বিভিন্ন সময় বিদেশের মাটিতে টার্গেট করে চালানো বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নাম এসেছে। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার প্রথমদিনেই ইরানে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। তবে এধরণের হামলা এটিই প্রথম নয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—ইসরায়েল কীভাবে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে এত সফল অভিযান চালাতে পারে? ইসরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করে?
মোসাদ গঠিত হয় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় বছর পর, ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে। তাদের কাজ ছিল ইসরায়েলকে বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা করা। এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল ইসরায়েলের অস্তিত্ব নিরাপদ রাখা।
শাবাক বা শিন বেট গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। এই গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হলো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিন বেট দাবি করে, তারা পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আসা হুমকির বিরুদ্ধে ‘অদৃশ্য ঢাল’ হিসেবে কাজ করে।
আমান হলো ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাধারণ সদর দপ্তরের অধীনে কাজ করে। এই সংস্থার মূল কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সামরিক কমান্ডকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা।
আমান বেশ কয়েকটি ইউনিট নিয়ে গঠিত, তবে ৮২০০, ৯৯০০ এবং ৫০৪ হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট, যারা গাজায় ইসরায়েলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ইউনিটগুলোর দায়িত্ব হলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান থেকে আসা গোয়েন্দা ও সামরিক হুমকি সনাক্ত করা।
ইউনিট ৮২০০-কে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় এবং এই ইউনিটের মাধ্যমেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মতে, এটি তাদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট।
তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট ৮২০০-তে ১০ হাজারের বেশি লোক কাজ করে এবং এখানে যারা কাজ করে তারা এলিট এবং শিক্ষিত বাহিনী থেকে বাছাই করা। এমনও বলা হয়, এই ইউনিটে কাজ করা সদস্যদের সংখ্যা মোসাদ ও শিন বেটের সদস্যদের থেকেও বেশি। তারা তথ্য সংগ্রহ করে, তা বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠায়।
প্রযুক্তির দিক থেকে ইউনিট ৮২০০-র তুলনা করা হয় বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। কারিগরি দিক থেকে একে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) সমতুল্য মনে করা হয়।
ইউনিট ৮২০০-এর কার্যক্রম সবসময় গোপন রাখা হয়। তবুও সামরিক ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, এই ইউনিট ইসরায়েলকে রক্ষা করতে কিংবা ইসরায়েলের হয়ে আক্রমণ করতে এক কথায় প্রতিরক্ষা ও হামলা উভয় ধরনের অভিযানে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। এই ইউনিট গঠিত হয় ১৯৫২ সালে।
যদি ইউনিট ৮২০০-কে ইসরায়েলের “কান” বলা হয়, তাহলে ইউনিট ৯৯০০-কে তার “চোখ” বলা যেতে পারে।এই ইউনিটের দায়িত্ব হলো ছবি ও ভিডিও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। এজন্য এই ইউনিট স্যাটেলাইট, গোয়েন্দা বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে।
এসব ছবি ও ভিডিওর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সেনা কমান্ডার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট পৌঁছে দেয়াও এই ইউনিটের দায়িত্ব। ইউনিট ৯৯০০-র কাছে আধুনিক প্রযুক্তি আছে, যার মাধ্যমে তারা যুদ্ধে লিপ্ত ইসরায়েলি সেনাদের জন্য থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করে দেয়।
তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরানকে পর্যবেক্ষণ করাও ইউনিট ৯৯০০-এর দায়িত্ব, যা ইসরায়েলের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ‘হরাইজন ১৩’ দিয়ে করা হয়।
২০২৩ সালের জুনে ইসরায়েলি মিডিয়া জানায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে “ব্রাঞ্চ ৫৪” নামে নতুন একটি গোয়েন্দা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার কাজ হবে ইরান এবং “পাসদারান-ই-ইনকিলাব” (ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া।
ব্রাঞ্চ ৫৪ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইরানের সামরিক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য। এই ইউনিটের এক কমান্ডার বলেন, “ব্রাঞ্চ ৫৪ প্রতিষ্ঠা এই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানি সামরিক হুমকি সম্পর্কে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে”।
নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা।”
এই গোয়েন্দা ইউনিটের একটি অংশ ইরানের সেই স্থানগুলো শনাক্ত করে, যেখানে যুদ্ধ শুরু হলে আক্রমণ চালানো যাবে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


