Home Blog Page 66

বিশ্বজুড়ে একাকীত্বের নতুন বাস্তবতা

একসময় মানুষ যখন একাকী হলে কাগজে কলম নিয়ে নিজের কাছে কথা বলত, ডায়েরী লিখতো। গান শুনতো বা নিজের পছন্দের কিছু করে নিজেকে প্যাম্পার করার চেষ্টা করতো। আর আজকের সময়ে একাকীত্ব মানেই দাঁড়ায় একটা ঝলমলে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা, আর মাঝে মাঝে কোনো এআই’য়ের সাথে আড্ডা দেওয়া বা পরামর্শ ও সান্ত্বনা খোঁজা।

কিন্তু সমাজ যখন এত উন্নত হয়েছে, যোগাযোগ সহজ হয়ে উঠেছে, তখন কেন মানুষ এই অভূতপূর্ব একাকীত্বের মধ্যে আটকা পড়ছে? কেন আমরা এত বিচ্ছিন্ন বোধ করছি? বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, কারণ একাকীত্ব শুধু মানসিক বিষণ্নতা নয়; এটি সামাজিক সংকট, যার পরিধি আমাদের শরীর ও মনকে দংশন করছে।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Pew Research Center-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩৫% মানুষ একা । ২০১৮ সালের তুলনায় এটা প্রায় দ্বিগুণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের (১৮-৩০ বছর) মধ্যে একাকীত্বের হার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২২ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৭০ মিলিয়ন মানুষ বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগজনিত মানসিক রোগে ভুগছেন, যার বড় একটি অংশ একাকীত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।

COVID-১৯ মহামারীর প্রভাবে একাকীত্বের মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। গবেষণা বলছে, মহামারী-পরবর্তী সময়ে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার হার প্রায় ৪৫% কমে গেছে।

মনোবিজ্ঞানী Julianne Holt-Lunstad-এর গবেষণা থেকে জানা যায়, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি ২৯% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়, এটি প্রায় ধূমপানের সমপরিমাণ। এছাড়াও একাকীত্ব ডিমেনশিয়া ও মস্তিষ্কের জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।

একাকীত্ব ও বিষণ্ণতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, এটা আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৪৫,০০০ মানুষ আত্মহত্যা করে, যার পেছনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

নিউরোসায়েন্টিস্ট Marco Iacoboni ব্যাখ্যা করেন, মানুষের মস্তিষ্কে “মিরর নিউরন” নামের কোষ রয়েছে, এই অংশ অন্য মানুষের আবেগ ও আচরণ বুঝতে সাহায্য করে। এই মস্তিষ্কীয় প্রক্রিয়া সরাসরি মানুষের সাথে যোগাযোগে হয়, ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল সংযোগে অনুপস্থিত থাকে। ফলে শুধুমাত্র স্ক্রিনের মাধ্যমে যোগাযোগে একাকীত্ব দূর হয় না, বরং তা বাড়তে পারে।

প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্থান, একদিকে যোগাযোগ সহজ করেছে, অন্যদিকে সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে দিয়েছে। এখন অনেকের “ফ্রেন্ডস” বা “ফলোয়ার্স” অনেক, কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা কম।

শহুরে জীবনের অব্যবস্থা, পরিবারের ছোট হওয়া এবং কাজের চাপ মানুষের কাছে সামাজিক সময় ও সম্পর্ক গড়ে তোলার জায়গা সংকুচিত করেছে। একজন ব্যক্তি দিনে গড়ে ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কর্মক্ষেত্রে কাটায়, যেখানে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কম থাকে। তরুণ সমাজে আত্মপ্রচার ও সামাজিক চাপ একাকীত্ব বাড়াতে অবদান রাখে। একদিকে তারা সংযুক্ত হতে চায়, অন্যদিকে মায়াময় গ্ল্যামারাস ভঙ্গিতে নিজেদেরকে গোপন করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাকীত্ব মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। যেমন:
কমিউনিটি সেন্টার ও পাবলিক স্পেসের মতো ভালো পরিকল্পিত জনস্থানগুলো সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পার্ক, লাইব্রেরি, খোলা মাঠ মানুষের আন্তরিক মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরি করে। স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম ও সামাজিক গ্রুপ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়বদ্ধতা তৈরি করে একাকীত্ব কমায়। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সেবা প্রসার মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য করে , এতে একাকীত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের মাত্রা কমানো সম্ভব। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অব্যাহত থাকবেই। আমাদের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তিকে সামাজিক বন্ধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, মেশিনে সম্পূর্ণ নির্ভর না করে মানুষের অন্তর্গত সংযোগকে অক্ষুণ্ণ রাখা। শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, এবং সমাজকে একত্রিত করে মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করতে হবে। বন্ধুত্ব, আস্থা ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠায় সময় ও শ্রম দেওয়া প্রয়োজন।

একাকীত্ব শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি আধুনিক সমাজের গভীর সংকটও। সাম্প্রতিক গবেষণায় এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট, যা আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য মারাত্মক। আমাদের প্রয়োজন মানবিক সংযোগের গুরুত্ব বোঝা এবং সামাজিক নীতির মাধ্যমে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। প্রকৃত বন্ধুত্ব ও আন্তরিক সম্পর্কই হবে আমাদের একাকীত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা।

আজকের এই বিশ্বে, আমরা প্রযুক্তির নানা সুবিধা পাচ্ছি, কিন্তু তার ছায়ায় মানব সম্পর্ক যেন ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে। আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই, একে অপরের জন্য সময় বের করি, সম্পর্কের গভীরতা বুঝি এবং একাকীত্বের অদৃশ্য এই বিপর্যয় থেকে সমাজকে রক্ষা করি।

চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে চীনে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর এই তিন দেশের সমন্বয়ে ‘একটি সম্ভাব্য জোট’ গঠন হতে যাচ্ছে কিনা এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিন দেশের মধ্যে এটিই এ ধরনের প্রথম বৈঠক।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে–মূলত চীনের উদ্যোগেই এ বৈঠকটি হয়েছে, যাকে তিন দেশই ‘অনানুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এ বৈঠকে ‘সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা’র বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার চীনের কুনমিং-এ নবম চায়না-সাউথ এশিয়ান এক্সপজিশন অ্যান্ড দ্যা সিক্সথ চায়না-সাউথ এশিয়া কো-অপারেশন’- শীর্ষক বৈঠকের সাইডলাইনে তিন দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম আলো জানিয়েছে, গত মাসের মাঝামাঝি চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে কুনমিংয়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ বৈঠকে যোগ দেওয়া নিয়ে দ্বিধায় ছিল। কারণ, বৈঠকের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে চীন তখন কোনো কিছু স্পষ্ট করেনি। বৈঠকে বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তান বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে তিন পক্ষের সহযোগিতা বাস্তবায়নে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের কথা বলা হলেও বাংলাদেশ এতে রাজি হয়নি। তিন দেশের বৈঠকের পর চীন যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এ প্রস্তাবেও বাংলাদেশ রাজি হয়নি। তখন ঠিক হয়, চীন ও পাকিস্তান আলাদাভাবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে।

বাংলাদেশ তখন দুই দেশকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে তার খসড়া দেখানোর অনুরোধ জানায়। খসড়ার একাধিক বিষয়ে বাংলাদেশ ভিন্নমত জানায়। তার মধ্যে মূল আপত্তি ছিল জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রসঙ্গটি। বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও চীন গত শুক্রবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। আর পাকিস্তান তাদের বিজ্ঞপ্তির খসড়া বাংলাদেশকে দেখায়নি।

পাকিস্তানের বিজ্ঞপ্তিতে ‘বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর প্রথম বৈঠক’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কি তিন দেশের মধ্যে নতুন কোনো জোট গঠন হয়েছে? নাকি চীন নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ কুনমিংয়ের বৈঠকে জেডব্লিউজি গঠনে রাজি হয়নি। মূলত বেশ কিছু খাতে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় কোনো জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়নি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে দেওয়া বিবৃতিতে বৈঠকটিকে ‘অনানুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক’ উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে–বৈঠকে বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তান আঞ্চলিক শান্তি, উন্নতি ও স্থিতিশীলতার দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে।

বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈঠকে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ম্যারিটাইম অ্যাফেয়ার্স, তথ্য প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন।

প্রথম আলোর ভাষ্যমতে–সাবেক ও বর্তমান বেশ কয়েকজন কূটনীতিক মনে করেন, কুনমিংয়ে গত বৃহস্পতিবারের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক বাংলাদেশ এড়িয়ে চললেই ভালো হতো। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক ও বিশ্লেষক ওবায়দুল হক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, রাজনৈতিক সরকারগুলোর পক্ষে এ অঞ্চলে ভারতকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে আরেকটি জোটের দিকে অগ্রসর হওয়া কঠিন হবে এবং সে কারণেই চীন বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাকেই এ উদ্যোগের জন্য বেছে নিয়ে থাকতে পারে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলছেন, এ উদ্যোগের পেছনে ভারতকে একটা ‘বার্তা’ দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা, এই তিন দেশ শেষপর্যন্ত কীভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, সেটাই হবে দেখার বিষয়।

চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই স্থিতিশীল। দেশটি এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে।আবার সেই সরকারের পতনের পর বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে রোববার রাতে চীন সফরে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব) আ ন ম মুনীরুজ্জামান দৈনিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, চীনের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় এটাই প্রথম একাধিক দেশকে জড়িয়ে নেওয়া শক্ত, কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ। যেসব বিষয় বিজ্ঞপ্তিতে আছে, তার মধ্যে সমুদ্র ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিংক ট্যাংক) নিয়ে তিন দেশের কাজ করার আগ্রহের ব্যাপক তাৎপর্য আছে। এ বিষয়গুলো তিন দেশেরই প্রতিবেশী ভারত, বৈশ্বিক দিক থেকে প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর বিষয়ে আগ্রহী দেশগুলোর নজরের বাইরে থাকার কথা নয়।

ভারতে বাংলাদেশের সাবেক একজন হাইকমিশনার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এমনিতেই সমস্যার শেষ নাই। কেন আমরা (বাংলাদেশ) নতুন সমস্যা যোগ করছি!’ অন্য একজন কূটনীতিক বলেন, এ উদ্যোগে ‘অংশ নিয়ে’ ভবিষ্যতে পিছিয়ে যাওয়াও চীনের সঙ্গে ঝামেলা তৈরি হতে পারে।

ভার্চুয়াল পপস্টার ‘Noonoouri’

ভাবুন তো আপনি আপনার প্রিয় গায়িকার গান শুনছেন। ইউটিউবে লক্ষ লক্ষ ভিউ, ইনস্টাগ্রামে ঝলমলে ছবি, টিকটকে ভাইরাল ট্রেন্ড সবকিছু দেখে আপনি মুগ্ধ। কিন্তু হঠাৎ জানতে পারলেন, এই গায়িকা আদৌ মানুষই না। তাঁর গলা, মুখ, পোশাক সবই ডিজিটাল। এমনকি তিনি ক্লান্ত হন না, ভুল বলেন না, বিতর্কে জড়ান না। তিনি নিখুঁত, কারণ তিনি তিনি শুধুই কোড, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফল। এটাই এখন বাস্তব। আর এর কেন্দ্রে আছে একটি নাম: Noonoouri।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান ডিজাইনার জোর্গ জুবার এই ভার্চুয়াল চরিত্র Noonoouri তৈরি করেন । প্রথম দিকে ফ্যাশন-ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত হলেও, হঠাৎ করেই সংগীত জগতে পা রাখে এই চরিত্রটি। Warner Music-এর সঙ্গে চুক্তি করে সে, আর প্রকাশ পায় তার প্রথম গান “Dominoes”। এই গানটি কণ্ঠ দিয়েছে AI, যার ভয়েস ক্লোন করা হয়েছে একটি বাস্তব মানুষের কণ্ঠ থেকে। তবে বাস্তবের কোনো উপস্থিতি নেই। শুধু ডিজিটাল পার্সোনা, নিখুঁত রূপ, আর একটি কল্পিত জীবনযাপন।

