Home Blog Page 70

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন : বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন, কেমন হবে ভবিষ্যতের চাকরি?

মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে এক ধরনের নস্টালজিয়া দেখা যায়—পুরোনো দিনের মতো তাদের কারখানাগুলো আবার কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে, সাধারণ মানুষ সেখানে আগের মতো ভালো বেতনের চাকরি পাবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত অনেকেই এমন স্বপ্ন দেখান। কিন্তু বাস্তবতা বলছে—কারখানার কাজ আর আগের মতো নেই এবং ভবিষ্যতেও তা ফিরবে না।

গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে কমেছে। কেবল ২০০০-এর দশকেই প্রায় ৬০ লাখ কারখানার চাকরি (ফ্যাক্টরি জব) হারিয়েছে দেশটি। অথচ উৎপাদন কমেনি—বরং ১৯৮০-এর দশকের তুলনায় আজ দেশটি দ্বিগুণ পণ্য উৎপাদন করে।

কেন এমন হচ্ছে? কারণ, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখন শ্রম-নির্ভর নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর। অটোমেশন ও উচ্চ দক্ষতার মেশিন ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক কম সংখ্যক কর্মী নিয়েও একই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে।

একসময় কারখানার চাকরি মানেই ছিল ভালো বেতন, স্থায়ী চাকরি, ইউনিয়নের সুরক্ষা এবং ডিগ্রি ছাড়া কর্মসংস্থান। কিন্তু এখন এসব সুবিধা প্রায় নেই। কারখানার কাজের বেতন বর্তমানে সেবাখাতের অনানুষঙ্গিক কাজের তুলনায় কম। ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যাও এক-চতুর্থাংশ থেকে কমে এক-দশমাংশে নেমে এসেছে।

এখনকার দিনে পুরোনো কারখানার চাকরির মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ভালো আয়, এবং উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন কাজগুলো বেশি দেখা যায় নিচের পেশাগুলোতে :

> ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, কার্পেন্টার, এইচভিএসি (হিটিং, ভেন্টিলেশন, এয়ারকন্ডিশনিং) টেকনিশিয়ান ইত্যাদি
> মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মী
> জরুরি সেবা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য (যেমন পুলিশ, দমকলকর্মী)

এসব পেশায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিনি কাজ করছেন। অধিকাংশের ডিগ্রি নেই, বেতন ভালো এবং ইউনিয়ন কাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।চলমান প্রবণতা বলছে – নির্মাণ, মেরামত এবং নিরাপত্তা খাতে চাহিদা বাড়বে। তবে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাবে যেসব খাত, তা হলো: স্বাস্থ্য সহায়তা (হেলথ-কেয়ার সাপোর্ট) এবং ব্যক্তিগত যত্ন খাত (নার্সিং, চাইল্ড কেয়ার)। এই কাজগুলো সাধারণত নারী-কেন্দ্রিক, বেতন কম, কিন্তু চাহিদা প্রবল। হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ দানি রডরিকের মতে, এই খাতগুলোতেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত—বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে।

বেদ না, ঈশ্বর না, তবে কী মানতো চার্বাকরা?

ধরুন কেউ বলছে “যতদিন প্রাণ আছে, ততদিন ভোগ করো। ঋণ করে হলেও ঘি খাও। মৃত্যু মানেই চূড়ান্ত, পরলোকে কিছু নেই।” এই বক্তব্য শুনে আপনার প্রথমে মনে হতে পারে, ‘আরে! এ তো নির্লজ্জ ভোগবাদ!’ কিন্তু একটু গভীরে গেলে বুঝবেন, এটি আসলে একটি শক্তিশালী দর্শনের সারকথা, যা হাজার বছর আগে থেকেই ভারতের মূলধারার ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুক্তির আওয়াজ তুলেছিল।

চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন শ্রুতির ঊর্ধ্বে গিয়ে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সত্য যাচাই করতে চাইত। যখন বেদ, উপনিষদ আর পুরাণগুলি আত্মা, পরকাল, পুনর্জন্ম, ব্রহ্ম ইত্যাদি জটিল তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শেখাচ্ছিল, তখন চার্বাকরা বলছিল, “যা দেখা যায় না, শোনা যায় না, ছোঁয়া যায় না—তা নিয়ে মাথা ঘামানো বৃথা।”

চার্বাকদের দাবি ছিল, প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। অনুমান, উপমান, শব্দ কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ সেগুলো সহজেই ভুল প্রমাণিত হতে পারে।যদি কেউ বলে, আগুন ধোঁয়া তৈরি করে, তাই যেখানে ধোঁয়া সেখানে আগুনও আছে, এটা অনুমান। কিন্তু মেঘ থেকেও তো ধোঁয়া বা কুয়াশার মতো কিছু ওঠে, তাহলে সেটা ভুল প্রমাণ হতে পারে। অতএব তারা বলল যা চোখে দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়, অনুভব করা যায়, কেবল সেটাই সত্য।

চার্বাক দর্শনের সবচেয়ে আলোড়ন তোলা দিক ছিল ঈশ্বর ও আত্মা-বিরোধিতা। এরা বলতো, “আত্মা বলে কিছু নেই। শরীরটাই সব। শরীর নষ্ট হলে চেতনা ও চিন্তা সব শেষ।” যেভাবে আগুন নিভে গেলে তাপ থাকে না, ঠিক তেমনই শরীর মরে গেলে মনের অস্তিত্ব থাকে না। চার্বাকরা ‘মন’, ‘চিন্তা’, ‘স্মৃতি’ ইত্যাদিকেও শরীরের বৈশিষ্ট্য হিসেবেই ব্যাখ্যা করত।

ঈশ্বর? তারা বলত, “যদি ঈশ্বর থাকে, তবে দুনিয়ায় এত দুঃখ, যুদ্ধ, অন্যায় কেন? একজন ন্যায়বান সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এসব সহ্য করতেন কেন?” এইরকম প্রশ্ন তারা ধর্মপ্রধান সমাজের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছিল এবং প্রত্যুত্তরে নিগ্রহ পেয়েছে।

