Home Blog Page 62

ভারতের নতুন বিধিনিষেধ, দেশের রপ্তানিতে কতটা প্রভাব পড়বে?

গত শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে নতুন করে ৯ ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। তৃতীয় দফায় ভারতের এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের দুশ্চিন্তায় ফেলছে।

ভারতের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ থেকে এই ৯ পণ্য আমদানির জন্য সমুদ্রপথে একটি পথ মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর খোলা রেখেছে দেশটি। তবে সমুদ্রপথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসব পণ্যের মোট রপ্তানির ১% রপ্তানি হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মূলত এসব পণ্য রপ্তানির সহজ পথটি বন্ধ করে দিল ভারত।

ভারতের বিধিনিষেধের তালিকায় থাকা ৯ পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাক্স সুতার বর্জ্য, কাঁচা পাট, পাটের রোল, ফ্ল্যাক্স সুতা, পাটের সুতা, ফুড গ্রেড সুতা, লিনেন কাপড়, লিনেন ও তুলার সুতা মিশ্রিত কাপড় এবং কম প্রক্রিয়াজাত বোনা কাপড়। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় মূলত কাঁচা পাট ও প্রক্রিয়াজাত পাটপণ্যই বেশি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের হিসাবে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে এই ৯ পণ্য বিশ্বের ৮৮টি দেশে রপ্তানি হয়।রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ডলার বা ৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। তুরস্কের পর এই ৯ পণ্য রপ্তানির দ্বিতীয় শীর্ষ গন্তব্য ভারত।ভারতে গত অর্থবছরে এই ৯ পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের, যা ওই ৯ পণ্যের মোট রপ্তানির প্রায় ২৩%।

এ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে তিন মাসে তিন দফায় অশুল্ক বাধা আরোপ করল ভারত। এর আগে গত ৯ এপ্রিল ভারতের কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় দেশটি। এরপর গত ১৭ মে বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, কাঠের আসবাব, সুতা ও সুতার উপজাত, ফল ও ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয় প্রভৃতি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ দিয়েছিল ভারত।

এনবিআরের হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রায় ১৫৯ কোটি ডলারে পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার যেসব পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার, যা ভারতে মোট রপ্তানির ৯%।

এর আগে ১৭ মে যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, যা মোট রপ্তানির ৩১%। অর্থাৎ রাজনৈতিক কারণে নেওয়া ভারতের এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে মোট রপ্তানির ৪০% পণ্য বাধার মুখে পড়েছে।

এর বাইরে কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা প্রত্যাহার করেছিল, তাতে আকাশপথে বিশ্বের অন্য দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়।

আনুপাতিক নির্বাচন বিতর্ক, সংস্কার আলোচনা টেবিল থেকে রাজপথে?

মৌলিক সংস্কার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের দাবিতে গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করেছে ইসলামী আন্দোলন। এতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিসের দুই ভাগসহ সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের পক্ষের দলগুলোর নেতারা আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিয়েছেন। তবে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সংস্কারে বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দলগুলোকে নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য বিএনপির বাইরে বৃহত্তর সমঝোতা গড়ার চেষ্টা চলছে। ইসলামী আন্দোলনের গতকালের সমাবেশের জনসমাগমকে সেই প্রক্রিয়ার প্রতি জনসমর্থন প্রকাশের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মোকাবিলায় আগামী নির্বাচনে একে অন্যকে আসনভিত্তিক ছাড় দেবে, এমন চিন্তা নিয়ে দলগুলোর নেতারা অগ্রসর হচ্ছেন।

জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন সংসদের নিম্নকক্ষেও ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন তথা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। তবে দুটি দলের সূত্রই বলেছে, বিএনপি উচ্চকক্ষে আনুপাতিক নির্বাচন মেনে নিলে তারা নিম্নকক্ষে বিদ্যমান পদ্ধতির নির্বাচন মেনে নেবে।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সমকালকে বলেছেন, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন হতেই হবে। এ বিষয়ে ছাড় দিয়ে সংস্কার হবে না। বিএনপি বলছে, আনুপাতিক উচ্চকক্ষ হলে নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তথা সরকারি দল আইন প্রণয়নে বাধাগ্রস্ত হবে।

গতকাল সমাবেশে উপস্থিত দলগুলো সংলাপে ঐকমত্য না হলে গণভোট চায় বলে জানিয়েছে। মূলত সংস্কার প্রস্তাবের যে বিষয়গুলো নিয়ে কমিশনের বৈঠকে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলো আলোচনার টেবিল থেকে মাঠে নিয়ে আসার ইঙ্গিত রয়েছে এতে।

উচ্চকক্ষে ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ, সাংবিধানিক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ সংলাপে অংশ নেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের একই অভিমত।

বিএনপির বক্তব্য–যদি সাংবিধানিক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগ তথা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব না হয়, তবে মেয়াদ নির্ধারণে রাজি বিএনপি। তাদের যুক্তি, সরকারপ্রধানের ক্ষমতা কমালে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব হবে না।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেবে কি না, দলটি অংশ না নিলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি না; এমন কিছু বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ ছাড়া বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যদি সরকার গঠন করে তাহলে বিরোধী দল কারা হবে, সেটারও স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়গুলোকে ঘিরেই এখনকার রাজনীতি আবর্তিত বলে মনে করা হচ্ছে।

শাসন, শোষণ ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গণদেবতা’

“কে বলেছিল, পঞ্চায়েতে বিচার হয়? যে বেশি গলা ফাটায়, লাঠি চালায়, বিচার তারই পক্ষে যায়।” —এই কথাটা বলেছিলেন উপন্যাসের এক বৃদ্ধ চাষা, যখন তাঁর গরু চুরি যাওয়ার বিচার করতে গিয়ে তিনি শুনলেন চোর নাকি সে নিজেই!

