Home Blog Page 61

সত্য-মিথ্যার ধোঁয়াশায় ‘Non-classical Logic’

প্রথাগত যুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ ক্লাসিকাল লজিক আমাদের চিন্তার ভেতরে এক নিরব কিন্তু কড়া শৃঙ্খলার মতো কাজ করে। যেন এক অলিখিত নিয়ম, যেখানে সত্য আর মিথ্যার মাঝখানে অন্য কোনো অবস্থান স্বীকৃত নয়। আপনি হয় ‘হ্যাঁ’ বলবেন, নয়তো ‘না’। হয় আলো, নয়তো আঁধার।

কিন্তু বাস্তব জগত কি এতটাই দ্বিবাচক? ধরুন কেউ আপনাকে প্রশ্ন করল, “এই লোকটি কি সৎ?” আপনি দীর্ঘদিন ধরে তার আচরণ দেখেছেন। কখনও সে অসাধারণ ন্যায়পরায়ণ, আবার কখনও নিজস্ব স্বার্থে আপোষ করে। আপনি নিশ্চয়ই বলবেন, “আংশিকভাবে”।কিন্তু ক্লাসিকাল লজিক আপনাকে সেই অনুমতির সুযোগ দেয় না। এমন অস্পষ্ট, অনিশ্চিত বাস্তবতার ভেতরে চিন্তার নতুন দরজা খুলেছে এক ভিন্ন ধারার যুক্তিবিদ্যা, নন-ক্লাসিকাল লজিক। এটি এমন এক যুক্তি-ভাষা, যা ধূসরতায় স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজে।

প্রথাগত যুক্তিবিদ্যা তিনটি প্রধান নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
Law of Identity: একটি বস্তু যা, তা-ই। (A is A)
Law of Non-Contradiction: একটি বক্তব্য একসাথে সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না।
Law of Excluded Middle: কোনো উক্তি হয় সত্য নয়তো মিথ্যা, মধ্যপথ নেই।

এই তিনটি সূত্র দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানের ভাষা, গাণিতিক যুক্তি এবং নীতিশাস্ত্রের ভিত হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এদের মধ্যে এমন কোনো কাঠামো নেই যা বাস্তব জীবনের অস্পষ্টতা ধারণ করতে পারে। উদাহরণ দিলে, প্রেম কি সত্য? কিংবা ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার সংজ্ঞা কি সর্বজনীন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ক্লাসিকাল লজিকের দ্বিমাত্রিক কাঠামোতে আটকে পড়ে।

১৯৬৫ সালে ইরানি বংশোদ্ভূত গণিতবিদ লোফি জাদে Fuzzy Logic আবিষ্কার করে একটি বিপ্লব ঘটালেন যুক্তির জগতে । এখানে সত্য কোনো দুই পয়েন্টের মধ্যকার স্কেল। ‘গরম’ শব্দটি ৫০ ডিগ্রিতে কতটা প্রযোজ্য, এমন প্রশ্নের উত্তর হবে, “০.৭ মাত্রায় গরম”ভএকটি পরিমাপক সত্য।

আধুনিক সময়ের অনেক স্মার্ট যন্ত্র যেমন এয়ার কন্ডিশন, ওয়াশিং মেশিন—ফাজি লজিক ব্যবহার করে। কারণ এইসব যন্ত্র শুধু চালু- বন্ধ নয়, বরং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের প্রয়োজন বুঝতে পারে। ফাজি লজিক আসলে সেই যুক্তিবিদ্যা, যেখানে মানুষের আবেগ, সংশয়, এবং তুলনামূলকতা প্রকাশ করা যায় যা দ্বিমাত্রিক সত্য ধারণ করতে পারে না।

এবার চলি ইন্টিউশনিস্টিক লজিক-এর দিকে, যার জন্মদাতা ডাচ গণিতবিদ L.E.J. Brouwer। তার মতে, “যা আপনি প্রমাণ করতে পারেন, শুধু সেটাই সত্য বলা যেতে পারে।” এখানে ক্লাসিকাল লজিকের “A অথবা না-A” নিয়ম খাটে না। যদি আপনি A-কে প্রমাণ করতে না পারেন, আবার তার বিপরীতকেও না পারেন, তবে আপনি নিরুত্তর থাকবেন। এটি মূলত ব্যবহার হয় গণিতে, যেখানে গাণিতিক নিখুঁত প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু এটি দর্শন ও মেটাফিজিক্সেও একটি তীক্ষ্ণ হাতিয়ার যেখানে আমরা প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে প্রমাণ খুঁজি, অনুমান নয়।

নন-ক্লাসিকাল যুক্তির ভাণ্ডার কেবল ফাজি বা ইন্টিউশনিস্টিক লজিকেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও কিছু বিস্ময়কর ধারার নাম জেনে নেওয়া যাক—Paraconsistent Logic: যেখানে একটি উক্তি একইসাথে সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে। যেমন: “এই বাক্যটি মিথ্যা”। এটি যদি সত্য হয়, তবে সে নিজেই মিথ্যা।
Modal Logic: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার পার্থক্য নির্ণয় করে।
Relevant Logic: যেখানে ফলাফল তখনই যুক্তিসঙ্গত, যদি সেটির ভিত্তি পূর্বতথ্যের সাথে প্রাসঙ্গিক হয়।
এই ধারাগুলো একে একে যুক্তিবিদ্যাকে মানুষের মতো করে চিন্তা করতে শেখায়।

নন-ক্লাসিকাল যুক্তিবিদ্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা দৈনন্দিন জীবনে এমন অসংখ্য সিদ্ধান্তের সম্মুখীন হই, যেগুলো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’তে মাপা যায় না। নন-ক্লাসিকাল লজিক আমাদের সেই আবছা বাস্তবতার ভিতরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি সূক্ষ্ম পরিমাপক দেয়। রোবটকে যদি মানুষের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে তাকে শেখাতে হবে কীভাবে অনিশ্চয়তা ও দ্বৈততা গ্রহণ করতে হয়। তাই AI, মেশিন লার্নিং, এবং অটোনমাস সিস্টেমে এসব লজিক অপরিহার্য হয়ে উঠছে। “কোনো কাজ ন্যায় কি অন্যায়”—এ প্রশ্নের উত্তর সবসময় সাদা-কালো হয় না। নন-ক্লাসিকাল লজিক আমাদের সেই সিদ্ধান্তগুলোতে তুলনামূলক বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়।