চার্বাকদের যুক্তি শুধু দর্শনের জগতে নয়, সমাজের মূল কাঠামোতেও আঘাত করেছিল। বেদ ও তার অনুসারী সমাজ যে যজ্ঞ, তপস্যা, পুজো, ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, চার্বাকরা সেগুলোকেই ভণ্ডামি বলেছিল। তারা বলত “যজ্ঞ করে স্বর্গ লাভ হবে কে বলেছে? কেউ কি ফিরে এসে জানিয়েছে স্বর্গ আছে? একদল পুরোহিত কেবল ঘি ঢেলে আগুনে টাকা পুড়িয়ে দিচ্ছে!” এই বিদ্রোহী কথাগুলোর জন্য চার্বাক দর্শন কখনোই মূলধারার অংশ হতে পারেনি। বেদ-ভিত্তিক সমাজ তাদের “নাস্তিক”, “অশুচি”, “ভোগবাদী” বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এরা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ বাস্তববাদী।

চার্বাক দর্শনের নাম ‘চার্বাক’ নামক এক ব্যক্তির নাম থেকে বলে প্রচলিত। আবার কেউ কেউ বলেন ‘চারু-বাক’ (সুন্দর বাক্য) থেকেই এসেছে নামটি।এই দর্শনকে অনেক সময় ‘লোকায়ত’ নামেও ডাকা হয়, যার অর্থ ‘মানুষের মধ্যে প্রচলিত’।

তবে দুঃখের বিষয়, চার্বাকদের নিজের লেখা কোনো গ্রন্থ আমাদের হাতে নেই। সব তথ্যই আমরা পাই বৌদ্ধ, হিন্দু বা জৈন দার্শনিকদের সমালোচনার মাধ্যমে। শঙ্করাচার্য, ধর্মকীর্তি, জৈন আচার্য হরিবদ্র, প্রভৃতিরা চার্বাকদের মত খণ্ডন করতে গিয়ে তাদের মতামতের উল্লেখ করেছেন।

তাহলে চার্বাক কি কেবল ভোগবাদ?

প্রচলিত ভুল ধারণা হলো চার্বাকরা কেবলমাত্র ভোগবাদে বিশ্বাস করত। অথচ বিষয়টা আরো সূক্ষ্ম। চার্বাকরা বিশ্বাস করত, যেহেতু জীবনের পর মৃত্যু ছাড়া কিছু নেই, তাই জীবনের মধ্যেই আনন্দ ও মুক্তির সন্ধান করো। এই দর্শন বলছিল, যতদিন দেহ আছে ততদিন জীবন অতএব দেহ ও ইন্দ্রিয়কেই মর্যাদা দাও।

এরা বলত না যে সমাজ ভেঙে দাও, বরং চেয়েছে সমাজ যেন অন্ধ বিশ্বাসে না চলে। এরা বলত না যে নৈতিকতা বাতিল করো, বলত নৈতিকতা যেন ভয়ের বা প্রলোভনের উপর না দাঁড়িয়ে যুক্তির উপর দাঁড়ায়।

বস্তুত চার্বাক দর্শন আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার এক প্রাচীন সংস্করণ। আজকের দিনেও যখন আমরা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় উন্মাদনা দেখি, তখন চার্বাকের যুক্তিনির্ভর কণ্ঠ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যেসব সমাজ এখনো প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাসে ডুবে আছে, সেসব সমাজের জন্য চার্বাক একটি দর্পণ।

চার্বাক দর্শন হয়তো প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মূলধারায় স্থান পায়নি, কিন্তু এর প্রভাব চিরস্থায়ী। ইউরোপে যখন ১৭শ-১৮শ শতকে যুক্তিবাদী আন্দোলন, বস্তুবাদ, এনলাইটেনমেন্ট শুরু হয়, তখন ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় চার্বাকরা তা বহু শতাব্দী আগেই বলে গেছে। এটা শুধু একটি দর্শন নয়, এটি যুক্তি, স্বাধীন চিন্তা ও সত্যের পক্ষ নেওয়ার সাহস।

‘দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন’ : আলী রীয়াজ

[ সোমবার ঢাকায় ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর যেভাবে হতে পারে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য থেকে ]

” এ মুহূর্তে গণতান্ত্রিক উত্তরণে আসল কাজ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো, কার্যকর করা। দ্বিতীয় হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য সম্মিলিত শক্তির একটা সমাবেশ ঘটানোর চেষ্টা করা। এটা এখনকার যেসব রাজনৈতিক শক্তি আছে, তাদের মাধ্যমে করার সম্ভাবনা আমি প্রায় দেখি না।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যে জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে ঠেকা কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে খানিকটা হলেও ঠিকঠাক করতে হবে। রাজনীতিবিদদের যদি একমত করানো যায়, তাহলে সেটা কিছুটা হবে। বাকিটা দীর্ঘ মেয়াদে একটা রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। যে শক্তির মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সেটা না হলে ঘুরেফিরে আবার ৭–১০ বছর পরে এই সংকট দেখা দেবে।

২০২৪ সালে আমাদের সামনে যে সম্ভাবনাটা তৈরি হয়েছে, সেটা হচ্ছে আমরা রাষ্ট্রটাকে বদলাতে পারি, সেই আকাঙ্ক্ষাটা তৈরি হয়েছে। কিন্তু চব্বিশের আন্দোলনটা এক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। এই স্বতঃস্ফূর্ততা একটা ফোর্স তৈরি করেছে, কিন্তু নেতৃত্ব তৈরি করেনি, কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি।

সেটা ঘটলে কোনো কমিশনের প্রয়োজন হতো না। ওই শক্তিই নির্ধারণ করে দিতে পারত যে আমি এই এই সংস্কার চাই, এটা করব এবং এই শক্তির জন্য কারও দ্বারস্থ হতে হবে না। এটা হলো না।

১০ মাস পরে এসে আমি বলছি, এই যে রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটা হয়নি।…এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। এই সুযোগে হতে পারত, কিন্তু হয়নি। তার অর্থ এই নয় যে কোনো দিন হবে না। হতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনার সেই জায়গাটা তৈরি করতে হবে।

… অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো তিনটি কাজ করার চেষ্টা করেছে। প্রথমত, কমিশনগুলো একটা এলিট পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট তৈরি করার চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয়ত, পুরো জিনিসটাই বিবেচনা করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিকভাবে। প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলে এটা অকস্মাৎ সমাধান দেবে না, কিন্তু সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের রূপান্তরের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এই অ্যাপ্রোচের যে দুর্বলতা আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিন নম্বর হচ্ছে, চেক অ্যান্ড ব্যালান্স।

আপনাকে একটা নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। পাঁচ বছরে এক দিনের গণতন্ত্র আমরা বলি। কিন্তু গত ১৬ বছর বা তারও কিছু বেশি সময় ধরে ওই এক দিনও নেই। আমার তো প্রতিষ্ঠান নেই, নির্বাচন কমিশন নেই। সংস্কার কমিশনগুলো ওই জায়গায় কাজ করছে। “

কিভাবে তৈরি হয় নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা?