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস “গণদেবতা” ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়। একটি গ্রামীণ সমাজের বুক চিড়ে সত্য উন্মোচনের চেষ্টা। বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের অন্তস্তল থেকে উঠে আসা এই উপন্যাস কেবল সাহিত্য নয়, বরং সমাজ-রাজনীতির একটি বিশ্লেষণাত্মক দলিল। এটি এমন এক সময়ের কাহিনি, যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, কৃষকের দুর্দশা, ধর্মীয় বিভাজন, সমাজতান্ত্রিক চেতনা, কুসংস্কার, এবং গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি গ্রাম, যার নাম কাহিনি চলতে চলতে পাঠকের কাছে ধরা দেয় এটি যেন বাংলারই যেকোনো একটি প্রান্তিক অঞ্চল। এখানে মানুষ কৃষিকাজ করে, জমিদারদের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে, ধর্ম নিয়ে বিভাজিত এবং পরস্পরের প্রতি এক অদ্ভুত অবিশ্বাসে বাস করে।

গল্পটি কোনও নির্দিষ্ট চরিত্রকেন্দ্রিক নয়। বরং এটি বহু চরিত্রের সম্মিলনে গড়ে ওঠা একটি গ্রামীণ মহাকাব্য। এখানে রয়েছে দরিদ্র কৃষক, যাঁদের জীবিকা গো-চাষ, খেতমজুরি ও ভাগচাষের উপর নির্ভরশীল; রয়েছে গ্রামের মৌলবী, পুরোহিত, মাঝারি জমিদার; রয়েছে নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ, যারা শহর থেকে ফিরে সমাজ পাল্টানোর স্বপ্ন দেখে।

উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি, গ্রামের এক কৃষকের গাভী চুরি হয়ে গেছে, আর সে বিচার পায় না। এরপর আসে জমি নিয়ে সংঘর্ষ, ঋণের দায়ে বাড়িঘর বিক্রি, দুর্ভিক্ষে মৃত্যু, চরম কুসংস্কারে গ্রাম জর্জরিত হয়ে পড়া। একসময় গ্রামে আসে রাজনৈতিক প্রভাব, যেমন কংগ্রেস ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার কিছু তরুণ। তারা বলে এই অবিচার ঠেকাতে হবে, একসাথে প্রতিরোধ গড়তে হবে। কিন্তু এই প্রতিরোধও শেষমেশ নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

উপন্যাসটি যখন লেখা হয় (প্রথম প্রকাশ: ১৯৪২), তখন ভারতবর্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং গ্রামীণ সমাজে চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। জমিদারী ব্যবস্থা তখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, ফলে কৃষকের জীবন দুর্বিষহ ছিল।সামাজিক বিভাজন হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব, জাত-পাত, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব কিছু মিলে এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছিল।তারাশঙ্কর এই সবকিছুকে অবলম্বন করে এক দুর্দান্ত বাস্তবতা নির্মাণ করেন। তিনি কোনো পক্ষ নেন না, বরং বাস্তবতাকে চিত্রিত করেন। তিনি দেখান, কিভাবে ক্ষমতার ভেতরে বাস করে শোষণ, কিভাবে ধর্মের আড়ালে ঢেকে রাখা হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য, আর কিভাবে সাধারণ মানুষ যাঁদের ‘গণ’ বলা হয় তাঁরাই অবজ্ঞার পাত্র।

‘গণদেবতা’তে একক কোনো নায়ক নেই। বরং প্রতিটি চরিত্রই একটি শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন—মোল্লা সাহেব ধর্মের মুখপাত্র হলেও সমাজে বিভাজন তৈরি করেন। ব্রাহ্মণ ঠাকুর অন্ধ গোঁড়ামিতে বিশ্বাস করেন, অথচ নিজের স্বার্থে ধর্মব্যবসা করতে পিছপা হন না। শহরফেরত তরুণ সমাজতান্ত্রিক, কিন্তু বাস্তবতার মুখে তারা হতাশ। এই চরিত্রগুলো নিয়ে লেখক যে চিত্র রচনা করেছেন, তা কখনো নাটকীয় নয়, বরং নীরব ও ধ্বংসাত্মক। তিনি গ্রামীণ বাংলার ধুলো, রোদ, শোষণ ও লজ্জা সবকিছু তুলে ধরেছেন নিখুঁত সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে।

‘গণদেবতা’ শুধুই অতীতের কথা নয়। ২০২৫-এর বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এখনো গ্রামের কৃষক ঋণে জর্জরিত, পঞ্চায়েত বা ইউনিয়ন পরিষদে পক্ষপাতিত্ব, ধর্ম নিয়ে বিভাজন, রাজনৈতিক দলগুলোর অপব্যবহার সব কিছু একই আছে। আজও গ্রামের এক কৃষক হয়তো থানায় যায়, বিচার পায় না। আজও কেউ প্রতিবাদ করতে চায়, কিন্তু গ্রামের মাতব্বর বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলে “চুপ থাকো, না হলে রেশন বন্ধ হয়ে যাবে।” এসব দৃশ্য যেন “গণদেবতা”-রই পুনরাবৃত্তি।

