Home Blog Page 60

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার খনিজ সহযোগিতার অঙ্গীকার

গুরুত্বপূর্ণ খনিজের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মঙ্গলবার একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য জরুরি এসব বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রেক্ষিতে এ ঘোষণা আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘কোয়াড’ নামে পরিচিত এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওয়াশিংটনে স্বাগত জানান।চার দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা ‘কোয়াড ক্রিটিকাল মিনারেলস ইনিশিয়েটিভ’ গঠন করছে, যার লক্ষ্য হলো সরবরাহ চেইন নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় করা।

যদিও বিবরণে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি, তবু এটি স্পষ্ট যে এই উদ্যোগের লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো। এর আগে, ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় চীন এসব খনিজের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হিসেবে চীনে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি সীমিত করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণ ও পরিশোধন এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনের জন্য কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের শিল্প খাতকে অর্থনৈতিক চাপে, মূল্য নিয়ন্ত্রণে এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নে ফেলতে পারে।”

চীন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুদদার, যার মধ্যে বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অপরিহার্য গ্রাফাইটের প্রায় সম্পূর্ণ মজুদ রয়েছে চীনের হাতে।

মন্ত্রীদের কেউই চীনের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবে তারা দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরে “ঝুঁকিপূর্ণ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে” উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা তাদের ভাষ্যে “এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি”।

ভারত ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, তারা চান কোয়াড “একটি স্বাধীন ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক”-এর ওপর গুরুত্ব দিক—যা এশিয়ায় চীনের আধিপত্যের বিরোধিতার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে।

চীন প্রসঙ্গে কোয়াডের মধ্যে সাধারণ অবস্থান থাকলেও, অন্য কিছু ইস্যুতে পার্থক্য রয়েছে। যেমন—যৌথ বিবৃতিতে ইউক্রেন বা ইরানের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ভারত ও জাপান উভয়েরই ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্প কোয়াড দেশগুলোতেও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের (যেমন অভিবাসন) উপর ছয় মাস জোর দেয়ার পর কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈঠক ট্রাম্প প্রশাসনের পুনরায় এশিয়ায় চীনকেন্দ্রিক মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনেকের জন্য বিস্ময় ছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে চীনকে অগ্রাধিকারে রাখেননি। বরং তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি সম্মানজনক বক্তব্য দেন এবং একটি বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে দুই দেশের মধ্যে আপস করেন।

চলতি বছরের শেষদিকে ট্রাম্পের ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই চার দেশের অংশীদারিত্ব প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন প্রয়াত জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি মনে করতেন, চীনকে ঘিরে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ‘নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ একটি জোট গঠন দরকার। চীন বারবার বলেছে যে, এই শত্রুতামূলক জোট তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার কোয়াড বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলেছেন, যেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের মতো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে অন্তত ৪.৭ লাখ পদ শূন্য

৩০ জুন প্রকাশিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যাটিস্টিকস অফ পাবলিক সার্ভেন্টস, ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে — ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ দপ্তরে মোট ৪,৬৮,২২০টি পদ শূন্য রয়েছে, যা অনুমোদিত মোট পদের ২৪.৩০%।

প্রতিবেদন অনুযায়ী–সময়মতো নিয়োগ না হওয়া, মামলা, পদ অনুমোদনের পরও নিয়োগ অনুমোদনের ঘাটতিসহ নানা জটিলতার কারণে এত বিপুল শূন্যপদের সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৩ সালের শেষে অনুমোদিত মোট পদ ছিল ১৯,১৯,১১১টি। এর মধ্যে কর্মরত ছিলেন ১৪,৫০,৮৯১ জন। বাকি ৪,৬৮,২২০টি পদ শূন্য ছিল। কর্মরতদের মধ্যে পুরুষ কর্মচারী ছিলেন ১০,৩৯,১০০ জন এবং নারী কর্মচারী ৪,১১,৭৯১ জন; অর্থাৎ পুরুষ ও নারীর অনুপাত ছিল ২.৫ : ১।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-কে জানান–২০২৪ সালের শেষে শূন্যপদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। কারণ ওই বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন হয় এবং এরপর ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে সরকার পদত্যাগ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যায়।
তবে একই সময়ে অবসর, পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত থাকায় উচ্চপদে কর্মরত জনবল অনুমোদিত সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
প্রথম থেকে ১২তম গ্রেড পর্যন্ত গেজেটেড পদে নিয়োগ দেয় সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। আর ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের পদে নিয়োগ দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
এসব শূন্যপদের বেশিরভাগই ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের মধ্যে, যেখানে সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ ২০তম গ্রেডে—৭৯,১৫১টি। এরপর ১০ম গ্রেডে রয়েছে ৭১,৭৯৭টি শূন্যপদ। এসব পদ বেশিরভাগই বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের।
অন্যদিকে, গ্রেড-১ (সচিব পদমর্যাদা) পদে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে বেশি জনবল কর্মরত রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।



কলম্বাসের আগেই কি আমেরিকায় গিয়েছিল ভাইকিংরা?

