Home Blog Page 67

ড্যানি বয়েল-এর ’28 Years Later’, জোম্বি মুভির জন্য কেন আইফোন বেছে নিলেন?

যখন কেউ বলেন, “আমি জোম্বি সিনেমা দেখি না,” অথচ তিনিই আধুনিক জোম্বি ঘরানার রূপকার, তখন একধরনের সাংস্কৃতিক প্যারাডক্স তৈরি হয়। ড্যানি বয়েলও ঠিক এই ধাঁচের নির্মাতা, যিনি ২০০২ সালে “28 Days Later” দিয়ে জোম্বি ঘরানাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্গঠন করেছিলেন। সেই সময়ের সামাজিক উদ্বেগ, ভাইরাস-ভীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা তাঁর কল্পনায় রূপ নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর, নিঃসঙ্গ ও হিংস্র সমাজে।

২০২৫ সালে তিনি ফিরেছেন ‘28 Years Later’ নিয়ে। এটি নিছক কোনো সিকুয়েল নয়, বরং চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযুক্তি, সমাজ ও দর্শনের এক যুগান্তকারী সংলাপ। আর এইবার চিত্রনির্মাণের অস্ত্র ছিল আইফোন।

Rage Virus ছড়ানোর ২৮ বছর পর, ব্রিটেনকে বাকি দুনিয়া বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। দেশটি কোয়ারেন্টাইন্ড, পরিত্যক্ত, বন্য প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। কিছু মানুষ ও ভাইরাস-আক্রান্তরা এখনো টিকে আছে, তবে কোনো স্থায়ী সমাজ নেই, নেই আইন, রাষ্ট্র কিংবা নির্ভরতার গণ্ডি।

এই পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক চিত্রপট আসলে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বসংকটের প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে মহামারি, জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তির আগ্রাসন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নতুন করে “সভ্যতা” শব্দটির অর্থ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বয়েলের সিনেমা সেইসব ভয়ের বাস্তব প্রতিফলন, একটি সতর্ক সংকেত, যা সিনেমার মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

ড্যানি বয়েল WIRED-কে বলেন, তিনি এই সিনেমার অধিকাংশ দৃশ্য iPhone দিয়ে শুট করেছেন। এটি শুধু প্রযুক্তির উদাহরণ নয়, বরং চিত্রভাষার বিপ্লব। আইফোনের মতো হালকা ক্যামেরা তাকে নর্থাম্ব্রিয়ার বন্য পরিবেশে দ্রুতগতিতে, গোপনে এবং প্রাকৃতিক আলোর সাথে শুট করার সুযোগ দিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, “যখন ক্যামেরা হালকা হয়, তখন কি সিনেমা আরও বাস্তব হয়ে ওঠে?”

বয়েলের মতে, হ্যাঁ। কারণ এটি নির্মাতাকে দৃশ্যের মধ্যে গলে যেতে দেয়, এবং একটি দৃশ্যের ভেতর থেকে নাটকীয়তা খুঁজে আনার সুযোগ করে দেয়। মোবাইল ক্যামেরা, বিশেষত আইফোন, তাকে এমন কিছু মুহূর্ত ক্যাপচার করতে দিয়েছে যা সজ্জিত বড় ক্যামেরা সেটআপ দিয়ে হয়তো সম্ভব হতো না, বিশেষ করে আকস্মিক সহিংসতা বা startling violence ধরা পড়ার ক্ষেত্রে।

একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, ড্যানি বয়েল স্বীকার করেছেন তিনি নিজে জোম্বি সিনেমা দেখেন না। তাহলে কীভাবে তিনি এমন এক ঘরানার পথিকৃৎ হলেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর নির্মাণচিন্তায়। বয়েলের কাছে জোম্বি কোনো দানবীয় চরিত্র নয়, বরং একটি রূপক, যা সমাজের পতন, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং মানুষের মধ্যে সঞ্চিত রাগ ও হিংসার বহিঃপ্রকাশ।

Rage Virus আসলে মনস্তাত্ত্বিক সংক্রমণ, যেখানে মানুষ নিজের মানবতাকেই ভুলে যায়। এটি কেবল বডি-হরর নয়, বরং কালচারাল হরর। তাঁর গল্প বলার মধ্যে রয়েছে সামাজিক ভবিষ্যদ্বাণী।

এই সিনেমাটি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন সমসাময়িক বিশ্ব নিজেও একরকম আপোক্যালিপ্টিক আবহে রয়েছে। আমরা মহামারি দেখেছি, রাজনীতি থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি পর্যন্ত বিপর্যয়ের সীমানা ছুঁয়েছি। ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘28 Years Later’ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে: “মানুষ না থাকলে পৃথিবী কেমন হতো?”

এ প্রশ্নটা শুধু জৈবিক অস্তিত্বের না, বরং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরও। এই সিনেমা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, সভ্যতা মানেই সবসময় অগ্রগতি নয়; অনেক সময় তা আত্মম্ভরিতার এক পরিণতিও হতে পারে।

ড্যানি বয়েলের পরিচালনায় সবসময় একধরনের আন্তর্জাগতিক বাস্তবতা থাকে। তাঁর ক্যামেরা চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করে, মনস্তত্ত্ব তুলে আনে এবং স্থান-কাল-পাত্রকে ভেঙে দেয়।

তিনি যেমন বলেন, “আমি জোম্বি দেখি না, আমি সমাজের বিকার দেখি”—ঠিক তেমনি তাঁর প্রতিটি কাজই একটি সামাজিক টেক্সট, যা সিনেমার ভেতর থেকেও সিনেমার বাইরের দুনিয়াকে আঘাত করে।

কেউই চায় না দুর্নীতি বন্ধ হোক : বিদ্যুৎ উপদেষ্টা

0

এ দেশের রাজনীতিবিদ-আমলা কেউই চায় না দুর্নীতি বন্ধ হোক। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, অপচয়ের পরিসীমা নেই। এসব যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

ফাওজুল কবির আরও বলেন — অপচয়, দুর্নীতি ও অদক্ষতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। পানির উৎস থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কেবল একজন মন্ত্রীর সুবিধার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হয়েছে। অপ্রয়োজনে রাস্তা করা হয়েছে, অব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় অর্থ নষ্ট হয়েছে। শনিবার ঢাকায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতির বাজেটসংক্রান্ত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে ফাওজুল কবির বলেন, ‘আমরা আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ না দিয়ে, ব্যবসা সুবিধা না দিয়ে এমন একটি দৃষ্টান্ত রেখে যেতে চাই, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ হবে।’

তদবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদ-আমলা- অধ্যাপক সবাই চান যে দুর্নীতি চলুক, তবে দুর্নীতিটা এবার আমাকে করার সুযোগ দিতে হবে। সবাই বলেন, দেখেন ফ্যাসিস্ট আমলে জানেনই তো ব্যবসা করতে পারি নাই, এখন একটু খেয়াল রাখবেন। তো আমরা সে পথে যাচ্ছি না।’

এর বিপরীতে সরকারের চেষ্টা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যে অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা। যেই ব্যবসা পাবেন, প্রতিযোগিতা হবে সেখানে। আমরা সবকিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছি।’

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ফাওজুল কবির বলেন, নিজস্ব গ্যাসের মজুত কমে আসায় এখন আমদানি করা এলএনজি-নির্ভরতা বাড়ছে। এতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সব সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব। তিনি বলেন, ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বেসরকারি খাত থেকেও অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

ফাওজুল কবির খান বলেন, সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যেই বাজেট ঘোষণা করতে হয়েছে। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতা এখানে মূল সমস্যা। এখন প্রয়োজন সামগ্রিক সংস্কার, তা না হলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি খাতে ৩ বিলিয়নের বেশি ডলার বকেয়া নামিয়ে আনা হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়নে। সময়মতো পরিশোধ করায় এলএনজির দামও কমেছে। আগে প্রতি ইউনিট ১৬ থেকে ১৭ ডলার ছিল। এখন তা ১২ ডলারে এসেছে।

উপদেষ্টা বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নেওয়া হয় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। অথচ বেসরকারি কেন্দ্র থেকে ১৩ টাকার বেশি দরে কেনা হচ্ছে। আগের সরকার প্রতি দুই মাসে একবার দাম সমন্বয়ের নীতি নিলেও অন্তর্বর্তী সরকার গত ১০ মাসে একবারও দাম বাড়ায়নি।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত বাজেট আপাতদৃষ্টিতে গতানুগতিক মনে হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

ইরানের সমালোচকরাও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বিরোধিতা করছেন

১৩ জুন ইরানে হামলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইংরেজিতে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। দেশটির সাধারণ মানুষকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে বলেছিলেন।

কিন্তু ইসরায়েলি হামলা ইরানে নতুন করে জাতীয়তাবাদ উসকে দিয়েছে। এমনকি সরকারের সমালোচকেরা ইসরায়েলি হামলার বিরোধিতা করছেন। দেশটির অধিকারকর্মী, চিকিৎসক, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী, তারকাসহ সমাজের নানা পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসুরে কথা বলছেন। ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করছেন।

সংস্কারপন্থী রাজনীতিক ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী আবতাহি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তেহরান থেকে টেলিফোনে বলেন — ইরানিদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, ইসরায়েল তা ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছে। তাঁর মতে, যেসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী সাধারণত পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে, তারা এখন সর্বোচ্চ নেতার পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা দেশের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় সাঈদ এজাতোল্লাহি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা পরিবারের মতো। সব সময় একমত হই না ঠিকই, কিন্তু ইরানের মাটি আমাদের চূড়ান্ত সীমা (রেড লাইন)।’

ইরানি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে — তেহরান ছেড়ে যাওয়া মানুষের জন্য হোটেল, গেস্টহাউস ও বিয়েবাড়ি খোলা রাখা হয়েছে। বিনা খরচেই তাঁদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বিনা মূল্যে অনলাইনে সেবা দিচ্ছেন। দোকানে ছাড় চলছে, রুটির দোকানে মানুষ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে কম রুটি কিনছেন, যাতে সবাই রুটি পান। স্বেচ্ছাসেবকেরা বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

কাস্পিয়ান সাগরের পাশে আশ্রয় নেওয়া রেজা (৪২) নামের এক ব্যবসায়ী টেলিফোনে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আমরা দারুণ এক সংহতি দেখতে পাচ্ছি। ভয় পাচ্ছি, কিন্তু পাশাপাশি একে অপরকে সাহস ও ভালোবাসা দিচ্ছি।’

শান্তিতে নোবেলজয়ী অধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদিকে বারবার কারাবন্দী করা হয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনিও ইসরায়েলি হামলার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। হামলার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করে তিনি গত সপ্তাহে বিবিসিকে বলেন, ‘যুদ্ধ আর সহিংসতা দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।’

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের যে দাবি করেছেন তা কতটা নির্ভরযোগ্য? এ প্রশ্ন তুলে নিউইয়র্ক টাইমস-এর কলাম লেখক নিকোলাস ক্রিস্টোফ মার্কিন হামলার পর লিখেছেন — “ইরানের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে—এ কথা যদি ধরেও নেওয়া হয়, তাহলেও এটি পরিষ্কার, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, যদি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে এ ঘটনাকে হয়তো পরমাণু কর্মসূচির শেষ না বলে সাময়িক একটি ধাক্কা বলা যেতে পারে।

অনেকে ভাবছেন, বোমা মেরে ইরানের সরকারকে ফেলে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তেমন লক্ষণ খুব একটা নেই। কারণ ইরানের বিরোধীরাও বাইরের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করছেন না।”

ইরানে মার্কিন হামলার সমালোচনা করে ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান বলেছেন — ‘আমরা সবাই একমত যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। কিন্তু ট্রাম্প এই লক্ষ্য অর্জনে কূটনৈতিক পথ ছেড়ে দিয়েছেন এবং তার বদলে এমন কিছু করেছেন যা অপ্রয়োজনে আমেরিকান নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে, আমাদের সেনাবাহিনীকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং আমেরিকাকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে না। কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আরও সময় ছিল।’

যুগে যুগে দিব্যজ্ঞান ও যুদ্ধ

১৪১৫ সাল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে চলছে শতবর্ষীয় যুদ্ধ। অ্যাজিঙ্কোর্টের যুদ্ধে ইংরেজ সেনারা সংখ্যায় কম, ক্লান্ত এবং প্রায় হারার মতো অবস্থা। কিন্তু হেনরি পঞ্চম হঠাৎ তাঁর সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, “ঈশ্বর আমাদের সাথে আছেন।” পরদিন যুদ্ধ জিতে যায় ইংল্যান্ড। কেউ বলে কৌশল, কেউ বলে কাকতালীয়। কিন্তু বিজয়ীরা যেটা বলেছিল তা ছিল সরল, “ঈশ্বর আমাদের পাশে ছিলেন।”

