Quantum physics – ‘স্পর্শ’ মস্তিষ্কের একটি বিভ্রম!

মানবজগতে ‘স্পর্শ’ এক গভীর বাস্তব অভিজ্ঞতা। হাত দিয়ে কিছু ধরলে, ত্বকের সঙ্গে অন্য কিছুর মিলন ঘটলে আমরা বুঝি ‘স্পর্শ করেছি’। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, এই অনুভবটা আদতে একটি বিভ্রম। বাস্তবিক অর্থে কোনো বস্তু আরেক বস্তুকে স্পর্শ করতে পারে না। কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুযায়ী, যেটাকে আমরা “ছোঁয়া” ভাবি, তা কেবলমাত্র কণিক-স্তরের বিকর্ষণ বলের একটি স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া।

প্রতিটি বস্তুই গঠিত হয় পরমাণু দিয়ে। একটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস (প্রোটন ও নিউট্রন), এবং তার চারপাশে নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘোরে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রন সব বস্তুতে থাকে এবং পরমাণু ও বস্তুগুলোর আচরণ নির্ধারণে তা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইলেকট্রন একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। একাধিক ইলেকট্রন একে অপরকে সবসময়ই বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ তারা একে অপরের কাছাকাছি আসতে চায় না। এই বিকর্ষণ ক্ষমতা খুব ক্ষুদ্র মাপের হলেও, একসাথে লক্ষ লক্ষ কণা যখন প্রতিক্রিয়া করে, তখন তার প্রভাব মানব ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভবযোগ্য হয়। অর্থাৎ ন্যানোস্কেল বলবিন্যাসই হয়ে ওঠে ম্যাক্রোস্কেল বাস্তবতা।

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের একটি মৌলিক নিয়ম হলো Pauli Exclusion Principle। এই নিয়ম অনুযায়ী, দুটি ইলেকট্রন কখনও একই কোয়ান্টাম অবস্থানে থাকতে পারে না। তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একে অপরকে ঠেলে দেয়। ফলে একটি বস্তু যখন আরেকটির খুব কাছাকাছি আসে, তখন তাদের ইলেকট্রন শেলগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী বিকর্ষণ বল তৈরি হয়। এই বলই প্রতিনিয়ত আমাদের আশেপাশের সবকিছুকে আলাদা রাখে। যে টেবিল কেউ ছুঁয়ে বসে আছে, তার পৃষ্ঠের ইলেকট্রনগুলো তার আঙুলের ইলেকট্রনগুলোকে ঠেলে দেয়। অথচ আমরা এই ঠেলাটাকেই “ছোঁয়া” বলে মনে করি। এই বিকর্ষণকে বলা হয় electromagnetic repulsion, যা চারটি মৌলিক বলের একটি। এটি শুধু পদার্থের কাঠামোকে ঠিক রাখে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আচরণও নির্ধারণ করে।

ইলেকট্রনের মধ্যকার বিকর্ষণ কেবল স্থির কোনো বল নয় বরং এটি ঘটে ফোটন বিনিময়ের মাধ্যমে। ফোটন হলো আলোর কণা, তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় এটি “force carrier” হিসেবেও কাজ করে। এই আলো কণা (ফোটন) এক ইলেকট্রন থেকে অন্য ইলেকট্রনে দ্রুত আদান-প্রদান হয়ে তৈরি করে একটি বলের অনুভব। এই বিনিময়ের মাধ্যমে ইলেকট্রন বুঝে ফেলে যে, তার সামনে আরেকটি কণা রয়েছে এবং সে একে ঠেলে দেয়। এই কার্যপ্রণালী হয় এত দ্রুত এবং এত ক্ষুদ্র স্কেল-এ যে তা আমাদের উপলব্ধির বাইরে। তবুও সেই বিনিময়ের মাধ্যমেই আমাদের বাস্তবতা তৈরি হয়। একে বলে force mediation, অর্থাৎ বল কিভাবে কণার মাধ্যমে স্থানান্তর হয়।