ইউরোপের উত্তর দিগন্তে, বরফে মোড়ানো ফিয়র্ড আর সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামে বসবাস করত একদল সাহসী ও রহস্যঘেরা মানুষ, এদের পরিচয় ভাইকিং। তবে ভাইকিং মানেই কেবল নৌকা, লুটপাট আর যুদ্ধের প্রতীক নয়; বরং এটি ছিল এক জটিল, শক্তিশালী এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থার অংশ। ৮ম থেকে ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত তাদের প্রভাব স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং এমনকি আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ভাইকিং সমাজে তিনটি প্রধান শ্রেণি ছিল, জার্ল (সম্মানিত নেতা বা অভিজাত), কার্ল (মধ্যবিত্ত কৃষক, কারিগর) ও থ্রাল (দাস)। তবে এ সমাজে জন্ম নয়, কাজের মাধ্যমেই একজন মানুষের অবস্থান নির্ধারিত হতো। তারা ছিল একটি গণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন গোষ্ঠী। তাদের লোকসভা পরিচিত ছিল “থিং” নামে, যেখানে জনসাধারণ আইন প্রণয়ন, বিচার ও রাজনীতি নিয়ে মতামত দিত। এটি আধুনিক পার্লামেন্টের প্রাথমিক রূপ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

ভাইকিং ধর্ম ছিল নর্স পৌরাণিক বিশ্বাসে প্রভাবিত, কেন্দ্রে ছিল দেবতা ওডিন (জ্ঞান ও যুদ্ধের দেবতা), থর (বজ্রের দেবতা), ফ্রেয়া (ভালোবাসা ও মৃত্যু) ইত্যাদি। তাদের ধর্ম বিশ্বাসে মৃত্যু ছিল শেষ নয়। বীরযোদ্ধার জন্য ‘ভালহালা’ ছিল পরকাল, যেখানে যুদ্ধে নিহতেরা ওডিনের সাথে অনন্ত যুদ্ধের জন্য বেছে নেওয়া হতো। এছাড়া তারা বিশ্বাস করত “রুন” নামক রহস্যময় অক্ষরের শক্তিতে, যা শুধু ভাষা নয়, বরং ভবিষ্যৎ বলা, জাদুবিদ্যা ও আত্মরক্ষা চর্চার অংশ ছিল।

ভাইকিং নারীরা ছিল অনেকাংশে স্বাধীন এবং যোদ্ধাও। শিল্ডমেইডেন নামে পরিচিত নারী যোদ্ধাদের অস্তিত্ব আজও প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্যে আলোচ্য। নারীরা সম্পত্তির অধিকারী হতে পারত, বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারত এবং এমনকি সভায় বক্তব্য রাখত।কখনো কখনো নারীরাও হতো প্রভাবশালী সম্মানিত নেতা জার্ল। এই প্রগতিশীলতা তাদের সময়ের অন্যান্য সমাজের তুলনায় ব্যতিক্রমী।

ভাইকিংদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি ছিল তাদের লংশিপ, দ্রুতগামী, অগভীর ড্রাফটবিশিষ্ট নৌকা যা সাগর, নদী এবং উপকূল দিয়ে সহজেই চলতে পারত। এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই তারা পৌঁছে গিয়েছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এবং এমনকি নিউফাউন্ডল্যান্ড, কানাডা, যেখানে লেইফ এরিকসন আমেরিকায় ইউরোপীয় আগমনের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ভাইকিংদেরকে আমরা সাধারণত লুটেরা ভাবি, কিন্তু তারা ছিল অত্যন্ত দক্ষ বণিকও। তারা সিল্ক রোড পর্যন্ত বাণিজ্য করেছিল, আরব দেশের মুদ্রা ও রাশিয়ান ফার পাওয়া গেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার উপকূলে। তাদের অর্থনীতি কৃষি, কারুশিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই দিকটি প্রমাণ করে যে তারা কেবল তলোয়ার নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল দিয়েও বিশ্ব জয় করেছিল।

১১শ শতকে খ্রিস্টান মিশনারি এবং রাজনৈতিক চাপের ফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় খ্রিস্টধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভাইকিংরা হঠাৎ করেই তাদের পুরোনো বিশ্বাস বিসর্জন দেয়নি; বরং অনেক সময় খ্রিস্টীয় রীতিতে নর্স দেবতাদের প্রতীক মিশিয়ে নিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ (syncretism) আজও নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কের উৎসবগুলোতে দেখা যায়।

ভাইকিংরা ছিল চমৎকার গল্পকার। সাগা নামে পরিচিত ছিল তাদের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক বর্ণনামূলক সাহিত্যের রূপ। এই কাহিনিগুলোতে ছিল নৈতিক শিক্ষা, বীরত্ব, প্রেম, প্রতারণা ও অতিলৌকিক গল্পের সংমিশ্রণ। তাদের সঙ্গীত ও যন্ত্র ট্যাগেলহার্পা আজও কিছু কিছু স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে পুনর্জীবিত করা হচ্ছে।

আজকের দিনে ভাইকিং সংস্কৃতি শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আধুনিক পপ কালচারে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। মার্ভেল সিনেমার থর, লোকি ইত্যাদি চরিত্রগুলো নর্স পুরাণ থেকেই আগত। এই পৌরাণিক চরিত্রগুলোর নৈতিক দ্বিধা, প্রতিশোধ, আত্মত্যাগ ইত্যাদি গুণ দর্শকদের এক গভীর দার্শনিক প্রশ্নে পৌঁছে দেয়। পাশাপাশি নেটফ্লিক্সের “Vikings” সিরিজ, “The Northman” সিনেমা, কিংবা ভিডিও গেম “Assassin’s Creed: Valhalla” সবই ভাইকিংদের গল্প ও আচারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে একদা লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য এখন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

