Home Blog Page 69

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশে বাংলাদেশ

0

আয়তনে বিশ্বে ৯৪তম, জনসংখ্যায় ৮ম বাংলাদেশ। সবচেয়ে কম জমি আর বেশি মানুষের এই দেশ তবুও বিশ্বের শীর্ষ ১০ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম।

গত দুই দশক ধরেই ফল উৎপাদনে টেকসই ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। একসময় মানুষ বাড়ির আশপাশের ছোট বাগানে সীমিত পরিমাণ ফল উৎপাদন করত। এখন দেশের প্রায় সব অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ফলের চাষ ছড়িয়ে পড়ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত ১৮ বছরে ফল উৎপাদন গড়ে ১১.৫% করে বাড়ছে। দেশের মানুষের ফল খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) খানা জরিপে দেখা গেছে, ২০২২ সালে দেশের একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯৫.৪ গ্রাম ফল খেয়েছেন। ২০১০ সালে এই গড় ছিল ৪৪.৭ গ্রাম।

একসময় দেশে কাঁঠাল ও আম ছিল প্রধান ফল। এখন অন্তত ২২ প্রজাতির ফল বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিত খাচ্ছে। বার্ষিক কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। আম উৎপাদনে সপ্তম। পেয়ারা উৎপাদনেও সপ্তম। এখন জাম, বরই, কামরাঙা, কতবেল, লেবু, আনারস, লটকন, আতা, সফেদার মতো স্থানীয় ফলের পাশাপাশি স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, মাল্টা, রামবুটান ইত্যাদি বিদেশি ফলের চাষ ব্যাপক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী – গত ১০ বছরে আমের উৎপাদন দ্বিগুণ, পেয়ারা দ্বিগুণের বেশি, পেঁপে আড়াই গুণ এবং লিচু উৎপাদন ৫০ শতাংশ বেড়েছে। চার-পাঁচ বছর ধরে নতুন ফল ড্রাগন ও অ্যাভোকাডো এবং দেশি ফল বাতাবিলেবু, তরমুজ, খরমুজ, লটকন, আমড়া ও আমলকীর উৎপাদনও বেড়েছে।

তবে এখনও ফল সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা আধুনিক হয়নি। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ সমকালকে বলেন — আম, কলা, পেঁপে, পেয়ারাসহ অনেক ফলের নতুন জাত এসেছে। কিছু জাত আগাম এবং দেরিতে ফলন দেয়। ফলে সারা বছর ফলের সরবরাহ থাকে।

ফল উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ একটি বড় সমস্যা। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, সরকারের পার্টনার প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের কাজ চলছে।দীর্ঘমেয়াদি ফল সংরক্ষণের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণায় সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। কাঁঠাল,আম ও আনারস শুকিয়ে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে সারা বছর ফল পাওয়া যায় এবং খাদ্যের পুষ্টিমান বজায় থাকে।

“আমি আমার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে চাই” : চৈতন্য তামহানে, ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক

প্রশ্ন: একজন পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে আপনার কাছে সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক কী?

চৈতন্য: আমার কাছে সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো মানুষের অনুভবকে পর্দায় তুলে ধরা। এমন মানুষদের জন্য সহানুভূতি সৃষ্টি করা যারা সমাজের চোখে ভুল বা অযোগ্য। সিনেমা এক ধরনের ক্যাথারসিস বা আত্মশুদ্ধি একটা নিরাপদ জায়গায় বসে নিজের ভেতরের জটিলতাগুলো অনুভব করা, যেন চোখ খোলা রেখে স্বপ্ন দেখা। এটা সিনেমার একদম নিজস্ব গুণ, বিভিন্ন শিল্প একত্র হয়ে এমন কিছু সৃষ্টি করে যা আমাদের ভেতরের মানুষটাকে স্পর্শ করে। এই জিনিসটাই এখন আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে।

প্রশ্ন: আর সিনেমা বানানোর সবচেয়ে সুন্দর দিকটা কী?

চৈতন্য: সিনেমা বানানোতে কষ্ট বেশি, ঝামেলা বেশি। তবুও যদি বলতে হয় সবচেয়ে সুন্দর দিক কী, তাহলে বলব অনেক মানুষ একসাথে একটাই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, সেটা! এক ধরণের অনিশ্চয়তা, জীবন্ত অনুভব, নিজেকে হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা, সময় বা অহং কিছুই মাথায় থাকে না। কিছুই নেই, শুধু একটা কিছু সৃষ্টি করার জন্য সবাই মিলে পরিশ্রম করছে। সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটা হলো যখন কোনো দৃশ্য এমনভাবে হয়ে যায় যা প্ল্যানে ছিল না, বা যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো হয়। এই ক্ষণিক বিস্ময় আর ছোট ছোট মিরাকল-এর মুহূর্তগুলোই ফিল্মমেকিং এর সবচেয়ে সুন্দর দিক আমার কাছে।

প্রশ্ন: ভারতে তো সবাই যেন সিনেমার ভেতরেই জন্মায়। আপনার গল্প কেমন ছিল?

চৈতন্য: হ্যাঁ, ভারতে সিনেমা আর ক্রিকেট হলো ধর্মের মতো। তাই আমিও কখনও সিনেমা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না।
ছোটবেলায় আমার মা ক্যাসেটে গল্প শোনাতেন, আমি বই পড়তাম, পত্রিকা পড়তাম। তবে বলতে হবে আমি কোনো ‘সংস্কৃতিমনস্ক’ পরিবারে বড় হইনি। আমরা খুব সাধারণ পরিবার ছিলাম। আমাদের জন্য সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা ছিল বিলাসিতা।
আমার বাবা স্থানীয় থিয়েটারের এক বন্ধুর মাধ্যমে বিনামূল্যে নাটক দেখতে নিয়ে যেতেন। তাইআমি থিয়েটারের কাছেই বড় হয়েছি। তখন আমি অভিনেতা হতে চাইতাম!

প্রশ্ন: সিনেমার প্রতি ভালোবাসা কীভাবে জন্মাল?