১৯৮৯ সালের শেষ দিকে যখন বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ল, বিশ্ব যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাম্রাজ্যভিত্তিক যুগের অবসান ঘটছে, এমনটাই মনে হলো পশ্চিমা নেতাদের। এক বছর না যেতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ঘোষণা দিলেন নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা’ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তিরিশ বছর পেরিয়ে এসে আজ ২০২৫ সালে আবারও এক প্রশ্ন উঠছে, এই বিশ্বব্যবস্থা কি আর আগের মতো আছে?

আমরা যখন বিশ্বব্যবস্থা বলি, আসলে কী বুঝি? একটা দেশ যেভাবে শাসিত হয়, নিয়ম-আইন থাকে, কেউ সেই আইনের প্রয়োগ করে, পৃথিবীর ক্ষেত্রে এমন কেউ নেই। পৃথিবী এক বিশাল অরাজকতা, যেখানে একেকটা রাষ্ট্র নিজের মতো চলতে চায়। তবুও একটা অদৃশ্য কাঠামো আছে যেটা আমরা বলি বিশ্বব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক নিয়ম আর ন্যায্যতার স্বীকৃতি।

তবে এই “ন্যায্যতা” এক জায়গায় স্থির থাকে না। ইতিহাস বলে বৈধতা অনেক সময় শুধু বিজয়ীর ভাষায় লেখা হয়। ১৭৪০ সালের ইউরোপে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট চাইলে অস্ট্রিয়ার সিলেশিয়া প্রদেশ জবরদখল করে নিচ্ছেন, তাতে কোনো আন্তর্জাতিক আপত্তি নেই। কিন্তু আজ যদি কোনো রাষ্ট্র তেমনটা করে, সেটাকে বলা হয় আগ্রাসন।

এই বদলের পেছনে বড় একটা মোড় এসেছে ১৯৪৫ সালের পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে জাতিসংঘের জন্ম। তারা বলল যুদ্ধ যদি হয়, তা হবে শুধু আত্মরক্ষার জন্য, নতুবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি নিয়ে।

তবে বাস্তবতা কী?

২০০৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন আর্থিক সংকটে পড়ে, অনেকেই ধরে নেয় তারা হয়তো দুর্বল হচ্ছে। রাশিয়া তখনই আক্রমণ চালায় জর্জিয়ায়। চীন ততদিনে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছে। ২০১৪ সালে পুতিন ইউক্রেন দখল করলেন। যুক্তি দিলেন আত্মরক্ষা। কিন্তু জাতিসংঘে বেশিরভাগ দেশ বলল এটা আগ্রাসন। তবে রাশিয়ার পাশে দাঁড়াল চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো।

ভাবছেন জাতিসংঘ কি কিছু করতে পারল?

না। কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স আর ব্রিটেন, সবাই ভেটো ক্ষমতা রাখে। কেউ চাইলেই যে কোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। এই ভেটো অনেক সময় একটা সিস্টেমের সার্কিট ব্রেকারের মতো কাজ করে যাতে পুরো ব্যবস্থাটাই ধ্বংস না হয়। সমস্যা হলো এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্রমাগত কমছে।

পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে দেখবে ১৯১৭ সালে মার্কিন অর্থনীতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল। তারপর বিশ্বযুদ্ধ শেষে তারা বিশ্বনেতা হতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তা হতে দিল না। ফলে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি ও জাপানিজ সাম্রাজ্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ফের শক্তিশালী হলো, তবে এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন এক বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে পড়ল এবং আমেরিকা পেল “unipolar moment”, একক আধিপত্যের সময়।

কিন্তু সেই মুহূর্তটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ভুল এবং ভেতরের বিভাজন তাদের ক্ষমতা খর্ব করল। এই ফাঁকেই চীন মাথা তুলে দাঁড়াল। আর এখন ২০২৫ সালে বিশ্বের মানুষ জিজ্ঞাসা করছে, আমরা কি নতুন এক ব্যবস্থা দেখতে যাচ্ছি?

চীন আর রাশিয়ার সম্মিলিত অর্থনীতি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে জোট বজায় রাখে, তাহলে তাদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এখনো বিশ্বব্যবস্থার চালিকাশক্তি।

তবে প্রশ্নটা এখানে থেমে থাকে না। প্রশ্নটা হলো যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের অভ্যন্তরীণ সংকট, বিভাজন আর স্বার্থপর নেতৃত্ব সামলে নিয়ে সেই নেতৃত্ব বজায় রাখতে পারবে? এই মুহূর্তে ইতিহাসের মোড় ঘুরছে এটা বোঝা যায়। তবে এই মোড় নিয়ন্ত্রণে রাখবে কে? পুতিন? শি জিনপিং? নাকি মার্কিন জনগণের সিদ্ধান্ত?

আমরা যদি ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি ২০২৫ সাল সেখানে লেখা আছে কোনো বড় বাঁক হিসেবে, তাহলে সেটা হয়তো হবে কারো আগ্রাসন নয়, বরং কোনো রাষ্ট্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলাফল। বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠে বিজয় আর ভুলের গল্পে। আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কী হবে আগামীকাল, তা নির্ধারণ করবে আজকের সিদ্ধান্ত।

ফটোগ্রাফি কিভাবে শিল্প হয়ে উঠলো?