আবার উপন্যাসে যেমন শহর থেকে কিছু তরুণ আসে সমাজ বদলাতে, এখনো অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে গ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবতায় এসে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা, শুধু স্বপ্ন নয়, প্রয়োজন সুসংগঠিত গণজাগরণ—যা উপন্যাসেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তারাশঙ্করের ভাষা গভীর, বাস্তবতাপূর্ণ ও আঞ্চলিক। তিনি চরিত্রদের মুখে বাস্তব গ্রামের টোন তুলে এনেছেন “হেঁটে গেলেই বিচার হইব?” কিংবা “পেট ভরলে রাজনীতি বোঝা যায়”—এই ধরনের সংলাপ সমাজের স্তরভেদ তুলে ধরে। তাঁর বর্ণনায় নদী, ধানখেত, মেঘলা আকাশ, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর সবকিছু এমনভাবে আসে, যেন পাঠক নিজেই গ্রামে হাঁটছে। তাঁর ভাষা কখনো প্রতিবাদের, কখনো শোকের, আবার কখনো হতাশার এক নির্মোহ স্বরে কথা বলে।

‘গণদেবতা’ এমন এক উপন্যাস, যেটি সময়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এটি বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা শোষিত মানুষের কাহিনি, যেখানে নায়ক নেই, কিন্তু সংগ্রাম আছে। এখানে সাধারণ মানুষ যারা যুগ যুগ ধরে শোষণের শিকার তাঁরাই গণদেবতা। কিন্তু সেই দেবতা, তিনি দ্যুতি বিকিরণ করেন না, বরং ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও ন্যায্যতার অপেক্ষায় থাকা এক চেহারা। এটি আমাদের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর এক আহ্বান। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে সমাজের ভিত্তি দুর্বল, সেখানে উন্নয়ন কেবল মোহ, আর গণতন্ত্র কেবল শব্দ। এই উপলব্ধি যতদিন না গভীরে প্রবেশ করে, ততদিন “গণদেবতা” বারবার পড়া প্রয়োজন।

হারেৎজ-এর প্রতিবেদন : গাজায় এক লাখ মৃত্যু, কী বলছে এই সংখ্যা?

লন্ডনের হোলোয়ে কলেজের অর্থনীতিবিদ এবং সহিংস সংঘাতে মৃত্যুহার সংক্রান্ত বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্প্যাগাট একাধিক গবেষণা করেছেন ইরাক, সিরিয়া ও কসোভোর যুদ্ধ নিয়ে। গত সপ্তাহে তিনি ও তার গবেষক দল গাজা উপত্যকায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন।

এতে তিনি ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ ও গবেষক ড. খলিল শিকাকির সহায়তায় গাজার ২ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এর আওতায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় মোট ৭৫ হাজার ২০০ জন মানুষ সহিংসতায় নিহত হয়েছে। এদের প্রায় সবাই ইসরায়েলি গোলাবারুদের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে।

তখন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছিল, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪৫ হাজার ৬৬০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। অর্থাৎ, মন্ত্রণালয়ের হিসাব প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৪০% কম দেখানো হয়েছিল।

গবেষণাটি এখনও ‘পিয়ার রিভিউ’-এর মাধ্যমে পর্যালোচিত হয়নি, অর্থাৎ এটি ‘প্রিপ্রিন্ট’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এর ফলাফল ‘লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’-এর গবেষকদের এক ভিন্নধর্মী পদ্ধতিতে করা গবেষণার সঙ্গে অনেকটাই মিলেছে। ওই গবেষণাও দেখিয়েছিল, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত মৃত্যুর পার্থক্য প্রায় ৪০%।

স্প্যাগাট ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে—“এক্সেস মোর্টালিটি” বা অতিরিক্ত মৃত্যুর হার। অর্থাৎ যুদ্ধের সরাসরি আক্রমণ ছাড়াও ক্ষুধা, ঠান্ডা, চিকিৎসার অভাব ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংসের ফলে কতজন মানুষ মারা গেছে।

নতুন জরিপ অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৫৪০ জনের। এই সংখ্যা যেকোনো মানদণ্ডে অনেক বেশি। তবে আগের অনুমিত লাখো মৃত্যুর তুলনায় তা কম।

অর্থাৎ, সহিংসতা ও ক্ষুধা-রোগে মৃত্যুর সংখ্যা মিলিয়ে জানুয়ারির আগেই ৮৩ হাজার ৭৪০ জন নিহত হয়েছে। তবে অধ্যাপক মাইকেল স্প্যাগাট জোর দিয়ে বলেছেন, জানুয়ারির তুলনায় এখন হয়তো সহিংসতার বাইরের মৃত্যুর হার আরও বেড়েছে।

এর একটি বড় কারণ হলো—গাজার মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের স্থানচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধ্বংস। পাশাপাশি মার্চে যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে যাবার পর থেকে ইসরাইলি অবরোধে খাদ্যের ঘাটতি ও জাতিসংঘের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে অধ্যাপক স্প্যাগাট বলেন, গাজার যুদ্ধ ২১ শতকের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর একটি। সিরিয়া, ইউক্রেন ও সুদানের মতো দেশগুলোর মোট মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো বেশি, কিন্তু গাজা এগিয়ে আছে যোদ্ধা ও বেসামরিক নিহতের অনুপাত এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে মৃত্যুর হারের দিক থেকে।

জরিপের সঙ্গে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মিলে যায়। জরিপ অনুযায়ী, নিহতদের ৫৬%ই শিশু (১৮ বছরের নিচে) অথবা নারী।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে এই হার প্রায় নজিরবিহীন।

স্প্যাগাটের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় সহিংস মৃত্যুর শিকার হওয়া নারী ও শিশুর অনুপাত অন্য সব সাম্প্রতিক সংঘাতের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। যেমন কসোভোতে এ অনুপাত ছিল ২০%, ইথিওপিয়ার উত্তরে ৯%, সিরিয়ায় ২০%, কলম্বিয়ায় ২১%, ইরাকে ১৭% ও সুদানে ২৩%।

