Home Blog Page 68

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা : বৈশ্বিক উষ্ণায়নের রাশ টেনে ধরতে সময় আছে আর ৩ বছর

বৈশ্বিক উষ্ণতার স্থায়ী ক্ষতি এড়ানোর জন্য মানবজাতির হাতে বেশি সময় নেই বলে সতর্ক করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তারা বলেছেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার জন্য আর তিন বছর মতো সময় রয়েছে আমাদের। বিবিসি জানিয়েছে – বিশ্বের শীর্ষ ৬০ জন জলবায়ু বিজ্ঞানী তাদের সর্বশেষ পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের গ্রাস থেকে বাঁচতে ২০১৫ সালে প্যারিস সম্মেলনে প্রায় দুইশ দেশ জানিয়েছিল, তারা গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সে জন্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, অর্থাৎ প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখা হবে।

তবে প্যারিস সম্মেলনের প্রায় দশ বছর হতে চললেও আশানুরূপ কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি। চলতি বছর বিজ্ঞানীরা বলছেন,তাপমাত্রা বৃদ্ধি আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আটকে রাখতে সর্বোচ্চ আর ১৩০ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ মেনে নেবে প্রকৃতি। এরমধ্যে ঠিকঠাক পথে না চললে, দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তিতে পড়বে মনুষ্যজাতি।

উল্লেখ্য, এখন প্রতি বছর গড়ে ৪০ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে পুরো বিশ্ব। সে হিসেবে ১৩০ বিলিয়নের কোটা পূরণ হতে মোটামুটি বছর তিনেক হাতে আছে।

প্রতিবছর বৈশ্বিক জলবায়ু অস্বাভাবিক আচরণ করছে। যেমন, ২০২৪ সাল ছিল মানবজাতির রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। গবেষকরা দাবি করছেন, প্রাক শিল্প যুগের তুলনায় গত বছর তাপমাত্রা এক দশমিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ভয়ের ভাষা এখন প্রযুক্তিতেও, ভূত ধরার আধুনিক কিট-কৌশল!

মানুষ জন্মের পর থেকে অদৃশ্য কিছু নিয়ে ভয়ের সাথে বসবাস করে। ভূত, আত্মা, অদৃশ্য সত্তা এসব ধারণা একরকম সকল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতীতে ভূত শিকার মানে ছিল তাবিজ, ওঝার মন্ত্র, কিংবা কল্পনার পাখির মতো শব্দ-চোখের আড়াল থেকে আতঙ্কিত হওয়া। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই রহস্যের পেছনে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির আলো। এখন আর শুধু কল্পনা বা গল্প নয়, বরং যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ভূতের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করার চেষ্টা চলছে।

শুরুতে ভূত শিকারিরা হাতে তুলতো ক্যামেরা আর রেকর্ডার। পরবর্তীতে যুক্ত হলো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যেগুলো পরিবেশের পরিবর্তন মাপতে সক্ষম। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের ওঠানামা, তাপমাত্রার ফারাক, অতিস্বনক তরঙ্গ বা এমনকি অদৃশ্য শব্দ তরঙ্গ। সেদিক থেকে আধুনিক ভূত শিকার কিটে রয়েছে একদল যন্ত্র যা একসঙ্গে এই তথ্য সংগ্রহ করে ভূতের অস্তিত্বের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করে। ভূত শিকারের কিটে সাধারণত কিছু মুখ্য উপকরণ থাকে, যেগুলো একসঙ্গে কাজ করে অদৃশ্য ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহে সাহায্য করে বলে বলা হয় ।

চৌম্বকীয় তরঙ্গের ওঠানামা মাপার যন্ত্র EMF ডিটেক্টরও ব্যবহৃত হয়। ভূতের উপস্থিতিতে এই তরঙ্গের পরিবর্তন হয় বলে ধারণা করা হয়। থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা তাপমাত্রার পার্থক্য দেখায়, যেখানে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে বা বাড়ে, সেটাকে কোল্ড স্পট বলা হয়, এটি আত্মার উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে। স্পিরিট বক্স রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি দ্রুত স্ক্যান করে শব্দ তৈরি করে। এই শব্দের মাঝে অনেক সময় ‘হ্যাঁ’, ‘না’ বা মানুষের কণ্ঠের মত টুকরো শোনা যায়, এই শব্দকে আত্মার ভাষা বলে ব্যাখ্যা করা হয়। EVP রেকর্ডার হচ্ছে অতিস্বনক বা মানবকানের বাইরে শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র। পরে এগুলো বিশ্লেষণ করে অদৃশ্য কণ্ঠরেকর্ড খোঁজা হয়। নাইট ভিশন ক্যামেরা তো আছেই। সরল লেজার বা সেন্সর দিয়ে অদ্ভুত গতিবিধি বা ছায়ামূর্তি শনাক্ত করে।মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করেও ভূতের সিগন্যাল খোঁজার চেষ্টা হয়।

এই যন্ত্রগুলো সাধারণত পরিবেশের বিভিন্ন ভৌত পরিবর্তন মাপে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো ভূত দ্বারা সৃষ্ট কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কয়েকটি সাধারণ কারণ যেমন—বৈদ্যুতিক তারের নিকটে EMF বাড়া, বাতাসের প্রবাহে তাপমাত্রার ওঠানামা, বা যান্ত্রিক গোলযোগ স্পিরিট বক্সে বিভ্রান্তিকর শব্দ তৈরি করতে পারে। তাই আধুনিক ভূত শিকার কিটের তথ্যকে সরাসরি ভূতের প্রমাণ বলা কঠিন। তবে এগুলো পরিবেশের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সূচক হিসেবেই কাজ করে, যেগুলো পরে বিশ্লেষণ করে ‘অদ্ভুত’ ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজা হয়। এখানে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও প্রবল, ভয়ের মধ্যে মানুষের মনেই কল্পনার জন্ম হয়, এগুলো পরে বহির্গত ঘটনার সাথে যুক্ত হয়ে ভূতের ধারণা তৈরি করে।

অতীতে যখন ভূতের গল্প প্রচলিত হত, তখন ছিল মুখে মুখে বর্ণনা লোককাহিনী। এখন সেই গল্পগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছায়ায় নতুন রূপ পেয়েছে। ভূত শিকার শো বা ডকুমেন্টারি গুলো প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত হলেও তার আসল আকর্ষণ থাকে ঐতিহাসিক গল্প, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অজানা অতীতের ছায়ায়। এই মাধ্যমগুলো সাংস্কৃতিক থেরাপির মতো কাজ করে, যেখানে মানুষ নিজের ভয়ের গল্পকে মানসিক ও সামাজিক আঙ্গিকে বোঝার চেষ্টা করে। এই ব্যাখ্যায় আধুনিক ভূত শিকার কিট শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের আবেগ,স্মৃতি আর বিশ্বাসেরও সমষ্টি।

কেন মানুষ এখনও ভূতের খোঁজে?
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের ভিতরের অজানা ভয়ের জায়গাটা থেকে যায়। মানুষ সবসময় রহস্যের পিছনে লেগে থাকে। কিছু অতিপ্রাকৃত, কিছু অদৃশ্য, যেগুলো বিজ্ঞান এখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের সঙ্গে ভূত শিকারের ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন নতুন আবিষ্কার। এখন আর শুধু ক্যামেরা বা রেকর্ডার নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, ৩D ম্যাপিং, এমনকি ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ব্যবহার করে গবেষণা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এমন যন্ত্রও থাকবে, যেগুলো তাত্ত্বিকভাবে অদৃশ্য শক্তিকে বিশ্লেষণ করতে পারবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়ভআমাদের ভয় আর বিশ্বাস সেই সঙ্গে কতদূর এগোতে চায়?