১৮৩৯ সালে যখন ফটোগ্রাফি প্রথম বাজারে আসে তখন অনেক শিল্পী আঁতকে উঠেছিলেন। পল ডেলারোশ তখনই ঘোষণা দিলেন, “আজ থেকে চিত্রকলা মৃত!” কারণ ফটোগ্রাফি মানেই বাস্তবতার নিখুঁত অনুলিপি। একটা যন্ত্র চোখের মতো দেখে, আর রঙতুলির চেয়েও নিখুঁতভাবে ক্যানভাসে চেপে দেয় বাস্তবকে। তখনকার শিল্পীরা ভাবলেন, শিল্পের জায়গাটা বুঝি এবার যন্ত্র নেবে! কিন্তু সত্যিই কি তাই ঘটেছিল?

এই প্রশ্নই আজ আবার ফিরে এসেছে AI (Artificial Intelligence) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির হাত ধরে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, AI কি শিল্প সৃষ্টি করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসে। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে ফটোগ্রাফিকে শিল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল বা প্রতিহত করার চেষ্টা হয়েছিল।

ফটোগ্রাফির আগে বাস্তবকে অনুকরণ করা মানেই ছিল শিল্প। একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী কতটা নিখুঁতভাবে মানুষের মুখ বা প্রকৃতির দৃশ্য আঁকতে পারেন, সেটাই ছিল তাঁর গৌরব। বিশেষ করে ১৯শ শতকের ফরাসি নিও-ক্লাসিকিস্ট ও প্রি-রাফায়েলাইট শিল্পীরা চরম বাস্তবতাবাদে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফটোগ্রাফি যখন সেই বাস্তবকে যন্ত্রের মাধ্যমে ধরা শুরু করল, তখন চিত্রকলার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠল।

তখনকার শিল্পী ও কবিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বোদলেয়ার, বলেছিলেন, “যদি ফটোগ্রাফিকে শিল্পে ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে একদিন সে শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে, কারণ সাধারণ মানুষের বোকামি তার সবচেয়ে বড় মিত্র।” অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতেন, ফটোগ্রাফি হয়তো শিল্প নয়, কিন্তু শিল্পীদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে। আবার একটি তৃতীয় দল ফটোগ্রাফিকে একটি নতুন ধারা হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, একটি যন্ত্রনির্ভর অথচ শিল্পসাধনার ক্ষেত্র।

কিভাবে ফটোগ্রাফি শিল্প হয়ে উঠল?

প্রথম দিকে ফটোগ্রাফি ছিল মূলত স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম। ধনীরা আগে যেখানে প্রতিকৃতি আঁকাতেন, সাধারণ মানুষ তা পারত না। কিন্তু ড্যাগুয়েরোটাইপ প্রযুক্তি এলো আর স্বল্পমূল্যে যান্ত্রিক প্রতিকৃতি তৈরি সম্ভব হয়ে উঠল। এরপর পর্যটকরা প্রাচীন রোমান ধ্বংসাবশেষের ছবি নিতে লাগল, ইঞ্জিনিয়াররা নির্মাণকাজের নথিপত্র রাখতে লাগলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ধরা পড়তে লাগল ক্যামেরার লেন্সে। কিন্তু একটা সময়ের পর, প্রশ্ন উঠল এই যন্ত্রনির্ভর ছবি কি শিল্প? শিল্পের মধ্যে যদি থাকে মানুষের অনুভব, সৌন্দর্যবোধ, ইচ্ছাশক্তি, তাহলে কি যন্ত্রের তৈরি ছবি সেই সংজ্ঞায় পড়ে?

এই বিতর্ক থেকেই ফটোগ্রাফি-ভিত্তিক শিল্প আন্দোলনের জন্ম হয়। “Pictorialism” ও “Photo-Secession” আন্দোলন। এদের দাবি ছিল ছবিতে শিল্পীর নিয়ন্ত্রণ, কম্পোজিশন, আবহ all are artistic choices. আর তাই এসব ছবি শুধু তথ্য নয়, অনুভূতিও বহন করে। ১৯১০ সালে স্টিগলিটজ যখন আলব্রাইট গ্যালারিতে প্রথম ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী আয়োজন করলেন, তখন একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলল যে ফটোগ্রাফিও এখন শিল্প।

ফটোগ্রাফির আগমন চিত্রকলাকে ধ্বংস করেনি, বরং নতুন পথ দেখিয়েছে। যদি ক্যামেরা বাস্তবকে অনুলিপি করতে পারে, তাহলে চিত্রশিল্পীর কাজ কী?এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিল নতুন ধারার চিত্রকলার ইমপ্রেশনিজম, টোনালিজম এবং পরবর্তীতে অ্যাবস্ট্রাকশন। শিল্পীরা বললেন, “আমরা শুধু বাইরে যা দেখি তা আঁকব না, আমরা যা অনুভব করি, যা স্বপ্ন দেখি, সেটাই দেখাব।”

ভ্যান গঘ তার ভাইকে লিখেছিলেন, “একটা আয়নায় বাস্তবতা ধরা পড়লে, সেটাকে আমরা ছবি বলি না, কারণ সেটা শুধু ছায়া। রঙ, রেখা, অতিরঞ্জন—এই সবকিছু মিলে একটা ছবি শিল্প হয়।” এইভাবে ফটোগ্রাফি পুরনো বাস্তববাদকে ভেঙে দিল, কিন্তু তার বদলে এক নতুন শিল্প-চেতনার জন্ম দিল। বলা যায় ফটোগ্রাফি না এলে হয়তো আধুনিক চিত্রকলাও আসত না।

আজকের দিনে আবার আমরা দাঁড়িয়েছি এক অনুরূপ সন্ধিক্ষণে। AI নির্মিত চিত্র তৈরি প্রযুক্তি, যেমন DALL·E বা Midjourney, দেখে অনেকে আতঙ্কিত হচ্ছেন এই যন্ত্রগুলো বুঝি শিল্পীদের চাকরি নিয়ে নেবে।

তবে ইতিহাস বলছে নতুন প্রযুক্তি শিল্পকে ধ্বংস করে না, বরং তাকে বিবর্তিত করে। Pixar প্রতিষ্ঠাতা আলভি রে স্মিথ বলেছিলেন, “কম্পিউটার শুধু একটা টুল। এটা নিজে থেকেই সৃজনশীল নয়।” আজও অ্যানিমেশন, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিজ্যুয়াল আর্ট সব জায়গায় কম্পিউটার আছে, কিন্তু তার পিছনে রয়েছে মানুষের মেধা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা।