গবেষণায় আরেকটি চরম তথ্য পাওয়া গেছে—জনসংখ্যার অনুপাতে নিহতের সংখ্যা। স্প্যাগাট বলেন, “আমার ধারণা, গাজার প্রায় ৪% জনগণ নিহত হয়েছেন। ২১ শতকে আর কোনও সংঘাতে এত উচ্চ হার দেখা গেছে বলে আমার জানা নেই।”

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে যেভাবে বিশদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার বিপরীতে ইসরায়েলের সরকারি মুখপাত্রদের নীরবতা বিস্ময়কর। ৭ অক্টোবরের যুদ্ধই প্রথম, যেখানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী শত্রুপক্ষের নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা জানায়নি।

ইসরায়েলি মুখপাত্র ও আইডিএফ শুধু একটি সংখ্যা বারবার উল্লেখ করছে— ২০ হাজার হামাস ও অন্যান্য সংগঠনের যোদ্ধা নিহত হয়েছে। কিন্তু এই দাবির পেছনে নেই কোনও নামের তালিকা, কিংবা কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

স্প্যাগাটের মতে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই ২০ হাজার যোদ্ধার নাম প্রকাশের চেষ্টা করলেও মাত্র কয়েকশ নাম পাওয়া গেছে। এমনকি হাজার জনের তালিকা তৈরি করাও কঠিন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ইতিহাসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ম্যাথিউ গ্যাব্রিয়েল ককারিল ম্যাথিউ ককারিলও এই সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, “ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সাধারণত যত যোদ্ধা নিহত হয়, তার অন্তত দ্বিগুণ আহত হয়।সুতরাং যদি ইসরায়েল বলে ২০ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে, তবে অন্তত ৪০ হাজার আহত হয়েছে। এ হিসেবে হামাসের মোট যোদ্ধা সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ হাজার। আর এটি বাস্তবসম্মত নয়।”

তবে ধরা যাক, ইসরায়েলের দেওয়া সংখ্যাই সঠিক। তবু হিসাব বলছে, ১ জন হামাস যোদ্ধার বিপরীতে ৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ ইসরায়েলি মুখপাত্ররা দাবি করেন, এই অনুপাত ১:১।

ভয়ংকর এই সংখ্যাগুলোর পরও অধ্যাপক স্প্যাগাট বলছেন–“এই জরিপের তথ্য দিয়ে ‘গণহত্যা’ শব্দের সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।ইসরায়েলের পক্ষ থেকে গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করা এখনও বাকি।” তার মতে, গাজায় যা ঘটছে, সেটি সম্ভবত “শুধু জাতিগত নির্মূল”।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ক্যাথলিকদের নিয়ে যেসব ভয় এখনো রয়ে গেছে

১৭শ শতকের ইউরোপে একটি বহুল প্রচলিত বিশ্বাস ছিল “পোপ গোপনে গোটা বিশ্ব দখলের চেষ্টা করছেন।” এই ধারণা কেবল কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা ডাচ প্রজাতন্ত্রে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি বলে বিবেচিত হত। কিছু প্রোটেস্ট্যান্ট প্যামফলেটে দাবি করা হয়, পোপের নেতৃত্বে এক গোপন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা চলছে যার লক্ষ্য প্রোটেস্ট্যান্ট রাজ্যগুলিকে ধ্বংস করা।

১৬০৫ সালের গানপাউডার প্লটের পর এই তত্ত্ব আরও জোরালো হয়। ক্যাথলিক ষড়যন্ত্রকারীরা সংসদ উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এটাই যেন প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় যে, ক্যাথলিক মানেই বিশ্বাসঘাতক। পরবর্তী দেড়শ বছর ধরে ইংল্যান্ডে ‘পোপিশ প্লট’ নামে অসংখ্য ভুয়া ষড়যন্ত্রের গল্প রটানো হয়, যাতে প্রতিবারই ক্যাথলিকদের “গোপন নেটওয়ার্ক”, “ইতালি ও স্পেনের সহায়তা” কিংবা “রোম থেকে আসা অন্ধ অনুগত্য” তুলে ধরা হয়।

অ্যান্টি-ক্যাথলিক কন্সপিরেসির কেন্দ্রে ছিল ক্যাথলিক যাজক সম্প্রদায়, বিশেষত ‘Jesuits’। অনেকেই বিশ্বাস করত, জেসুইটরা শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং রাজতন্ত্র পতনের গুপ্ত ষড়যন্ত্রে জড়িত। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও এমনকি আমেরিকাতেও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি মূল সুর ছিল: “Jesuits are everywhere, silently infiltrating governments, universities, and royal courts.”

বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেও কিছু আমেরিকান পত্রিকা দাবি করে “জেসুইটরা আমেরিকান কংগ্রেসে প্রভাব বিস্তার করছে এবং পোপ শিগগিরই হোয়াইট হাউস দখল করবেন।”

১৯৬০ সালে জন এফ কেনেডি যখন আমেরিকার প্রথম ক্যাথলিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচন করেন, তখন একটি ভয়াবহ কন্সপিরেসি থিওরি ছড়িয়ে পড়ে, যদি JFK জিতে যান, তবে হোয়াইট হাউস চালাবেন পোপ। এই তত্ত্ব শুধু মৌখিক নয়, একে প্রচার করা হয় টিভি বিতর্কে, পত্রিকায় এবং এমনকি গির্জার ভেতরেও। JFK নিজেকে প্রমাণ করতে বাধ্য হন যে, তিনি পোপের নয়, মার্কিন জনগণের আদেশ মানবেন।