চৈতন্য: আমি বরাবরই সিনেমার ভক্ত ছিলাম, কিন্তু বলিউডের বাইরের সিনেমা আমাকে বেশি টানত। অনেক কিছু বুঝতাম না, তবু এক ধরণের মুগ্ধতা কাজ করত। একজন থিয়েটার ডিরেক্টর আমাকে City of God নামে একটা সিনেমা দেখতে বলেছিলেন। আমি তখন ভিডিও লাইব্রেরি থেকে ভাড়া নিয়ে সেটা দেখি, আর সেটা আমার জীবনে বড় একটা মোড় এনে দেয়। তখনই আমি বুঝতে পারি, শুধু বলিউড-হলিউড নয়, পৃথিবীর অনেক জায়গায় দারুণ সিনেমা তৈরি হচ্ছে। এরপর আমি শুধু সিনেমা দেখতাম, যেন আমার আর কোনো পরিচয়ই ছিল না!

প্রশ্ন: মাত্র ১৭ বছর বয়সেই আপনি টেলিভিশনের জন্য লেখালেখি শুরু করেন?

চৈতন্য: হ্যাঁ, আমি এক থিয়েটার ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করছিলাম, যিনি তখন টিভির জন্যও লিখতেন। উনি একদিন বললেন, “তুমি খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে কথা বলো, তোমার আইডিয়াও আছে, এসো আমার সঙ্গে লেখো।” টাকা খুব বেশি ছিল না, মাসে তিনশো ডলার মতো।কিন্তু আমার জন্য সেটা অনেক কিছু ছিল। পরে কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা হয়, টেলিভিশন ছেড়ে দিই। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমি ভারতীয় সিনেমায় চুরি বা প্ল্যাজারিজম নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাই। এটা আমার বলিউড থেকে বিদায়পত্র ছিল। সৌভাগ্যবশত কয়েকজন মেন্টরের সঙ্গে দেখা হয়, যারা ভিন্নধর্মী সিনেমা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন।

প্রশ্ন: এরপর তো আপনি ‘Court’ বানান, সেটা ভেনিস ফেস্টিভালে নির্বাচিত হয় এবং ভারত থেকে অস্কারের জন্যও পাঠানো হয়।

চৈতন্য: হ্যাঁ, আমার সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল যখন ভেনিস ফেস্টিভালে ‘Court’ নির্বাচিত হয়। এর আগে পৃথিবীর সব বড় বড় ফেস্টিভাল এই সিনেমা ফিরিয়ে দিয়েছিল। একমাত্র একটা সেলস এজেন্ট এবং ভেনিস ছিল আমাদের আশার আলো। আমি কোনো পুরস্কার বা রিভিউ চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম ছবিটা যেন কোথাও জায়গা পায়। ‘Court’ আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য বানানো হয়নি। এতে কাস্ট, শ্রেণী, স্থানীয় রাজনীতি কিংবা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কোনো সহজীকরণ ছিল না। কোনো আপস করিনি।

প্রশ্ন: আপনি যেই পথে হেঁটেছেন, সেটা বলিউডের বিপরীতধর্মী।

চৈতন্য: (হাসি) হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা অস্থিরতা ছিল। আমার আশেপাশে যেসব সিনেমা দেখতাম, সেসবে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। ভারতে সবাইকে শ্রদ্ধা করতে শেখানো হয়, প্রশ্ন তুলতে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমি এই অতিরিক্ত শ্রদ্ধার ধারণাটাতেও বিরক্ত ছিলাম। আমি চাইনি শতবর্ষের ঐতিহ্যের ভারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। আমি চেয়েছিলাম আমার নিজের ভাষা, আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পেতে।

প্রশ্ন: এমন কারা ছিলেন যাঁদের সাহায্যে আপনি এ যাত্রা সম্ভব করতে পেরেছেন?

চৈতন্য: দুজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন। একজন হচ্ছেন আমার প্রযোজক বিবেক গোম্বার। আমি থিয়েটারে ওকে পরিচালনা করেছিলাম, তখন থেকেই বন্ধুত্ব। একসময় আমি একদম ভেঙে পড়ি, ফিল্ম মেকিং তো দূরের কথা, জীবনই ছেড়ে দিতে চাচ্ছিলাম।
বিবেক আমাকে শর্তহীনভাবে টাকাটা দিলেন “এই নাও এক বছরের সময়, বসে লেখো।” তারপর থেকে সে আমার প্রায় দ্বিতীয় পিতার মতোই জীবনের একটা অংশ। আরেকজন হচ্ছেন আলফনসো কুয়ারোন।

প্রশ্ন: তিনি তো ‘The Disciple’-এর এক্সিকিউটিভ প্রযোজকও ছিলেন।

চৈতন্য: ‘Court’-এর পর আমাকে Rolex Mentor and Protégé Arts Initiative-এর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, আর মেন্টর ছিলেন Alfonso Cuarón! আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা লন্ডনে দেখা করি, আর দারুণভাবে মিলে যাই। উনি ‘Court’ দেখেছিলেন, সম্ভবত সেটাই তাকে প্রভাবিত করে। এরপর আমি নির্বাচিত হই! আমাকে ‘Roma’-র সেটে উনি তাঁর বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি ছিলাম একমাত্র ব্যক্তি যিনি পুরো স্ক্রিপ্ট পড়েছিলেন এবং মনিটরে কাজ করতে পারতেন। এটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান। আমি ভাবতাম আমি খুবই ডিটেইলে যাই। কিন্তু Alfonso-কে দেখে বুঝলাম, ও একজন যাদুকর! ওর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আবেগ ও সাবকনশাসকে স্পর্শ করার জন্য। ‘The Disciple’-এর প্রতিটি শটে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট আছে, কিন্তু কেউ বুঝতেই পারবে না, এটাই Alfonso’র প্রভাব। তিনি আমার ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফিও ঠিক করে দেন। আমি নিজে দ্বিধায় ছিলাম, কিন্তু উনি বললেন বিশ্বাস রাখো। আমি রাখলাম। আজ বুঝি, তিনি ঠিকই ছিলেন।

ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, হতে পারে দু-এক দিনের মধ্যে

যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র কর্মকর্তারা ইরানের ওপর হামলার সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র।বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে পরিকাঠামো গড়ে তুলছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে (পশ্চিমা বিশ্বে শনিবার সপ্তাহ শেষ হয়) হামলার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।

গত কয়েক দিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে ভাবনার কথা জানিয়ে আসছেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধরত ইরানকে লক্ষ্য করেই এই ভাবনা।

