Home Blog Page 63

অস্তিত্ব সংকটে হামাস : বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও ইরানের সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইসরায়েলি টানা হামলায় বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এখন কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত হামাস। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে-কমান্ডার সংকট, সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থান এবং ইরানের সম্ভাব্য সমর্থনহীনতার মাঝে এই ইসলামপন্থি সংগঠনটি টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

হামাসের ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্র জানায়, সংগঠনটি এখন বিকেন্দ্রীকৃত পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। ছোট ছোট গ্রুপে যোদ্ধারা স্বতন্ত্রভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল খোলাখুলি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। তারা হামাসের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ১৬টি হামাস-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও সূত্র, ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা জানান – হামাসের কেন্দ্রীভূত কমান্ড ধ্বংস হয়ে গেছে। সংগঠনটি এখন সীমিত পরিসরে আকস্মিক হামলা চালাতে পারলেও বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনায় অক্ষম।

দীর্ঘ ২০ মাসের সংঘাতে ইসরায়েল গাজার ভূগর্ভস্থ শত শত কিলোমিটার সুড়ঙ্গ ধ্বংস করেছে এবং আনুমানিক ২০ হাজারের বেশি হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, হামাসের যোদ্ধাদের গড় বয়স প্রতিদিনই কমছে। কারণ সংগঠনটি বর্তমানে গাজার বাস্তুচ্যুত, দরিদ্র ও বেকার তরুণদের মধ্যে থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হামাসের প্রধান সামরিক মিত্র হলেও সম্প্রতি ইসরায়েলের ইরানে চালানো বিমান হামলা এবং মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এই সম্পর্ককে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কর্মকর্তা সাঈদ ইজাদির হত্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। তিনি হামাসের সঙ্গে সমন্বয়কারী প্রধান ব্যক্তি ছিলেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।

এক হামাস ঘনিষ্ঠ ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেন, ইরানের সমর্থন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ, প্রশিক্ষণ ও সামরিক কৌশলে এই অনিশ্চয়তা আমাদের কৌশলেও প্রভাব ফেলবে। এক হামাস সূত্র রয়টার্সকে বলেছেন, আমরা বিশ্বাস হারাইনি। কিন্তু বাস্তবতা খুব ভালো দেখাচ্ছে না।

চারটি সূত্র জানিয়েছে, রাফাহ অঞ্চলে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হামাসবিরোধী এক গোত্র নেতা ইয়াসির আবু শাবাবকে হত্যার জন্য বিশেষ বাহিনী পাঠানো হলেও এখনও তাকে ধরতে পারেনি হামাস। হামাস বলেছে–‘ইসরায়েলের দালাল’ এসব বিদ্রোহী গ্যাং গাজায় বিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা ভাঙতে চায়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, কিছু হামাসবিরোধী গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিয়ে সমর্থন দিচ্ছে তার সরকার।

৫৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে যুদ্ধবিরতির জন্য। তবে নেতানিয়াহু পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন হামাস নেতাদের গাজা ত্যাগ করতে হবে। যা হামাসের কাছে আত্মসমর্পণের শামিল।

হামাসের রাজনৈতিক নেতা সামি আবু জুহরি রয়টার্সকে বলেন, সংগঠনটি যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ করছে। তবে আত্মসমর্পণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আমরা আলোচনায় প্রস্তুত এবং সব জিম্মিকে একসঙ্গে মুক্তি দিতে রাজি আছি। তবে যুদ্ধ থামাতে হবে এবং ইসরায়েলকে গাজা থেকে সরে যেতে হবে।

রয়টার্সকে একটি সূত্র জানায়, হামাস এখন যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া। কারণ যুদ্ধবিরতি হলে ক্লান্ত গাজাবাসীর জন্য স্বস্তি আসবে এবং সংগঠনটি নিজের অভ্যন্তরীণ শত্রুদের দমন করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, গাজা সংকট সমাধানে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে এবং ইরানে হামলা বন্দীদের মুক্তিতে সহায়ক হবে।

বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়াজিদ সাইঘ মনে করেন, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে হামাস হয়তো গাজা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর যুদ্ধ শেষ হলে হয়তো তাদের আর শাসকগোষ্ঠী হিসেবে কেউ গ্রহণও করবে না।

ইসরায়েল হামাসের যে ক্ষতি করেছে, তা তাদের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড়। গাজায় তাদের বেশির ভাগ শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। যদিও তারা আত্মসমর্পণ না করার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই প্রতিরোধের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর শঙ্কা বাড়ছে।

মৃত্যুর পরের জীবন ও জ্যোতিষশাস্ত্র

একজন প্রিয়জন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলে, আমরা অনেক অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে ডুবে যাই। তেমনি এক পরিস্থিতিতে, কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “একজন মানুষ মারা গেলে তার জন্মকুণ্ডলী কি তখনো কোনো মানে রাখে? আত্মা কি সেই গ্রহ-নক্ষত্রের ছায়াপথ অনুসরণ করে চলতে থাকে মৃত্যুর পরেও?”