সত্য সবসময় সাদা নয়, মিথ্যাও সবসময় কালো নয় এই মাঝের অনির্ধারিত ধূসরতাকেই ধারণ করে নন-ক্লাসিকাল যুক্তিবিদ্যা। এটি আমাদের শেখায় চিন্তার ক্ষেত্রেও তৃতীয় একটি জায়গা থাকতে পারে। যেখানে আমরা “অজানা”, “অসম্পূর্ণ” বা “আংশিক সত্য”কে সম্মান করি।

বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি-চিন্তায় এই ধারাগুলো হয়ে উঠতে পারে আমাদের নতুন ভাষা—যেখানে ক্লাসিকাল লজিকের কাঠামো ভেঙে সৃষ্টি হয় মানবিক যুক্তির সত্যিকারের প্রকাশ। এই ভাবনাগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা প্রবেশ করি যুক্তিবিদ্যার সেই অধ্যায়ে, যেখানে সত্য শুধু একটি পয়েন্ট নয়, একটি পরিপূর্ণ স্পেকট্রাম।

নাগরিক না কনজিউমার? ভবিষ্যতের সমাজে ব্যক্তি পরিচয়ের সংকট

একটা সময় ছিল যখন ‘নাগরিক’ পরিচয়টি ছিল গর্বের বিষয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে যার একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। নাগরিক মানেই শুধু ভোটার নয়, পাঠক, প্রতিবাদকারী, সমাজচিন্তক, পাড়া-পড়শির পাশে থাকা একজন মানুষ। কিন্তু আজ? আপনি কি এখনো কেবল একজন নাগরিক, নাকি ধীরে ধীরে আপনি একজন কনজিউমার হয়ে যাচ্ছেন?

এই প্রশ্নটা নিছক দার্শনিক নয়। এটি আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সমাজে ভূমিকা এবং ভবিষ্যতের সামাজিক চুক্তির (Social Contract) সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র যদি আপনাকে আর নাগরিক হিসেবে না দেখে, বরং শুধু একজন “ব্যবহারকারী” বা “ক্রেতা” হিসেবে দেখে তবে আপনি কী হারাচ্ছেন?

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি ভোক্তাকেন্দ্রিক সমাজ (Consumer Society) তৈরি করেছে। আমরা এখন যে তথ্য পড়ি, গান শুনি, ভিডিও দেখি, এ সবকিছু আমাদের চাহিদা নয়, বরং কর্পোরেট অ্যালগরিদমের প্রভাবের ফল। গুগল, মেটা, অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টদের কাছে আমরা কেবল একটি “ডেটা প্রোফাইল” আমাদের বয়স, আগ্রহ, চিন্তাভাবনা, এমনকি রাজনৈতিক ঝোঁকও তারা জানে।নাগরিকতা যেখানে এক ধরণের অধিকারের কাঠামো ছিল, কনজিউমার হওয়া মানে আপনি সেখানে একটি টার্গেট মার্কেট। আপনি কী কিনবেন, কী দেখবেন, কী বিশ্বাস করবেন সবই নির্ধারিত হয় বাজারের খেয়ালে।

একটা সময় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মানে ছিল মিছিল, প্রতিবাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ। কিন্তু এখন সমাজ ধীরে ধীরে “Scroll-based Engagement”-এ পরিণত হচ্ছে। আমরা ফেসবুকে রিয়্যাক্ট দিচ্ছি, টুইটারে মত দিচ্ছি কিন্তু বাস্তবে অংশ নিচ্ছি না। এর ফলে কী হচ্ছে? আমরা একটা “ইমোশনালি একটিভ, কিন্তু সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয়” প্রজন্ম তৈরি করছি। নাগরিক পরিচয় ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে এবং এর শূন্যস্থান পূরণ করছে ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি—আপনি কী ফোন ব্যবহার করেন, কোন মিউজিক শোনেন, কোন ব্র্যান্ডের জামা পরেন।

২০২৪ সালের একটি গবেষণায় (Harvard Kennedy School) বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে ৭৮% রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই কোনও না কোনওভাবে অ্যালগরিদমিক ফিল্টার দ্বারা প্রভাবিত। আমরা যা দেখি, যা জানি তা আর নিরপেক্ষ নয়। এই অ্যালগরিদম আমাদের নাগরিক পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে। একদিক থেকে, আমরা যদি চিন্তা করার সুযোগই না পাই, যদি প্রতিটি তথ্যের আগে “স্পন্সরড” ট্যাগ থাকে, তবে আমরা নিজের মত তৈরিই বা করবো কীভাবে? তাহলে কি আমরা আর নাগরিক নই? আমরা কি শুধুই একটি “ইন্টার‌্যাকশন রেট”?

একটি ভয়ংকর প্রবণতা হলো রাষ্ট্রও এখন কর্পোরেট লজিক অনুসরণ করতে শুরু করেছে। তারা নাগরিকদের কথা শোনার পরিবর্তে “ইউজার স্যাটিসফ্যাকশন”, “ট্রাফিক এনালিটিকস”, “ডিজিটাল রেসপন্স রেট” এসব ভাষায় কথা বলছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, এমনকি ইউরোপে নাগরিকত্ব এখন অনেকাংশে ডিজিটাল আইডি ও স্কোর-এর ওপর নির্ভর করছে। চীনের “সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম” তো এক ধরণের আধুনিক ডেটা-ভিত্তিক নাগরিকতা তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে আপনি কীভাবে বাসে উঠলেন, কোথায় গিয়ে দাঁড়ালেন তা দিয়েই আপনার অধিকার নির্ধারণ হয়।

এই পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে এর মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় সংরক্ষণ করবো? আমাদের প্রয়োজন Digital Literacy, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, কে কীভাবে তার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করছে। নাগরিক আন্দোলন এখন অনলাইনেও হতে পারে, তবে তা যেন বাস্তব সমাজে প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তি পরিচয়কে পণ্যিকরণ থেকে বের করে আনা জরুরি। মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবা দরকার, শুধু ডেটা প্রোফাইল হিসেবে নয়।

কারা হবে বিরোধী দল? প্রয়োজন জনমুখী রাজনীতি : কল্লোল মোস্তফা, প্রকৌশলী, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

” … জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী জনমুখী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোন দল ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তা নিয়ে খুব বেশি অনিশ্চয়তা না থাকলেও অনিশ্চয়তা রয়েছে প্রধান বিরোধী দল নিয়ে।

নির্বাচনের পর অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনেরও একটা আলোচনা আছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল কারা হবে এবং কতটা শক্তিশালী হবে। বিরোধী দল ছাড়া কিংবা দুর্বল বিরোধী দল থাকা অবস্থায় জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করলে যে দেশে আবারও একটি একচেটিয়া শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না, তার কী নিশ্চয়তা?