গতকাল বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কী করব, সে বিষয়ে কিছু ধারণা আছে।’ তবে তিনি জানান, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ মুহূর্তে সেটা জানাতেই’ বেশি পছন্দ করেন তিনি, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অস্থির।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি হামলা করতেও পারি, না-ও করতে পারি।’ তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখনো সব ধরনের বিকল্প টেবিলে রয়েছে।

যুদ্ধের ব্যাপারে ট্রাম্পের এই মনোভাব এক সপ্তাহ আগের অবস্থান থেকে একেবারেই বিপরীত। তখন তিনি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হামলা কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প ইরানকে সময় দিচ্ছেন, যাতে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কিছু কার্যক্রম বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এড়ানোর ইঙ্গিত দিতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও বুধবার সে ধরনের ইঙ্গিতই দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক পোস্টে বলেন, তাঁর দেশ এখনো ‘কূটনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ এবং কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র চায়নি, ভবিষ্যতেও চাইবে না।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শুক্রবার জেনেভায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরমাণু আলোচনা করতে যাচ্ছেন।

ট্রাম্প বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারে তিনি আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে ‘অভিযান চালিয়ে যেতে’ উৎসাহিত করেছেন। তবে এই সময় তিনি বোঝাননি যে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় অংশ নেবে।

বিজ্ঞানের যাত্রায় যাদুবিদ্যার অবদান

আইজ্যাক নিউটন, কার্ল লিনিয়াস, রবার্ট বয়েল প্রমূখদের আজ আমরা বিজ্ঞানের পিতা হিসেবে জানি তাঁরা এক সময় ছিলেন জাদুবিদ্যা ও অলৌকিকতার অন্ধ অনুসারী। এমনকি আমাদের যুক্তিবাদী চোখে আজ যেসব বিশ্বাস হাস্যকর ঠেকে, মারমেইড খোঁজা, অস্ত্রের ক্ষত নিরাময়ে “weapon salve” ব্যবহার কিংবা মৃতদেহের রক্তপাত দিয়ে খুনির শনাক্তকরণ সেসব ছিল এক সময় প্রকৃত অনুসন্ধিৎসুর কাজ। এইসব অদ্ভুত বিশ্বাসের ভিতর দিয়েই গড়ে উঠেছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি।

১৯৩৬ সালে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস নিউটনের কিছু অপ্রকাশিত নোট কেনেন। তাতে ছিলো ১ লাখেরও বেশি শব্দে লেখা নিউটনের গোপন এলকেমিক গবেষণা। কেইনস হতবাক হয়ে বলেছিলেন, “এগুলো পুরোপুরি যাদুবিদ্যাচর্চা বিজ্ঞানের কোনো মানদণ্ডে পড়ে না।” আর এই অভিজ্ঞতার পরেই কেইনস মন্তব্য করেন, “নিউটন কেবল যুগান্তরের বিজ্ঞানী ছিলো না সে ছিলো শেষ যাদুকর।” কিন্তু শুধু নিউটনই নন, বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল, কার্ল লিনিয়াস, এমনকি জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহেও ছিলেন অদ্ভুত বিশ্বাসের অনুসারী। এক সময়ের ইউরোপ ছিলো এক অভূতপূর্ব জগত, যেখানে বিজ্ঞান ও যাদুবিদ্যা হাত ধরাধরি করে চলত।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো পুরাতন গ্রিক ও আরব লেখকদের অনুবাদনির্ভর। জ্ঞান মানে ছিলো শুধু তাদের মতানুযায়ী চলা। ১৪শ শতকের অক্সফোর্ডে কেউ যদি অ্যারিস্টটলের বিরুদ্ধে কিছু বলতো, তাকে ৫ শিলিং জরিমানা গুনতে হতো। কৌতূহলকে মনে করা হতো পাপ। এই বন্ধ গণ্ডি থেকে মুক্তি এনে দিয়েছিলো যাদুবিদ্যা, অন্তত সেটাই ছিলো তখনকার অনেক বিজ্ঞানীর কাছে বাস্তবতর ও অধিক সম্ভাবনাময়।

১৬শ শতাব্দীর সুইস-জার্মান চিকিৎসক প্যারাসেলসাস ছিলেন প্রথমদের মধ্যে যিনি পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি পুরাতন গ্রন্থ পুড়িয়ে জনসমক্ষে ঘোষণা করেন প্রকৃত জ্ঞান বইয়ে নয়, প্রকৃতিতে। প্যারাসেলসাস মনে করতেন, চিকিৎসা, রসায়ন ও জ্যোতিষ বিদ্যা সবই ঈশ্বরীয় রহস্য উন্মোচনের পথ। তাঁর এই যাদু-প্রেমভরা বৈজ্ঞানিক মনোভাব পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করে।

ডেনিশ জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে একটি দ্বন্দ্বে নাক হারানোর পর প্যারাসেলসাসের চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতিষের প্রতি আকৃষ্ট হন। তখনকার দিনে তারা তারার অবস্থান দেখতো বই দেখে, কিন্তু ব্রাহে আকাশের দিকে সরাসরি তাকিয়েই এক বিশাল তারকাতালিকা তৈরি করেন। তিনি আবিষ্কার করেন সুপারনোভা ও ধূমকেতু এবং বিশ্বাস করতেন এসব মহাজাগতিক ঘটনা দুর্ভাগ্য ও রাজ্যপতনের পূর্বাভাস। তিনি ১৫৭২ সালে একটি নতুন তারা দেখে ডেনমার্কের রাজাকে গোপনে সতর্ক করে বলেন, “সব সৃষ্টির চিরন্তন বিশ্রামের সময় ঘনিয়ে এসেছে।”

কার্ল লিনিয়াস, যিনি আজ ‘জীববিজ্ঞানের জনক’ হিসেবে পরিচিত তিনিও মারমেইড খুঁজতে রাজপর্ষদকে অনুরোধ করেছিলেন। বিজ্ঞান ও অলৌকিকতাকে আলাদা করার চিন্তা তখনও স্পষ্ট ছিল না। তার জন্যই হয়তো আজ আমাদের কাছে হাস্যকর মনে হলেও, তাঁদের জন্য তা ছিলো এক ধরণের অনুসন্ধানী বোধ।