আধুনিক ভূত শিকার কিট কেবল যন্ত্রপাতির সংগ্রহ নয়, বরং মানুষের ভয়, বিশ্বাস ও প্রযুক্তির এক সমন্বয়। যন্ত্রগুলো হয়তো ভূতকে ধরে ফেলতে পারে না, কিন্তু আমাদের ভয়ের মূলে ঢুকে যাওয়ার একটা মাধ্যম হয়।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু – কমান্ডো থেকে যেভাবে ‘যুদ্ধবাজ’ প্রধানমন্ত্রী

২০২২ সালের নভেম্বর মাসে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে পুনঃনির্বাচিত হন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি রক্ষণশীল লিকুদ পার্টির প্রধান এবং ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী জোট সরকারের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বিবিসি বলছে, ৭৫ বছর বয়সী নেতানিয়াহু ছয়বার প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যা একটি অতুলনীয় সাফল্য এবং যা অনেকাংশে তার নিজস্ব ‘মি. সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ ভাবমূর্তির ফল।

নেতানিয়াহু আগেই বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলের রক্ষক হিসেবেই স্মরণীয় হতে চান। যদিও নেতানিয়াহুর শাসনামলেই ইসরায়েল তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এর পরবর্তী যুদ্ধ নেতানিয়াহুর বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী চলা গণআন্দোলনকেও থামিয়ে দেয়, যা দেশটিকে মাসের পর মাস বিভক্ত করে রেখেছিল। সমালোচকরা নেতানিয়াহুকে দেশের বিভাজনের জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলেও অভিহিত করেন।

১৯৪৯ সালে তেলআবিবে জন্ম নেন নেতানিয়াহু। ১৯৬৩ সালে তার বাবা বেঞ্জিয়ন (ইতিহাসবিদ ও জায়নিস্ট কর্মী) একটি একাডেমিক পদের প্রস্তাব পেয়ে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

১৮ বছর বয়সে নেতানিয়াহু ইসরায়েলে ফিরে যান এবং পাঁচ বছর সেনাবাহিনীতে কাটান, যেখানে তিনি একটি অভিজাত কমান্ডো ইউনিট ‘সায়েরেত মাতকাল’-এ ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে ফিলিস্তিনিদের দ্বারা অপহৃত একটি বেলজিয়ান এয়ারলাইনারে অভিযানের সময় তিনি আহত হন এবং ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭৬ সালে নেতানিয়াহুর ভাই জনাথন উগান্ডার এনতেবেতে অপহৃত একটি উড়োজাহাজের যাত্রীদের উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নিহত হন। তার মৃত্যু নেতানিয়াহু পরিবারে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি ইসরায়েলে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।

পরবর্তীতে ভাইয়ের স্মরণে একটি সন্ত্রাসবিরোধী ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন নেতানিয়াহু এবং ১৯৮২ সালে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের ডেপুটি চিফ অব মিশন নিযুক্ত হন। এতে রাতারাতিই নেতানিয়াহুর জীবন পাল্টে যায়। পরিষ্কার ইংরেজি উচ্চারণ এবং স্বতন্ত্র আমেরিকান অ্যাকসেন্ট নিয়ে তিনি মার্কিন টেলিভিশনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এবং ইসরায়েলের একজন দক্ষ মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৮৪ সালে তিনি জাতিসংঘে ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ইসরায়েলে ফিরে আসার পর রাজনীতিতে যুক্ত হন নেতানিয়াহু এবং লিকুদ পার্টির হয়ে নেসেটে (পার্লামেন্ট) একটি আসন জয় করেন এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন।

পরে নেতানিয়াহু দলের চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের পর ইসরায়েলে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম সরাসরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। সেসময় নেতানিয়াহু ছিলেন ইসরায়েলের সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের প্রথম নেতা।

১৯৯৩ সালের অসলো শান্তি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করলেও, নেতানিয়াহু হেবরনের ৮০ শতাংশ অংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিতে সই করেন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে আরও অবকাঠামো প্রত্যাহারে সম্মত হন, যা ডানপন্থীদের রোষের কারণ হয়।

১৯৯৯ সালে মেয়াদপূর্তির ১৭ মাস আগেই নির্বাচন আয়োজন করে নিজের সাবেক কমান্ডার লেবার পার্টির নেতা এহুদ বারাকের কাছে হেরে যান নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দেন এবং অ্যারিয়েল শ্যারন তার স্থলাভিষিক্ত হন।

শ্যারন ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর নেতানিয়াহু আবার সরকারে ফিরে আসেন, প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে অর্থমন্ত্রী হিসেবে। ২০০৫ সালে তিনি অবরুদ্ধ গাজা থেকে ইসরায়েলিদের প্রত্যাহারের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।

২০০৫ সালে শ্যারন বড় ধরনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে যান এবং লিকুদ পার্টি ছেড়ে নতুন মধ্যপন্থী দল কাদিমা গঠন করেন। তখন নেতানিয়াহু আবার লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের মার্চে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

তিনি পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণে নজিরবিহীনভাবে ১০ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন, যার ফলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু ২০১০ সালের শেষ দিকে তা ভেঙে পড়ে।

২০০৯ সালে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের পাশে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্যতার ঘোষণা দিলেও, পরে তিনি কঠোর অবস্থানে চলে যান। ২০১৯ সালে এক ইসরায়েলি রেডিওতে তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে না, অন্তত যেভাবে মানুষ ভাবছে, তা কখনো হবে না।’

নেতানিয়াহুর শাসনামলে ফিলিস্তিনিদের হামলা এবং ইসরায়েলি সামরিক প্রতিক্রিয়া গাজা উপত্যকায় নিয়মিত সংঘর্ষে রূপ নেয়।

২০১৫ সালের মার্চে নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন চুক্তিকে ‘একটি খারাপ চুক্তি’ বলে অভিহিত করেন। ওবামা প্রশাসন এই সফরকে হস্তক্ষেপমূলক ও ক্ষতিকর হিসেবে নিন্দা জানায়।