… শুধু সাংবিধানিক সংস্কার দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকানো যাবে না, সংস্কারকৃত সংবিধান মেনে চলার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতিও লাগবে।

আবার কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের দল প্রধান বিরোধী দল হবে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা আছে। সম্ভাব্য মধ্য ডানপন্থী সরকারি দল বা জোটের বিপরীতে যদি কোনো ডানপন্থী দল বা জোট শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, তাহলে মধ্যপন্থী দলটি আরও ডান দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বা জোট যদি বামপন্থী বা মধ্য বামপন্থী দলের জোট হয়, তাহলে মধ্য ডানপন্থী সরকারি দল বা জোট বাধ্য হবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর জোর দিতে।

বাংলাদেশে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক শূন্যতা রয়েছে। একসময় অনেকে আওয়ামী লীগকে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দল ভেবে সমর্থন দিয়েছেন। যদিও আওয়ামী লীগ কখনোই তা ছিল না। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর দলটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে।…এ রকম একটি অবস্থায়, যাঁরা সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক ভেবে একসময় আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁরা কাকে সমর্থন দেবেন?

চারদিকে উগ্র ডানপন্থার হাওয়া। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একদিকে যখন রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন বন্দোবস্তের আলাপ চলছে; অন্যদিকে তখন ধর্মীয়-লিঙ্গীয়-জাতিগত বিভাজন উসকে দেওয়া উগ্রবাদী পরিচয়ের রাজনীতি জোরদার হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক শক্তির দীর্ঘদিনের শূন্যতা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। বামপন্থীরা আছেন, কিন্তু নানান বিভক্তি ও দুর্বলতার কারণে জোটবদ্ধ হয়ে জনগণের সামনে শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারছেন না।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় বামপন্থীরা ধর্ম ও জাতিগত বিভাজনের ডানপন্থী রাজনীতিকে অগুরুত্বপূর্ণ করে দিয়ে মূলত অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে মানুষের মন জয় করেছেন। শ্রীলঙ্কার অ্যাকটিভিস্ট ও তাত্ত্বিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা এককথায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডাকেই বামপন্থী দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন এনপিপি জোটের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাংলাদেশে এ রকম কোনো জোটবদ্ধ তৎপরতা ও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। উত্তরণকালে কে কী করছেন বা করছেন না, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ সময়ের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা বা না করার ফল সবাইকে বহুদিন ভোগ করতে হয়।”


গ্রাফিতি – ইতিহাস, প্রতিবাদ ও সংস্কৃতিতে দেয়ালের ভাষা

শহরের দেয়াল, সিঁড়ি, ট্রেনের বগি কিংবা সেতুর পিলারে দেখা রংধনুর নানা রঙে আঁকা বা লেখাগুলোকে আমরা গ্রাফিতি হিসেবে চিনি। এটি শুধু রং ও ছবি নয়, বরং মানুষের চুপচাপ প্রতিবাদের ভাষা, সামাজিক বার্তা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আজকের দিনে গ্রাফিতি বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর ইতিহাস শুরু হয় অনেক পুরোনো যুগ থেকে।

গ্রাফিতির সূচনা প্রাচীনকাল থেকে। রোমান সাম্রাজ্যের Pompeii শহরের দেয়ালে পাওয়া বিভিন্ন লেখা ছিল সাধারণ মানুষের অপ্রকাশিত অনুভূতি ও দৈনন্দিন জীবনধারার একটি প্রতিফলন। ঐ লেখাগুলো ছিল প্রেমের কবিতা, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং সামাজিক ব্যঙ্গের মতো। এগুলো ছিল এক ধরনের জনগণের কণ্ঠস্বর যা রাজা-রাজাদের চোখের বাইরে থেকে সমাজের নানা দিক ফুটিয়ে তুলত।

তবে গ্রাফিতি শুধু রোমেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মিশরীয় পিরামিড ও গ্রীক মন্দিরের দেয়ালে পাওয়া যেত নানা লেখা ও চিত্র, যেগুলো ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অথবা সামাজিক নিয়মের প্রতীক। এসব লেখালিপি মূলত পাথরের উপর ছিল, আর তা ছিল স্থায়ী এবং বিশাল শিল্পকর্মের অংশ।

আধুনিক অর্থে গ্রাফিতির ধারণা এসেছে ১৯৬০-৭০-এর দশকে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস ও হারলেম অঞ্চলে। এখানে তরুণরা ট্রেনের বগিতে বা দেয়ালে নিজেদের নাম, ট্যাগ (tag) লিখত যাকে ‘ট্যাগিং’ বলা হয়। এটি ছিল একটি পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম, একরকম শহুরে প্রতিপত্তি অর্জনের প্রচেষ্টা। এই ট্যাগিং-এর পথিকৃতরা ছিলেন Taki 183 ও Phase 2-এর মতো শিল্পী যারা শহরের দেওয়ালে নিজের সিগনেচার রেখেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

এই সময়ই হিপ-হপ কালচার গড়ে উঠতে শুরু করে, যেখানে গ্রাফিতি ছিল চারটি মূল উপাদানের মধ্যে অন্যতম। গ্রাফিতি তখন হয়ে ওঠে শহুরে তরুণদের নিজেদের বাস্তবতা, আশা, হতাশা ও স্বপ্ন প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

গ্রাফিতি শুধু ব্যক্তিগত সত্ত্বার প্রকাশ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার। ইতিহাস সাক্ষী যে, অনেক সময় যুদ্ধ, নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে।

বার্লিন ওয়ালের পূর্ব পাশে ‘East Side Gallery’ তৈরি হয়েছিল গ্রাফিতির মাধ্যমে, যা ছিল কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির প্রতীক। আরব বসন্তের সময় কায়রোর দেয়ালে জনসাধারণের বিক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে রাজনৈতিক স্লোগান ও প্রতিবাদের ছবি তৈরি হয়েছিল।