বিজ্ঞানীরা তখন গবেষণার তহবিল পেতেন রাজা, সম্রাট কিংবা অভিজাতদের কাছ থেকে আর তারাও চাইতেন দৃষ্টিনন্দন ‘ফলাফল’: স্বর্ণ বানানো, অমরত্বের ওষুধ, কিংবা আগামীকাল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। রোমান সম্রাট রুডলফ দ্বিতীয় ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। তাঁর প্রাগ প্রাসাদ ছিলো বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান-যাদুবিদ্যা কেন্দ্র। তিনি নিজের হাতে এলকেমির কাজ করতেন, সঙ্গে থাকতেন ব্রাহে ও কেপলারের মতো জ্যোতির্বিদ।

তখনকার এলকেমি থেকে উন্নত হয় খনিজবিদ্যা, গ্লাস ও সিরামিক প্রযুক্তি, ফার্নেস ডিজাইন। জ্যোতিষচর্চা থেকে তৈরি হয় ঘড়ি, লেন্স, টেলিস্কোপ, সেকস্ট্যান্ট। এমনকি ১৭৪৯ সালেও কার্ল লিনিয়াস মারমেইড খুঁজতে সুইডিশ বিজ্ঞান একাডেমিকে চাপ দেন। নিউটন নিজেই বাকি জীবন কাটান বাইবেলের গোপন সংকেত খুঁজে, এলকেমির পরীক্ষা করে। স্যার কেনেল্ম ডিগবি ‘weapon salve’ নিয়ে চিকিৎসা করেন, রবার্ট বয়েল “দ্বিতীয় দৃষ্টিশক্তি” গবেষণা করেন, রেনে ডেকার্তেস মৃতদেহের রক্তপাত নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে ফিরেন।

আজ আমরা জানি মারমেইড, জ্যোতিষ, এলকেমি এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু একে অস্বীকার করলেই ইতিহাস ভুলবো। কারণ এইসব বিশ্বাস যতই ‘অদ্ভুত’ হোক একসময় ছিলো সাহসিকতা ও কৌতূহলের জন্মদাত্রী।

ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধষ স্নাইপার

ইতিহাসের দুর্ধর্ষ এক স্নাইপার সোভিয়েত ইউনিয়ন রেড আর্মির লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি ‘লেডি ডেথ’ নামেও পরিচিত।

১৯১৬ সালে ইউক্রেনে জন্ম নেয়া লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো ১৪ বছর বয়সে সপরিবার কিয়েভে বসবাস শুরু করেন। সে সময়ই শুটিংয়ের হাতেখড়ি। শুটিংয়ে দক্ষতার জন্য ভেরোশিলভ শার্পশুটার ব্যাজ এবং মার্কসম্যান সনদ পেয়েছিলেন। পরে স্থানীয় অস্ত্র কারখানায় কাজ শুরু করেন। ১৯৩৭ সালে কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলারের নাৎসি জার্মানির সশস্ত্র বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ শুরু করে। লুডমিলা পাভলিচেঙ্কোর কানে আসে এ খবর।দ্রুত রেড আর্মির রিক্রুটমেন্ট অফিসে গিয়ে উপস্থিত হন। রিক্রুটমেন্ট অফিসাররা প্রথমে তাঁকে নার্স হিসেবে নিয়োগ দেন।

একজন স্নাইপার হওয়ার জন্য তিনি দৃঢ়চিত্ত ছিলেন। সোভিয়েত বাহিনীর হাতে রক্ষার দায়িত্ব থাকা পাহাড়ে রোমানিয়ার সৈনিকদের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করলে রেড আর্মির ২৫তম রাইফেল ডিভিশনে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি রেড আর্মির ২০০০ মহিলা স্নাইপারদের একজন হয়ে ওঠেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন যুদ্ধে বেঁচে যান।

লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো প্রথমে ওদেসা পোর্ট অবরোধে সামনের সারিতে লড়াই করেন। সেখানেই দক্ষতা দেখান। ১৮৭ জন শত্রু ওদেসায় তাঁর হাতে বধ হন। সিনিয়র সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি পান তিনি।

১৯৪১ সালের অক্টোবরে নাৎসি বাহিনী ও রোমানীয় সেনাবাহিনী ওদেসার নিয়ন্ত্রণ নিলে পাভলিচেঙ্কো ও তাঁর ইউনিট সমুদ্রপথে সেভাস্তোপোলের দিকে অগ্রসর হয়।

এরপর শুরু হয় ঐতিহাসিক সেভাস্তোপোলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাভলিচেঙ্কো বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। তাঁর বীরত্বের কথা নাৎসিরাও জানত, পাভলিচেঙ্কোর নাম শুনলে ভয় পেত তারা।

১৯৪২ সালের মে মাস পর্যন্ত তাঁর হাতে বধ হওয়া সৈনিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫৭। তিনি লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পান। এভাবেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পাভলিচেঙ্কো গুরুতর আহত হলে তাঁকে রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে এর মাঝেই তাঁর বধ করা শত্রুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯-এ। যাঁদের ভেতর শত্রুপক্ষের ৩৬ জন দক্ষ স্নাইপারও ছিলেন।

রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহারের পর পাভলিচেঙ্কোকে রেড আর্মির মেজর পদে উন্নীত করা হয়। এরপর তিনি স্নাইপিং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।যুদ্ধ চলাকালে তার এই অসাধারণ বীরত্বগাথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে হোয়াইট হাউজে যান লুডমিলা।

তৎকালীন মার্কিন ফার্স্ট লেডি ইলিনর রুজভেল্টের উদ্যোগে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে ঘুরে সাধারণ আমেরিকান নারীদের মাঝে তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেন পাভলিচেঙ্কো। তবে নারীদের পোশাকের প্রতি আমেরিকানদের ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে খানিকটা ক্ষুব্ধ হন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে পুনরায় কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ইতিহাসবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। পাভলিচেঙ্কো একবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘হিরো অব সোভিয়েত ইউনিয়ন’ এবং দুবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অর্ডার অব লেনিন’ লাভ করেন।

লুডমিলা পাভলিচেঙ্কোর আত্মজীবনী ‘লেডি ডেথ : দ্য মেমোরিজ অব স্তালিন’জ স্নাইপার’ প্রকাশিত হলে বেশ সাড়া ফেলে। তাঁর বীরত্বের গল্প শুনে ফ্যাসিবিরোধী সংগীতশিল্পী উডি গুথরি ‘মিস পাভলিচেঙ্কো’ শিরোনামে একটি গান উৎসর্গ করেন।