১৯শ শতক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ভাইকিংদের অনেক বিস্ময়কর নিদর্শন পাওয়া গেছে।স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে রুনিক শিলালিপি, লংশিপ, অস্ত্রশস্ত্র, অলংকার এবং এমনকি পুরো বসতিগ্রাম।কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে ‘L’Anse aux Meadows’ নামক যে বসতিটির সন্ধান পাওয়া গেছে, তা প্রমাণ করে যে ভাইকিংরা বাস্তবেই আমেরিকায় পা রেখেছিল। এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো কেবল ইতিহাসকে নয়, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

ভাইকিংদের জীবনে ছিল কঠোর বাস্তবতা, কিন্তু তাদের সংস্কৃতির ভিত ছিল সম্মান, বিশ্বাস, এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি। তারা বিশ্বাস করত, মানুষ জন্মে তার নিয়তি তৈরি করতে, কেবল মেনে নিতে নয়।

ভাইকিং সংস্কৃতি এক রক্তক্ষয়ী অতীতের গল্প নয়, বরং ছিল এক জটিল মানবিক সভ্যতা, যেখানে যুদ্ধ ও বুদ্ধি, ধর্ম ও যুক্তি, পুরাণ ও রাজনীতি একসাথে মিশে এক অনন্য পরিচয় গড়ে তোলে। আজকের আধুনিক বিশ্বে, ভাইকিংদের গণতান্ত্রিক চর্চা, নারীর স্বাধীনতা, এবং সংস্কৃতি-ভিত্তিক অভিযাত্রার মানসিকতা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তারা শুধু ইতিহাসের নয়, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতারও এক প্রাচীন ও জীবন্ত নিদর্শন।

ইউএসএআইডির সহায়তা বন্ধের প্রভাব, ৫ বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

ট্রাম্প প্রশাসন বৈদেশিক সহায়তা প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় আগামী ৫ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শিশু। মঙ্গলবার বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই ভয়াবহ ভবিষ্যৎ-চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা তহবিলের ৪০%-এর বেশি সরবরাহ করত। মার্কিন সরকার এ বছরের শুরুতে সহায়তার পরিমাণ ৮৩% কমানোর ঘোষণা দেয়। মার্কিন সরকার বলেছে, অপচয় দূর করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ এটি।

গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের (আইএসগ্লোবাল) গবেষক ডেভিড রাসেল্লা সতর্ক করে বলেছেন, অর্থ সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপদগ্রস্থ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় গত দুই দশকে যে অগ্রগতি হয়েছে তা এখন ঝুঁকিতে আছে। এই ঘটনাকে একটি মহামারির সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

গবেষণা বলছে, ইউএসএআইডির তহবিল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, বিশেষ করে আফ্রিকান দেশগুলোতে মহামারি ও দুর্ভিক্ষ রোধে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে এই তহবিলের আওতায়।

১৩৩টি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক গবেষক দলটি অনুমান করেছে, ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করেছিল ইউএসএআইডি।

গবেষকদের অনুমান, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যা প্রতিরোধযোগ্য। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৭ লাখ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। এর ব্যাপকতা বোঝার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা ধরা যায়। ওই যুদ্ধে চার বছরে প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

সরকারি তথ্য বলছে, গত বছর ৬১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা বিতরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার অর্ধেকেরও বেশি ইউএসএআইডির মাধ্যমে।

এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও ব্যবহার হচ্ছে রাজনৈতিক প্রচারে

তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট চেক উদ্যোগ ডিসমিসল্যাবের একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে — বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ফেক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে রাজনৈতিক প্রচার চলছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতার নামে কুৎসা রটানো, অপপ্রচার ও ভাবমূর্তির ক্ষতি করার চেষ্টাও চলছে।
ডিসমিসল্যাব তাদের গবেষণায় গত ১৮ থেকে ২৮ জুন সময়ে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ থেকে ৭০টি ভিডিও সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছে। এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক এসব ভিডিও বিশ্লেষণে তারা দেখেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উল্লেখ করা হয়নি যে এগুলো এআই দিয়ে তৈরি। ভিডিওগুলো অনেকটা নিখুঁত। ফলে মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ভিডিও দিয়ে ব্যাপকভাবে অপপ্রচার ও কুৎসা রটানোর ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ, এ দেশে নিয়মনীতির শিথিলতা রয়েছে। এ ধরনের ভিডিও সহিংসতাও উসকে দিতে পারে।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ করা ভিডিওগুলো ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে (ভিউ)। ভিডিওগুলোতে ব্যবহারকারীরা রিঅ্যাকশন (প্রতিক্রিয়া) দিয়েছেন ১০ লাখের বেশি। ডিসমিসল্যাব তাদের গবেষণায় বলছে, প্রতিটি ভিডিও গড়ে প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজারবার দেখা হয়েছে এবং গড়ে ১৭ হাজার রিঅ্যাকশন পেয়েছে, যা এসব আধেয়র (কনটেন্ট) বিস্তার ও প্রভাব সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে ভিডিওগুলোকে ‘সফটফেকের’ কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মানে হলো, এতে কৃত্রিমভাবে সাধারণ মানুষের অবয়ব ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘ডিপফেক’ হলো একজন ব্যক্তির অবিকল অবয়ব ও কণ্ঠস্বর দিয়ে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা।
ভিডিওগুলোর বেশির ভাগই তৈরি করা হয়েছে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের নতুন ভিডিও জেনারেশন টুল ভিইও-৩ ব্যবহার করে, যা ২০২৫ সালের মে মাসে চালু হয়। ডিসমিসল্যাব বলছে–বিকৃত মুখাবয়ব, অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর ইত্যাদি কারণে আগে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো সহজেই শনাক্ত করা যেত। কিন্তু ভিইও-৩ দিয়ে তৈরি এআই ভিডিও সহজে শনাক্ত করা যায় না।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় বলা হয়েছে, তাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রচার সবার আগে শুরু করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকেরা। জামায়াতের সমর্থনে বেশ কিছু ভিডিও আসার পর বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দলের সমর্থকেরাও এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রচার করতে শুরু করেন। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায়ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের এ ধরনের ভিডিও ছড়াতে দেখা গেছে।
ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে উপযুক্ত লেবেল (এআই দিয়ে তৈরি উল্লেখ করে চিহ্ন) থাকার কথা। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ করা ৭০টি ভিডিওর একটিতেও তা ছিল না। মেটার অ্যালগরিদমও (স্বয়ংক্রিয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা) ভিডিওগুলো শনাক্ত করতে পারেনি।

