লেভেল বাই লেভেল সামনে এগোনো, নির্দিষ্ট গতি ও গাইডলাইন—জীবন একসময় এমনসব ধারণাতে বাঁধা ছিলো। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কীভাবে এগোতে হবে সবই যেন ছিল পূর্বনির্ধারিত।
কিন্তু ইদানীং জীবন যেন “Grand Theft Auto (GTA)” এক বিশাল খোলা দুনিয়া যেখানে কারও জন্য কোনো স্পষ্ট মানচিত্র নেই। হঠাৎ ঘটতে থাকা ঘটনা, দিকবিহীন মিশন, র্যান্ডম চ্যালেঞ্জ সবই একসাথে। জীবন এখন আর ভবিষ্যদ্বাণী নয়, প্রতিক্রিয়ার খেলা।
এই পটভূমিতে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি, সেখানে আগের পরিকল্পনা আর নিয়মে কাজ চলে না। ১০ বছরের কর্পোরেট প্ল্যান বা রাষ্ট্রীয় নীতিমালা মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হতে পারে একটি ভাইরাসে, একটি যুদ্ধের ঘোষণায় বা মাত্র একটি AI সফটওয়্যারের আবির্ভাবে।
এই অস্থির, অনিশ্চিত এবং গতানুগতিক ধারণার বাইরে থাকা বাস্তবতায় ৭টি সাংস্কৃতিক প্রবণতা আমাদের সামনে একটি পরিবর্তিত দুনিয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিশ্বব্যাংক, WTO, IMF, জাতিসংঘ ইত্যাদির গঠনের মাধ্যমে যে গ্লোবালাইজড অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ছে। ২০২৩ সাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে সহিংস বছরগুলোর একটি। জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশগত নয় এটি পুঁজিবাদকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। Allianz SE এর বোর্ড সদস্য গুনথার থালিঞ্জার স্পষ্ট করে বলেছেন, “এটি পৃথিবী রক্ষার নয়, এটি বাজার ও সভ্যতার চালনা-শর্ত রক্ষার লড়াই।”
আজকের বিশ্বে মানুষ দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্যবান ও সুরক্ষিত। কিন্তু জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি, শক্তি ও সম্পদের প্রবাহও ধীর হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০% জনগোষ্ঠী (বেবি বুমার) দেশের ৫২% সম্পদের মালিক। অথচ বিশ্বের ৫০% মানুষ ৩০ বছরের কম বয়সী। এই অসামঞ্জস্য তরুণদের ভবিষ্যৎ গঠনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
একই সময়ে ষাটোর্ধ্ব মানুষদের বিজ্ঞাপনে প্রায় অদৃশ্য করে রাখা হচ্ছে—যা এক বিশাল সমাজগোষ্ঠীকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। কর্পোরেট সংস্কৃতিতে প্রজন্মগত সংলাপ ও পারস্পরিক শেখার উদ্যোগ যেমন ‘রিভার্স মেন্টরশিপ’ এখন সময়ের দাবি।
Gen-Z মনে করে প্রাপ্তবয়স্কতা শুরু হয় ২৭ বছর বয়সে, ১৮ নয়। কেন? কারণ জীবনের লক্ষ্য ও দায়িত্ব এখন আর আগের মতো সুপরিকল্পিত নয়।বাড়ি কেনা, বিয়ে, সন্তান এসব কিছু এখন অনেকের জন্য বিলাসিতা। Millennials ও Gen-Z এর অনেকেই আগের প্রজন্মের তুলনায় গরিব, চাকরি অনিরাপদ, আয় অনিশ্চিত।
তরুণরা এখন চাকরি বদলায়, সাইড হাস্টলে সময় দেয়, কারণ তাদের সামনে ভবিষ্যৎ অনির্দিষ্ট। এই প্রজন্মের ভোক্তা অভ্যাসও তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, কিভাবে তারা তরুণদের পাশে দাঁড়াবে, শুধুমাত্র পণ্য নয়, সহযাত্রা হিসেবে?
নারীরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অগ্রসর হলেও তরুণ পুরুষদের একাংশ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনুভব করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে অনেক তরুণ পুরুষ ডানপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকছেন। ৩০ বছরের নিচে ৬৩% পুরুষ একা, যেখানে নারীদের মধ্যে এই হার ৩৪%। এই অবসাদ, সামাজিক বৈষম্য এবং রোমান্টিক ব্যর্থতা অনেককে ‘পুরনো সমাজের’ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আকৃষ্ট করছে। এমন এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে যেখানে বিষাক্ত পুরুষত্বের আইকনরাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই সমাজ ও বিপণন জগতকে বিকল্প ও সহানুভূতিশীল রোল মডেল তৈরি করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমাজ কাঠামো বদলে দিচ্ছে। খাবার, বাজার, সম্পর্ক সবই এখন স্ক্রিনের মাধ্যমে, একাকী ও নীরবভাবে। AI সঙ্গী এখন বাস্তব মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫% তরুণ বিশ্বাস করে AI রোমান্টিক সঙ্গী হতে পারে। এ একাকীত্ব Gen-Z কে সবচেয়ে একাকী প্রজন্মে পরিণত করেছে। অথচ বাস্তব সামাজিক সংযোগই মন ও শরীরের সুস্থতার অন্যতম শর্ত। তাই যেসব ব্র্যান্ড ‘In Real Life’ সংযোগ তৈরি করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের বিজয়ী হবে।
গ্লোবালাইজেশন এক সময় স্থানিক সংস্কৃতিকে সমতল করেছিল। কিন্তু আজকের তরুণরা স্থানীয় ও নিস গ্রুপগুলোর প্রতি আকৃষ্ট। K-ড্রামা, পুয়ের্তো রিকান সঙ্গীত, আইরিশ হিপহপ সবই গ্লোবাল ট্রেন্ড। ম্যাস মিডিয়া আর আগের মতো নেই। ব্যক্তিগত অ্যালগরিদম ভিত্তিক কনটেন্ট এখন নতুন বাস্তবতা। এখন ব্র্যান্ডের প্রয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতিকে বোঝা, শ্রবণ, সহ-নির্মাণ এবং সেই সংস্কৃতির ভেতর থেকে গল্প বলার সক্ষমতা অর্জন করা।
AI নতুন ধরনের পুঁজিবাদ তৈরি করছে যেখানে যাদের হাতে AI-এর নিয়ন্ত্রণ, তারাই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি সৃজনশীল ক্ষেত্রেও AI কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে । Shopify-এর CEO ঘোষণা দিয়েছেন AI না পারলে তবেই নতুন লোক নিয়োগ।
Meta-এর কর্মী সংখ্যা তুলনায় নগণ্য হলেও ব্যবহারকারী কোটি কোটি। ভবিষ্যতে একটি মাত্র ব্যক্তি হয়তো AI দিয়ে ১ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি চালাতে পারবে। এই ধাক্কা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গাঠনিক চিন্তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বিশেষত Universal Basic Income, কাজের ভূমিকা এবং মানুষের মূল্যকে ঘিরে।
এই সাতটি প্রবণতা কেবল চলতি সময়ের চিত্র নয়, এগুলো ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। প্রযুক্তি, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে নতুন বাস্তবতা নির্মিত হচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই পরিবর্তনকে অস্বীকার না করে বুঝে নেওয়া, অভিযোজিত হওয়া এবং একে মানবিক, ন্যায্য ও টেকসই করে গড়ে তোলা।