এই প্রশ্ন শুনেই যেন এক ধাক্কায় আমাদের কল্পনার সীমানা প্রসারিত হয়। কারণ আমরা জানি, জন্মকুণ্ডলী সাধারণত একটি জীবনের মানচিত্র। জন্মের মুহূর্তে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে তৈরি সেই ছক আমাদের চরিত্র, প্রবণতা, সম্পর্ক, দুর্বলতা এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঘটনা নির্ধারণের পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু সেই জন্মের ছাপ কি মৃত্যুর পরে টিকে থাকে? আত্মা কি কোনো নক্ষত্রচিহ্নিত পথ বেয়ে এগিয়ে যায়?

জ্যোতিষশাস্ত্রের ভাষায়, জন্মকুণ্ডলী হচ্ছে এক ধরনের সাংকেতিক রূপরেখা, যেখানে আত্মা কোনো এক জীবনে তার শেখার বিষয়গুলো, দুঃখ-সুখের অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের গঠন ও ভাঙন, এমনকি কিছু কার্মিক পাঠসূচি বেছে নেয়। জন্মকুণ্ডলী ভবিষ্যদ্বাণী নয়, এটি হলো সেই মানচিত্র, যা আত্মার এক জীবনের ভেতরে অভিজ্ঞতার কাঠামো তৈরি করে।

তবে প্রশ্নটা দাঁড়ায় ঠিক এখানেই, এই কাঠামো কি অনন্ত?
অনেক প্রাচীন দর্শনে বলা হয়েছে আত্মা অমর এবং পুনর্জন্মের মাধ্যমে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে প্রবেশ করে। যদি এই বিশ্বাস সত্য হয়, তবে আত্মা প্রতিবারই নতুন সময়, স্থান ও পরিবেশে নতুন রূপে জন্ম নেয়। প্রতিটি জন্মের সঙ্গে জন্ম নেয় নতুন একটি কুণ্ডলী।

এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে জন্মকুণ্ডলীকে দেখা যেতে পারে “একটি জীবনের পাঠসূচি” হিসেবে। একজন শিক্ষার্থীর হাতে দেওয়া নির্দিষ্ট সিলেবাস, যেটি সেই শিক্ষার্থীর জন্য প্রযোজ্য কেবল একটি সেমিস্টারের জন্য। তারপর নতুন জন্ম, নতুন কুণ্ডলী, নতুন পাঠ।

তবে এর মানে এই নয় যে পূর্বের জন্মকুণ্ডলীর কোনো মূল্য নেই। বরং এটি আত্মার অভিযাত্রার একটি অধ্যায়, যেখানে সে কোনো একটি রূপে, কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছিল।

জ্যোতিষশাস্ত্রে একটি ধারায় বলা হয়, যেমন জন্মের সময় গ্রহের অবস্থান আত্মার সূচনাকে প্রতিফলিত করে, তেমনই মৃত্যুর মুহূর্তটিও একটি চার্ট তৈরি করে। একে অনেকে বলেন “ডেথ চার্ট”। এই চার্ট আত্মার উত্তরণ, পরবর্তী পথে প্রবেশ, বা কিছু ক্ষেত্রে আত্মার চক্রের ইঙ্গিত বহন করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

তবে এখানেই আসে সীমাবদ্ধতা। সময়, স্থান এবং গ্রহ এসবই দেহাবদ্ধ অস্তিত্বের পরিসরে কার্যকর। আত্মা যদি সময়-স্থান ছাড়িয়ে যায়, তাহলে এই সমস্ত মানচিত্র তাকে কতদূর পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে?

বিভিন্ন ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয় আত্মা পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা বয়ে আনে, যদিও সেই স্মৃতি সচেতন মনে অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আগের জন্মকুণ্ডলী সরাসরি প্রভাব ফেলে। বরং প্রতিটি জীবন আত্মার এক নতুন পাঠশালা, যেখানে অভিজ্ঞতা, উদ্দেশ্য, এবং পরিস্থিতি নতুন করে গঠিত হয়।

ধরা যাক কোনো ব্যক্তি এই জীবনে শিল্পপ্রবণতায় ভরপুর ছিলেন। তার জন্মকুণ্ডলীতে ছিলো শক্তিশালী শনি ও শুক্রের সংযোগ, যা সৃজনশীলতা ও অধ্যবসায়কে নির্দেশ করেছিল। মৃত্যুর পরে আত্মা কি সেই প্রবণতা নিয়ে আবার জন্মাবে? সম্ভবত না। আত্মা তার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কোনো অধ্যায় বেছে নেয়। তার কুণ্ডলীও নতুন রূপে গঠিত হয়।

জন্মকুণ্ডলী অনেকের কাছেই মানবজীবনের অভ্যন্তরীণ গতি-প্রকৃতি, সিদ্ধান্ত ও বিকাশ বোঝার একটি চমৎকার পদ্ধতি। এটি আত্মাকে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোয় আবদ্ধ করে না; বরং তাকে সময় ও স্থাননির্ভর এক রূপে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

আত্মা যদি সীমাহীন হয়, তবে কুণ্ডলী একটি সীমিত আয়ুষ্কালেই তাৎপর্যপূর্ণ। মৃত্যু সেই আয়ুষ্কালের পরিসমাপ্তি। তবে মৃত্যুর পরে আত্মা কোথায় যায়, কীভাবে যায় সেসব প্রশ্নের উত্তর আমরা সত্যিই জানি না।