১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর পাভলিচেঙ্কো স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ বিশেষ স্ট্যাম্প ইস্যু করে। ২০১৫ সালে রুশ-ইউক্রেনীয় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয় তাঁর কাহিনী অবলম্বনে বায়োপিক ‘ব্যাটল ফর সেভাস্তোপোল’, যা ব্যাপক ব্যবসাসফল হয়।

কেন বন্দুকের পর আসে শব্দের দখল? ভাষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি

মানুষ যখন যুদ্ধের শিকার হয় তখন শুধু শরীর রক্তাক্ত হয় না ভাষাও আক্রান্ত হয়। উপনিবেশিক ইতিহাসে যুদ্ধ কেবল ভূমি দখলের লড়াই ছিল না, চিন্তা, সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠারও লড়াই ছিল। বিজিত জাতিকে যেভাবে দমন করা হয়, তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘমেয়াদী অস্ত্র হলো ভাষা। ব্রিটিশরা ভারতে এবং ফরাসিরা আলজেরিয়ায় কেবল রাজনীতির মঞ্চে নয়, ভাষার মঞ্চেও যুদ্ধ চালিয়েছে।

১৮৩৫ সালের লর্ড ম্যাকলের “Minute on Indian Education” ভারতীয় ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো দলিল। ম্যাকলে লিখেছিলেন—
“We must do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern—a class of persons, Indian in blood and colour, but English in tastes, in opinions, in morals and in intellect.”

এই বক্তব্যের মধ্যে শুধুই শিক্ষানীতি নয়, উপনিবেশিক আধিপত্যের কৌশল লুকিয়ে ছিল। ইংরেজরা চায়নি পুরো ভারতবাসী ইংরেজি শিখুক। তারা চেয়েছিল এক শ্রেণির ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ তৈরি করতে যারা শাসকের ভাষা জানবে, তাদের মূল্যবোধ ধারণ করবে, কিন্তু শাসিতদের দলে থাকবে।

এই নীতির ফলাফল দেখা যায় শিক্ষাব্যবস্থায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি হয়ে ওঠে উন্নত শিক্ষা ও সরকারি চাকরির প্রধান মাধ্যম। বাংলাভাষা, সংস্কৃত, উর্দু বা ফার্সি যেগুলো উপমহাদেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর অংশ ছিল সেগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক করে তোলা হয়।

এভাবেই ভাষা হয়ে উঠল শ্রেণিচ্যুতির হাতিয়ার। গ্রামীণ জনগণ, যারা আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলত, তারা শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ল। একইসাথে জাতিগত দাঙ্গা, ভাষাগত বিভাজন বাংলা ও উর্দুর বিরোধ প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক ভাষানীতিরই অনিবার্য ফল।

১৮৩০ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধক্ষেত্র।আলজেরিয়া ছিল একটি আরব-ইসলামিক সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষা। ফরাসিরা খুব দ্রুত বুঝে ফেলে, যদি তারা এই ভাষার কাঠামো ভেঙে ফেলতে পারে, তাহলে আলজেরীয় জাতির আত্মপরিচয়ই নষ্ট হয়ে যাবে।

১৯৩৮ সালে ফরাসি সরকার আলজেরিয়ায় আরবি ভাষাকে একটি বিদেশি ভাষা বলে ঘোষণা দেয়। এমনকি ১৯৪৯ সালের এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আরবি কেবল একটি ধর্মীয় ভাষা, তার কোনও আধুনিক সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা নেই।” এই নির্দেশনা স্কুল, আদালত, সংবাদপত্র সবখানে আরবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে।

শুধু তাই নয়, ফরাসি প্রশাসন চেয়েছিল একটি নতুন ‘আধুনিক আলজেরীয়’ তৈরি করতে, যারা আরবি বা ইসলামিক চেতনার সঙ্গে নয়, বরং ফরাসি জাতিসত্তার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করবে। এখানেই ভাষা হয়ে উঠল সংস্কৃতিগত রূপান্তরের প্রধান অস্ত্র।

ব্রিটিশ ভারত বা ফরাসি আলজেরিয়া উভয় ক্ষেত্রেই ভাষানীতির লক্ষ্য ছিল মানসিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। শাসকের ভাষা যদি কারও চিন্তার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে শাসকের জগতে চিন্তা করতে শেখে। এমনকি নিজ জাতিকে পিছিয়ে থাক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বা অশিক্ষিত ভাবতে থাকে। এ একধরনের ‘self-colonization’ বা আত্ম-উপনিবেশ।

এ কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘ইংরেজি জানা’ মানেই হয়ে দাঁড়ায় ‘সভ্য’, ‘শিক্ষিত’ এবং ‘যোগ্য’। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করে, যেটি তাকে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে ঠেলে দেয়। ফলত বাংলা, তামিল, উর্দু, পাঞ্জাবি সব ভাষায় সাহিত্যচর্চা কমতে থাকে এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি গড়ে ওঠে।

তবে এই ভাষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও ছিল। ভারতবর্ষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে নানা চিন্তাবিদ বাংলা ভাষায় চিন্তা ও লেখালেখি চালিয়ে যান। আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ফ্রান্তজ ফ্যানন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যার বই “The Wretched of the Earth” ভাষা ও উপনিবেশের সম্পর্ক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করে। ফ্যানন দেখান, উপনিবেশিকরা কেবল শারীরিক নয়, ভাষার মাধ্যমে ‘মৌনতা’ চাপিয়ে দেয়। স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়, ভাষার অধিকার পুনরুদ্ধারও।

ব্রিটিশ ভারত ও ফরাসি আলজেরিয়া এই দুই উদাহরণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যুদ্ধ কেবল বন্দুক ও কামানের নয়; ভাষার, চিন্তার ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরও। আজকের বিশ্বে যখন আমরা গ্লোবালাইজেশনের নামে আবারও এক ধরণের ভাষা আধিপত্য দেখি (ইংরেজি ভাষার প্রায় একাধিপত্য), তখন এই ইতিহাসকে মনে রাখা জরুরি। ভাষার স্বাধীনতাই আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। আর তাই আমাদের প্রতিটি শব্দচয়নেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর সিদ্ধান্ত—আমরা কার ভাষায় ভাবছি, কার ভাষায় বাঁচছি?

