আধুনিক যুদ্ধে দেশের ভেতরের জনমত গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মার্কিন মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তিন দেশই এখন জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে—জয় তাদেরই হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারে, তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে; ইসরায়েল দাবি করতে পারে, তারা তেহরানকে যথেষ্টভাবে দুর্বল করেছে; আর ইরান গর্ব করে বলতে পারে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে এবং পিছু হটেনি।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের দস্যু’ বলে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন — যদি তেহরান শান্তির পথে না আসে, তবে পরবর্তী হামলা হবে আরও ভয়াবহ। তবে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চায়নি।
ট্রাম্প বুঝতে পারেন, তেহরানের এমন একটা পথ দরকার, যাতে তারা উত্তেজনার পথ থেকে সরে আসতে পারে, আবার দেশের অভ্যন্তরীণ জনসমর্থনও না হারায়। এ কারণেই কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালানোর পর ট্রাম্প পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ইরানকে আগাম সতর্কতার জন্য ধন্যবাদ দেন।
নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়া ট্রাম্প এখন নিজেকে শান্তিদূতের ভূমিকায় তুলে ধরতে পারছেন। এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সেনা হারায়নি, নিজেদের সামরিক শক্তি দেখিয়েছে এবং মিত্র ইসরাইলের নিরাপত্তা হুমকি দূর করেছে—এ যেন ট্রাম্পের জন্য কৃতিত্ব দাবির মোক্ষম সময় হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিখুঁত বিমান হামলার আগের সপ্তাহেই ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আকাশে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।তারা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় এবং তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তি ও পরমাণুবিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অর্জন যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িয়ে পড়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে চালানো বিমান হামলা শুধু তেহরান নয়, পুরো বিশ্বকে এই বার্তা দিয়েছে যে ওয়াশিংটন নিরঙ্কুশভাবে তেলআবিবের পাশে আছে।
সামরিক সাফল্য ভূরাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলের অবস্থান যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়বে। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এটি এক বড় রাজনৈতিক লাভ এনে দিতে পারে।
ইরানের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেশিরভাগ প্রতিহত করলেও ইসরাইলে যেটুকু ক্ষতি হচ্ছিল, তাতে জনমনে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা থেকে যুদ্ধবিরতির ফলে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেল ইসরাইল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে চালানো বিমান হামলা তেহরানকে এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। প্রতিশোধ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে, কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। একদিকে মুখ রক্ষা, অন্যদিকে উত্তেজনা থেকে সরে আসার পথ—দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো ইরানকে। ইরান সে পথেই হেঁটেছে।
ইরান আন্তর্জাতিকভাবে এমন এক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে, যেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে, মাথা নিচু করেনি। বেশির ভাগ ইরানি এখন দেশের পক্ষে একজোট হয়েছেন। এই যুদ্ধকে তাঁরা মাতৃভূমির ওপর হামলা বলেই বিবেচনা করেছেন।
তবে, সাধারণ ইরানিরা আর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চায় না। তেহরানের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রধান সাদেক নুরুজি বলেন, ‘আমাদের আর যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা নেই। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। জনসমর্থন ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সমান নয়।’ বিশ্লেষক কারিম জাফারি লেখেন, ‘ইরান এখন বহুমুখী যুদ্ধ চায় না। এর ফল কী হবে, তা ভেবে দেখা দরকার।’