২০১৭ সালে ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইসরায়েল ও মার্কিন নীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এক বছরের মধ্যেই ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই পদক্ষেপ আরব বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে—কারণ তারা পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে দাবি করে—তবে এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য ছিল।

নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে ইরান বিষয়েও একমত হন, যখন ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

২০১৬ সালের পর নেতানিয়াহু ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনটি আলাদা মামলায় তাকে ঘুষ, জালিয়াতি এবং আস্থাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উপহার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক কভারেজ পেতে সুবিধা দিয়েছেন।

যদিও নেতানিয়াহু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, এটি তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।তারপরও ২০২০ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিচারের সম্মুখীন হন।

গাজা ও পরবর্তী সংঘাতের কারণে তার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। কারও কারও দাবি, নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন যেন তাকে বিচারের মুখোমুখি না হতে হয়।

কণার পেছনে প্রশ্ন আর প্রশ্নের পেছনে দর্শন, বিজ্ঞান-দর্শনের সেতু

ধরুন, আপনি একদিন রাস্তায় হাঁটছেন। হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসা একটি পাতা আপনার সামনে এসে পড়ে। আপনি হয়তো প্রথমেই ভাববেন, পাতাটি এখানে কীভাবে এলো? বাতাসের গতি, পাতার ওজন, আকর্ষণ বল এসব ব্যাখ্যা দেবে পদার্থবিজ্ঞান। কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন, “আমি কেন এই ঘটনা লক্ষ্য করলাম?” অথবা “এই ঘটনাটির পেছনে কি কোনো অর্থ নিহিত আছে?” তাহলে আপনি দর্শনের প্রাঙ্গণে পা রেখেছেন।

একই ঘটনার দুই দিক, একটি বস্তুগত ও পরিমাপযোগ্য, অন্যটি মানব মনের গভীর চিন্তা। ইতিহাস সাক্ষী যে পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। যেখানে পদার্থবিজ্ঞান উত্তর দেয় জগত কীভাবে কাজ করে, সেখানে দর্শন প্রশ্ন তোলে কেন তা ঘটে। এই ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’ দুইটি মৌলিক প্রশ্নের মধ্যবর্তী সংকট থেকেই উদ্ভূত মানব মেধার সবচেয়ে প্রাচীন ও গভীর দুটি শাখা হলো পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন।

প্রাচীন দর্শনের যুগে, বিশেষ করে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের সময়ে, পদার্থবিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে দর্শনেরই একটি শাখা হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন ‘বিশ্ব কীভাবে চলে’ এই প্রশ্নে দর্শনের যুক্তি ও প্রকৃতির পর্যবেক্ষণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল না। প্লেটো আদর্শ রূপের (Form) তত্ত্ব উপস্থাপন করতেন, আর অ্যারিস্টটল পদার্থ ও গতি নিয়ে তত্ত্ব রচনা করতেন, যা পরবর্তীতে নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং বলা যায়, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দর্শনের অন্তর্গত ভাবনা থেকে জন্ম নিয়েছে।

গ্যালিলিও যখন বিজ্ঞানের জন্য প্রমাণভিত্তিক যুক্তির পথ প্রশস্ত করলেন, তিনি বললেন সব বস্তু একই বেগে পড়ে। নিউটন যখন ‘মাধ্যাকর্ষণ’ শক্তির ধারণা প্রকাশ করলেন, তখন দর্শনের নানাবিধ প্রশ্ন সামনে এলো “শূন্যস্থানেও কেন দুটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে?” নিউটনের যুগ থেকেই পদার্থবিজ্ঞান নিরপেক্ষ বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছে, যেখানে বস্তু, গতি ও বলের মধ্যকার সম্পর্ক নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। কিন্তু দর্শন তখনও প্রশ্ন তোলে “এই নিয়মগুলি কার হাতে গড়া? আদৌ এই নিয়মগুলোর উৎপত্তি কোথায়?”

১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের মাধ্যমে সময় ও স্থানের ধারণা বদলে যায়। সময় আর স্থির নয়, স্থানও চিরস্থায়ী নয়। এগুলো সম্পূর্ণরূপে আপেক্ষিক, অর্থাৎ পর্যবেক্ষকের অবস্থান ও গতির উপর নির্ভরশীল। এই তত্ত্ব দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা আপেক্ষিকতাবাদের (Relativism)—সাথে মিলে যায়, যা বলে সত্য বা বাস্তবতা কোনো একক অচল বস্তু নয়, বরং এটি পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দার্শনিক সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিতে কণার অবস্থান ও বেগ একসঙ্গে নির্ধারণ করা যায় না। এর ফলে প্রশ্ন উঠে “সত্যের ধারণা কি ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে?” অথবা “কণার অস্তিত্ব কি কেবল আমাদের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল?” এই ধরনের চিন্তা দর্শনের অস্তিত্ববাদ ও বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যতা তত্ত্বের সঙ্গে অবাক করার মতো সাদৃশ্যপূর্ণ।

২০শ শতাব্দীর বিশিষ্ট দার্শনিক লুডভিগ উইটজেনস্টাইন বলেছিলেন “আমার ভাষার সীমাই আমার জগতের সীমা।” অর্থাৎ আমরা কেবল সেই বাস্তবতাকেই চিনতে ও প্রকাশ করতে পারি যা ভাষার মাধ্যমে ধরা যায়। পদার্থবিজ্ঞানে নানান জটিল গাণিতিক ফর্মুলার মাধ্যমে মহাবিশ্বের বিভিন্ন দিক বর্ণনা করা হয়। তবে বহু বিজ্ঞানী স্বীকার করেন, প্রকৃত বাস্তবতা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। এখানেই ভাষা ও অর্থের সীমা নিয়ে দর্শনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

নিলস বোর, হাইজেনবার্গ, আইনস্টাইন ছিলেন দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, “বিজ্ঞানহীন দর্শন অন্ধ, আর দর্শনহীন বিজ্ঞান পঙ্গু।” এ থেকে স্পষ্ট হয়, তারা যুক্তি ও উপলব্ধিকে একত্রিত করে বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আজকের দিনে বিজ্ঞানী শন ক্যারল, রজার পেনরোজ ও অনেকে দর্শনের বহুদিনের প্রশ্ন যেমন চেতনাবোধ বা চেতনার গণিতিক ভিত্তি নিয়ে গবেষণা করছেন।

বাংলাদেশের মহান বিজ্ঞানী সত্যেন বসুকে আমরা ‘বোসন’ কণার আবিষ্কর্তা হিসেবে চিনি; তিনি দার্শনিকভাবেও প্রখ্যাত। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, চেতনা ও বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্য করা যায়। জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছিলেন “উদ্ভিদেও চেতনা রয়েছে,” যা ছিলো তাঁর পরীক্ষানির্ভর যুক্তি ও দর্শনের অন্তর্জ্ঞান।

বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চেতনাবোধ, মহাবিশ্বের সৃষ্টিকাল ও অবসানের রহস্য, সময়ের প্রকৃতি এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের মাধ্যমে, তবে এই উত্তরগুলো অনেক সময় দর্শনের গভীর চিন্তার ওপরও নির্ভরশীল।

অতএব, বিশ্বজগত বোঝার জন্য শুধু পদার্থের গতি ও শক্তিই যথেষ্ট নয়; দরকার সেই ‘চিন্তা’ যা প্রশ্ন তোলে এবং ভাবতে শেখায়। পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নের ভাষা দেয়, আর দর্শন তার গভীরতা প্রদান করে।

“শিয়া-সুন্নি বিভাজন ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত” : আরিফ রহমান, লেখক

ইসলামের ইতিহাসে শিয়া-সুন্নি বিভাজন একটি গভীর ও সংবেদনশীল অধ্যায়, যার শেকড় প্রোথিত আছে মহানবী (সা)-এর উত্তরাধিকারের প্রশ্নে। এই বিভাজনের সূচনা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইসলামের ইতিহাসের একেবারে ঊষালগ্নে, বিশেষ করে “গাদীর খুম” (غدير خم) নামক একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে।

“শিয়া” শব্দটি এসেছে “শিয়াতু আলী” বা “আলী’র দল” থেকে। তারা বিশ্বাস করেন, নবী (সা)-এর পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব বা খেলাফতের একমাত্র ন্যায্য অধিকারী হলেন তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাতা হযরত আলী (রা)। অন্যদিকে, “সুন্নি” বা “আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আহ” এর অনুসারীরা মনে করেন, নবী (সা) নির্দিষ্ট কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেননি, বরং মুসলিমদের পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র মাধ্যমেই নেতা নির্বাচিত হবেন।

গাদীর খুম: যেখান থেকে বিতর্কের শুরু

১০ম হিজরিতে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর জীবনের শেষ হজ, যা ‘বিদায় হজ’ নামে পরিচিত, তা থেকে মদিনায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ‘গাদীর খুম’ নামক স্থানে তিনি প্রায় লক্ষাধিক সাহাবীর কাফেলাকে থামিয়ে একটি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি হযরত আলী (রা)-এর হাত উঁচু করে ধরে জনতার উদ্দেশে ঘোষণা করেন:

“মান কুনতু মাওলাহু, ফা-হাযা আলিইয়্যুন মাওলাহু” (আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা)।
এই একটি বাক্যই শিয়া-সুন্নি ব্যাখ্যার ভিন্নতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

দুই ব্যাখ্যা: নেতৃত্বের ঘোষণা নাকি বন্ধুত্বের প্রকাশ?

শিয়া মুসলমানদের কাছে গাদীর খুমের ঘটনা হলো হযরত আলী (রা)-এর খেলাফতের সুস্পষ্ট ও ঐশী ঘোষণা। তাঁদের মতে, এখানে “মাওলা” শব্দের অর্থ “নেতা” বা “কর্তৃত্বের অধিকারী”। শিয়ারা বিশ্বাস করেন, এই ঘোষণার পরই কুরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতটি নাজিল হয়, যেখানে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিনটিকে স্মরণ করে তাঁরা প্রতি বছর ‘ঈদে গাদীর’ পালন করেন।

অপরদিকে, সুন্নি আলেম ও ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, “মাওলা” শব্দের অর্থ এখানে “বন্ধু” বা “প্রিয়জন”। তাঁদের মতে, এই ঘোষণার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল। ইয়েমেন থেকে ফেরার পথে গনিমতের মাল বণ্টন নিয়ে হযরত আলী (রা)-এর সাথে কিছু সেনার মতবিরোধ তৈরি হয়। নবী (সা) সেই বিতর্ক নিরসন এবং আলী (রা)-এর প্রতি নিজের ভালোবাসা ও সমর্থন প্রকাশ করার জন্যই এই কথা বলেছিলেন। সুন্নিরা যুক্তি দেন, খেলাফতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নবী (সা) এমন পরোক্ষ শব্দে ঘোষণা না করে আরও পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারতেন।

সাকিফা বনু সায়িদা: ক্ষমতার পালাবদল

নবী (সা)-এর ওফাতের পরপরই এই মতপার্থক্য বাস্তবে রূপ নেয়। যখন হযরত আলী (রা) ও নবী পরিবার নবীজীর দাফন-কাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন মদিনার ‘সাকিফা বনু সায়িদা’ নামক স্থানে আনসার ও মুহাজিরদের একাংশ হযরত আবু বকর (রা)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচন করেন।

শিয়াদের মতে, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে নবী (সা)-এর পরিবারের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সুন্নিদের মতে, সাকিফার সিদ্ধান্ত ছিল উম্মাহকে নেতৃত্বহীন অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সাহাবীদের ‘শূরা’ বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।

ইমামত বনাম খেলাফত: মূল মতাদর্শিক পার্থক্য

এই বিভাজনের মূলে রয়েছে নেতৃত্ব বিষয়ক দুটি ভিন্ন ধারণা—শিয়াদের ‘ইমামত’ এবং সুন্নিদের ‘খেলাফত’।

শিয়া ইমামত: শিয়ারা বিশ্বাস করে, ইমামত আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একটি আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পদ। নবী (সা)-এর পর এই পদের অধিকারী তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, যাঁরা নিষ্পাপ (মাসুম) এবং ইসলামের নির্ভুল ব্যাখ্যাকারী।

সুন্নি খেলাফত: সুন্নিরা মনে করে, খেলাফত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিমরা পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিকে শাসক হিসেবে নির্বাচন করবে। তাই তাঁরা প্রথম চার খলিফাকে ‘খুলাফায়ে রাশিদুন’ বা ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে শ্রদ্ধা করেন।

কারবালার ট্র্যাজেডি: বিভক্তি যখন রক্তে রঞ্জিত

প্রাথমিকভাবে এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক থাকলেও ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা এটিকে একটি গভীর আবেগ ও ধর্মীয় পরিচয়ে রূপান্তরিত করে। নবী (সা)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা) তৎকালীন উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং মুষ্টিমেয় সঙ্গীসহ শহীদ হন। এই শাহাদাত শিয়া ইসলামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সময়ের সাথে সাথে এই বিভাজন মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ষোড়শ শতকে ইরানে সাফাভি রাজবংশ শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে এই বিভাজন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক রূপ লাভ করে। আজকের দিনেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে এই ঐতিহাসিক বিভাজনের ছায়া দেখা যায়, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে ক্ষমতার লড়াই মূল কারণ হিসেবে কাজ করে।