বাড়ির স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে কেন? মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের ‘হোম’ বাস্তবতা

একটা সময় ছিল, নিজের একটা বাড়ি হবে—এটা শুধু একটি আবেগ নয়, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা ও সাফল্যের প্রতীক ছিল। এটি বাবা-মায়ের প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের তরুণ সমাজ বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্ম এই স্বপ্নকে অতীতের একটি অবাস্তব ধ্যান হিসেবেই দেখতে শুরু করেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে শহরের বাস্তবতা, জমির দাম, বাড়িভাড়ার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আয়-ব্যয়ের অসমতা এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ‘নিজের বাড়ি’ একটি অলীক জগতে আটকে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের তথ্যে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৭৪% পরিবারের কোনো নিজস্ব বাসস্থান নেই; তারা ভাড়ায় থাকে। এর মধ্যে ২৫–৩৫ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তারা অধিকাংশই চাকরিজীবী বা নতুন উদ্যোক্তা, যাদের আয় বাসা কেনার বাজারমূল্যের তুলনায় অপ্রতুল।

আর একটি গবেষণা “Buyer’s Sentiment Report 2022” বলছে, ঢাকায় একটি ১২০০ স্কয়ার ফিট ফ্ল্যাট কিনতে গড় খরচ প্রায় ৯০ লাখ টাকা, যেখানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় হয়ত ৩০–৪০ হাজার টাকা। এই হিসেবে কোনো সঞ্চয় ছাড়াই টানা ২০–২৫ বছর মাসিক আয়ের পুরোটাই জমিয়ে রাখলে একটি ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব—এটি প্রায় অসম্ভব কল্পনা।

শুধু বাংলাদেশ নয় এ প্রবণতা বিশ্বব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্রের “Federal Reserve”-এর ২০২০ সালের এক জরিপ বলছে, বেবি বুমাররা যখন ৩৫ বছর বয়সে পৌঁছেছিল, তখন তারা জাতীয় সম্পদের ২১% নিয়ন্ত্রণ করত; সেখানে আজকের মিলেনিয়ালরা একই বয়সে কেবল ২-৫% সম্পদের মালিক।
বাংলাদেশে BIDS (২০২৩) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৮% তরুণ মনে করেন তারা জীবনে কোনোদিন নিজস্ব বাড়ির মালিক হতে পারবেন না। এদের অনেকে মনে করেন, ‘ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখা মানেই নিজেকে হঠাৎ ধনী ভাবার মতো নির্বোধ কল্পনা’।

বাড়িভাড়া শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, এটি এক ধরনের মানসিক অনিরাপত্তাও তৈরি করে। ঢাকায় ভাড়ার গড় বৃদ্ধি প্রতি বছরে ৮–১২%, যা অনেকের আয়ে সামঞ্জস্যহীন। ফলে শহরের একজন সাধারণ তরুণ জীবনের অন্তত ৫–৭ বার বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ ২০২৪ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩০–৩৫ বছর বয়সী শহুরে তরুণদের মধ্যে ৫৭% মনে করেন, “নিজস্ব বসতবাড়ির অভাবে তারা পরিবার গঠনে অনিচ্ছুক বা অনিরাপদ বোধ করেন।” এই গবেষণা আরও বলছে, ৪২% অংশগ্রহণকারী মনে করেন, “প্রতিনিয়ত বাসা বদলানোর অভিজ্ঞতা তাদের আত্মপরিচয় ও স্থায়িত্ববোধে প্রভাব ফেলেছে।”

যেহেতু নিজস্ব বাসা পাওয়া কঠিন, তাই তরুণ প্রজন্ম নতুন বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশে “co-living” বা শেয়ারড হাউজিং সংস্কৃতি সম্প্রতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এতে একাধিক তরুণ একই বাসায় বসবাস করে খরচ ভাগ করে নেয়, যার ফলে সাশ্রয় হয় এবং সামাজিক বন্ধনও গড়ে ওঠে।
২০২৩ সালে “BDProperty Insights” একটি সমীক্ষায় জানায়, ঢাকা শহরে ৭৫টির বেশি কমার্শিয়াল কো-লিভিং স্পেস গড়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও মিরপুর অঞ্চলে। এই নতুন বাসস্থান চিন্তা একদিকে যেমন সম্ভাবনা, তেমনই ‘নিজের ঘর’ ভাবনার অবসানের ইঙ্গিতও বটে।

পুরনো প্রজন্ম যেখানে ঘরকে দেখেছে মালিকানা ও জমির ভিত্তিতে, সেখানে নতুন প্রজন্ম ঘরকে দেখছে “স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা”-র জায়গা হিসেবে। অনেক তরুণ এখন বলেন, “আমার ঘর মানে এমন এক জায়গা, যেখানে আমি আমার মতো করে বাঁচতে পারি, মালিকানা থাক বা না থাক।”
বিশ্বজুড়ে এখন এক ধরণের “post-ownership” দর্শন গড়ে উঠছে—যেখানে ‘ব্যবহার’ই মুখ্য, মালিকানা নয়। AirBnB, co-living, rent-to-live—সবকিছু মিলে নতুন বাসস্থান দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বাসস্থান নীতির পুনর্বিবেচনা। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত, নতুন প্রজন্মের বাস্তবতা বুঝে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প, অল্প সুদে হাউজিং লোন এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেমন, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে “Young Housing Scheme” চালু হয়েছে বাংলাদেশেও তেমন করে “তরুণদের জন্য আবাসিক পরিকল্পনা” শুরু করা দরকার। না হলে শহরের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতেও ‘স্থায়ীভাবে অস্থায়ী’ থেকেই যাবে।

‘নিজের বাসা’ এই ভাবনাটি হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আর অর্থবহ থাকবে না। ভাড়া-কেন্দ্রিক সমাজ একদিকে জীবনের গতি বাড়াচ্ছে, কিন্তু অপরদিকে আত্মিক সংযোগ, পারিবারিক গঠন এবং স্থায়িত্ববোধকে দুর্বল করছে।

তবুও আশাবাদের জায়গা থেকে বলা যায় যদি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা যায়, আবাসন খাতে সমতা ও সহনশীলতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মের হোম নিশ্চিত হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন : কক্সবাজার ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা যুদ্ধে জড়াচ্ছে আরাকান আর্মির সাথে