AI-ও ঠিক সেইরকম এক মাধ্যম, এটা শুধু একটা টুল। একজন শিল্পী চাইলে এটাকে ব্যবহার করে নিজের চিন্তা আরও গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারেন।তার ভিশন, আবেগ, স্টাইল AI-কে নির্ধারণ করবে। যেমন ফটোগ্রাফি একটা নতুন শিল্পের জন্ম দিয়েছিল, AI-ও দিচ্ছে তেমন নতুন এক সম্ভাবনার দরজা।

যখনই কোনো নতুন প্রযুক্তি আসে মানুষ ভয় পায়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে সেই ভয়ই একটা নতুন শিল্প-বিপ্লবের জন্ম দেয়। শিল্প মানে কল্পনা, উদ্দেশ্য, এবং হৃদয়ের প্রকাশ। সেটাই থাকলে মাধ্যম বদলালেও শিল্প থেকে যায়। AI কি শিল্প সৃষ্টি করতে পারে? উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলছে নতুন প্রযুক্তি শিল্পের পরিসর বাড়া সংকুচিত করে না। এখন শিল্পীদের দায়িত্ব, এই নতুন যন্ত্রকে আত্মস্থ করে ভবিষ্যতের শিল্পের ভাষা নির্মাণ করা।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসরাইল-ইরান-ফিলিস্তিন প্রশ্ন : রবার্ট ফোর্ড, সিরিয়া ও আলজেরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত

” … ওবামা, বাইডেন ও ট্রাম্প—তিনজনই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অসন্তোষের কথা ভেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ কম করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বুশ প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ, বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের বিরক্তি এই নীতিকে উৎসাহিত করেছে। ওবামা ও বাইডেন মানবাধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের প্রচেষ্টা বিশেষ সফল হয়নি।

ট্রাম্প শুরু থেকেই সরাসরি বলেছেন যে উদারনৈতিক বা লিবারেল আদর্শ দিয়ে কাজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ঠিক করতে হবে বাস্তবতার ভিত্তিতে।আমরা ট্রাম্পের সেই কথারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি তাঁর ইরান ও সিরিয়া নীতিতে।

২০১৭ সালের রিয়াদ ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, হঠাৎ করে সামরিক হস্তক্ষেপ বা শাসন পরিবর্তনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হবে না। তিনি সাবধান করেছিলেন যে এ রকম পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বিপর্যয় এবং চরমপন্থার উত্থান ডেকে আনতে পারে।

২০২৫ সালে একই বক্তব্যকে আরও জোর দিয়েছেন। বলেছেন যে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র দূরে থাকবে। তিনি বলেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো বা কাকে নেতৃত্বে রাখা উচিত, তা নির্ধারণ করার দিন শেষ।

… ২০২৫ সালে তিনি সরাসরি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য বড় বড় প্রকল্পের পেছনে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে কোনো লাভ হয়নি। তাই তিনি এই প্রকল্পগুলো বন্ধ করেছেন বা কাটছাঁট করেছেন। বহু এনজিও এবং সরকারি দপ্তরের কর্মী তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন।

তাঁর মতে, সংস্কার হবে ধীরে ধীরে। বিপ্লবের মতো আকস্মিকভাবে নয়। এ কারণেই তিনি ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের ধাপে ধাপে সংস্কার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার পথে এগোনোকে তিনি প্রশংসা করেছেন।

… ইরানের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর কোনো স্থায়ী শত্রু নেই। ইরানে শাসন পরিবর্তন চান না তিনি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই তাঁর পছন্দ।

তবে তিনি কঠোরভাবে এ-ও বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত হতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। তবে তাঁর পছন্দ সামরিক নয়, কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ। তিনি ইরানের তেলের রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলেছেন।

… ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভিত্তি মূলত ব্যবসা, বাণিজ্য এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। তিনি চাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেরাই নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নেতৃত্ব নিক। আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে, অর্থনৈতিক চুক্তি করবে। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে খরচ করতে যুক্তরাষ্ট্র আর রাজি নয়।

তিনি চান ইসরায়েলকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় নিয়ে আসা হোক। আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ তাঁর এই কৌশলের অংশ। তবে ফিলিস্তিনি জনগণের স্থান এই পরিকল্পনায় কোথায়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে ভূমধ্যসাগরীয় দেশ ও তুরস্কের নেতাদের কথা শুনবেন। “

‘Clairvoyance’ স্বপ্নে দেখা ঘটনা বা দুর্ঘটনা সত্যি হয়ে গেছে কখনও?

১৯৭৭ সালে আমেরিকার নিউ জার্সির বাসিন্দা প্যাট্রিসিয়া প্যাটারসন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তিনি বারবার বলতে থাকেন, “একটি ছোট ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে… ওর নাম শন… সে এখন একটি লাল গাড়িতে…”। স্বামী প্রথমে এটিকে দুঃস্বপ্ন ভেবেছিলেন। কিন্তু অবাক করার মতো ঘটনা ঘটে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর। রেডিও এবং টিভিতে ব্রেকিং নিউজ একটি ছোট শিশু শন ফারগুসন অপহরণ হয়েছে। তার সর্বশেষ অবস্থান ছিল একটি লাল রঙের ভ্যানের আশপাশে।

প্যাট্রিসিয়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা নন, কোনো গোয়েন্দাও নন। তবে এই ঘটনার পর তিনি পরিচিত হন ‘সাইকিক ডিটেকটিভ’ নামে। এই ঘটনায় FBI-ও পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। ঘটনাটি আজো অনেকে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। কেউ বলেন এটা নিছক কাকতালীয়, কেউ বলেন—প্যাট্রিসিয়া ছিলেন একজন সত্যিকারের “ক্লেয়ারভয়েন্ট”, অর্থাৎ অতীন্দ্রিয় জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। এই রহস্যময় ক্ষমতারই নাম ক্লেয়ারভয়েন্স (Clairvoyance)।বাংলায় একে বলা যায় “অতীন্দ্রিয় দর্শন”। এমন এক মানসিক শক্তি যা দিয়ে মানুষ দেখতে পায় এমন কিছু যা সে চোখে দেখে না।

