“একটা মুরগি পালাচ্ছে… আর তার পেছনে দৌড়াচ্ছে একদল বন্দুকধারী।”
একটা ছোট্ট দৃশ্য, কিন্তু এটাই হয়তো City of God সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। এই মুরগিটা যেন একেবারে সাধারণ জীবন বা স্বপ্ন, যা রিও ডি জেনেইরোর ফেভেলার রক্তাক্ত রাস্তায় বেঁচে থাকতে চায়। আর যারা তাড়া করে, তারা সেই স্বপ্ন-ভাঙা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে অস্ত্র, গ্যাং আর মৃত্যুই জীবনের একমাত্র দিকনির্দেশ। আর এই মুরগির দৌড় দেখতে দেখতে আমরা পরিচিত হই রকেট নামের এক তরুণের সঙ্গে, যে শুধু ক্যামেরা হাতে জীবনকে ধরে রাখতে চায়, অথচ জীবন নিজেই তার সামনে বিস্ফোরিত হতে থাকে বারবার।
সিনেমার গল্প রকেট নামের ছেলেটির জীবনের নানা বাঁকে এগিয়ে চলে। সে ফেভেলায় জন্মেছে, যেখানে বন্দুক হাতে নেওয়াই যেন জীবনের অনিবার্যতা। রকেট চায় ফটোগ্রাফার হতে, কোনো অপরাধী নয়। তার সমান্তরালে আমরা দেখি লিল ডাইস (পরবর্তীতে লিল জি)-এর উত্থান। এক নিষ্ঠুর, হিংস্র চরিত্র, যে একসময় রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে ফেভেলার নিয়ন্ত্রণ নেয় । বন্ধু, প্রেম, পরিবার সবকিছুই ফিকে হয়ে যায় অপরাধজগতের নিঃশ্বাসে। সিনেমা রকেটের চোখ দিয়ে আমাদের জানায়, কোথায় শুরু হয় স্বপ্ন আর কোথায় সেটা হারিয়ে যায় গুলির শব্দে।
ফ্র্যাগমেন্টেড টাইমলাইন, ক্যারেক্টারভিত্তিক সাব-প্লট এবং হাইপার-রিয়েল সিন সব মিলিয়ে সিনেমার গল্প বলার ধরন দর্শককে তাড়িয়ে নিয়ে চলে। কখনও আমরা ১০ বছর আগে ফিরে যাই, আবার পরের দৃশ্যেই এখনকার গ্যাংওয়ারে পৌঁছে যাই। এই ঝাঁপিয়ে পড়া টাইমস্টাইল শুধু সিনেমাটিকে গতিশীলই করে না, বরং ফেভেলার জটিল বাস্তবতাকেও ধরতে সক্ষম হয়।
একটি দৃশ্য মনে গেঁথে যায়, দুই শিশুকে বলা হয়, “গুলি করবে পায়ে না হাতে?” আরেক শিশু গুলি করে ফেলে তার বন্ধুকে। এই মুহূর্তটি কেবল নৃশংসতা নয়, এটি সমাজের বিকৃত প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাচ্চারা বড় হয় মৃত্যু হাতে নিয়ে, খেলা শেখে গুলি করে।
আরেক বিখ্যাত ডায়লগ — “If you run, the beast catches; if you stay, the beast eats” এ যেন জীবনের পরিহাস। পালালেও মরবে, দাঁড়ালেও মরবে। এই দ্বৈততা নিয়েই তো চলছে শহর।
City of God সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি অনন্য। ফেভেলার প্রতিটি গলি যেন জীবন্ত ধুলোমাখা, রঙচটা, রক্তমাখা। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার ব্যবহার, দ্রুত এডিটিং এবং ঘন রঙের সংমিশ্রণ দর্শককে প্রায় বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়। এক সময় আপনি বুঝতে পারেন, আপনি আর সিনেমা দেখছেন না, আপনি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, লুকিয়ে আছেন, দৌড়াচ্ছেন।
City of God কোনো কাল্পনিক শহরের গল্প নয়। এই শহর আছে, এই মানুষগুলো বাস্তব। বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো প্রতিটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেই এই ধরনের শহর আছে, যেখানে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সহিংসতা একসঙ্গে বাস করে। বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং কালচারের উত্থান, কক্সবাজারের মাদক চক্র, কিংবা পুরান ঢাকার এলাকা দখলের লড়াই, সমস্তই যেন City of God-এরই এক স্থানান্তরিত ছায়া। ২০২০ সালে মিরপুর ও গাজীপুরে কিশোর গ্যাংদের হাতে হওয়া সহিংস ঘটনাগুলোও সিনেমাটির বাস্তব প্রতিবিম্ব।
Cidade de Deus থেকে War of Rio সিনেমার পটভূমি ভিত্তি করে রিওর বাস্তব এলাকা “Cidade de Deus” (ঈশ্বরের শহর)–এর ঘটনা, যেখানে ১৯৬০-৮০ দশকে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার গ্যাংওয়ার শুরু হয়। ব্রাজিল সরকার বারবার চেষ্টা করেও থামাতে পারেনি এই আগুন। সাংবাদিক পাওলো লিন্স এই ঘটনাগুলোর উপর ভিত্তি করে বই লিখেছিলেন, যেটিকে পরে সিনেমা বানানো হয়।
City of God একটি নৃশংস অথচ মানবিক সিনেমা। এটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, কিভাবে সমাজ গড়ে তোলে খুনিদের, কিভাবে বঞ্চনার বুকে জন্ম নেয় ‘বস’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন। রকেটের ক্যামেরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যদি কেউ চোখ মেলে দেখে, কেউ সত্যকে ধরে রাখে, তাহলে আমূল পরিবর্তনের বিকল্প পথও আছে।