অপরদিকে, ক্যাথলিক চার্চকেও টার্গেট করেছে ফ্রিম্যাসনিক ও সেকুলার গোষ্ঠীরা, যারা বিশ্বাস করে চার্চ “মানবজাতির জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে”। এই ভাবনা থেকে ইউরোপে বেশ কিছু বিপ্লবী আন্দোলন (যেমন ফরাসি বিপ্লব) ক্যাথলিক চার্চকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এমনকি ইলুমিনাটি-সম্পর্কিত অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্বেও ক্যাথলিক চার্চকে অন্ধকারের নায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এসব ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আদতে জনগণের মনে ভয়ের বীজ বপনের এক কৌশল। ধর্মের নামে চালানো হয় একধরনের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, যাতে একটি গোষ্ঠীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়।

যখনই রাজনৈতিক ক্ষমতা, বহুজাতিক অভিবাসন বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো সমস্যা দেখা দেয়, তখন অ্যান্টি-ক্যাথলিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। যেমন ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকায় বলা হত “Catholics breed too fast, soon they will outnumber real Americans!”

হলিউড ফিল্ম ‘Angels & Demons’ কিংবা ‘The Da Vinci Code’-এ ক্যাথলিক চার্চকে এমন এক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়, যারা গুপ্ত সংগঠন, গোপন ইতিহাস এবং এক বিকল্প সত্য আড়াল করে রেখেছে। যদিও এগুলো ফিকশন, তবুও বহু দর্শকের মনে গেঁথে যায় এমন বিশ্বাস যে, চার্চ আসলে সত্য গোপন করছে।

অ্যান্টি-ক্যাথলিসিজম কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং ইতিহাসে বহুবার রাজনৈতিক কৌশলের রূপ নিয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো অনেক সময় গুজব হলেও, তা সমাজে বাস্তব সহিংসতা ও বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে।

১৬ বছর দেশে প্রতারণামূলক বিনিয়োগ হয়েছে : বাণিজ্য উপদেষ্টা

দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

বুধবার ঢাকায় ‘কনডাক্টিভ অটোমাবাইল পলিসি ফর গ্রিন গ্রোথ অ্যান্ড এন্ড কম্পিটিটিভ ইকোনমি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি বলেন — ‘বিগত ১৬ বছরে আমরা এমন সব ফ্যালাসি (প্রতারণামূলক) বিনিয়োগ করেছি, সেটা কর্ণফুলী টানেল হোক বা অন্য কিছু। এমন উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ করেছি যে ঋণের নামে এক টাকার জিনিসই ২০ টাকায় করেছি।’

তিনি বলেন, এসব বিনিয়োগ করতে গিয়ে আমরা তো পরিবেশের আরও বড় ক্ষতি করে ফেলেছি। এসব উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা বিপুল অর্থনৈতিক দায় তৈরি করেছি। এখন আমাদের জাতীয় ব্যয়ে সর্ব বৃহৎ খাত হিসেবে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটা তো টেকসই নয়। দীর্ঘ মেয়াদে তো এটা চলনশীল নয়। এখান থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে।

তিনি বলেন, আমার মন্ত্রণালয়ে আমি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাদ দিচ্ছি। যেসব প্রকল্প ৭০-৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে ঝামেলায় পড়েছি। এসব প্রকল্প অব্যাহত রাখলে বিপদ, আবার কাজ বন্ধ করলেও বিপদ। তবে আমরা উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই। অপ্রয়োজনীয় এবং রিটার্নহীন প্রকল্প বাদ দিতে চাই ।

এ সময় উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এ দেশের ভোগ্যপণের বাজার ১৫০ বিলিয়ন ডলারের। বছরে ১০ কোটি টন খাদ্য আমদানি হয় বিদেশ থেকে। কিন্তু এগুলোর জন্য আমাদের লজিস্টিক নেই। বাংলাদেশের আমাদের লজিস্টিক খরচ সবচেয়ে বেশি, যা উন্নত বিশ্বে যে কোনো দেশের চেয়েও বেশি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের সব গঞ্জ দিয়ে নাম করা এলাকাগুলো একসময় লজিস্টিক হাব ছিল। কিন্তু সেগুলো বিকল হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সম্পদ ছিল সেগুলো। এ দেশে ২০০ নদী আছে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার। সেগুলো ব্যবহার করতে পারলে অসম্ভব সুন্দর ভবিষ্যত আসবে আমাদের।’

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, “জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকগুলোর মধ্যে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত রয়েছে। এসব খাতের প্রাথমিক এনাবলার হচ্ছে লজিস্টিক সাপোর্ট। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইউটিলিটি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস এবং শ্রমশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের ১৭/১৮ কোটি জনসংখ্যা রয়েছে, যদিও খনিজ সম্পদ তেমন নেই। তবে রয়েছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড—একটি ভাইব্রেন্ট ও প্রোডাক্টিভ জনগোষ্ঠী। এই শ্রমশক্তিকে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে।”

ঈশ্বরের ভূমিকা নিতে চাচ্ছেন – এলন মাস্ক

“এই টেক বিলিয়নিয়ার মানবজাতির এমন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চাচ্ছেন যেখানে মুষ্ঠিমেয় গোষ্ঠী ছাড়া সবার জন্য জায়গা নেই : চার্লি ওয়ারজেল এবং হানা কিরোস