ট্রাম্পের চাপে ন্যাটোর সামরিক ব্যয়বৃদ্ধি, যুদ্ধপ্রস্তুতি ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার দৌড়ে বিশ্ব

বুধবার (২৫ জুন) নেদারল্যান্ডের দ্য হেগে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে — জোটের সদস্য ৩২টি রাষ্ট্র ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির প্রতিরক্ষায় ব্যয় করবে৷ যা আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি, এতদিন এই হার ছিল ২%৷

প্রথম এই ৫% লক্ষ্যমাত্রার চাপ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প৷ তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তারা যদি ‘কম’ ব্যয় চালিয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেবে৷ ২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ন্যাটোর মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ মিটিয়েছে৷

অনেক ইউরোপীয় দেশ ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছে এবং বলেছে যে ৫% হার খুব বেশি৷ ২০২৪ সালে অনেক দেশ এখনো ২% লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি৷

যৌথ ঘোষণায় ন্যাটো বলেছে, ‘গভীর নিরাপত্তা হুমকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’ বিশেষ করে ইউরো-অ্যাটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী হুমকি এবং সন্ত্রাসবাদের ‘অব্যাহত হুমকির’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা হ্রাসের হুমকি দিয়েছেন।

এই ৫% মধ্যে অন্তত ৩.৫% ব্যয় করা হবে সরাসরি প্রতিরক্ষার জন্য, বাকি অর্থ ব্যয় করা হবে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’, সাইবার নিরাপত্তা, নাগরিক প্রস্তুতি, উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য।

শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কেবল নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে না, বরং কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন — এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের ফলে পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, পরিচর্যা ও শিক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় কমে যেতে পারে।

ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে তাতে মার্কিন অস্ত্রশিল্প মূলত লাভবান হবে। এর মধ্যেই ন্যাটো সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ১২টি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের হ্যাগ শহরে অনুষ্ঠিত এবারের ন্যাটো সম্মেলনকে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলে অভিহিত করা হচ্ছে। মাত্র দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট স্থায়ী এই সম্মেলনের ব্যয় হয়েছে ২১৪৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি মিনিটে খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বিপুল ব্যয় নিয়ে ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) বলেছে — শীতল যুদ্ধের শেষ সময়ের পর থেকে বিশ্ব এখন সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অস্ত্র মজুদের দিকে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৯.৪% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭১৮ ট্রিলিয়ন ডলারে। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড।

সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে সামরিক খাতে। সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র একা যে ব্যয় করে, তালিকার পরবর্তী ৯টি দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও তা বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক খাতে চীনের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ এবং রাশিয়ার চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি ব্যয় করে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে এরপরই রয়েছে রাশিয়া, ভারত, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বব্যাপী এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার শেষ এখনও চোখে পড়ছে না। ২০২৪ সালে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ তাদের সামরিক খরচ বৃদ্ধি করেছে।

সিপ্রি সতর্ক করেছে যে, সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট হ্রাসের দিকে পরিচালিত করে।

২০২৫ সালের গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে দেখা গেছে – বৈশ্বিক শান্তি অব্যাহতভাবে হ্রাস পাচ্ছে, এবং যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রধান সূচকগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। আরও অনেক দেশ সামরিকীকরণ বৃদ্ধি করছে, যার পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত বৃদ্ধি, ঐতিহ্যগত জোট ভাঙন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

ম্যানোস্পেয়ার – ডিজিটাল টক্সিক পুরুষতন্ত্র

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যেমন আমাদের জীবনে নানা সুফল নিয়ে এসেছে, তেমনি কিছু অন্ধকার দিকও উন্মোচন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ম্যানোস্পেয়ার’ নামে পরিচিত এক অনলাইন পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠী। শুরুতে এটি কিছু হতাশ পুরুষের অনলাইন গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল নেটওয়ার্কে, যার প্রভাব বাস্তব জীবনের রাজনীতি, সম্পর্ক এবং নারীদের নিরাপত্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই গোষ্ঠী নারীবিদ্বেষ, পুরুষতান্ত্রিকতা ও ঘৃণাকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার বীজ বপন করছে।

ম্যানোস্পেয়ার কী?
‘ম্যানোস্পেয়ার’ শব্দটি মূলত অনলাইনে একধরনের পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠী ও তাদের চক্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন উপগোষ্ঠী রয়েছে, যেমন ইনসেল (Involuntary Celibates), যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মানসিকভাবে হতাশ; MGTOW (Men Going Their Own Way), যারা নারীদের পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিজেদের পথে যাওয়ার পক্ষে; পিক-আপ আর্টিস্ট (PUA), যারা নারীদের ‘জিততে’ বিভিন্ন কৌশল শেখায়; এবং ‘রেড পিল’ আন্দোলন, যারা নারীদের জন্মগতভাবে পুরুষ শোষণকারী বলে মনে করে।