শিয়া-সুন্নিদের বাহ্যিক পার্থক্য

নেতৃত্বের ধারণা ছাড়াও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ফিকহ (ইসলামি আইন) ও ধর্মীয় আচারে কিছু পার্থক্য রয়েছে, যেমন: সাহাবীদের মর্যাদা বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, নামাজ ও আজানের পদ্ধতিতে সামান্য ভিন্নতা এবং আশুরা পালনের রীতি। শিয়ারা ইমাম হুসাইন (রা)-এর শাহাদাতের স্মরণে মহররম মাসে গভীর শোক পালন করে, যা তাদের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিভেদ নয়, সম্প্রীতির অন্বেষণ

শিয়া-সুন্নি বিভাজনের ইতিহাস জটিল এবং বেদনাদায়ক। কিন্তু এই বিভেদের মাঝেও উভয় সম্প্রদায়ের মৌলিক বিশ্বাস এক: এক আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা)-এর নবুওয়ত, পবিত্র কুরআন এবং পরকাল। পার্থক্যগুলো মূলত ইতিহাস, ব্যাখ্যা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে।ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির মনোভাব পোষণ করাই এখন সময়ের দাবি। গাদীর খুমের ঘটনা যেমন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটি হযরত আলী (রা)-এর প্রতি নবী (সা)-এর গভীর ভালোবাসারও প্রমাণ। এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার শিক্ষাকে ধারণ করেই মুসলিম উম্মাহ শান্তি ও ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

আমের অর্থনীতি

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হলেও এই খাতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সামান্যই ব্যবহার করতে পেরেছে। বছরে ২০ লাখ টনের বেশি আম উৎপাদন হলেও এটি এখনো কেবল একটি মৌসুমি ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচিত, কোনো কৌশলগত শিল্প হিসেবে নয়। দেশে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ খুবই কম, রপ্তানি সীমিত, এবং অবকাঠামোও দুর্বল।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশে ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ও খাওয়া হয় আম। আম পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও এর বহুমুখী ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে আম হয়। এর অপূর্ব ঘ্রাণ, মিষ্টি স্বাদ এবং পুষ্টিমূল্য একে দিয়েছে “ফলের রাজা”র মর্যাদা।

তবুও, এর জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃত চাষাবাদের পরও, আমকে এখনো একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পপণ্য হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।যদিও চাষি, নার্সারি মালিক এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আম ব্যবসায় বেশ লাভ করেন। কিন্তু আমকে কেন্দ্র করে কৃষিভিত্তিক শিল্প সেভাবে এখনো দাঁড়ায়নি।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি একটি বড় সুযোগ হারানোর শামিল। বিদেশি ফলের রস, জ্যাম ও জেলি আমদানির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায়, বাংলাদেশের নিজস্ব আমভিত্তিক মূল্য সংযোজন শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিক্রি সীমিত থাকলেও, আমদানি বিকল্প হিসেবে দেশেই আমজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ালে অনেক অর্থ দেশেই থেকে যাবে। আর আমভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প করা গেলে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে।

১৯৮৫ সাল থেকে সরকার আম উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখনো জাতীয় শিল্প কৌশলে আমের স্থান নেই এবং একে কৌশলগত কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় “রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প” অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ১,২০,০০০ একর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। যার প্রধান অঞ্চলগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম।

আমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই প্রতি ১০ একর বাগানে এক মাসের জন্য ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক কাজ করে। আমের মৌসুমে প্রায় ৮০,০০০ মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে আম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফিলিপাইন সারা বছর চাষ অব্যাহত রাখতে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে, আর ভারত আমকে একটি রপ্তানিকেন্দ্রিক কৃষিপণ্য শিল্প হিসেবে সফলভাবে গড়ে তুলেছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুর রহমানের মতে, বাংলাদেশ বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন করে, যার অভ্যন্তরীণ বাজার মূল্য প্রায় ১৩,০০০ থেকে ১৪,০০০ কোটি টাকা। অনেকে আম খাতের প্রকৃত মূল্য ৩০,০০০–৩৫,০০০ কোটি টাকা হিসেবে ধারণা করেন, যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনো অনেক বাধা রয়ে গেছে। বাংলাদেশি আমের স্বাদ তুলনাহীন হলেও, অল্প সংরক্ষণক্ষমতা এবং চেহারার অমসৃণতা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। “স্বাদ অতুলনীয়, কিন্তু রঙ ও দ্রুত পচে যাওয়ার কারণে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়,” বলেন আরিফুর রহমান।

এইসব বাধা সত্ত্বেও, গত পাঁচ বছরে দেশে আম উৎপাদন গড়ে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। দেশজুড়ে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৮০,০০০ মানুষ আম অর্থনীতিতে যুক্ত হয়—শ্রমিক থেকে শুরু করে ই-কমার্স কর্মী, কুরিয়ার, প্রক্রিয়াজাতকরণকর্মী পর্যন্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৭২টি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে এবং ৩৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ভালো মানের সংরক্ষণ ও কোয়ারানটাইন অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আম রপ্তানি অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার খাত হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আম বিপ্লব জীবন বদলে দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব অঞ্চলটি এখন দেশের একটি ফলের ঝুড়িতে পরিণত হচ্ছে, যা জাতীয় ফল উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশের জোগান দিচ্ছে।

বর্তমানে খাগড়াছড়ির প্রায় ৩,৫০০ আমচাষি বছরে ৬০,০০০ টন আম উৎপাদন করছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ।উৎপাদন প্রতি বছর অন্তত ১০ শতাংশ হারে বাড়ায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল ডেইলি স্টারকে বলেন, “প্রতিযোগিতামূলক আম অর্থনীতি গড়ে তুলতে আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন বাড়াতে হবে, চাষি ও রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে এবং বিশেষ আমকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে থাকবে আধুনিক হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট ও পরিবহন নেটওয়ার্ক।”

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমাদেরকে কি শেখায়?

কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন আমরা মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্পে বিশ্বাস করি যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই? কেন হঠাৎ করেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে “সবকিছুই আসলে গোপন কোনো চক্রান্তের ফল”? এটি এমন এক অদ্ভুত সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক খেলা যা কেবল ইতিহাসেই নয়, আমাদের বর্তমানেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শিকড় কোথায়?