এলন মাস্ক দাবি করেন, তিনি “লংটার্মিজম” নামক একটি ভবিষ্যতমুখী দর্শনের সঙ্গে একমত। এই মতবাদ অনুসারে, দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে মানবজাতির সর্বোচ্চ মঙ্গল সাধনের কৌশল খোঁজা হয়। এই দর্শনের মূল স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে মহামারী প্রতিরোধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবস্থাপনা।

মাস্কের বহুদিনের স্বপ্ন হলো মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়া, এটাকে তিনি একটি সভ্যতাগত প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করেন, “জীবনের জন্য জীবন বীমা” বলে। তার যুক্তি হলো, পৃথিবী যদি একদিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে অন্য গ্রহে মানুষের টিকে থাকার ব্যবস্থাই মানবজাতির বাঁচার একমাত্র উপায়।

মাস্ক সমর্থিত এক লংটার্মিস্ট বিশ্বাস করেন এই পরিকল্পনার মাধ্যমে অজস্র ভবিষ্যতের প্রাণ রক্ষা পাবে, যারা না হলে জন্মই নিত না। এ বিষয়টি মাস্কের বিশেষ আগ্রহের কারণ, কারণ তিনি মনে করেন জন্মহার কমে যাওয়া মানবজাতির জন্য ভয়ংকর হুমকি। তবে মাস্কের আচরণ ও ভাষ্য তার এই আদর্শের সমতাভিত্তিক নীতির সঙ্গে মেলে না।

একজন পরিচিত প্রোনেটালিস্ট (যিনি জন্মবৃদ্ধি আন্দোলনের প্রবক্তা), যাকে মাস্ক সরাসরি প্রচার করেছেন, বলেছেন এই আন্দোলনের চিন্তাভাবনা ইউজেনিক্সবাদীদের (জেনেটিক উৎকর্ষবাদীদের) সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মাস্ক দেখা করেছেন এমন দুজন প্রোনেটালিস্টের পরিকল্পনায় রয়েছে একটি ভবিষ্যতের শহর-রাষ্ট্র, যেখানে “জিনগতভাবে নির্বাচিত মানুষ” থাকবে এবং যেখানে “অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর সন্তান উৎপাদনের” ভিত্তিতে ভোটাধিকার দেওয়া হবে।

মাস্ক এমন সব পোস্ট ছড়িয়েছেন, যেগুলোতে বর্ণবাদী আইকিউ তত্ত্ব প্রচার করা হয়। তিনি “হোয়াইট জেনোসাইড” নামে পরিচিত ডানপন্থী ষড়যন্ত্রতত্ত্বে আকৃষ্ট এবং এমনকি DEI (diversity, equity, inclusion), ট্রান্স অধিকার ইত্যাদিকে তার কল্পিত পশ্চিমা “সভ্যতা”-র জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মাস্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে, বিদেশে সহায়তা পাঠানো বন্ধ করা (যা তিনি সরকারের একজন সদস্য হিসেবে করেছেন) আসলে আমেরিকার অর্থ বাঁচায় এবং এই অর্থ পরে উন্নততর কাজে ব্যবহার করা যায়। তার মতে, “আমেরিকা হলো সেই মূল স্তম্ভ, যা পুরো সভ্যতাকে ধরে রেখেছে।”

এই যুক্তির ভিত্তিতে, বৈশ্বিক সহায়তা কমিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হয়, তা আমেরিকানদের কল্যাণে ব্যয় করা যায়। এতে তারা পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে, বিশেষ করে প্রোনেটালিস্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে, যা “সুবিধাপ্রাপ্ত”, “উচ্চ আইকিউ সম্পন্ন”, বিশেষত শ্বেতাঙ্গদের আরও বেশি সন্তান জন্ম দিতে উৎসাহিত করে।

তাহলে দক্ষিণ সুদান বা সোমালিয়ার লোকজন মারা গেলে কী আসে-যায়? এই হলো সেই ধারণা, লেখেন ওয়ারজেল ও কিরোস। মূল বিষয় হলো, কেবল পশ্চিমা সভ্যতাই বেঁচে থাকবে এবং নিজেদের মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দেবে।

“কিন্তু মাস্ক যতই আমাদের দৃষ্টি মহাকাশে সরাতে চান, পৃথিবীতে এখন ভয়ানক কিছু ঘটছে। “বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষটি বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছেন। তাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়ে অন্য এক স্বপ্নময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন।”

রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সম্ভাবনা, বিএনপি’র প্রতিদ্বন্দ্বী হতে ‘বৃহত্তর নির্বাচনী সমঝোতা’র চেষ্টা?

দৈনিক সমকালের রিপোর্টে বলা হয়েছে — আওয়ামী লীগ না থাকায়, আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার চেষ্টা করছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দলগুলো। এককভাবে কারো পক্ষে বিএনপিকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়। আদর্শিক ভিন্নতায় জোট সম্ভব না হওয়ায়, নানা মত এবং পথের দলগুলোর যতটা সম্ভব নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সংস্কার প্রশ্নেও এই দলগুলোর অবস্থান কাছাকাছি।

আপাতত এর অবয়বটা হলো– জামায়াতে ইসলামী বিএনপির মতো এককভাবে নির্বাচন করবে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলো একটা নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম গঠন করবে। আর সংস্কার আলোচনায় বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া মধ্যপন্থী দলগুলো নিয়ে পৃথক বলয় গঠনের চেষ্টা করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বিএনপির বিপরীতে এই তিন শক্তি আনুষ্ঠানিক কোনো জোট গঠন করবে না। কিন্তু তারা নির্বাচনে একে অন্যকে আসনভিত্তিক ছাড় দেবে। জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, এবি পার্টি এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি চিত্র পেয়েছে সমকাল। তাদের দাবি, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা কয়েকটি দলও বৃহত্তর সমঝোতায় যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