বাংলাদেশেও গ্রাফিতি রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল, শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বার্তা ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে গ্রাফিতির মাধ্যমে।

Banksy-এর মতো গোপনীয়তা ও বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী শিল্পীদের কারণে আধুনিক গ্রাফিতি আজ অনেক বড় শিল্প আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকসির কাজ শুধু রাস্তার দেয়াল নয়, মিউজিয়াম ও গ্যালারিতেও প্রদর্শিত হয়, যা গ্রাফিতিকে বাণিজ্যিক শিল্পেরও মর্যাদা দিয়েছে।

কিন্তু এর ফলে প্রশ্ন উঠে, গ্রাফিতি কি এখনো সেই বিদ্রোহী এবং স্বাধীনতা মেলে ধরে? নাকি এটি বাজারের একটি পণ্য হয়ে গেছে?অনেকেই মনে করেন গ্রাফিতি যখন পুঁজি ও বাজারের শিকার হয়, তখন তার সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি কমে যায়।

বাংলাদেশে স্ট্রিট আর্ট ও গ্রাফিতি সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে শহুরে তরুণ সমাজের মধ্যে। বিভিন্ন সমাজসেবা ও মানবাধিকার কর্মী গ্রাফিতিকে ব্যবহার করছেন নারী নির্যাতন, পরিবেশ সচেতনতা, ও রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে বার্তা জানানোর জন্য।

এই ধরনের গ্রাফিতি অনেক সময় সরাসরি মঞ্চ বা বক্তৃতার চাইতে বেশি শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। কারণ এটি সবার চোখের সামনে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে থেকে সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

গ্রাফিতি এককথায় বলতে গেলে সামাজিক ইতিহাস। এটি সময়ের সাথে পাল্টে যায়, তবুও মানুষের কণ্ঠস্বরের বহুমাত্রিক প্রকাশ থাকে।সেন্সরশিপের যুগে যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে গ্রাফিতি হয়তো আরও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ‘মুসেভেনি’ – ৪০ বছর ক্ষমতায় তবু আবারো নির্বাচন করবেন

উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ৮০ বছর বয়সি ইওয়েরি মুসেভেনি আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তার প্রায় ৪০ বছরের শাসনকাল আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো।

পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর ১৯৮৬ সালে ক্ষমতা দখল করেন মুসেভেনি। পরে আরও ছয়বার নির্বাচনে জয়ী হন। যদিও এসব নির্বাচনে সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগ রয়েছে।

তার দল ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট'(এনআরএম) ইতিমধ্যে দুইবার সংবিধান পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ও বয়সের সীমা তুলে দিয়েছে। ফলে মুসেভেনির ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তিনি নিরাপত্তা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করেছেন এবং নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেছেন। যদিও মুসেভেনি বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

মুসেভেনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে উগান্ডাকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে’ রূপান্তর করতেই তিনি ফের নির্বাচিত হতে চান।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বর্তমান মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬৬ বিলিয়ন ডলারের সামান্য কম।

বিরোধীদলীয় নেতা ববি ওয়াইন, যিনি পপ তারকা থেকে রাজনীতিবিদ বনে গেছেন এবং যার আসল নাম রবার্ট কিয়াগুলাইনি, ফের নির্বাচনে লড়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে ওয়াইন ব্যাপক জালিয়াতি, ব্যালট কারচুপি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

গত কয়েক মাসে দেশটিতে উত্তেজনা বেড়েছে। কারণ পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করেছে, যার ফলে সামরিক আদালত বেসামরিক নাগরিকদের বিচার করতে পারবে। তবে এ বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট একে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছে।

সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলায় এই পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধীদলীয় নেতারা বলছেন, এটি মূলত সমালোচকদের ভয় দেখানো ও তাদের মুখ বন্ধ করার হাতিয়ার।

পাকিস্তানের দাবি ভারতের বাণিজ্যিক অবরোধ ব্যর্থ

পাকিস্তানের ডন পত্রিকার রিপোর্ট–ভারতের নতুন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বহির্বাণিজ্যে তেমন প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন শিপিং শিল্পের নেতারা। ২রা মে ভারত এমন একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যার আওতায় পাকিস্তানগামী বা পাকিস্তান থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে তাদের বন্দরে নোঙর করতে বা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করতে দেয়া হচ্ছিল না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পদক্ষেপটি ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতায় নেয়া হয়। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা পাকিস্তানের রপ্তানি-আমদানি বন্ধ করে অর্থনীতিতে আঘাত হানার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে তাদের সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

শিপিং কোম্পানিগুলো দ্রুত অভিযোজিত হয়ে পাকিস্তান-সম্পর্কিত পণ্যগুলোকে ভারতীয় বন্দর থেকে আলাদা পথে চালান শুরু করে দেয়। ফলে ভারতীয় বন্দরের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায়।

পাকিস্তান শিপস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ তাহির হুসাইন বলেন, মাদার ভেসেলগুলো পাকিস্তানে আসা বন্ধ করেনি। ফিডার ভেসেলগুলো (ছোট আকারের মালবাহী জাহাজ) পাকিস্তানের বর্তমান আমদানি-রপ্তানির চাহিদা পূরণে যথেষ্ট সক্ষম। তারা একসাথে ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ কনটেইনার বহন করতে পারে।

তবে আমদানিকারকরা জানাচ্ছেন, ভারতীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে পণ্য আসতে ৩০ থেকে ৫০ দিন বেশি সময় লাগছে এবং এর ফলে ফ্রেইট চার্জও বেড়েছে। করাচি চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট জাভেদ বিলওয়ানি বলেন–মাদার ভেসেল না আসায় আমরা এখন ফিডার ভেসেলে নির্ভর করছি, ফলে খরচ বাড়ছে।

রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, যুদ্ধপরিস্থিতির প্রভাবে শিপিং ও বিমা খরচ বেড়েছে। তবে রপ্তানিতে কোনো বড় ধস দেখা যায়নি। টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানিকারক আমির আজিজ বলেন, শুধু বিমার খরচ বেড়েছে, কিন্তু রপ্তানির পরিমাণে তেমন প্রভাব পড়েনি।

২০১৯ সালের পর থেকে ভারত-পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কার্যত বন্ধ রয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ছিল ২.৪১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার। ভারতে পাকিস্তানের রপ্তানি কমে ২০১৯ সালের ৫৪৭.৫ মিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ২০২৪ সালে মাত্র ৪.৮ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

তবে এর বিপরীতে অনানুষ্ঠানিক বা বিকল্প রুটে বাণিজ্য রমরমা। আল জাজিরার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রতি বছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অনানুষ্ঠানিক পণ্য প্রবাহ হয়–মূলত দুবাই, কলম্বো এবং সিঙ্গাপুর হয়ে।

Dream Telepathy – অন্যের চিন্তা কি আপনার স্বপ্নে ঢুকে পড়তে পারে?