চিকিৎসায় জাদুবিদ্যা

কখনও ভেবে দেখেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের শুরুটা কোথা থেকে হয়েছিল? আজকের আধুনিক হাসপাতাল বা সিটি স্ক্যান মেশিন নয়, চিকিৎসার প্রথম ধারণা এসেছিল আত্মার দুর্বলতা নিয়ে, দেহের নয়। দেহের অসুখ দেখা হতো আত্মিক ভারসাম্যহীনতার ফল হিসেবে।আর সেই আত্মাকে সারানোর জন্য প্রয়োজন হতো শুধু হার্বাল ওষুধ নয়, প্রয়োজন হতো মন্ত্র, রিচুয়াল, নক্ষত্রের অবস্থান এবং এমনকি আত্মিক শক্তির সাথে যোগাযোগ!

এই জায়গা থেকেই শুরু হয় জাদুবিদ্যার চিকিৎসার ইতিহাস যেখানে চিকিৎসা মানেই ছিল একরকম গোপন চর্চা, যেখানে বিজ্ঞান, ধর্ম, জ্যোতিষ আর আধ্যাত্মিকতা মিশে ছিল একই পাত্রে।

প্রাচীন সুমের, মিশর, ভারত, চীন সভ্যতাগুলো রোগকে শুধু দেহগত নয়, বরং ঈশ্বরের অভিশাপ, আত্মার ভারসাম্যহীনতা, বা শত্রুর জাদুবিদ্যার ফলাফল হিসেবে দেখত। সুমেরীয়রা রোগ সারাতে যেসব ট্যাবলেট ব্যবহার করত, তাতে লেখা থাকত ঈশ্বরের নাম। মিশরের “Ebers Papyrus” নামক চিকিৎসাগ্রন্থে এমন অনেক রেসিপি আছে যেখানে মন্ত্র না পড়লে ওষুধ কাজ করবে না। অর্থাৎ চিকিৎসা মানেই ছিল ম্যাজিক!

১৬শ শতাব্দীর রহস্যময় চিকিৎসক পারাকেলসাস বলতেন “রোগের উৎস শরীর নয়, আত্মা। আর চিকিৎসা তখনই কার্যকর হয়, যখন দেহের উপাদানগুলোর সঙ্গে আত্মার শক্তি মিলিয়ে দেওয়া যায়।” তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক রোগের পেছনে আছে এক প্রকার elemental spirit—যেমন আগুন, পানি, বাতাস, পৃথিবী বা ধাতুর চেতনা। সে অনুযায়ী তিনি ওষুধ বানাতেন ধাতু ও গাছের মিশ্রণে এবং সেই ওষুধে প্রয়োগ করতেন বিশেষ মন্ত্র।

আধুনিক চিকিৎসা যেখানে রোগের উৎস খুঁজে বেড়ায় রক্ত আর কোষে, জাদুচর্চা সেখানে খুঁজে বেড়ায় রোগের জ্যোতিষগত অবস্থান।মধ্যযুগে বিশ্বাস করা হতো, চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের প্রভাব সরাসরি মানুষের যকৃত, হূৎপিণ্ড বা মনোভাবের উপর পড়ে। Indian Ayurveda বা চীনা Tao medicine-এ energy meridian বা চক্র ছিল শরীরের অদৃশ্য সেতু, যার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে রোগ হত। এই ধারণা পরবর্তীকালে “aura cleansing”, “chakra healing” বা “sound vibration therapy”-র জন্ম দেয়।

ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথের গোপন পরামর্শক ড. জন ডি, তার কালো আয়না ব্যবহার করে ‘এনোকিয়ান ফেরেশতা’-দের সাথে যোগাযোগ করতেন । – তার বিশ্বাস ছিল, এই আত্মিক শক্তিরাই শরীরের গোপন ব্যাধির উৎস জানে এবং নিরাময়ের পথ বলে দিতে পারে। আজকের দৃষ্টিতে এটি অবৈজ্ঞানিক হলেও কিন্তু occult tradition-এ এটিই ছিল “celestial diagnosis”।

প্রাচীন Druids বা ভারতীয় অরণ্যসাধকরা বিশ্বাস করতেন প্রতিটি গাছের নিজস্ব আত্মা আছে। তুলসী, মরিচ, নিম এসব উদ্ভিদের ব্যবহার কেবল ঔষধি নয়, বরং এক ধরনের “spirit-hosting”। রিচুয়াল করে গাছের আত্মাকে আহ্বান করে, ওষুধ প্রস্তুতের আগে সেই গাছের আশীর্বাদ নেওয়া হতো। এই চর্চা অনেকটা আজকের “Plant Intelligence” ধারণার সাথে মিলে যায়।

আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান জাদুচর্চা থেকে দূরে অবস্থান করলেও Placebo effect, sound healing, guided imagery, এসব পদ্ধতিতে সেই আদি occult বিশ্বাস এখনও জীবিত। মানুষ যখন চেতন এবং অবচেতনের সীমান্তে গিয়ে রোগকে চিনতে শেখে, তখন সে এক প্রকার inner alchemy-র ভিতর দিয়ে যায়, এটি ঠিক occult-চিকিৎসার মতোই।

চীনে কয়েন ও নোট ব্যবহার ‘বিলুপ্তির পথে’

চীনে নগদ লেনদেন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে খ্যাত চীন এখন কার্যত পুরোপুরি ডিজিটাল। শহরের সুপারমার্কেট, ক্যাফে, ট্যাক্সি কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট—সবখানেই লেনদেন চলে মূলত দুটি অ্যাপে : উইচ্যাট ও আলি পে।

দোকানের সামনে সারি সারি ঝুলে থাকে সবুজ আর নীল লোগোর বোর্ড। অনেক প্রতিষ্ঠান তো এখন আর ক্যাশ রেজিস্টারই রাখে না—ক্রেতা শুধু ফোনে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলেই লেনদেন সম্পন্ন।

বাড়ির পাশের ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে ট্যাক্সিচালক পর্যন্ত অনেকেই এখন আর নগদ নিতে চান না। অনেক সময় খুচরো টাকাও থাকে না তাদের কাছে।

গত দশকে পরিবর্তনটা কতটা দ্রুত হয়েছে, সেটি উল্লেখ করে সবজি বিক্রেতা মা দিয়ান বলেন, ‘এটা একেবারে আমূল পরিবর্তন। এখন আমি শুধু বয়স্কদের কথা ভেবে নগদ নিই। ৮০ বছরের নিচে যারা, প্রায় সবাই মোবাইলে পেমেন্ট করে। তবে তার ওপরে যারা, তাদের পক্ষে মানিয়ে নেওয়া কঠিন।’

৮১ বছর বয়সী ওয়ে ইউনলিয়াং ট্যাক্সি ডাকতে হলেও এখন পরিবারের সাহায্য নেন। কারণ আগের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর গাড়ি পাওয়া যায় না; চীনের ‘উবার’ খ্যাত ‘দিদি’ অ্যাপে বুকিং ছাড়া গাড়ি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

অনেক সময় এটি নিয়ে বিপাকে পড়েন বিদেশি পর্যটকরাও—এয়ারপোর্ট থেকে শহরে পৌঁছাতে হলে আগে থেকে অ্যাপ ডাউনলোড ও অর্থ স্থানান্তর করতে হয়, না হলে গাড়ি পাওয়া বেশ মুশকিল।

মহামারির সময় যখন অনেক দোকান কেবল ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে শুরু করে, তখনই ৭৫ বছর বয়সী ওয়াং এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যান। তবুও নিরাপত্তার খাতিরে তিনি সবসময় পকেটে ১০০ ইউয়ানের একটি নোট রাখেন (প্রায় ১ হাজার ৬০০টাকা )—এতে ফোন হারিয়ে গেলে বা ভুলে গেলে অন্তত বাসায় ফেরার ভরসা থাকে।

একসময় সাধারণ একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে শুরু হওয়া উইচ্যাট এখন চীনাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। কেনাকাটা থেকে শুরু করে খাবার অর্ডার, ট্যাক্সি ডাকা, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ—সবই করা যায় এর ভেতরের অসংখ্য ‘মিনি-প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে। অন্যদিকে, আলিবাবার মালিকানাধীন আলিপে মূলত একটি পেমেন্ট টুল।

এই দুই অ্যাপের মাধ্যমে চীনে ব্যাংকিং কার্যক্রম অনেকটাই পেছনের কাতারে চলে গেছে। যদিও বেতন পেতে এখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা জরুরি এবং এই অ্যাপগুলোর সঙ্গে একটি কার্ড সংযুক্ত করতে হয়, তবুও অনেক তরুণ চীনার দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যাংকের কোনো ভূমিকা নেই—যতক্ষণ না তারা গৃহঋণের মতো বড় কোনো আর্থিক সুবিধা নিতে চান।

চীনের সব ব্যাংকই রাষ্ট্রায়ত্ত হলেও, উইচ্যাট ও আলিপে-এর আগ্রাসী ডিজিটাল আধিপত্যের সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারছে না। সাধারণ লেনদেনে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে গেছে।

চীনা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এই সাফল্যে কিছুটা উদ্ধত হয়ে ওঠলেও, উইচ্যাট-এর মালিক টেনসেন্টের সিইও মা হুয়াতেং সবসময়ই পেছনে থেকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বকে সম্মান জানিয়ে চলেছেন।

উইচ্যাট ও আলিপের সীমাহীন আধিপত্যের প্রতিক্রিয়ায় চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈশ্বিক বিস্তারকে ‘অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে দেখেছিল বেইজিং।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০২২ সাল থেকে পিপলস ব্যাংক অব চায়না চালু করে ডিজিটাল ইউয়ান বা ডিজিটাল রেনমিনবি (e-CNY)। এই মুদ্রা প্রচলিত ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়, তবে এটি সম্পূর্ণ কাগুজে রূপহীন—একটি নিখাদ ডিজিটাল লেনদেন মাধ্যম। এর নিয়ন্ত্রণ থাকে রাষ্ট্রের হাতে, আর ইস্যু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই।

