Home Blog Page 64

নিরোর জীবন ষড়যন্ত্র ও ইতিহাস

সম্রাট নিরো রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে কুখ্যাত শাসক, যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে অগ্নিকাণ্ড, নিষ্ঠুরতা আর রক্তপাতের ছবি। কিন্তু ৬৮ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয় এক গভীর রহস্য, যা শতাব্দী জুড়ে মানুষকে ভাবিয়েছে ” নিরো কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?” এই প্রশ্নের উত্তরে জন্ম নেয় অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যার কিছু অংশ আজও গবেষকদের আলোচনার বিষয়।

খ্রিস্টাব্দ ৬৮। নিরোর বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেনেট তাকে “রাষ্ট্রশত্রু” ঘোষণা করে। সৈন্যরা এগিয়ে আসছে গ্রেপ্তার করতে। কিছু বিশ্বস্ত দাসের সঙ্গে আত্মগোপনে নিরো পালিয়ে যান এক পরিত্যক্ত বাড়িতে।

বলা হয়, শেষ মুহূর্তে সৈন্যদের পায়ের শব্দ শুনে, নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দেন তিনি। সেই সময় তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে বিখ্যাত বাক্য— “Qualis artifex pereo!” (“কি মহান শিল্পী হয়ে আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম!”) তবে প্রশ্ন থেকেই যায় এই মৃত্যু কি সত্যিই হয়েছিল? নিরোর মৃতদেহ জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কেউ নিশ্চিত করে বলেনি যে তাকে কবর দেওয়া হয়েছিল। অথচ রোমান রীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহীদের মরদেহ জনতার সামনে এনে অপমান করা হতো। কিন্তু নিরোর ক্ষেত্রে যেন সবকিছু ছায়ার নিচে ঢাকা।

নিরোর কথিত মৃত্যুর পরে, ইতিহাসে অন্তত তিনজন Pseudonero-এর খোঁজ পাওয়া যায়, তারা সবাই নিজেকে আসল নিরো দাবি করেছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ছিল এক ব্যক্তি, যিনি পার্থিয়ায় উপস্থিত হন। চেহারা, হাবভাব, বাদ্যযন্ত্র বাজানো সবই ছিল নিরোর মতো। তিনি ঘোষণা দেন—“আমি নিরো, রোম আমাকে মেরে ফেলতে পারেনি, আমি ফিরছি।”

পার্থিয়ার রাজাও প্রথমদিকে তাকে সমর্থন করেন। রোমের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক হুমকি। কারণ একজন মৃত সম্রাটের নামে যদি বিদ্রোহ গড়ে ওঠে, তাহলে মৃত্যুর ভয়ই বৃথা। এমনকি ২০ বছর পরেও যখন কেউ নিজেকে নিরো বলে দাবি করত, তখনও হাজার হাজার মানুষ তার পক্ষে জড়ো হতো। প্রশ্ন ওঠে একজন “মৃত” সম্রাট এত প্রভাব কীভাবে রেখে যায়?

প্রথম শতাব্দীর খ্রিস্টানরা নিরোকে একটি জীবন্ত অভিশাপের মতো মনে করত। খ্রিস্টান নিধনের জন্য তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। আর তাই, নিরো মারা গেলেও তাদের বিশ্বাস ছিল সে আবার ফিরে আসবে।

এই বিশ্বাসকে বলা হয় Nero Redivivus Legend। বাইবেলের “Book of Revelation”-এ এক রহস্যময় “বিস্ট”-এর কথা বলা হয়েছে যার মাথা কাটা হয়েছে, তবুও সে বেঁচে উঠবে। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি নিরোর প্রতীকী রূপ। খ্রিস্টান সমাজ ভাবত, নিরোই সেই “অ্যান্টিক্রাইস্ট” যে একদিন পৃথিবী ধ্বংস করতে ফিরবে। এই কিংবদন্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এখনও খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে নিরো একটি অশুভ প্রতীক হিসেবেই টিকে আছে।

নিরো ছিলেন আত্মপ্রেমে ডুবে থাকা এক রোমান সম্রাট। তিনি গান গাইতেন, থিয়েটারে অভিনয় করতেন, এমনকি নিজের অভিনয়ের জন্যই দর্শকদের জোর করে বসিয়ে রাখতেন। তিনি ছিলেন নিজের জীবনেরই নাট্যকার। তাহলে কি এটা খুব অবাক করার মতো যে তিনি নিজের মৃত্যুকেও একটা নাটক বানিয়েছিলেন? সৈন্যদের আসার আগেই আত্মগোপন করা। মৃতদেহের অনুপস্থিতি। গুজব ছড়ানো যে তিনি জীবিত।সব মিলিয়ে অনেক ইতিহাসবিদই বলেন নিরোর মৃত্যু ছিল তার জীবনের সর্বশেষ মঞ্চস্থ নাটক।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে Postmortem Mythmaking হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আবার কেউ বলেন, এই গুজব ছিল রাজনৈতিক অস্ত্র রোমের শাসকরা চেয়েছিল নিরোর নামেই মানুষকে ভয় দেখাতে। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত সত্য হলো ভয়ের রাজা কখনও সহজে মরে না। তার মৃত্যু যত রহস্যময় হয়, গুজব তত শক্তিশালী হয়।

আজও কেউ কেউ বলেন, নিরো মরেনি। সে হয়তো পার্থিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। হয়তো সে এক সন্ধ্যায় বাঁশি বাজিয়ে বসে ছিল ইরানের কোনো পাহাড়ি গ্রামের গুহায়। হয়তো এখনো, ইতিহাসের অন্ধকার কোনো করিডোরে নিরো বেঁচে আছে।

আইএমএফের বিবৃতি : যে ৪টি কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভুগছে

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ ৪ কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো খারাপ অবস্থায় আছে বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অন্য তিনটি কারণ হলো কঠোর আর্থিক ও রাজস্ব নীতির প্রভাব, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে অব্যাহত চাপ। আইএমএফের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে চলমান ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি থেকে দুই কিস্তির ১৩৭ কোটি মার্কিন ডলার একসঙ্গে পাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামীকাল ২৬ জুন বাংলাদেশের হিসাবে এ অর্থ জমা হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফ আরও বলেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আগের সরকারের পতন হয়। তখন সামষ্টিক অর্থনীতি আরও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা উদ্যোগে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়; যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আইএমএফ কর্মসূচির অধীন তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের পর্যালোচনায় বাংলাদেশের পারফরম্যান্স মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্প্রতি বিনিময় হার আরও নমনীয় করার পাশাপাশি কর রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে।

আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩.৮% হতে পারে। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৫.৪% হবে।

এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিও আগামী অর্থবছরে কিছুটা সহনীয় হবে। আইএমএফের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৬.২%-তে নেমে আসতে পারে। চলতি অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯.৯% হওয়ার কথা বলেছে আইএমএফ।

আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধরনের সামষ্টিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। কঠোর মুদ্রানীতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নীতিমালার সমন্বয়, নমনীয় বিনিময় হার এবং রাজস্ব ঘাটতি হ্রাস—এই তিনটি মিলেই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাতে ভারসাম্য স্থাপনে সহায়ক হবে বলে মনে করে আইএমএফ।

পৃথিবীর গল্প নিয়ে মহাশূন্যে ভয়েজার ১ ও ২ এর রোমাঞ্চকর অভিযানের ৪৫ বছর

১৯৭৭ সালে নাসা (NASA) পৃথিবী থেকে দুইটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল—ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। সেসব যন্ত্রপাতি ছিল আমাদের সৌরজগতের গভীরে প্রবেশের সাহসী অন্বেষণ। আজ প্রায় আধা শতাব্দী পরও তারা কোটি কোটি মাইল পেরিয়ে মহাবিশ্বের অজানা গহ্বরে পা বাড়িয়ে চলছে।

১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে নাসা উপলব্ধি করেছিল, ১২ বছর পর গ্রহগুলোর অবস্থান এমন হবে যে তারা সৌরজগতের বৃহৎ গ্রহগুলোকে পরপর পরিদর্শনের উপযুক্ত কক্ষপথে থাকবে। এটি ছিল একটি বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সুযোগ, যা সর্বশেষ পাওয়া যায় প্রায় ১৭৬ বছরে একবার। এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভয়েজার মিশন পরিকল্পনা করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহগুলোকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা।

এই প্রকল্পের আগের অংশ ছিল ‘পায়োনিয়ার’ মহাকাশযানগুলি, কিন্তু ভয়েজার ছিল অধিক শক্তিশালী, আধুনিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। শুধু গ্রহের ছবি তোলা নয়, তাদের বায়ুমণ্ডল, চুম্বকীয় ক্ষেত্র, উপগ্রহ ও রশ্মি সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

ভয়েজার মহাকাশযান দুটি ডিজাইন করা হয়েছিল ১২ বছর ধরে কাজ করার জন্য, কিন্তু তারা আজ ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এটি মূলত তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তি ব্যবস্থার কারণে সম্ভব হয়েছে।

তাদের শক্তি সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয় “রেডিওআইসোটোপ থার্মাল জেনারেটর” (RTG) — যা নিউক্লিয়ার বিকিরণ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এই শক্তি সরবরাহ তাদের অনবরত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি চালিয়ে দেয়। তাছাড়া তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত। তারা পৃথিবীর সাথে দুরদূরান্ত থেকে সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। এর জন্য নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (Deep Space Network) ব্যবহার করা হয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বৃহৎ ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে সংকেত গ্রহণ করে।

মজার দিক হলো, এই ভয়েজার মহাকাশযানগুলোর প্রযুক্তি আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগের! তাদের মেমরি মাত্র ৪ মেগাবাইট, যা আজকের স্মার্টফোনের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। তবু এত সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি দিয়েই তারা আজও চালু আছে। মাঝে মাঝে সংকেত বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা যন্ত্রাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে সমস্যাও হতো, কিন্তু তারা নিজেই পুনরায় চালু হয়ে যায়— যেন একরকম ‘নিজেই জীবন ফিরে পাওয়া’!

আরেক মজার ব্যাপার হলো, এত বছর কেটে গেলেও তারা সূর্য থেকে মাত্র এক ‘লাইট-ডে’ দূরত্ব পেরিয়েছে, অথচ আমাদের কাছের নিকটতম তারকা প্রায় ৪ লাইট-ইয়ার দূরে! অর্থাৎ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মহাবিশ্বের বিস্তার আমাদের সামনে এক অসীম রহস্যই থেকে যায়। এসব তথ্য মহাকাশের রহস্য আর মানুষের সীমাবদ্ধতার মজার মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।

ভয়েজার ২ ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট পৃথিবী থেকে রওনা হয় এবং ভয়েজার ১ ৫ সেপ্টেম্বর। যদিও ভয়েজার ১ পরে পাঠানো হয়, এটি সৌরজগতের বাহিরে ভয়েজার ২-কে ছাড়িয়ে গেছে কারণ এটি একটি দ্রুত গতিতে রওনা হয়েছিল।

প্রথম গন্তব্য ছিল বৃহস্পতি। ১৯৭৯ সালে, তারা বৃহস্পতির কাছে পৌঁছে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। বৃহস্পতির বিশাল ঘূর্ণায়মান বায়ুমণ্ডল, তার বিশাল লাল লোমকূপ এবং চারটি প্রধান উপগ্রহ আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টো— এর অজানা তথ্য ভয়েজার থেকে এসেছে।

এরপর তারা শনি গ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করে, যেখানে তাদের ক্যাসিনি মহাকাশযানের পূর্বসূরী হিসেবে কাজ করেছিল। শনির অমর্যাদিত রিং সিস্টেম, তার উপগ্রহ টাইটান এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে অজানা অনেক তথ্য এই মহাকাশযান থেকে পাওয়া গেছে।

ভয়েজার ২ এর পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইউরেনাস এবং নেপচুন। এটি ছিল প্রথম ও একমাত্র মহাকাশযান যা এই দুই গ্রহের কাছে পৌঁছেছে।ইউরেনাস ও নেপচুন সম্পর্কে আমাদের বর্তমান জ্ঞান প্রায় পুরোপুরি ভয়েজারের আবিষ্কৃত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।

ভয়েজারের অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের বহনকৃত “গোল্ডেন রেকর্ড”। এটি একটি সোনালী-তামার ডিস্ক, যার মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় নমস্কার, বিভিন্ন দেশের গান, প্রাণী ও প্রকৃতির শব্দ, মানুষের ছবি ও তথ্য সংরক্ষিত। ভাবনা ছিল যদি মহাবিশ্বে অন্য বুদ্ধিমান সভ্যতা এই মহাকাশযান পায়, তাহলে তারা মানব সভ্যতার সম্পর্কে ধারণা পাবে।