কেন উদ্বেগের কারণ?
এই গোষ্ঠীর বক্তব্য নারীদের প্রতি একঘেয়ে অবজ্ঞা, সন্দেহ ও ঘৃণা ছড়ায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা সমস্যার জন্য তারা নারীদের দায়ী করে। বিশ্বজুড়ে ‘ম্যানোস্পেয়ার’-এর প্রভাব থেকে অনেক সহিংস ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে হতাশ কিছু পুরুষ নারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই ধরনের ভাবধারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অ্যালগরিদমের কারণে যারা একবার এই বিষয় নিয়ে দেখেন, তাদের কাছে আরো ঘৃণাসূচক কনটেন্ট বেশি করে পৌঁছায়।

তরুণ পুরুষদের মধ্যে সামাজিক একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ব্যর্থতা অনেক বড় কারণ। যখন তারা নিজেরাই সমস্যার মুখোমুখি হন, তখন ‘ম্যানোস্পেয়ার’ তাদের জন্য এক ধরণের সহজ ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই গোষ্ঠী বলে তোমার সমস্যার জন্য নারীরা দায়ী। এভাবে তারা নিজের হতাশা অন্যের ওপর দোষারোপ করে মানসিক স্বস্তি খোঁজে।

সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা এতোটাই প্রস্তুত নয় যে তারা তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা ও সহায়তা এখনও যথেষ্ট নয়। ফলে তারা অনলাইনে এই ধরনের ক্ষতিকর গোষ্ঠীতে প্রবেশ করে এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুব্ধ অনুভব করে।

এই সংকট থেকে উত্তরণ করতে হবে অনেক স্তরে। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরিবারগুলোকে পুরুষ ও নারীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সমতা শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণাসূচক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসার দরকার যাতে পুরুষরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত হয়। সবশেষে, ‘ভালো পুরুষ’ বা প্রকৃত পুরুষত্বের একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা জরুরি, যেখানে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও সম্মান মিশ্রিত থাকবে।

ম্যানোস্পেয়ার’ কেবল একটি অনলাইন সমস্যা নয়, এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের পরিচায়ক। এটি সমাজের জন্য এক বড় হুমকি, কারণ এটি নারীবিদ্বেষ, হিংসা এবং বিভাজনের জন্ম দেয়। আমরা যদি সময়মতো সতর্ক না হই, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ আরও অস্থিতিশীল হবে। তাই দরকার সকল স্তরের সচেতনতা ও যৌথ প্রয়াস, যাতে আমরা একটি সংহত, মানবিক ও সমতার সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

দেশে এখন মাদকাসক্ত ৮৩ লাখ!

0

দেশে এখন মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। মাদকাসক্তদের বেশির ভাগ পুরুষ। নারী ও শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তি রয়েছে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক সমীক্ষায় মাদকাসক্ত জনসংখ্যার এই প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এ ধরনের সমীক্ষা এই প্রথম করেছে ডিএনসি। অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সমীক্ষায় দেশের আট বিভাগের ১৬টি জেলা থেকে ৫ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে মাদকাসক্তির হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গবেষকেরা স্বীকৃত গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

গবেষণার ফলাফলের অংশে বলা হয়, দেশে প্রাক্কলিত মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৩ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.৮৯%। জনসংখ্যা ধরা হয়েছে সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা শুমারি অনুযায়ী ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার।

এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা করেছিল, সেখানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ লাখ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমীক্ষা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (প্রায় ৫২%), ২৩ লাখ ইয়াবায় (প্রায় ২০%) ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭%) আসক্ত। ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, তিন লাখের মতো মানুষ ঘুমের ওষুধ মাদক হিসেবে গ্রহণ করেন। ড্যান্ডির মতো আঠাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করেন ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো মানুষ। শিরায় মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ।

ডিএনসির মাদকবিষয়ক প্রতিবেদন (ড্রাগ রিপোর্ট) ২০২৪ -তে বলা হয়েছে, মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের পথ (রুট) গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমানা), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) এবং গোল্ডেন ওয়েজের (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় এমন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা রয়েছে। এসব জেলার অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মাদক দেশে আসছে।

গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকে দেশে ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে ফেনসিডিল আসা শুরু হয়। পরে ফেনসিডিলের জায়গা নেয় ইয়াবা।মিয়ানমার থেকে এখনো প্রচুর ইয়াবা আসে। পাশাপাশি নতুন করে আসা শুরু হয়েছে ক্রিস্টাল মেথ, যা মূলত ইয়াবার মূল উপাদান।

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, মাদকের ছোট ব্যবসায়ী, বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের বেশি ধরা হয়। আড়ালে থেকে যান বড় মাদক ব্যবসায়ীরা। আবার মাদক মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যদান ঠিকমতো হয় না বলে বড় অংশের মামলায় আসামি খালাস পেয়ে যান।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মাদকের কারণে প্রতিবছর পাচার হয়ে যায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর মাদক কেনাবেচা করে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে বেসরকারি পর্যায়ে ৩৮৭টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। নতুন করে সরকারিভাবে ঢাকায় ২৫০ শয্যার এবং দেশের বাকি ৭টি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আরও ৭ পূর্ণাঙ্গ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নন-ফিকশন বইগুলো কেন বেস্টসেলার হচ্ছে?