এই এক লাইন দিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ ও ‘ঈশ্বর’ বা ‘দিব্যতা’র মধ্যকার সেই অদ্ভুত সম্পর্কের ইতিহাস, যেখানে ঈশ্বর কেবল মন্দিরে নন, ছিলেন রণক্ষেত্রেও।

মানুষ যখন যুদ্ধ করে, তখন সে প্রায়ই ভাবে যে সে ন্যায়ের জন্য লড়ছে। আর ন্যায় মানেই ঈশ্বর। ফলে যুদ্ধের সময় দুপক্ষই দাবি করে ঈশ্বর তাদের পক্ষে। ইতিহাস জুড়ে দেখা যায় দেবত্ব কেবল বিশ্বাস নয়, কৌশলও।

ক্রুসেডের কথাই ধরুন। খ্রিস্টানদের পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত এই লড়াইয়ের একেকটা ধাপে ‘পোপ’ নিজে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে যুদ্ধের অনুমতি দিতেন। আর মুসলিম সেনারা বলতেন, তাঁরা “আল্লাহর পথের যোদ্ধা”। এইসব যুদ্ধের শেষে কত মানুষ মরেছে, কত মসজিদ, গির্জা ধ্বংস হয়েছে, তার হিসাব নেই। কিন্তু দুইপক্ষই ভেবেছে ঈশ্বর তাঁদের পক্ষেই ছিলেন।

মানসিকভাবে যুদ্ধ এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার স্থান। সৈনিক জানে সে যে কোন দিন মারা যেতে পারে। এই ভয়, অসহায়তা ও মৃত্যুভীতি থেকে মুক্তি পেতে তারা ধর্মের কাছে যায়। ধর্ম আশ্বাস দেয় “তোমার মৃত্যু অর্থহীন নয়, ঈশ্বর জানেন তুমি কী করছো।” ধর্ম শুধু সাহসই দেয় না, ন্যায্যতা’র ঢাল হিসেবেও কাজ করে। যখন কেউ শত্রুকে হত্যা করছে, তখন সে বিশ্বাস করতে চায় এই হত্যাও এক ধরণের পবিত্র কাজ।

অনেকেই ভাবেন আধুনিক যুগে আর ঈশ্বরের ব্যবহার নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বলেছিলেন “God told me to end the tyranny in Iraq.” অন্যদিকে আল-কায়েদার হামলাকারীরাও বলেছিল তারা জিহাদে অংশ নিয়েছে, যেখানে শহিদ হওয়া মানে স্বর্গে যাওয়া। দুই পক্ষই ঈশ্বরের নামে যুদ্ধ করেছে। আবার দু’পক্ষই একে অপরকে শয়তান বলেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের যুদ্ধ ইতিহাসেও ঈশ্বরের ভূমিকা রয়েছে। মহাভারতে কৃষ্ণ নিজে যুদ্ধের রথ চালাচ্ছেন, অর্জুনকে গীতা বলছেন “তোমার কর্তব্য যুদ্ধ করা।” এই গীতার বাণী আজও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে উদ্ধৃত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কামিকাজে পাইলটরা সম্রাটকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন। তাদের জন্য আত্মত্যাগ মানেই ঈশ্বরের প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য। তারা বিমানে উঠে আত্মঘাতী মিশনে যেতেন, তাদের শেখানো হতো “এই মৃত্যু তোমাদের পরকালকে পবিত্র করে তুলবে।”

একটা প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে, এসব ‘ঈশ্বরের যুদ্ধে’ নারীর ভূমিকা কী ছিল? ক্রুসেডের সময় অনেক নারী নিজ সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে তারা ‘ঈশ্বরের পুরস্কার’ পাবেন। আবার আফ্রিকার কিছু আদিবাসী যোদ্ধ্রী নারী নিজেদের ‘ঈশ্বরী’ বলেই দাবি করতেন। ডাহোমির অ্যামাজন নারীরা যুদ্ধের আগে আধ্যাত্মিক আচার করতেন এবং নিজেদের দেবীর অবতার হিসেবে দেখতেন।

তাহলে ঈশ্বর কি কখনও যুদ্ধ থামাতে পারেননি?

এই প্রশ্নই হয়তো সবচেয়ে অদ্ভুত এবং গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রিসমাস ডে তে একটি ঘটনা ঘটে, একে বলা হয় “Christmas Truce”। জার্মান ও ব্রিটিশ সেনারা হঠাৎ করেই গোলাগুলি বন্ধ করে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়, উপহার দেয়, ফুটবল খেলে। কেউ কেউ বলেন ঈশ্বর সেইদিন যুদ্ধে সত্যিই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরদিন আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এমনও অনেকে বলেন, যুদ্ধ কখনোই ঈশ্বরের ডাকে সম্ভব না। সবই মানুষের শয়তানতুল্য স্বার্থ। তবে ইতিহাস বলে ঈশ্বরকে সামনে রেখেই মানুষ যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়। সেই ঈশ্বর কখনও ইসলামের, কখনও খ্রিস্টানদের, কখনও ব্রাহ্মণের, কখনও সম্রাটের রূপে হাজির হন।

ঈশ্বরের নামেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর একেক সময় একেকভাবে দেওয়া যায়। কেউ বলবে মানুষ ঈশ্বরের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। কেউ বলবে ঈশ্বর কেবল একটি প্রতীক, যুদ্ধ আসলে ক্ষমতার খেলা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট ঈশ্বর থাকেন যুদ্ধের প্রার্থনায়, সৈনিকের ওজনে, নেতার ভাষণে এবং সাধারণ মানুষের আশায়। তাঁকে ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করে, আবার তাঁর কাছেই মাফ চায়। এই দ্বন্দ্বই ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত সত্য। যেখানে ঈশ্বর আছেন কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কোন পক্ষে আছেন!