প্রথমেই চলুন একটু ইতিহাসে যাই। ৩৩১ খ্রিষ্টপূর্বে রোম নগরীতে হঠাৎ করে অনেক প্রভাবশালী পুরুষ মারা যেতে লাগলেন। তখন এক দাসী দাবি করল, শহরের অভিজাত নারীরা নাকি গোপনে বিষ তৈরি করছে! তদন্তে দেখা গেল, সত্যিই কিছু ওষুধ বানানো হচ্ছিল, কিন্তু সন্দেহ হল এগুলো কি বিষ, নাকি চিকিৎসার জন্য? দু’জন নারী নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে সেই ওষুধ খেয়ে ফেললেন, সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন। এরপর ব্যাপক গ্রেপ্তার, ১৭০ জন নারী অভিযুক্ত। কিন্তু ইতিহাসবিদ লিভি মনে করেন, আসলে শহরে কোনো মহামারী চলছিল, আর এই ষড়যন্ত্রের গল্পটা বানানো হয়েছিল মানুষের আতঙ্ককে ব্যাখ্যা করতে।

কেন ছড়িয়ে পড়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এগুলো আমাদের সমাজের গভীর উদ্বেগ, ভয় আর সন্দেহকে তুলে ধরে। আধুনিক যুগে ৫জি টাওয়ার নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিল, নতুন করোনাভাইরাস নাকি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়াচ্ছে! যুক্তরাজ্যে ৭৭টি টাওয়ার ও ৪০ জন ইঞ্জিনিয়ারের ওপর হামলা হয়েছিল এই গুজবের কারণ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ এমন গল্পে বিশ্বাস করে? গবেষকরা বলছেন, সমাজে যখন অস্থিরতা, সংকট বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন মানুষ সহজ ব্যাখ্যার খোঁজে ছুটে। কোনো জটিল ঘটনা বা অজানা বিপর্যয় হলে আমরা চাই, একে কোনো খারাপ লোক বা গোপন শত্রুর ওপর দোষ চাপাতে।

ইতিহাসজুড়ে দেখা যায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সবসময়ই সঠিক খলনায়ক থাকে। রোমে অভিজাত নারী বা দাস, আধুনিক সমাজে কখনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কখনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কখনো বিদেশি শক্তি। এইভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সমাজের বিদ্যমান ভয়, সন্দেহ আর বিভাজনকে কাজে লাগায়।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধু ভয় নয়, আমাদের “আমরা বনাম ওরা” মানসিকতাকেও উস্কে দেয়। এতে একদিকে নিজের দল বা পরিচয় নিয়ে গর্ব তৈরি হয়, অন্যদিকে “বাইরের শত্রু”কে দোষারোপ করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সমাজে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা বিভাজন বেশি সেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বেশি জনপ্রিয় হয়।

আমরা গল্প ভালোবাসি। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে থাকে নাটকীয় খলনায়ক, গোপন পরিকল্পনা, নৈতিক শিক্ষা সব মিলিয়ে এক টানটান গল্প! তাই সহজ, সরল সত্যের চেয়ে এমন গল্প আমাদের বেশি টানে। যেমন, “একটি ভাইরাস হঠাৎ এল, হাজার হাজার মানুষ মারা গেল” এটা শুনতে একঘেয়ে, তার চেয়ে “গোপন শক্তি ভাইরাস ছড়িয়েছে” এটা অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

অনেক সময় কোনো ঘটনা বা বিপর্যয়ের পর সরকার বা বিজ্ঞানীরা দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে পারেন না। তখন তথ্যের শূন্যতা আর মানুষের সন্দেহ একসাথে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়। ১৯৯০-এর দশকে এক বিজ্ঞানী ভুলভাবে দাবি করেছিলেন, এমএমআর ভ্যাকসিনে অটিজম হয়। পরে বহু গবেষণায় সেটা ভুল প্রমাণিত হলেও, এর মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে, অনেক ক্ষতিও হয়ে যায়।

আগে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতো মুখে মুখে, এখন ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। একবার কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে, সেটা নিয়ে আলোচনা, হাস্যরস, প্রতিবাদ সবই আসলে সেই গল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। আজকাল অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দেশ-কাল-সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।

আগে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতো সমাজের প্রান্তিক মানুষ, এখন অনেক সময় ক্ষমতাবানরাও এসব ছড়ান নিজেদের স্বার্থে। করোনা নিয়েও বিভিন্ন দেশের নেতারা নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছেন, যাতে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা সামনে আসে। এতে সমাজ আরও বিভক্ত হয়, সত্য-মিথ্যার সীমা আরও ঝাপসা হয়ে যায়।

কীভাবে সামলাবো?

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমাদের সমাজের গভীর উদ্বেগ, বিভাজন আর তথ্যের শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো যেমন আমাদের গল্প বলার প্রবণতার ফসল, তেমনি কখনো কখনো বড় বিপদের কারণও হতে পারে। তাই কোনো নতুন গল্প বা গুজব শুনলে, একটু ভাবুন এটা কি সত্যিই যুক্তিসঙ্গত? নাকি আমাদের ভয়, সন্দেহ আর গল্পের প্রতি ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে কেউ আমাদের ভুল পথে চালাচ্ছে?

আসলেই কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা আছে ইরানের?

মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো অবস্থায় নেই। শুধু তাই নয়, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে তেহরানের অন্তত তিন বছর লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এসব তথ্য দিয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ট্রাম্প প্রশাসনের চারজন কর্মকর্তা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ইসরায়েলের হামলার পর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, আকস্মিক এ হামলা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির করার পথে ঠেলে দিতে পারে।

গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসি গ্যাবার্ড মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায় এখনো বিশ্বাস করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ করছে না এবং তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা খামেনি ২০০৩ সালে যে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন সেটিকে আবার চালু করার অনুমতি দেননি।’

তবে গ্যাবার্ড বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা কোনো পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।

অথচ, নিজ দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং তারা খুব দ্রুত এগোচ্ছে।

নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন কর্মসূচি বন্ধে আগাম ব্যবস্থা হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, তেহরান ইতিমধ্যে ৯টি পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তবে নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা বলছেন, তিনি মূলত অন্য কিছু প্রতিরোধ করতে আগাম পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেটা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা কিংবা নেতানিয়াহু সরকারের পতন ঠেকানো।

৯০ এর দশক থেকেই ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে যে ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করতে চাচ্ছে। ইরান বরাবরই বলে আসছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরমাণু প্রকল্প পরিচালনা করছে তারা৷ তারপরও অনেকের সন্দেহ থাকার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে — ইরানের ইউরেনিয়ামের ব্যাপক পরিমাণ মজুদ ও এ বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব।

ইরান এখন ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ৪০০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজন ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম৷ এখনো ইরান সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি৷

২০১৫ সালের ঐতিহাসিক জয়েন্ট কমপ্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম ৩.৭ শতাংশের বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করবে না। এই মাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তারা ৩০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাখতে রাজি হয়েছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালে জেসিপিওএ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর এক বছর পেরোতেই ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করে। তারা শুধু যে ২০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাই শুরু করে তাই-ই নয়, বরং প্রথমবারের মতো তা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। আইএইএ’র মতে, এই হারে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের জন্য দরকারি মানের কাছাকাছি পর্যায়ের।

মনোবিজ্ঞান – ‘মিলগ্রাম এক্সপেরিমেন্ট’ আনুগত্যে কি আরাম মানুষের?