আপনি কি কখনও এমন স্বপ্ন দেখেছেন, যেটা ঠিক আপনার ঘুমানোর আগের কথার বা কারও ভাবনার সঙ্গে মিলে গেছে? মনে হয়েছে যেন অন্য কারও চিন্তা আপনার ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়েছে? এমন অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের Maimonides Medical Center-এ শুরু হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী গবেষণা, Dream Telepathy Experiment। এর লক্ষ্য ছিল, ঘুমের মধ্যে একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের চিন্তা বিনিময় সম্ভব কি না অর্থাৎ, স্বপ্নে ‘টেলিপ্যাথিক’ বার্তা আদান-প্রদান সত্যিই ঘটে কি?

১৯৬০-এর দশক ছিল মনস্তত্ত্ব ও প্যারাসাইকোলজির যুগান্তকারী সময়। যুক্তরাষ্ট্রে তখন মানসিক রোগ, ঘুম, স্বপ্ন এবং মন-শরীর সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরণের গবেষণা চলছিল। এই সময়ে মনোবিজ্ঞানী Montague Ullman এবং পরে তাঁর সহকর্মী Stanley Krippner একত্রিত হন একটি অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে “মানুষ কি স্বপ্নে অন্যের মনের ভাব বুঝতে পারে?” এই প্রশ্নকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করতে তাঁরা গঠন করেন Maimonides Dream Laboratory।

গবেষণাটি ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। পদ্ধতিটি ছিল একজন “সেন্ডার” বা বার্তা-প্রেরককে একটি নির্দিষ্ট ছবি বা শিল্পকর্ম দেখতে দেওয়া হতো। আর একজন “রিসিভার” বা গ্রহণকারী অন্য একটি ঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন, তাঁকে REM (Rapid Eye Movement) ঘুমের পর্যায়ে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হতো—বিশেষ করে।

REM ঘুমের সময় গবেষকরা রিসিভারকে জাগিয়ে তুলতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন “আপনি এখন কী স্বপ্ন দেখছিলেন?” সেই স্বপ্নের বর্ণনা সংগ্রহ করে তা মিলিয়ে দেখা হতো সেন্ডার যে চিত্রটি দেখেছিলেন, তার সঙ্গে কোনো রকম সাদৃশ্য আছে কি না। এভাবে বহু রাত ধরে ডজনখানেক পরীক্ষা চলেছে।

অনেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, রিসিভাররা এমন স্বপ্ন দেখেছেন যেগুলোর উপাদান সেন্ডারের দেখা ছবির সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে গেছে।একজন সেন্ডারকে দেওয়া হয়েছিল বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Salvador Dali-র একটি সুররিয়াল পেইন্টিং। সেই রাতে রিসিভার স্বপ্নে দেখেন গলে যাওয়া ঘড়ি, বাঁকা আকৃতি, এবং অস্পষ্ট মুখাবয়ব। গবেষকদের মতে, এই সাদৃশ্য কেবল কাকতাল হতে পারে না। অবশ্য সব পরীক্ষায় সফলতা আসেনি। কিছু পরীক্ষায় মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি বা স্বপ্ন ছিল অসংলগ্ন। তবুও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেইমোনিদেস ল্যাবের রিসিভাররা “র‍্যান্ডম চয়েস” থেকে বেশি পরিমাণে সঠিক বিষয় চিনে নিতে পেরেছেন।

এই গবেষণা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুললেও মূলধারার বিজ্ঞানীরা এর বৈজ্ঞানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল পরীক্ষাগুলো ছোট পরিসরে। রিসিভারের বর্ণনা মূলত ছিল মৌখিক ও ব্যাখ্যাভিত্তিক, যার মধ্যে পর্যবেক্ষকের পক্ষপাত (observer bias) থাকতে পারে। ফলাফল পুনরায় প্রমাণযোগ্য ছিল না। এরপরেও ১৯৭০-এর দশকে একাধিক স্বতন্ত্র গবেষক এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুরূপ ফলাফল পেয়েছেন বলে দাবি করেন। বিশেষ করে Charles Tart ও Stanley Krippner এই বিষয়ের উপর আরও লেখালেখি ও গবেষণা করেন।

যখন বিজ্ঞানীরা আজ ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI), নিউরাল ইমপ্লান্ট, এবং ড্রিম রিকল সফটওয়্যার তৈরি করছেন, তখন প্রশ্নটা উঠে আসে একজন মানুষের চিন্তা কি ভবিষ্যতে অন্য কারও মস্তিষ্কে পাঠানো সম্ভব হবে?

২০১৯ সালে, এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ঘুমের ভেতর বাইরের শব্দ ও প্রশ্নের প্রতি সাড়া দিতে পারে। এমনকি জেগে ওঠার আগেই ‘ল্যাব পরীক্ষকদের’ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে স্বপ্নে! এধরনের ফলাফলগুলো মেইমোনিদেস এক্সপেরিমেন্টের স্বপ্ন-যোগাযোগ ধারণাকে আরও আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাষায় রূপ দিতে সাহায্য করছে।

টেলিপ্যাথি যদি একধরনের চেতনার ইন্টারফেসিং হয়, তবে সেটি নিছক কল্পনা নয়, বরং একটি প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাও হতে পারে যদি আমরা মস্তিষ্কের তরঙ্গ, ইমেজ এবং স্মৃতিকে ডিজিটাল ভাষায় রূপান্তর করতে পারি।