তবে বাস্তবতা হলো, দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল ইউয়ানের ব্যবহার এখনো প্রায় অদৃশ্য। কারণ মানুষ এর চেয়ে অনেক বেশি ভরসা করে উইচ্যাট ও আলিপের ‘সুবিধা’ ও ‘স্বাচ্ছন্দ্যের’ ওপর।

আরাকানের রাজদরবারে বাংলা ভাষা

১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ, বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে তখনো অশান্তি। মগ জলদস্যুরা নদীপথে, পর্তুগিজ নাবিকেরা বন্দরের দখল নিয়ে ব্যস্ত।ঠিক সে সময়, কক্সবাজার থেকে সামান্য দক্ষিণে আরাকানের রাজধানী ম্রাউক উ-তে বসে আছেন এক বৌদ্ধ রাজা রাজা থিরি তুদামা।সামনে তার বাংলা ভাষায় লেখা এক কাব্যের পাণ্ডুলিপি। লিখেছেন তাঁরই দরবারের কবি আলাওল। সে কাব্যের নাম পদ্মাবতী। এটাই সেই অধ্যায় যেটা আমরা হয়তো প্রায় ভুলেই গেছি, যেখানে বাংলা ভাষা ছিল রাজ্যর রাষ্ট্রভাষা, আর রাজা ছিলেন বাংলার কবিতার পৃষ্ঠপোষক।

আরাকান রাজ্য, যেটিকে এখন আমরা রাখাইন বলি, সেটি ছিল এক স্বাধীন ও শক্তিশালী উপকূলীয় রাজ্য। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ত্রয়োদশ শতক থেকেই এই অঞ্চলে শাসন করতেন, তবে ষোড়শ শতকে এসে রাজনৈতিকভাবে এরা বাংলার আফগান ও মুসলিম শাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়। ১৪৩০ সালে বঙ্গদেশের সুলতান জালালউদ্দিন শাহ আরাকানের রাজা নরমেইককে পুনঃসিংহাসনে বসান এবং সে সম্পর্ক গভীর হতে হতে বাংলা ভাষার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ম্রাউক উ-এর প্রাসাদেও।

১৫৩১ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় আরাকান রাজ্যের “বাংলা যুগ”, এই সময়েই বাংলা ভাষা দরবারের মুখ্য ভাষায় পরিণত হয়। বাংলার দরবারচর্চা, কাব্য ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে রাজদরবার থেকে গ্রামীন কল্পলোকেও।

বাংলা ভাষাকে শুধুমাত্র দরবারে ব্যবহার করার পেছনে সাংস্কৃতিক বা নান্দনিক কারণই ছিল না, এটি ছিল এক কৌশলগত সিদ্ধান্তও।আরাকান রাজারা বুঝেছিলেন, পূর্ববঙ্গ তথা চট্টগ্রাম, সিলেট ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করতে হলে বাংলাকেই গ্রহণ করতে হবে।

১৫৭৫ সালে রাজা মিন ফালু যখন সুলতান আকবরের নামে মুদ্রা জারি করেন, তাতে ফারসি ও বাংলা দু’ভাষার সংমিশ্রণ ছিল। বাংলার প্রশাসনিক ভাষা তখন যেমন ফারসি ছিল, তেমনি আরাকানে বাংলা হয়ে উঠছিল দরবারি ভাষা। বাংলাভাষী মুসলমানদের বড় অংশ আরাকানে প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত ছিল, ফলে বাংলায় রাজনীতি, নীতিকথা, ধর্মীয় আখ্যান এবং প্রেম-ভাষ্য সবকিছুই সেই সময়কার সাংস্কৃতিক ছক হয়ে দাঁড়ায়।

আলাওলের জীবন কেবল কবিতা নয়, এটি এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিভ্রমণ। তিনি ছিলেন এক সৈনিক, পরে দাস, শেষে কবি। আরাকানের এক সেনাপতির শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে পড়েন তিনি, কিন্তু তার সাহিত্য প্রতিভা তখনকার সেনাপতি মাগন ঠাকুরের নজরে পড়ে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আলাওল রচনা করেন তোহফা, সয়ফুল মুলুক, এবং অনুবাদ করেন মালিক মুহাম্মদের পদ্মাবতী।

এই অনুবাদ ছিল সরল নয় তাতে যোগ হয়েছিল বাংলার নিজস্ব সুর, মর্ম, সূফি ভাব, নারীর সম্মান ও অন্তর্জাগতিক প্রেমের প্রকাশ।রাজা থিরি তুদামা নিজে ছিলেন এই কাব্যচর্চার পৃষ্ঠপোষক। এই সহাবস্থান দেখায়, বাংলা ভাষা কেবল শাসনের ভাষা ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল রাজাদের আধ্যাত্মিক আশ্রয়ও।

আলাওলের পূর্বসূরি দৌলত কাজী আরাকান দরবারেই রচনা করেন সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী—যেখানে নারীর সতীচরিত্রের কাহিনি এক ধ্রুপদী কাঠামোয় উঠে আসে। তার ভাষা সরল, কিন্তু তাতে রোমান্স ও মূল্যবোধের সমন্বয় রয়েছে। অন্যদিকে মাগন ঠাকুর নিজে একজন বৌদ্ধ হলেও ছিলেন আলাওলের মেন্টর ও বাংলা কবিতার উপাসক। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার সুফি-রোমান্টিক কাব্যধারা পল্লবিত হয়।বৌদ্ধ, মুসলিম ও হিন্দু মিলে এই ত্রিমুখী উপস্থিতি বাংলা ভাষার ঐক্যসাধনের অনন্য প্রমাণ।