কল্পনা করুন আপনাকে বলা হলো কেউ একজন ভুল করলেই আপনি তাকে বৈদ্যুতিক শক দেবেন। আপনি জানেন, শকটা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কর্তৃপক্ষ। তিনি বলছেন, “চালিয়ে যান, পরীক্ষার প্রয়োজনে আপনাকে চালিয়ে যেতেই হবে।” আপনি কী করবেন? থামবেন, নাকি চালিয়ে যাবেন?

এই প্রশ্নই ১৯৬১ সালে স্ট্যানলি মিলগ্রাম নামের এক আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী তার বিখ্যাত পরীক্ষায় সামনে এনেছিলেন। আজ প্রায় ছয় দশক পরেও এই পরীক্ষা শুধু মনোবিজ্ঞানে নয়, রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধাপরাধ এবং আধুনিক সমাজের নৈতিকতা বিশ্লেষণের অন্যতম মানদণ্ড হয়ে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জার্মান নাৎসি সেনাদের বিচার চলাকালীন সময়ে একটা প্রশ্ন সামনে উঠে আসে, “এতো এতো গণহত্যা, এতো বর্বরতা কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো?” অভিযুক্তরা প্রায় সবাই একই সুরে জবাব দিয়েছিলো, “তারা আদেশ পালন করেছে।” এই নিঃস্পৃহ জবাবে ভীত ও বিস্মিত হয়ে উঠেছিলো গোটা দুনিয়া। স্ট্যানলি মিলগ্রাম এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চাইলেন, সাধারণ মানুষও কি এমন অন্ধভাবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে পারে যে নৈতিকতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে?

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিকে বলা হতো, সে একজন শিক্ষক। সে তার অদৃশ্য ‘ছাত্র’কে প্রশ্ন করছে, এবং ভুল উত্তরের জন্য শাস্তি হিসেবে বৈদ্যুতিক শক দিচ্ছে। শক ১৫ ভোল্ট থেকে শুরু করে ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত বাড়ানো হতো। ছাত্রটি সম্পর্কে শিক্ষক কিছুই জানেন না। শিক্ষক যখন দ্বিধায় পড়েন, তখন পরীক্ষক (authority figure) নিরপেক্ষ গলায় বলেন “চালিয়ে যান।” “পরীক্ষার জন্য এটা আপনাকে চালিয়ে যেতে হবে।” “আপনার অন্য কোনো বিকল্প নেই।”

ফলাফল ছিলো চমকপ্রদ, প্রায় ৬৫% অংশগ্রহণকারী ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত শক দেন, অপরদিক থেকে ‘ছাত্র’ চিৎকার করে বলছে “আমার হৃদরোগ আছে!”, “আমি আর নিতে পারছি না!” এসব শুনে শুনে কেউ কেউ ঘেমে যাচ্ছেন, আতঙ্কিত হচ্ছেন, কিন্তু শাস্তি দিয়েই যাচ্ছেন!

মিলগ্রাম বলেন এটি Agentic State। এই অবস্থা তখন ঘটে যখন মানুষ নিজেকে ‘সিদ্ধান্তের কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে না দেখে বরং ‘নির্দেশের বাহক’ হিসেবে দেখে। ফলে নৈতিক দায়বদ্ধতা তার উপর আর থাকে না। সে মনে করে যা হচ্ছে তার দায় মূলত নির্দেশদাতার।এটি শুধু একাডেমিক ধারণা নয়। বাস্তব জীবনেও আমরা এর নমুনা দেখেছি, আবু ঘরিব কারাগারে মার্কিন সেনাদের অমানবিকতা, রুয়ান্ডার গণহত্যা, পাকিস্তানি সেনাদের ১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞ। এইসব ক্ষেত্রে অনেকে বলেছিলেন “আমি ত শুধু আদেশ পালন করেছিলাম।” অর্থাৎ ‘মিলগ্রাম মুহূর্ত’ বারবার ফিরে আসে।

কর্তৃত্বের প্রতি আমাদের আনুগত্য অনেকাংশেই সামাজিকভাবে গঠিত। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অনুশাসন সব জায়গাতেই “প্রশ্ন না করে মেনে চলা” শেখানো হয়। শিশুদের শেখানো হয়, “বড়দের কথা না শুনলে শাস্তি হবে”। এই শেকড়েই মিলগ্রামের পর্যবেক্ষণ প্রোথিত। এই প্রবণতা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামরিক কাঠামোতে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। একজন পুলিশ অফিসার বা সরকারি কর্মচারী কখনো কখনো অনৈতিক নির্দেশ পালন করেন শুধু ‘উপরের আদেশ’-এর খাতিরে। বাংলাদেশেও এমন বহু ঘটনার নজির রয়েছে।

মিলগ্রামের এক্সপেরিমেন্ট যুগান্তকারী হলেও এর সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেকে বলেন এটি নাটকীয় এবং আর্টিফিশিয়াল পরিস্থিতি। কেউ কেউ হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন এটি একটি অভিনয়। আবার অংশগ্রহণকারীদের মানসিক চাপের মাত্রাও প্রশ্নবিদ্ধ।

এছাড়া এখনকার গবেষণা নীতিমালায় এই ধরনের পরীক্ষাকে “Ethically problematic” ধরা হয়। তবুও জেরি বার্গার ২০০৯ সালে কিছু নিরাপদ পরিবর্তনসহ পুনরায় পরীক্ষাটি চালান এবং প্রায় একই রকম ফল পান।

বর্তমান বিশ্বে যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভুয়া তথ্য, দমন-পীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র ও নেতা-পূজার সংস্কৃতি বেড়ে চলেছে, সেখানে মিলগ্রামের গবেষণা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

যখন কেউ বলে “আমি কেবল কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে চলেছি”, তখন আমাদের প্রশ্ন করা উচিত “এই নিয়ম কি ন্যায্য ছিলো?” নৈতিকতা কি কেবলই নির্দেশ পালন, না কি কখনও সেটিকেও প্রশ্ন করা? মিলগ্রামের এক্সপেরিমেন্ট আমাদের বলে দেয় একজন সাধারণ মানুষও চরম অমানবিক সিদ্ধান্তে যেতে পারে, যদি সে তার সম্পূর্ণ বিবেককে কর্তৃপক্ষের কাছে সঁপে দেয়।

নার্সিসিজমেরও আছে ভালো দিক, বদলে দিতে পারে সমাজ

আমরা যখন ‘নার্সিসিজম’ শব্দটি শুনি, তখন প্রথমেই যা মনে আসে তা হলো অতিরিক্ত আত্মপ্রেম, অহংকার, অথবা এমন কাউকে যিনি নিজের চেহারা, অর্জন বা কথা নিয়ে অকারণে গর্ব করেন। এমন কাউকে আমরা সচরাচর অপছন্দ করি। কারণ সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, ‘নিজেকে বড় ভাবা খারাপ’। কিন্তু আজকের আলোচনায় আমরা একটু ভিন্নভাবে ভাবতে চাই।