0

রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির থেকে সদস্য সংগ্রহ করছে রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য। কিন্তু এই বিদ্রোহ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এতে মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক আরও খারাপ হবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। তাই বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও ত্রাণ সহায়তা বাড়ানো এবং রোহিঙ্গা শিবিরে এসব গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো।

এই পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ উঠে এসেছে ব্রাসেলসভিত্তিক বেসরকারি থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার : রোহিঙ্গা বিদ্রোহের ঝুঁকি’ শীর্ষক এশিয়া প্রতিবেদনে। এটি বুধবার (১৮ জুন) সকালে প্রকাশিত হওয়ার কথা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির অগ্রগতির পর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের শিবিরে বহু বছর ধরে নিজেদের মধ্যে সহিংস দ্বন্দ্বে জড়িত থাকা এসব গোষ্ঠী গত নভেম্বরে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে একযোগে লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর শিবিরে সহিংসতা কমে এলেও সদস্য সংগ্রহ বেড়েছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বৌদ্ধ জনগণের সমর্থন পায়, তাই রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় আহ্বানের মাধ্যমে সংঘাতে নামানো হচ্ছে। এই লড়াইকে তারা ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে ‘জিহাদ’ হিসেবে উপস্থাপন করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের পুরো সীমান্ত বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে পরীক্ষামূলক আলোচনা শুরু করেছে। তবে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর হামলা এই আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে তা রাখাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব উসকে দেবে এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে যখন আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইনে অগ্রসর হয়, তখন মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নিজেদের পক্ষে লড়াইয়ে নামাতে চায়। তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের জোর করে মিলিশিয়ায় নেয়, সম্প্রদায় নেতাদের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় যায়।

এই গোষ্ঠীগুলো আগে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করত। আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা রোধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার সাময়িক ফল দিলেও সেনাবাহিনী পুরোপুরি সফল হয়নি। অনেক রোহিঙ্গা সেনাবাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও আরাকান আর্মির প্ররোচনামূলক বক্তব্য ও উত্তর রাখাইনে তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের অভিযোগ এই গোষ্ঠীকে সামরিক বাহিনীর চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে দেখতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকে প্রভাবিত করেছে।

অতীতে সহিংস কৌশলের কারণে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা এই গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করত। কিন্তু আরাকান আর্মির বিরোধিতা এবং প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তায় এখন শিবিরগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য সংগ্রহের জন্য উর্বর মাটিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। তারা রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর ‘ঐক্য’ প্রচেষ্টায় সমর্থন দিলেও বলছে, তাদের উদ্দেশ্য শিবিরে সহিংসতা কমানো।

তবে মনে হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে প্রত্যাবাসনে চাপ দিতে চায়। এসব গোষ্ঠীকে তারা অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই সম্পৃক্ততা আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারের চলমান আলোচনায় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, বাংলাদেশের উচিত আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, রাখাইনে বাণিজ্য ও সহায়তা জোরদার করা এবং রোহিঙ্গা শিবিরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কমানো। এতে সীমান্তে স্থিতিশীলতা আসবে এবং রোহিঙ্গা নাগরিক সমাজ গড়ে উঠবে।

আরাকান আর্মির উচিত রোহিঙ্গাদের আস্থায় আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রমাণ করা যে তারা সবাইকে নিয়ে শাসন চালাতে সক্ষম। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৈদেশিক সহায়তা কমাচ্ছে, তাই আন্তর্জাতিক দাতাদের উচিত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে সহায়তা আরও বাড়ানো।

সংস্কৃতির যে ৭টি ধারা বদলে দেবে সমাজ

লেভেল বাই লেভেল সামনে এগোনো, নির্দিষ্ট গতি ও গাইডলাইন—জীবন একসময় এমনসব ধারণাতে বাঁধা ছিলো। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কীভাবে এগোতে হবে সবই যেন ছিল পূর্বনির্ধারিত।

কিন্তু ইদানীং জীবন যেন “Grand Theft Auto (GTA)” এক বিশাল খোলা দুনিয়া যেখানে কারও জন্য কোনো স্পষ্ট মানচিত্র নেই। হঠাৎ ঘটতে থাকা ঘটনা, দিকবিহীন মিশন, র‌্যান্ডম চ্যালেঞ্জ সবই একসাথে। জীবন এখন আর ভবিষ্যদ্বাণী নয়, প্রতিক্রিয়ার খেলা।

এই পটভূমিতে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি, সেখানে আগের পরিকল্পনা আর নিয়মে কাজ চলে না। ১০ বছরের কর্পোরেট প্ল্যান বা রাষ্ট্রীয় নীতিমালা মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হতে পারে একটি ভাইরাসে, একটি যুদ্ধের ঘোষণায় বা মাত্র একটি AI সফটওয়্যারের আবির্ভাবে।

এই অস্থির, অনিশ্চিত এবং গতানুগতিক ধারণার বাইরে থাকা বাস্তবতায় ৭টি সাংস্কৃতিক প্রবণতা আমাদের সামনে একটি পরিবর্তিত দুনিয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিশ্বব্যাংক, WTO, IMF, জাতিসংঘ ইত্যাদির গঠনের মাধ্যমে যে গ্লোবালাইজড অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ছে। ২০২৩ সাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে সহিংস বছরগুলোর একটি। জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশগত নয় এটি পুঁজিবাদকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। Allianz SE এর বোর্ড সদস্য গুনথার থালিঞ্জার স্পষ্ট করে বলেছেন, “এটি পৃথিবী রক্ষার নয়, এটি বাজার ও সভ্যতার চালনা-শর্ত রক্ষার লড়াই।”

আজকের বিশ্বে মানুষ দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্যবান ও সুরক্ষিত। কিন্তু জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি, শক্তি ও সম্পদের প্রবাহও ধীর হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০% জনগোষ্ঠী (বেবি বুমার) দেশের ৫২% সম্পদের মালিক। অথচ বিশ্বের ৫০% মানুষ ৩০ বছরের কম বয়সী। এই অসামঞ্জস্য তরুণদের ভবিষ্যৎ গঠনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

একই সময়ে ষাটোর্ধ্ব মানুষদের বিজ্ঞাপনে প্রায় অদৃশ্য করে রাখা হচ্ছে—যা এক বিশাল সমাজগোষ্ঠীকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। কর্পোরেট সংস্কৃতিতে প্রজন্মগত সংলাপ ও পারস্পরিক শেখার উদ্যোগ যেমন ‘রিভার্স মেন্টরশিপ’ এখন সময়ের দাবি।