একটি বৌদ্ধ রাজ্যে এক মুসলিম কবি ফারসি মহাকাব্য বাংলায় অনুবাদ করছেন এবং সে অনুবাদের তত্ত্বে রয়েছে হিন্দু-ইসলাম-বৌদ্ধ চিন্তার মিলন এটাই ছিল আরাকানের দরবার। এই সহাবস্থান এক নতুন “বঙ্গ” তৈরি করেছিল, যা শুধুই ভৌগোলিক ছিল না, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। এ কারণেই কেউ কেউ বলেন বাংলা ভাষার প্রকৃত আত্মা শুধু পশ্চিম বাংলার তত্ত্বে নয়, উপকূলীয় ও পাহাড়ি জনপদেও লুকিয়ে আছে।

বাংলা ভাষার গৌরব কেবল ১৯৫২ সালের শহীদ মিনারে নয়, তার রয়েছে প্রাচীন দরবার, সিংহাসন, প্রেমকাব্য এবং সুফিবাদের গভীর ইতিহাস। আরাকানের রাজদরবার তারই এক জলজ ছায়া, যেখানে বাঙালিত্ব কেবল মাটিতে নয়, ছিল পাহাড়ের ওপারেও, সিংহাসনের উচ্চারণেও।

পাঠচর্চার সংকট যেভাবে গণতন্ত্র ও রাজনীতির বিকৃতি ঘটাতে পারে

আপনি কি ইদানীং-এর মধ্যে একটা বই একটানা পড়ে শেষ করেছেন? কিংবা এমনও হতে পারে একটু পড়া শুরু করেই ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চলে গেছে ইনস্টাগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে বা হয়তো ‘চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করি হাতে এই আঁচিলটা ক্যান্সার কিনা’ জাতীয় কিছুর খোঁজে। এমনটা শুধু আপনার নয়, পুরো একটি প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস হয়ে উঠেছে। আর এখানেই প্রশ্ন উঠে, আমরা কি ক্রমশ এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে ‘পড়ার’ বদলে শুধু ‘দেখা ও বলা’ই বেঁচে থাকবে?

Gallup এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্করা ইতিহাসে সর্বনিম্ন সংখ্যক বই পড়েছে। National Center for Education Statistics জানায়, ১৯৮৪ সালে যেখানে ৩৫% ১৩ বছর বয়সীরা “প্রায় প্রতিদিন” বই পড়তো, ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ১৪%-এ। অথচ আমরা দিনে গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় কাটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে শব্দ আছে, ক্যাপশন আছে, কিন্তু নেই গভীর পাঠ। আমেরিকান সমাজে এই ‘ডিপ রিডিং’ বা গভীর পাঠের ক্রমহ্রাস এমন একটি মানসিক কাঠামোর অবক্ষয় ঘটাচ্ছে যা যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনাশীলতা ও সামাজিক সহনশীলতাকে তৈরি করতো। একে বলে ‘Deep Literacy’—যেটি শুধু বই পড়া নয়, বরং চিন্তা গঠনের এক ধরণ।

দার্শনিক ওয়াল্টার ওং তার “Orality and Literacy” বইতে বলেন, লিখিত ভাষা মানুষের চিন্তার কাঠামো বদলে দেয়। মৌখিক সংস্কৃতিতে কথা মনে রাখার জন্য পুনরাবৃত্তি, উপমা ও সহজ শব্দচয়নের প্রয়োজন হয়। তাতে জটিল তর্ক বা বিমূর্ত চিন্তা করা কঠিন হয়। তিনি বলেন, লিখিত ভাষা মানুষের ভাবনাকে বিমূর্ত করে তোলে, আত্ম-অন্বেষণ ও যুক্তিপূর্ণ যুক্তি তৈরি করে। এটি ছিলো এমন এক মানসিক বিপ্লব যা গণতন্ত্র, বিজ্ঞান ও মানবাধিকার চেতনার ভিত্তি গড়ে তোলে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষ আবার এমন এক মৌখিক সমাজে প্রবেশ করছে, যেটা ওয়াল্টার ওং বলেছিলেন প্রাক-সাক্ষর সংস্কৃতি ।TikTok, Reel, Meme, Emoji—এসব সংক্ষিপ্ত, আবেগনির্ভর ও মুখরোচক উপাদান মানুষের মনকে আবারও সংক্ষিপ্ত, সহজবোধ্য এবং দলভিত্তিক ভাবনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধারণা ছড়ানোর জন্য এখন আর তথ্যের সত্যতা প্রয়োজন হয় না বরং কি ভাইরাল হয় সেটাই সত্যের মানদণ্ড। সমাজে এমন এক অবস্থা তৈরি হচ্ছে যেখানে ভাবনা নয়, সামাজিক অনুমোদনই যুক্তির বিকল্প হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণ ও চরমপন্থা বেড়েছে, কারণ যুক্তির বদলে আবেগ দিয়ে মত গঠন করা হচ্ছে। এখন “লিভড এক্সপেরিয়েন্স” (ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা) বহু ক্ষেত্রে প্রমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে ভাবনার বৈচিত্র্য বা বিরোধ সহ্য করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি মতবাদের পেছনে দাঁড়িয়ে যায় আলাদা শ্রেণি বা গোষ্ঠী। মানুষ আর যুক্তি দেখে না, দেখে কে বলেছে তারপরেই মত গঠন করে।