নন-ফিকশন বইয়ের জনপ্রিয়তা আজকাল সবার মুখে মুখে। একসময় সাহিত্য বা গল্প-উপন্যাসই ছিল পাঠকদের প্রথম পছন্দ, কিন্তু এখন চিত্রটা ভিন্ন। বিশ্বের বেস্টসেলার তালিকা থেকে শুরু করে স্থানীয় বইমেলাগুলোতেও নন-ফিকশন বইয়ের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।কেন এই পরিবর্তন? কেন মানুষ কল্পনার জগৎ ছেড়ে বাস্তবের মুখোমুখি হতে চাইছে? এ জ্ঞানের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষা নন-ফিকশনের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ আরও বেশি জানতে, শিখতে এবং নিজেদের দক্ষতাকে উন্নত করতে আগ্রহী। ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অনুভব করছে মানুষ। নন-ফিকশন বইগুলো এই চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান যে কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য নন-ফিকশন বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। একজন পাঠক যখন কোনো বিশেষ বিষয় সম্পর্কে প্রামাণিক এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য চান, তখন নন-ফিকশনই তাদের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।

আত্ম-উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত বিকাশের তীব্র ইচ্ছা নন-ফিকশন বইকে বেস্টসেলারের তালিকায় নিয়ে আসছে। আধুনিক জীবনে মানুষ আরও উৎপাদনশীল, সুখী এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে চায়। “কীভাবে সফল হবেন,” “স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট,” “আর্থিক স্বাধীনতা,” “ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা” – এমন বিষয়গুলো নিয়ে লেখা বইগুলো মানুষের এই চাহিদাকে পূরণ করে। জেমস ক্লেয়ারের ‘অ্যাটমিক হ্যাবিটস’, ডেল কার্নেগির ‘হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল’ কিংবা রবার্ট কিয়োসাকির ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ এর মতো অধিক বিক্রিত বইগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই বইগুলো কেবল তথ্যই দেয় না, বরং পাঠকের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে ব্যবহারিক কৌশল এবং অনুপ্রেরণা যোগায়। যখন মানুষ অনুভব করে যে একটি বই তাদের ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তখন তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়।

ডিজিটাল মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নন-ফিকশনের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে বইয়ের রিভিউ, সারাংশ এবং সুপারিশ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য ইনফ্লুয়েন্সার এবং বুকটিউবার নন-ফিকশন বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন, এগুলো ও দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে। কোনো একটি জটিল ধারণা বা সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে যখন একটি নন-ফিকশন বইকে তুলে ধরা হয়, তখন তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

পডকাস্ট এবং অডিওবুকের সহজলভ্যতাও নন-ফিকশনের প্রসার ঘটিয়েছে। মানুষ এখন যাতায়াতের সময় বা অন্যান্য কাজের ফাঁকে অডিওবুক শুনে জ্ঞান অর্জন করতে পারছে, যা তাদের সময়কে আরও ফলপ্রসূ করে তুলছে।

নন-ফিকশন বইয়ের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং সহজলভ্যতা এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। আগে নন-ফিকশন বলতে মূলত ইতিহাস বা জীবনীমূলক বই বোঝানো হলেও এখন এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। ভ্রমণকাহিনী থেকে শুরু করে রান্নার বই, গবেষণামূলক প্রবন্ধ থেকে শুরু করে আত্মজীবনী, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে জীবনদর্শন—সবকিছুই নন-ফিকশনের অন্তর্ভুক্ত। ই-বুক এবং অডিওবুকের কারণে এই বইগুলো এখন বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে সহজে সংগ্রহ করা যায়, যা পাঠকদের একটি বৃহত্তর অংশকে আকৃষ্ট করছে।

নন-ফিকশন বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রামাণিকতা পাঠকদের কাছে এর আবেদন বাড়িয়েছে। ফিকশন যেখানে কল্পনাপ্রসূত, সেখানে নন-ফিকশন বাস্তব ঘটনা, গবেষণা, এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত হয়। অনেক পাঠক এমন বিষয়বস্তু পছন্দ করেন যা বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করে। কোনো বিশেষজ্ঞ যখন তাদের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা একটি বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন, তখন পাঠকরা সেটিকে সহজে বিশ্বাস করে এবং মূল্যবান মনে করে।

মানুষের পঠন অভ্যাসের পরিবর্তনও নন-ফিকশনের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে। বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে সময় কম। দীর্ঘ গল্প বা জটিল প্লট অনুসরণ করার চেয়ে অনেকেই সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকরী তথ্য পেতে আগ্রহী। নন-ফিকশন বইগুলো প্রায়শই নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান বা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান প্রদান করে, এটি আধুনিক পাঠকের দ্রুত তথ্য প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

নন-ফিকশন বইয়ের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী প্রবণতা নয়। এটি মানুষের জ্ঞানার্জনের আগ্রহ, আত্ম-উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা, ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব, বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতি মানুষের সহজাত ঝোঁকের সম্মিলিত ফল। সময়ের সাথে সাথে এই ধারা আরও সুদৃঢ় হবে বলেই মনে করা হচ্ছে, মানুষ সব সময়ই শিখতে, জানতে এবং নিজেদের উন্নত করতে চায়, আর নন-ফিকশন বইগুলো এই যাত্রায় তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।

ভারত প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং অংশীদার : চীন

২৩ জুন চীনের বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর মধ্যকার এক বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন ও ভারত।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াং জানিয়েছেন যে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় পক্ষের জন্যই যোগাযোগ আরও উন্নত করা, পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা এবং বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।