এই গোল্ডেন রেকর্ড মানবজাতির ঐতিহাসিক এক ডিজিটাল টাইম ক্যাপসুল। এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির এক মহাকাশিক প্রতীক, যে আমরা কেবল আমাদের পৃথিবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নই, বরং মহাবিশ্বের এক অঙ্গ। বর্তমানে ভয়েজার ১ এবং ২ উভয়ই সৌরজগতের বাইরে, ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করেছে। পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছে— ভয়েজার ১ এর দূরত্ব প্রায় ১৬ বিলিয়ন কিলোমিটার (প্রায় ১০০ বিলিয়ন মাইল)। তারা এখনও সংকেত পাঠাচ্ছে, যদিও সংকেতগুলো পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো।তাদের যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে পুরোনো হচ্ছে এবং শক্তি সংকটের কারণে নাসা কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করেছে। তবে অন্তত ২০২৫ সাল পর্যন্ত তারা তথ্য পাঠানো চালিয়ে যাবে বলে আশা করা হয়। ভয়েজার মিশন আমাদের জন্য শুধুমাত্র সৌরজগতের রহস্য উন্মোচন করেনি বরং মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহলের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই যাত্রা আমাদের শেখায় জ্ঞানের জন্য মানুষের এক অনন্ত যাত্রা কখনো থামে না।

সংস্কার সংলাপ : সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রাখতে অনড় বিএনপি

0

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমলে মেয়াদ নির্ধারণে রাজি নয় বিএনপি। দলটি জানিয়েছে, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকলে তবেই ‘১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না’– এ প্রস্তাব মানবে তারা।

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনে বিএনপির ঘোর আপত্তি থাকায় নতুন প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ গঠনেও সায় দেয়নি বিএনপি।

দলটির ভাষ্য, এনসিসি এবং নিয়োগ কমিটি একই ধরনের। এ ধরনের পর্ষদ হলে নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ক্ষমতা কমবে; তাহলে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ নির্ধারণে রাজি হবে না।

গতকালের সংলাপে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান নিয়োগ কমিটির হাতে থাকবে না। সংসদ ভেঙে গেলে কমিটিও বিলুপ্ত হবে।

প্রস্তাব করা হয়– প্রধানমন্ত্রী, সংসদের উভয় কক্ষের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রধান বিরোধী দল বাদে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা অন্য দল থেকে একজন এমপি, রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি হবেন কমিটির সদস্য। ৭ সদস্যের এ কমিটির মাধ্যমে ইসি, দুদক, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয় (সিএজি), মানবাধিকার কমিশন এবং প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে হয়। প্রস্তাবিত ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ গঠন করা হলে সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমবে ও ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে বলা হচ্ছে।

সরকারি দল, বিরোধী দলসহ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নিয়োগ করা হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এক ব্যক্তি বা এক দলের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার একটা বড় দুর্বলতা হলো এখানে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কমিশনগুলোকে অতীতে দলীয়করণ করা হয়েছে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আজকের রাজনৈতিক দলগুলো এই কমিশনগুলোর বিদ্যমান আইন নিয়ে বিরোধিতা করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ করবে বলে বলেছিল।

প্রতিদিন এক হাজার মিলিয়নেয়ার বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে

২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্তরাষ্ট্রে যুক্ত হয়েছেন, এ সংখ্যা বছরে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৯ হাজার।সুইস ব্যাংক ইউবিএস-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই বৃদ্ধির ফলে বছরের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে মোট মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখে। এটি আগের বছরের তুলনায় ১.৫ শতাংশ বেশি।

মিলিয়নেয়ার বৃদ্ধির পেছনে কী ছিল যুক্তরাষ্ট্রে?

যুক্তরাষ্ট্রে এই সম্পদ বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি ছিল ওয়াল স্ট্রিটের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ও ডলারের স্থিতিশীলতা। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০২৫ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ইউবিএস-এর অর্থনীতিবিদ জেমস মাজো বলেন, “চলতি বছরে সম্পদ বৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হতে পারে, তবে তা বন্ধ হয়ে যাবে এমনটা নয়। দুর্বল ডলার অনেক দেশের সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।”

মিলিয়নেয়ার সংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন, যেখানে ২০২৪ সালে মিলিয়নেয়ার বেড়েছে ২.৩ শতাংশ হারে, মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ লাখে। এক বছরে চীনে নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার। তবে সবচেয়ে দ্রুত হারে মিলিয়নেয়ার বৃদ্ধি পেয়েছে তুরস্কে, প্রায় ৮.৪ শতাংশ। দেশটিতে এখন ৮৭ হাজার মিলিয়নেয়ার।

মিলিয়নেয়ার মানচিত্রে ইউরোপের দখল

বিশ্বে মোট মিলিয়নেয়ারের ৪০ শতাংশ বসবাস করেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ধনসম্পদের ঘনত্বের বিচারে লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ড শীর্ষে, এ দুই দেশে প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্কের একজনের সম্পদ ১০ লাখ ডলার বা তার বেশি।

ইউবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে মিলিয়নেয়ার বেড়েছে ৬৮ লাখ ৪ হাজার, ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে আবাসন খাতে মূল্যবৃদ্ধি।

তবে এই প্রবৃদ্ধি সমানভাবে হয়নি, যেমন জাপানে জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে ৩৩ হাজার মিলিয়নেয়ার কমেছে। ২০২৪ সালে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ২৮৯১ জনে। জরিপ অনুযায়ী, ৫৬টি বাজারের মধ্যে ১৫টিতে বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ কমেছে, এর মধ্যে নেদারল্যান্ডস ও উরুগুয়ে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, কাতার, গ্রিস ও পোল্যান্ডে সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে এই প্রায় ৬ কোটি ধনী ব্যক্তি মালিক ২২৬.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের, যা বৈশ্বিক সম্পদের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে ২৮৬০ জন বিলিয়নেয়ারের সম্মিলিত সম্পদ ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে ধনী মাত্র ১৫ জন ‘সেন্টিবিলিয়নেয়ার’ (১০০ বিলিয়নের বেশি সম্পদধারী), যাঁদের হাতে রয়েছে মোট ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