Noonoouri গান গায়, মডেলিং করে, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের হয়ে কাজ করে এবং সবসময় সামাজিক বার্তাবহ হয়ে ওঠে। সে নারীবাদ, পরিবেশ-সচেতনতা কিংবা প্রাণী অধিকার নিয়ে কথা বলে তাও নিখুঁতভাবে, কোনো বিতর্ক ছাড়াই এবং তার ফলোয়ার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে তারকা ব্র্যান্ডের অংশীদারিত্ব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ডিজাইনারদের প্রচারে অংশগ্রহণ সবই এক নিখুঁত প্রোগ্রামড পরিকল্পনার ফল।

এই ঘটনাগুলো কেবল বিনোদন বা কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং পুরো সংগীতশিল্পের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা। Noonoouri-এর উত্থান আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে তারকা মানেই কি এখন মানুষ? না কি একটি সুনির্মিত ব্র্যান্ড-চরিত্রও এখন শিল্পের ভবিষ্যৎ?

একজন ভার্চুয়াল শিল্পী তৈরি হয় একাধিক ধাপে। প্রথমে ডিজিটাল সফটওয়্যারের সাহায্যে চরিত্রের গঠন ও রূপ নির্ধারণ করা হয়। এরপর AI ভয়েস ক্লোনিং ব্যবহার করে কণ্ঠ বানানো হয়। এরপরে গানের কম্পোজিশন, ভিডিও সম্পাদনা ও বাজারজাতকরণ সবকিছুই ঘটে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায়। আর সবশেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে উপস্থাপন করা হয় এমনভাবে যেন সে আমাদেরই মতো। যেন আমরা ভুলে যাই সে একজন কাল্পনিক অস্তিত্ব।

এই ধরনের চরিত্রগুলো এত জনপ্রিয় হচ্ছে কেন? কারণ তারা কখনো ক্লান্ত হয় না, ভুল করে না, বিতর্কে জড়ায় না। তাদের পেছনে কাজ করছে একটি দক্ষ টিম যারা প্রতিমুহূর্তে বিশ্লেষণ করছে ট্রেন্ড, ডিজাইন করছে নতুন গানের স্টাইল, সাজাচ্ছে নতুন ভিডিও কনসেপ্ট। এক কথায় তারা একটি সর্বদা সক্রিয়, নিয়ন্ত্রিত ব্র্যান্ড। আর নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে Gen Z, এই ডিজিটাল পার্সোনা নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে যাচ্ছে। তাদের কাছে বাস্তবতা আর ভার্চুয়ালের সীমারেখা আগেই ঝাপসা হয়ে গেছে।

Noonoouri একা নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার K-pop ইন্ডাস্ট্রিতেও ভার্চুয়াল সদস্য নিয়ে গঠিত গার্ল ব্যান্ড ‘MAVE:’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তাদের সদস্যরা AI দ্বারা নির্মিত এবং গানগুলোও প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি হচ্ছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ এই নতুন ধারা তরুণ শ্রোতাদের একধরনের প্রযুক্তিনির্ভর রোমাঞ্চ দিচ্ছে।

কিন্তু এই উত্থানের পেছনে কী হারিয়ে যাচ্ছে? মানব শিল্পীদের জায়গা কি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে? উত্তরটি সহজ না, কিন্তু চিন্তার বিষয় অনেক। একটি AI শিল্পী দিনে দশটা গান তৈরি করতে পারে, প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক অ্যালগরিদম অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করে এবং প্লে-টাইম বাড়ানোর জন্য নিজেকে সবদিক থেকে পরিবর্তন করতে পারে। সেখানে একজন মানব শিল্পীর পক্ষে এত দ্রুততা ও নমনীয়তা রাখা সম্ভব নয়। ফলে রেকর্ড কোম্পানি, ব্র্যান্ড, এমনকি প্ল্যাটফর্মগুলোও ধীরে ধীরে এই AI শিল্পীদের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।

তবে মানব শিল্পীরা এখনো একটি বড় শক্তি। তারা লাইভ কনসার্টে গান গায়, দর্শকদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে অনুভূতির আদানপ্রদান করে। তাদের ব্যর্থতা, মানসিক যন্ত্রণা, সাফল্যের লড়াই সবই মানুষকে স্পর্শ করে। এই স্পর্শ AI কখনোই পরিপূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।

সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সাররা ব্র্যান্ডের জন্য চমৎকার ROI দেয়, বেশি ইন্টারেকশন আনতে পারে।

পৃথিবীর বড় বড় এজেন্সিগুলো আজ এই ভার্চুয়াল তারকাদের নিয়ে সিরিয়াস ইনভেস্টমেন্ট করছে। যেমন, লিল মিকেলা নামে আরেকজন ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার যিনি ২০১৬ সাল থেকে ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় এবং এখন মিলিয়ন ফলোয়ারের মালিক। Noonoouri তাদেরই আধুনিক উত্তরসূরি আরও উন্নত, আরও গতিশীল, এবং আরও পরিপূর্ণরূপে বাজারমুখী।