এই ক্ষমতার কথা নতুন নয়। প্রাচীন ভারতের ঋষিরা ‘দিব্যদৃষ্টি’র কথা বলেছেন। মহাভারতে সংজ্ঞায়িত হয় ‘দ্রষ্টা’ বা ঋষি, যিনি সত্য দেখতে পান।গ্রীসে ছিল ডেলফির অরাকল, যাঁরা দেবতার দূত হয়ে রাজাদের ভবিষ্যৎ বলে দিতেন। চীনেও ছিল ‘ম্যাণ্ডারিন অরাকল’ যারা রাজদরবারে ভবিষ্যৎ বা দুর্ভাগ্যের বার্তা বহন করত।

ইউরোপে ষোড়শ শতকে নস্ত্রাদামুস হয়ে ওঠেন ক্লেয়ারভয়েন্স ক্ষমতার প্রতীক। তিনি ৯৪৪টি ভবিষ্যদ্বাণী লিখে যান, যেগুলোর মধ্যে অনেকে আজও নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মিল খোঁজেন। ফরাসি বিপ্লব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৯/১১ হামলা এমনকি ডায়ানার মৃত্যুও এর মধ্যে লিপিবদ্ধ ছিলো বলে জানা যায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্লেয়ারভয়েন্স হতে পারে মস্তিষ্কের বিশেষ ইন্দ্রিয়-প্রক্রিয়ার ফল, যেটা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে নিস্ক্রিয় থাকে। আবার কেউ বলেন এটা নিছক confirmation bias।অর্থাৎ যেটা মিলেছে সেটাই আমরা মনে রাখি, ভুলগুলো ভুলে যাই।

তবে গবেষণা থেমে নেই। আমেরিকার Duke University-তে Dr. J.B. Rhine ১৯৩০–৫০-এর দশকে ‘জেনার কার্ড’ দিয়ে হাজারো মানুষের ওপর পরীক্ষা চালান। কিছু মানুষ বাস্তবভাবে দূরের ঘটনা অনুমান করতে পেরেছিল। যদিও মূলধারার বিজ্ঞান এই গবেষণাকে সন্দেহভাজন বলেই বিবেচনা করে।

১৯৭০–৯৫ সাল পর্যন্ত CIA এক গোপন প্রকল্প চালায় যার নাম ছিল “Stargate Project”। তারা কিছু মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরীক্ষায় বসিয়েছিল: কোনো নির্জন জায়গায় তারা ‘চোখ বন্ধ করে’ কি কি আছে তা বর্ণনা করবে। আশ্চর্যজনকভাবে অনেক সময় তারা আসবাবপত্রের বিবরণ, এমনকি শত্রুপক্ষের মিলিটারি ঘাঁটির অবস্থানও বলে দিয়েছিল। এই প্রজেক্ট আজও বিতর্কিত, তবে এটিই আধুনিক ইতিহাসে ক্লেয়ারভয়েন্স নিয়ে সবচেয়ে বাস্তব এবং উচ্চপর্যায়ের গবেষণা।

ইসলাম ধর্মে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হওয়া বা তার দাবিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “ভবিষ্যৎ জানে একমাত্র আল্লাহ”। হাদিসে এমন ব্যক্তিদের বিশ্বাস না করার নির্দেশ আছে। খ্রিস্টধর্মেও অকাল্ট প্র্যাকটিস বা অতীন্দ্রিয় শক্তির ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কতা রয়েছে।

তবে হিন্দু দর্শন বা বৌদ্ধ ধ্যানপ্রথায় ‘দিব্যচক্ষু’ বা ‘যোগসিদ্ধি’ দ্বারা অতীত-ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা অনেক সাধকের মধ্যে পাওয়া গেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। তিব্বতের কিছু লামা নির্জন ধ্যানে বসে শত শত বছর পরের ঘটনাও দেখতে পেতেন বলে দাবি আছে অনেক তিব্বতী গ্রন্থে।

আমরাও মাঝে মাঝে শুনি, “অমুক সব বলে দিতে পারে,” “স্বপ্নে দেখেছিল, তাই বলেছিল” ইত্যাদি। গ্রামে একদল নারী থাকে যাঁরা স্বপ্নে ‘দেখেন’ কে বাঁচবে, কার কী হবে। আধুনিক শহরে দেখা যায় ‘পাম রিডার’, ‘ট্যারোট কার্ড রিডার’, কেউ কেউ বলে তাঁরা আত্মার সঙ্গে কথা বলেন। তবে বাস্তবে এদের মধ্যে কে সত্যিকারের ক্লেয়ারভয়েন্ট আর কে শুধুই কৌশলী প্রতারক তা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। আর এখানেই জন্ম নেয় বিতর্ক।

একটি মজার তথ্য হলো, মানুষের মস্তিষ্কে pineal gland নামের একটি অংশ আছে যা অনেকেই ‘তৃতীয় চোখ’ বলে বিশ্বাস করেন। এই গ্রন্থি আলো আঁধারির সঙ্গে শরীরের হরমোন রেগুলেট করে, আবার ধ্যানের সময় এর কার্যকারিতা বেড়ে যায় বলেও গবেষণায় দেখা গেছে।

কেউ কেউ বলেন ক্লেয়ারভয়েন্স এই pineal gland-এর এক অতিমাত্রিক রূপ, যেখানে মন তথ্য ‘ধারণ’ করে না, বরং এক অদৃশ্য জগত থেকে গ্রহণ করে।

২০১৩ সালে কলকাতার এক মেয়ের ঘটনা ছাপা হয় পত্রিকায়। মেয়ে বলেছিল তার মায়ের ব্যাগে একদিন আগেই বিষ রাখা হয়েছিল। সকালে দেখা গেল মা সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, পরে জানা গেল কেউ একদিন আগেই খাবারে বিষ মিশিয়েছিল। এই ঘটনা কোনো পত্রিকার বানানো গল্প? নাকি এক নিখুঁত ক্লেয়ারভয়েন্টের অভিজ্ঞতা?