প্রযুক্তি খাত এবং মেগা টেক উদ্যোক্তাদের উত্থানই এই ধনসম্পদের কেন্দ্রিকতা তৈরির প্রধান কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। প্রতিবেদনে ‘এভরিডে মিলিয়নেয়ার’ এক বিশেষ শ্রেণির কথা বলা হয়েছে, যাঁদের সম্পদ ১০-৫০ লাখ ডলারের মধ্যে।এদের সংখ্যা ২০০০ সালের তুলনায় চারগুণ বেড়ে এখন প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ এবং এদের সম্মিলিত সম্পদ বিশ্বের সব বিলিয়নেয়ারের চেয়ে বেশি।

মিরর নিউরন, বিবর্তন ও সহানুভূতির বিজ্ঞান

একবার ভাবুন, আপনি হঠাৎ কারো হাই তুলতে দেখলেন আর সঙ্গে সঙ্গে আপনারও হাই উঠলো। কখনো খেয়াল করেছেন, কাউকে কাঁদতে দেখলে আপনার বুকটাও ভারী হয়ে আসে? আবার হয়তো কাউকে খুশিতে নাচতে দেখে আপনার শরীরেও একটা নাচার ভাব চলে আসে। কেন এমন হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার মস্তিষ্কের এক আশ্চর্য জিনিসে, সেটির নাম মিরর নিউরন।

‘মিরর’ মানে আয়না। আর ‘নিউরন’ হলো মস্তিষ্কের কোষ, যেগুলো দিয়ে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণ পরিচালিত হয়। এখন কল্পনা করুন, মস্তিষ্কে এমন কিছু নিউরন আছে, যেগুলো তখনই সক্রিয় হয় যখন আপনি কোনো কাজ করছেন অথবা অন্য কাউকে সেই কাজ করতে দেখছেন। ধরুন আপনি দেখলেন কেউ চোখে পানি নিয়ে কাঁদছে। আপনি নিজে কাঁদছেন না, তবুও আপনার মনের ভেতর একটা আবেগ জাগে। এই আবেগ, এই অনুভব করা’র পেছনে কাজ করছে সেই মিরর নিউরন।

কীভাবে এই নিউরন আবিষ্কার হলো?

এই নিউরনের রহস্য প্রথম আবিষ্কার হয় ১৯৯০-এর দশকে ইতালির এক গবেষণাগারে। সেখানকার বিজ্ঞানী জ্যাকোমো রিজোলাত্তি (Giacomo Rizzolatti) ও তাঁর দল এক বাঁদরের ওপর গবেষণা করছিলেন। বাঁদরটি যখন একটি কলা ধরল, তখন তার মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে (Premotor cortex) নিউরন সক্রিয় হয়ে উঠল। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, বাঁদরটি যখন অন্য কাউকে সেই কলা ধরতে দেখল, তখনও একই নিউরন সক্রিয় হলো!

এতদিন নিউরন মানেই ছিল নিজের কাজে সক্রিয় হওয়া কোষ। কিন্তু এখন দেখা গেল, অন্যের কাজ দেখেও নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে যেন নিজের কাজই করছে! এই নিউরনকেই বলা হলো “Mirror Neurons”।

মানুষের মস্তিষ্কে এই মিরর নিউরনগুলো প্রধানত দেখা যায় তিনটি অংশে, Premotor cortex —এ, চলাফেরার পরিকল্পনায় কাজ করে। Inferior frontal gyrus (Broca’s area) ভাষা ও আবেগ বোঝায় সহায়ক। Inferior parietal lobule শরীরের অঙ্গের অনুকরণ ও স্থানজ্ঞান পরিচালনায় যুক্ত। এই অঞ্চলগুলো মিলে তৈরি করে Mirror Neuron System (MNS), যা মানুষের শেখা, অনুভব ও সংবেদনশীল আচরণ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

যখন আমরা কাউকে আঘাত পেতে দেখি, কিংবা কষ্ট পেতে দেখি, তখন আমরা সেই কষ্ট অনুভব করতে পারি। এটাকে বলে Empathy বা সহানুভূতি। এই সহানুভূতির জৈব ভিত্তি হল মিরর নিউরন। এর কারণেই আমরা অন্যের চোখ দিয়ে অনুভব করতে শিখি।

আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ছোট শিশুরা বড়দের মুখভঙ্গি, হাঁটা, হাসি সবকিছু অনুকরণ করে শেখে। কারণ তারা নিজের কাজ করার আগে অন্যকে দেখে দেখে শিখে নিচ্ছে। মিরর নিউরন তাদের শেখায়, “দেখো আর করো।”

গবেষকরা মনে করেন, ভাষা শেখার আগেও আমরা মুখের ভঙ্গি দেখে শেখা শুরু করি। শিশুরা শব্দ উচ্চারণ শেখার আগেই ঠোঁট কেমন নড়ে, চোয়াল কেমন চলে তা অনুকরণ করতে শেখে মিরর নিউরনের সাহায্যে।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, Autism Spectrum Disorder (ASD) থাকা অনেক শিশুর মধ্যে এই মিরর নিউরন সিস্টেমের কাজ কম হয়। তাই তারা অন্যের অনুভূতি বুঝতে, চোখে চোখ রাখতে বা অনুকরণ করতে সমস্যায় পড়ে। যদিও এটি এখনো সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়, তবু এটি এক শক্তিশালী থিওরি।

আজকাল অনেক থেরাপিস্ট মিরর নিউরন ধারণা ব্যবহার করছেন, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত রোগী আয়নায় নিজের অঙ্গ দেখে অনুকরণ করে নড়াচড়া শেখেন। Role-modeling therapy-তে শিশুকে আচরণ শেখাতে সামনে কেউ করে দেখায়। Empathy training-এ সহানুভূতির দক্ষতা বাড়াতে নাটক বা মাইমের মাধ্যমে অন্যের অবস্থান অনুধাবনের চর্চা

সমালোচনা কী বলছে?