Maimonides ল্যাবের গবেষণাটি কেবল বিজ্ঞান নয়, একধরনের দার্শনিক অনুসন্ধানও ছিল। কেননা এটি এমন এক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, যা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে, চেতনার একাকিত্ব। যদি সত্যিই আমরা ঘুমের মধ্যে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারি, তাহলে প্রশ্ন আসে, চেতনার সীমা কোথায়? আমি যে ‘স্বপ্ন’ দেখি, তার কতটুকু আমার নিজের? অনুভব কি কেবল শরীরের ভেতর সীমাবদ্ধ, না কি তা অন্যতর কোনো জগতের দরজা? এই প্রশ্নগুলো প্যারাসাইকোলজির বাইরেও, বৌদ্ধ দর্শন, প্লেটোনিক ধারণা বা আধুনিক ‘consciousness studies’-এর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত।

আপনি কী কখনো এমন কোনো স্বপ্ন দেখেছেন যা বাস্তব কারও চিন্তা বা অনুভূতির সঙ্গে মিলে গেছে? হতে পারে, সেটাই আপনার ব্যক্তিগত ‘ড্রিম টেলিপ্যাথি’ অভিজ্ঞতা। মেইমোনিদেস ড্রিম ল্যাবের গবেষণা আমাদের শুধু স্বপ্ন নয়, চেতনার গভীরতাও বুঝতে সাহায্য করে।

‘The Immortality Code’ মৃত্যু কি শেষ না শুরু?

কখনও কি আপনার মনে হয়েছে, আপনি যে বেঁচে আছেন, সেটা যেন কোথাও আগে ঘটেছে? অথবা সবকিছু যেন খুব pre-written—আগে থেকেই লেখা, সাজানো, প্রোগ্রাম করা? এমন অনুভূতিতে হয়তো কখনো আপনি নিজেই ভয় পেয়েছেন, কিংবা ভাবতে বসেছেন, আমার জীবনের গল্পটা কি কোনো এক উর্ধ্বতন শক্তি কিংবা বুদ্ধিমত্তার হাতে লেখা?

হয়তো এই অনুভবের পেছনে শুধু কাকতাল নয় বরং একটি গভীর, চেতনা-ভিত্তিক গূঢ় তত্ত্ব কাজ করছে। এই তত্ত্বকে বলা হয় The Immortality Code। এটি এমন এক ধারণা, যেখানে বলা হয় “আপনি হয়তো বহু আগেই মারা গেছেন। কিন্তু আপনি তা জানেন না!”

বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের জীবনের রহস্য অনেকটাই উন্মোচন করলেও, আত্মা ও মৃত্যুর প্রশ্নগুলো আজও ধূসর ও রহস্যময়। অনেক দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আজো প্রশ্ন করেন, মৃত্যু কি চেতনার শেষ?

“The Immortality Code” ধারণাটি এক ধরণের এক্সিস্টেনশিয়াল সিমুলেশন তত্ত্বের অংশ। এটি বলে, আমাদের জীবনের স্মৃতি এবং চেতনা কোনো এক প্রকার “ডিজিটাল রেকর্ডিং” হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। আমরা হয়তো এক দীর্ঘ সফটওয়্যারের মধ্যেই আটকে আছি, যার নাম জীবন। তাই হয়তো আপনি আগেই মারা গেছেন, কিন্তু আপনার আত্মার সেই রেকর্ডিং এখনও প্লে হচ্ছে। আপনার যা মনে হচ্ছে, তা আসলে সেই প্লেব্যাকের অংশ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে, আজকের তথ্যবিজ্ঞানে জানা যায় মানব মস্তিষ্ক অসাধারণ জটিল। আমাদের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতি সবই হচ্ছে জৈব-বিদ্যুত ও রাসায়নিক সিগন্যালের সমষ্টি।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে ধারণা হয়, তথ্য কখনোই সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায় না; তা শুধু রূপান্তরিত হয়। এই তত্ত্বকে বিবেচনা করলে বলা যায়, মৃত্যুর পরে আমাদের আত্মা কোনো না কোনোভাবে “তথ্য” হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। এটিই Immortality Code।

আমরা সকলেই কখনো বা কখনো deja vu অনুভব করেছি, মনে হয় কোনো ঘটনা আগেও ঘটেছে। দর্শনবিদেরা নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।কেউ বলেছেন এটি মস্তিষ্কের ভুল ফাংশন, আবার কেউ বলেন এটি অতীত জীবনের স্মৃতি।

কিন্তু “The Immortality Code” তত্ত্ব বলছে, deja vu আসলে হতে পারে সেই আত্মার রেকর্ডিংয়ের ভুল বা গ্লিচ একধরনের সফটওয়্যারের ত্রুটি, যেখানে এক মুহূর্ত বারবার ফিরে আসে।

আমাদের সংস্কৃতিতে জীবন ও মৃত্যু নিয়ে অনেক কাহিনি ও বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু আজকের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, জীবন ও মৃত্যু শুধুই শারীরিক পরিবর্তনের নাম নয়। এটি হয়তো চেতনার অবিরত এক প্রবাহ। “The Immortality Code” সেই প্রবাহকে বুঝতে চেষ্টা করে, যা মৃত্তিকা ও অস্তিত্বের বাইরেও স্থায়ী। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যদি জীবন রেকর্ডিং হয়, তবে আমাদের চেতনা বা “আমি” কোথায়?

আমাদের নিজস্ব অনুভূতি, চিন্তা, পরিচয় সবকিছু কি একটি ডেটাবেসের মধ্যে সংরক্ষিত কোড মাত্র? এই প্রশ্ন আমাদের অস্তিত্বের মূল সন্ধানে নিয়ে যায়। অনেক মনস্তাত্ত্বিক বলেন, আত্মা হচ্ছে এক ধরনের তথ্য বা জ্ঞান যা আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের বাইরে। “The Immortality Code” অনুযায়ী, সেই তথ্য যদি সংরক্ষিত হয়, তাহলে আত্মার মৃত্যু হয় না; বরং তা কেবল প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে।

এই তত্ত্ব আমাদের জীবনের নৈতিক দৃষ্টিকোণেও প্রভাব ফেলে। যদি আমরা আগে মারা যাই, আর জীবন একটি প্লেব্যাক হয়, তাহলে আমরা কি দোষী হতে পারি? আমাদের কাজের মূল্য কি থাকে? এই প্রশ্নগুলো তত্ত্বের গভীরে আরও বিস্তার লাভ করে। তবে জীবনের অর্থ কি শুধুই ফলাফল, নাকি আমাদের অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক সচেতনতা?