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ‘আলী খামেনীর’ উত্থান যেভাবে

প্রায় চার দশক ধরে শক্ত হাতে ইরান শাসন করছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এ সময়কালে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পরাশক্তিদের বাঁধা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক শক্তিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ও ভিন্নমত দমন করেছেন।

ইরানের সরকার, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন খামেনি। পাশাপাশি তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড ও কুদস বাহিনী—যারা হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।

ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। সেই বিপ্লবেই পশ্চিমাপন্থি রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালে খোমেনির বিরোধীরা খামেনিকে হত্যা চেষ্টা করলে তার ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন খামেনি।

প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট হাশেমি রফসানজানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন খামেনি। তবে পরবর্তী সময়ে দুই জনের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থি মোহাম্মদ খাতামির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনৈতিক সংস্কার ও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রস্তাব খামেনির কট্টর রক্ষণশীল অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

২০১৩ সালে হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট হলে খামেনি কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায় অনুমতি দেন। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় বহুল আলোচিত যৌথ কর্মপরিকল্পনা বা ছয় পরাশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি। যদিও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলে খামেনি এটিকে ‘আমেরিকার প্রতারণার প্রমাণ’ হিসেবে তুলে ধরেন।

২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা গ্রিন মুভমেন্ট ছিল তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয়ের বিরোধিতা করে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তখন খামেনির বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগানও শোনা যায়।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর হিজাব ইস্যুতে ইরানে আবারও বিশাল আন্দোলন হয়। এই বিক্ষোভে বহু মানুষ নিহত হন এবং খামেনির পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেওয়া হয়। তবে এই বিক্ষোভকেও তিনি ‘বাইরের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেন।

খামেনির দৃষ্টিতে ইসরায়েল একটি ‘অবৈধ রাষ্ট্র’। তিনি রমজানের শেষ শুক্রবারকে ‘কুদস দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেন এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে সরাসরি সমর্থন দেন।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি ইরানকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত একাধিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান শক্ত করেন।

তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানকে নেতৃত্ব দিলেও খামেনি তার শত্রুদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াননি। তবে ইরানের এই মনোভাবে পরিবর্তন আসে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়।

ইসরাইল যখন গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাকিরা কেবল মুখে প্রতিবাদ জানিয়ে বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব সারে।

এরপর গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ, হিজবুল্লাহর ওপর হামলা এবং গত সপ্তাহে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলায় পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ।

ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’র আহ্বান জানালে প্রত্যুত্তরে খামেনি বলেছেন, ‘যারা ইরান, এর জনগণ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানেন তারা এমন ভাষায় হুমকি দেন না। কারণ, ইরানিরা আত্মসমর্পণ করার জাতি নয়।’

৮৫ বছর বয়সী খামেনি শারীরিক অবস্থা ও বয়স বিবেচনায় তার উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হতে পারেন। আবার কেউ কেউ সদ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

শিল্প–ব্যক্তিসত্তা, সামষ্টিক অবচেতন ও যুগান্তের সংযোগ

একজন কবি যখন একটি পঙ্‌ক্তি লেখেন বা একজন শিল্পী যখন রঙ ছুঁড়েন ক্যানভাসে, তখন তা কি নিছক তাঁর জীবনের প্রতিফলন? নাকি এর পেছনে থাকে এক বৃহৎ, অতিচেতন ঘূর্ণি যেখানে ব্যক্তি হারিয়ে যান, আর উঠে আসে যুগ-যুগান্তরের না-বলা গল্প? ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত Modern Man in Search of a Soul গ্রন্থে কার্ল জং এই রহস্যকে ছুঁতে গিয়েছিলেন।

জং বলেন, সৃষ্টিশীলতা জন্ম নেয় আমাদের স্মৃতি, স্বপ্ন, দুঃখ, চেতনা, অবচেতনা সবকিছুর সমষ্টি থেকে, এমনকি যেসব অভিজ্ঞতা আমরা নিজেও জানি না সেসব থেকেও। কিন্তু এসবের অনেকটাই আমাদের চেতনার বাইরে থাকে। সৃষ্টিশীলতা সেখানে এক “periscope” এক ধরনের জাহাজের চোখ, যার সাহায্যে অবচেতন মন বাইরের দুনিয়ায় তাকিয়ে পড়ে এবং নিজেকে প্রকাশ করে শিল্পের ভাষায়।

জং সৃষ্টিকে ভাগ করেন দুই ভাবে, মনস্তাত্ত্বিক এবং ভিশনারি। প্রথমটি ব্যক্তির প্রেম, যন্ত্রণা, সংগ্রাম ইত্যাদি অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে। এটি চেনা, বোধগম্য, মানুষের অনুভূতির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ভিশনারি সৃষ্টি যেন স্বপ্নভঙ্গের অভিজ্ঞতা। এটি প্রাগৈতিহাসিক, প্রাক-বক্তব্য, এক রহস্যময় ঘরানা। একজন শিল্পী যেন কোনো অদৃশ্য ছায়ার মধ্যে ডুবে গিয়ে এমন কিছু প্রকাশ করেন যা নিজের মধ্যেও অপরিচিত।

জং বিশ্বাস করতেন অবচেতন মানেই ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বরং এক বৃহৎ মানসিক ভাণ্ডার, যাকে তিনি বলেছিলেন Collective Unconscious। এর ভেতরে বাস করে প্রতিটি মানুষের পুরাণ, প্রতীক, ছায়াময় আকাঙ্ক্ষার আদিম অভিজ্ঞতা। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে দেখা যায় একই ধরণের স্বপ্নচিত্র বা প্রতীক (সাপ, আগুন, মা, অন্ধকার), কারণ এগুলো আসে সেই সমষ্টিগত অবচেতন থেকে।

বাংলা লোকসাহিত্যে দেবী কালীর চিত্র, পাশ্চাত্যের “Mother Earth”, বা আফ্রিকার “ancestral spirits” এসব এক ধরনের আদিম প্রতীক বা “archetype” যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন শিল্পে প্রায় একই আকারে ফিরে এসেছে। শিল্পী নিজে সচেতনভাবে না হলেও এই চিত্রগুলোর বাহক হয়ে ওঠেন।