এ নিয়ে সব গবেষক কিন্তু একমত নন। কেউ কেউ বলেন, “মিরর নিউরনের কাজকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আবেগ ও সমাজবোধ শুধু এই নিউরনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।” আবার কেউ বলেন, “এটা শুরু মাত্র। আমরা এখনো এর পুরোটাই বুঝতে পারিনি।” তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মিরর নিউরন মানবিক আচরণ বোঝার একটা দরজা খুলে দিয়েছে।

আমরা আসলে একে অপরকে কেবল দেখি না, অনুভবও করি। আমরা শুধু ব্যক্তি নই, আমরাই সামাজিক সত্তা। একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনকে স্পর্শ করে। এটা কেবল আবেগ নয়, নিউরোসায়েন্স। আর সেই বিজ্ঞান বলে, আপনি যখন অন্যকে অনুভব করেন, তখন আপনার মস্তিষ্কও সেই কাজ করছে। এ যেন এক অদৃশ্য আয়না। যেখানে আমি, আপনি, আমরা সবাই একে অপরের প্রতিবিম্ব।

রোহিঙ্গা শিবিরে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা মদত দিচ্ছে অভিযোগ – আরাকান আর্মির

0

ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ (আইসিজি) গত বুধবার ‘রোহিঙ্গা বিদ্রোহের ঝুঁকি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং ছয় মাস ধরে দূর থেকে পরিচালিত সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, বাংলাদেশে শরণার্থীশিবিরের চলমান অবস্থা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশঙ্কা ও সুযোগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ, আরাকান আর্মিসহ সব পক্ষের জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয় — বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ১০ লাখের বেশি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে এখন কার্যত আরাকান আর্মির শাসন চলছে। প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এখন রাখাইন রাজ্যে জরুরি পণ্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, ত্রাণ বিতরণেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রাখাইনে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ব্যাংকব্যবস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে আরাকান আর্মির কাছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কক্সবাজারের বিস্তৃত শরণার্থীশিবিরগুলোয় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ), রোহিঙ্গা ইসলামিক মহাজ, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি এবং মুন্নাহ গ্রুপের মতো কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন ও অপরাধী চক্র সক্রিয়।

২০২৪ সালের শুরুতে আরাকান আর্মি রাখাইনের রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। সে সময় রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় ।সেই সময়ে আরসা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ওই সময় আরও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যাদের বেশির ভাগই আসে গত বছর।

ভূ-উপগ্রহের তথ্যানুযায়ী, সে সময় রোহিঙ্গাদের ৩০টির বেশি গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। এ জন্য আরাকান আর্মির সেনাদের দায়ী করে রোহিঙ্গারা। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক গুরুতর চাপের মুখে পড়ে। ধারণা করা হয়, এখনো প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছে, যাদের বেশির ভাগই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় রয়েছে।

রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভেতর ক্ষোভ ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়তে থাকে। একটি স্বতন্ত্র রোহিঙ্গা স্বদেশ গঠনের লক্ষ্যে শরণার্থীশিবিরে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে।ফলে শরণার্থীশিবিরগুলো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নতুন সদস্য সংগ্রহের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি আরাকান আর্মির ওপর হামলার পরিকল্পনাও করছে বলে আইসিজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আরসা ইতিমধ্যে উত্তর রাখাইনে হামলা চালানো শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে এবং সম্প্রতি আরাকান আর্মির যোদ্ধাদের ওপরও তারা হামলা চালিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে শরণার্থীশিবিরগুলো ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় যা ঘটছে, সেখানে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কিছুটা সহায়তা পাচ্ছে। কক্সবাজারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শরণার্থীশিবিরগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে।

রাখাইনে আরাকান বাহিনীর উত্থানের পর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের পথ ছেড়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা চুক্তির কৃতিত্ব দাবি করে ডিজিএফআই। সংস্থাটি এর নাম দিয়েছে ‘মিশন হারমনি’ এবং তাদের ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে দিল মোহাম্মদকে বিশ্বের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশি কর্মকর্তারা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সমর্থন নেই। তবে সাবেক একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বলেন, ‘এসব স্থানীয় পর্যায়ে ঘটে। আমি ২০০ শতাংশ নিশ্চিত, এটা সরকারি নীতি নয়।’

সীমান্তের দুই পাশে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পটভূমি প্রস্তুত করতে আরাকান আর্মির সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ত হওয়ার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। কারণ আরাকান আর্মি মনে করে বাংলাদেশ, বিশেষ করে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, তাদের (আরাকান আর্মি) প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

আরাকান আর্মির সামরিক শক্তি বিবেচনায়, রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংগ্রাম সফল হবে না; বরং আরও বিপর্যয়কর পরিণতি নেমে আসতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড রাখাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সাথে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সম্পর্ক, আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের চেষ্টা এবং মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্রাইসিস গ্রুপ সুপারিশ করেছে — রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সদস্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে শরণার্থীশিবিরগুলোয় সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি উসকানিমূলক যেসব ভাষণ দিচ্ছে এবং বিদ্রোহ দানা বাঁধার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ঢাকার উচিত আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া, যার মধ্যে জান্তা সরকারের অবরোধে সরবরাহ ঘাটতিতে পড়া রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রাখা।

চাঁদের বুড়ি থেকে ড্রিমটাইম, লোককথায় মহাবিশ্বের গল্প

যখন মানুষ রাতের আকাশের দিকে তাকায়, তার চোখে শুধু তারা নয়, গল্পও জ্বলে ওঠে। বিজ্ঞানের অনেক আগে থেকেই মানুষ আকাশ, তারার আলো ও অন্ধকার দিয়ে তৈরি করেছে নিজস্ব কল্পনার মহাবিশ্ব। এই ব্যাখ্যাগুলো শুধুই মজা বা রূপকথা নয় এগুলো ছিল সমাজের বিশ্বাস, চিন্তা ও মানসিক কাঠামোর প্রতিফলন। এই ব্যাখ্যাই হলো ফোকলোরিক কসমোলজি—যা বিজ্ঞানভিত্তিক নয়, বরং প্রতীক, মিথ ও লোকজ বোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক কল্পনাময় বিশ্বদর্শন।

বর্তমান যুগে আমরা জানি পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, নক্ষত্র হলো গ্যাসের বিশাল বল, আর মহাবিশ্ব বহুগুণ বড় ও বিস্তৃত।কিন্তু একসময় মানুষ এসব জানত না। তখন তারা আকাশকে ভাবত দেবতা, আদি আত্মা, বা পূর্বপুরুষদের আবাস হিসেবে। তারা বিশ্বাস করত, আকাশ একটি জীবন্ত সত্তা, যেখানে মানুষের জন্ম-মৃত্যুর পথ লুকিয়ে আছে। এইসব ভাবনা সমাজের চাহিদা ও কল্পনার উপযোগে গড়ে উঠেছে। যে সমাজ ভয় দেখিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চেয়েছে, সেখানে আকাশ ঈশ্বরের বিচারস্থল হয়েছে; যেখানে প্রেম ও মাতৃত্ব বড় ছিল, সেখানে আকাশ হয়েছে করুণাময়ী মায়ের প্রতীক।