Gen-Z মনে করে প্রাপ্তবয়স্কতা শুরু হয় ২৭ বছর বয়সে, ১৮ নয়। কেন? কারণ জীবনের লক্ষ্য ও দায়িত্ব এখন আর আগের মতো সুপরিকল্পিত নয়।বাড়ি কেনা, বিয়ে, সন্তান এসব কিছু এখন অনেকের জন্য বিলাসিতা। Millennials ও Gen-Z এর অনেকেই আগের প্রজন্মের তুলনায় গরিব, চাকরি অনিরাপদ, আয় অনিশ্চিত।

তরুণরা এখন চাকরি বদলায়, সাইড হাস্টলে সময় দেয়, কারণ তাদের সামনে ভবিষ্যৎ অনির্দিষ্ট। এই প্রজন্মের ভোক্তা অভ্যাসও তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, কিভাবে তারা তরুণদের পাশে দাঁড়াবে, শুধুমাত্র পণ্য নয়, সহযাত্রা হিসেবে?

নারীরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অগ্রসর হলেও তরুণ পুরুষদের একাংশ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনুভব করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে অনেক তরুণ পুরুষ ডানপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকছেন। ৩০ বছরের নিচে ৬৩% পুরুষ একা, যেখানে নারীদের মধ্যে এই হার ৩৪%। এই অবসাদ, সামাজিক বৈষম্য এবং রোমান্টিক ব্যর্থতা অনেককে ‘পুরনো সমাজের’ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আকৃষ্ট করছে। এমন এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে যেখানে বিষাক্ত পুরুষত্বের আইকনরাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই সমাজ ও বিপণন জগতকে বিকল্প ও সহানুভূতিশীল রোল মডেল তৈরি করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমাজ কাঠামো বদলে দিচ্ছে। খাবার, বাজার, সম্পর্ক সবই এখন স্ক্রিনের মাধ্যমে, একাকী ও নীরবভাবে। AI সঙ্গী এখন বাস্তব মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫% তরুণ বিশ্বাস করে AI রোমান্টিক সঙ্গী হতে পারে। এ একাকীত্ব Gen-Z কে সবচেয়ে একাকী প্রজন্মে পরিণত করেছে। অথচ বাস্তব সামাজিক সংযোগই মন ও শরীরের সুস্থতার অন্যতম শর্ত। তাই যেসব ব্র্যান্ড ‘In Real Life’ সংযোগ তৈরি করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের বিজয়ী হবে।

গ্লোবালাইজেশন এক সময় স্থানিক সংস্কৃতিকে সমতল করেছিল। কিন্তু আজকের তরুণরা স্থানীয় ও নিস গ্রুপগুলোর প্রতি আকৃষ্ট। K-ড্রামা, পুয়ের্তো রিকান সঙ্গীত, আইরিশ হিপহপ সবই গ্লোবাল ট্রেন্ড। ম্যাস মিডিয়া আর আগের মতো নেই। ব্যক্তিগত অ্যালগরিদম ভিত্তিক কনটেন্ট এখন নতুন বাস্তবতা। এখন ব্র্যান্ডের প্রয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতিকে বোঝা, শ্রবণ, সহ-নির্মাণ এবং সেই সংস্কৃতির ভেতর থেকে গল্প বলার সক্ষমতা অর্জন করা।

AI নতুন ধরনের পুঁজিবাদ তৈরি করছে যেখানে যাদের হাতে AI-এর নিয়ন্ত্রণ, তারাই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি সৃজনশীল ক্ষেত্রেও AI কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে । Shopify-এর CEO ঘোষণা দিয়েছেন AI না পারলে তবেই নতুন লোক নিয়োগ।

Meta-এর কর্মী সংখ্যা তুলনায় নগণ্য হলেও ব্যবহারকারী কোটি কোটি। ভবিষ্যতে একটি মাত্র ব্যক্তি হয়তো AI দিয়ে ১ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি চালাতে পারবে। এই ধাক্কা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গাঠনিক চিন্তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বিশেষত Universal Basic Income, কাজের ভূমিকা এবং মানুষের মূল্যকে ঘিরে।

এই সাতটি প্রবণতা কেবল চলতি সময়ের চিত্র নয়, এগুলো ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। প্রযুক্তি, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে নতুন বাস্তবতা নির্মিত হচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই পরিবর্তনকে অস্বীকার না করে বুঝে নেওয়া, অভিযোজিত হওয়া এবং একে মানবিক, ন্যায্য ও টেকসই করে গড়ে তোলা।

‘আমরা’ ইরানের আকাশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি : ট্রাম্প

ইসরাইল-ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি না জড়ানোর ঘোষণা দিলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, ‘আমরা এখন ইরানের আকাশ পুরোপুরি এবং সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যে ‘আমরা’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের কাছে আকাশ নজরদারির ভালো প্রযুক্তি ও প্রচুর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ছিল, কিন্তু সেগুলো আমেরিকান তৈরি “জিনিসপত্রের” সঙ্গে তুলনীয় নয়। ভালোভাবে কেউ কিছু করলে সেটা করে আমেরিকা—পুরোনো দিনের সেই আমেরিকা।’

মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে ঘিরে কয়েকটি পোস্ট করেছেন। এর একটিতে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছেন।

ট্রাম্প লিখেছেন,‘তিনি (খামেনি) সহজ লক্ষ্যবস্তু, তবে যে জায়গায় আছেন, নিরাপদ আছেন। আমরা তাঁকে ‘অপসারণ’ (হত্যা!) করব না। অন্তত এখনই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমরা চাই না বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হোক।’ এরপর হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প যোগ করেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।’

একটি অন্য পোস্টে ট্রাম্প ইংরেজ বড় অক্ষরে লেখেন, ‘UNCONDITIONAL SURRENDER!” (নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ!)। ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পিছু হটার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্পের করা আগের মন্তব্যের প্রতিধ্বনি এটা। এদিকে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অংশ নিতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিবিএস নিউজ জানিয়েছে — মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর কথা ভাবছেন।

সূত্রগুলো বলছে, এই বিষয় নিয়ে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা এ ব্যাপারে এখনো পূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।