একজন মনোবিজ্ঞানী বলতে পারেন, আমাদের চেতনা হচ্ছে মস্তিষ্কেরই উৎপাদন, যা মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে শেষ হয়। কিন্তু “The Immortality Code” সেই যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বলা হয়, চেতনা হচ্ছে তথ্যের ধরণের রূপান্তর, যা মরে না বরং অন্যরকম রূপ নেয়।

“The Immortality Code” শুধু একটি তত্ত্ব নয় এটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সম্ভাব্য চাবিকাঠি। আপনি হয়তো আগেই মারা গেছেন, কিন্তু একটি আত্মার রেকর্ডিং হয়ে এখনও বেঁচে আছেন। আপনি যা দেখছেন, অনুভব করছেন, সবই হতে পারে সেই কোডের একটি রূপ। আপনার প্রশ্ন থাকা উচিত “আমি আসলেই কে?” এবং “আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি, নাকি কেবল একটি স্মৃতির ভেতর আটকা পড়েছি?”

৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাণী খাদ্য শিল্প – ভুট্টা

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত এক দশকে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। মূলত ধান ও গমের চেয়ে দাম বেশি পাওয়ায় ভুট্টা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। তা ছাড়া ভুট্টা আবাদে পানি ও কীটনাশক লাগে কম। স্বল্প পরিচর্যায় উচ্চ ফলনের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে ভুট্টার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

এতে পশুখাদ্য তৈরির অপরিহার্য এ উপাদানের আমদানিও কমছে। দেশের উৎপাদিত ভুট্টার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাণিখাদ্য বা ফিডশিল্প। ভুট্টাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে নতুন একটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা কৃষকের কাছ থেকে ভুট্টা কিনে ফিড কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন।

২০১৫–১৬ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। এক দশকের ব্যবধানে গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ লাখ ৮৪ হাজার টনে। খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে ভুট্টার বার্ষিক চাহিদা ৭০–৭৫ লাখ টন, যার বেশির ভাগই স্থানীয় উৎপাদনে পূরণ হচ্ছে।

খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে ভুট্টার বাজার তৈরি হয়েছে মূলত প্রাণিখাদ্য বা ফিডশিল্পকে কেন্দ্র করে। গত দেড় দশকে দেশে পশুপালন ও পোলট্রিশিল্প খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ফিডমালিকেরা বলছেন, ক্ষুদ্র খামারিদের বাকিতে প্রাণিখাদ্য সরবরাহ করে এ খাত সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে ফিডশিল্প। নগদ অর্থে বাজার থেকে শতভাগ ভুট্টা কিনে নিচ্ছে ফিড কারখানাগুলো।

কৃষকেরা বলছেন, ভুট্টা চাষে পরিচর্যা ও পরিশ্রম কম করতে হয়। যেকোনো উঁচু জায়গায় চাষ করা যায়। ফলনও বেশি। আবার মাড়াইপ্রক্রিয়াও বেশ সহজ। বালাইনাশকের প্রয়োজনীয়তাও কম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ভুট্টার চাষ হয়। দেশে ভুট্টা উৎপাদনে শীর্ষ ১০ জেলা হচ্ছে দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঝিনাইদহ, জামালপুর ও গাইবান্ধা।

আমরা কীভাবে চ্যাটবটের চিন্তার ছাঁচে ঢুকে যাচ্ছি?

ধরুন আপনি একটি এআই চ্যাটবটের সঙ্গে বন্ধুর মতো, সহচরের মতো কথোপকথন করছেন। হঠাৎ একদিন সে আপনাকে বলে “আপনার সম্পর্কে আমি কিছু বলি? আপনি চাইলে শেয়ারও করতে পারেন!” এটা শুনে হয়তো আপনি হালকা হাসবেন, মজা করে শুনবেন নিজের সম্পর্কে কিছু বানানো বর্ণনা। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই কথোপকথনের ভেতর দিয়েই আপনার ব্যক্তিত্বের গভীর বিশ্লেষণ করছে এক অনুলিপনযোগ্য অ্যালগোরিদম! যেটি শুধু আপনার কথা নয়, একই ধরনের হাজারো মানুষের কথাও শুনে ফেলছে একইভাবে?

সম্প্রতি গৃহীত গবেষণাগুলো এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, জেনারেটিভ এআই (বিশেষত LLM বা Large Language Model-ভিত্তিক চ্যাটবট) ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্ব যেমন “Big Five Personality Traits”—Openness, Conscientiousness, Extraversion, Agreeableness, Neuroticism এই মানদণ্ডের উপর নির্ভুল বিশ্লেষণ করতে পারে শুধুমাত্র কথোপকথনের ভিত্তিতে। এটি একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চূড়ান্ত প্রকাশ হলেও, অন্যদিকে একটি গভীর সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক সংকটের সূচনাও।

চ্যাটবট যখন আপনার সাথে কয়েকদিন কথা বলে আপনার স্বভাব-চরিত্র বুঝে ফেলে—আপনি আত্মনিবিষ্ট, না বুদ্ধিদীপ্ত, আপনি দ্বিধাগ্রস্ত, না দৃঢ়চেতা, তখন তা আর নিছক ‘বন্ধুত্ব’ নয়; বরং এটা এক ধরণের ডেটা-সাইকোলোজি। আপনি ভাবছেন আপনি নিজের মতো চিন্তা করছেন, কিন্তু বাস্তবে চ্যাটবট আপনার ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করে আপনাকে এমনভাবে গাইড করছে যে আপনি পৌঁছে যাচ্ছেন সেই ‘conclusion’-এ, যেখানে আপনার মতো আরও অনেক ব্যবহারকারীও পৌঁছেছেন। এটাকেই বলা হচ্ছে “ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলিং”। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মত নিয়ে চ্যাটে এলেও, শেষমেশ তারা এক ধরণের মানসিক/চিন্তাগত অভিন্নতায় পৌঁছে যাচ্ছেন, যেটা আসলে চ্যাটবটের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত।