বাংলা লোককথায় চাঁদে একজন বুড়ির বসবাস, যিনি ধান ভাঙেন। শিশুদের শোনানো হলেও, এই গল্পের ভেতরে রয়েছে সমাজ-ভাবনার সূক্ষ্ম প্রতিফলন। ধান ভাঙা এক নারীর চিত্র আসলে কৃষিভিত্তিক সমাজের চাঁদের প্রতি নির্ভরতার প্রতীক, কৃষি ঋতুর হিসাব চাঁদ দিয়ে করা হতো। একইসাথে চাঁদকে নারীত্ব, মাতৃত্ব এবং পুনর্জন্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই চাঁদের বুড়ি যেন আমাদের শস্য, মৃত্যু ও আলো ফেরার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় যার ছায়া পড়ে সংস্কৃতির গভীরে।

সাঁওতাল, গোঁদ বা মুন্ডা জাতিগোষ্ঠীর গল্পে আকাশ একটি তরল বা সজীব সত্তা, যেখানে পূর্বপুরুষেরা বাস করেন। তারা বিশ্বাস করে, আকাশে কিছু একদা উড়ে এসেছিল এবং মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল সেই ঐশ্বরিক আগমন থেকে। অস্ট্রেলীয় অ্যাবরিজিনদের “ড্রিমটাইম” ধারণা অনুযায়ী, আকাশ কেবল স্থান নয়, বরং সময় ও আত্মার স্মৃতি। ড্রিমটাইম হলো এক মহাকাশিক স্মৃতির অবস্থা, যেখানে দেবপ্রাণীরা এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছে। তারা বিশ্বাস করে, আকাশের তারা আসলে পূর্বপুরুষদের আত্মার আলোকছবি। এমন সমাজে, মহাকাশ মানে শুধু মহাবিশ্ব নয়, বরং সামাজিক উত্তরাধিকার, নৈতিক চেতনা এবং আধ্যাত্মিক উপস্থিতি।

অনেক আফ্রিকান সমাজে প্রচলিত আছে একসময় আকাশ এবং ঈশ্বরেরা পৃথিবীর খুব কাছে ছিল। কিন্তু মানুষের অহংকার বা লোভের কারণে ঈশ্বর দূরে চলে যান, আকাশ উঠে যায় ওপরে। এই ব্যাখ্যা বাস্তব জ্ঞান নয়, কিন্তু এক গভীর সামাজিক শিক্ষা আত্মসংযম না থাকলে, ঈশ্বর ও নৈতিকতা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এমন কসমোলজিগুলো মানুষকে নিজ আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করত, এইভাবে লোককথা হয়ে উঠত সমাজগঠনের এক অন্তর রূপরেখা।

উত্তর ইউরোপের নর্স মিথে মহাবিশ্ব গঠনের পেছনে ছিলো এক গা ছমছমে গল্প, দৈত্য ইমিরকে হত্যা করে দেবতারা তার খুলি দিয়ে আকাশ, রক্ত দিয়ে সমুদ্র, আর হাড় দিয়ে পাহাড় বানায়। এখানে ঈশ্বররা দয়ালু স্রষ্টা নয়, বরং যোদ্ধা, তাদের কাজ ধ্বংস করে নতুন সৃষ্টি আনা। সমাজে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক, জীবনকে যুদ্ধ, সংগ্রাম ও সাহসের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হতো।

চীনের প্রাচীন ফোকলোরে আকাশ এক ধরনের দ্য গ্রেট স্কাই ব্যুরোক্রেসি! সেখানে সূর্য, চাঁদ, তারা সবাই দায়িত্বশীল। মায়া সভ্যতা আকাশকে তিন স্তরে ভাগ করেছিল, উপরের আকাশ (ঈশ্বরদের), মধ্য পৃথিবী (মানুষদের), নিচের জগত (মৃত্যুর পর)। ইনকা সভ্যতায় চাঁদ ছিল নারীত্বের ঈশ্বরী, সূর্য ছিল রাজশক্তির উৎস। এইসব ফোকলোরিক কসমোলজি শুধু মহাবিশ্ব নয়, রাজনীতি, পরিবার ও জীবনের কাঠামোকেও গড়ে দিত।

আজ আমরা বিজ্ঞান দিয়ে সব ব্যাখ্যা করতে পারি। তবুও কেন আমরা প্রেমের কবিতায় ‘তারা’ দিই, কেন সিনেমায় মহাশূন্যে ‘ঈশ্বরের সিগন্যাল’ খুঁজি, কিংবা মৃত্যুর পরে আত্মার ‘আকাশে ওঠা’ বিশ্বাস করি? কারণ ফোকলোর কখনো মরে না। সমাজ বদলায়, কিন্তু মানুষের অন্তর্জগৎ, ভয়, বিস্ময় ও আত্মসন্ধান ঠিক আগের মতোই থাকে। তাই চাঁদের বুড়ি, ড্রিমটাইম বা ইমিরের গল্প সবই ফিরে আসে নতুন রূপে, সাহিত্যে, চিত্রকলায়, এমনকি বিজ্ঞানের কল্পনায়ও।

ফোকলোরিক কসমোলজি আমাদের শেখায়, আকাশ মানে শুধু নীল আচ্ছাদন নয়, এটি মানুষের ভেতরের কল্পনা, স্মৃতি, আত্মা ও সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে যেমন ভাবি, আমাদের সমাজও অনেকটা তেমনই আলো ও অন্ধকারে মেশা, প্রশ্নে ও গল্পে গড়া।

ঋত্বিক ঘটকের হারিয়ে যাওয়া সিনেমা “নাগরিক”

১৯৫২ সাল। বাংলা চলচ্চিত্র তখনও সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালি” বা মৃণাল সেনের ফর্ম ভাঙার যুগে প্রবেশ করেনি। ঠিক এই সময় তরুণ চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, তৈরি করে ফেললেন এক সাহসী সিনেমা “নাগরিক”। ছবিটি তৈরি হলেও সেই সময় মুক্তি পায়নি।পরিচালক জীবদ্দশায় ছবিটি হারিয়ে যায় মানুষের চোখ থেকে এবং অনেকের ধারণা ছিল এটি হয়তো আর ফিরে আসবে না।

ঋত্বিক ঘটক ছিলেন শুধু চলচ্চিত্রকার নন, তিনি ছিলেন এক ট্র্যাজিক দার্শনিক, এক শিল্পী যিনি নিজের দেশভাগজনিত ক্ষতবিক্ষত চেতনার মধ্য দিয়েই ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল পূর্ব বাংলার বাস্তবতা, গৃহহীনতা, পরিচয়ের সংকট ও জাতিগত ব্যথা। নাগরিক ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যেখানে কলকাতার এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের ভাঙন, স্বপ্নভঙ্গ ও এক যুবকের ব্যক্তিগত সংগ্রাম ধরা পড়ে।

নাগরিক-এর মূল চরিত্র রামু এক তরুণ বেকার যুবক, যার পরিবার দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ (অধুনা বাংলাদেশ) থেকে কলকাতায় চলে আসে। নতুন শহরে তারা একটা ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু ধীরে ধীরে শহরের নির্মম বাস্তবতায় তারা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।

রামুর পরিবার তার বাবা, মা এবং ছোট বোন একসঙ্গে একটি জরাজীর্ণ বাসায় থাকে। বাবা একসময় চাকরি করতেন, কিন্তু এখন অবসরপ্রাপ্ত ও রোগাক্রান্ত। মায়ের কাঁধেই সংসারের ভার। রামু কাজ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত, কিন্তু প্রতিবারই তার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়।তার মুখে লেগে থাকে এক ধরনের শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা।

রামুর জীবনে একমাত্র আশার আলো হলো তার প্রেমিকা সুভাষিনী। সে রামুর প্রতি সহানুভূতিশীল, দৃঢ়চেতা ও ভালোবাসায় বিশ্বাসী। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কেও ছায়া ফেলে। রামু নিজেকে তার যোগ্য মনে করে না। এমনকি ভালোবাসার মাঝেও সে বারবার হেরে যায় জীবনের কাছে।

ছবির আবহজুড়ে যে শহরটিকে আমরা দেখি তা কখনো সুস্পষ্ট নয়, কিন্তু সবসময় অনুভবযোগ্য। শহর এখানে হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষ, যেখানে মানুষের মুখগুলো একঘেয়ে, শব্দগুলো কোলাহলপূর্ণ, ভবিষ্যৎ যেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন গলি।

রামুর বাবা মারা যান, সংসারে অনাহার দেখা দেয়। মা নিজের গয়নাগাটি বিক্রি করে সাময়িক রেহাই আনেন। কিন্তু এই দুঃসহ বাস্তবতায় কারও মুখেই কোনো দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ নেই।

রামু মাঝে মাঝে কল্পনায় ঢুকে পড়ে নিজেকে সফল চাকুরে ভাবে, সুভাষিনীর সঙ্গে সুন্দর জীবনের কল্পনা করে। কিন্তু প্রতিবারই সে বাস্তবতায় আছড়ে পড়ে।

ঘটকের নির্মাণশৈলীতে এই স্বপ্নদৃশ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোতে বাস্তব আর কল্পনা পরস্পরের ওপর চাপে তৈরি হয় এক ধরণের অস্থির দৃশ্যভাষা, যা রামুর মনোজগৎ প্রকাশ করে।

শেষদিকে, রামু একটি ছোট চাকরি পায়। তা খুবই সামান্য হলেও কিন্তু এটিই যেন তার জীবনের একমাত্র ধাক্কাহীন মোড়। ছবির শেষ দৃশ্যে রামু শূন্য দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে।

ছবিটি এখানেই শেষ হয়। কোনো দৃশ্যমান সমাধান বা আশার আলো দেওয়া হয়নি। বরং রামু ও তার পরিবারের জীবন প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই বয়ে চলে, যা ছিল ঘটকের দৃষ্টিতে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্ত্ত মধ্যবিত্তদের অস্তিত্বচিত্র।

নাগরিক একটি পারিবারিক কাহিনি হলেও কিন্তু তার ভেতরে লুকানো আছে সমাজ, রাজনীতি ও অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন। রামু এখানে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি না, বরং এক সমস্ত প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক, যারা শহরের মাটি চেনে না, সমাজে জায়গা পায় না, কিন্তু প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকার জন্য। ঘটকের ভাষায় এই ছবির গল্প হলো ‘মানুষ না হয়ে ওঠার গল্প’।

ঘটকের ভাষা কখনও প্রচলিত ক্ল্যাসিক সিনেমার মতো নয়। তাঁর ক্যামেরা কখনও স্থির থাকে না, দৃশ্যায়ন হয় রুক্ষ, সংলাপ হয় গভীর ও প্রতীকধর্মী। এই ছবিতে আমরা দেখি বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার এক বিচিত্র সম্মিলন, যেখানে শহর নিজেই হয়ে উঠেছে এক চরিত্র, এক নীরব শত্রু।

“নাগরিক” ১৯৫২ সালেই তৈরি হলেও কিন্তু কোন প্রযোজক বা পরিবেশক এটি মুক্তি দিতে রাজি হননি। এর পেছনে একাধিক কারণ ছিল, ছবির রূঢ় বাস্তবতা মূলধারার বিনোদনধর্মী দর্শকের অনুকূল ছিল না, ঋত্বিক তখনও পরিচিত নাম ছিলেন না, বাজেট স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় ছবিটি ছিল অনেকাংশে অপরিণত। এইসব মিলিয়ে “নাগরিক” এক ধরণের কালচারাল আর্কাইভে চাপা পড়ে যায়।পরবর্তীতে ঘটক নিজেও ছবির মুক্তির চেষ্টা বাদ দেন।

১৯৭৬ সালে ঘটকের মৃত্যুর এক বছর পর, তাঁর ছাত্র ও অনুরাগীরা ছবির প্রিন্ট ও নেগেটিভ খুঁজে বের করেন। তখন শুরু হয় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া। যদিও ফিল্মটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, তবুও সেটিকে যতটুকু সম্ভব পরিস্কার করে ১৯৭৭ সালে মুক্তি দেওয়া হয় কলকাতার নিউ এম্পায়ার সিনেমা হলে। এই ঘটনার ফলে “নাগরিক” এক ‘লস্ট মাস্টারপিস’ হিসেবে চলচ্চিত্র ইতিহাসে নতুন আসনে বসে।এর সঙ্গে সঙ্গেই ঋত্বিকের প্রারম্ভিক ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির একটি পূর্ণ রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“নাগরিক” কেন গুরুত্বপূর্ণ?
“নাগরিক” যদি ১৯৫২ সালে মুক্তি পেত, তবে এটি হয়তো ভারতীয় আর্ট সিনেমার সূচনা বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতো। এই ছবির মধ্যে আমরা দেশভাগ-পরবর্তী যুবসমাজের হতাশা, চেতনার টানাপোড়েন ও উদ্বাস্তু সংকট দেখতে পাই যা ঘটকের পরবর্তী “মেঘে ঢাকা তারা” ও “সুবর্ণরেখা”য় আরও প্রসারিত হয়। এই ছবিতে ঐতিহ্যবাহী গঠন না মেনে নতুন দৃশ্য-ভাষা ব্যবহার হয়, যা পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের প্রভাবিত করে।

ঘটকের জীবদ্দশায় ছবিটি মুক্তি না পাওয়া এক সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ১৯৭৭-এর পর থেকে “নাগরিক” ঘাটকের প্রতিভার এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে ওঠে। এটি যেন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কৃত মানচিত্র যেখানে প্রত্যাশা, হাহাকার ও স্বপ্ন মিশে থাকে। “নাগরিক” আমাদের দেখায়, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি সময়ের দলিল, একটি চেতনার প্রতিবিম্ব।

“নাগরিক”-এর যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃত শিল্প হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি পায় না, কিন্তু সময়ের কাঁটায় দাঁড়িয়ে সে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। ঋত্বিক ঘটক সেই শিল্পীদের একজন, যিনি শহরের নিচু গলির কোণে বসে উচ্চারণ করেছিলেন সমাজ, বিভাজন ও মানবতার কথা।

যে ইসরায়েলি প্রকৌশলী, ফাঁস করেছিলেন সেদেশের পারমাণবিক অস্ত্রের তথ্য

ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ। অন্যদিকে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্রই তৈরি করছে।

ইসরায়েলের নিজের দেশে পারমাণবিক অস্ত্র আছে কী না, সেটা কিন্তু তারা স্বীকারও করে না, আবার অস্বীকারও করে না। তবে আন্তর্জাতিক মহল বিশ্বাস করে যে, তাদের কাছেও আছে পারমাণবিক অস্ত্র।

লন্ডনের পত্রিকা দ্য সানডে টাইমস ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে একটা প্রতিবেদন ছেপেছিল, ‘রিভিলড্ – দ্য সিক্রেটস অফ ইসরায়েলস্ নিউক্লিয়ার আর্সেনাল’, অর্থাৎ ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন তথ্য ফাঁস। মনে করা হয়, এই খবরটি ব্রিটিশ সাংবাদিকতায় সবথেকে বড় ‘স্কুপ’ খবরগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা।

খবরের সূত্র ছিলেন ইসরায়েলি পরমাণু প্রকৌশলী মোরেখাই ভানূনু। অনেকেই যেটা সন্দেহ করতেন যে, ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়ে উঠেছে, সেই সন্দেহের নিরসন হয় তার ফাঁস করে দেওয়া তথ্য দিয়েই।

জেরুজালেমের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে নেগেভ মরুভূমির মাঝে অবস্থিত অতি গোপন ‘ডিমোনা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ চাকরি করতেন মি. ভানূনু। ১৯৮৫-র শেষ দিকে মি. ভানূনু সিদ্ধান্ত নেন যে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এশিয়া-ভ্রমণে বেরবেন।

ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্যবহার করে আর তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প – এই দুটো বিষয়ই ইসরায়েলের প্রতি তার মোহভঙ্গ ঘটিয়েছিল।

চাকরি ছাড়ার আগে অবশ্য তিনি পারমাণবিক কারখানার ভেতরে ফিল্মের দুটি রোল ভর্তি ছবি তুলে নিয়েছিলেন। সেই সব ছবির মধ্যে যেমন ছিল অস্ত্র তৈরির জন্য কীভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিষ্কাশন করা হয় তার ছবি, তেমনই পরীক্ষাগারে বানানো থার্মোনিউক্লিয়ার যন্ত্রের একটা মডেলের ছবিও ছিল।

মি. ভানূনুর ওই সিদ্ধান্ত তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল লন্ডনে। দ্য সানডে টাইমসের খবর ছাপা হলো, তারপরই ইসরায়েলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ তাকে রোম থেকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে মি. ভানূনুর বিচার শুরু হয়। তার ১৮ বছরের জেলের সাজা হয়। জেলে থাকার প্রায় অর্ধেকটা সময় তাকে একা একটা সেলে বন্দী থাকতে হয়।

জেল থেকেই দেওয়া একটি রেকর্ড করা সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি বিশ্বকে জানাতে চেয়েছিলাম যে আসলে কী ঘটছে। এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়। ইসরায়েলের নীতির বিপরীতে গিয়ে আমি বিশ্বকে একটা তথ্য দিতে চেয়েছিলাম।”

জেল থেকে তিনি ছাড়া পান ২০০৪ সালের ২১শে এপ্রিল। তবে ইসরায়েল ছাড়ার অনুমতি তাকে কখনই দেওয়া হয় নি। মুক্তি পাওয়ার শর্ত ভঙ্গ করায় তারপরেও তাকে বেশ কয়েকবার জেলে যেতে হয়েছে।

সেদেশে মি. ভানূনুকে বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করা হলেও ২০০৪ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তার সমর্থকরা উৎসব পালন করেছিলেন। তাকে ‘শান্তির নায়ক’ নামে ডাকা হত। মুক্তি পাওয়ার পরে তার প্রথম সাক্ষাতকারে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, তার “কোনো অনুশোচনা নেই”।

“গোপনে কী কর্মকান্ড চলছে, সেটা বিশ্বকে জানিয়েছি আমি। আমি তো বলি নি যে আমাদের উচিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেওয়া হোক, কিন্তু ডিমোনা ধ্বংস করা হোক। আমি শুধু তুলে ধরেছি যে, এদের কাছে কী রয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার তো অন্যদের।”

ডিমোনা কারখানা গড়তে ফ্রান্সের সঙ্গে একটা গোপন চুক্তি করে ইসরায়েল। ধারণা করা হয় যে পারমাণবিক বোমার জন্য উপাদান তৈরির কাজ ৬০এর দশকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সেখানে। বহু বছর ধরে ইসরায়েল ওই কারখানাটিকে একটি কাপড় তৈরির কারখানা বলে প্রকাশ করতো।

সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল আ্যন্ড নন-প্রলিফারেশনের হিসাব অনুযায়ী, এখন ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক বোমা আছে।তবুও ইসরায়েল তার পারমাণবিক ক্ষমতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেই একটা অস্পষ্টতার নীতি নিয়ে চলে। ইসরায়েলের নেতারা অনেক বছর ধরেই বারবার একটা কথা বলে আসছেন যে, “ইসরায়েল কখনই মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকারী প্রথম দেশ হয়ে উঠবে না।”