তাহলে সত্যি কি ক্লেয়ারভয়েন্স আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট। Clairvoyance একদিকে প্রতারণার আশ্রয় হতে পারে, আবার অন্যদিকে হতে পারে এমন একটি মানসিক ক্ষমতা যা আমরা এখনো বিজ্ঞান দিয়ে ধরতে পারিনি। FBI থেকে CIA প্রাচীন ভারত থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমস এমন অনেক প্রামাণ্য ও বিতর্কিত ঘটনা ক্লেয়ারভয়েন্সকে শুধুই ছেলেমানুষি কল্পনা বলার সুযোগ রাখে না। কেউ একে মানসিক রোগ বলে, কেউ ‘গড গিফট’ মানে। কেউ বলে এটা নিছক ছলনা। আমরা হয়তো কখনও নিশ্চিত হতে পারব না। কিন্তু এই রহস্য, এই সম্ভাবনা, এই অদ্ভুত অন্য’র দরজা সবসময়ই খোলা থাকবে। হয়তো আপনি, আমি বা যে কেউ অজান্তেই সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কখনো দেখে ফেলি এক ফালি অদৃশ্য বার্তা ।

“জীবন আমার বোন” : যেখানে জীবন নারী নয়, প্রেম নয়, একটা ক্ষত

“জীবনের গন্ধ পেতাম, কিন্তু সে গন্ধের আর উৎস পাই না।” — মাহমুদুল হক, জীবন আমার বোন

একজন মানুষ ফিরে আসে শহরে। তার কোনো নাম নেই। নেই বাড়ি, নেই মা, নেই বোন। নেই পরিচিত কেউ। অথচ এই শহর একসময় ছিল তার। এখন শহরটি যেন নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। দোকান খোলা, রিকশা চলে, মানুষ হাঁটে, কিন্তু তার চারপাশে কেবল স্তব্ধতা।

এইভাবে শুরু হয় মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন। কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং অস্তিত্ববাদী স্মৃতির অনুরণনে গড়া এক আত্মদর্শী ভ্রমণ। এখানে চিরাচরিত কাহিনি কাঠামো নেই, নেই উত্তেজনাকর দ্বন্দ্ব বা চমকপ্রদ সমাপ্তি।

নামহীন এক ব্যক্তি ফিরে আসে যুদ্ধোত্তর শহরে। সে খুঁজে বেড়ায় ‘জীবন’-কে। কে এই জীবন? প্রেমিকা? বোন? নাকি শুধুই স্মৃতির মায়া? এই অনুসন্ধান কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে নয়, বরং এককালের অস্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল চেষ্টা। সে ফিরে পেতে চায় যুদ্ধের আগে হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে, সেই অচেনা বাড়িকে যেখানে উঠোনে বোন বসে থাকতো। কিংবা সেই নিজস্ব সময়কে, যেটা এখন কেবল ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতি।

উপন্যাসের সবচেয়ে দ্ব্যর্থপূর্ণ ও গভীর চরিত্র ‘জীবন’। তিনি কি একজন নারী, যাকে ভালোবাসা হয়েছিল? নাকি তিনি এক আত্মিক ধারণা। এক ‘অপরাপর’ যাকে ধরা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়? উপন্যাসের নামেই প্রশ্ন জেগে ওঠে, জীবন যদি বোন হয়, তবে সে কোথায়?

মাহমুদুল হকের গদ্য কাব্যিক নয়, বরং যেন নীরব আত্মস্বীকার। তাঁর বাক্যগুলো ছোট, সংযত, কিন্তু বিষণ্নতায় পূর্ণ। “আমার কোনো নাম ছিল না তখন, এখনো নেই।” এই একটি বাক্যই মানুষের অস্তিত্ব সংকট, নামহীনতার ব্যথা ও আত্মপরিচয়ের বিলাপ একসাথে ধারণ করে। গল্পে সংলাপ কম।বর্ণনা ছিমছাম, যেন পাঠক নিজেই একটি মানসিক যাত্রার সঙ্গী। হকের ভাষা যেন হেঁটে চলা, ঘুরে ফিরে নিজের ভেতরে ফেরা।

গল্পে সময় কখনো বর্তমান, কখনো অতীত। কখনো ভবিষ্যৎ, আবার কখনো ভবিষ্যতেরও পরে। ‘গতকাল’ যেখানে মা-বোন জীবিত ছিলেন। ‘আজ’ এক নষ্ট শহর। আর ‘আগামীকাল’ জীবন ফিরে আসবে কি না, সেই অনিশ্চিত প্রতীক্ষা। এইভাবে সময় চলে গহিনে, যেখানে স্মৃতি আর বাস্তবতা একে অপরকে প্রশ্ন করে।

পরিচিত জায়গায় গিয়ে মানুষটিকে কেউ চেনে না। সে বসে থাকে কিন্তু সময় চলে যায় অন্যদিকে। এটি শুধু শহরের পরিবর্তন নয়, এক ব্যক্তির মুছে যাওয়ার দৃশ্য। কখনো দেখা যায় জীবনকে, কিন্তু সে আবার হারিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে মানুষটি ফিরে যায় সেই পুরনো বাড়ির সন্ধানে। কিন্তু বাড়ি নেই শুধু তার গন্ধ যেন বাতাসে ভাসে। এ এক প্রগাঢ় স্মৃতিচারণ ও বাস্তবতার সংঘর্ষ।

মাহমুদুল হক নিজেই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের একজন নীরব, প্রজ্ঞাবান পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় রাজনীতি নেই, আছে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির ধ্বনি। এই উপন্যাসে হক যেন নিজের ভেতরের অস্তিত্ব সংকটের কথা বলছেন, বলছেন এমন এক যন্ত্রণার কথা, যার ভাষা নেই।

‘জীবন আমার বোন’ একধরনের অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতা। যারা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগেছেন, যারা কারো জন্য ফিরেছেন অথচ তাকে আর পাননি, যারা শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কোনো ব্যাখ্যাহীন মুহূর্তে, তাদের জন্য এই উপন্যাস নিঃশব্দ আয়না।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিদেশে কীভাবে কাজ করে?

বিভিন্ন সময় বিদেশের মাটিতে টার্গেট করে চালানো বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নাম এসেছে। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার প্রথমদিনেই ইরানে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। তবে এধরণের হামলা এটিই প্রথম নয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—ইসরায়েল কীভাবে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে এত সফল অভিযান চালাতে পারে? ইসরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করে?