একজন শিল্পীর ভেতরে থাকে দুটি শক্তি: একজন সাধারণ মানুষের মতো সুখ, নিরাপত্তা, স্বস্তি চাওয়ার ইচ্ছা, আর অন্যদিকে, থাকে সৃষ্টির প্রতি এক নির্মম দায়বদ্ধতা। এই দ্বন্দ্ব থেকেই শিল্পীর যন্ত্রণা জন্মায়। সৃষ্টিশীলতা তাঁকে অনেক সময় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। সমাজ নিরাপত্তা চায়, আর শিল্প তোলপাড় করে। সমাজ চায় স্থিরতা, আর শিল্প জাগায় প্রশ্ন। একজন কবি যখন যুগের নিরব ব্যথাকে ভাষা দেন, সমাজের চোখে তিনি হয়ে উঠতে পারেন অস্বস্তিকর। অথচ সেই প্রশ্ন তোলার মধ্যেই হয়তো তার যুগের প্রয়োজনীয় শুশ্রূষা লুকানো থাকে।

ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন শিল্প মানেই একধরনের repressed desire-এর রূপান্তর। অর্থাৎ শৈশবের অবদমন, যৌনতা, নির্যাতন বা মানসিক আঘাত থেকেই শিল্পের জন্ম হয়। তিনি শিল্পীকে দেখতেন একধরনের চিকিৎসারত রোগী হিসেবে, যিনি শিল্পের মাধ্যমে তাঁর ব্যথাকে প্রকাশ করেন।

কার্ল জং একে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর মতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সৃষ্টিশীলতা এক বৃহত্তর, মহাজাগতিক সত্তার সঙ্গে যুক্ত।তিনি একে বলেছিলেন, অচেতন স্রোতের প্রতি আত্মসমর্পণ। একজন কবি বা শিল্পী তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর মানবতার পক্ষ থেকে কথা বলেন। এই তফাৎটাই ফ্রয়েডকে ব্যক্তিনির্ভর, আর জংকে বিশ্বজনীন করে তোলে।

ইউং শিল্পীকে দ্বৈত অস্তিত্বের মানুষ বলেন। ব্যক্তি হিসেবে সুখ চাইলেও, সৃষ্টিশীলতা তাঁকে নিঃস্ব করতে পারে। এটি একটি সাধনা, যেখানে জীবন থেকে কিছু ত্যাগ করে শিল্পী একটি বৃহত্তর চেতনাজগতে প্রবেশ করেন। তবে জং সেই tortured genius ধারনাকে বাতিল করেন। তাঁর মতে কষ্ট সৃষ্টির অনিবার্য পূর্বশর্ত নয়, বরং সৃষ্টির চাপেই ব্যক্তি ব্যথিত হন। এটি দুর্ভাগ্য নয়, সৃষ্টির মূল্য।

কার্ল জং আমাদের বোঝান, সৃষ্টিশীলতা নিছক এক শিল্পীর মস্তিষ্কের খেলা নয়। এটি এক মহাজাগতিক আহ্বান যেখানে অবচেতন, প্রতীক, স্বপ্ন, সমাজ ও যুগ-মানস একত্রিত হয়। শিল্প তখন শুধুই “আমি” নয়, বরং “আমরা”-র কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। একজন কবি, চিত্রশিল্পী, সংগীতকার তাঁরা প্রত্যেকেই একা নন। তাঁদের ভেতর দিয়ে কথা বলে একটি যুগ, একটি সভ্যতা, এমনকি সেই অন্ধকার গহ্বর যেখান থেকে মানুষ তার প্রথম কল্পনাকে জন্ম দিয়েছিল।

‘রাখাইনের সংঘর্ষ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি’, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে : মোঃ তৌহিদ হোসেন, বাংলাদেশ অন্তর্বতী সরকারের, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহভাবে বাড়ছে

বাংলাদেশে এখন ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। শুধু গত এক মাসেই রাখাইন রাজ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় আরও ২০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে। উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের সামর্থ্য সীমিত—আর অতিরিক্ত চাপ নিতে পারছি না।”

মিয়ানমারের সমস্যা শুধু এক দেশের না

রাখাইনের সংঘর্ষ শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়—এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। তাই জাতিসংঘের উচিত এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকেও আলোচনায় যুক্ত করা। মোঃ তৌহিদ হোসেন, বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ।

নিরাপত্তা পরিষদের নীরবতা ভাঙা দরকার

তৌহিদ হোসেন বলেন, “এই পরিষদ আর চুপ থাকতে পারে না। সাধারণ মানুষ যেন কষ্ট না পায়।” তিনি জাতিসংঘকে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে এবং মিয়ানমারে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তিপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে আহ্বান জানান।

ছোট দেশগুলোর কথাও শুনতে হবে

উপদেষ্টা বলেন – বড় দেশের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে যেন ছোট বা উন্নয়নশীল দেশের কণ্ঠস্বর হারিয়ে না যায়। নির্বাচিত সদস্যদের দায়িত্ব হলো মতভেদ ভুলে ঐক্য গড়ে তোলা, এবং নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া শান্তি সম্ভব না

শুধু জাতিসংঘ নয়, শান্তি আনতে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকেও যুক্ত করতে হবে। উপদেষ্টা বলেন, “এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় কাজ করা সংগঠনগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে—যাতে তারা রাজনৈতিক সমর্থন ও সম্পদ পায়।” বিশ্বশান্তির জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।

শান্তির পথে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ শান্তির পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, “আসুন, সবাই মিলে কাজ করি—যাতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আজকের সংকট মোকাবিলা করতে পারে।”

AI নির্ভরতা খর্ব করছে চিন্তাশক্তি

গত কয়েক বছরে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির প্রসার আমাদের লেখালিখি, চিন্তাভাবনা ও শিক্ষার পদ্ধতিকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। চ্যাটজিপিটি বা অনুরূপ ভাষাভিত্তিক মডেল এখন অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণদের লেখালিখির প্রথম পছন্দ। কিন্তু এই প্রযুক্তি কি আমাদের শেখার প্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? সম্প্রতি এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের গবেষণা এই প্রশ্নের পিছনে কিছু বাস্তব ও উদ্বেগজনক প্রমাণ হাজির করেছে।

নাটালিয়া কসমাইনা এবং তাঁর সহগবেষকরা বোস্টনের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি দলে ভাগ করেন। প্রথম দল শুধুমাত্র চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে, দ্বিতীয় দল গুগল সার্চ করে এবং তৃতীয় দল কোনো প্রযুক্তি ছাড়া কেবল নিজের মস্তিষ্ক দিয়ে রচনা লেখে। প্রতিটি দলকে SAT-এর আদলে কয়েকটি রচনার কাজ দেওয়া হয়।