তিনি বলেন, উভয় পক্ষকেই এ বিষয়টি মেনে চলা উচিত যে আমরা একে অপরের জন্য হুমকি নই, বরং উন্নয়নের সুযোগ; আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী নই, বরং অংশীদার—এর মাধ্যমে দুই দেশই লাভবান হতে পারে।

ওয়াং আরও বলেন, উভয় দেশকে সুসম্পর্কপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের সঙ্গে আচরণ করতে হবে, পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে হবে এবং দুটি প্রাচীন মহান সভ্যতার ইতিহাস ও প্রজ্ঞা প্রদর্শনের মাধ্যমে সংবেদনশীল বিষয়গুলো যথাযথভাবে মোকাবিলা করে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখতে হবে।

ওয়াং ই বলেন, গত বছর রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। তাই দুই দেশের উচিত এই গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য বজায় রাখা।

অজিত ডোভাল চীন সফর করছেন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের এক বৈঠকে অংশ নিতে, যা একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ক জোট।

ওয়াং-ডোভাল বৈঠকের পর সোমবার দিল্লি থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, উভয় পক্ষ ভারত-চীন সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়ন, বিশেষ করে জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

অজিত ডোভাল আরো বলেন, দুই দেশের নেতাদের মধ্যে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকনির্দেশনা ঠিক করে দিয়েছে। ভারত ও চীনের কৌশলগত লক্ষ্য একসূত্রে গাঁথা। আর উভয় দেশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো উন্নয়ন।

কেন ভাঙা সমাজকে স্বাভাবিক মনে করতে বাধ্য হই আমরা?

একটা অদ্ভুত অনুভূতি মিলিয়ে দেখুন, যখন আপনি চারপাশে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন কিছুই ঠিক নেই, সমাজের কাঠামো, রাষ্ট্রের নীতি, গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, এমনকি মৌলিক মানবিক সম্পর্কগুলোতে ধস নেমেছে। অথচ আশপাশের মানুষগুলো ঠিকই স্বাভাবিক আচরণ করছে, মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি। আপনি যদি কখনও এমন কিছু অনুভব করে থাকেন, তাহলে হয়তো আপনি “হাইপারনরমালাইজেশন” নামক একটি ধারণার সীমানায় দাঁড়িয়ে আছেন।

এই শব্দটা প্রথম জনপ্রিয় হয় ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা Adam Curtis এর ২০১৬ সালের একটি তথ্যচিত্র থেকে। তবে এর উৎপত্তি আরও পুরোনো, সোভিয়েত আমলে সমাজবিজ্ঞানীরা এটি ব্যবহার করেছিলেন সেই সমাজব্যবস্থার জন্য, যেখানে বাস্তবতা ও প্রপাগান্ডার মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, মানুষ জানত সব মিথ্যে, কিন্তু সেই মিথ্যেতেই তারা বেঁচে ছিল। ঠিক এই জায়গা থেকেই হাইপারনরমালাইজেশন।

যখন সব ভেঙে যাচ্ছে তখনও আমরা স্বাভাবিক অভিনয় কেন করি?

ডিজিটাল নৃতত্ত্ববিদ Rahaf Harfoush ব্যাখ্যা করেন “আপনি যে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছেন, তা হলো একদিকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন সিস্টেমগুলো কাজ করছে না। অন্যদিকে ক্ষমতাবানরা ও প্রতিষ্ঠানগুলো এমন অভিনয় করছে যেন সব ঠিকঠাক চলছে।” এটা কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এই ধরনের পরিবেশে মানুষ নিজেদের মানিয়ে নেয়, যেন dysfunction-ই নতুন স্বাবাভিকতা।

এটি শুধু পশ্চিমা বিশ্বের বাস্তবতা নয়। বাংলাদেশেও কি আমরা রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, দুর্বল গণতন্ত্র, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিংবা শিক্ষাক্ষয়ের মধ্যে দিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি না?

হাইপারনরমালাইজেশনের উপসর্গগুলো কী?

ভাঙা প্রতিষ্ঠান – গণতন্ত্র, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায়বিচার—সবই মুখে আছে, কার্যত দুর্বল। সহানুভূতির অবসান – কোনো বড় অমানবিক ঘটনা ঘটলেও মানুষ তেমন করে প্রতিক্রিয়া জানায় না। অবসন্ন নাগরিকত্ব – মানুষ ভাবে, “আমি তো একা কিছু করতে পারি না, তাই আর ভেবেও কি হবে!।” ভুল বাস্তবতার সংস্কৃতি – মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এত তথ্য মিশে যায় যে, সত্য-মিথ্যার সীমা মুছে যায়। ব্যক্তিগত শান্তির ভান – চারপাশে আগুন, কিন্তু আমি যদি আমার ছোট জগতে ঠিক থাকি তাহলে সেটাই যথেষ্ট।

বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি আর টেকনোলজি হাত ধরাধরি করে চলছে। মার্কিন প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে টেক বিলিয়নিয়ররা, যেমন এলন মাস্ক বা মার্ক জাকারবার্গ, সরকারকে কখনও চ্যালেঞ্জ করছে না বরং তথ্য প্রবাহ ও সচেতনতার রাশ নিজেদের হাতে নিয়ে নিচ্ছে। এমত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই একটি ভুয়া স্বাভাবিকতার জালে আটকে যায়। সে জানে কিছু ঠিক চলছে না, কিন্তু তার ভাষা নেই এটা ব্যাখ্যার।হাইপারনরমালাইজেশন সেই ভাষাটুকু দেয়।

এই মনস্তত্ত্বের ফলাফল কী?

আমরা যখন বুঝি কিছু ঠিক চলছে না, কিন্তু প্রতিবাদ করি না তখন আমরা ব্যক্তিগতভাবে মানিয়ে নিতে শিখি। কিন্তু সমাজ তখন চেতনাহীন পতনের দিকে এগোতে থাকে। ধীরে ধীরে অন্যায় স্বাভাবিক হয়, দুর্নীতি টেকসই হয়, গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।মানুষ নিজেকে বাঁচাতে গা বাঁচিয়ে চলে, দায়িত্ব এড়ায়। এই মনোভাব সামষ্টিক সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি করে, যা বাস্তব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাধা।

ভুয়া স্বাভাবিকতা ভাঙার সময় এখনই। হাইপারনরমালাইজেশন আমাদের কণ্ঠরোধ করে রাখে, আমরা হয় মৌন থাকি, নয়তো স্বপ্নবিলাসী হয়ে উঠি। কিন্তু মিনিংফুল পরিবর্তনের জন্য দরকার collective awakening, যেটা Rahaf Harfoush এর ভাষায়, “একসাথে জেগে ওঠা”। এখন সময় এসেছে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করার, আমরা কি সত্যিই ঠিক আছি? আমাদের চারপাশে যা ঘটছে, তা কি বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে? সমাজে যখন মিথ্যা এতটাই বড় হয়ে যায় যে, সবাই তাতেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়, তখন থেকে নেমে আসে সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়।

উপনিবেশবাদের ছায়ায় লুকানো গৌরব ‘গ্রেট জিম্বাবুয়ে’

১৩শ শতকের আরব ভ্রমণকারী ইবনে বতুতা যখন আফ্রিকার অন্তরালে এক রহস্যময় শহরে পা রাখেন, তখন তিনি লিখেছিলেন ‘আমি এমন এক জায়গায় এসেছি যেখানে ঘরগুলো পাথর দিয়ে তৈরি এবং প্রাচীর এত উচ্চ যে ঘোড়া চড়ে উঠতে পারা কঠিন।’ এই শহরটির নাম ছিলো ‘জিম্বাবুয়ে’। আজকের দিনে সেই পাথরের শহরের নিঃশব্দ ধ্বংসাবশেষ বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় এক মহান সভ্যতার গল্প, যা যুগ যুগ ধরে স্থায়ী থেকেছে ইতিহাসের গভীরে

জিম্বাবুয়ের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই শহরের নামকরণ “জিম্বাবুয়ে” শব্দ থেকেই, যার অর্থ “পাথরের বড় ঘর”। ১১শ থেকে ১৫শ শতকের মধ্যে এটি গড়ে ওঠে এবং শোনা জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রাজধানীতে পরিণত হয়। গবেষকরা মনে করেন এখানে একসময় প্রায় ২০,০০০ মানুষের বসবাস ছিল। এই শহরের উত্থান শুধু আঞ্চলিক ক্ষমতার কারণে নয়; বরং এটি যুক্ত ছিল ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের সঙ্গে, যা চীন, পারস্য এবং ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

গ্রেট জিম্বাবুয়ের অন্যতম বিস্ময় হলো এর স্থাপত্য, বিশেষ করে Great Enclosure এবং Hill Complex। ১১ মিটার উচ্চতার পাথরের প্রাচীরগুলো এমন নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে যে কোনও ধরনের মর্টার বা সিমেন্ট ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। কেবল নিখুঁত ভারসাম্যে পাথর বসিয়ে তৈরি করা এই বিশাল কাঠামো আজও স্থাপত্য ও প্রকৌশলের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
Conical Tower, যার উদ্দেশ্য আজও পুরোপুরি জানা যায়নি, অনেক গবেষক একে রাজকীয় প্রতীক, খাদ্যভাণ্ডার অথবা ধর্মীয় স্তম্ভ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর আকৃতি ও অবস্থান রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ স্পষ্ট করে।

গ্রেট জিম্বাবুয়ের শক্তি শুধু স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল পরিপূর্ণ নগররাষ্ট্র। এখানকার অধিবাসীরা লোহা গলিয়ে অস্ত্র ও সরঞ্জাম বানাতো, কৃষিকাজে দক্ষ ছিল এবং গবাদি পশুর মালিকানা ছিল সামাজিক মর্যাদার সূচক।

তবে তাদের সোনার খনিই ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের মূল আকর্ষণ। চীনা সিরামিক, পারস্যের গ্লাস, আরব মুদ্রা, এমনকি ভারতীয় জপমালা এখানে পাওয়া গেছে । এসব তথ্য প্রমাণ করে, গ্রেট জিম্বাবুয়ে এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। মোজাম্বিক উপকূলে অবস্থিত কিলওয়া বন্দরের মাধ্যমে এই সোনা আর পণ্য দুনিয়ার দূর প্রান্তে পৌঁছাত।

লিখিত কোনো ইতিহাস পাওয়া না গেলেও কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের বলে দেয় গ্রেট জিম্বাবুয়ের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস গভীর ও প্রকৃতিনির্ভর ছিল। “জিম্বাবুয়ে বার্ড” নামে পরিচিত পাথরের খোদাই করা পাখির প্রতীক আজও দেশের জাতীয় পতাকায় জায়গা পেয়েছে। এটি শোনা ধর্মবিশ্বাসে পূর্বপুরুষের আত্মা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের প্রতীক। এছাড়াও পাওয়া গেছে পাথরের টোটেম, উৎসর্গের নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক উপাদানের পূজা সংক্রান্ত প্রতীক। এসব ইঙ্গিত দেয় এক পল্লীভিত্তিক, আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজের।

উনবিংশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা যখন প্রথম এই ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে, তখন তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে: “এত উন্নত স্থাপত্য কোনও আফ্রিকান বানাতে পারে না।” তারা দাবি করে বসে যে, এটি বাইবেলীয় রাজা সলোমনের লোকজন, ফিনিশীয় বা আরবদের তৈরি। এই চিন্তা ছিল স্পষ্টভাবে বর্ণবাদী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ব্রিটিশ খননকার্য পরিচালিত হয় “আফ্রিকান অবদান মুছে ফেলার” উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে ২০শ শতকের প্রত্নতত্ত্ববিদ Gertrude Caton-Thompson এবং অন্যান্য গবেষকেরা প্রমাণ করেন এই নিদর্শন শতভাগ আফ্রিকান শোনা জনগোষ্ঠীর হাতে গড়া।

জিম্বাবুয়ে ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন রাষ্ট্রের নাম দেয় এই প্রাচীন নগরের নামে “জিম্বাবুয়ে”, যা ছিল সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রতীকী পদক্ষেপ। পতাকায় ব্যবহৃত জিম্বাবুয়ে বার্ড এবং জাতীয় সংগীতে এই ঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি মেলে। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যা শুধুমাত্র প্রত্নতত্ত্বিক গুরুত্ব নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়।

গ্রেট জিম্বাবুয়ে আমাদের শেখায় ইতিহাস কেবল বিজয়ীর লেখা দলিল নয়, বরং বঞ্চিতদের গোপন কণ্ঠস্বরও। আফ্রিকার ইতিহাসকে অন্ধকার ও অসভ্যতা দিয়ে চিহ্নিত করাকে চ্যালেঞ্জ করে এই ধ্বংসাবশেষ।

গ্রেট জিম্বাবুয়ে ধ্বংসাবশেষ এক নীরব কিন্তু দৃঢ় দলিল যে একদা আফ্রিকা ছিল সভ্য, সৃজনশীল এবং বিশ্ব-সংযুক্ত। এটি কেবল প্রাচীন এক নগরের ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, স্থাপত্যশিল্প, অর্থনীতি এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক সংহত প্রতিচ্ছবি।

ইরান-ইসরাইল : নেতানিয়াহু যে কারণে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পেছনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে একাধিক কারণ ছিল। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তাদের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। এর সাথে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড চাপ, কৌশলগত কারণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিমা শাইন বলেন, ইসরায়েলি সমরবিদরা শুরু থেকেই একটি স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর আঘাত হানা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানো নয়।

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল প্রায় দুই সপ্তাহের একটি সংক্ষিপ্ত অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। যুদ্ধবিরতি হয়েছে ১২ দিনের মাথায়, পরিকল্পনার চেয়ে কিছুটা আগেই।’

ইসরায়েলের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছেন, ইসরায়েল ধারণা করেছিল অভিযানের শুরুতেই ইরান সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, কিন্তু পতন হবে না। তাই পারমাণবিক কর্মসূচির যতটা সম্ভব ক্ষতি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যখন বোঝা গেল এর চেয়ে বেশি কিছু অর্জন সম্ভব নয়, তখন ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়ে যায়।

সিমা শাইন বলেন, যদিও ইসরায়েল আগে থেকেই অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা করে রেখেছিল, কিন্তু যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তটি যে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপেই নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে দ্রুত দেশটির সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া এবং সংঘাত যেন আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয় তা নিশ্চিত করা। তাই হামলার পরপরই যুদ্ধবিরতির আলোচনা জরুরি ছিল। নেতানিয়াহুর পক্ষে মার্কিন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা কঠিন ছিল।

যুদ্ধের পর নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। তবে এই জনসমর্থন দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারতো।

নেতানিয়াহু সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, জনসমর্থন থাকতে থাকতেই যুদ্ধ শেষ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে সমর্থন কমার ঝুঁকি ছিল। যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘মারিভ’ জানিয়েছে, নেতানিয়াহু তার ‘মি সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে আগাম নির্বাচনের কথা ভাবছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইসরায়েল এখন হামাসের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইবে। ইরান দুর্বল হয়ে পড়ায় হামাসকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে পারবে না। এতে হামাস আরও দুর্বল হবে। আমেরিকার পাশাপাশি কাতার ও মিশরও হামাসের সঙ্গে চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।