এই দলগুলোর নেতাদের ভাষ্য, প্রাথমিক এই পরিকল্পনায় সব দল একমত হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। এই রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক সংস্কার প্রশ্নে আপাতত কাছাকাছি এসেছে। একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টায় যুক্ত দলগুলোর নেতাদের মতে, সংস্কারে বিএনপির অনড় অবস্থান বাকি দলগুলোকে আরও কাছাকাছি আনছে।

সমঝোতার চেষ্টা করা দলগুলোও জানে–বিষয়টি সহজ নয়। বিএনপি যাকে আসন দেবে, সেই দলই বিএনপির সঙ্গে চলে যাবে। এটিও জোটের চেষ্টা না করার কারণ। আসন বন্টন প্রশ্নে বিএনপির সাথে দর কষাকষির কৌশল হিসেবেও এই সমঝোতাকে কেউ কেউ কাজে লাগাতে পারেন।

নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টা করা দলগুলোর নেতারা সমকালকে বলেছেন — দখল, চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনোখুনির ঘটনায় ১০ মাসে বিএনপির জনসমর্থন কমেছে। আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচন বর্জন করবেন, যেমনটা বিএনপি জোটের সমর্থকরা ২০২৪ সালে করেছিল। এ সমীকরণে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট দলগুলো এক হতে পারলে বিএনপিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তারা।

গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ায় মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই জীবনে প্রথমবারের মতো প্রকৃত অর্থে ভোট দেবেন। অন্য দলগুলোকে টিকতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কোনো দলের পক্ষে একা তা সম্ভব নয়। এ কারণেই বৃহত্তর সমঝোতার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জামায়াতের জ্যেষ্ঠ একজন নেতা সমকালকে বলেন, নির্বাচনকে ‘বিএনপি বনাম সবাই’– রূপ দিতে পারলে যে কোনো ফল সম্ভব। আর এই বার্তা দিতে পারলে দোদুল্যমান ভোটারদেরও সমর্থন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, বিএনপিকে হারানো সম্ভব– এই রব তুলতে না পারলে ভোট মিলবে না। ‘বিএনপিই সরকার গঠন করবে’– এই আওয়াজ থাকলে গ্রামগঞ্জের ভোটাররা অন্য কাউকে ভোট দেবে না।

নবগঠিত এনসিপির সঙ্গে এবি পার্টিসহ কয়েকটি দলের সমঝোতা হতে পারে। জামায়াত থেকে বেরিয়ে আসা নেতারা এবি পার্টি গঠন করেছে। এ দলটি যে বলয়ে থাকবে, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হবে জামায়াতের জন্য। এ তথ্য জানিয়ে এবির একজন নেতা বলেন–এবি পার্টিসহ মধ্যপন্থিদের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব, সেই প্রচেষ্টা চলছে।

সমমনা হয়েও গণঅধিকার, গণসংহতি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দল মৌলিক সংস্কারে বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এতে দলগুলোর সঙ্গে এনসিপি, এবি পার্টিসহ অন্যরা কাছাকাছি এসেছে। মধ্য এবং মধ্যবামপন্থি এই দলগুলোও সমঝোতার চেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

বিএনপি ইতোমধ্যে গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে আসন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের সহায়তা করার জন্য স্থানীয় বিএনপিকে চিঠি দিয়েছে। জেএসপির আ স ম আবদুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর মান্না এবং গণসংহতির জোনায়েদ সাকিকে কর্মসূচি পালনে সহায়তার জন্য বিএনপি চিঠি দিয়েছে স্থানীয় নেতাদের।

একাধিক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, এ চিঠিই এখন তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির স্থানীয় নেতারা শত্রু ভাবছেন চিঠি নিয়ে আসা যুগপৎ আন্দোলনের সমমনা দলগুলোর নেতাদের।

দাসত্ব থেকে দ্রোহে, আফ্রিকান গুম্বে মিউজিক

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি একটি গোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও মূল্যবোধকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষ করে যখন কথা আসে আফ্রিকান ডায়াস্পোরার, অর্থাৎ আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়া মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের, তখন সঙ্গীত তার গুরুত্ব অনেকগুণ বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে গুম্বে (Goombay) সঙ্গীত একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসে, যা আফ্রিকার মারুন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য বহন করে এবং আজকের দিনে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অঙ্গ।

গুম্বে মূলত সিয়েরা লিওনের মারুন সম্প্রদায়ের একটি প্রথাগত সঙ্গীত। মারুনরা ছিলেন আফ্রিকান দাসপ্রথা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রদায়, যারা পাহাড় ও গভীর অরণ্যে গিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। তাদের সঙ্গীত ছিল আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও স্মৃতির ভাষা। গুম্বে সঙ্গীতের রিদম, ঢঙ এবং বাদ্যযন্ত্র আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, বিশেষ করে পেরকুশন ও ড্রামের ব্যবহার দিয়ে এটি তৈরি হয়।

আফ্রিকান দাসপ্রথার সময়কাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বহু আফ্রিকান সম্প্রদায় বিভিন্ন কারণে আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে তারা নতুন পরিবেশে বসবাস শুরু করলেও তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারণা ধরে রাখতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সঙ্গীত এই প্রেক্ষাপটে গুম্বের মতো একটি জীবন্ত সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

গুম্বে সঙ্গীত ক্যারিবীয় অঞ্চলে যেমন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়, তেমনি এটি আফ্রো-ডায়াস্পোরার ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কমিউনিটিগুলো এই সঙ্গীতের মাধ্যমে তাদের পূর্বপুরুষদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে।