আমরা খুঁজে দেখতে চাই এই যে আত্মমুগ্ধতা, এই যে ‘নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ থাকা’ তা কি একেবারেই খারাপ? না কি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে কিছু সামাজিক প্রয়োজন? হয়তো অবাক হবেন শুনে, কিন্তু মনোবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বলছে, নার্সিসিজমের মধ্যেও রয়েছে উপকারিতা, বিশেষ করে যখন তা নিয়ন্ত্রিত এবং সচেতনভাবে ব্যবহৃত হয়।

নার্সিসিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক পুরাণের চরিত্র ‘নার্সিসাস’ থেকে, যে নিজের প্রতিবিম্বে এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ে যে, সেখানেই ডুবে মারা যায়। সেই কাহিনির মতোই, আধুনিক মনোবিজ্ঞানে নার্সিসিজম বলতে বোঝানো হয় এমন এক ব্যক্তিত্ব, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করে, নিজের কৃতিত্বে আনন্দিত হয় এবং অন্যদের প্রশংসা কামনা করে।

তবে এই বৈশিষ্ট্যটি একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বরং আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কম-বেশি নার্সিসিজম থাকে এবং তা প্রয়োজনীয়ও। একে বলা হয় “Healthy Narcissism” যেখানে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসী, নিজেকে ভালোবাসে, কিন্তু অপরকেও ছোট করে দেখে না।

নার্সিসিজম সমাজে কীভাবে উপকারী ভূমিকা রাখে?

যেকোনো বড় পরিবর্তনের পেছনে যিনি থাকেন, তিনি সাধারণত নিজের ওপর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী হন। সেই আত্মবিশ্বাস অনেক সময় বাহ্যিকভাবে ‘অহং’ বলেই মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে সেটিই তাঁকে ঝুঁকি নিতে শেখায়, ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

শিল্পী, কবি, পরিচালক বা ডিজাইনাররা অনেক সময় নিজেদের কাজ নিয়ে গর্বিত থাকেন। তারা মনে করেন, ‘এই সৃষ্টি অন্যদের ছুঁয়ে যাবে।’ এ বিশ্বাস ছাড়া কেউ শিল্পচর্চা করতে পারে না। একে বলা যেতে পারে সৃষ্টিশীল নার্সিসিজম যেখানে নিজের মূল্য বুঝে তা প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে নতুন কিছু দেওয়া হয়।

সামাজিকভাবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমাজ যাদের সাহসী কণ্ঠ পায়, তারাই সমাজকে বদলায়। আত্মপ্রেম অনেক সময় সেই সাহস জোগায়।

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আত্মপ্রচারের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। আপনি যত ভালো হোন না কেন, যদি নিজেকে তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে আপনি অনেকাংশেই অদৃশ্য। নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য অনেক সময় মানুষকে আত্মপ্রচারে দক্ষ করে তোলে। এই আত্মপ্রচার যদি শুধুই গর্ব না হয়ে, নিজের কাজের কার্যকারিতা ও প্রভাব তুলে ধরার মাধ্যম হয়, তবে তা সমাজের জন্যও সহায়ক।

মানুষ যখন দেখে কেউ নিজের অর্জন নিয়ে খুশি, বা প্রকাশ্যে বলে, “আমি পারি”—তখন অনেকেই মনে মনে ভাবে, “আমি কেন পারবো না?” এটি একধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি করে। হিংসা নয়, বরং অনুপ্রেরণার জন্ম দেয়। এভাবেই একাধিক ব্যক্তি উন্নতির দিকে এগোয়, সাথে সমাজে সাফল্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়।

স্বাস্থ্যকর নার্সিসিজম ব্যক্তি ও সমাজকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। যখন একজন ব্যক্তি নিজের মূল্য জানেন, নিজের সক্ষমতা বোঝেন, তখন তাঁর আত্মসম্মান অন্যের কথায় ভেঙে পড়ে না। তিনি জানেন, তিনি কে, কী চান এবং কী করতে পারেন। এমন ব্যক্তি সমাজের চাপ ও ব্যর্থতা মোকাবিলায় দৃঢ় থাকেন। এটি এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য, যা ক্রমবর্ধমান মানসিক অসুস্থতার যুগে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশি সমাজে ‘নম্রতা’ ও ‘বিনয়’ এমনভাবে রোপিত হয়েছে, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসকেও অহংকার বলে ভুল করা হয়। ফলে যারা আত্মপ্রচারে পারদর্শী, বা নিজের কথা নিজে বলতে পারে, তারা সহজেই “অহংকারী” বা “ভণ্ড” ট্যাগ পেয়ে যায়।

অথচ একই সমাজে আমরা ‘নেতা’, ‘সেলিব্রিটি’, কিংবা ‘উদ্যোক্তা’দের সম্মান করি, যারা প্রায়শই নিজেদের শক্তভাবে উপস্থাপন করেন।এই দ্বিচারিতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নার্সিসিজমের প্রয়োজনীয়তা। নতুন প্রজন্ম আত্মবিশ্বাসী, তারা নিজেদের কাজ নিয়ে গর্বিত।সোশ্যাল মিডিয়া তাদের একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। তবে এই আত্মপ্রচারে যেন দম্ভ না আসে, সেই শিক্ষা ও সচেতনতা জরুরি।

কখন নার্সিসিজম ক্ষতিকর হয়ে ওঠে?

যখন কেউ কেবল নিজেকে কেন্দ্র করে সমাজ বা পরিবারের কাঠামো ভেঙে ফেলেন, তখন সেটা ভয়ংকর হয়। অতিরিক্ত আত্মমুগ্ধতা ব্যক্তি ও সমাজ দু’টোকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমন মানুষ সহানুভূতিশীল হন না, সমালোচনা নিতে পারেন না, এবং অন্যের প্রয়োজনীয়তা অবহেলা করেন। এতে সৃষ্টি হয় Toxic Narcissism যা সম্পর্ক, সমাজ ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।

অসুস্থ narcissism আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি করে, কিন্তু স্বাস্থ্যকর narcissism আত্মমর্যাদা শেখায়। যদি আমরা আমাদের শিশুদের শিখাই “নিজেকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্যকে উপেক্ষা কোরো না”, তাহলে তারা হয়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু সহানুভূতিশীল মানুষ।

এই যুগে যেখানে পরিচিতি, আত্মপ্রকাশ ও ব্যক্তিত্বের প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত চলছে সেখানে নার্সিসিজমকে একপাক্ষিকভাবে খারাপ বললে চলবে না। বরং প্রয়োজন “সচেতন আত্মপ্রেম”—যেটা নিজেকে গড়তে এবং সমাজে অবদান রাখতে সাহায্য করে।