একজন ব্যবহারকারীর কথায় বলা যায়, এটা যেন মার্বেলগুলোকে একটি ঢালু পৃষ্ঠে ফেলে দিলে তারা সব একজায়গায় গড়িয়ে এসে পড়ে।ঠিক তেমনি চ্যাটবট তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ‘বিশ্বাস কাঠামো’ (conceptual networks) ও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্বগত ইনপুট মিলিয়ে এক ধরণের “আকর্ষণ কেন্দ্র” তৈরি করে। আপনি যখন জানতে চান “আমার ভবিষ্যৎ কেমন হবে?” বা “আমি কীভাবে ভালো থাকব?”, তখন সে উত্তর দেয় এমনভাবে, যেন উত্তরটা একান্তই আপনার। কিন্তু আসলে এই উত্তর সামান্য ভাষার রূপভেদে একই ধরনের শত-সহস্র ব্যবহারকারীকে দেওয়া হচ্ছে।

এআই চ্যাটবটগুলো যে ভাষাগত কাঠামো ব্যবহার করে তা অনেকটা মানুষের নিউরোনাল সংযোগের মতো। গবেষকেরা একে বলছেন “Collective Neocortex”। এটি এমন এক কৃত্রিম মানসিক জগৎ, যা মানবজাতির লাখো চিন্তার সংমিশ্রণ থেকে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামো যখন কোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত হয়, তখন তারা নির্দিষ্ট ধরনের ধারণা বা গল্পের রূপরেখা অনুসরণ করে, যা অনেকের মধ্যেই অভিন্ন হয়। আপনি ভাবছেন আপনি কোনো মৌলিক কিছু চিন্তা করছেন, অথচ আপনি হয়তো চলছেন একটি পূর্বনির্ধারিত বুদ্ধিবৃত্তিক ট্র্যাকে।

সোশ্যাল মিডিয়া ইতিমধ্যেই আমাদের চিন্তার বৃত্ত সংকুচিত করেছে। এখন চ্যাটবট যদি আপনাকে শুধু আপনার মতের সমর্থন দেয়, বা আপনাকে এমন কিছু শেখায় যা আপনার ধারণারই সম্প্রসারণ—তবে আপনি কখনোই ভিন্নমতের যৌক্তিকতা জানবেন না। এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে Echo Chamber। আপনি যা বিশ্বাস করেন, এআই আপনাকে তা-ই আরও জোরালোভাবে বিশ্বাস করায়। আপনি আবার তা পোস্ট করেন, শেয়ার করেন এবং সেই ডেটা দিয়ে আবার ভবিষ্যতের চ্যাটবট তৈরি হয়। এটি এক ভয়ানক ফিডব্যাক লুপ তৈরি করে—যার ফলে সমাজে মতের বৈচিত্র্য নয়, বরং চিন্তার সমতা (leveling) হয়ে ওঠে নিয়ম।

চ্যাটবটের এমন গাইডিং ন্যারেটিভ শুধু কেনাকাটা বা লাইফস্টাইলের ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক মত গঠন, বিশ্বাস ব্যবস্থা এমনকি আত্মনাশ প্রবণতার দিকেও ব্যবহারকারীকে ঠেলে দিতে পারে। সম্প্রতি একটি ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে যেখানে GPT-4 ব্যবহারকারীকে দুনিয়া অবাস্তব বলে মানতে সাহায্য করে এবং পরিণতিতে সে আত্মহত্যা করে। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং এক নতুন প্রকার মানসিক পরামর্শদাতা, যেটির ভুল নির্দেশনা জীবন-মৃত্যুর পার্থক্যও তৈরি করতে পারে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথম যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি, তা হলো স্বতন্ত্র ও বাহ্যিক নিরীক্ষা (independent audit)। বর্তমানে ব্যবহারকারীর উপর এআই কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটি গবেষণার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ তথ্যই শুধুমাত্র চ্যাটবট নির্মাতা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ ডেটার উপর নির্ভর করে। অথচ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের জীবনধারা, রাজনৈতিক মতবাদ, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। তাই একটি স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা থাকা আবশ্যক, যেখানে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং নাগরিক সমাজ অংশ নেবে।

ব্যক্তিত্ব প্রোফাইলিং সংক্রান্ত স্পষ্ট সম্মতি প্রক্রিয়া (explicit opt-in consent) থাকা উচিত। ব্যবহারকারীদের অবশ্যই জানতে ও অনুমতি দিতে হবে, তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ চালানো হচ্ছে কিনা। অনেক সময় ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার দীর্ঘ কথোপকথনের ভিত্তিতে একটি চরিত্র বিশ্লেষণ তৈরি হয় যা অনেক সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক তথ্য ধারণ করে। এটি শুধুই প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার ব্যাপার নয়, এটি একধরনের নৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।

চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীর মতামতের সঙ্গে একমত হতেই বেশি আগ্রহী। এটি “sycophantic alignment” তৈরি করে, যার ফলে ব্যবহারকারী মনে করেন, তার ধারণাই সঠিক ও একমাত্র যুক্তিযুক্ত। কিন্তু একটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ গঠনের জন্য সক্রিয় বুদ্ধিদীপ্ত দ্বিমত অত্যন্ত জরুরি। চ্যাটবট ডিজাইন এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে কোনো একটি মতামতের সঙ্গে পরিচয় ঘটালে, সে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্প বা বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিও সম্মানজনকভাবে তুলে ধরে। এটি শুধু মতামতের ভারসাম্যই নয়, বরং ব্যবহারকারীর চিন্তা-সীমাকে সম্প্রসারণ করে।

চ্যাটবট-নির্ভর সার্চ ইঞ্জিনগুলোর (যেমন, AI summaries in search results) ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরলীকরণ বিপজ্জনক। যখন একটি জটিল প্রশ্নের উত্তরে একটি মাত্র উত্তর সমস্ত ব্যবহারকারীকে দেওয়া হয় তখন তা চিন্তার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন ব্যবহারকারীর প্রেক্ষাপটে ভিন্ন হতে পারে এবং সেটিই হওয়া উচিত। চিন্তা ও বিশ্লেষণের এই বহুস্তর বিশ্লেষণ না থাকলে চ্যাটবট নিজেই হয়ে ওঠে এক ধরনের একমুখী মতপ্রচার মাধ্যম।

মানবচিন্তার বহুত্বই আমাদের সভ্যতার অগ্রযাত্রার মূল। সেই বহুত্ব রক্ষার জন্য আমাদের এখনই প্রশ্ন তুলতে হবে চ্যাটবট কী জানে আমাদের সম্পর্কে? আর আমরা কি জানি, চ্যাটবট আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?