তাহলে কি এই AI শিল্পীরা আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে মানব শিল্পীদের স্থান দখল করে নেবে? নাকি তারা একসাথে সহাবস্থান করবে? অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের সংগীতে মানুষ ও মেশিন একত্রে কাজ করবে। একজন মানব গায়ক হয়তো একদিন মঞ্চে গান গাইবেন একজন ডিজিটাল শিল্পীর সঙ্গে। তাদের সম্মিলিত সৃষ্টিতেই জন্ম নেবে নতুন এক সঙ্গীতজগৎ।

Noonoouri আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির যুগে তারকা হওয়া মানেই কেবল প্রতিভা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত নির্মাণ। আর এই নির্মাণ যদি মানুষের বাইরেও সম্ভব হয়, তবে শিল্পের সংজ্ঞা কি পরিবর্তিত হচ্ছে? এই প্রশ্নটাই আজকের সংগীতচর্চার কেন্দ্রবিন্দু।

ইসরায়েলে ২০ লাখ রুশভাষীর বাস, রাশিয়াকে তাঁদের কথা ভাবতে হয় : পুতিন

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরে শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের মূল অধিবেশনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন — রাশিয়ার সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ এবং ঐতিহাসিক। অন্যদিকে, ইসরায়েলের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ রুশভাষী। তাই সরাসরি একটি পক্ষকে সমর্থন না করে কূটনৈতিক সমাধান চায় রাশিয়া।

ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ‘ইসরায়েলে প্রায় ২০ লাখ রুশভাষী রয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক রুশভাষী রয়েছে যে ইসরায়েলকে একটি রুশভাষী দেশ বললেও ভুল হবে না। আমাদের ইতিহাস ও বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রায় ১৫ শতাংশ নাগরিকই মুসলমান। এর বাইরেও আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, আস্থানির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রেই মিত্রসুলভ। আমরা ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পর্যবেক্ষক সদস্যও।’

ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির পক্ষে রাশিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে পুতিন বলেন, ‘আমরা কেবল কথায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপেও ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিকে সমর্থন করি। বুশেহরে আমরা একটি পরমাণু রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করেছি। নানা চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি সত্ত্বেও এই কাজ আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট জানান, সংঘাত শুরুর পর থেকেই তিনি ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছেন এবং তাঁদের কাছে সমঝোতার কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব প্রস্তাবে দুই পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—উভয় বিষয়েই ভারসাম্য রাখার কথা বলা হয়েছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাশিয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামতে চায় না। তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল কিছু ধারণা দিচ্ছি। যদি তেহরান এবং পশ্চিম জেরুজালেম এগুলোতে সাড়া দেয়, আমরা তাতে খুশি হবো।’

ট্রাম্পের পোস্টে ইরানে সরকার পরিবর্তন

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার একদিন পর ইরানের সরকার পরিবর্তন বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি বলেছেন “সরকার পরিবর্তন টার্মটার ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে সঠিক নয়। কিন্তু যদি ইরানের বর্তমান সরকার ইরানকে আবার মহান করতে অক্ষম হয়, তাহলে কেন সেখানে সরকার পরিবর্তন হবে না?”

রোববার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ট্রাম্পের পোস্টের শেষে ইংরেজি বড় অক্ষরে লেখা ‘এমআইজিএ’-কে ‘মেইক ইরান গ্রেট এগেইন’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ ধরা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ও তার সমর্থকরা প্রায়ই তাদের স্লোগান ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-কে সংক্ষিপ্ত করে এমএজিএ বা মাগা বলে থাকে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে – ট্রাম্প এমন এক সময়ে ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলানোর প্রসঙ্গ তুললেন, যখন ইরানে হামলা নিয়ে তার ‘মাগা’ সমর্থকরা দ্বিধাবিভক্ত; তার প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তাও ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলানোর লক্ষ্য ওয়াশিংটনের নেই বলে বারবার আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন।

এর আগে সকালেই তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটে হেগসেথ বলেছিলেন “যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানটি সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে ছিলো না। আমরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শেষ দেখতে চেয়েছি”।

এ মাসের ১৩ তারিখ ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় আচমকা আঘাত হানা ইসরায়েলের নেতারা গত কয়েকদিন ধরে প্রায়ই বলেছেন, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানে শাসন করে আসা কট্টরপন্থি শিয়া মুসলিম মোল্লাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা।

কিন্তু রোববার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

এর আগে সবশেষ রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকে মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে, এমন অভিযোগ করে সরকার পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। পরে ওই অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হয়েছিলো।

সরকার পরিবর্তন ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকানদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে রিপাবলিকানদের বড় অংশের মধ্যেই আপত্তি আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বুশ যুগের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়েছিলেন।

প্রাচীন সভ্যতার পেছনে আছে ভিনগ্রহের নভোচারী

সভ্যতার প্রতিটি স্তরে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন থাকে। মিশরের পিরামিড কীভাবে গড়া হয়েছিল? কে প্রথম সূর্য পূজা শুরু করেছিল? কিংবা কোন প্রযুক্তিতে হাজার বছর আগে পাথরের ওপর এমন নিখুঁত ভাস্কর্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল?

এইসব প্রশ্নের ভেতরেই জন্ম নেয় বিতর্কিত কিন্তু দারুণ জনপ্রিয় তত্ত্ব Ancient Astronaut Theory। এই তত্ত্ব অনুসারে প্রাচীনকালে ভিনগ্রহী প্রাণীরা পৃথিবীতে এসেছিলেন, যাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং উপস্থিতি মানবসভ্যতার ধর্ম, স্থাপত্য ও বিজ্ঞানের ওপর সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

এই তত্ত্বের জনপ্রিয়তা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে এরিখ ভন ড্যানিকেন-এর লেখা Chariots of the Gods? বইটি প্রকাশের পর। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন নিদর্শন, যেমন বিশাল পিরামিড, অসাধারণ খোদাই, রহস্যময় দেবতাদের চিত্র এসব কিছুই হতে পারে এমন কিছুর প্রমাণ, যা মানুষ একা করতে পারেনি।
ভন ড্যানিকেনের বক্তব্য ছিল, মানুষের অতীত ইতিহাসের পেছনে এক ‘অদৃশ্য প্রযুক্তি’ কাজ করেছিল, যা হয়তো ছিল ভিনগ্রহী কোনো বুদ্ধিমত্তার ফল।