গুম্বে সঙ্গীতের যাত্রা শুধু একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি নয়, এটি স্মৃতির এক ধারক। আফ্রিকার বাইরে বসবাসরত আফ্রো-ডায়াস্পোরার মানুষদের জন্য এটি ছিল তাদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের জীবন্ত রূপ। সঙ্গীতের মাধ্যমে তারা নিজেদের শেকড় ও আত্মাকে অনুভব করতে পারতো। বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের কাছে গুম্বে ছিল এক ধরনের “ফিরে যাওয়ার পথ” একটি সাংস্কৃতিক হোম, যা সময় ও স্থান পার হয়ে সংযোগের কাজ করে। এই স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ আফ্রো-ডায়াস্পোরার মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলেছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে সাংস্কৃতিক একীকরণ বাড়ছে, সেখানে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের গুরুত্বও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। গুম্বে সঙ্গীতের মাধ্যমে আফ্রো-ডায়াস্পোরা তাদের ভিন্নতা ও স্বকীয়তা ধরে রাখছে। তারা নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য এই ঐতিহ্যকে ব্যবহার করছে, যা তাদের ইতিহাস ও পরিচয়ের প্রতীক।

এছাড়া গুম্বে সঙ্গীত নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের ইতিহাস শেখানোর মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু পুরাতন সময়ের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিও গড়ে তোলে।

গুম্বে সঙ্গীতের ঢঙ ও রিদম বিশ্বসঙ্গীতে অনেক প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে ক্যারিবীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ধরনে যেমন রেগে, সোকো, ও ক্যালিপসো। এই সঙ্গীতগুলো আজকের বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এবং একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।

গুম্বে সঙ্গীতের এই বৈশ্বিক প্রভাব আধুনিক সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি দৃষ্টান্ত যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্য এবং বিশ্বায়নের সংমিশ্রণ ঘটে।

এ সঙ্গীতের যাত্রা আমাদের শেখায় কিভাবে একটি সংস্কৃতির স্মৃতি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়ে নতুন নতুন রূপে জীবিত থাকে। এটি শুধুমাত্র অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক ঐক্যেরও বুনিয়াদ গড়ে।

যুদ্ধের পর নতুন ইরান? জনগণকে ঐক্যের বার্তা দিচ্ছে সরকার

ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান যেন এক নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির সরকার ও জনগণের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যার প্রমাণ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর ইরানজুড়ে জাতীয় ঐক্যের এক বিরল প্রদর্শন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শান্তির আবরণ শিগগির গভীর সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। কেননা এই যুদ্ধ ইরানি সমাজ ব্যবস্থার গভীরে পরিবর্তন এনেছে। যুদ্ধ ইরানে কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সারা দেশের মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক বন্দীদেরও যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য প্রদর্শনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত পেজেশকিয়ান যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণের সংযম ও ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেন – সরকার সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলেও জনগণ রাস্তায় নামেনি, ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।

তবে ইরান সমাজবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি সাঈদ মোইদফার সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি সরকার জনগণের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধের অবসান শান্তি নয়, বরং নতুন সামাজিক সংকটের সূচনা হতে পারে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ও সংস্কারপন্থি গণমাধ্যমগুলো এই ঐক্যের আহ্বানকে প্রতিধ্বনিত করছে। দৈনিক ‘এতেমাদ’ ও ‘আরমান মেল্লি’ তাদের প্রথম পাতায় জাতীয় সংহতির প্রশংসা করেছে এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেছে। তেহরান সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা আজাদি মনুমেন্টের নিচে ‘ও ইরান’ নামে দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করেছে। বেশ কিছু শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎকারে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশংসা করেছেন। ‘এতেমাদ’ পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে তাঁদের ছবি প্রকাশ করেছে।

আরেকটি বিষয় হলো—যুদ্ধবিরতির পর ইরানের ইসলামিক মতাদর্শের ভাষা এক পাশে সরিয়ে এখন জাতীয় পরিচয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিরোনামগুলো এখন ‘ইরান’ শব্দ দিয়ে শুরু হচ্ছে, ‘ইসলাম’ শব্দটি এর পেছনে পড়ে গেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাম্প্রতিক ভাষণে ‘ইসলামিক ইরান’ শব্দযুগলটি মাত্র একবার ব্যবহার করা হয়েছে।

এই ঐক্যের আহ্বানের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে একধরনের দায়বোধও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সরকার এখন জনগণের কাছে ঋণী। সংস্কারপন্থী সমাজবিজ্ঞানী হামিদ রেজা জালাইপুর বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে জনগণকে পুরস্কৃত করা সরকারের দায়িত্ব, যাতে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী হয়।’

এমনকি কিছু রক্ষণশীলও একই সুরে কথা বলছেন। এক সাবেক সম্পাদক স্বীকার করেছেন, এখন সরকারের পালা—যুদ্ধের সময় জনগণের সহনশীলতার প্রতিদান দেওয়ার।

জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য আহমদ বখশায়েশ বলেছেন, সরকারকে অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নতুনভাবে সাজাতে হবে। কমিটির আরেক সদস্য বেনাম সাঈদিও সরকারবিরোধীদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে ইরানের সব নীতি নির্ধারণ করেন—সর্বোচ্চ নেতা খামেনি। তিনিই যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, তিনিই নীতিগত পরিবর্তনের একমাত্র ক্ষমতাধারী। এখন আপাতত শাসকগোষ্ঠী ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের ভাষা ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ছাঁচ কত দিন টিকে থাকবে বা এটি আদৌ কোনো বাস্তব পরিবর্তন বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।