এই আলোচনা মূলত আমেরিকান সমাজের উদাহরণ দিয়ে শুরু হলেও কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আমরা বাংলাদেশে আমাদের সমাজেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। স্কুল-কলেজে বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ছে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগে যেখানে পাড়ার পাঠাগারে বা স্টল থেকে মাসিক ম্যাগাজিন কিনে পড়া হতো, সেখানে এখন স্ক্রিনে চোখ, রিলে মন এবং শিরোনামে মনোযোগ সীমাবদ্ধ।

বইমেলা যতটা জমে, তার বড় একটা অংশই হয়ে দাঁড়ায় ইভেন্ট বা ফটোশ্যুট। পড়া আর আত্মস্থ করার মধ্যকার যে নিবিড় সম্পর্ক, তা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে গেছে। ‘শেয়ারযোগ্যতা’ই হয়ে উঠছে তথ্য গ্রহণের একমাত্র মানদণ্ড। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক মতবিনিময়েও এই ডিজিটাল মৌখিকতা প্রবলভাবে বিরাজ করছে। যুক্তিভিত্তিক আলোচনা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা দলগত অনুরাগ-বিদ্বেষের জায়গায় মতামত গড়ে উঠছে।

আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমাদের পছন্দ ঠিক করবে সমাজের ভবিষ্যৎ। আমরা কি আবারও একটি মৌখিক, আবেগনির্ভর, প্রতিপক্ষ-নির্ভর সমাজে ফিরে যাবো? নাকি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেও পড়ার, ভাবার ও বুঝে মত প্রকাশের ঐতিহ্যকে ধরে রাখবো?

পাঠ কেবল জ্ঞানার্জনের উপায় নয়, এটি আমাদের মানসিক পরিপক্বতার প্রতিফলন। সমাজ যতই বদলাক পাঠের গভীরতা ধরে রাখা না গেলে, আমরা হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকবো, কিন্তু মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাবো এক আদিম জগতে।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন – প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধি বদলে দেবে বিশ্ব অর্থনীতি?

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট ও আরও কিছু উন্নত দেশ বহু দশক পর আবারও ব্যাপক হারে সামরিক প্রস্তুতির পথে হাঁটছে।ইউক্রেনে যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, তাইওয়ান নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতি—এসবই প্রতিরক্ষায় বড় বাজেট বরাদ্দের তাগিদ সৃষ্টি করেছে।

জুনের শেষ সপ্তাহে ন্যাটোর সদস্যরা জিডিপির ৩.৫% সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে এবং ১.৫% নিরাপত্তা-সম্পর্কিত খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে সম্মত হয়েছেন। এ পরিকল্পনা সফল হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে তারা সামরিক খাতে আগের তুলনায় বছরে ৮০০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করবে—যা বিশ্ব অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।

অনেকে বলছেন–সামরিক খাতে বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় প্রবৃদ্ধি ঘটাবে। ন্যাটো সদস্যরা যদি প্রতিশ্রুতি মতো ব্যয় বাড়ায়, তাহলে তা সামাজিক ব্যয়ের অংশকে সংকুচিত করবে—যা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী ‘শান্তি লভ্যাংশ’-কে কার্যত শেষ করে দেবে। একইসঙ্গে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে, যা সুদের হার বাড়িয়ে সরকারি অর্থনীতিকে আরও নাজুক করে তুলবে।

এ ধরনের বড় বাজেট ঘাটতি ‘কেইনসীয় প্রণোদনা’ হিসেবে অল্প সময়ের জন্য কাজ করলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে অস্বস্তিকর হতে পারে—বিশেষ করে যখন উন্নত বিশ্বে মজবুত শ্রমবাজার ও অব্যাহত মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান। পাশাপাশি, অস্ত্র কিনে কারও জীবনমান সরাসরি উন্নত হয় না।

তবে, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও প্রযুক্তি কিছু ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। সামরিক খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। যেমন, ইন্টারনেট ও পারমাণবিক শক্তি—দু’টিই উদ্ভব হয়েছিল সামরিক গবেষণা থেকে।

পশ্চিমা রাজনীতিকদের দাবি, সামরিক ব্যয় শিল্পায়নহীনতা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আধুনিক অস্ত্র উৎপাদন পদ্ধতি এখন খুবই স্বয়ংক্রিয় ও দক্ষতাভিত্তিক। এর ফলে সামরিক শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলোতে সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে মাত্র ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতে পারে বলে অনুমান, যা ৩ কোটি শিল্প কর্মীর ইউরোপীয় শ্রমবাজারে সামান্যই প্রভাব ফেলবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ড্রোন নির্মাণের মতো কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ এবং এতে ব্যাপক শ্রমের প্রয়োজন হয় না। উপরন্তু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও মানবশক্তির প্রয়োজন কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের কাছে মুনাফার ভাগ তুলে দিচ্ছে।

পাবলিক ফিন্যান্স যখন ভঙ্গুর, তখন প্রতিটি অর্থ খরচ করতে হয় খুব হিসাব করে। না হলে সামান্য প্রবৃদ্ধির বিনিময়ে যে মূল্য দিতে হবে, তা হয়তো বহুগুণ বেশি—কর বৃদ্ধি অথবা সামাজিক খাতে কাটছাঁটের পাশাপাশি রয়েছে স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিও।