Home Blog Page 65

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন : ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষেরই বিজয় দাবি

আধুনিক যুদ্ধে দেশের ভেতরের জনমত গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মার্কিন মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তিন দেশই এখন জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে—জয় তাদেরই হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারে, তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে; ইসরায়েল দাবি করতে পারে, তারা তেহরানকে যথেষ্টভাবে দুর্বল করেছে; আর ইরান গর্ব করে বলতে পারে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে এবং পিছু হটেনি।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের দস্যু’ বলে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন — যদি তেহরান শান্তির পথে না আসে, তবে পরবর্তী হামলা হবে আরও ভয়াবহ। তবে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চায়নি।

ট্রাম্প বুঝতে পারেন, তেহরানের এমন একটা পথ দরকার, যাতে তারা উত্তেজনার পথ থেকে সরে আসতে পারে, আবার দেশের অভ্যন্তরীণ জনসমর্থনও না হারায়। এ কারণেই কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরান হামলা চালানোর পর ট্রাম্প পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ইরানকে আগাম সতর্কতার জন্য ধন্যবাদ দেন।

নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়া ট্রাম্প এখন নিজেকে শান্তিদূতের ভূমিকায় তুলে ধরতে পারছেন। এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সেনা হারায়নি, নিজেদের সামরিক শক্তি দেখিয়েছে এবং মিত্র ইসরাইলের নিরাপত্তা হুমকি দূর করেছে—এ যেন ট্রাম্পের জন্য কৃতিত্ব দাবির মোক্ষম সময় হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিখুঁত বিমান হামলার আগের সপ্তাহেই ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আকাশে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।তারা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় এবং তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তি ও পরমাণুবিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে।

ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অর্জন যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িয়ে পড়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে চালানো বিমান হামলা শুধু তেহরান নয়, পুরো বিশ্বকে এই বার্তা দিয়েছে যে ওয়াশিংটন নিরঙ্কুশভাবে তেলআবিবের পাশে আছে।

সামরিক সাফল্য ভূরাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলের অবস্থান যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়বে। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এটি এক বড় রাজনৈতিক লাভ এনে দিতে পারে।

ইরানের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেশিরভাগ প্রতিহত করলেও ইসরাইলে যেটুকু ক্ষতি হচ্ছিল, তাতে জনমনে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা থেকে যুদ্ধবিরতির ফলে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেল ইসরাইল।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে চালানো বিমান হামলা তেহরানকে এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। প্রতিশোধ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে, কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। একদিকে মুখ রক্ষা, অন্যদিকে উত্তেজনা থেকে সরে আসার পথ—দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো ইরানকে। ইরান সে পথেই হেঁটেছে।

ইরান আন্তর্জাতিকভাবে এমন এক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে, যেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে, মাথা নিচু করেনি। বেশির ভাগ ইরানি এখন দেশের পক্ষে একজোট হয়েছেন। এই যুদ্ধকে তাঁরা মাতৃভূমির ওপর হামলা বলেই বিবেচনা করেছেন।

তবে, সাধারণ ইরানিরা আর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চায় না। তেহরানের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রধান সাদেক নুরুজি বলেন, ‘আমাদের আর যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা নেই। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। জনসমর্থন ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সমান নয়।’ বিশ্লেষক কারিম জাফারি লেখেন, ‘ইরান এখন বহুমুখী যুদ্ধ চায় না। এর ফল কী হবে, তা ভেবে দেখা দরকার।’

আকাশের সাদা রেখার আতঙ্ক

আকাশে উড়ন্ত বিমানের পেছনে যে সাদা রেখাগুলো দেখা যায়, সেগুলো নিয়মিত “কনট্রেইল” বা কনডেনসেশন ট্রেইল নামে পরিচিত। তবে গত কয়েক দশকে এই সাধারণ ফেনাটিকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে “কেমট্রেইল” ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (Chemtrail Conspiracy Theory)। এই তত্ত্বের অনুসারীরা মনে করেন, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সরকার বা গোপন শক্তি আকাশে রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দেয়, যেটা সাধারণ মানুষ জানে না।

কিন্তু এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটুকু? বাস্তবে কেমট্রেইল কি, কেন এটি নিয়ে এত ভ্রান্ত ধারণা, এবং এর পেছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে? প্রথমেই বুঝতে হবে, কনট্রেইল ও কেমট্রেইল এরা এক নয়। কনট্রেইল হলো বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত গরম গ্যাস যখন আকাশের ঠান্ডা, আর্দ্র পরিবেশে এসে জমে যায় এবং ছোট ছোট বরফের কণা তৈরি করে যা সাদা রেখার মতো দেখায়। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক। কনট্রেইল বিভিন্ন আকারের হতে পারে, যেমন পাতলা সরু রেখা, কিছু সময় বিস্তৃত বা দীর্ঘস্থায়ী।

অন্যদিকে, “কেমট্রেইল” ধারণাটি দাবি করে, এই রেখাগুলোতে আসলে শুধু বরফ নয়, বিশেষ ধরনের রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে বিমান থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই পদার্থগুলো বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় বলে মত প্রকাশ করা হয়, যেমন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ বা জলবায়ু পরিবর্তন, মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ বা মানসিক প্রভাব, সামরিক পরীক্ষার জন্য রাসায়নিক ছড়ানো।

১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তত্ত্ব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে কয়েকজন পাইলট ও সাধারণ নাগরিক বিমানের পেছনে দেখা বিশেষ ধরনের রেখা দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরে নানা ভিডিও, ছবি, ও ব্লগের মাধ্যমে এই ধারণাটি মজবুত হয়। বিভিন্ন সাইবার ফোরামে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কেমট্রেইল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

কিছু সামরিক ও সরকারি ডকুমেন্টের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা, ভুল বুঝাবুঝি এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে আগ্রহ এই তত্ত্বকে ছড়াতে সাহায্য করেছে। ২০০০ সালের পর থেকে অনেক দেশে সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, যদিও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশ সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, আকাশে বিমানের পেছনে থাকা সাদা রেখাগুলো সাধারণত বরফের কণা।আকাশ খুব ঠান্ডা ও আর্দ্র থাকে থাকলে এই কনট্রেইলগুলো কখনো কখনো দীর্ঘক্ষণ আকাশে থাকতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা যেমন NASA, NOAA, Environmental Protection Agency (EPA), এবং বিজ্ঞানীদের বড় অংশ এই বিষয়ের “কেমট্রেইল” তত্ত্বকে ভিত্তিহীন ও গুজব বলে বিবেচনা করে।

তাদের যুক্তি হলো পানির নমুনা, মাটির বা বায়ুর মান পর্যালোচনা করে যদি অতিরিক্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া যেত তাহলে তা বৈজ্ঞানিক রিপোর্টে ধরা পড়ত। কিন্তু এরকম কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা রিপোর্ট নেই। বিমান যন্ত্রপাতি রাসায়নিক ছড়াতে ডিজাইন করা হয় না।

বিপরীতে, কেমট্রেইল ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অনুসারীরা অস্বাভাবিক দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইল বা রেখার আকার পরিবর্তনকে “রাসায়নিক ছড়ানো”র প্রমাণ হিসেবে দেখেন।

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জনপ্রিয় কেন?

মানুষের মধ্যে “অজানা ও অদৃশ্য” বিষয়ে আগ্রহ স্বাভাবিক। কেমট্রেইল তত্ত্বে সেই অজানার চিত্র ফুটে ওঠে। কেউ জানেনা ঠিক কী হচ্ছে আকাশে, তাই মনে হয় যেন গোপন কোনো ষড়যন্ত্র চলছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক অবিশ্বাস বিশেষ করে বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের প্রতি অবিশ্বাস মানুষকে সহজেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে ঠেলে দেয়। যারা সাধারণ তথ্য বা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার পরিবর্তে “গোপন তথ্য” খোঁজেন, তারা কেমট্রেইল ধারণায় আকৃষ্ট হন।

আবার ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাও অপরিসীম। ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, যা বাস্তবতা যাচাই ছাড়াই বিশ্বাস করা হয়।

কেমট্রেইল তত্ত্বটি বৈজ্ঞানিকভাবে খণ্ডনীয় হলেও কিছু বাস্তব কারণ থাকতে পারে যেগুলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু গবেষণায় মেঘ সৃষ্টি ও রোদ বাঁচানোর পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে আকাশে ক্ষুদ্র কণা ছড়ানোর ধারণা রয়েছে। তবে এটি সীমিত গবেষণা এবং জনসাধারণের নজরদারি রয়েছে।

মাঝে মাঝে বিশেষ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা সেন্সর নির্দিষ্ট গ্যাস পরীক্ষা করার জন্য আকাশে ছড়ানো হতে পারে, যা নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ এবং স্বচ্ছ।বিভিন্ন ধরনের বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার ধরনে বিভিন্ন রকম রেখা তৈরি হতে পারে। এই সকল বিষয়গুলো মিলিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং কেমট্রেইল তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায়।

কেমট্রেইল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মূলত মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা, ভয় ও অবিশ্বাসের ফলাফল। যেখানে বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ বলে দেয় এসব রেখা কেবল বরফের কণা এবং স্বাভাবিক কনট্রেইল, সেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভয়ংকর গল্পের কারণে ষড়যন্ত্রের চিত্র গড়ে ওঠে।

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন – বাংলাদেশের পানির হিস্যা কমাতে চায় ভারত

পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের পর এবার বাংলাদেশের সঙ্গেও আগামী বছর মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলা গঙ্গা নদীর পানি বন্টন চুক্তির শর্ত পুনঃআলোচনা করে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে একথা জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

প্রতিবেদনে বলা হয় — নয়াদিল্লি ঢাকাকে জানিয়েছে, উন্নয়ন চাহিদা মেটাতে ভারতের আরো পানিসম্পদের প্রয়োজন। এছাড়া, নতুন চুক্তিটিও হবে আগের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি, সম্ভবত ১০ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি।

দেশটির সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য হচ্ছে, এই স্বল্পমেয়াদি চুক্তির লক্ষ্য— দুই দেশকে নমনীয়তা ও অভিযোজনযোগ্য সময় দেওয়া— যাতে ভবিষ্যতে পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা যায়।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি বন্টন চুক্তি, যেটি শুস্ক মৌসুমের জন্য পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজের পানি ভাগাভাগির পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিল। মেয়াদ শেষে, অর্থাৎ ২০২৬ সালে, আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি পুনঃনবায়ন করার কথা।

চুক্তিতে বলা হয়, ফারাক্কা ব্যারেজের উজানে গঙ্গার পানির নাব্যতা যদি ৭০ হাজার কিউসেকের কম হয়, তবে বাংলাদেশ ও ভারত মোট পানির ৫০% হারে ভাগ করবে। নাব্যতা ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক, বাকি পুরো পানি পাবে বাংলাদেশ।

বর্তমান চুক্তি অনুসারে, শুষ্ক মৌসুম (১১ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত) প্রতি ১০ দিন অন্তর ভারতে ও বাংলাদেশে পালাক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেকস পানি সরবরাহের বিধান আছে।

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনা সংক্রান্ত ভারত সরকারের অভ্যন্তরীণ কিছু নথিও দেখেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। যেখানে বলা হচ্ছে, ফারাক্কা ব্যারেজ ৪০ হাজার কিউসেক পানি স্থায়ীভাবে কলকাতা বন্দর ট্রাস্ট (বর্তমান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর, কলকাতা)-এর ফিডার খালে প্রবাহিত করার জন্য নির্মিত হয়েছিল ।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেন, “১৯৯৬ সালের (বাংলাদেশের সঙ্গে) চুক্তি এই ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে।এর ফলে ঢাল পতন, নদীতল ক্ষয় এবং কলকাতা বন্দরের তীব্র পলিজমার কারণে নাব্যতার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।পাশাপাশি, সেখানে অবস্থিত এনটিপিসির প্ল্যান্টও পানি সংকটে পড়েছে।”

ভারত এখন ক্রমবর্ধমান নিজস্ব ‘চাহিদা’ মেটাতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য পানির হিস্যা আরো কমাতে চায়। কাশ্মীরের পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই প্রতিবেশীদের সাথে পানির ভাগাভাগি নিয়ে মোদি সরকারের যে নীতি পরিবর্তন — এটি তারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকায় এই চুক্তি নিয়ে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনাও হয়। মে মাসের শুরুতে এমনই একটি বৈঠকে অংশ নেওয়া ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, “পাহেলগামের আগে আমরা ৩০ বছর মেয়াদ বাড়ানোর কথা ভাবছিলাম, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি একদম বদলে গেছে।”

‘কম্পিউটেশনাল বায়োলজি’ – গণিত বদলে দেবে স্বাস্থ্য

ধরা যাক এক দুপুরে আপনি ক্যাফেতে বসে আছেন। সামনের টেবিলে দুজন চুপচাপ ল্যাপটপে চোখ গুঁজে বসে আছেন ভাবছেন নিশ্চয়ই ফ্রিল্যান্সার। কিন্তু হঠাৎ শুনলেন, একজন বলছে, “এই প্রোটিনটা যদি এভাবে ফোল্ড করে, তাহলে তো ক্যানসারের মিউটেশনটা স্পষ্ট হয়!” অন্যজন জবাব দেয়, “আমাদের মডেলটা কি AlphaFold-এর রেজাল্টের কাছাকাছি আসছে?”

আপনি একটু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। কী এটা? প্রোটিন? ফোল্ডিং? AlphaFold? গুগল ঘেঁটে বুঝতে পারলেন, ওরা আসলে কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট। জীববিজ্ঞানের এমন এক জগতে কাজ করছে, যেখানে কোষের রহস্য বোঝা হয় কোড দিয়ে, ল্যাব নয়, ল্যাপটপ দিয়ে।

কম্পিউটেশনাল বায়োলজি নামটি শুনলে মনে হয় এটি বুঝি কেবল জটিল গবেষণার বিষয়, কেবল বিদেশি বিজ্ঞানীদের কাজ। কিন্তু এই শাখা এমন এক বিজ্ঞান, যেটি জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে অ্যালগরিদম দিয়ে।

ধরুন আপনি জানতে চান কেন আপনার পরিবারের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, অথচ আপনি সুস্থ। চিকিৎসক আপনার ডিএনএ টেস্ট করে একটি অদ্ভুত জিন মিউটেশন খুঁজে পেলেন, যা আপনাকে সেই রোগ থেকে রক্ষা করেছে। এই বিশ্লেষণের পেছনে ছিল একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা শত শত রোগীর জিন বিশ্লেষণ করে এমন মিল খুঁজে বের করেছে। এই কাজটাই করে কম্পিউটেশনাল বায়োলজি।

আমরা প্রায়ই বলি “ডিএনএ আমাদের জীবনের মানচিত্র।” কিন্তু মানচিত্র দেখতে জানলে তবেই না পথ খুঁজে পাওয়া যায়! সেই মানচিত্র দেখার চশমা হলো কম্পিউটার, গণিত, এবং তথ্য বিশ্লেষণ। এই শাখার যাত্রা মোটেও আজকের নয়। ১৯৯০ সালে যখন “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট” শুরু হয়, তখন কোটি কোটি জিনের মধ্যে কোনটি কী করে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা একাই দাঁড়িয়েছিলেন এক সমুদ্রের পাড়ে। হাতে ছিল শুধু ডিএনএ সিকোয়েন্স। সেইসময় কম্পিউটার এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি। তখন থেকেই জীববিজ্ঞানের ভাষা বদলে যেতে শুরু করে।

কয়েক বছর আগে Google-এর DeepMind AlphaFold নামে একটি অদ্ভুত সিস্টেম তৈরি করলো। এটিকে বলা হয় জীববিজ্ঞানের ChatGPT।

এই প্রোগ্রামটি শুধু দেখে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্স, এবং বলে দেয় এই প্রোটিন কীভাবে ভাঁজ হবে। ব্যাপারটা এমন, যেন আপনি কারো নাম শুনেই বলে দিচ্ছেন সে দেখতে কেমন হবে!

প্রোটিনের গঠন বোঝা মানে হলো আপনি জানেন শরীরের কোন অংশে কোন প্রোটিন কাজ করে, কীভাবে রোগ হয় এবং কোন ওষুধ দিয়ে তাকে থামানো যায়। AlphaFold-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী এখন চিকিৎসা গবেষণাকে কয়েক দশক এগিয়ে দিয়েছে।

ধরুন গ্রামের বাবা স্ট্রোকে মারা গেলেন। চিকিৎসকেরা কিছু করতে পারেননি, কারণ সময়মতো রোগ ধরা যায়নি। এখন যদি এমন একটি মেশিন তৈরি হয়, যা সেই বাবার মেয়ের জিন স্ক্যান করে বলে দিতে পারে “তোমারও স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে, এখনই ওষুধ খাও বা লাইফস্টাইল বদলাও।” এটিই Personalized Medicine কম্পিউটেশনাল বায়োলজির বড় অবদান। ক্যানসার, আলঝেইমার, এমনকি ডিপ্রেশন এই সবকিছুই এখন আর শুধুমাত্র ডাক্তারি চেম্বারের বিষয় নয়। এখন তারা কম্পিউটার ল্যাবে গবেষণার বিষয়।

হয়তো ভাবছেন, “বাংলাদেশে এসব কি হচ্ছে?” ছোট হলেও অগ্রগতি আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগ গড়ে উঠেছে, icddr,b-তে মলিকুলার ডেটা নিয়ে কাজ চলছে। COVID-19-এর সময় বাংলাদেশি গবেষকেরা জিনোম সিকোয়েন্স করে ভাইরাসের ধরন শনাক্ত করেছেন। তবে সত্যি বলতে এখনো অনেক পথ বাকি। ডেটা নেই, প্রশিক্ষণ নেই, অনেক ক্ষেত্রে আগ্রহও নেই। কিন্তু পৃথিবী থেমে নেই।

আসুন ভাবি আপনার ফোনে যেভাবে গুগল ম্যাপ আপনাকে গন্তব্য বলে দেয়, একদিন ঠিক তেমনভাবে একটি অ্যাপ আপনাকে বলবে, “হৃদপিণ্ডে একটি সমস্যা হচ্ছে। এটা অ্যানালাইসিস করেছি তোমার লাইভ ডিএনএ এবং পুষ্টি ডেটা থেকে। এখনি চিকিৎসা নাও।” এই ভবিষ্যৎ আজ স্বপ্ন হলেও, কম্পিউটেশনাল বায়োলজি সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে সত্যি করে তুলছে।

আজ যখন আমরা কোষের ভেতরের প্রতিটি জৈব প্রক্রিয়া বুঝতে চাই, তখন সেখানে জিনের সিকোয়েন্স, প্রোটিনের গঠন, কোষের আচরণ সবকিছুকে ধরা হয় সংখ্যায়, কাঠামোয়, আর কোডে। কম্পিউটেশনাল বায়োলজি আমাদের সেই যাত্রাপথের দিশারি। ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান শুধু ডাক্তার নয়, ডেভেলপারও তৈরি করবেন।

দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে এশিয়া, বাড়বে চরম আবহাওয়ার ঘটনা

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) প্রকাশিত “State of the Climate in Asia 2024” রিপোর্টে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এশিয়া মহাদেশ বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা কেবল তাপমাত্রার পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি এবং সম্পদের টিকে থাকার লড়াইয়ের চিত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এশিয়ার তাপমাত্রা পূর্ব-শিল্পযুগীয় গড়ের চেয়ে ১.৮৬°C বেশি ছিল, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। এটি সরাসরি মানব-সৃষ্ট গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফল, যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং মিথেনের ঘনত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশেও গড় তাপমাত্রা বেড়েছে, যার ফলে উষ্ণ জলরাশিতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, এবং খরার ঘটনাগুলো চরমভাবে বেড়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে একদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে, অন্যদিকে অনেক অঞ্চলে মারাত্মক খরা দেখা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই “ঘূর্ণিঝড় রেমাল”-এর আঘাতে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং কৃষি জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়েছে। চীনের পূর্বাঞ্চলে, জুন মাসে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এক মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টি হওয়ায় নদী প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে তীব্র খরার কারণে গম ও তুলা চাষে মারাত্মক ধস নেমেছে।

খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকরা পূর্বানুমানভিত্তিক চাষাবাদ করতে পারছেন না। বাংলাদেশে ধানের মৌসুমে দেরিতে বৃষ্টি এবং পরে অতিবৃষ্টির কারণে ফলনে ১৫–২০% পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে। পাকিস্তানের সিন্ধু এবং ভারতের মহারাষ্ট্র অঞ্চলে কৃষকরা জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের অভাবে জমি পতিত রেখেছেন।

ডব্লিউএমও রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই এশিয়ায় ১০০০-এর বেশি প্রাণহানি হয়েছে চরম আবহাওয়ার কারণে। এছাড়া লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের কারণে বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থদের মধ্যে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং শ্বাসজনিত রোগ বেড়েছে। ঢাকায় মে মাসে গড় তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে, যা বিগত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

WMO অনুমান করছে, শুধু ২০২৪ সালেই চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এশিয়ায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্ষুদ্র চাষি, নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারায় দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলছে।

এই রিপোর্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের বিষয় নয় এটি এখনই ঘটছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, দূষণ কমানো, জলবায়ু অভিযোজন-ভিত্তিক কৃষি নীতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আজ জরুরি প্রয়োজন। WMO একে একটি “জাগরণের ডাক” হিসেবে উল্লেখ করেছে, যেখানে এশিয়ার দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে—না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও বিপজ্জনক পৃথিবীর মুখোমুখি হবে।

দেশে মব ভায়োলেন্স বন্ধ হবে কখন?

গণপিটুনি ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এখনই। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

গত নয় মাসে বাংলাদেশের সমাজে গণপিটুনি ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। একের পর এক ঘটনা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব সহিংসতা ঠেকাতে কার্যত ব্যর্থ।বারবার দেখা যাচ্ছে, জনতা যখন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন পুলিশ ও প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, নারী নির্যাতন, জনসমক্ষে মানুষকে মারধর, ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুরসহ নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনেক সময় দেখা গেছে, প্রশাসনের নীরবতা জনতাকে আরও বেশি সাহসী করে তুলেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অথচ দলীয় নেতৃত্ব শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সারে “আমরা সহিংসতা সমর্থন করি না”, কিংবা “দোষী সাব্যস্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে” কিন্তু বাস্তবে কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অনেক সময় ঘটনা ঘটার পর, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে, তখনই কেবল সরকার বা প্রশাসন মুখ খোলে। প্রশ্ন ওঠে আইন কি কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তা ফেসবুকে ভাইরাল হয়? নাকি নীরব দর্শক হয়ে থাকা সরকারের নতুন নীতি?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, “কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়া যাবে না।” অথচ গত কয়েক মাসে একের পর এক ঘটনা দেখিয়েছে, এই সাংবিধানিক অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপিটুনি বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের চিহ্ন নয়। এতে বিচারবহির্ভূত শাস্তি, নিরীহ মানুষের হয়রানি, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু বিবৃতি নয়, দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও সক্রিয় হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সবশেষে বলা যায়, গণপিটুনির এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে, সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনই সময়, রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ও নতুন সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা

একটি সময় ছিল যখন সংস্কৃতি তৈরি হতো গল্প, গান, লোককথা, নাটক কিংবা সিনেমার মাধ্যমে। সেই সংস্কৃতি হতো ধীর, বহুস্তরীয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পুষ্ট। কিন্তু আজ কেবল এক মিনিটের ভিডিওতে একটি পুরো ট্রেন্ড জন্মায়, ছড়িয়ে পড়ে এবং একই দ্রুততায় হারিয়েও যায়। এই নতুন সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের গভীরে গিয়ে প্রভাব ফেলছে ভাষা, সম্পর্ক, ইতিহাস, এমনকি আত্মপরিচয়ের বোধেও।
আগে সংস্কৃতি তৈরি হতো বই, গান, মঞ্চ কিংবা লোককথার মাধ্যমে। এখন তৈরি হয় কনটেন্টে—ছোট ভিডিও, হ্যাশট্যাগ আর ট্রেন্ডিং শব্দে। “NPC challenge”, “get ready with me”, “duet this”, “sad boy aesthetic” এগুলো শুধুই ট্রেন্ড নয়, বরং সমাজের নতুন ব্যাকরণ। এদের জন্ম সাধারণ মানুষের হাতেই। কেউ ভাইরাল হওয়ার আশায় বানায়, কেউ অনুকরণ করে ফলোয়ার বাড়ায়, আবার কেউ শুধুই অংশ নিতে চায় যেন সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। এই নতুন ডিজিটাল ট্রেন্ড এক অর্থে একধরনের লোকজ সংস্কৃতি, যা দ্রুত ছড়ায়, পরিবর্তিত হয়, আবার হারিয়েও যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে ভাষা এবং ভাবনার জগতে। এখনকার তরুণরা কথা বলে “cringe”, “vibe”, “mood” দিয়ে। বাংলার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে এমন শব্দ যা একসময় হয়তো শুধুই পশ্চিমা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এই ভাষাগত পরিবর্তন একদিকে গ্লোবাল সংস্কৃতির সাথে সংযোগ তৈরি করছে, কিন্তু অপরদিকে মাতৃভাষার নিজস্ব রূপ ও গভীরতা হারানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ভাবনার ক্ষেত্রেও প্রভাব সুস্পষ্ট। আগেকার দিনে একজন পাঠক কবিতা পড়ে ভাবতেন, নাটক দেখে প্রশ্ন করতেন, গান শুনে স্মৃতি খুঁড়তেন। এখন ৩০ সেকেন্ডের ক্লিপে সেই আবেগ “ফাস্ট-ফরোয়ার্ড” হয়ে যাচ্ছে। চিন্তার গভীরতা কমছে, প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে তাৎক্ষণিক ও ত্বরিত।

নতুন সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলি সবচেয়ে গভীরভাবে যেটি বদলে দিচ্ছে তা হলো মানুষের আত্মপরিচয়। “ফিটনেস ট্রেন্ড” না মানলে আত্মসম্মানে আঘাত পায়। ট্রেন্ডে অংশ না নিলে মনে হয় সমাজে গুরুত্ব হারিয়ে যাবে। এই যে ‘ট্রেন্ডে থাকা না থাকা’-র ভয়, তা একধরনের “সামাজিক দেহ-ভয়” তৈরি করছে। ফলে সমাজে সৌন্দর্যের মানদণ্ড, গ্রহণযোগ্যতার ধারণা এবং আত্মমূল্যায়নের পদ্ধতিগুলো কৃত্রিম হয়ে উঠছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডের মূল নিয়ন্ত্রক এখন আর চলচ্চিত্র, সাহিত্য বা একাডেমিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ইনফ্লুয়েন্সাররা। তারা কী বলছে, কী করছে, কী পরছে সবকিছুই একেকটি ট্রেন্ডের জন্ম দেয়। এই ‘নতুন সাংস্কৃতিক দেবতা’রাই হয়ে উঠেছে আদর্শ। এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক কারণ যে কেউ ভাইরাল হতে পারে। আবার একদিকে এটি নিয়ন্ত্রণমূলক—কারণ ভাইরাল না হলে কেউ চোখেই পড়ে না। এ যেন জনপ্রিয়তার মধ্যেই সত্য লুকিয়ে আছে এমন এক বিশ্বাস, যা সমাজে সাংস্কৃতিক অসাম্য তৈরি করে।

ট্রেন্ড-ভিত্তিক সমাজ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও গভীরতাকে গুরুত্ব দেয় না। আজ একটি নাচের স্টেপ ভাইরাল, কাল সেটি হারিয়ে যাবে। এক সপ্তাহ আগে যে ট্রেন্ড ছিল চোখের মণি, এখন তা ‘old’। ফলে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়া, অতীত চর্চা এবং ধারাবাহিক মানসিকতার মধ্যে ছেদ পড়ছে। একটি জাতি যদি তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি হারায়, তবে সে তার আত্মপরিচয় হারানোর পথেই থাকে। সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড যদি এই স্মৃতি ভেঙে ফেলে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কী?

ট্রেন্ড এখন শিক্ষার মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা টেক্সট না পড়ে “60 seconds summary” খোঁজে। গণিত শেখার বদলে “fun trick to multiply” দেখে। দর্শন বোঝার আগে তারা দেখে “what is nihilism in 1 min?”। এই সংক্ষিপ্ত-ভাবনা সংস্কৃতি শুধু জ্ঞানার্জন নয়, চিন্তা করার ক্ষমতাকেও ভেতরে ভেতরে ক্ষয় করছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড একদিকে আমাদের বৈশ্বিকতার দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে তা আমাদের চিন্তা, ভাষা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক গভীরতার উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এটি নতুন এক লোকজ প্রযুক্তি যা একইসাথে দৃষ্টি উন্মোচন করছে, আবার দৃষ্টি সীমাবদ্ধও করছে। তবে প্রশ্ন হলো আমরা কি কেবল ট্রেন্ডে ভেসে যাবো, নাকি ট্রেন্ডকে বুঝে নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চাকে রক্ষা করবো?

ফ্যাশন, ডিজাইন ও জীবনে নতুন ট্রেন্ড – Occult

একটা সময় ছিল ডাইনিদের নাম শুনলেই ভয় পেত মানুষ। কালো পোশাক, অদ্ভুত প্রতীক, রাতের আঁধারে মোমবাতির আলো সব মিলিয়ে occult ছিল গোপন, রহস্যময় আর নিষিদ্ধ কিছু। তখন কেউ যদি পেন্টাগ্রাম বা বাফোমেটের প্রতীক শরীরে ধারণ করত, তাকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হতো। আর এখন? সেই একই প্রতীক দিয়ে বানানো হচ্ছে নামী ব্র্যান্ডের হুডি, হাই ফ্যাশন শো-তে occult থিমের পোশাক পরে হাঁটছেন মডেল এবং Instagram-এ occult aesthetic এখন এক ট্রেন্ড।

কেন এমন হলো? হাজার বছরের পুরনো এক ‘ভীতিকর’ চেতনা কীভাবে পরিণত হলো আধুনিক ডিজাইনের ভাষায়? occult কি কেবল ফ্যাশন স্টেটমেন্ট? না কি এই গোপনতার ভেতরে লুকিয়ে আছে একরাশ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, আত্ম-অন্বেষণ এবং গভীর জ্ঞানের ছায়া?

Occult কোনো কুসংস্কার নয়, বরং বিকল্প চেতনার ইতিহাস। এটি মূলধারার ধর্ম, বিজ্ঞান ও সামাজিক ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনের নাম যেখানে সত্যের সন্ধান চলে ছায়ার ভিতর দিয়ে। প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে মধ্যযুগ, রেনেসাঁ ও ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত যখনই কোনো জ্ঞানপ্রণালীকে প্রতিষ্ঠিত শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, তখন সেই বিকল্প চেতনা ‘occult’ নামে ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

এই চেতনায় আত্ম-শক্তি, রহস্য, প্রাকৃতিক উপাদান ও প্রতীকের সম্মিলন ঘটেছে। occult বলতে তাই বোঝায় প্রতিবাদী, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকতত্ত্ব—যা প্রায়শই ক্ষমতার চোখে ‘বিপজ্জনক’ হয়ে ওঠে।

Occult-এর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তার প্রতীক, একধরনের গোপন ভাষা, যেগুলো দৃশ্যমান জগতের বাইরে ইশারা করে। এই প্রতীকগুলোর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, বিদ্রোহ, আত্মোপলব্ধি ও শক্তি প্রকাশ পায়। পেন্টাগ্রাম পাঁচ উপাদানের প্রতীক এবং জাদু ও সুরক্ষার চিহ্ন। বাফোমেট দুই বিপরীতের মিলন—নারী/পুরুষ, আলো/অন্ধকার, আত্মা/দেহ। সিগিল ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিমূর্ত রূপ, নিজের অভ্যন্তর থেকে তৈরি এক জ্যামিতিক উচ্চারণ ট্যারট চিত্র, চোখ, সাপ, মণ্ডল প্রতিটি প্রতীক নির্ভর করে জ্ঞানের শরীরায়নের ওপর ফ্যাশন যখন শরীরের উপর লেখা হয়, তখন এসব occult প্রতীক হয়ে ওঠে এমন এক ভাষা যা কেবল সাজ নয়, বরং আত্ম-অস্তিত্বেরও মূর্ত রূপ।

১৯৭০-এর দশকে ইউরোপ ও আমেরিকায় গথিক ও পাঙ্ক সংস্কৃতি জন্ম নেয়। কালো পোশাক, স্কাল, ক্রস, চেইন, অন্ধকার ছায়া এসব ফ্যাশন উপাদান ছিল মূলধারার ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে রূপক প্রতিবাদ।

এরপর আসে Witchcore ও feminist occult aesthetic। নারীরা occult প্রতীক ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি, আত্মবিশ্বাস, এবং ঐতিহাসিকভাবে দমন হওয়া নারীত্বকে প্রকাশ করেন। TikTok ও Instagram-এ “WitchTok”, “Dark Feminine Energy”, “Tarot Fashion” এসব সাবকালচার occult aesthetics-কে এক নতুন সামাজিক চেতনার অংশ করে তোলে।

Alexander McQueen, Rick Owens, Gucci, Balenciaga সব বড় ফ্যাশন হাউস occult প্রতীক ব্যবহার করে নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছে। McQueen মৃত্যুর সৌন্দর্য, রেনেসাঁ-সময়ের গোপন শিল্পকৌশল ও স্কাল ডিজাইন ব্যবহার করেন। Rick Owens occult কে স্রেফ চমক নয়, বরং আত্মদর্শনের ভাষা বানান। Gucci tarot কার্ড, snake symbolism ও চোখের প্রতীক দিয়ে occult কে মেটাফিজিকাল ডিজাইনে রূপ দেয়।

তবে এ জায়গায় এক বিতর্কও আছে, occult aesthetics কি বাণিজ্যের হাত ধরে নিজের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি হারাচ্ছে? গত এক দশকে occult aesthetics উচ্চফ্যাশনের জগতে শুধু থিম হিসেবে নয়, বরং বিচার্য ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১8 সালে Vogue occult-inspired কালেকশনকে “The Return of Ritualistic Fashion” হিসেবে আখ্যা দেয়। যেখানে Gucci, Dior, এবং Rodarte-র মিস্টিক্যাল ডিজাইনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়। একই বছর The Business of Fashion (BoF) occult ও গথিক ফ্যাশনকে “Top 5 Fashion Aesthetics Reshaping the Luxury Market” এর তালিকায় রাখে। ২০২১ সালে Lyst Fashion Index occult থিমে তৈরি Rick Owens ও Marine Serre-র কালেকশনকে “Breakthrough Cultural Moments” বলে চিহ্নিত করে। এছাড়াও occult টাইপোগ্রাফ, runic ফন্ট ও অর্কানিক গ্লিফ ডিজাইন ২০২৩ সালে AIGA (American Institute of Graphic Arts)-এর “Most Influential Design Trends” তালিকায় স্থান পায়। এসব স্বীকৃতি প্রমাণ করে occult এখন কেবল ভিন্নধারার রুচির অংশ নয়, একটি সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক শক্তি, যা আধুনিক ডিজাইন ও ফ্যাশনের মানদণ্ডে প্রভাব ফেলছে।

আজ occult কেবল পোশাকে নয়, ডিজাইনেরও নানা শাখায় ছড়িয়ে পড়েছে। টাইপোগ্রাফিতে এসেছে runic font, glyph, sigil-styled লেটারিং। Interior design-এ occult aesthetics মানে—মোমবাতি, গাঢ় কাঠ, ট্যারট চিত্র, আর্কিটেকচারাল মড্যুল। Metaverse ও Virtual Fashion-এ occult ডিজাইন মানে holographic সিগিল, অ্যানিমেটেড অন্ধকার aura, ডিজিটাল উইচকোর এর ফলে occult দৃশ্য ও অদৃশ্যের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এক ধরনের ডিজিটাল আত্মপরিচয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে occult ফ্যাশন এখনো মূলধারার বাইরে, কিন্তু এর কুয়াশা ছড়াতে শুরু করেছে। কিছু তরুণ ডিজাইনার সৃষ্টিশীলভাবে ব্যবহার করছেন ত্রিনয়ন, কুণ্ডলিনী, তান্ত্রিক রূপরেখা স্বাধীন আর্ট ব্র্যান্ড occult প্রতীক নিয়ে বানাচ্ছে ব্যাজ, হুডি, পোস্টার। নারী-ডিজাইনাররা occult aesthetics কে নারীর গোপন শক্তির রূপ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এগুলো একধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ যেখানে ব্যক্তি নিজেকে সমাজিক-ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে তুলে ধরছে।

Occult ফ্যাশন একরকম আত্মপাঠ, যেখানে শরীর হয়ে ওঠে ক্যানভাস, প্রতীক হয়ে ওঠে ভাষা এবং গোপন চেতনা ফিরে আসে সৌন্দর্য ও শক্তির মোড়কে।

সিন্ধু পানি চুক্তি আর পুনর্বহাল করবে না ভারত : অমিত শাহ, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারত আর কখনোই ইসলামাবাদের সঙ্গে সিন্ধু পানি চুক্তি পুনর্বহাল করবে না এবং পাকিস্তানে প্রবাহিত পানি অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেবে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার ভারতীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহ এমনটি বলেছেন।

দৈনিকটিকে অমিত শাহ বলেন — “একটি খাল নির্মাণ করে পাকিস্তানে প্রবাহিত পানি আমরা রাজস্থানে নিয়ে যাবো। পাকিস্তান পানির অভাবে ভুগবে যা তারা অন্যায্যভাবে পাচ্ছিল।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহর সর্বশেষ এই মন্তব্যে নিকট ভবিষ্যতে চুক্তিটি নিয়ে ইসলামাবাদের আলোচনার আশা ম্লান হয়ে গেল।

গত মাসে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ভারত নিম্নপ্রবাহে পাকিস্তানের কৃষিজমিগুলোতে সেচ সরবরাহ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী থেকে পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে।

পাকিস্তান অতীতে বলেছে, চুক্তিতে কোনো এক পক্ষের একতরফাভাবে সরে যাওয়ার কোনো বিধান নেই এবং পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত নদীর পানি আটকে দেওয়াকে প্রচেষ্টাকে ‘যুদ্ধের উস্কানি’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ভারতের সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে পাকিস্তান।

কাশ্মীরের পাহেলগামে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার পর এর পেছনে ইসলামাবাদ আছে বলে অভিযোগ করে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি ‘স্থগিত’ করে নয়া দিল্লি। পাকিস্তানের কৃষি সেচের ৮০ শতাংশ পানি নিশ্চিত হয়েছিল এই চুক্তির মাধ্যমে। পাকিস্তান ওই হামলায় নিজেদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

কেন আদিবাসী দর্শনের দিকে ফিরে তাকাবো?

আজকের পৃথিবীটা উন্নত প্রযুক্তি আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ছায়ায় বেঁচে থাকলেও, প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, মানুষ আত্মিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, এবং আমরা এমন এক সমাজব্যবস্থায় আটকে যাচ্ছি, যা অনেকের জন্য উপযুক্তই নয়। ফলে প্রশ্ন জাগে দর্শনের কাজ যদি হয় ‘কেন বাঁচি’ আর ‘কীভাবে বাঁচা উচিত’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, তবে আমাদের আধুনিক দর্শন কীভাবে এমন এক পথে আমাদের নিয়ে এল যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের ও আমাদের পরিবেশের ধ্বংস ডেকে আনছি?

পশ্চিমা ও প্রাচ্য দর্শনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে তুলনামূলক চিন্তা চলেছে। উপনিষদ, গীতা কিংবা দাও দে চিং-এর মতো দর্শন পশ্চিমে জনপ্রিয় হলেও, এই দর্শনগুলিও যুদ্ধ থামাতে পারেনি, কিংবা আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য কার্যকর জীবনদর্শন উপহার দিতে পারেনি। সেই অভাব পূরণে আদিবাসী দর্শন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।

Miguel van der Velden দেখিয়েছেন আদিবাসী দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবীর প্রতি গভীর আধ্যাত্মিক ও অস্তিত্ববাদী সম্পর্ক, যা কেবল চিন্তার বিষয় নয়, বরং জীবিত অভিজ্ঞতা। পশ্চিমে ঈশ্বরকে ভাবা হয় জগতের বাইরের এক সত্তা হিসেবে (transcendent), আর প্রাচ্যে ঈশ্বর জগতের অন্তর্গত (immanent)। কিন্তু আদিবাসী দর্শন বলে জগৎটাই ঈশ্বর। এই ধারণা স্পিনোজার মতবাদের সঙ্গেও সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে আদিবাসী সমাজে এটা কেবল এক দার্শনিক মত নয়, জীবনের পদ্ধতি।

জগৎ এখানে শুধুমাত্র বস্তুগত জিনিসপত্রের সমষ্টি নয়। গাছ, নদী, পাহাড়, পশু, মানুষ সব কিছু একটি বৃহৎ চেতনার অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে, আমরা পৃথিবীর উপর আধিপত্য করতে আসিনি, বরং তার সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠতে এসেছি। যখন বলা হয় “পৃথিবী আমাদের মা”—তখন তা শুধু এক কাব্যিক উপমা নয়, বরং নারী, প্রজনন, খাদ্য, পরিবেশ ও নৈতিক দায়িত্বের সম্মিলিত দার্শনিক দৃষ্টিকোণ।

তবে আদিবাসী দর্শন বলতে একক কোনো মতবাদ বোঝানো ঠিক নয়। পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার ধারক। কিন্তু তাদের মাঝে একটি মৌলিক মিল হলো তারা সবাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করে এবং তাদের সাংস্কৃতিক আধ্যাত্মিকতা ভূমির সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

আদিবাসী পরিচয়ের মূলতত্ত্ব হচ্ছে ভূমির সঙ্গে সংযোগ। অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী হয়তো ঐ ভূমির প্রথম বাসিন্দা নয়, কিন্তু তাদের সংস্কৃতি সেই ভূমির সাথে এমনভাবে মিশে আছে যে, সেটাই হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। জমি তাদের কাছে শুধুমাত্র চাষের ক্ষেত্র নয়, বরং তাদের পূর্বপুরুষ, ভাষা, উৎসব, মৃত্যুর ধারণা, এমনকি বিচার ব্যবস্থারও ভিত্তি।

এভাবেই দর্শন জন্ম নেয়। দর্শন তাদের কাছে জীবনের অংশ, বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয় নয়। আদিবাসী সমাজে প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি গান, প্রতিটি গল্প সবই জীবনের গভীর ভাবনা বহন করে।

প্রশ্ন আসে আদিবাসী দর্শন কীভাবে দার্শনিক চিন্তায় স্থান করে নেয়?

আদিবাসী দর্শন জগৎকে দ্বৈত নয়, সান্নিধ্যমূলকভাবে দেখে। পশ্চিমা ‘দ্বৈতবাদ’ বলে শরীর আর আত্মা আলাদা, আলো আর অন্ধকার বিপরীত। প্রাচ্যের ‘অদ্বৈতবাদ’ বলে সবই এক। কিন্তু আদিবাসী দর্শন এক অদ্ভুত ভারসাম্য রক্ষা করে, তারা বলে সব কিছু একই উৎস থেকে এসেছে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা পৃথক, তবুও সংযুক্ত। এখানে আত্মপরিচয় মানে একযোগে স্বতন্ত্রতা ও পারস্পরিকতা।

ক্ষমার ধারণাও ভিন্ন। আধুনিক সমাজে ক্ষমা আত্মিক ব্যাখ্যার বিষয় ‘আমি কষ্ট ভুলে যাচ্ছি’। কিন্তু Wayuu জাতিগোষ্ঠীর মতো অনেক আদিবাসী সমাজে ক্ষমা ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক। কোনো ভুল হলে তার সমাধান আসে এক অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে, যেখানে অপরাধী, ক্ষতিগ্রস্ত, পরিবার ও সম্প্রদায়ের সবাই অংশ নেয়। এখানে ক্ষমা মানে সামগ্রিক পুনর্মিলন, ব্যক্তি নয় সম্প্রদায়কে জুড়ে দেওয়া।

তৃতীয়ত আদিবাসী দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে টিকে থাকা যায়। আদিবাসী সমাজ প্রকৃতিকে ব্যবহার করেনি, তার সঙ্গে সহাবস্থান গড়েছে। এই সহাবস্থানের কারণেই তারা টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। আর এখানেই রয়েছে তাদের দর্শনের মূল্য।

আত্মপরিচয়ের সংকটে থাকা বর্তমান প্রজন্মের জন্য আদিবাসী দর্শন হতে পারে এক পুনর্জন্মের পথ। Miguel van der Velden লিখেছেন তরুণরা আজ আত্মিকভাবে ছিন্নভিন্ন। তারা আধ্যাত্মিকতা খোঁজে কিন্তু পায় না। আদিবাসী দর্শন এখানে এক নতুন স্পর্শ দেয় যেখানে আধ্যাত্মিকতা মানে নিজেকে প্রকৃতির মধ্যে পুনরায় আবিষ্কার করা।

শেষ পর্যন্ত আদিবাসী দর্শন আমাদের এই সংকটপূর্ণ সময়ে নতুন পথ দেখাতে পারে যেখানে মানুষ শুধু একক সত্তা নয়, বরং একটি বৃহৎ জীবন্ত সত্তার অংশ হয়ে যায়। আধুনিক দর্শন যেখানে ভাবনার অনুশীলন, আদিবাসী দর্শন সেখানে জীবনের চর্চা।