লেখার সময় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ৩২টি অঞ্চলে EEG (Electroencephalography) সেন্সরের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। লক্ষ্য ছিল তাদের সৃজনশীলতা, মনোযোগ এবং স্মৃতির কার্যকারিতা বোঝা।

চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে কম কার্যকলাপ দেখা যায়। বিশেষ করে আলফা, থেটা এবং ডেল্টা তরঙ্গে (যেগুলো সৃজনশীলতা, মেমরি লোড এবং ভাষাগত প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে) তাদের সাড়া ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গবেষণায় দেখা যায়, এআই ব্যবহারকারী দলের রচনাগুলো ছিল প্রায় একই রকম একঘেয়ে, একই শব্দ ব্যবহার এবং মৌলিক চিন্তার অভাব।

পরীক্ষক ইংরেজি শিক্ষকদের মতে, রচনাগুলো ছিল আত্মাহীন। এদিকে যাঁরা শুধু মস্তিষ্ক ব্যবহার করে লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ, কল্পনা ও সন্তুষ্টি দেখা গেছে। EEG-তেও দেখা গেছে উচ্চ সংযোগ, সক্রিয় চিন্তাভাবনা এবং গভীর স্মৃতির ব্যবহার।

পরবর্তী ধাপে, প্রত্যেককে আগের একটি রচনা আবার লিখতে বলা হয়। এবার চ্যাটজিপিটি দলকে কোনো প্রযুক্তি ছাড়া লিখতে হয়, আর মস্তিষ্ক-নির্ভর দল পায় চ্যাটজিপিটির সহায়তা। ফলাফল আরও চমকপ্রদ চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারী দল আগের রচনাগুলো প্রায় মনে রাখতে পারেনি। তাদের স্মৃতি-সম্পর্কিত তরঙ্গ ছিল দুর্বল। কসমাইনার ভাষায়, “তারা কাজটি করে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু কিছুই মস্তিষ্কে বসেনি।” অর্থাৎ শেখার অভিজ্ঞতা নয়, তারা কেবল কাজটিকে শেষ করেছে।

অন্যদিকে যারা শুরুতে নিজেরা চিন্তা করে লিখেছিল, তারা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেও ভালো করেছে এবং তাদের মস্তিষ্কে নতুন করে সাড়া দেখা গেছে। এই ফলাফল দেখায়,প্রথমে নিজে চিন্তা করে শেখা হলে, পরে এআই প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।

আলফা তরঙ্গ (৮-১২ হার্টজ) সাধারণত মস্তিষ্কের বিশ্রামকালীন অবস্থা ও মনোযোগকে নির্দেশ করে। থেটা তরঙ্গ (৪-৭ হার্টজ) গভীর চিন্তা, স্মৃতি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। আর ডেল্টা তরঙ্গ (০.৫-৪ হার্টজ) সাধারণত ঘুমের সময় সক্রিয় থাকলেও, গভীর বিশ্লেষণাত্মক কাজে কিছুটা দেখা যায়। এই তরঙ্গগুলোর দুর্বলতা মানে হলো চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্ক চিন্তামূলকভাবে সাড়া দিচ্ছে না।

গবেষণার মূল লেখক কসমাইনা বলেন, “আমি ভয় পাচ্ছি শিগগিরই কেউ হয়তো বলবে GPT কিডস প্রোগ্রাম চালু করি।” তাঁর মতে শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কে এই প্রযুক্তির অযাচিত ব্যবহার বড় বিপর্যয় আনতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জিশান খান বলছেন, “স্মৃতি, তথ্যসংগ্রহ ও মানসিক স্থিরতা এসব তৈরির সময়েই যদি আমরা মস্তিষ্ককে এড়িয়ে যাই, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতা হারিয়ে যাবে।”

গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউ পায়নি এবং ছোট পরিসরের, তবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভবিষ্যতের শিক্ষানীতি তৈরি বা প্রযুক্তি প্রয়োগে এই ফলাফলগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

এটা যেমন সত্য যে এআই আমাদের লেখায় সহায়ক হতে পারে, তেমনই এটাও সত্য যে যদি আমরা শুরুতেই চিন্তার দায়িত্ব প্রযুক্তিকে দিয়ে দিই, তাহলে আমরা শিখছি না শুধু কাজ সেরে নিচ্ছি।

এআই আমাদের হাতকে আরও কার্যকরী করতে পারে, কিন্তু তা যেন আমাদের মস্তিষ্ককে অলস না করে ফেলে। প্রযুক্তি তখনই আশীর্বাদ যখন আমরা তার সহযোগিতা নিই, পরিবর্তে নিজের চিন্তার দায়িত্ব ছেড়ে দিই না।

অবশেষে আসছে অং কার ওয়াই’র ‘Blossoms Shanghai’

অং কার ওয়াইয়ের বহু প্রতীক্ষিত টিভি সিরিজ ‘Blossoms Shanghai’, যার নির্মাণে কেটেছে প্রায় এক দশক, সেটি অবশেষে দর্শকদের জন্য হাজির। অং কার ওয়াই এমন একটি নাম, যা কেবল সিনেমা প্রেমীদের নয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই এক অনন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। “In the Mood for Love”, “2046”, কিংবা “Chungking Express” প্রতিটি ছবিতে সময়, স্মৃতি ও প্রেমের জটিল মেটাফোরিক চিত্র এঁকেছেন তিনি। এবার ফিরলেন সম্পূর্ণ নতুন মাধ্যমে টেলিভিশন সিরিজে।

তাঁর নতুন সৃষ্টি ৩০ পর্বের সিরিজ, “Blossoms Shanghai” ইতিমধ্যেই চীনে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। দেশের টিভি রেটিংয়ে শীর্ষে থাকা এই সিরিজটি এবার The Criterion Channel-এর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকায় মুক্তি পাচ্ছে।

এই সিরিজের পটভূমি ১৯৯০ দশকের সাংহাই, যে সময় চীন ধীরে ধীরে তার বাজার উন্মুক্ত করে, এবং সাংহাইয়ের স্টক এক্সচেঞ্জ শুরু হয়। এই সময়টি ছিল নতুন অর্থনৈতিক শ্রেণির উত্থানের, সেইসঙ্গে পুরনো সমাজ কাঠামোর চ্যালেঞ্জের। ঠিক এমন এক উত্তাল সময়ে আ বো নামের এক চরিত্রের জীবনের গল্প বুনেছেন অং, যিনি একজন সাধারণ মানুষ থেকে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের মালিক হয়ে ওঠেন।

