক্ষিণ এশিয়ার ভারতবর্ষ ও বিশেষ করে বাংলার জনজীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। তাবিজ, বশীকরণ মন্ত্র, নজর লাগা, ওঝা-পীরের ঝাঁড়া এসব শুধু অলৌকিক বিশ্বাস নয় এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক বেঁচে থাকার উপকরণ, একটি মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার ভাষা।
তাবিজ হলো এক ধরনের লেখা, কখনো কোরআনের আয়াত, কখনো সংস্কৃত মন্ত্র, কখনো অজানা প্রতীকের সমাহার, এগুলো ভাঁজ করে চামড়ার খাপে পুরে গলায়, হাতে বা কোমরে ঝোলানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই লেখাগুলো কিভাবে “শক্তি” হয়ে ওঠে?
ইসলামি তাবিজ সাধারণত কোরআনের আয়াত বা আরবি দোয়া তাবিজে লেখা হয়। “আয়াতুল কুরসি”, “সূরা ফালাক”, “সূরা নাস” ইত্যাদি পঙক্তিকে পবিত্র রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিন্দু লোকাচারে তাবিজ আসে “যন্ত্রতন্ত্র” আর “বীজমন্ত্র” থেকে।ত্রিকোণ, চক্র, পদ্ম বা অক্ষরবিশিষ্ট প্রতীকে দেবতাকে আহ্বান করা হয়। তাবিজের মূল উদ্দেশ্য একটাই, দৃষ্ট অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা, আর অন্তর্গত ভয়কে শান্ত করা।
“প্রেমে ব্যর্থ? শত্রুকে আয়ত্তে আনতে চান? একবার বশীকরণ মন্ত্র চেষ্টা করুন।” এইধরনের বিজ্ঞাপন হয়তো আপনি কোনো ফুটপাতের দেয়ালে দেখেছেন। বশীকরণ মূলত তান্ত্রিক মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে মানুষকে মানসিক বা আধ্যাত্মিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কৌশল।এটা সরলভাবে কেবল প্রেমভিক্ষার জন্য নয়, এক সময় ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার।
হিন্দু তন্ত্রগ্রন্থ “অথর্ববেদ”, “কালিকা পুরাণ” ইত্যাদিতে বশীকরণের নানা রকম মন্ত্র ও পদ্ধতির বিবরণ রয়েছে। মুসলিম সমাজে সিফলি ও রুহানী ইলমে জ্বিন, ফেরেশতা বা আত্মিক শক্তিকে আহ্বান করে কৌশল প্রয়োগ করা হয়। আজকের দিনে ইউটিউব বা ফেসবুকেও এইসব মন্ত্রের আধুনিক সংস্করণ ছড়িয়ে আছে, যা দেখে বোঝা যায় মানুষ এখনও ভালোবাসা, প্রতিশোধ আর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে অদৃশ্য শক্তি’কে বিশ্বাস করে।
গ্রামীণ বাংলায় আজও কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের আগে ওঝার কাছে যাওয়া হয়। ‘ঝাঁড়ফুঁক’ শব্দটি এখানে যেমন সাধারণ, তেমনি গভীর সাংস্কৃতিক। ওঝা/ফকির/সাধুরা একদিকে যেমন লোকচিকিৎসক, তেমনি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা। তাবিজ, পানি পড়া, কাঁচি দিয়ে কাটাকাটি, নারকেল ঘুরানো সবকিছু একসাথে চলে। পীরের দেয়া তাবিজ, গিলাফ ছোঁয়া, মানত করা—সবই সেই অদৃশ্য শক্তিকে খুশি করার প্রয়াস।
ব্রিটিশ আমলে এই তাবিজ, মন্ত্র এসবকে অন্ধবিশ্বাস বলে বিদ্রুপ করা শুরু হয়। এমনকি “Witchcraft Act” বা “Magical Remedies Act” চালু করে এসব চর্চা দমন করা হতো। কিন্তু এই উপমহাদেশে বিজ্ঞান ও মন্ত্র সবসময় পাশাপাশি থেকেছে।
একজন কৃষক হয়তো পাকা ধান তুলতে মাঠে তাবিজ পুঁতে দেন, আবার সেই তিনিই বাজারে গিয়ে আধুনিক সার কিনে আনেন। এই দ্বৈততা এখানকার মানসিকতার গভীরে গেঁথে আছে।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাবিজ ও বশীকরণ মন্ত্রের সঙ্গে নারীর সম্পর্কও গভীর। প্রেমে প্রতারণা, স্বামীকে নিজের দিকে রাখা, সন্তান না হওয়া, এসব নিয়ে বহু নারী আজও পীর, ওঝা, তান্ত্রিকের শরণ নেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে নারীর আওয়াজ সহজে শোনা হয় না, সেখানে এই তাবিজ হয়ে ওঠে এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ, যেন অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ দিয়ে নিজের নিয়তি কিছুটা হলেও বদলে ফেলার চেষ্টা। শুধু প্রেমের ক্ষেত্রেই নয়, সন্তানধারণে অক্ষমতা, স্বামীর অবাধ্যতা, পরকীয়া নিয়ন্ত্রণেও তাবিজ বা পানি পড়ার উপর নির্ভরতা সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এগুলো কখনো কখনো প্রতারণার হাতিয়ার হলেও, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক অসহায়ত্ব।
এ বিশ্বাসের বাজারে দালালও আছে। ‘বিশ্ববিখ্যাত কামদেব তান্ত্রিক’, ‘যে কোনো সমস্যার সমাধান ২৪ ঘণ্টায়’—এমন বিজ্ঞাপন ছড়ানো হয় শহরের দেয়ালজুড়ে। এইসব বিজ্ঞাপন মানুষকে দুর্বল মুহূর্তে ঠকায়, ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এদের মাধ্যমে বোঝা যায় এই লোকজ সংস্কৃতি কেবল ধর্ম বা ঐতিহ্য নয়, তা একধরনের অর্থনৈতিক বাজারও হয়ে উঠেছে।
অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, তাবিজ বা মন্ত্র আসলে একধরনের প্লেসিবো ইফেক্ট তৈরি করে। রোগীর বিশ্বাস তাকে মানসিকভাবে শক্ত করে, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। কখনো কোনো তাবিজে আসলেই কিছু নেই, কিন্তু রোগী ভাবে “এটা আমাকে রক্ষা করবে”, ফলে সে স্বস্তি পায়। এই স্বস্তি থেকেই ধীরে ধীরে আরোগ্যের পথ খোলে।
তাবিজ, মন্ত্র বা বশীকরণ এই বিষয়গুলোকে আমরা হয়তো অবৈজ্ঞানিক বলে এড়িয়ে গেলেও কিন্তু এগুলোর ভেতরে রয়েছে এক গহিন মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। যখন চিকিৎসা বা যুক্তি ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে বিশ্বাসে। আর এই বিশ্বাস কখনো আয়াতে বাঁধা, কখনো কালি দিয়ে আঁকা মন্ত্রে। এই বিশ্বাসকে বুঝতে হলে শুধুমাত্র যুক্তিবাদ নয়, বুঝতে হবে ভয়ের ভেতরকার ভাষা, চাহিদার অস্পষ্টতা এবং একাকীত্বের গভীরতাও।