তত্ত্বটি শুধু অনুমাননির্ভর নয়, অনুসারীরা একে বাস্তবতার নানা নিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করেন। কিছু বিখ্যাত প্রমাণ হলো:

মিশরের পিরামিড:
খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ সালে গিজার পিরামিড নির্মাণ হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রতিটি পাথরের ব্লক ওজন ২.৫ টন, যা ২০ লাখেরও বেশি ব্লকে নির্মিত। এত বিশাল কাঠামো যেখানে কোন ধাতব সরঞ্জামের ব্যবহারও ছিল না কি করে এত নিখুঁতভাবে নির্মাণ করা সম্ভব? অনেকে বলেন, এর পেছনে থাকতে পারে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা।

নাসকা লাইনস (পেরু):
পৃথিবীর মাটিতে আঁকা প্রায় ৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের চিত্রকর্ম, যেটি শুধুমাত্র আকাশ থেকে দেখা যায়। এসব রেখার মধ্য দিয়ে বানানো হয়েছে বানর, পাখি, অদ্ভুত জীব ও জ্যামিতিক আকৃতি। ভূমি থেকে না দেখে এত নিখুঁত আঁকাজোকা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?

ইনকা সভ্যতার মাচু পিচু ও অলমেক ভাস্কর্য:
বিশাল পাথরের ব্লক এমনভাবে কাটা ও জোড়া লাগানো হয়েছে যাতে সূক্ষ্ম সুতো পর্যন্ত ঢুকানো যায় না। আধুনিক কালের লেজার কাটিং ছাড়া এত নিখুঁত নির্মাণ কি সম্ভব?

ভারতের প্রাচীন সাহিত্য:
‘রামায়ণ’-এ পুষ্পক রথ বা আকাশযানের বিবরণ দেওয়া আছে। ‘মহাভারত’-এ রয়েছে “দেবতাদের যুদ্ধ”, “অগ্নিবাণ”, এমনকি আণবিক বিস্ফোরণের বর্ণনাও। এগুলো কি স্রেফ কল্পনা? নাকি ভিনগ্রহী প্রযুক্তির প্রতিফলন?

ধর্মগ্রন্থে ভিনগ্রহীদের ছায়া?
বাইবেলের ইজেকিয়েল নামক এক নবী আকাশ থেকে আগত একটি জ্বলজ্বলে চক্রাকার যানের বর্ণনা দেন। তত্ত্বকারীদের মতে, এটি হতে পারে একটি UFO বা ভিনগ্রহী যান। সুমেরীয় সভ্যতায় ‘অ্যানুনাকি’ নামে কিছু দেবতার কথা বলা হয়, যারা ‘আকাশ থেকে নেমে এসেছিল’ এবং মানুষকে চাষাবাদ, গণনা, বিজ্ঞান শেখায়। এই ‘অ্যানুনাকি’দের অনেকেই মনে করেন অন্য গ্রহ থেকে আগত প্রাণী।

এই তত্ত্বের আরও জনপ্রিয়তা আসে History Channel-এর Ancient Aliens প্রামাণ্যচিত্র সিরিজের মাধ্যমে। Giorgio Tsoukalos সহ বেশ কয়েকজন তত্ত্বকার এই ধারনাটি আরও বিস্তৃত করেন। তারা বলেন, শুধু স্থাপত্য নয় পুরাকথা, ধর্মীয় চিত্রশিল্প, এমনকি DNA-তেও রয়েছে সেই আগন্তুকদের ছাপ।

তবে সমালোচনারও অভাব নেই। মূলধারার প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদরা বলেন:এই তত্ত্ব মানব ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির অবমূল্যায়ন করে। প্রাচীন মানুষের অসাধারণ কল্পনা, প্রযুক্তি ও পরিশ্রমকে অস্বীকার করা হয়। কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যা এই তত্ত্বকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে। একাধিক গবেষক বলেন, এটা একধরনের ইউরো-সেন্ট্রিক চিন্তা বিশেষ করে যখন আফ্রিকান, ল্যাটিন আমেরিকান বা ভারতীয় সভ্যতার কৃতিত্বকে ‘ভিনগ্রহীদের’ বলে চালানো হয়।

তত্ত্বটি সত্য হোক বা না হোক, এটা মানুষের এক চিরন্তন জিজ্ঞাসার প্রতিফলন, মানুষ কি সত্যিই শুধুমাত্র নিজের শক্তিতে এই সভ্যতা গড়েছে, নাকি আমাদের অতীতে এসেছিল এমন কেউ, যাদের আমরা ঈশ্বর, দেবতা কিংবা ‘আকাশের অতিথি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি?
আজকের দিনে যতই বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, ততই এই প্রশ্নগুলো নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। UFO-র ভিডিও ফাঁস, NASA ও Pentagon-এর স্বীকারোক্তি সব মিলিয়ে এ তত্ত্ব হয়তো খুব শীঘ্রই আর শুধুই কল্পনা থাকবে না।

‘প্রাচীন নভোচারী’ তত্ত্ব কোনো পবিত্র সত্য নয়, আবার সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্যও নয়। এটি একটি দরজা খুলে দেয় যা দিয়ে আমরা অতীতকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পারি।

ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া – চমকে দিল হাজার বছরের প্রাচীন টোটকা

বিগত কয়েক দশক ধরেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যখন অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তখন পুরনো চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর প্রতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি ১০০০ বছর পুরনো অ্যাংলো-স্যাক্সন চিকিৎসা রেসিপি আলোচনায় এসেছে, যা ল্যাবরেটরিতে MRSA-এর মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিককে টপকে কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

এই প্রাচীন ওষুধের নাম ‘Bald’s Eye Salve’। ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের একটি গবেষণা দল এই রেসিপি পুনর্গঠন করে বিশ্লেষণ করেছে এবং তা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘Bald’s Leechbook’ নামে পরিচিত একটি ৯ম শতাব্দীর অ্যাংলো-স্যাক্সন চিকিৎসা-গ্রন্থে ‘Bald’s Eye Salve’ নামক একটি সংমিশ্রণ ওষুধের উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি চোখের সংক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। রেসিপিতে ব্যবহৃত উপাদানগুলো হলো রসুন (garlic), পেঁয়াজ বা লিক (onion/leek), পুরনো ওয়াইন, গরুর পাকস্থলীর নির্যাস (ox bile)।

এই উপাদানগুলো মিশিয়ে একটি তামার পাত্রে এক রাত রেখে ওষুধটি প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ছিল। দীর্ঘকাল ধরে একে লোকবিশ্বাস কিংবা ঐতিহ্যগত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আধুনিক গবেষণার আলোকে এটির কার্যকারিতা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. ফ্রেয়া হ্যারিসন এবং তাঁর সহকর্মীরা এই প্রাচীন রেসিপি অনুসরণ করে ল্যাবরেটরিতে ওষুধটি তৈরি করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাকটেরিয়া-প্রতিরোধী সংক্রমণ, বিশেষ করে MRSA (Methicillin-resistant Staphylococcus aureus) এর ওপর এই ওষুধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা।

প্রথমে তাঁরা রেসিপির প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রয়োগ করেন, কিন্তু তেমন কোনো কার্যকর ফল পাননি। এরপর যখন সব উপাদান ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়, তখন দেখা যায় এটি বায়োফিল্ম আকারে গঠিত কলোনির বিরুদ্ধে ৯০% পর্যন্ত MRSA ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম।

ব্যাকটেরিয়ার একটি বিশেষ রূপ হলো বায়োফিল্ম, যেখানে তারা নিজেদের একটি সুরক্ষিত জেলি-আবরণে ঢেকে ফেলে। এই আবরণ ওষুধ প্রবেশে বাধা দেয় এবং চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। হাসপাতালের সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, যন্ত্র প্রতিস্থাপন এসব ক্ষেত্রে বায়োফিল্ম ব্যাকটেরিয়া ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করে।

বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে বায়োফিল্ম ধ্বংস করা একটি জটিল কাজ। অথচ ‘Bald’s Eye Salve’ বায়োফিল্মের বিরুদ্ধেও কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

এই রেসিপির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো একটি উপাদানও একা কার্যকর নয়। কেবল চারটি উপাদান একত্রে মিশ্রিত হলে তৈরি হয় এক ধরনের যৌগিক প্রতিক্রিয়া, যাকে বলে synergistic effect। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক রাসায়নিক যৌগ পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গঠন করে, কিন্তু আলাদাভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। গবেষকরা মনে করছেন ওয়াইনে থাকা অ্যালকোহল, রসুনের অ্যালিসিন, পেঁয়াজের সালফার যৌগ এবং গরুর পাচক রস একত্রে ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর ভেঙে ফেলার মতো যৌগ উৎপাদন করতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও নির্বিচার ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়া নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। ফলে বহু রোগের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ‘Bald’s Eye Salve’ তার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, বহু প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল কুসংস্কার ছিল না; বরং তাদের কার্যকারিতার পেছনে একটি বাস্তব, পরীক্ষিত জ্ঞানভিত্তি ছিল। গবেষণা যদি সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে অতীতের বহু রেসিপি ও পদ্ধতি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে নানা প্রকৃতিনির্ভর ও লোকজ চিকিৎসা-পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার উদ্যোগ চলছে। ‘Bald’s Eye Salve’-এর সাফল্য এসব গবেষণার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

‘Bald’s Eye Salve’-এর কার্যকারিতা প্রমাণ করে প্রাচীন চিকিৎসা-পদ্ধতিগুলো অপ্রাসঙ্গিক নয় বরং তাদের কিছু অংশে অত্যন্ত কার্যকর সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে, এই ধরনের গবেষণা মানবজাতির টিকে থাকার অন্যতম দিক হতে পারে।

মার্কিন হামলার জবাবে কি করতে পারে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ইসরায়েলের চলমান আক্রমণের সঙ্গী হয়ে নাতাঞ্জ, ইশ্ফাহান ও ফোরদোর পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে।

তিন স্থাপনায় মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করেছে ইরানও। এর প্রতিক্রিয়ায় এখন তারা কী করবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও কৌতুহল প্রকট।

বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদক ফ্রাঙ্ক গার্ডনার মনে করছেন, ইরানকে এখন তিন কৌশলের মধ্যে একটি বেছে নিতেই হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, কিছুই না করা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইরান পাল্টা হামলা চালালে ‘আরও তীব্র ও শক্ত জবাবের’ হুমকি দিয়েছেন। তেহরান যদি এখন ওয়াশিংটনের হামলার জবাবে কিছুই না করে তাহলে ট্রাম্পের আরও হামলা থেকে মুক্তি পাবে। এবং এই সূত্রে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনাও জোরদার হতে পারে।

কিন্তু এমন ক্ষেত্রে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভয়ানক দুর্বল দেখাবে। এতদিন ধরে তারা তাদের ওপর হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে জবাব দেওয়ার যেসব হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছিল, সেগুলোকে মনে হবে ‘অক্ষমের আস্ফালন’; মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য দেশে তাদের প্রভাবও ‘নাই’ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় যে বিকল্প এখন ইরানি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির হাতে আছে, তা হল দ্রুত ও কঠোর পাল্টা আঘাত।

ইসরায়েলের এত এত হামলার পরও ইরানের হাতে এখনও বিপুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা ২০টির মতো মার্কিন ঘাঁটিকে নিশানা করতে পারে তারা। ড্রোন এবং দ্রুতগির টর্পেডো নৌযান দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে ‘ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ’ চালাতে পারে তারা।

গার্ডনারের মতে, এখন শেষ যে বিকল্পের কথাও ইরান ভাবতে পারে, তা হল সময় নেওয়া। পাল্টা আঘাত তারা করবে নিজেদের বেছে নেওয়া সময়ে। তারা এখনকার উত্তেজনা থিতিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারে, এবং এমন এক সময়ে হামলা চলাতে পারে যখন মার্কিন ঘাঁটিগুলো সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার কথা ভাববে না।

তবে অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, মুখে ‘কড়া জবাবের’ অঙ্গীকার করলেও ইরান এবং তার তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে এসেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ৯ দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেই পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এদিকে ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ মধ্যে হামাস এবং হিজবুল্লাহর অবস্থাও অনেকটাই শোচনীয়। ইয়েমেনের হুতি আর ইরাকের গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা হামাস বা হিজবুল্লাহর মতো নয়।

ক্লিনটন, বুশ ও ওবামা প্রশাসনে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা ডেভিড ফিলিপস মনে করছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় ট্রাম্পের নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থে পাল্টা আঘাত হানবে।

বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভিজিটর ফিলিপস আল-জাজিরাকে বলেন–‘পারসিয়ান জাত্যাভিমানের গুরুত্বকে’ খাটো করে দেখলে ভুল করবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলা ‘দীর্ঘ সংঘাতের সূচনা’ করল বলেই আশঙ্কা তার।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের উপপরিচালক অ্যাডাম উইনস্টেইন বলেন — “আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পথে, যা ইচ্ছাকৃত এবং যার সূচনা সে নিজেই করেছে—এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।”

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন — “আমাদের মনে রাখা দরকার যে, দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ নিজেরা প্রথম হামলার শিকার না হয়েও একটি পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশে হামলা চালাল। ইসরায়েলে ইরান হামলা চালায়নি, তেল আবিব যুদ্ধ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান হামলা চালায়নি, এই মুহূর্তে মার্কিনিরা এই সংঘাতে যুক্ত হল।”

তার মতে, ইরানের ওপর এ হামলা ‘বিশ্বকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি’ দেবে। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিশানায় পড়তে পারে, তাদের কাছে পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়া নিরাপত্তা বোধ করা কঠিন হয়ে যাবে।

“তাই আমার ভয় হচ্ছে, আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার দেখতে পাবো। একইসঙ্গে আমার ধারণা, এই পরিস্থিতি প্রায় নিশ্চিত করে দিয়েছে যে, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ইরান একটি পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে,” বলেছেন তিনি।

বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশি পরিবার

এক সময় বাংলাদেশের পরিবার মানেই ছিল এক ছাদের নিচে বহু মানুষের কোলাহল। যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।গ্রীষ্মের দুপুরে ছাদে উঠে আচারের বয়াম চুরি করা, বিকেলে গলিতে ক্রিকেট খেলা, আর সন্ধ্যায় কর্তার পদধ্বনিতে হঠাৎ চুপসে যাওয়া, এই ছিল জীবনের রুটিন। পরিবারের কর্তা মানেই ছিলেন ভয়ের আরাধ্য প্রতিমূর্তি। তার সামনে কেউ খেলনা নিয়ে খেলতো না, হাসতো না, এমনকি উচ্চস্বরে কথা বলাও ছিল নিষেধ!

তবে সময় বদলেছে। এখনকার শহুরে পরিবারে সে রকম দৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বড় বড় ফ্ল্যাটে এখন চারজনের ছোট্ট পরিবার, নীরব নিস্তব্ধ ঘর আর প্রযুক্তিতে ডুবে থাকা সন্তানরা। পরিবার ছোট হয়েছে, সম্পর্কের রূপ বদলেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই বদল আদৌ ভালো না খারাপ?

বাংলাদেশের পরিবার কাঠামো গত কয়েক দশকে এক অনবদ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র, আজ সেখানে আধুনিক নগরায়ন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির ছোঁয়া নতুন এক পরিবার কাঠামো গড়ে তুলেছে। এই রূপান্তর শুধুমাত্র গৃহের আকার বা সদস্যসংখ্যার পরিবর্তন নয়, এটি সামাজিক সম্পর্ক, অভিভাবকত্ব, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা নিয়ে এসেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে ‘যৌথ পরিবার’ ছিলো মানুষের প্রথম সামাজিক সংস্থা। Durkheim-এর ‘মেকানিক্যাল সংহতি’ প্রতিফলিত হতো এই গোষ্ঠীগুলোর বন্ধনে যেখানে রক্ত ও ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠতো। আজকের দিনে নগরায়ন ও আধুনিক জীবনের চাপে পরিবারে ‘অর্গানিক সংহতি’ কাজ করছে, যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে ছোট, নিউক্লিয়ার পরিবার আধিপত্য বিস্তার করছে। পরিবারে সদস্যসংখ্যা কমলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বেড়েছে।

Talcott Parsons-এর ‘প্রাথমিক সামাজিকীকরণ’ ও ‘প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিত্বের স্থিতিশীলতা’র ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক পরিবার সন্তানদের সামাজিকীকরণের মূল কেন্দ্র। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের দ্রুত বৃদ্ধি, নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ ও ভোগবাদী সংস্কৃতি পরিবারের কাঠামো ও ভূমিকা পাল্টে দিয়েছে। দুই অভিভাবকের আয় নির্ভর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও তাদের সময় সংকট জন্মাচ্ছে, যা সন্তানের যত্ন ও মনোযোগে প্রভাব ফেলে। গৃহকর্মী ও ক্যার গিভারদের ওপর পরিবারের নির্ভরতা বেড়েছে, যা ‘কেয়ার ইকোনমি’ বিষয়ে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক উত্থাপন করছে।

Ulrich Beck-এর ‘ইন্ডিভিজুয়ালাইজেশন থিওরি’ অনুযায়ী, আধুনিক সমাজে ব্যক্তিরা পরিবার থেকে স্বাধীন হয়ে নিজের পরিচয় ও জীবনপথ নির্ধারণে অধিক গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের তরুণরা এখন ‘লাভ ম্যারেজ’, ‘ডিভোর্স’ এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তি তাদের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে। টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুকের প্রভাব পরিবারের পারস্পরিক সংযোগকে নতুন আঙ্গিকে পরিবর্তন করেছে। ‘মিডিয়া পরিবার’ ও ‘ডিজিটাল সম্পর্ক’ এখন বাস্তবের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের যুগে পারিবারিক সম্পর্কের ধরন বদলেছে। শিশু ও কিশোররা প্রকৃতির পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে অধিক সময় ব্যয় করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে কিশোরদের গড় স্ক্রিন টাইম দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার মধ্যে। ফলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত ডিজিটালাইজড হচ্ছে, কিন্তু এর সঙ্গে আবেগীয় বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। এই বাস্তবতা পরিবারের আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবী হওয়ার ফলে সন্তানদের প্রতি সময়ের অভাব ক্রমশ বেড়েছে। প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে ‘লেফট বিহাইন্ড ফ্যামিলি’ বা পরিত্যক্ত পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে অর্থ আসে কিন্তু আবেগীয় সঙ্গীনতা কমে যায়। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

বাংলাদেশি পরিবারের কাঠামো ও সম্পর্কের রূপান্তর একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। নগরায়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় পরিবার শুধুমাত্র গৃহ নয় একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। Durkheim-এর মতবাদ অনুসারে, সম্পর্কের ধরন পরিবর্তিত হলেও মানুষের সামাজিক সংযোগের চাহিদা অক্ষুণ্ণ থাকে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিবার কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, সেটাই সমাজতত্ত্ব ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় প্রশ্ন।

সংস্কার সংলাপ : মৌলিক বিষয়ে দলগুলোর দূরত্ব কমেনি, বিএনপি-সমমনা দল বনাম এনসিপি-জামায়াতসহ বাকিরা

সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেনি। সংসদের উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন এর অন্যতম।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন নিয়েও দলগুলোর ঐকমত্য হয়নি গত সপ্তাহে হওয়া চার দিনের সংলাপে। দুই দিনের বিরতির পর আজ রোববার আবার শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী সংলাপ।

গত সপ্তাহের সংলাপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বিষয়গুলোতে একদিকে বিএনপি এবং সমমনা পাঁচটি দল–এলডিপি, এনডিএম, লেবার পার্টি, ১২ দলীয় জোট এবং ১১ দলীয় জোট। তাদের কাছাকাছি অবস্থান বামপন্থি সিপিবি, বাসদের।

বিএনপির বিপরীত অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিসহ বাকি দলগুলো। যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি, জেএসডির অবস্থানও বিএনপির বিপরীতে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বড় মতপার্থক্য চলছে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন এবং এনসিসি গঠনে। এ দুই বিষয়কেই মৌলিক সংস্কার বলছে ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি চায়, বিদ্যমান পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচনে যে দল যত শতাংশ আসন পাবে, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষে তত আসন পাবে।

জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতিসহ ২৩ দল বলছে, নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে আসন বণ্টন হলে উচ্চকক্ষ কার্যকর থাকবে না। এ দলগুলো চায় — যে দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষে তত শতাংশ আসন পাবে।

আনুপাতিক উচ্চকক্ষে বিরোধিতার করে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন বলেছেন, এতে সরকারি দল দেশ চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়বে। ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে উচ্চকক্ষে আইন পাস করাতে পারবে না। যেখানে অতীতে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েও পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনার নজির আছে।

ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য সমকালকে বলেছেন, এ ভাষ্য ঠিক নয়। নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা সরকার দল উচ্চকক্ষে যত কম আসনই পাক, সরকার পরিচালনায় আইন প্রণয়নে বাধা নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন এবং প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার রাশ টানতে কমিশন প্রস্তাব করেছে, এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এনসিসির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে।

এতে সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে দাবি করে বিএনপি এনসিসি গঠনের বিরোধিতা করছে। দলটি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের আইনগুলো শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেছে। জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ২১টি দল এনসিসি গঠনের পক্ষে।

শুধু বিএনপি রাজি না হওয়ায় অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হচ্ছে না– এমন প্রবণতার অভিযোগ তুলে একাধিক দল বলছে, একটি বিষয়ে কত দল একমত হলে, তা ‘ঐকমত্য হয়েছে’ বলে গণ্য করা হবে– এ ব্যাপারে কমিশনের ব্যাখ্যা থাকা উচিত।

কমিশন সূত্র জানাচ্ছে, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দল যেসব বিষয়ে রাজি হবে, সেগুলোতে ঐকমত্য হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। বড় দলগুলো একমত না হলেও তিন-চতুর্থাংশ দল একমত হলে ঐকমত্য হিসেব গণ্য করা হবে। যদিও বিএনপি এ সংজ্ঞায় রাজি নয়। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ঐকমত্য হতে হবে সর্বসম্মতিক্রমে।

চার দিনের সংলাপে ৩০ রাজনৈতিক দল এবং জোট শুধু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিলে শর্ত সাপেক্ষে ঐকমত্য হয়েছে। যদিও জামায়াত বলেছে, শুধু অর্থবিল এবং আস্থা প্রস্তাব নয়, সংবিধান সংশোধনেও এমপিরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না। বিএনপি বলেছে, যুদ্ধাবস্থায়ও দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না এমপিরা।