মোসাদ গঠিত হয় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় বছর পর, ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে। তাদের কাজ ছিল ইসরায়েলকে বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা করা। এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল ইসরায়েলের অস্তিত্ব নিরাপদ রাখা।

শাবাক বা শিন বেট গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। এই গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হলো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিন বেট দাবি করে, তারা পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ‘অদৃশ্য ঢাল’ হিসেবে কাজ করে।

আমান হলো ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাধারণ সদর দপ্তরের অধীনে কাজ করে। এই সংস্থার মূল কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সামরিক কমান্ডকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা।

আমান বেশ কয়েকটি ইউনিট নিয়ে গঠিত, তবে ৮২০০, ৯৯০০ এবং ৫০৪ হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট, যারা গাজায় ইসরায়েলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ইউনিটগুলোর দায়িত্ব হলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান থেকে আসা গোয়েন্দা ও সামরিক হুমকি সনাক্ত করা।

ইউনিট ৮২০০-কে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় এবং এই ইউনিটের মাধ্যমেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মতে, এটি তাদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট।

তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট ৮২০০-তে ১০ হাজারের বেশি লোক কাজ করে এবং এখানে যারা কাজ করে তারা এলিট এবং শিক্ষিত বাহিনী থেকে বাছাই করা। এমনও বলা হয়, এই ইউনিটে কাজ করা সদস্যদের সংখ্যা মোসাদ ও শিন বেটের সদস্যদের থেকেও বেশি। তারা তথ্য সংগ্রহ করে, তা বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠায়।

প্রযুক্তির দিক থেকে ইউনিট ৮২০০-র তুলনা করা হয় বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। কারিগরি দিক থেকে একে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) সমতুল্য মনে করা হয়।

ইউনিট ৮২০০-এর কার্যক্রম সবসময় গোপন রাখা হয়। তবুও সামরিক ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, এই ইউনিট ইসরায়েলকে রক্ষা করতে কিংবা ইসরায়েলের হয়ে আক্রমণ করতে এক কথায় প্রতিরক্ষা ও হামলা উভয় ধরনের অভিযানে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। এই ইউনিট গঠিত হয় ১৯৫২ সালে।

যদি ইউনিট ৮২০০-কে ইসরায়েলের “কান” বলা হয়, তাহলে ইউনিট ৯৯০০-কে তার “চোখ” বলা যেতে পারে।এই ইউনিটের দায়িত্ব হলো ছবি ও ভিডিও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। এজন্য এই ইউনিট স্যাটেলাইট, গোয়েন্দা বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে।

এসব ছবি ও ভিডিওর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সেনা কমান্ডার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট পৌঁছে দেয়াও এই ইউনিটের দায়িত্ব। ইউনিট ৯৯০০-র কাছে আধুনিক প্রযুক্তি আছে, যার মাধ্যমে তারা যুদ্ধে লিপ্ত ইসরায়েলি সেনাদের জন্য থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করে দেয়।

তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরানকে পর্যবেক্ষণ করাও ইউনিট ৯৯০০-এর দায়িত্ব, যা ইসরায়েলের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ‘হরাইজন ১৩’ দিয়ে করা হয়।

২০২৩ সালের জুনে ইসরায়েলি মিডিয়া জানায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে “ব্রাঞ্চ ৫৪” নামে নতুন একটি গোয়েন্দা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার কাজ হবে ইরান এবং “পাসদারান-ই-ইনকিলাব” (ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া।

ব্রাঞ্চ ৫৪ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইরানের সামরিক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য। এই ইউনিটের এক কমান্ডার বলেন, “ব্রাঞ্চ ৫৪ প্রতিষ্ঠা এই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানি সামরিক হুমকি সম্পর্কে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে”।

নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা।”

এই গোয়েন্দা ইউনিটের একটি অংশ ইরানের সেই স্থানগুলো শনাক্ত করে, যেখানে যুদ্ধ শুরু হলে আক্রমণ চালানো যাবে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের দখলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প

প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশের একক নির্ভরতা রয়েছে চীনের ওপর। তাই এ ধরনের চামড়া বিক্রিতে খুব বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ নেই।অনেকটা বাধ্য হয়েই চীনের কাছে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে বাংলাদেশকে চামড়া রপ্তানি করতে হয়। নতুন বাজার বৃদ্ধি না পাওয়ায় চামড়ার চাহিদা তেমন বাড়ছে না।

ইউরোপের লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) পরিবেশগত সনদ না পাওয়ায় এক দশক ধরে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ। একসময় ইতালি, আমেরিকা ও কোরিয়ান বায়ার তথা ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া নিলেও এখন তাঁরা চীনমুখী হয়ে গেছেন। আর চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আবাসিক অফিস খুলে ট্যানারি থেকে আড়ত পর্যন্ত নিয়মিত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের একচেটিয়া কারবারে অসহায় অবস্থা এখানকার ব্যবসায়ীদের।

সাভারের হেমায়েতপুরের বিসিক চামড়াশিল্প নগরের ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীনা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা প্রতি বর্গফুট প্রক্রিয়াজাত চামড়ার দাম পড়ে ৬০–৭০ টাকা। কিন্তু সরকার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৬০–৬৫ টাকা, যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। লবণযুক্ত চামড়া কেনার পর তা পশমমুক্ত করে শুকিয়ে রং করে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।

চামড়ার সোনালি দিনের কথা স্মরণ করে এবিএস ট্যানারির হিসাব কর্মকর্তা আহমদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৫ সালের আগেও আমরা বিভিন্ন দেশে প্রতি বর্গফুট চামড়া বিক্রি করতাম তিন ডলারে। এখন তা ৫০ থেকে ৭০ সেন্টে নেমে এসেছে। তখন আমরা প্রতিটি চামড়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েও কিনেছি।’

এবছর সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ঢাকায় মাঝারি আকারের একটি গরুর ২৫ বর্গফুটের লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬২৫ টাকা। কিন্তু এই দামে নাকি রপ্তানিও করা যায় না বলে দাবি ট্যানারি ব্যবসায়ীদের। তাঁদের মতে, ইউরোপের বাজার চালু করা গেলে চামড়ার দাম বেড়ে যাবে।