আ বো-কে বলা হচ্ছে “শাংহাইয়ের জে গ্যাটসবি”। গ্যাটসবি যেমন ছিলেন ফিটজেরাল্ডের “The Great Gatsby” উপন্যাসে ধনসম্পদের মাঝে নিঃসঙ্গ ও অতীতের প্রেমে তাড়িত এক চরিত্র, তেমনি আ বো-ও একা, টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত এবং প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও সাফল্যের দোলাচলে দোদুল্যমান।

এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চীনের জনপ্রিয় অভিনেতা হু গে, যিনি “Nirvana in Fire”–এর জন্য ২০১৬ সালে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং এই সিরিজের জন্য ২০২৪ সালেও একই স্বীকৃতি অর্জন করেন।

অং কার ওয়াই নিজে বলেছেন, “এই সিরিজটি সাংহাইয়ের ‘roaring 90s’-এর প্রাণ তুলে ধরে।” সেই উন্মাতাল সময়ের শিল্প, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, অর্থনীতির ধাক্কা সবকিছু সিরিজে চিত্রিত হয়েছে। কিন্তু এখানে কেবল অর্থনৈতিক উত্থান নয়, বরং মানুষের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বন্দ্ব, এবং নিয়তির সাথে লড়াইকেই মূল উপজীব্য করা হয়েছে।

সাংহাই তাঁর জন্মভূমি। অথচ অং-এর আগের বেশিরভাগ কাজই হংকং ভিত্তিক, যেমন “In the Mood for Love” ও “2046”—যদিও দুই কাজেই শাংহাইয়ের অভিবাসীদের প্রেক্ষাপট আছে। তাই “Blossoms Shanghai” হলো এক অর্থে তাঁর “শিকড়ে ফেরা”। এটি শুধুই ভৌগোলিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও আত্মিক স্তরেও প্রত্যাবর্তন।

এই সিরিজটি নির্মিত হয়েছে জিন ইউচেং-এর পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস “Blossoms” অবলম্বনে। এই উপন্যাসটি চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কাহিনি, যেখানে প্রতিটি চরিত্র একটি সময়ের প্রতিনিধি। কেউ আদর্শ হারায়, কেউ আকাঙ্ক্ষায় দগ্ধ হয়, কেউবা হারিয়েও ফিনিক্সের মতো ফিরে আসে। অং এই উপন্যাসকে শুধু চিত্রায়ণ করেননি, বরং বরাবরের মতো নিজস্ব ভাষায় ভিজ্যুয়াল কবিতা তৈরি করেছেন।

“Blossoms Shanghai”–কে অনেকে অং-এর আগের কাজগুলোর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি বলছেন। “In the Mood for Love” যেখানে হারানো প্রেম ও নৈঃশব্দ্যের এক কবিতা, “2046” সেখানে সময়ের ফাঁদে আটকে থাকা চরিত্রদের ব্যথা, ঠিক তেমনই “Blossoms Shanghai” হলো সময় ও ক্ষমতার বুননে আবিষ্ট এক শহর ও তার মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের কাহিনি। তবে এবার ফোকাস প্রেম নয়, বরং উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক মানুষের অনুশোচনা ও সংকল্প।

Criterion Channel এখন শুধু উত্তর আমেরিকায় নয়, বরং শীঘ্রই যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও সিরিজটি স্ট্রিমিং করবে। এই ঘোষণার সাথে সাথে আরও একটি সংবাদও এসেছে। ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে “In the mood for love” আবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে।

এর ফলে অং কার ওয়াই-এর সৃষ্টি জগৎকে নতুন প্রজন্ম আরও ভালোভাবে জানবে। যারা এর আগে তাঁর কাজ দেখেননি, তাদের জন্য “Blossoms Shanghai” হতে পারে এক উপযুক্ত প্রবেশদ্বার।

“Blossoms Shanghai” প্রেম, বঞ্চনা, সময়, বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্ম-অনুসন্ধানের এক জীবন্ত দলিল। একটি মানুষ কিভাবে নিজেকে গড়েন এবং কিভাবে সেই গড়ে তোলা আত্মপ্রতিমার সাথে যুদ্ধ করেনসেই গল্পই “Blossoms Shanghai”।

Manga Introduction to Philosophy : মাঙ্গা ফরম্যাটে দর্শন পরিচয়

দার্শনিক চিন্তা মানেই কি কপালে ভাঁজ ফেলে হাঁটাহাঁটি? জীবন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা কি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের কাজ? না, মোটেই না! জাপানি দার্শনিক মাসাহিরো মোরিওকার বই “Manga Introduction to Philosophy” সেই ভুলটা মিষ্টি করে ভাঙে। দর্শনের মতো কাঠখোট্টা একটি শাস্ত্রকে তিনি এমনভাবে আমাদের সামনে হাজির করেন, যেখানে পাঠককে ভারী টার্ম বা ক্লাসিক গ্রন্থের জালে না ফেলে বরং সহজ প্রশ্নের মধ্য দিয়েই নিয়ে যান আত্মোপলব্ধির গভীরে।

চশমা-পরা গুরুজনের কণ্ঠ নয়, বরং একদম বন্ধুত্বপূর্ণ, সরল, আর মনকে নাড়িয়ে দেওয়া এক প্রশ্নোত্তর ধারায় সাজানো এই বই — যেন কেউ গল্প বলতে বলতে আমাদের আত্মা নাড়িয়ে দেয়। এটা কোনো ক্লাসিক দার্শনিক থিসিস নয়। এটা হলো চিন্তার এক সহজপাঠ — যেখানে সময়, অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় আর জীবনের মানে নিয়ে এমনভাবে আলাপ হয়, যেন প্রাচীন গ্রীক সভায় নয়, তোমার নিজের ড্রইংরুমেই সেই প্রশ্নগুলো জন্ম নিচ্ছে।