যখন আমরা একটি বস্তুতে হাত রাখি, ধরা যাক, একটি কাঁচের টেবিল, বাস্তবে আমাদের হাতের কণাগুলো আর ঐ বস্তুর কণাগুলো কখনো একে অপরকে সরাসরি ছোঁয় না। তারা একটি অদৃশ্য ‘ইলেকট্রনিক সীমাবদ্ধতা’ তৈরি করে। সেই সীমায় যে বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তা আমাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে। মস্তিষ্ক তখন তাকে বলে “স্পর্শ।” বস্তুর গায়ে চাপ দিলে কেন একটি শক্ত প্রতিক্রিয়া পাই? কারণ যত বেশি চাপ দেয়া হয়, বিকর্ষণ বলও তত বেশি বৃদ্ধি পায়। আর সেই বল স্নায়ুতে বেশি সংবেদন পাঠায়। এই ঘটনাটিই চেতনার মধ্যে স্পর্শের একটি বিভ্রম তৈরি করে। এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয় তাপ, টেক্সচার ও গতির প্রতিক্রিয়াও, যা স্পর্শকে বাস্তব বলে মনে করায়, যদিও তা আসলে একটি গাণিতিক শক্তি বিন্যাসমাত্র।

ধরা যাক, কেউ একজন প্রিয়জনের হাতে হাত রাখলে অনুভব করছে একটি উষ্ণতা, নরমত্ব, হৃদয়ের সংযোগ। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলছে, তুমি তাকে ছুঁতে পারো না। তোমার ইলেকট্রনগুলো তার ইলেকট্রনগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে, কোনো এক বিন্দুতে এসে তারা আর কাছাকাছি যেতে পারছে না। কিন্তু সেই ঠেলাটাই তোমার মস্তিষ্ককে বলছে—”তুমি স্পর্শ করেছো।” এই অনুভব কি তবে শুধু স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া? না কি এটা একধরনের ব্যাখ্যাত্মক বাস্তবতা, যেটি তৈরি হয় কণার ঘর্ষণের জাল থেকে? এই প্রশ্নগুলোই আমাদের বিজ্ঞান ও দর্শনের সন্ধিক্ষণে দাঁড় করায়।

দার্শনিক প্রতিফলনে যদি বাস্তবে কেউ কাউকে ছুঁতে না পারে, তাহলে আমাদের যে ভালোবাসা, যে সম্পর্ক, যে আবেগ তা কি কেবল স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া? এই প্রশ্ন মানবজিজ্ঞাসার মূল। বাস্তবতাকে আমরা শুধুই ইন্দ্রিয়ের ব্যাখ্যায় চিনতে শিখেছি। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, সেই ইন্দ্রিয়ও বিভ্রমের শিকার। আমরা যে জগতে বাস করি, তার সবচেয়ে ছোট স্কেল-এ বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা রূপ ধারণ করে। স্পর্শ, শব্দ, রঙ সবই কণিক স্তরে একেকটা বল বা শক্তির বিনিময়।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘বাস্তবতা’ একটি মস্তিষ্কভিত্তিক ভাষ্য না যে বস্তু প্রকৃতপক্ষে আছে, বরং যেভাবে আমরা তা অনুভব করি সেভাবেই তার অস্তিত্ব। স্পর্শের বিভ্রম তাই আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যা অনুভব করে, তার পেছনে সবসময় একটি অতিপারমাণবিক সত্য লুকিয়ে থাকে।

“স্পর্শ” আমাদের জীবনের একটি গভীর মানবিক অনুভূতি। অথচ কোয়ান্টাম দৃষ্টিকোণ থেকে, তা কেবলমাত্র ইলেকট্রনিক বিকর্ষণের ঘর্ষণীয় ফলাফল। আমাদের শরীর ও অন্যান্য যেকোনো বস্তুগুলোর মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, তা কখনোই পুরোপুরি দূর হয় না। সেই সীমাবদ্ধ দূরত্বেই তৈরি হয় বাস্তবতার স্পর্শ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন