একটা অদ্ভুত অনুভূতি মিলিয়ে দেখুন, যখন আপনি চারপাশে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন কিছুই ঠিক নেই, সমাজের কাঠামো, রাষ্ট্রের নীতি, গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, এমনকি মৌলিক মানবিক সম্পর্কগুলোতে ধস নেমেছে। অথচ আশপাশের মানুষগুলো ঠিকই স্বাভাবিক আচরণ করছে, মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি। আপনি যদি কখনও এমন কিছু অনুভব করে থাকেন, তাহলে হয়তো আপনি “হাইপারনরমালাইজেশন” নামক একটি ধারণার সীমানায় দাঁড়িয়ে আছেন।
এই শব্দটা প্রথম জনপ্রিয় হয় ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা Adam Curtis এর ২০১৬ সালের একটি তথ্যচিত্র থেকে। তবে এর উৎপত্তি আরও পুরোনো, সোভিয়েত আমলে সমাজবিজ্ঞানীরা এটি ব্যবহার করেছিলেন সেই সমাজব্যবস্থার জন্য, যেখানে বাস্তবতা ও প্রপাগান্ডার মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, মানুষ জানত সব মিথ্যে, কিন্তু সেই মিথ্যেতেই তারা বেঁচে ছিল। ঠিক এই জায়গা থেকেই হাইপারনরমালাইজেশন।
যখন সব ভেঙে যাচ্ছে তখনও আমরা স্বাভাবিক অভিনয় কেন করি?
ডিজিটাল নৃতত্ত্ববিদ Rahaf Harfoush ব্যাখ্যা করেন “আপনি যে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছেন, তা হলো একদিকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন সিস্টেমগুলো কাজ করছে না। অন্যদিকে ক্ষমতাবানরা ও প্রতিষ্ঠানগুলো এমন অভিনয় করছে যেন সব ঠিকঠাক চলছে।” এটা কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। এই ধরনের পরিবেশে মানুষ নিজেদের মানিয়ে নেয়, যেন dysfunction-ই নতুন স্বাবাভিকতা।
এটি শুধু পশ্চিমা বিশ্বের বাস্তবতা নয়। বাংলাদেশেও কি আমরা রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, দুর্বল গণতন্ত্র, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিংবা শিক্ষাক্ষয়ের মধ্যে দিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি না?
হাইপারনরমালাইজেশনের উপসর্গগুলো কী?
ভাঙা প্রতিষ্ঠান – গণতন্ত্র, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায়বিচার—সবই মুখে আছে, কার্যত দুর্বল। সহানুভূতির অবসান – কোনো বড় অমানবিক ঘটনা ঘটলেও মানুষ তেমন করে প্রতিক্রিয়া জানায় না। অবসন্ন নাগরিকত্ব – মানুষ ভাবে, “আমি তো একা কিছু করতে পারি না, তাই আর ভেবেও কি হবে!।” ভুল বাস্তবতার সংস্কৃতি – মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এত তথ্য মিশে যায় যে, সত্য-মিথ্যার সীমা মুছে যায়। ব্যক্তিগত শান্তির ভান – চারপাশে আগুন, কিন্তু আমি যদি আমার ছোট জগতে ঠিক থাকি তাহলে সেটাই যথেষ্ট।
বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি আর টেকনোলজি হাত ধরাধরি করে চলছে। মার্কিন প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে টেক বিলিয়নিয়ররা, যেমন এলন মাস্ক বা মার্ক জাকারবার্গ, সরকারকে কখনও চ্যালেঞ্জ করছে না বরং তথ্য প্রবাহ ও সচেতনতার রাশ নিজেদের হাতে নিয়ে নিচ্ছে। এমত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই একটি ভুয়া স্বাভাবিকতার জালে আটকে যায়। সে জানে কিছু ঠিক চলছে না, কিন্তু তার ভাষা নেই এটা ব্যাখ্যার।হাইপারনরমালাইজেশন সেই ভাষাটুকু দেয়।
এই মনস্তত্ত্বের ফলাফল কী?
আমরা যখন বুঝি কিছু ঠিক চলছে না, কিন্তু প্রতিবাদ করি না তখন আমরা ব্যক্তিগতভাবে মানিয়ে নিতে শিখি। কিন্তু সমাজ তখন চেতনাহীন পতনের দিকে এগোতে থাকে। ধীরে ধীরে অন্যায় স্বাভাবিক হয়, দুর্নীতি টেকসই হয়, গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।মানুষ নিজেকে বাঁচাতে গা বাঁচিয়ে চলে, দায়িত্ব এড়ায়। এই মনোভাব সামষ্টিক সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি করে, যা বাস্তব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাধা।
ভুয়া স্বাভাবিকতা ভাঙার সময় এখনই। হাইপারনরমালাইজেশন আমাদের কণ্ঠরোধ করে রাখে, আমরা হয় মৌন থাকি, নয়তো স্বপ্নবিলাসী হয়ে উঠি। কিন্তু মিনিংফুল পরিবর্তনের জন্য দরকার collective awakening, যেটা Rahaf Harfoush এর ভাষায়, “একসাথে জেগে ওঠা”। এখন সময় এসেছে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করার, আমরা কি সত্যিই ঠিক আছি? আমাদের চারপাশে যা ঘটছে, তা কি বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে? সমাজে যখন মিথ্যা এতটাই বড় হয়ে যায় যে, সবাই তাতেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়, তখন থেকে নেমে আসে সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়।