২০১৩ সালে জাপানে এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় “まんが 哲学入門――生きるって何だろう?” নামে। এর বাংলা করলে দাঁড়ায়—“দর্শনের মাঙ্গা পরিচয়: বাঁচা মানে আসলে কী?” এই বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এটি মাঙ্গা ফরম্যাটে লেখা। অর্থাৎ পুরো বইটি এক ধরনের কমিক স্টাইলে আঁকা, যেখানে দুটি চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে দর্শনের বড় বড় প্রশ্ন উঠে আসে। লেখক নিজেই বইটির স্কেচ তৈরি করেন, এবং পরবর্তীতে চিত্রনির্মাতা ন্যানকোফু তেরাদা সেই স্কেচকে পেশাদার চিত্রে রূপ দেন। মাঙ্গার আঁকাগুলো যদিও অনেকটাই সাদামাটা, কিন্তু তার ভেতরের চিন্তা, আলাপ আর আলতো রসবোধ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক অতুলনীয় পাঠ্য অভিজ্ঞতা।

বইটিতে চারটি মৌলিক প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে চারটি অধ্যায় সাজানো হয়েছে—সময়, অস্তিত্ব, আমি কে, এবং জীবনের মানে কী। এই প্রশ্নগুলো বহু দার্শনিক যুগ যুগ ধরে আলোচনা করে এসেছেন, কিন্তু মোরিওকা এগুলোকে সাধারণ পাঠকের বোধের কাছে টেনে আনেন। চরিত্র দুটি—একটি হলো “ম্যানমারু-কুন,” কৌতূহলী, গোলাকৃতির মুখে এক তরুণ; আর অপরটি হলো “সেন্সেই,” যিনি এক প্রাজ্ঞ ও সহানুভূতিশীল শিক্ষক—এরা আলাপচারিতায় এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়, ভুল করে, দ্বিধায় পড়ে, আবার উত্তর খুঁজে পেতে চায়। এই দ্বৈততা পাঠকের নিজের মনেই যেন প্রতিধ্বনি তোলে। সময় নিয়ে অধ্যায়ে মোরিওকা সময়কে কেবল ঘড়ির কাঁটার হিসাব দিয়ে বোঝান না। বরং তিনি বলেন, সময় এক অভিজ্ঞতা। আমরা অতীতে বাস করি, ভবিষ্যতের চিন্তায় ঘুরি, অথচ বর্তমান বলে কিছু যেন ধরা দেয় না। পাঠক এখানে নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে—সময় কি আমাকেই চালায়, না আমি সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটি?

অস্তিত্বের অধ্যায়ে প্রশ্ন আসে: “আমি না থাকলেও কি কিছু থাকত?” এই প্রশ্নটা একদিকে দার্শনিক, আবার অন্যদিকে অনেক গভীরভাবে ব্যক্তিগত। মোরিওকা এখানে অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা ও বিস্ময়কে ধরেছেন। তিনি বলেন, “তুমি আছো”—এই ছোট্ট সত্যটাই আসলে সবথেকে আশ্চর্য ঘটনা। আমাদের অস্তিত্ব একদিকে স্বতঃসিদ্ধ, আবার এক গভীর রহস্যের মধ্যেও নিহিত।

“আমি কে?” অধ্যায়ে প্রবেশ করলেই পাঠক অনুভব করে নিজের পরিচয়ের এক টানাপোড়েন। নাম, স্মৃতি, দেহ—সবকিছুর মাঝে “আমি” কোথায়? আজকের আমি কি কালকের মতো? তাহলে “আমি” বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? এই অধ্যায়ে মোরিওকা খুব সরল ভাষায় আমাদের দেখান, “আমি” হচ্ছে এক চলমান সত্তা, যা প্রতিদিন একটু একটু করে বদলায়, কিন্তু তার মধ্যেও কিছু একটা থাকে যা বদলায় না। এই দ্বৈততাই আমাদের ব্যক্তিত্বের মূল।সবশেষে, “জীবনের মানে কী?”—এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অস্বস্তিকর, আবার সবচেয়ে সাহসী। মোরিওকা এখানে “জন্ম নেওয়া ঠিক হয়েছে কিনা”—এই প্রশ্ন তুলে পাঠককে একেবারে জীবন ও অস্তিত্বের প্রান্তদেশে নিয়ে যান। তিনি বলছেন না যে জীবন মানেই দুঃখ, আবার বলছেন না যে জীবন মানেই আনন্দ। বরং তিনি বলছেন, “জীবনের মানে আমরা নিজেরাই খুঁজি। আমাদের অনুভব, প্রশ্ন, ভালোবাসা—এইসব মিলেই মানে তৈরি হয়।” এই অধ্যায় অনেক পাঠককে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই বলেছে, এই বই পড়ে তারা প্রথমবার জীবনের মানে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করে।

বইটির প্রভাব শুধু জাপানে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পর এটি আন্তর্জাতিকভাবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বই পড়ানো হচ্ছে পরিচিতিমূলক দর্শন কোর্সে, আবার অনেক পাঠক একে “entry point to thinking” বলে অভিহিত করেছে। যদিও কিছু পাঠক এই বইকে খুব প্রাথমিক বা স্কুল-লেভেলের দার্শনিক আলাপ বলেও মনে করেছেন, কিন্তু এটাও সত্য—এমন বই খুব কমই আছে যা নতুন পাঠককে এত সহজে জটিল চিন্তার দিকে টেনে নেয়।

Masahiro Morioka এই বইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, দর্শন মানে শুধু ধূসর বই আর কষ্টকর পরিভাষা নয়। দর্শন মানে নিজের জীবনের প্রশ্নগুলোর দিকে সাহসের সঙ্গে তাকানো, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবা, এবং তা করতে গিয়ে ভুল করলেও ভয় না পাওয়া। এই বই তারই এক মাঙ্গা-রূপ — হাসির রেখায় গড়া গভীর আত্মজিজ্ঞাসা।

“Manga Introduction to Philosophy” এমন এক বই, যেটা আপনি দুই ঘণ্টায় পড়ে ফেলতে পারবেন, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো নিয়ে বছরের পর বছর ভাবতে পারেন। জীবনের প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞ বিস্ময়, “আমি কে?”, “কেন বেঁচে আছি?”, “সব কিছুর মানে কী?”—এই প্রশ্নগুলোর প্রতি এক ধরণের সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তোলে এই বই।

এই বই শুধু পড়ার নয়, জীবন নিয়ে ভাবার আমন্ত্রণ। যারা জীবনের গভীরে ঢুকতে চান, কিন্তু দরজাটা এখনো খুঁজে পাননি—এই বই সেই দরজা। তা সে দর্শনের ছাত্র হন বা একজন সাধারণ কৌতূহলী পাঠক, “Manga Introduction to Philosophy” এক নতুন অভিজ্ঞতার সূচনা দেবে, সেটা নিশ্চিত।